বিপজ্জনক সংকেত

জয়দীপ চক্রবর্তী

মুক্তিনাথ সম্পর্কে প্রায় কিছুই জানা ছিল না অরুণাংশু বা সুছন্দার। পরিদাদুই বলছিলেন, 'একবার যেতে পারলে মন্দ হত না রে খুকু। জায়গাটার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য নিয়ে তো কথাই হবে না কোনও, তাছাড়া আধ্যাত্মিক দিক থেকেও মুক্তিনাথ কিন্তু অসাধারণ। আমার যে কতদিনের ইচ্ছে একবার ওখানে যাওয়ার।

'জায়গাটা তো নেপালের দিকে বোধহয়'—অরুণাংশু বললেন।

'নেপালের দিকে টিকে নয় নেপালেই'— পরিদাদু বললেন, 'একদিকে পশুপতিনাথ শিব অন্যদিকে মুক্তিনাথ নারায়ণ দুটিই নেপালের খুব ইম্পরট্যান্ট তীর্থস্থান। পার্থক্য একটাই। শিব সহজ সরল আশুতোষ, তাঁর কাছে পৌঁছনও খুব কষ্টকর নয়, কিন্তু নারায়ণের কাছে পৌঁছনো সহজ নয়। মুক্তিনাথের পথ বেশ দুর্গম।

'তাহলে আমরা ওখানে কী করে যাব পরিদাদু, ট্রেক করে?' শাওন জিজ্ঞেস করল চোখ গোল গোল করে।

'অনেকেই যায় ট্রেক করে, পরিদাদু বললেন শাওনের মাথার চুলের মধ্যে আঙুল বোলাতে বোলাতে 'সত্যি বলতে কি ট্রেকিং রুটটাও অসাধারণ, কিন্তু আমরা সে পথে যাব না। জমসম পর্যন্ত দিব্বি গাড়ি যাচ্ছে আজকাল। এমনকি কাঠমান্ডু থেকে জমসম এয়ার রুটও হয়ে গেছে এখন। কলকাতা থেকে কাঠমান্ডু হয়ে সোজা জমসম পর্যন্ত আরামসে প্লেনে চেপে পৌঁছে যাওয়া যায় হুস করে। তারপর জমসম থেকে মুক্তিনাথ ইচ্ছে হলে হাঁটা লাগাতে পারো।'

'আর হাঁটার ইচ্ছে না হলে?' মাথার ওপর দু—হাত তুলে আড়মোড়া ভাঙতে ভাঙতে বললেন অরুণাংশু। 'ইচ্ছে না হলে হাঁটবে না,' পরিদাদু হালকা গলায় বললেন, 'কে তোমায় জোর করে হাঁটতে বলছে বাপু, তোমার মতন অলস লোকেদের জন্যে জমসম থেকে মুক্তিপাথ জিপ সার্ভিস হয়ে গেছে বলে শুনেছি আজকাল।'

'তাহলে বাপু আর হাঁটাহাঁটি করে লাভ নেই'—রান্নাঘর থেকে বাইরে বেরিয়ে এসে আঁচলে মুখ মুছতে মুছতে বললেন সুছন্দা।

শাওন জিজ্ঞেস করল, 'আমরা কি তাহলে প্লেনেই যাচ্ছি পরিদাদু?'

'বাবা কী বলে দেখ,' বলে শাওনের দিকে চেয়ে চোখ টেপেন পরিদাদু, 'অরুণটা যা কৃপণ রাজি হবে কি আর?'

'আহা শুরুতেই আমার ওপর অ্যামন ব্লেম দেওয়াটা কি ঠিক হচ্ছে পরি?' প্রতিবাদের সুরে বললেন অরুণাংশু, 'আমি তো ছাই জানিই না আর কী কী উপায়ে মুক্তিনাথে পৌঁছনো যায়'—

'ট্রেনে যাওয়া যায়'—পরিদাদু বলতে শুরু করেন। শাওন তাঁর কথার মাঝখানেই বলে ওঠে, 'এক্কেবারে নেপাল পর্যন্ত?'

'না না'—হেসে ওঠেন পরিদাদু, 'ট্রেনে করে আমাদের নামতে হবে রক্সৌল। তারপর ওখান থেকে বর্ডার পেরিয়ে বীরগঞ্জ হয়ে গাড়ি নিয়ে সোজা পোখরা'—

'পোখরার কাছাকাছি তাহলে জায়গাটা?' সুছন্দা জিজ্ঞেস করেন।

'নো ম্যাডাম', পরিদাদু হাসেন, 'মুক্তিনাথ ওখান থেকে বহুদূর। বরং পোখরাকে তুই মুক্তিনাথ যাত্রার গেটওয়ে বলতে পারিস। কেননা ওখান থেকেই মুক্তিনাথ যাবার সরকারি অনুমতিপত্র জোগাড় করতে হয় প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দিয়ে'—

'ওব্বাবা অ্যাতো হ্যাপা?' মুখ বেঁকিয়ে বলেন সুছন্দা।

'তা একটু তো আছে ম্যাডাম', পরিদাদু বললেন, 'ভালো জায়গায় বেড়াতে যাবে অথচ একটুও ঝুট ঝামেলা পোয়াবে না তা কি হয়? বিশেষত মুক্তিনাথ হল গিয়ে মুক্তিক্ষেত্র, শাস্ত্রমতে একবার ওখানে পৌঁছে কুন্ডে স্নান করতে পারলেই কেল্লা ফতে'—

'মানে?' অবাক হয়ে বলেন সুছন্দা।

'মুক্তি, ইহজীবনের সব পাপ সব অপরাধ থেকে রেহাই পেয়ে গেলে তুমি'—

'সত্যি পরিকাকু?' বলে কপালে হাত ঠেকিয়ে মুক্তিনাথ নারায়ণের উদ্দেশ্যে প্রণাম জানান সুছন্দা। পরিদাদু বলতে থাকেন, 'সত্যি কি মিথ্যে তা তো বলতে পারব না খুকু, তবে যুগ যুগ ধরে কিছু মানুষের অমনই বিশ্বাস'—

অরুণাংশু বললেন, 'পোখরার কথা কিন্তু আমি জানি। বিউটিফুল জায়গা। ইন ফ্যাক্ট বিয়ের আগে গিয়েওছিলাম আমি একবার। অপূর্ব একটা লেক আছে ওখানে'—

'ইয়েস, ফেওয়া লেক'—পরিদাদু বললেন।

'তাহলে পোখরাতে তো যেতেই হবে আমাদের পরিদাদু' শাওন বলে উঠল আব্দেরে গলায়।

'চলো, তাই হোক তাহলে। প্লেনট্লেন ভুলে আমরা বরং রক্সৌলের টিকিটেরই খোঁজ লাগাই জোর কদমে'—বলে পরিদাদু ওঁর এক পরিচিত ট্র্যাভেল এজেন্টকে ফোন লাগালেন নিজের সেলফোন থেকে।

অরুণাংশু বলেছিলেন, 'মিথিলা এক্সপ্রেস যেহেতু দুপুরের দিকে ছাড়ে বিহারের বিচ্ছিরি গরমটা যাবার সময় খুব একটা ভোগাতে পারবে না আমাদের। সন্ধে নেমে গেলে গরমের তীব্রতাও কমে যায়। কাজেই যাওয়ার সময় এ সি কোচের টিকিট না কাটলেও চলে।' পরিদাদু অবশ্য সে কথা শোনেননি। যাওয়া এবং আসা দুটোই এ সি টিকিট করিয়েছিলেন তিনি। ভাগ্যিস করিয়েছিলেন। মে মাসের গা জ্বালিয়ে দেওয়া গরম হাওড়া স্টেশন পৌঁছতেই কাহিল করে দিয়েছিল শাওনদের। ট্রেনের কামরায় উঠে সত্যিই যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচা গেল। সুছন্দা আড়চোখে অরুণাংশুর দিকে একবার তাকিয়ে নিয়ে বললেন, 'পরিকাকু ভাগ্যিস ওই কিপ্টে লোকটার কথা শুনে সত্যি সত্যি স্লিপার ক্লাশের টিকিট করো নি, অমন হলে ট্রেন থেকে বোধহয় নেমে পড়তে হত আমায়। এতটা পথ এই গরমে যেতেই পারতাম না ওভাবে'—

'ভাবতেই পারিনি খুকু এমনি গরম পড়ে যাবে'—একটুও প্রতিবাদ না করে বলে উঠলেন অরুণাংশু।

'তাছাড়া স্লিপার ক্লাশে আর এক বিপদও আছে'—উলটোদিকের সিটে বসা ভদ্রলোক বলে উঠলেন অরুণাংশুর দিকে চেয়ে গোঁফ আর দাড়ির জঙ্গলে ঢাকা মুখে মুচকি হেসে, 'আপনার রিজার্ভ করা বার্থে দেখবেন অন্য লোকে মৌজ করে বসে আছে, চেষ্টা করেও তুলতে পারবেন না তাকে'—

'মগের মুলুক নাকি?' সুছন্দা বলে উঠলেন রাগ রাগ গলায়।

'এসব বলে লাভ নেই ম্যাডাম। এটাই কনভেনশন। এমনই তো চলছে চারদিকে। আর আমরা অধিকাংশ মানুষই ঝামেলা এড়াতে মুখ বুজিয়ে মেনে নিচ্ছি সবকিছু'—

'ইশ কী যন্তন্নার কথা বলুন দিকি'—সুছন্দা বললেন, 'পয়সা খরচা করে রিজার্ভেশন করিয়েও শান্তি নেই, কী যে চলছে না চারদিকে, ভাবতেও বিচ্ছিরি লাগে'—

'কী করবেন বলুন, ওভাবেই সব চলছে এখন। সমস্ত জায়গায় শুধু লোভ পেশিশক্তি প্রদর্শন আর কোরাপশন, এমনকি শিক্ষাক্ষেত্রে পর্যন্ত'—বলেই ভদ্রলোক থেমে গেলেন। তারপর পরিদাদুর দিকে চেয়ে বললেন, 'মাফ করবেন, আমি বোধহয় বোর করছি আপনাদের'—

'না না ঠিক আছে, ঠিকই তো বলছেন আপনি' পরিদাদু বললেন।

ভদ্রলোক হাসলেন, 'নমস্কার, আমার নাম উপল দত্ত, বারুইপুরের কাছাকাছি থাকি। ওখানকার একটা স্কুলে পড়াই, বুঝতেই পারছেন, মাস্টারি করি তো তাই বেশি কথা বলাটা অভ্যাস হয়ে গেছে। সুযোগ পেলেই নিজের বিদ্যে জাহির করে ফেলি আর কী'—

পরিদাদু হাতদুটো নমস্কারের ভঙ্গিতে তুলে আনলেন বুকের কাছে, 'নমস্কার। আমি পরিমল চট্টোপাধ্যায়, আর এই আমার ভাইঝি সুছন্দা আর ওর হাজব্যান্ড অরুণাংশু'—

'নমস্কার' অরুণাংশু বললেন হালকা হেসে।

'আর এটি নিশ্চয়ই আপনার নাতি? শাওনের দিকে চেয়ে বললেন উপল দত্ত।

'হ্যাঁ'। পরিদাদু বললেন।

'কী নাম তোমার?' শাওনকেই সরাসরি জিজ্ঞেস করলেন ভদ্রলোক।

'শাওন' লাজুক লাজুক মুখ করে উত্তর দিল শাওন।

'কোন ক্লাসে পড়ো তুমি?'

'ক্লাস এইট'—

'গুড'—বলে আবার পরিদাদুর দিকে চাইলেন তিনি, 'তা সদলবলে কোথায় চললেন, পোখরা কাঠমান্ডু?'

'উঁহু'—পরিদাদু মাথা নাড়লেন, 'আর একটু এগোবো'—

'কোনদিকে?'

'মুক্তিনাথ'—

'আমরাও তো যাচ্ছি মুক্তিনাথ। ভালোই হল। সঙ্গী পেয়ে গেলাম তীর্থযাত্রার দুর্গম পথে। কী প্ল্যান, জমসম থেকে হাঁটবেন তো?'

'সম্ভবত না'—

'সে কী মশাই, কষ্ট করে অ্যাদ্দুর এলেন যখন হাঁটুন একটু। পথের অসাধারণ বিউটিটা বুঝতেই পারবেন না তা নইলে'—

'কথাটা ঠিকই, আমি একা থাকলে তাই ই করতাম। কিন্তু ওদের নিয়ে পারা মুশকিল হবে। তাছাড়া টাইমটাও একটা ফ্যাকটর। হাতে খুব বেশি ছুটিও নেই আমাদের'—

'মিস করলেন কিন্তু। পারলে তা সত্ত্বেও মারফা গ্রামে অন্তত এক আধটা দিন কাটাতে চেষ্টা করবেন'—

'দেখা যাক। আপনার কথা নিশ্চয়ই মাথায় রাখব আমরা'—

'থ্যাঙ্ক য়ু,' উপল দত্ত হাসলেন।

'আপনি কি একা চলেছেন?' সুছন্দা জিজ্ঞেস করলেন।

'আমরা দুজন', বলে সাইড লোয়ারে বসা ভদ্রলোকের দিকে হাত বাড়ালেন তিনি, 'আলাপ করিয়ে দি, এ হল প্রীতম রায় আমার কোলিগ, ফিজিক্স পড়ায়'—

'নমস্কার'—হাতদুটো বুকের কাছে তুললেন ভদ্রলোক। সুছন্দা প্রতিনমস্কার জানালেন। অরুণাংশু জিজ্ঞেস করলেন, 'আপনারা খুব পাহাড়ে ঘোরেন বুঝি?'

'খুউব, প্রীতম রায় বললেন, 'আমরা প্রতি বছর সামার ভ্যাকেশন শুরু হলেই রুকস্যাক গুছিয়ে পাহাড়ে হাঁটতে বেরিয়ে পড়ি, এ একটা অদ্ভুত টান জানেন তো, পাহাড়ে যাঁরা ঘোরেন তাঁরা জানেন, পাহাড় না বুকের মধ্যে এক মায়াবী ভাষায় ডাক পাঠাতে থাকে সর্বক্ষণ। এই ডাক এড়ানো খুব কঠিন। এই ডাক যে শুনেছে বিপদ আপদ দৈহিক কষ্ট সব তুচ্ছ তার কাছে'—

'জানি', পরিদাদু মাথা নাড়লেন, 'আপনার প্রতিটি কথা অক্ষরে অক্ষরে সত্যি। আমি ভুক্তভোগী বলেই তা জানি। সকলে বুঝবে না'—

'ঠিক'—প্রীতম রায় মিষ্টি করে হাসলেন।

'আপনারও পাহাড়ে ঘুরে বেড়ানোর পাগলামি আছে নাকি?' উপলবাবু জিজ্ঞেস করলেন পরিদাদুকে।

'ছিল' পরিদাদু হাসলেন, 'তাছাড়া ডিফেন্সে চাকরির সুবাদেও ঘুরতে হয়েছে নানা দুর্গম জায়গায়। অবশ্য এমনিতেও হিমালয় বিশেষ করে বড় প্রিয় আমার। কত বৈচিত্র আর রহস্যই যে বুকের মধ্যে জমা করে রেখেছে এই অতিকায় পর্বতমালা, ভাবতেই অবাক হয়ে যাই আমি'—

'এগজ্যাক্টলি'—বলে চুপ করে গেলেন প্রীতম রায়। শাওন চুপ করে বসে সকলের কথা শুনছিল। মাঝে মাঝে বন্ধ কাচের ওপাশে দ্রুত পিছন দিকে ছুটতে থাকা গাছপালা ঘরবাড়ির দিকে নজর রাখছিল জানলার কাচে বাঁদিকের গাল ঠেকিয়ে। এ সি কামরায় আরাম আছে, ধপধপে সাদা চাদর তোয়ালে বালিশ কম্বলের আরাম আর আভিজাত্য আছে, তবু শাওনের স্লিপার ক্লাশে চড়েই দূর পাল্লার ট্রেনে পাড়ি জমাতে বেশি ভালো লাগে। প্ল্যাটফর্মে গাড়ি দাঁড়ালেই হকারের চিৎকার আর কামরার মধ্যে দিয়ে তাদের ব্যস্ত ছুটোছুটিটাকে এ সি কামরায় খুব মিস করে শাওন। অরুণাংশুও শাওনের দিকে চেয়ে বললেন, 'বন্ধ জানলার ওপারটা যেন কেমন অন্যরকম লাগছে বল শানু, যেন অচেনা অচেনা, কৃত্রিম। প্ল্যাটফর্মে গাড়ি দাঁড়ালে জানলার গরাদের ফাঁক দিয়ে হাত বাড়িয়ে এটা ওটা কিনে খাব, জানলার ওপর মুখ ঠেকিয়ে চা চা বলে চিৎকার করে চাওয়ালাকে ডেকে ভাঁড়ে করে চা খাব, পোঁওও করে বাঁশি বাজিয়ে ট্রেন ছেড়ে দিয়ে দুলকি চালে গুটি গুটি পায়ে এগোবে আর জানলার পাশে পাশে ট্রেনের পাশে হালকা পায়ে দৌড়তে দৌড়তে চাওয়ালা ফেরত পয়সা দেবার জন্যে জানলা দিয়ে হাত গলিয়ে দেবে কামরার ভিতরে এই না হলে মজা। এ যেন কেমন বন্দি হয়ে বসে আছি। এইজন্যেই আমি এ সি কোচের টিকিট করতে চাইনা। কিন্তু কী করব বল শানু, এসব কথা তো আর তোর মা আর পরিদাদু বুঝবে না। ওরা ভাববে আমি কিপ্টেমি করে নন এ সি টিকিট করছি'—

এমনভাবে কথাগুলো বললেন অরুণাংশু যে হো হো করে হেসে উঠল সবাই। এমনকি শাওনও। উপল দত্ত বললেন, 'সত্যিই এক কাপ চা পাওয়া গেলে মন্দ হত না'—

পরিদাদুও তাঁর কথায় সায় দিলেন। সুছন্দা বললেন, 'ফ্লাস্কে করে চা খানিকটা করে আনলে মন্দ হত না। রাস্তার চা যাই বলো মুখে রোচে না কিন্তু'—

পরিদাদু হাসলেন। সুছন্দার দিকে চেয়ে বললেন, 'পথে বেরিয়ে ওসব কথা ভাবতে নেই খুকু। কতটাই বা চা ফ্লাস্কে করে আনতিস তুই, কাজেই যেখানে যেমন মনকে সেভাবেই তৈরি রাখতে হয়'—

'ম্যাডামের কথাটাও একেবারে উড়িয়ে দেবার নয় দাদা', উপলবাবু বললেন, আমি নিজে চায়ের ভক্ত বলে ব্যাপারটা বুঝি। আমি তো বাইরে বেরোলেই সঙ্গে টি ব্যাগ রেখে দিই। একটু গরম জল জোগাড় করতে পারলেই আর চিন্তা নেই, ব্যাস'—

'কিছু যদি মনে না করেন, আসলে আজকাল বলাটাও অন্যায়, ট্রেনে কারও কাছ থেকে তো কিছু আর খাওয়া যায় না, তবু যদি বিশ্বাস রাখতে পারেন আমার ওপর, আমার কাছে চা আছে চাইলে খেতে পারেন' বলতে বলতে শাওনের উলটোদিকের আপার বার্থ থেকে এক ভদ্রলোক নীচে নেমে এলেন। সকলের দিকে চেয়ে নমস্কার জানিয়ে বললেন, 'আমি বিকাশ বসু, আপনাদের কথা শুনছিলাম ওপর থেকে। ভয়ে কথা বলিনি এতক্ষণ। আপনারা মাস্টারমশাই লোক, আর আমি পড়াশুনোয় চিরকাল গবেট—কাজেই'—

'আহা আমরা তো আর মাস্টার নই', পরিদাদু পাশে একটু সরে গিয়ে ওঁকে বসার জায়গা করে দিয়ে বললেন, 'তবে এটা ঠিক, আজকাল কাউকে খাবার দাবার অফার করাটা উঠেই গেছে। কিছু মনে করবেন না আপনার অফারটাও নিতে পারলাম না। অন্য কারণে না, আসলে আমরা এতজন যে আপনার সঞ্চিত চায়ে টান পড়ে যাবে। আপনার অফারের জন্যে ধন্যবাদ, আপনি খান, আমরা একটু অপেক্ষা করে দেখি। পরে কোনো স্টেশনে নিশ্চিত পেয়ে যাব'—

উপলবাবু বললেন, 'আপনিও কি নেপাল?'

'আজ্ঞে হ্যাঁ, তবে পোখরা পর্যন্ত'—

'বেড়াতে?'

'না, কাজে। আমার ব্যবসা আছে, ইলেক্ট্রনিক্স গুডসের'—

'আই সি। তাহলে প্রায়ই আসতে হয় এদিকে আপনাকে?'

'তা আসতে হয়'—

প্রীতম রায় কথা না বলে জানলার বাইরে তাকিয়ে বসেছিলেন। ভদ্রলোক একটু গম্ভীর। কথা কম বলেন। ফর্সা এবং ভারী সৌম্য দর্শন। শাওন মাঝে মাঝেই আড় চোখে তাঁর দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখছিল। কেন কে জানে, মানুষটাকে খুব শ্রদ্ধা করতে ইচ্ছে করছিল তার। এতক্ষণে জানলার দিক থেকে বিকাশবাবুর দিকে মুখ ফেরালেন তিনি। জিজ্ঞেস করলেন, 'মুক্তিনাথের দিকে এখন কেমন টেম্পারেচার হবে বলে মনে হয়?'

বিকাশবাবু হাসলেন, 'বিপদে ফেললেন আমায়। নেপালে প্রায়ই আসি ঠিকই, কিন্তু ওদিকটায় তো যাইনি কখনও স্যার'—

'ও আচ্ছা'—বলে তিনি আবার চুপ করে গেলেন। অরুণাংশু জিজ্ঞেস করলেন, 'বীরগঞ্জ থেকে বীরগঞ্জ পুরোটা যদি আমরা গাড়ি নিয়ে নিই তাহলে পাওয়া যাবে তো?'

'বীরগঞ্জ থেকে গাড়ি নিয়ে একেবারে মুক্তিনাথ পর্যন্ত গিয়ে ওই গাড়িতেই আবার বীরগঞ্জ?'

'হ্যাঁ। পাওয়া যাবে না গাড়ি?'

বিকাশ হাসলেন, 'বীরগঞ্জ থেকে মুক্তিনাথ সরাসরি গাড়ি যায় কিনা জানি না, তবে গেলেও আপনারা তা নেবেন না। ফালতু এক্সপেনসিভ হয়ে যাবে ব্যাপারটা। আপনারা পোখরা পর্যন্ত গাড়ি করুন। পোখরা পৌঁছে গাড়ি ছেড়ে দেবেন। ওখান থেকে সহজেই সব ব্যবস্থা হয়ে যাবে। পোখরা থেকে ওদিকের বাসও পেয়ে যাবেন আপনারা। আমি সপ্তাখানেক থাকব এখন এদিকে। অসুবিধেয় পড়লে ফোন করতে পারেন আমায়। ফোন নাম্বারটা লিখে নিন। এই নাম্বারটাই চালু থাকবে নেপালে ঢুকে পড়ার পর। এদিকে অনেকের সঙ্গেই চেনা জানা আছে আমার। আমি বলে দিলে অসুবিধে হবে না আর, ওরা আপনাদের গাইড করে দেবে ঠিকঠাক।'

'থ্যাঙ্ক য়ু। খুব ভালো হল আপনার সঙ্গে আলাপ হয়ে', পরিদাদু বললেন, 'সঙ্গে বিজনেস কার্ড রাখেন না আপনি?'

'না' লাজুক হেসে বললেন বিকাশ বসু, 'অ্যাকচুয়ালি কার্ডে যে কনট্যাক্ট নাম্বার দেওয়া আছে আমার, তা তো এখানে চালু থাকে না। কাজেই'—

'আচ্ছা ঠিক আছে,' পরিদাদু বললেন, 'নাম্বারটা বলুন'—

বিকাশ বসুর সেল ফোনের নাম্বারটা নিজের ফোনে লোড করে নিলেন পরিদাদু। তারপর ওঁর দিকে চেয়ে হালকা হেসে বললেন, 'খুব ভালো লাগল আপনার সঙ্গে দেখা হয়ে গিয়ে। বাড়ি থেকে এতদূরে এসে আপনার মতন এমন পরোপকারি সজ্জন মানুষের সাহায্যের আশ্বাস পাওয়াটা সত্যিই সৌভাগ্যের'—

বিকাশ বসু লাজুক হাসলেন। এতক্ষণ পা দুটো ভাঁজ করে বাবু হয়ে বসে ছিলেন তিনি আরাম করে। এবার বার্থ থেকে নেমে পায়ে চটি গলাতে গলাতে বললেন, 'কী যে বলেন, কিছুই তো করতে পারলাম না এখনও আপনাদের জন্যে। ভরসা করে চা অফার করেছিলাম, সেটাও রিফিউজ করলেন। ঠিক আছে মুজফফরপুরের ওপর দিয়ে যখন গাড়ি যাবে, আপনাদের লিচু কিনে খাওয়াব। যা স্বাদ খেয়ে দেখবেন। তখন না করলে কিন্তু শুনব না। এখন থেকেই বলে দিচ্ছি'—বলে উপল দত্তের দিকে চাইলেন বিকাশবাবু। উপলবাবু কথাটা তেমন গুরুত্ব দিলেন না। বললেন, 'আমাদের বারুইপুরের লিচুও কিন্তু কম যায় না একটুও। দেশের জিনিসে অবহেলা করে মুজফফরপুরের লিচুকে খামোখা বেশি নম্বর দিতে আমি রাজি নই। আপনার লিচু আপনিই খাবেনখন'—

মুচকি হেসে বিকাশবাবু টয়লেটের দিকে এগিয়ে যেতেই পরিদাদুর দিকে মুখটা ঝুঁকিয়ে আনলেন উপল দত্ত। তারপর চাপা গলায় বললেন, 'পথের আলাপে হুট হাট কাউকে বিশ্বাস করে নেওয়াটা একেবারেই বুদ্ধিমানের কাজ নয়। এ লোকটাকে কেন জানি কিছুতেই সুবিধের লোক মনে হচ্ছে না আমার'—

'কেন বলুন দেখি?' পরিদাদু জিজ্ঞেস করলেন।

'বড্ড বেশি কথা বলে লোকটা, তাছাড়া কেমন যেন গায়ে পড়া। তার চেয়েও বড় কথা কতটুকু চিনি লোকটাকে যে ওর সব কথা বিশ্বাস করব? কলকাতা থেকে নেপালে ব্যবসা করতে আসছে। ভাবুন একবার। জানেন তো, এসব জায়গা স্মাগলারদের স্বর্গরাজ্য একেবারে'—

'সে আর কোথায় নেই বলুন?'

'তবু অচেনা লোককে হুট করে বিশ্বাস করাটা ঠিক নয়। আমার এক্সপিরিয়েন্স থেকেই কথাটা বলছি মশাই'—

'সেতো দেখুন, সত্যি কথা বলতে গেলে আপনাদেরও একটু আগে পর্যন্ত চিনতাম না আমরা। অথচ বিশ্বাস করে নিলাম তো আপনাদের। পথে বেরিয়ে সবাইকে যদি সন্দেহভাজন মনে করি তাহলে বেড়ানোর আনন্দই যে মাটি'—পরিদাদু হাসতে হাসতে বললেন।

'একটা ব্যাপার ভেবে দেখেছেন?'

'কী বলুন দেখি?'

'জেনুইন ব্যবসায়ী হলে লোকটি ওর ভিজিটিং কার্ডটা হাইড করল কেন?'

'আহা এভাবে দেখচেন কেন, লোকটা তো সত্যি কথাও বলতে পারে'—

'যাই বলুন আপনি মশাই বড্ড বেশি অপটিমিস্ট'—বলে আর কী বলতে গিয়েও থেমে গেলেন ভদ্রলোক। বিকাশবাবু করিডোরের দরজা খুলে ভিতরে ঢুকে পড়লেন এইসময়েই। পরিদাদু হাই তুললেন লম্বা করে। তারপর সুছন্দার দিকে ফিরে বললেন, 'খুকু, খাবার দাবার বের কর এবার, ক্ষিদে পেয়ে গেছে।' তাই দেখে প্রীতমবাবুও তাড়া দিলেন, 'উপল চল আমরাও ডিনার সেরে ফেলি'—

খাওয়াদাওয়া সেরে টুকটাক কথা বলছিল সবাই। হঠাৎ আচমকা একটা বিশ্রি ঘটনা ঘটে গেল। উপল দত্ত শাওনদের উলটোদিকের বার্থে শাওনেরই মুখোমুখি বসে গুনগুন করে গান গাইছিলেন। রবীন্দ্রসংগীত। আপনমনে। হঠাৎই গান থেমে গেল তাঁর। তারপর আচমকাই তাঁর পুরো শরীরটা থরথর করে কাঁপতে কাঁপতে বেঁকে চুরে নুয়ে পড়তে লাগল সিটের ওপর। চোখের দৃষ্টিতে শূন্যতা, মুখ বেঁকে গেছে। দুহাতের আঙুল দিয়ে শূন্যে কী যেন আঁকড়ে ধরতে চাইছেন তিনি প্রাণপণে। শাওনই প্রথম খেয়াল করল ব্যাপারটা। মারাত্মক ভয় পেয়ে গিয়ে চিৎকার করে উঠল সে, 'পরিদাদু—উ—উ—উ'...

পরিদাদু লাফিয়ে উঠে ধরলেন তাঁকে। প্রীতমবাবুর দিকে চেয়ে বললেন, 'একটা সরবিট্রেট, তাড়াতাড়ি'—

প্রীতমবাবু দ্রুত ব্যাগ খুলে ওষুধ বের করলেন। ওষুধটা খাওয়ানো গেল না। দাঁতের দুটো পাটি শক্ত হয়ে একে অপরের ওপর চেপে বসেছে তখন। বিকাশবাবু রাতের খাওয়া সেরে লম্বা হয়ে শুয়ে পড়েছিলেন চোখ বুজিয়ে। হই চই শুনে চোখ খুলতেই ব্যাপারটা দেখতে পেলেন তিনি। মুহূর্তের মধ্যে লাফিয়ে আপার বার্থ থেকে নেমে এলেন বিকাশ বসু। একটা চামচ দিয়ে ওঁর দাঁতটা ফাঁক করার চেষ্টা করতে করতে বললেন তিনি, 'আমার মনে হচ্ছে এটা কার্ডিয়াক প্রব্লেম নয়, চোখে মুখে ঠান্ডা জল দিন একটু, ঠিক হয়ে যাবে'— মিনিট পাঁচ সাত পরে ধাতস্থ হলেন উপলবাবু। কামরার সকলেই একে একে কুশল সংবাদ নিলেন তাঁর। উপলবাবু আশ্বস্ত করলেন যে ঠিকই আছেন তিনি। সামান্য দুর্বলতা ছাড়া আপাতত অন্য কোনো শারীরিক সমস্যা নেই আর। পরিদাদু জিজ্ঞেস করলেন, 'আগে কখনও এমন হয়েছে?'

'উঁহু'—ক্লান্ত ভঙ্গিতে মাথা নাড়লেন উপলবাবু। রাতের অন্ধকার চিরে ঝমঝম করে এগিয়ে চলল মিথিলা এক্সপ্রেস।

রক্সৌল পৌঁছতে প্রায় সকাল নটা বেজে গেল পরের দিন। ট্রেন থেকে নেমে প্ল্যাটফর্ম থেকে বাইরে বেরিয়ে গাড়ি ঠিক করে বীরপঞ্জ পৌঁছতে পৌঁছতে দশটা। রক্সৌল থেকে বীরগঞ্জ টাঙ্গাতেও আসা যেত। পরিদাদু বললেন অযথা দেরি করে লাভ নেই। বীরগঞ্জে কয়েক ঘণ্টার জন্যে একটা ঘর ভাড়া করা হল ফ্রেশ হয়ে নেওয়ার জন্যে। পরিদাদু বললেন, 'ঘণ্টা দেড়েকের বেশি সময় দেওয়া যাবে না। তার মধ্যে তৈরি হয়ে নাও সব্বাই। আমি গাড়ি করে নিচ্ছি। তাড়াতাড়ি না বেরোলে পোখরা পৌঁছে হোটেলে ঢুকতে পারবে না। রাত দশটা বাজলেই দোকান পাট হোটেল রেস্তোরাঁ সব বন্ধ হয়ে যায় ওখানে। এখানে হালকা টিফিন করে নাও। পথে সুবিধে মতন কোথাও লাঞ্চ করে নেওয়া যাবে। অরুণাংশু একমুখ বিরক্তি নিয়ে পরিদাদুর কাছে এসে বললেন, 'পরি তোমার মোবাইলে টাওয়ার আছে?'

পরিদাদু নিজের পকেট থেকে ফোনটা বের করে একবার দেখে নিয়ে বললেন, 'আছে'—

'কোনো মানে হয়, আমার ফোনটায় কোনো টাওয়ার নেই নেপালে ঢোকার পর থেকেই'—

সুছন্দা বললেন, 'আমারও নেই'—

এই সময়েই উপলবাবু আর প্রীতমবাবুর সঙ্গে দেখা হল ওদের। একটা গাড়ি ঠিক করে তার পাশে দাঁড়িয়ে চা খাচ্ছিলেন দুজনে। পরিদাদু এগিয়ে গেলেন সেদিকে। অরুণাংশুও। পরিদাদু জিজ্ঞেস করলেন উপল দত্তের দিকে চেয়ে, 'কেমন আছেন, শরীর ঠিকঠাক?'

'ঠিকঠাক'। উপল দত্ত হাসলেন। আজ মাথায় ভারি সুন্দর একটা টুপি পরে আছেন তিনি। পরিদাদু টুপিটার প্রশংসা করলেন খুব। প্রীতম রায় খুব একচোট হাসলেন। বললেন, 'আপনারা জানেন না, টুপির প্রতি মারাত্মক টান উপলের। ভালো টুপি দেখলে ও কিনবেই। ওর সংগ্রহে কত রকমের যে টুপি আছে ভাবতে পারবেন না। নানা ধরনের টুপি কেনা আর সেগুলো সংরক্ষণ করা ওর একটা নেশা। সেই হোটেলের গল্পটা এঁদের বল উপল'—বলে উপল দত্তের দিকে চাইলেন তিনি। উপলবাবু মিষ্টি করে হাসলেন খানিক। তারপর বলতে শুরু করলেন, 'আর বলেন কেন, সেবার পিন্ডারি গিয়েছিলাম ট্রেক করতে। ফেরার সময় যে হোটেলটায় উঠেছি তার একটা বেয়ারা কিছুতেই দেখি পিছন ছাড়ে না আমার। আমি ভাবলাম বকশিশ চায় নিশ্চয়ই। পকেট থেকে একটা দশ টাকার নোট বের করে দিলাম। তাও দেখি নড়ে না, আমি আরও দশ দিলাম, তাতেও চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল সে। আমি আশ্চর্য হয়ে জিজ্ঞেস করলাম, 'কী ব্যাপার, কিছু বলবে?' তখন সে ব্যাটা বলে কিনা তার এই টুপিটা চাই। এটা অ্যাতো পছন্দ হয়েছে তার যে টাকা নয়, টুপিটাই দিতে হবে নাকি তাকে। এই নিয়ে কী ঝুলোঝুলি তার। বুঝুন কাণ্ড'—উপলবাবু হা হা করে হাসতে থাকেন।

'দিলেন?' সুছন্দা জিজ্ঞেস করলেন।

'পাগল নাকি', উপল দত্ত বললেন, 'টুপি বাঁচাতে তাকে বুঝিয়ে শুনিয়ে দুশোটি টাকা হাতে দিয়ে ফেরত পাঠালাম শেষমেশ'।

'সে কী মশাই, তার চেয়ে তো টুপির দাম কম?' পরিদাদু অবাক হয়ে বললেন।

'হোক না, টুপিটা তো বাঁচল বলুন,' বলে হাসতে থাকেন উপলবাবু।

প্রীতম রায় হাত নাড়লেন, 'চলি, আর দেরি করব না। আপনারা আসুন ধীরেসুস্থে। তবে আপনারাও চেষ্টা করবেন বেশি দেরি না করতে। আশা করি পোখরায় আবার দেখা হবে আপনাদের সঙ্গে।'

'সেই গাড়িই যখন করলেন তখন আমাদের সঙ্গেই তো চলে আসতে পারতেন আপনারা দুজনে, কোনোই অসুবিধা ছিল না, একসঙ্গে গল্প করতে করতে চলে যাওয়া যেত'—পরিদাদু বললেন।

'থ্যাঙ্ক য়ু', প্রীতম রায় হাত নাড়লেন, 'কথাটা মনে রইল, পরে কখনও সুযোগ এলে অবশ্যই একসঙ্গে ভীড়ে যাব। আপাতত চলি। আপনাদের তো এখনও কিছুটা সময় লাগবে মনে হচ্ছে। কাজেই আমরা আপাতত এগোই'—

'আসুন তবে'। পরিদাদু হাত তুলে নমস্কার জানালেন। ওঁরাও নমস্কার জানালেন বুকের কাছে হাতদুটো জড়ো করে। পরিদাদু বললেন, 'লেকের কাছাকাছি কোথাও হোটেল নেবেন নিশ্চয়ই?'

'ইচ্ছে তো আছে। দেখি ফাঁকা পাই কি না, তাছাড়া দরদামেও তো পোষাতে হবে বলুন'—বলে হাসলেন প্রীতম রায়।

'সে তো বটেই' বলে পরিদাদুও হাসলেন।

'আপনারা কি হোটেল বুক করে এসেছেন কলকাতা থেকে?'

'না না, গিয়ে ঠিক করব ওখানে।'

'কাল সকালে লেকের দিকে ঘুরতে আসবেন নিশ্চয়ই'—

'দেখা যাক, ইচ্ছে তো আছে'—

'কাল দেখা হবে তাহলে', বলেই শাওনের দিকে ফিরলেন উপল দত্ত, 'শাওনবাবু চলি তাহলে, বেস্ট অফ লাক'—

শাওন হাসিমুখে হাত নাড়ল ওঁদের দিকে চেয়ে। গাড়িতে উঠে পড়লেন দুজনে। গাড়ি ছেড়ে দিল মুখ ঘুরিয়ে নিয়ে। গাড়িটা চোখের বাইরে চলে যেতেই সুছন্দা বললেন, 'মানুষগুলো কিন্তু ভারি ভালো। কথা বললেই ভালো লেগে যায়'। অরুণাংশু বললেন, 'এমন একজন মানুষও আছে নাকি খুকু তোমার যাকে ভালো লাগে না'—

অরুণাংশুর কথা শুনে হো হো করে হেসে উঠলেন পরিদাদু। সুছন্দা মুখ গোমড়া করে বলে উঠলেন অভিমানি গলায়, 'শেষমেশ তুমিও ওর দলে যোগ দিলে পরিকাকু?' পরিদাদু হাসতেই হাসতেই বললেন, 'রাগ করছিস কেন খুকু, আমার তো মনে হয় এটা কমপ্লিমেন্ট। সব মানুষকে ভালোবাসতে পারাটা কি চাড্ডিখানি কথা নাকি। সত্যি এমন হলে দুনিয়াটাই যে পালটে যেত রে'—পরিদাদু বাঁ হাতটা কনুই এর কাছ থেকে ভাঁজ করে ঘড়ি দেখলেন আর তারপরেই গম্ভীর মুখ করে তাড়া দিলেন সব্বাইকে, 'আর একটা কথাও নয়। অনেক দেরি করে ফেলছি আমরা। কুইক, ঝড়ের বেগে রেডি হয়ে নাও যত তাড়াতাড়ি পারো।'

বীরগঞ্জ থেকে রওনা হতে বেশ বেলা হল। পথে থামতে হল একবার লাঞ্চ করার জন্যেও। পোখরা পৌঁছতে বেশ রাত্রি হয়ে গেল শাওনদের। পথে গাড়ির মধ্যেই জমিয়ে একচোট ঘুমিয়ে নিয়েছে অরুণাংশু। মাঝে সুছন্দাও কিছুক্ষণ। শাওন ঘুমোয়নি। ঘুমোননি পরিদাদুও। পথে চলতে চলতে শাওন পরিদাদুকে জিজ্ঞেস করল, 'আচ্ছা পরিদাদু, নেপাল তো একটা আলাদা স্বাধীন রাষ্ট্র'—

'হুঁ', পরিদাদু বললেন, 'কিছুদিন আগে পর্যন্ত নেপালই ছিল পৃথিবীর একমাত্র হিন্দু রাষ্ট্র'—

'এখন নেই?' অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল শাওন।

'না, এখন এটা ধর্মনিরপেক্ষ দেশ। এমনকি নেপালের রাজতন্ত্রের বদলে ভারতবর্ষেরই মতন এখানে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা হয়েছে প্রায় এক দশক হতে চলল।'

'এখানে আসতে পাসপোর্ট লাগে না?'

'না, ভারতীয়দের নেপাল ও ভুটান যাবার জন্যে পাসপোর্টের দরকার লাগে না', বলে একটু থামলেন পরিদাদু। তারপর দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললেন, 'পৃথিবীর সব দেশের জন্যেই এমন হওয়া উচিত ছিল বল শানু? একটাই বেশ ভূখণ্ড থাকত আর আমাদের সকলের একটাই পরিচয় থাকত যে আমরা মানুষ। তাহলে কী ভালোই না হত বল। আমাদের ইচ্ছে মতন এক দেশ থেকে অন্য দেশে ঘুরে ঘুরে বেড়াতাম। কেউ আপত্তি করত না, প্রশ্ন করত না। কৈফিয়ত তলব করত না। ওঃ দিব্বি হত তাহলে।'

জানলা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে ছিল শাওন। পাহাড় ঘুরে ঘুরে কালো কুচকুচে পথটা এঁকেবেঁকে এগিয়ে গেছে। দৃশ্যে নতুনত্ব কিছু নেই। পথে বেশ কয়েকটা নদী পড়ল। একটা বেশ বড়সড় চওড়া নদী দেখে জিজ্ঞেস করল শাওন, 'এটা কী নদী পরিদাদু?'

'সম্ভবত নারায়ণী', বলেই ড্রাইভারের দিকে চাইলেন তিনি নিশ্চিত হয়ে নেবার জন্যে। ড্রাইভার মানুষটি খুবই গম্ভীর। কথা বলেনই না প্রায়। এবারেও রাস্তার দিক থেকে চোখ না ফিরিয়েই ওপর নীচে মাথাটাকে দুবার দুলিয়ে নিয়ে সংক্ষিপ্ত উত্তর দিলেন তিনি, 'জী, নারায়ণী'—

শাওন আবার জিজ্ঞেস করল, 'পোখরাতে কি ঠান্ডা হবে মনে হয়?'

'ধুস,' মাথা নাড়লেন পরিদাদু, 'পোখরার হাইট তো এমন কিছু বেশি নয়। কত আর হবে, মেরেকেটে ন শো দশ পনেরো মিটার। তার জন্যে তো আর এমন কিছু ঠান্ডা হবার কথা নয়।'

'আর মুক্তিনাথের হাইট?'

'মুক্তিনাথের হাইট মন্দ নয়।'

'কত হবে তবু?'

'তা ধর তিন হাজার আটশো মিটারের মতন।'

'দার্জিলিং এর চেয়ে বেশি?'

'অনেক বেশি', পরিদাদু হাসলেন, 'দার্জিলিং আট হাজার ফুটেরও কম উঁচু। মুক্তিনাথ বারো হাজার ফুটেরও বেশি।'

'উরেব্বাস'—অবাক হয়ে বলে শাওন, 'তার মানে ওখানে নিশ্চয়ই জোরদার ঠান্ডা হবে'—

'তা হবে।'

'দারুণ মজা না পরিদাদু, বরফ তো থাকবেই তাহলে'—

'থাকবে।'

'আচ্ছা পরিদাদু আমরাও ওই মাস্টারমশাইদের মতন জমসম থেকে হেঁটে যেতে পারি না?'

'দাঁড়া আগে জমসম পর্যন্ত পৌঁছই। তার আগে পোখরায় গিয়ে পারমিশন করাতে হবে ওদিকে যাওয়ার জন্যে।'

'পারমিশন পেতে কি অসুবিধে হয়?'

'সাধারণত হয় না, তবু না আঁচালে যে বিশ্বাস নেই শানুবাবু'—বলে চুপ করে গেলেন পরিদাদু। শাওনও কথা বলল না আর। জানলার বাইরের দিকে চেয়ে সে বসে রইল চুপ করে। পাহাড়ের গা গড়িয়ে ধীরে ধীরে সন্ধ্যা নামছে তখন। গাছপালার পাতার ফাঁক দিয়ে চুঁইয়ে নীচে নেমে আসা আলো ক্রমশ নিভে আসছিল। ফ্যাকাশে রঙের ঝুপসি অন্ধকার দ্রুত মুড়ে ফেলছে চারপাশের দৃশ্যপট। পাখিরা ডাকতে ডাকতে হুটোপুটি করছে রাস্তার পাশের গাছের ডালে। এই সবকিছুকে পিছনে রেখে শাওনদের সাদা রঙের টাটা সুমো গাড়ি গোঁ গোঁ আওয়াজ করে ক্লান্তি জানাতে জানাতে ছুটে চলল তাদের পোখরায় পৌঁছে দিয়ে আসার জন্যে।

পোখরা পৌঁছতে বেশ রাত হয়ে গেল। রাস্তায় দোকানপাট বন্ধ হয়ে গেছে তখন। হোটেলও অধিকাংশই বন্ধ। যে দু—একটা খোলা ছিল দেখে শুনে তারই মধ্যে একটায় দুটো ঘর নিয়ে নিলেন পরিদাদু। হোটেলের ম্যানেজারের বয়েস বেশি নয়। সে জোরাজুরি করছিল যে ঘর পিছু আটশো টাকা দিতে হবে। পরিদাদু অনেক বলাতেও ভাড়া একটুও কমালো না সে। পরিদাদু বললেন, 'ঠিক আছে তাই দেব। তবে আই সি তে নয়, এন সি—তে। লোকটা শেষ পর্যন্ত এই শর্তে রাজি হয়ে তিনতলার দুটো ঘর খুলে দিল ওদের। ঘরগুলো মন্দ নয়। পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন এবং আরামদায়ক। পরিদাদু বললেন, 'আমি আর শানু বরং একটা ঘরে থেকে যাচ্ছি। অরুণ আর খুকু পাশের ঘরে চলে যাক।' কথাটা শুনে দারুণ আনন্দ হল শাওনের। পরিদাদুকে সে তো এমনিতেই কাছছাড়া করতে চায় না কিছুতেই। অন্যান্যবার বেড়াতে গেলে পরিদাদু সাধারণত নিজের জন্যে সিঙ্গল রুম নিয়ে একা থেকেছেন। এবার নিজে থেকেই শাওনকে তিনি নিজের ঘরে ডেকে নেওয়ায় মনে মনে আহ্লাদে একেবারে আটখানা হয়ে গেল সে। মনের ভাবটা অবশ্য প্রকাশ করল না শাওন। নিজের ন্যাপস্যাকটা পিঠ থেকে নামিয়ে শান্তভাবে রেখে দিয়ে এল পরিদাদুর ঘরে। অরুণাংশু বললেন, 'সবই তো হল, কিন্তু খাওয়া দাওয়ার কী হবে?'

'পরিস্থিতি যা তাতে তো হরিমটর ছাড়া আর কিছু জুটবে বলে মনে হচ্ছে না'—সুছন্দা বললেন।

'হরিমটর কেমন খেতে মা?' বোকার মতন জিজ্ঞেস করল শাওন।

সুছন্দা হেসে ফেললেন। তারপর শাওনের মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বললেন, 'হরিমটর কোনো খাবারই নয় বোকা, হরিমটর খেয়ে থাকা মানে আসলে উপবাসে থাকা'—

পরিদাদু বললেন, 'সম্ভাবনাটা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না খুকু, তবু চেষ্টা করে দেখি একবার।'

অরুণাংশু বললেন, 'এই রাতে আর কী চেষ্টা করবে, তার চেয়ে চলো আমাদের ব্যাগে কী আছে দেখি।'

'দাঁড়াও, দেখি', বলে হোটেলের ম্যানেজার ছেলেটাকে ডেকে কথা বললেন পরিদাদু। প্রথমে খুবই গাঁইগুঁই করল লোকটা। তারপর আর একজনের সঙ্গে একটু কথা বলে এসে বলল, 'হতে পারে, তবে ভাত ডাল আর আলুভাজা ছাড়া কিছু পাওয়া যাবে না।'

অরুণাংশু উল্লসিত হয়ে বললেন, 'বিউটিফুল। ওতেই দিব্বি রাত্তির কেটে যাবে আমাদের। অনাহারের চেয়ে এই বন্দোবস্ত তো অমৃতকুম্ভের সন্ধান পাওয়ার সমান।'

'যা বলেছো', তাঁর কথায় সায় দিলেন সুছন্দা।

হাত মুখ ধুয়ে ফ্রেশ হয়ে নিল সব্বাই। সারাদিনের ক্লান্তি শরীরটাকে কাহিল করে ফেলছে ক্রমাগত। এমনকি পরিদাদুও বলছিলেন, 'এবার একটু শুতে পারলে বাঁচি রে খুকু, বিছানাটা মনে হচ্ছে যেন টানছে আমাকে'—

রাতের খাবার অতি সাধারণ। তার স্বাদও আহামরি নয়। তবু ওই খাবারই তৃপ্তি করে খেয়ে নিল সবাই। একটা প্রশ্ন অনেকক্ষণ থেকে মাথার মধ্যে ঘুরছিল শাওনের। বিছানায় শুতে গিয়ে প্রশ্নটা পরিদাদুকে করে ফেলল সে। একটু ইতস্তত করে জিজ্ঞেস করল শাওন, 'আচ্ছা পরিদাদু হোটেলে রুম নেবার সময় তুমি যে এন সি আর আই সি বলেছিলে ওটার মানে কী?'

পরিদাদু হাসলেন, 'নেপাল তো অন্য দেশ, তাদের নিজস্ব টাকা আছে। তবে কী ভারতীয় টাকাও এখানে চলে। আই সি মানে ইন্ডিয়ান কারেন্সি আর এন সি হল নেপালি কারেন্সি'—

'ওরেব্বাবা', এটাতো মাথাতেই আসেনি আমার। চোখ বড় বড় করে বলল শাওন, 'আচ্ছা পরিদাদু, ভারতীয় মুদ্রা আর নেপালি মুদ্রার দাম কি এক?'

'উঁহু', বালিশে মাথা দিয়ে লম্বা হয়ে বিছানায় শুয়ে চোখদুটো বুজিয়ে বললেন পরিদাদু, 'ভারতীয় টাকার দাম নেপালি টাকার চেয়ে বেশি। ভারতীয় মুদ্রায় একশো টাকা মানে নেপালি মুদ্রায় একশো ষাট টাকা'—

'অনেকটাই তো বেশি তাহলে'—

'হুঁ', বলে চুপ করে গেলেন পরিদাদু। একটু পরেই নাক ডাকার আওয়াজ পাওয়া গেল তাঁর। শাওনও আর কথা বলল না। চোখ বুজিয়ে চুপ করে শুয়ে থাকতে থাকতে সেও একসময় ঘুমিয়ে পড়ল।

সকালে ঘুম থেকে উঠে পরিদাদুকে বিছানায় দেখতে পেল না শাওন। ব্রাশ করতে করতে পাশের ঘরে এসে দেখল সুছন্দা উঠে পড়েছেন কিন্তু অরুণাংশু তখনও বিছানায়। সুছন্দা শাওনকে দেখে হাসলেন, 'কী রে, পরিদাদুর সঙ্গে কেমন ঘুমোলি?'

'ভালোই। কিন্তু পরিদাদু কোথায় গেল আমাদের সঙ্গে না নিয়ে?'

'কোথায় আর যাবে, আছে কোথাও আশেপাশে। পরিদাদুকে তো চিনিস, সকালবেলায় কি তিনি ঘরে বসে থাকার লোক?'

'আমি বাইরে গিয়ে দেখে আসব একটু?' মুখ টুখ ধুয়ে তোয়ালে দিয়ে মুছতে মুছতে শাওন বলল।

'দরকার নেই, এসে যাবে এক্ষুনি', বলতে বলতে একটা লম্বা হাই তুলে বিছানার ওপর উঠে বসলেন অরুণাংশু।

'ওব্বাবা, ঘুম ভেঙেছে তাহলে তোমার' অরুণাংশুর দিকে চেয়ে বললেন সুছন্দা।

'ভাঙবে না? যা শুরু করেছো তোমরা'—

'আমরা আবার কী করলাম'—চোখ গোল গোল করে বলেন সুছন্দা।

'ওরে বাবা যা চিৎকার চ্যাঁচামেচি জুড়েছো সাত সকালে'—

'সাত সকাল আর নেই অরুণ', সুছন্দা কিছু বলার আগেই পরিদাদু ঢুকলেন বলতে বলতে, 'কী করে যে বাইরে এসে এতক্ষণ ঘুমিয়ে থাকো কে জানে, আর আলস্য না করে গা ঝাড়া দিয়ে উঠে পড়ো তো দেখি। চল বাইরে গিয়ে দেখবে ফেওয়া লেক কী সৌন্দর্য নিয়ে অপেক্ষা করে আছে তোমাদের জন্যে'—

বাইরে বেরিয়ে সবাই মিলে একসঙ্গে টিফিন করে নিল শাওনরা। তারপর রাস্তা ধরে হাঁটতে হাঁটতে ফেওয়া লেক। এর আগে অরুণাচল বেড়াতে গিয়ে পিটিসো লেক আর সাঙ্গেটসার লেক দেখেছিল শাওন। তাদের সৌন্দর্যও অসাধারণ। তবু ফেওয়া লেক—কেও ভীষণ ভালো লেগে গেল শাওনের। মস্ত লেকটায় টল টল করছে হালকা সবুজ রঙের জল। সেই জলে মৃদু হাওয়ায় তীরের কাছে বাঁধা ডিঙি নৌকাগুলো টলমল করছিল এক জায়গায় দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে। ডানদিকে তাকিয়ে একেবারে হাঁ হয়ে গেল শাওন। এতক্ষণ মেঘ আর কুয়াশার চাদরে আকাশটা মোড়া ছিল। এখন মেঘ সরে গিয়ে নীল আকাশ ফুঁড়ে রোদ উঠতেই দুদিকের দুই পাহাড়ের মাঝখানের ইংরেজি ভি অক্ষরের মতন ফাঁকা জায়গাটা জুড়ে একটা বরফে মোড়া পাহাড় চূড়া উঁকি দিয়েছে। তার মাথার ওপরের রুপোলি বরফ রোদে ঝলমল করছে। আর সেই রোদ ঝলমলে পাহাড়ের ছায়া পড়েছে ফেওয়া লেকের জলে। এত ভালো লাগছিল শাওনের যে সুছন্দার হাত ধরে টান দিয়ে সে চিৎকার করে উঠল, 'মা দ্যাখো'—

সেদিকে তাকিয়ে সুছন্দা বললেন, 'সত্যিই অপূর্ব।

অরুণাংশু বললেন, 'বিউটিফুল। ছবিটা হারিয়ে যাবার আগে ক্যামেরায় বন্দি করে রাখা দরকার, কী বলিস শানু?'

শাওন সংশয় প্রকাশ করল, 'আসবে?'

'আলবাত', বলে চোখের সামনে ক্যামেরাটা তুলে ধরে ফোকাস ঠিক করতে লাগলেন অরুণাংশু। আর তখনই একটু দূরে লেকের পাড়ে উপল দত্ত ও প্রীতম রায়কে চোখে পড়ল শাওনের। সেদিকে হাত তুলে দেখিয়ে পরিদাদুকে বলল শাওন, 'পরিদাদু দ্যাখো'—

'তাইতো', বলেই পরিদাদু হাঁক ছাড়লেন, 'ও উপলবাবু, এই যে মিস্টার রায়'—দু—একবার ডাকতেই এদিকে চাইলেন তাঁরা। তারপরেই একগাল হেসে দুজনেই এগিয়ে এলেন শাওনদের দিকে।

পরিদাদু জিজ্ঞেস করলেন, 'কোথায় উঠেছেন?'

'লেক ভিউ'—

'তাহলে তো লেকের একেবারে কাছেই'—

হ্যাঁ, আপনারা?'

'আমরাও বেশি দূরে না, কাছেই। এখান থেকে হেঁটে বড়জোর বিশ পঁচিশ পা, ব্লু বার্ড, চলুন না, চা খেয়ে আসবেন।' সুছন্দা বললেন।

'আপত্তি নেই, কী বল হে প্রীতম'— উপল দত্ত বললেন।

'চলুন, যাওয়ার পথে দোকান টোকানগুলোও একটু দেখে নেওয়া যাবেখন। কী বউদি অসুবিধা হবে?' প্রীতম রায় বললেন।

'অসুবিধে মানে? কোনো মহিলাকে শপিং এর কথা বলে বিরক্ত হতে দেখেছেন কখন?' আড় চোখে একবার সুছন্দার দিকে তাকিয়ে নিয়ে বললেন অরুণাংশু।

'দেখেছেন কেমন টিজ করছে আমায়', অনুযোগের সুরে বললেন সুছন্দা।

'ঠিক আছে খুকু চল আমরা বরং দোকানপাট ঘুরে দেখি খানিক, অরুণ বাইরে থাকুক। ওর যখন ভালো লাগে না এসব'—

বা রে তাই বললাম নাকি, অরুণাংশু বললেন, 'সবাই মিলে আমাকে ভালোই জব্দ করছ দেখছি।'

'জব্দর কি আছে, তোমার ভালো লাগে না তাই'—মওকা পেয়ে সুছন্দা বলে উঠলেন গম্ভীর গলায়।

'আচ্ছা বেশ, আমার ভুল হয়েছে বাপু' বলে এমন ভাবে দু—হাতে কান ধরলেন অরুণাংশু যে হো হো করে হেসে উঠল সব্বাই।

আর একটু সময় লেকের পাশে কাটিয়ে হাঁটা শুরু করলেন সবাই। রাস্তাটা ক্রমশ ওপরের দিকে উঠে গেছে। রাস্তার দুপাশেই প্রচুর দোকান। নানা জিনিসপত্রের। খাবার দাবার ও বিভিন্ন প্রয়োজনীয় জিনিস তো আছেই, শীতের পোশাক এবং অন্যান্য ঘর সাজানোর জিনিসপত্রের সম্ভারও চোখে পড়বার মতন। হঠাৎই একটা দোকানের সামনে এসে থমকে দাঁড়িয়ে পড়লেন উপল দত্ত। প্রীতম রায়ের দিকে ফিরে বললেন, 'দোকানের মধ্যে বাঁ দিক ঘেঁষে দাঁড়িয়ে থাকা লোকটাকে দ্যাখ প্রীতম'—

'কী দেখব?' অবাক হয়ে বলেন তিনি।

'লোকটার টুপিটা দ্যাখ, কী কিউট'—

'ধুস, পারোও বটে তুমি, চলো সামনে এগোই'—একটু বিরক্ত হয়েই বলেন প্রীতম রায়।

'রাগ করছিস কেন ভাই, টুপিটা সত্যি অন্য রকম, ডিজাইনটা দ্যাখ'—

'তুমি দ্যাখো'। বলে সামনে হাঁটা লাগালেন তিনি।

উপল দত্ত তাঁর হাত ধরে টান দিলেন, 'চল দোকানে গিয়ে ঢুকি একবার।'

'ঢুকে?'

'একবার ট্রাই করে দেখব অমন একটা টুপি যদি পাওয়া যায়।'

'আবার পাগলামি শুরু করলে তো' বিব্রত গলায় বললেন প্রীতম, 'এঁরা কী ভাববেন বল তো'—

শাওনদের দিকে চাইলেন উপল। তারপর ছেলেমানুষের মতন আব্দেরে গলায় বললেন, 'প্লিজ'—

সুছন্দা হেসে ফেললেন। অরুণাংশুও। শাওনেরও হাসি পাচ্ছিল খুব। কষ্ট করে হাসি চাপল সে। পরিদাদু বললেন, 'ঠিক আছে, চলুনই না দেখে আসি একবার। উনি এতো করে বলছেন যখন'—

উপল দত্তর মুখে হাসি ফুটল। প্রীতম বাবুর দিকে চেয়ে বললেন, 'দেখলে এঁরা কিন্তু তোমার মতন ইনকন্সিডারেট নন'—

'এরা তো এখনও তোমায় ঠিকঠাক চেনেননি'—

'থ্যাঙ্ক য়ু মিস্টার চ্যাটার্জী,' প্রীতমের কথাটা পাত্তাই দিলেন না উপল, 'চলুন আমরা এগোই তাহলে' বলে হনহন করে হাঁটা লাগলেন তিনি দোকানের দিকে। অন্যেরাও নিঃশব্দে পিছু নিলেন তাঁর।

টুপি মাথায় দেওয়া লোকটা সম্ভবত লোকাল। মাঝারি হাইট, বেশ গাট্টাগোট্টা চেহারা, অধিকাংশ পাহাড়ি মানুষ যেমন দেখতে হন তেমনই। পরনে জিন্স, টি শার্ট। পায়ে দামি জুতো। মাথায় একটা বাহারি টুপি। টুপিটা দেখতে সত্যিই সুন্দর। হালকা বাদামি রঙের হ্যাট। কানের ওপরের অংশদুটো ফোল্ড করে ওপরে তুলে বোতাম দিয়ে আটকানো। ইচ্ছে হলে নামিয়েও নেওয়া যায়। টুপিটার মাঝামাঝি জায়গায় একটু চওড়া কালো বর্ডার। তার ওপরের অংশে ভারী সুন্দর সুতোর কাজ করা। টুপিটা এত সুন্দর যে দোকানের অন্য ক্রেতাদের ভিড়েও লোকটার দিকে চোখ না পড়ে উপায় নেই। শাওন হাঁ করে লোকটার দিকে তাকিয়ে ছিল। সুছন্দা শাওনের হাতে হালকা চিমটি কাটলেন। শাওন তাঁর দিকে চাইতেই ফিসফিস করে ধমক দিয়ে উঠলেন তিনি, 'অমন অসভ্যের মতন লোকটার দিকে হাঁ করে তাকিয়ে আছিস কেন, অন্যেরা দেখলে কী ভাববেন?'

শাওন লজ্জা পেয়ে চোখ সরিয়ে নিল। লোকটা একটা অদ্ভুত ভাষায় স্লিপিং ব্যাগ কেনার জন্যে দরদাম করছিল। ভাষাটা অনেকটাই হিন্দির মতন। পরিদাদুকে জিজ্ঞেস করতে উনি বললেন ওটা নেপালি ভাষা। ভাষাটা পুরোটা না হলেও অনেকটাই বুঝতে পারছিল শাওন। লোকটা বার বার এমন একটা স্লিপিং ব্যাগ দেখাতে বলছিল যেটা প্যাকিং এর সময় অল্প জায়গার মধ্যে ধরে যেতে পারে। উপল দত্ত দোকানে ঢুকে ওই লোকটার মাথায় যে টুপিটা রয়েছে সেদিকে হাত দেখিয়ে দোকানিকে জিজ্ঞেস করলেন ওরকম টুপি এ দোকানে পাওয়া যাবে কিনা। দোকানদার হাসলেন। হিন্দিতে শান্ত কণ্ঠে উত্তর দিলেন, 'এখানকার সব দোকানেই এ টুপি পাবেন। আপনার অমন টুপি চাই?'

'দেখান'—উৎসাহিত হয়ে বললেন উপলবাবু।

দোকানদার লোকটি দোকানের একটা ছেলেকে টুপি দেখাতে বললে সে ওই ধরনের চার পাঁচটা টুপি এনে রাখল উপল দত্তের সামনে। উনি টুপিগুলো নেড়েচেড়ে বললেন, 'উঁহু, এগুলো আলাদা। আমি এগজ্যাক্টলি ওই টুপি চাই।'

'স্যার এগুলো একই', ছেলেটা বোঝানোর চেষ্টা করল তাঁকে। কিন্তু উপলবাবু সহজে হাল ছাড়ার পাত্র নন। প্রথমে খানিকটা ইংরেজি আর বাকিটা অপটু হিন্দিতে তিনি লোকটার মাথার টুপিটার সঙ্গে তাঁর সামনে রাখা টুপিগুলোর পার্থক্য বোঝানোর চেষ্টা করতে লাগলেন তাকে। তারপর মুখে বলে বোঝাতে না পেরে হঠাৎ 'এক্সকিউজ মি' বলে লোকটার কাছে গিয়ে তাঁর মাথা থেকে খুলেই নিলেন টুপিটা হাত বাড়িয়ে। তারপর সেটা ছেলেটার দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলে উঠলেন ভারী গলায়, 'টেক ইট। মাইন্ড ইট, হামারা টোপি দিস টোপি কা মাফিক হোনা চাহিয়ে'—

যাঁর মাথা থেকে টুপিটা খুলে নিলেন উপলবাবু সেই লোকটি স্পষ্টতই বিরক্ত হলেন। অত্যন্ত ক্রুদ্ধ দৃষ্টিতে চাইলেন তিনি উপলের দিকে। প্রীতম রায় চাপা গলায় পরিদাদুকে বললেন বিরক্তির সঙ্গে, 'বাড়াবাড়ি নয় বলুন? বাইরে বেরিয়ে একটা কেলেঙ্কারি বাঁধিয়ে কোনোদিন না মারধোর খেয়ে বসে দেখুন।'

পরিদাদু তখনও হাসছিলেন। হাসতে হাসতেই বললেন, 'যাই বলুন উনি মানুষটি কিন্তু বেশ। বড় জীবন্ত, বড় প্রাণোচ্ছল। আজকাল বাঁচার মতন করে বাঁচতে মানুষ তো ভুলেই যাচ্ছে ক্রমশ। অধিকাংশ মানুষ জীবদ্দশাতেই মরে যায় মনে মনে। তার মধ্যে উপলবাবুর মতন মানুষজনকে দেখলে ভালো লাগে জানেন তো। বাঁচার ইচ্ছেটা বেড়ে যায়।'

'নিকুচি করেছে মশাই বাঁচার ইচ্ছে বাড়ানোর। লোকটা কেমন করে তাকাচ্ছে দেখেছেন, এক্ষুনি না একটা মারদাঙ্গা বেঁধে যায়'—

মারদাঙ্গা বাঁধল না অবশ্য শেষমেশ। উপলবাবু বুঝিয়ে শুনিয়ে ম্যানেজ করে ফেললেন লোকটাকে। দোকানদারও টুপিটা হাতে নিয়ে ওটার সঙ্গে মিলিয়ে হুবহু ওই টুপি বের করে ফেললেন বেশ কয়েকটা। উপলবাবু খুশি হয়ে দরদাম না করেই বললেন, 'দো চাহিয়ে।'

ছেলেটি দুটো টুপি তাঁর হাতে দিলে ওই লোকটার টুপির সঙ্গে আর এক প্রস্থ মিলিয়ে নিলেন নিজের টুপিগুলো তারপর তিনটে টুপি হাতে নিয়ে একটু নাড়াচাড়া করে 'থ্যাঙ্ক য়ু' বলে লোকটার টুপি তাঁকে ফিরিয়ে দিলেন উপল দত্ত। লোকটা টুপিটা মাথায় গলিয়ে আড়চোখে আর একবার উপলবাবুর দিকে তাকিয়ে নিয়ে সদ্য কেনা স্লিপিং ব্যাগটা বাঁ হাতে ঝুলিয়ে গটমট করে বেরিয়ে গেলেন দোকান থেকে। সুছন্দা উপলের দিকে চেয়ে মিষ্টি করে হাসলেন, 'আপনার টুপি সত্যিই পাওয়া গেল তাহলে?'

'গেল তো', খুশি খুশি গলায় বললেন উপল দত্ত, 'আপনি কিছু কিনলেন না?'

'দোকানে ঢুকে ছন্দা কিছু কেনেনি এমন হয়েছে নাকি কখনও?' অরুণাংশু বললেন লঘু স্বরে।

'ইশ কী বদনাম দেখুন, অথচ সত্যি কিচ্ছু কিনিনি নিজের জন্যে। শানুর জন্যে শুধু একটা উইন্ড চিটার কিনলাম, জিনিসটা দেখে ভালো লেগে গেল'—

'নিজের জন্যে কিছু কিনবেন না তাহলে সত্যিই?'

'নাহ।'

'দাদার টিজিঙের ভয়ে?'

'না না তা নয়।'

'তাহলে?'

'মনে মনে একটা জিনিসই নিয়ে যাবার প্ল্যান আছে এখান থেকে, অবশ্য পাই যদি'—

'কী?'

'নারায়ণ শিলা। শুনেছি কালী গন্ডকিতেই একমাত্র নারায়ণ শিলা ভেসে আসে। আমার বহুদিনের শখ বাড়িতে নারায়ণ শিলা রাখার, মানে সত্যিকারের শিলা। জানেনই তো আজকাল প্রচুর নকল শিলা কিনতে পাওয়া যায় এমনকি কলকাতাতেও'—

'জানি।'

'পরিকাকুর কাছে যখন জায়গাটা সম্পর্কে শুনলাম তখন থেকেই মনে মনে ভেবে রেখেছি মুক্তিনাথ যাচ্ছি যখন আর কিছু আনি না আনি নারায়ণ শিলা আনবই। নদীতে হাত ডুবিয়ে বসে থাকব ঠিক করেছি। আমায় একজন বলে দিয়েছে মন দিয়ে প্রার্থনা করে নদীর জলে হাত পেতে রাখলে নারায়ণ শিলা নাকি নিজে নিজেই হাতে এসে ওঠে। যদি এভাবে পেয়ে যাই তাহলে তো কথাই নেই, আর একান্তই নদী থেকে পাওয়া না গেলে কিনেই নেব ওখান থেকে। খোদ মুক্তিনাথ থেকে নারায়ণ শিলা কিনলে খাঁটি জিনিসই পাব নিশ্চয়ই।'

'আশা করা যায়।'

দোকানের বাইরে বেরিয়ে এসে হাঁটতে হাঁটতে প্রীতম রায় বললেন, 'তা এবারে একেবারে একজোড়া টুপি কিনলে যে, আর একটা কি বউদির জন্যে?'

'নো স্যার', ফুরফুরে গলায় বললেন উপল বাবু।

'তবে?'

'ইট'স ফ মিস্টার চ্যাটার্জী।'

'আমি?' চমকে গিয়ে বলে ওঠেন পরিদাদু।

'ইয়েস।'

'হঠাৎ?'

'আমাদের বন্ধুত্বের স্মারক হিসেবে আপনাকে দিতে ইচ্ছে হল এটা। কলকাতা ফিরে আর দেখা হবে কিনা তা তো জানি না। বাড়ি ফিরে এটা দেখলে আপনার আমার কথা মনে পড়বে।'

'এমনিও আপনার কথা মনে পড়বে মিস্টার দত্ত', পরিদাদু তাঁর দিকে হাত বাড়িয়ে দিলেন।

'তবু এটা আপনি রাখুন। আপনি এটা নিলে আমার ভালো লাগবে।'

'থ্যাঙ্কস। নিলাম আমি', হাত বাড়িয়ে টুপিটা নিতে নিতে খুবই আন্তরিক গলায় বললেন পরিদাদু। সুছন্দা তাড়া দিলেন, 'এবার একটু পা চালিয়ে চলুন দেখি। কখন থেকে হোটেলে গিয়ে চা খেতে খেতে গল্প করার প্ল্যান হয়ে আছে আমাদের। এখন যা পরিস্থিতি তাতে তো দেখছি হোটেলে পৌঁছনোর আগেই সব গল্প শেষ হয়ে যাবে আপনাদের।'

রিসেপশনে ঘরে চা এবং স্ন্যাক্স পাঠিয়ে দেবার কথা বলে দিয়ে ওপরে উঠলেন সবাই। অরুণাংশুর ঘরটা অপেক্ষাকৃত বড় বলে ওই ঘরটাতেই বসা হল। প্রীতম শাওনের পিঠে আলতো চাপড় মারলেন, 'শাওনবাবু বলো কেমন লাগছে জায়গাটা?'

'ভালো।' শাওন ছোট্ট করে জবাব দিল।

'আর আমাদের?'

'ভালোই তো'—লজ্জা পেয়ে মুখ নিচু করে ফেলল শাওন।

'তাহলে রাখো এটা', বলেই পকেট থেকে একমুঠো টফি বের করলেন প্রীতম রায়।

'এমা এসব আবার কেন? ও কি ছোট্ট আছে নাকি আর'—সুছন্দা অপ্রস্তুত গলায় বলে উঠলেন।

'বড়ও কি খুব অ্যাঁ, কী গো শাওন'? বলে শাওনের দিকে চাইলেন তিনি।

শাওন কী বা বলবে। চুপ করে রইল সে। উপল দাড়ির জঙ্গলে আঙুল চালাতে চালাতে বললেন, 'ইশ সত্যি তো খুব অন্যায় হয়ে গেছিল আমার। শাওনবাবুর জন্যে কিছু তো একটা কিনে নিয়ে ঢোকা উচিত ছিল আমার। কথাটা খেয়ালই ছিল না এক্কেবারে'—

'কোন কাজের কথাটাই বা তোমার খেয়াল থাকে বলো তো,' প্রীতম হাসলেন, 'তার ওপরে আবার টুপির সন্ধান পেয়ে গেলে রাস্তায়। ব্যাস জগতের আর কোনো কিছু কী করেই বা খেয়াল থাকবে তোমার'—

'খুবই অন্যায় হয়ে গিয়েছিল ভাই আমার, স্বীকার করছি, তুমি সত্যি আমার মান বাঁচালে আজ। তা নইলে শাওন কী যে ভাবত আমাদের।'

'না না তা কেন' প্রতিবাদ করে উঠল শাওন। তারপর টফিগুলো হাতে নিয়ে বলল, 'এত টফি লাগবে না আমার। আমি টফি খেতে পছন্দও করি না খুব। আপনারা আর কিছু রেখে দিন।'

'লজ্জা পাবার কোনো কারণ নেই, ' উপল বললেন, 'রেখে দাও। পাহাড়ি পথে এগুলো খুব কাজের জিনিস জানো তো, অনেক সময়েই এগুলো পথে ঘাটে পরম বন্ধুর মতন সাহায্য করে। যাঁরা নিয়মিত পাহাড়ে যান তাঁরা এ কথা জানেন।'

'উনি ঠিক কথাই বলেছেন শানু,' পরিদাদু বললেন, 'এগুলো কাছে রেখে দে, পরে সত্যিই কাজে লেগে যেতে পারে।'

অরুণাংশু জিজ্ঞেস করলেন, 'আপনাদের কী প্ল্যান আজ? আজ তো মুক্তিনাথের দিকে রওনা দেবেন না বুঝতেই পারছি।'

'না আজ আর স্টার্ট করব না। আজ পোখরার আশেপাশেই ঘুরে নেব একটু। আপনারা?'

'আমরাও কাল রওনা দেব। আজ ভাবছি একটু পরে পারমিশনের ব্যবস্থাটা সেরে নেব টুরিজম অফিস থেকে। জায়গাটা আবার কত দূর কে জানে,' পরিদাদু বললেন।

'বেশি দূরে না, খোঁজ নিয়েছি আমরা। এখান থেকে ম্যাক্সিমাম তিন চার কিলোমিটার হবে। গাড়ি নিলে হার্ডলি শ তিনেক নেবে যাওয়া আসা মিলিয়ে।' প্রীতম রায় বললেন।

আই সি না এন সি?' শাওন গম্ভীর গলায় জিজ্ঞেস করল। পরিদাদু হেসে ফেললেন।

'এন সি', উপল বললেন।

সুছন্দা হাঁ করে তাকিয়ে ছিলেন শাওনের দিকে। অবাক হয়ে বললেন তিনি এসব আবার কী বলছিস রে শানু?'

'বুঝলে না তো,' শাওন বিজ্ঞের মতন মুখ করে বলে, 'আই সি হলে ভাড়াটা অনেক বেশি লেগে যেত, আমাদের একশো টাকা মানে এদের একশো ষাট টাকা।'

'তাই?'

'হ্যাঁ।'

'তুই এতোসব জানলি কী করে?'

'আমিও জানতাম না আগে, সবে কালই জেনেছি', বলে পরিদাদুর দিকে চেয়ে হেসে ওঠে শাওন।

প্রীতম বললেন, 'আপনারা আজ যাচ্ছেন না যখন অযথা আজ পারমিশন করাতে গিয়ে লাভ নেই। কাগজপত্র ঠিকঠাক থাকলে ওখানে বেশি সময় লাগে না। এমনকি গাড়িও ওখান থেকেই পেয়ে যাবেন আপনারা। অবশ্য দরদাম করে নিতে হবে ঠিকঠাক বুঝে শুনে। না হলে গলা কেটে নেবে এরা। এমনিতেই গাড়ি খুব কস্টলি এখানে'—

'কাগজপত্র কী লাগে পারমিশনের জন্যে?' অরুণাংশু জিজ্ঞেস করলেন।

'ফোটো আই ডি, স্পেশালি পাসপোর্ট অথবা ভোটার আই ডির অরিজিনাল এবং জেরক্স। সঙ্গে দু কপি করে পাসপোর্ট সাইজের ছবি।'

'আর শানুর?'

'প্রোব্যাবলি স্কুলের আইডেনটিটি কার্ড আর বার্থ সার্টিফিকেট, যদি পাসপোর্ট না থাকে। আমি শিওর নই, কাল জেনে দিতে হবে আপনাদের।'

'অনেক ধন্যবাদ', অরুণাংশু বললেন।

'কিন্তু শুধু ধন্যবাদে তো চলবে না মশাই'—উপল দত্ত দাড়ির ফাঁক দিয়ে মুচকি হাসলেন।

'বলুন কী করতে পারি আমরা'—

'আজ সন্ধেবেলা আমাদের হোটেলে আসতে হবে। আমরা একসঙ্গে ডিনার করব।'

'দেখি', পরিদাদু বললেন।

'উহু, দেখি বললে তো শুনব না। কথা দিতে হবে।'

'ঠিক আছে, তাই হবে।'

'হোটেলের নামটা মনে আছে?'

'লেক ভিউ তো?'

ইয়েস, ফার্স্ট ফ্লোর। রুম নাম্বার টু ওয়ান ফোর। রিসেপশনে এসে জানালেই হবে। আমরা পরিমলবাবুর নাম বলে রাখব।'

'ও কে।'

'শানুবাবু কী মেনু প্রেফার করছো বলো, চিকেন নাকি অন্য কিছু'—

'এক্কেবারে নিরামিষ, একদম বাহুল্য করবেন না। এমন করলে কিন্তু যাব না বলে দিচ্ছি' সুছন্দা চোখ পাকিয়ে ছদ্ম রাগের ভঙ্গিমায় বললেন।

'এই তো মুশকিল ম্যাডাম। প্রশ্নটা তো আপনাকে করিনি আমরা।'

'না না তবু।'

'আচ্ছা ঠিক আছে ওটা তাহলে আমাদের ওপরেই ছেড়ে দিন,' বলে উঠে পড়লেন দুজনে। দরজার দিকে এগোতে এগোতে হাত নাড়ালেন একবার, 'চলি, সন্ধেবেলা দেখা হচ্ছে'—

পরিদাদু বললেন, 'স্নানটা সেরে নে শানু,' তারপর অরুণাংশুদের দিকে তাকিয়ে বললেন, 'তোমরাও একেবারে তৈরি হয়ে নাও। লাঞ্চ সেরে সাইট সিয়িং—এ বেরব আমরা। তাহলে ঘুরতে ঘুরতে দেরি হলেও কোনো হেডেক থাকবে না আর। কোনো জায়গা যদি ভালো লেগে যায় সেখানে একটুক্ষণ বসে যেতে পারব। যাই বলিস, তাড়াহুড়ো করে বাপু ঘুরতে ইচ্ছে করে না।'

'যা বলেছ পরিকাকু', সুছন্দাও সায় দেন তাঁর কথায়।

সকলে তৈরি হয়ে খাওয়াদাওয়া সেরে বেরোতে যাবেন এমন সময় বৃষ্টি নামল। খুব জোরে নয়। ঝিরঝিরে বৃষ্টি। পরিদাদু বললেন, 'কী করবে বলো, বেরিয়ে পড়বে জয় মা বলে, নাকি ওয়েট করবে একটু?'

সুছন্দা বললেন, 'আমার কোনো অপশন নেই, যা বলবে তোমরা। অরুণাংশু বললেন, 'ওয়েদার খারাপ থাকলে বেরিয়ে লাভ নেই। সকালে দু—একজনকে জিজ্ঞেস করে জানলাম যে একটু এগিয়ে গেলেই খুব ভালো ভিউ পাওয়া যায়। বহু লোক ছবি টবি তোলেন ওখানে।'

'কিসের?' সুছন্দা জিজ্ঞেস করলেন।

'পিক'—অরুণাংশু জবাব দিলেন।

'কী পিক'? শাওন জিজ্ঞেস করে কৌতূহলী গলায়।

'মচ্ছপুছারে।'

'অ্যাঁ এ আবার কী নাম' সুছন্দা বলেন মুখটা বেঁকিয়ে।

'ওটার মানে কী বাবা?' শাওন জিজ্ঞেস করল।

'মচ্ছপুছারে মানে মাছের লেজ, ফিশ টেল। আসলে পাহাড়ের এই চূড়াটা মাছের পুচ্ছ পাখনার মতন দেখতে', অরুণাংশু নন পরিদাদু বুঝিয়ে বললেন শাওনকে।

'দারুণ ব্যাপার তো'—শাওন অবাক হয়ে বলে, 'আমরা দেখব তো ওটা পরিদাদু?'

'নিশ্চয়ই' পরিদাদু বললেন, 'কিন্তু আকাশ যদি এমন মুখ গোমড়া করে থাকে তাহলে আমরা ওর দেখা পাই কী করে বল তো'—

আকাশ একটু পরে পরিষ্কার হল। বৃষ্টি থেমে রোদ উঠল ঝলমল করে। পরিদাদু বললেন, 'চল এবার বেরোনো যাক। হোটেলের সিঁড়ি দিয়ে নীচে নেমে রাস্তায় দাঁড়াল শাওন। পরিদাদু এসে দাঁড়ালেন তার পাশে। হঠাৎ পরিদাদুর হাত ধরে টান দিল শাওন, 'পরিদাদু দ্যাখো, সেই লোকটা।'

'কোন লোকটা?' পরিদাদু সেদিকে না তাকিয়েই বলেন।

'দোকানের সেই লোকটা।'

'দোকানের কোন লোক?'

'দত্ত আঙ্কেল যার মাথা থেকে টুপি খুলে নিয়েছিল।'

'হতেই পারে', খুব নিরাসক্ত গলায় বললেন পরিদাদু, 'ও এখানকার লোকাল লোক। রাস্তাঘাটে দেখতে পাওয়াটা অস্বাভাবিক নয়।'

'লোকটা খুব উত্তেজিত মনে হচ্ছে।'

'তাই'? বলে পরিদাদু চাইলেন সেদিকে। লোকটা একটা মোটর বাইকে হেলান দিয়ে খুব উত্তেজিত ভঙ্গিতে হাত নেড়ে নেড়ে আর একজনকে কিছু একটা বলেছিল। আর তা শুনে খুব উত্তেজিত আর হতাশ হয়ে মাটির ওপরে বসে পড়ল অন্য লোকটা।

'সেই লোকটাই না পরিদাদু?' শাওন চাপা গলায় বলে।

'তাই তো মনে হচ্ছে। 'তবে এদের এখানকার লোকেদের মুখের গঠন তো একই রকমের। কাজেই আমরা ভুলও করতে পারি।'

'ভুল নয়। আমি ঠিক দেখেছি। ওর জুতোটা দেখো।'

'যদি ওই লোকটা হয়ও তাতে সমস্যাটা কোথায় সেটাই তো বুঝতে পারছি না।'

কথার মাঝখানে অরুণাংশু আর সুছন্দা নেমে এলেন। অরুণাংশু বললেন, 'ব্যাপারখানা কী? দাদু নাতিতে মিলে কী যুক্তি পরামর্শ হচ্চেচ শুনি'—

'তোমার ছেলেকে রহস্যে পেয়েছে। এই যে আমরা এমন নিরাপদে এবং নিরুপদ্রবে ঘুরে বেড়াচ্ছি এটা শানুর বোধহয় ঠিক ভালো লাগছে না—'

'কেন?'

'টুপির দোকানের লোকটা এত উত্তেজিত হয়ে আছে কেন এই রহস্যের সমাধান না হলে শানু কিন্তু স্বস্তি পাচ্ছে না' বলে হো হো করে হেসে উঠলেন পরিদাদু। শাওনের খুব অভিমান হল। পরিদাদু কেন যে মাঝে মাঝে সকলের সামনে ইচ্ছে করে তাকে এমন অপদস্থ করেন কে জানে। সে আর কোনো কথা বলল না। উলটোদিকের ফুটপাথে দাঁড়ানো লোকটা ওই লোকটাকে বাইকে চাপিয়ে দ্রুত চলে গেল ফেওয়া লেকের দিকে। পরিদাদু তার চলে যাওয়াটা দেখলেন। আড়চোখে শাওনের দিকেও তাকিয়ে নিলেন একবার।

তারপর খুব স্বাভাবিক গলায় বললেন, 'চল এবার রওনা দেওয়া যাক।'

অরুণাংশু বললেন, 'গাড়ি নেব?'

'থাক না কী দরকার,' পরিদাদু বললেন, 'হাঁটতে হাঁটতে এগোই খানিক। ক্লান্তি লাগলে গাড়ি করে নেব রাস্তা থেকে।'

'তাই হোক। চলো তবে পা চালাই', বলে অরুণাংশু পা বাড়ালেন। সুছন্দাও। শাওন হাঁটতে লাগল পরিদাদুর পাশে পাশে।

রাস্তাটা সোজা এগিয়ে গেছে। দুপাশে সার সার দোকান। বেশ কিছুটা হাঁটার পরেই রাস্তাটা দু—ভাগ হয়ে দু—দিকে চলল। অরুণাংশু বললেন, 'আমরা কোনদিকে হাঁটব পরি?'

'ডানদিকেই এগিয়ে দেখি চলো।' বলে খোশ মেজাজে গুন গুন করে গান গাইতে গাইতে পথ চলতে লাগলেন তিনি। আরও কিছুটা হাঁটার পর হঠাৎ থমকে দাঁড়ালেন পরিদাদু। শাওনের দিকে তাকিয়ে বললেন, 'দ্যাখ শানু'—

বাঁ দিকে কোনো একটা প্রশাসনিক ভবন। আর তার পিছনেই খোলা আকাশে জেগে উঠেছে বরফে মোড়া ঝকঝকে সাদা পর্বতের চূড়াটা। সুছন্দা বললেন, 'অপূর্ব।'

অরুণাংশু ক্যামেরা বের করলেন। পরিদাদু শাওনকে দেখাচ্ছিলেন বরফে মোড়া পাহাড় চূড়াটা সত্যিই কেমন মাছের লেজের মতন আকার নিয়েছে। শাওন আনন্দে হাততালি দিয়ে উঠল। সুছন্দা বললেন, 'কী অদ্ভুত বলো দেখি পরিকাকু, কী করে এমন হয়'—

'প্রকৃতি যে এমন কত বিস্ময় আর কত সৌন্দর্য বিছিয়ে রেখেছে মানুষের জন্যে', পরিদাদু বললেন গাঢ় গলায়, 'আমরা তার কতটুকুই বা দেখতে পেলাম এ জীবনে'—

একটা গাড়ি এসময় পাশে এসে দাঁড়াল। জিজ্ঞেস করল ওঁরা সাইট সিয়িং এ যাবেন কিনা। পরিদাদু অরুণাংশু আর সুছন্দার দিকে চাইলেন। সুছন্দা বললেন, 'নিয়েই নাও পরিকাকু। অনেকক্ষণই তো হাঁটলাম। আর ভাল্লাগছে না বাপু।'

অরুণাংশুও সায় দিলেন সে কথায়। পরিদাদুর দিকে চেয়ে বললেন, 'তাছাড়া কী কী যে দেখবার আছে এখানে তাও তো জানি না আমরা। গাড়ি নিলে ড্রাইভারই আমাদের গাইড হতে পারবেন। বেশি দূরে যাবার দরকার নেই। বলো আশপাশে যা যা কিছু দেখার আছে আমাদের দেখিয়ে সন্ধের আগেই আমাদের লেক ভিউ এর সামনে নামিয়ে দিতে।'

সুছন্দা বললেন, 'ঠিক বলেছ। একটু আগে আগেই ওনাদের ওখানে যাওয়া ভালো। তাহলে বসে দুটো কথা বলা যাবে। একেবারে খাওয়ার সময় হাজির হওয়াটা খুব খারাপ দেখাবে।'

'ঠিক আছে, সেভাবেই কথা বলি তাহলে', বলে গাড়ির ড্রাইভারের দিকে এগিয়ে গেলেন পরিদাদু।

লেক ভিউ এর সামনে এসে যখন গাড়ি থেকে নামল শাওনরা তখন সবে সন্ধে হয়েছে। রিসেপশনে পরিদাদু নিজের নাম বলতেই রিসেপশনিস্ট মহিলাটি মিষ্টি করে হাসলেন। পরিদাদুর দিকে চেয়ে 'ওয়ান মিনিট প্লিজ' বলে ফোন তুললেন তিনি। ওপারে ফোন উঠল সম্ভবত। মহিলা শুধু বললেন, 'মিস্টার চ্যাটার্জী এন্ড হিজ পার্টি'—আর তার দু—মিনিটের মধ্যে রিসেপশনে নেমে এলেন প্রীতমবাবু। ওদের দিকে চেয়ে বললেন, 'আসুন'—

প্রীতম রায়কে খুব গম্ভীর আর চিন্তিত লাগছিল। তাঁর উদ্বেগ কারোরই নজর এড়াল না। পরিদাদু উদ্বিগ্ন কণ্ঠে জিজ্ঞেস করলেন, 'কী হয়েছে মিস্টার রায়, এনি প্রবলেম?'

'হুঁ', সত্যিই একটু সমস্যায় পড়েছি। ইন ফ্যাক্ট আমি নার্ভাসও ফিল করছি ব্যাপারটায়।'

'কী হয়েছে?' উদ্বেগের সঙ্গে জিজ্ঞেস করলেন পরিদাদু।

'উপলের অ্যাকসিডেন্ট হয়ে গেছে একটা।'

'সে কী কখন?'

'আজ আমরা আশেপাশে বেরিয়েছিলাম একটু'—

'আমরাও তো বেরিয়েছিলাম।' সুছন্দা বললেন।

'জানি। বেরোবেন যে তা তো বলেছিলেন আমাদের'—

'উপলবাবুর কী হয়েছে বলুন', পরিদাদু প্রীতমবাবুকে থামিয়ে বাসে উঠলেন মাঝপথে, 'কেমন আছেন উনি এখন?'

'এমনি ঠিক আছে। তবে শকটা বোধহয় ঠিকঠাক নিতে পারেনি। বাড়ি ফিরে কনভালশনটা আবার একবার হয়েছিল। এখন বিশ্রাম নিয়ে অনেকটাই সুস্থ, তবে মাঝে মাঝে দু—একটা অসংলগ্ন কথাবার্তা বলছে'—

'মাই গড', অরুণাংশু বললেন চিন্তিত মুখে, 'কিন্তু অ্যাক্সিডেন্টটা হল কী ভাবে?'

'ওপরে চলুন, বলছি। এখানে এভাবে দাঁড়িয়ে সব বলা যাবে না, বলাটা ঠিকও হবে না হয়তো।'

'এ অবস্থায় আমরা আজ আর তবে নাই বা আতিথ্য গ্রহণ করলাম আপনাদের প্রীতমবাবু,' সুছন্দা বললেন,

'চলুন উপল বাবুর সঙ্গে দেখা করে আমরা বরং আজ আসি'—অরুণাংশু বললেন।

'না না তা কেন', অপ্রস্তুত গলায় বললেন প্রীতম, তা করলে উপল খুব দুঃখ পাবে। তাছাড়া এসময় আপনারা যতক্ষণ আমার সঙ্গে থাকেন আমিও নিশ্চিন্ত থাকতে পারি একটু।'

'চলুন, আমরা ওপরে গিয়ে বসি আগে।' পরিদাদু বললেন।

'চলুন।' প্রীতম সিঁড়ির দিকে পা বাড়ালেন।

উপল দত্ত বিছানায় শুয়ে ছিলেন। খুব ক্লান্ত লাগছিল তাঁকে। কপাল, হাত এবং আরও দু—এক জায়গায় কাটা ছড়ার দাগ এবং ব্যান্ড এইড লাগানো রয়েছে তাঁর। পরিদাদু তাঁর কাছে গিয়ে মাথায় হাত রাখলেন, 'আছেন কেমন এখন?'

'ভালো।' দুর্বল গলায় উত্তর দিলেন উপল।

'কী হয়েছিল, রাস্তায় কী নাকি এক্সিডেন্ট হয়েছিল আপনার?'

'একটা বাইক বেমক্কা ধাক্কা মারল আমায়'—

'বাইক?'

'হ্যাঁ।'

'কীভাবে ঘটল ব্যাপারটা? অন্যমনস্ক হয়ে হাঁটছিলেন নাকি?'

'আর বলেন কেন, আমাদের ওখানেও দেখেছি হাতে বাইক পেলে ছেলে ছোকরারা নিজেদের হিরো মনে করে। এখানেও তাই। আমি রাস্তার ধার দিয়ে হাঁটছিলাম। ধাক্কা লাগার কথাই নয়, অথচ আমায় মেরে দিল। যেন আমায় ধাক্কা দেওয়াটাই ওর উদ্দেশ্য ছিল।'

'এমন মনে হচ্ছে কেন আপনার?'

'তা না হলে আমার ধাক্কা লাগার তো আর কোনো কারণ নেই'—

'কজন ছিল বাইকে?'

'দুজন।'

'তাদের দেখেছেন?'

'দেখেছি।'

'আবার দেখলে চিনতে পারবেন?'

'না।'

'সেকি কেন?'

'দুজনেরই পুরো মুখটাই হেলমেটে ঢাকা ছিল। সন্ত্রাসবাদীরা কি আর মুখ খুলে অপারেশন করে মশাই?'

'সন্ত্রাসবাদী কারা?'

'ওই যে যারা আমায় মারতে চাইছিল।'

'আপনাকে মেরে ওদের লাভ?'

'আমি যে বুঝে ফেলেছিলাম ওরা একটা কিছু গন্ডগোল পাকাতে চাইছে। কাজেই আমাকে ওরা ওদের পথ থেকে তো সরাতে চাইবেই। আমার মামা এমন একবার একটা ডাকাতকে চিনে ফেলেছিল ট্রেন ডাকাতি করার সময়। ব্যাস আর যায় কোথায়, মেরেছিল চপারের কোপ। ভেবেছিল মামা মরেই গেছে, তাই ফেলে রেখে চলে গিয়েছিল। মামা বেঁচে গিয়েছিল শেষপর্যন্ত। আমাকে মারতে ওরা কিন্তু আবার আসবে জানেন তো। প্রীতম গো বেচারা ছেলে ও আমায় বাঁচাতে পারবে বলে মনে হয় না'—

পরিদাদু প্রীতম রায়ের দিকে চাইলেন। তিনি ইশারায় জানালেন যে উপল অসংলগ্ন কথা শুরু করেছেন। পরিদাদু কিন্তু উপলকে এড়িয়ে যাবার চেষ্টা করলেন না। বরং খুব স্বাভাবিক গলায় বললেন, 'ব্যাপারটাতো খুবই চিন্তার। তবে আপনার চিন্তা নেই। মিস্টার রায় একা নন, আমরাও আছি ওঁর সঙ্গে। আর জানেন তো আমি কিন্তু ডিফেন্স—এ চাকরি করেছি দীর্ঘ দিন। আমার সঙ্গে পেরে ওঠা খুব সহজ কাজ নয়।'

'সত্যি বলছেন আপনি আমাদের সঙ্গে আছেন?'

'অবশ্যই।' পরিদাদু আবার ওঁর মাথায় হাত রাখলেন। 'আপনি একটু বিশ্রাম নিন এবার। আমরা ততক্ষণ প্রীতমবাবুর সঙ্গে একটু কথা বলে নিই।'

'বলুন। আর মনে আছে তো রাতে আমরা কিন্তু একসঙ্গে ডিনার করব আজ। আপনারা কথা দিয়েছেন।'

সুছন্দা অবাক হয়ে প্রীতম রায়কে ফিসফিস করে বললেন, 'এই তো এ কথাটা মনে আছে ওঁর'—

প্রীতম হাসলেন। নীচু গলায় বললেন, 'সবই ঠিক আছে এমনিতে, কিন্তু মাঝে মাঝে কোথায় যেন লিঙ্ক হারিয়ে ফেলছে ও। হঠাৎ হঠাৎ করে এই টাইম এবং স্পেসের বাইরে বেরিয়ে যাচ্ছে উপল। আর সেটাই দুশ্চিন্তায় ফেলে দিচ্ছে আমায়।'

'তাহলে ওঁকে তো একজন ডাক্তার দেখিয়ে নেওয়া দরকার।'

'দেখালাম তো বিকেলে। অ্যাকসিডেন্টের পর।'

'এই সিম্পটমগুলোর কথা বলেছেন?'

'সবই বলেছি। ট্রেন থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত। জিজ্ঞেসও করলাম এরপর আর আমাদের যাওয়া উচিত হবে কি না।'

'ডাক্তার কী বললেন?' অরুণাংশু জিজ্ঞেস করলেন।

'ডাক্তার তো বললেন চলে যেতে।'

'ওষুধ বিষুধ কিছু দিলেন?'

'নাহ। বললেন দরকার নেই। শুধু লক্ষ রাখতে হবে যেন ও পড়ে না যায়'—

পরিদাদু এসে বসলেন এবার প্রীতম রায়ের সামনে। প্রীতম বললেন, 'কী বুঝলেন?'

'এখনও খুব দুশ্চিন্তা করার মতন কিছু নয়। আর ওঁর সব কথাই যে অসংলগ্ন তা নাও তো হতে পারে।'

'মানে?'

'আমার কৌতূহল একটু বেশি জানেন তো মিস্টার রায়। আমি কতকগুলো ব্যাপার একটু আপনার কাছ থেকে জেনে নিতে চাইছি। দেখুন মনে করতে পারেন কি না'—

'বলুন'—

'আপনার কি মনে হয় উপলবাবুর এই অ্যাকসিডেন্টটার মধ্যে কোনোরকম অস্বাভাবিকতা আছে?'

'সত্যি কথা বলতে কী আমি ব্যাপারটা এমনভাবে ভাবিইনি। আসলে সে সময় ওকে নিয়েই এত ব্যস্ত হয়ে পড়লাম'—

'ঘটনাটা কোথায় ঘটল?'

'এখান থেকে বেশি দূরে নয়। আমরা তো গাড়ি টাড়ি নিইনি। পায়ে হেঁটেই ঘুরছিলাম। এখান থেকে দু—এক কিলোমিটার হেঁটে যাবার পর রাস্তাটা বেশ নির্জন হয়ে গেল। দোকান টোকান কমে গিয়ে রাস্তাটা তখন অনেকটাই শুনশান। হঠাৎ সেইসময় মোটর বাইকটা হুড়মুড় করে'—

'আপনারা কি ফাঁকা রাস্তা পেয়ে মাঝখান দিয়ে'—

'একেবারেই না', পরিদাদুকে থামিয়ে দিয়ে বললেন প্রীতম, 'বাইকটা যাবার যথেষ্ট জায়গা ছিল।'

'বাইকটা কি হঠাৎ এল নাকি আগে থেকে ফলো করছিল বলে মনে হয়?'

'ঠিক লক্ষ করিনি। আসলে এমন কোনো ব্যাপার মাথাতেই তো আসেনি আগে। তবে আপনি বলার পর একটা কথা মনে পড়ল'—

'কী কথা?'

'আমরা রুম থেকে যখন নীচে নামলাম রাস্তার পাশে একট মোটর বাইক দাঁড়িয়ে ছিল। পাশে দুটি ছেলে কোমরে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে কথা বলছিল। আমরা নীচে নেমে হাঁটা শুরু করতেই ওদের মধ্যে একজন মোবাইলে কার সঙ্গে কথা বলতে বলতে বাইকে স্টার্ট দিল, তারপর হুউশ করে বেরিয়ে গেল আমাদের পাশ দিয়ে'—

'ছেলেগুলোকে দেখেছিলেন ভালো করে?'

'না। দেখার উপায়ও ছিল না। ওদের মুখ হেলমেটে ঢাকা ছিল।'

'পরে ওদের আর দেখতে পাননি?'

'কে জানে। ওরা কিনা দেখলে বুঝতেই বা পারতাম কীভাবে। হয়তো দেখেছি, বুঝতে পারিনি। রাস্তাটা যেখানে দুভাগ হয়ে গেল সেখানেও তো দেখলাম একটা বাইক রাস্তার পাশে স্ট্যান্ড করে দুজন লোক চা খাচ্ছে আমাদের দিকে পিছন ফিরে। আগের দুজন আর এই দুজন একই লোক কিনা তা তো বলতে পারব না আমি। এখন আপনি বলার পর মনে হচ্ছে এক লোক হতেও পারে। কেননা বাইকের রং দুবারেই একই ছিল।'

'কী রং?'

'লাল।'

'মডেল?'

'তা বলতে পারব না।'

'ধাক্কা লাগার সময় কোনদিক থেকে লাগল, পিছন দিক থেকে?'

'হ্যাঁ।'

'আর উপলবাবু মুখ থুবড়ে পড়লেন?'

'না ঠিক তা নয়।'

'তাহলে?'

'ধাক্কাটা যাতে জোরে না লাগে তাই ওরা বোধহয় হাত দিয়ে ধাক্কা মেরে সরিয়ে দিতে চেয়েছিল ওকে।'

'বাইক থেকে হাত দিয়ে ধাক্কা দেওয়া হয়েছিল উপলবাবুকে?'

'ওই আর কি। ওকে বাঁচাতে গিয়ে ঠেলে দিয়েছিল হয়তো, ও টাল সামলাতে না পেরে ছিটকে পড়ে যায়'—

'তারপর?'

'ওর ব্যাগ, টুপি সব ঠিকরে পড়ে যায় রাস্তার ওপর। ওই দুজনই গাড়ি ঠিক করে কাছের একটা ওষুধের দোকানে নিয়ে যেতে বলে আমাদের। গাড়ি ছাড়ার সময় ব্যাগ আর টুপিটা ছুঁড়ে দেয় গাড়ির ভিতর।'

'ওরা কেন?'

'আমার তো ওগুলোর কথা মনেও আসেনি। আমি উপলকে নিয়েই ব্যস্ত তখন। উপলই ধাতস্থ হয়ে টুপিটার কথা বলল'—

'কী বললেন উনি?'

'তখনই প্রথম ওর কথায় অসঙ্গতিটা নজরে এল আমার।'

'কী রকম?'

'ও চিৎকার করছিল টুপিটা কোথায় গেল তা দেখবার জন্যে। হাত দিয়ে ইঙ্গিত করে অন্য লোকদের টুপিটার কথা জিজ্ঞেস করছিল আর বলছিল উগ্রপন্থীরা টুপিটা নাকি হাতিয়ে নিয়েছে'—

'স্ট্রেঞ্জ। একথা মনে হল কেন ওঁর?'

'জানি না। তবে হোটেলে ফিরেও ও বলছিল যে চলন্ত মোটর বাইক থেকে ওরা নাকি ওর টুপিটাই টান মেরে খুলে নিতে চেয়েছিল। ওকে ঠেলে দিতে চায়নি। বুঝতেই পারছেন, ওর সব কথা তো আর এখন ধর্তব্যের মধ্যে আনা যাচ্ছে না'—

'হুঁ'— বলে চুপ করে গেলেন পরিদাদু। তাঁর কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়ল। অরুণাংশু বললেন, 'তুমি কি কিছু সাসপেক্ট করছ পরি?'

'করছি।' স্পষ্ট স্বরে দৃঢ়ভাবে বললেন পরিদাদু।

'কী সন্দেহ করছ তুমি পরিদাদু?' শাওন কৌতূহলী গলায় জিজ্ঞেস করল।

'এক্ষুনি তো সবটা বলতে পারছি না। তবে দুটো জিনিস খুব স্পষ্ট।'

'কী?' প্রীতম রায় জিজ্ঞেস করলেন।

'প্রথমত মিস্টার দত্তের কেনা টুপিটার মধ্যে কিছু একটা গোলমাল আছে, আর দ্বিতীয়ত সম্ভবত টুপিটা ফেরত পেতেই তাঁর ওপর ইচ্ছাকৃত অ্যাটাক হয়েছে।'

'যাঃ আপনি উপলের কথাগুলোই তো মেনে নিচ্ছেন দেখছি', আশ্চর্য হয়ে বলেন প্রীতম।

'নিচ্ছি। সবটা না হলেও কিছুটা।'

'কিন্তু একটা কথা বলুন তো, খামোখা একটা সামান্য টুপির জন্যে কেউ এত কাণ্ড করতে যাবে কেন?'

'হয়তো টুপিটা সত্যি সত্যি অতটা সাধারণ নয়, ওর মধ্যে কোথাও কিছু অসামান্যতা আছে হয়তো।'

'কী সেটা?'

'সেটাই তো আমাদের খুঁজে বের করতে হবে,' বলে একটু থামলেন পরিদাদু। তারপর বললেন, 'উপলবাবুর শারীরিক কন্ডিশনে নিশ্চয়ই আপনারা আর জমসম থেকে হেঁটে মুক্তিনাথ ওঠার প্রোগ্রামটা রাখবেন না'—

'আর কি তা সম্ভব হবে'—হতাশ কণ্ঠে বললেন প্রীতম।

'সম্ভব হবে না', গম্ভীর গলায় বললেন পরিদাদু, 'আর আপনারা তা যাবেনও না। আপনারা দুজন গাড়িতেই যাবেন এবং আমাদের সঙ্গে একসঙ্গে। কাল সকালে দশটা নাগাদ আমরা এখান থেকে আপনাদের তুলব।

গাড়ি আমরা নিয়ে আসব। তার আগে দয়া করে আপনারা কোথাও বেরোবেন না।'—

'আমরা তো আরও আগে বেরোব ভেবেছিলাম'—

'কী লাভ। পারমিশনের কাজ সকাল দশটার আগে তো হবে না। আমি খোঁজ নিয়েছি, দশটাতে অফিস খোলে ওদের। আর আজ আমরা ফিরে যাচ্ছি। একসঙ্গে ডিনারের সুযোগ তো রইলই একসঙ্গেই মুক্তিনাথ যাচ্ছি যখন। মনে রাখবেন, ঠিক সকাল দশটায় আপনাদের তুলছি আমরা। দুজনেই তৈরি থাকবেন।' পরিদাদু উঠে পড়লেন, 'চলি। টেক কেয়ার'—বলে পা বাড়ালেন দরজার দিকে। শাওনরাও কোনো প্রশ্ন না করে এগিয়ে চলল তাঁর পিছু পিছু।

বাইরে পুরোদস্তুর অন্ধকার নেমে গেছে তখন। সকালে যে দোকানটা থেকে কেনাকাটা করা হয়েছিল তার সামনে এসে পরিদাদু দাঁড়ালেন। তারপর শাওনের দিকে চেয়ে বললেন, 'তোরা এগো শানু। আমাদের হোটেলের ঠিক উলটোদিকে যে রেস্টুরেন্টটা, ওটায় গিয়ে খাবারের অর্ডার দিয়ে বস একটু। আমি দশ মিনিটের মধ্যে আসছি একটা কাজ সেরে। তোরা যা ইচ্ছে খাবারের অর্ডার দিস, তবে আমার জন্যে রুটি আর নিরামিষ সবজিই বলিস'—

অরুণাংশু বললেন, 'এখানে আবার তোমার কাজটা কি শুনি? যদি টুকটাক কেনাকাটার কিছু থাকে তো চলো একসঙ্গেই সেরে আসি। তারপর তোমার শপিং শেষ হলে একসঙ্গেই খেতে যাব।'

'না, আমি একাই যাব দোকানে। দরকার আছে। সময় নষ্ট কোরো না। যা বললাম তাই করো'—বলে দোকানের মধ্যে ঢুকে গেলেন পরিদাদু। সুছন্দা উদ্বেগের সঙ্গে বলে উঠলেন, 'কী যে করে বুঝি না বাপু। যেখানেই যাই ঠিক একটা না একটা ঝামেলার মধ্যে নিজেকে জড়িয়ে ফেলবে পরিকাকু।'

'যা বলেছ', তাঁর কথায় সায় দেন অরুণাংশু। শাওনের অবশ্য মনে মনে আনন্দই হল। বেশ একটা রহস্যে টহস্যে জড়িয়ে পড়লে ফিরে গিয়ে বন্ধুদের কাছে ফলাও করে গল্প করা যাবে। ক্লাসে তার তখন এমন কদর বেড়ে যাবে যে ওদের ফার্স্ট বয় রাজদীপের থেকেও ওই বেশি হিরো বনে যাবে ক্লাসের মধ্যে।

পরিদাদু মিনিট পনেরো পরেই এসে গেলেন। অরুণাংশু খাবারের অর্ডার দিয়ে বসেছিলেন। ওরা বলেছে ডেলিভারি দিতে আধ ঘণ্টা লাগবে। ওরা গরমাগরম বানিয়ে দেবে। পরিদাদু গম্ভীর মুখ করে এসে বসে পড়লেন শাওনের পাশে। সুছন্দা বললেন 'কী কিনলে গো পরিকাকু?'

অরুণাংশু আড়চোখে একবার সুছন্দার দিকে তাকিয়ে নিয়ে সিরিয়াস গলায় বললেন, 'দেখে শেখো, ইচ্ছে থাকলে এবং সময়ের দাম সংক্রান্ত বিষয়ে সামান্য সচেতনতা থাকলে কত তাড়াতাড়ি কেনাকাটা শেষ করে ফেলা যায়। কেউ কেউ তো দোকানে ঢুকলে কখন যে বেরোতে হয় দোকান থেকে এই বেসিক ব্যাপারটাই ভুলে যায়'—

'আমাকেই যে শোনাচ্ছ সেটা স্পষ্ট করেই বলো না বাপু, অত ঠারে ঠোরে বলার কী আছে', সুছন্দা হাসি মুখেই বললেন। তারপর পরিদাদুর দিকে চেয়ে আবার বললেন, 'এমন ঝড়ের বেগে ছুটে গিয়ে কী কিনে আনলে গো?'

'আমি কিছু কিনতে যাইনি।' পরিদাদু একই রকম গম্ভীর গলায় বললেন। বাড়ি থেকে বেরোনো ইস্তক পরিদাদুকে এতটা চুপচাপ আর গম্ভীর কখনও দেখেনি শাওন। পরিদাদু যে কোনো একটা গন্ডগোলের আঁচ পেয়েছেন এ বিষয়ে তার এখন আর সন্দেহ নেই। অরুণাংশু আর সুছন্দাও নিশ্চিত পরিস্থিতির ঘোলাটে ব্যাপারটা আঁচ করছিলেন মনে মনে। অরুণাংশু অবাক হওয়া গলায় বললেন, 'কিনতে যাওনি মানে,—আমরা যে দেখলাম তুমি দোকানের মধ্যে ঢুকলে'—

'দোকানে তো ঢুকেইছিলাম, কিন্তু সেটা কেনাকাটা করার জন্যে নয়।'

'তাহলে?'

'কতকগুলো বিষয়ে খোঁজ খবর করার ছিল।'

'খোঁজ খবর?'

'হ্যাঁ।'

'কীসের খোঁজ?'

'টুপির ব্যাপারটা আমি কনফার্ম করার চেষ্টা করছিলাম। পাশাপাশি উপল দত্তকে ধাক্কা মেরে কেন ফেলে দেওয়া হল তার একটা কার্য কারণ সম্পর্ক খুঁজে বের করারও দরকার হয়ে পড়েছে যে।'

'দরকারটা কী জন্যে,' একটু বিরক্ত হয়ে বললেন অরুণাংশু, 'তুমি তো পুলিশও নও, গোয়েন্দাও নও। এমনকি ওই উপলবাবুর ব্যক্তিগত দেহরক্ষী হিসেবেও কেউ নিয়োগ করেনি তোমায়। তাহলে তুমি অযথা এসবের মধ্যে জড়াচ্ছ কেন আর মাথাটাকেই বা এত ঘামাচ্ছ কেন?'

'অরুণ ঠিকই তো বলছে পরিকাকু', সুছন্দাও বললেন, 'কী দরকার বলো শুধুমুধু নিজেদের এর মধ্যে জড়িয়ে'—

'আসলে আমার এটা একটা দোষই বলতে পারিস খুকু,' পরিদাদু হাসলেন, 'অনেকে শব্দজব্দ দেখলেই সলভ করতে বসে যায় দেখবি সব কাজ ফেলে। এ একটা চ্যালেঞ্জ অ্যাকসেপ্ট করা জানিস তো, যতক্ষণ না পাজলটার সমাধান হচ্ছে মনের মধ্যে বিচ্ছিরি একটা অস্বস্তি। মনে হয় বেয়াড়া শব্দগুলো যেন হারিয়ে দিচ্ছে আমায়। আমারও এমনটাই হয় জানিস, চোখের সামনে কিছু একটা রহস্যজনক ঘটনা ঘটে যাচ্ছে অথচ আমি সেটার বিন্দু বিসর্গ মানে বুঝতে পারছি না, নিজেকে তখন খুব বোকা মনে হয়। আর মনে হয় আমার না বুঝতে পারা পাজলটা দূরে বসে আমায় দুয়ো দিচ্ছে। কাজেই আমায় অস্তিত্ব রক্ষার তাগিদে ঘটনার কার্য কারণ সম্পর্ক খুঁজতে হয়।'

বোঝা গেল', অরুণাংশু বললেন, 'তোমায় নিরস্ত করা যাবে না জানি ভাই। তা বলো এই পাজলের কার্য কারণ কিছু কি খুঁজে পেলে?'

'কিছুটা পেলাম বইকি।'

'কী পেলে?'

'সে বিষয়ে এখানে আলোচনা না করে আমাদের ঘরে গিয়েই না হয় কথা বলব। আমাদের খাবার বোধহয় রেডি হয়ে গেছে। চলো খেয়ে নিয়ে আমরা বরং ভিতরে ঢুকে পড়ি। বাইরে এভাবে বেশিক্ষণ ঘোরাঘুরি করাটা বোধহয় আর খুব একটা সেফ নয়। আফটার অল উপলবাবুদের সঙ্গে আমরাও অনেকটা সময় একসঙ্গে ছিলাম। আমাদের একটু কনসাশ থাকা দরকার। হয়তো বিষয়টা তেমন কিছুই নয়, তবু সাবধানের মার নেই। আসলে জানো তো'— পরিদাদু কিছু একটা বলতে গিয়েও থমকে গেলেন। খাবার নিয়ে টেবিলের সামনে এসে দাঁড়াল দুজন মানুষ।

অরুণাংশু বললেন, 'কী হল থামলে কেন, কী যেন বলছিলে'—

লোকদুটো টেবিলে খাবার নামিয়ে রেখে ফিরে যাচ্ছিল। ওদের দিকে একবার আড়চোখে তাকিয়ে নিয়ে পরিদাদু বললেন, 'থাক'।

অরুণাংশু হাসলেন, 'ফালতু ঘাবড়াচ্ছো পরি। এরা বাংলা জানে না'—

'জানতেও পারে', পরিদাদু হাসলেন, 'অত নিশ্চিন্ত হওয়ার কিছু নেই। মনে রেখো সারা ভারতের যত ট্যুরিস্ট স্পট, সেখানে বেড়াতে আসা পর্যটকদের সিংহভাগই বাঙালি। কাজেই অধিকাংশ পর্যটন কেন্দ্রেই দেখবে দোকানপত্তর হোটেল রেস্টুরেন্টে যারা ব্যবসা চালান তাদের প্রায় সকলেই বলতে না পারলেও বাংলা ভাষাটা অনেকখানিই বোঝেন।

অরুণাংশু আর কথা বাড়ালেন না। সুছন্দাও বললেন, 'তাড়াতাড়ি খেয়েদেয়ে ভিতরে ঢুকে পড়ি চল শানু, গিয়ে পরিকাকুর কথাগুলো শুনি। যাই বলিস, আমার কিন্তু আর তর সইছে না'—

'আমারও', মাথা নেড়ে বলে শাওন।

হোটেলের ঘরে জমিয়ে বসে কোলের ওপর একটা বালিশ টেনে নিয়ে অরুণাংশু বললেন, 'এবার বলো কী ইনভেস্টিগেশন সেরে এলে আমাদের বাদ দিয়ে।'

পরিদাদু মৃদু হাসলেন, 'আমার জানার দরকার ছিল টুপির ব্যাপারটায় যে খটকার কথাটা প্রীতমবাবুর সামনে আমি বলে এলাম সেটা ঠিকঠাক কিনা।'

'কী দেখলে, খটকাটা রিজনেবল?'

'একদম।'

'কী করে বুঝলে?'

'উপল দত্ত এবং প্রীতম রায়ের কথা শুনতে শুনতে আমার কেবলই মনে হচ্ছিল টুপিটাকে ঘিরে নিশ্চিত কিছু একটা রহস্য আছে। ওঁদের সঙ্গে কথা বলার সময় হঠাৎই একটা সম্ভাবনার কথা মাথায় আসে আমার।'

'কী সম্ভাবনা পরিদাদু?' শাওন চোখ গোল গোল করে জিজ্ঞেস করল।

'আমার মনে হল দোকানে টুপি কেনার সময় নিশ্চিত ওই লোকটার টুপি বদল হয়ে গেছে উপলবাবুর কেনা টুপিগুলোর সঙ্গে।'

'আরও একটা পসিবিলিটিও কিন্তু থেকে যাচ্ছে পরি'—

'বলো'—

'এমনও তো হতে পারে টুপি কেনার পর যে টুপিগুলো উনি দোকানে ফেরত দিলেন, তার মধ্যেই ওই লোকটার টুপিটা চলে গেছে'—

'হতে পারত। কিন্তু বোধহয় তা হয়নি।'

'কী করে জানলে?'

'এ চিন্তাটা আমার মাথাতেও এসেছিল। আমি সেটা খোঁজ করব বলে দোকানে গিয়ে ওই টুপিগুলোর খোঁজ করেছিলাম।'

'দোকানে গিয়ে তুমি কী বললে?'

'আমি উপলবাবুর কেনা টুপিটার সাধ্যমতন ডিটেলস দিয়ে ঠিক ওইরকম টুপি আছে কিনা জিজ্ঞেস করলাম। আর কথাটা জিজ্ঞেস করতেই দোকানদার নড়েচড়ে বসে আমায় জিজ্ঞেস করে বসল ওইরকম টুপির কী দরকার আমার'—

'তখন তুমি কী বললে পরিদাদু'— শাওন জিজ্ঞেস করল।

'আমি বললাম ওইরকম টুপি আমার খুব পছন্দ, আমি কিনতে চাই।'

'তারপর?' সুছন্দা বললেন।

'দোকানদার বলল ওর দোকানে ওই টুপি আর নেই, তবে আমি নিলে পাশের দোকান থেকে আনিয়ে দিতে পারে। আমি যেই বললাম অন্য দোকান থেকে আনাতে হবে না, ওই দোকানে থাকলে নিতাম, লোকটা হাঁ করে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল আমার দিকে। তারপর অবাক হয়ে বলল কী ব্যাপার বলুন তো মশাই, সকালে দাড়িঅলা এক ভদ্রলোক ওই টুপি একজোড়া কেনার পর থেকেই হঠাৎ ওই টুপিটার ডিম্যান্ড মারাত্মক বেড়ে গেল।'

'তোমায় লোকটা তাহলে আইডেন্টিফাই করতে পারেনি', অরুণাংশু বললেন। সুছন্দা অরুণাংশুকে থামিয়ে দিয়ে বললেন, 'দাঁড়াও। অত কথা বোলোনাতো মাঝখানে। পরিকাকুর কথাটা শুনতে দাও।'

পরিদাদু বললেন, 'দোকানের লোকটার সঙ্গে কথা বলে জানতে পারলাম আজ দুপুরে দুটো লোক দোকানে এসে ওই টুপি যতগুলো ছিল সবকটা কিনে নিয়ে গেছে। আর ওরা বার বার জানতে চাইছিল সারাদিনে ওই টুপির বিক্রিবাটা কেমন হয়েছে এবং কতগুলো হয়েছে।'

'আশ্চর্য তো?' অরুণাংশু বললেন।

'শুধু আশ্চর্যের নয় অরুণ, ব্যাপারটা যথেষ্ট দুশ্চিন্তারও বটে', পরিদাদুকে চিন্তিত দেখালো।

'কেন বলো দেখি?'

'দোকানের সবগুলো টুপি কিনে নিয়ে যাওয়ার পরেও উপলবাবুর ওপরে অ্যাটাক হওয়ার অর্থটা বুঝলে না?'

'তার মানে ওদের টুপিটা ওরা পায়নি এখনও। আর সম্ভবত সেটা এখনও উপল আঙ্কলের কাছেই রয়েছে'। শাওন বলল।

'এগজ্যাক্টলি', পরিদাদু বললেন, 'সুতরাং বুঝতেই পারছ টুপিটা ফেরত পেতে উপলবাবুর ওপর আবারও অ্যাটাক হতে পারে। আর সকাল থেকে ঘটনা যেভাবে এগোচ্ছে তাতে একথাও স্পষ্ট যে টুপিটা যারা ফেরত পেতে চাইছে, তারা কিন্তু একটা দল হিসেবে কাজ করছে। ইন্টারেস্টটা কোনো ব্যক্তিমানুষের নয়।'

'আমাদের এখন তাহলে কী করণীয় পরি?' অরুণাংশু জিজ্ঞেস করলেন।

'প্রথমত সবসময়েই নিজেরা সতর্ক থাকা'—

'আর দ্বিতীয়ত?'

'খুঁজে বের করা টুপিটা কেন এত ইমপর্ট্যান্ট ওদের কাছে।'

'কী করে বুঝবে?'

'দেখা যাক। তার আগে উপলবাবুর টুপিটা একবার আমার নিজের দেখাটা খুবই জরুরি।'

সকালবেলা ঠিক দশটায় উপলবাবুদের হোটেল থেকে তুলে নিলেন পরিদাদু। পারমিশন পেতেও অসুবিধে হল না এটুও। তবে এই অফিসে ওঁরা ভারতীয় টাকা নিলেন না। এখানে নেপালি টাকাই দিতে হবে এমনই নাকি নিয়ম। এই অফিসের মধ্যেই একটা মানি এক্সচেঞ্জ কাউন্টার আছে, কিন্তু সেটা বন্ধ থাকায় পরিদাদুকে বাইরে বেরোতে হল। প্রীতম রায় বললেন, 'চলুন আমিও যাই আপনার সঙ্গে। আমাদেরও তো মানি এক্সচেঞ্জ করতে হবে।'

'চলুন', পরিদাদু আপত্তি করলেন না।

উপলবাবুকে দেখে অসুস্থ বলে মনে হচ্ছিল না। তবে কথা কম বলেছিলেন। প্রীতমবাবু বলছিলেন এমনিতে ঠিকই আছেন, তবে রাস্তাঘাটে ও হোটেলের বিভিন্ন মানুষকে অহেতুক সন্দেহভাজন মনে করবার একটা প্রবণতা তৈরি হয়েছে তার কাল রাত্রি থেকে। পরিদাদুরা ফিরে আসার প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই মুক্তিনাথ যাওয়ার অনুমতিপত্র তৈরি হয়ে গেল। গাড়ি কোথায় পাওয়া যেতে পারে সে বিষয়ে অফিসে খোঁজ করতেই পঁচিশ—ছাব্বিশ বছর বয়েসি একজন নেপালি ছেলে পরিদাদুর দিকে এগিয়ে এল। পরিদাদু ছেলেটির দিকে চাইতেই বলে উঠল সে, 'আপনারা মুক্তিনাথ যাবার গাড়ি খুঁজছেন?'

'হ্যাঁ'। পরিদাদু বললেন, 'আপনার গাড়ি আছে?'

'জী।'

'আপনি নিজেই চালিয়ে নিয়ে যাবেন?'

'না না আমার ড্রাইভার যাবে, কোনো প্রবলেম হবে না। আমাদের সরকারি ছাড়পত্র আছে। পথে কোনো তকলিফ হবে না আপনাদের। কেউ কোথাও আটকাবে না আপনাদের রাস্তায়। এক্কেবারে মুক্তিনাথ তক গাড়ি আপনাদের নিয়ে যাবে এবং ফিরিয়ে দেবে এখানে। থ্রি ডে টু নাইট পুরা পচাশ হাজার লাগবে নেপালি কারেন্সিতে।'

'বলেন কী, পঞ্চাশ হাজার। ইয়ার্কি করছেন নাকি!' অরুণাংশু বললেন চোখ গোল গোল করে। প্রীতমও বলে উঠলেন হাত নেড়ে, 'বহোত জাদা বোল রাহা হ্যায় আপ নে।'

'জাদা বিলকুল নেহি সাব', লোকটা হাসল, 'রাস্তা বহোতই খারাপ ওদিকে। আপনারা গেলেই বুঝতে পারবেন। একবার ওখান থেকে ফিরেই গাড়ি সার্ভিসিং এ পাঠাতে হয় আমাদের। রাস্তা সত্যি খুবই খতরনক'—

'এই মেরেছে', সুছন্দা ভয় পাওয়া গলায় বললেন, 'গাড়ি ওই বদখত রাস্তা দিয়ে যাবে, ঠিকঠাক পৌঁছতে পারব তো? ড্রাইভার খুব পাকা না হলে যে মহা চিত্তির পরিকাকু।'

'কোনো টেনশন করবেন না ম্যাডাম। রিস্ক আমাদের। গ্যারান্টি দিচ্ছি, পথে কিচ্ছু অসুবিধা হবে না আপনাদের।'

'ঠিক আছে বাইরেও খোঁজ করে দেখি একটু গাড়ি পাওয়া যায় কিনা।' অরুণাংশু বললেন।

'দেখতে পারেন। তবে ওরা কেউ আপনাদের মুক্তিনাথ পর্যন্ত নিয়ে যাবে না। পথে বার বার গাড়ি চেঞ্জ করতে হবে আপনাদের।'

'কেন?' প্রীতম জিজ্ঞেস করলেন অবাক হয়ে।

'এখানকার বেশিরভাগ গাড়ি বেনি পর্যন্ত যায়। তার ওপারে যাবার পারমিট নেই এদের। ওখান থেকে আবার গাড়ি করতে হবে আপনাদের। সে গাড়ি আবার যাবে জমসম অব্দি। তারপর আবার জিপ নিয়ে মুক্তিনাথ'—

'ওরেব্বাবা, সে তো মহা হ্যাপা', সুছন্দা বললেন, 'পর পর গাড়িগুলো না পাওয়া গেলে যে খুব বিপদ। পথেই বসে থাকতে হবে হা পিত্যেশ করে।'

'গাড়ি পেয়ে যাবেন', ছেলেটা বলল, 'কিন্তু লাগেজ নিয়ে বার বার ওঠা নামার ঝামেলাটা থেকেই যাবে।'

'ঝামেলার দরকার নেই মিস্টার রায়', পরিদাদু বললেন, 'বাইরের উটকো গাড়ি আমি আর নিতে চাইছি না। কার যে কী মতলব বোঝা তো যায় না। এমনিতেই একটা ঝামেলায় অজান্তেই জড়িয়ে পড়েছি আমরা। আর সে জন্যে আমাদের যথেষ্ট সাবধান থাকা প্রয়োজন। কাজেই এ ছেলেটি যেহেতু গভর্নমেন্টের অথরাইজড টুর অপারেটর, ওর তত্ত্বাবধানে যাওয়াটাই কিন্তু আমাদের পক্ষে সেফ হবে বলে মনে হয়।'

'কিন্তু গাড়ির রেটটা বড় চড়া হয়ে গেল না পরি, এ যে একেবারে হাতে মাথা কাটছে গো'— অরুণাংশু বললেন।

একটু বারগেন করো, আমার ধারণা হাজার পাঁচ সাত কমিয়ে দেবে ও। তাছাড়া অ্যামাউন্টটা আই সি তে কনভার্ট করে নাও মনে মনে, তাহলে আর এত বেশি মনে হবে না'। বলে পরিদাদু হাসলেন।

তাই হল। শেষমেশ চুয়াল্লিশে রফা করল লোকটা। পরিদাদুর দিকে চেয়ে বলল, 'আপনাদের যে কোনো একজন আমার সঙ্গে আসুন। কিছু কাগজপত্র ও ফর্ম্যালিটিজ আছে। সেগুলো সেরে ফেলতে হবে।'

'কতদূরে যেতে হবে' পরিদাদু জিজ্ঞেস করলেন।

'বেশি দূরে না, কাছেই', বলে হাসল লোকটা, 'এক্ষুনি হয়ে যাবে আসুন।'

'আমি আর মিস্টার রায় যাই নাকি?' বলে অন্যদের মুখের দিকে তাকালেন পরিদাদু।

'আমি যাব চলুন', বলে এগিয়ে এলেন উপল দত্ত।

'না থাক আপনার না যাওয়াই ভালো', পরিদাদু আপত্তি করলেন।

'আমিই যাব', উপল জেদ ধরলেন, 'প্রীতমকে দিয়ে হবে না পরিমলবাবু। ও বড্ড ভালোমানুষ। বিপদের গন্ধ মোটে বোঝে না। অথচ চোখ কান তো খোলা রাখতে হবে বলুন, চারদিকে সন্দেহভাজন লোক ঘুরে বেড়াচ্ছে। দেখলেই মনে হয় মিলিট্যান্ট। ও গেলে বিপদ হতে পারে।'

'আপনি গেলে বিপদ আরও বাড়তে পারে', পরিদাদু একটু কড়া গলাতেই বললেন এবার। উপল তবু শুনতে রাজি হলেন না। অগত্যা পরিদাদু সঙ্গে নিলেন তাঁকে। তারপর গাড়ির লোকটিকে বললেন, 'কী গাড়ি দেবেন, সুমো?'

'না, বোলেরো। ওই রাস্তায় বোলেরো বেটার হবে।'

'গাড়ি লাগাবেন কোথায়?'

'বলুন কোথায় দিলে সুবিধা হবে আপনাদের?'

'হোটেল লেক ভিউ।'

'তাই দেব। আধা ঘণ্টার মধ্যে আমি গাড়ি দিয়ে দিচ্ছি। আপনারা তৈরি হয়ে নিন', বলে অফিসের বাইরে এসে কালো রঙের একটা মোটর বাইকে উঠে পরিদাদুদের দিকে তাকিয়ে ইশারায় উঠে পড়তে বলল লোকটা। পরিদাদু উপল দত্তকে নিয়ে সেদিকে এগোতে এগোতে শাওনের দিকে তাকিয়ে বললেন,'তোরা আমাদের গাড়িতে উঠে তাড়াতাড়ি রওনা দে। প্রথমে আমাদের হোটেলে গিয়ে লাগেজগুলো গাড়িতে তুলে নিবি তারপর সোজা লেক ভিউ। একদম দেরি করবি না কিন্তু।'

'হোটেলের বিল তাহলে আমি দিয়ে দিচ্ছি', অরুণাংশু বললেন, 'রুম ডেলিভারি কী কী ছিল মনে আছে তোমার?'

'না', পরিদাদু হাত নাড়ালেন মাছি তাড়ানোর ভঙ্গিতে, 'ওরা যা বিল করে দিয়ে দিও। আর হ্যাঁ খুকু, চেক আউট করার সময় ভালো করে ঘরগুলো দেখে নিস কিছু পড়ে রইলো কিনা'—

'আচ্ছা', বলে মাথা নাড়লেন সুছন্দা।

পরিদাদু আর উপল বাইকে উঠে পড়লেন। অল্প ধোঁয়া ছেড়ে মৃদু একটু গর গর আওয়াজ করে মোটরবাইকটা চোখের আড়ালে চলে গেল। অরুণাংশু বললেন, 'আমাদেরও দেরি করে লাভ নেই। গাড়িতে উঠে পড়া যাক। তা নয়তো কাজ সেরে অহেতুক দাঁড়িয়ে থাকতে হবে ওদের।'

শাওন মাকে নিয়ে গাড়িতে বসে পড়ল। অরুণাংশু কাগজপত্রগুলো আর একবার চেক করে নিয়ে প্রীতমকে বললেন, 'চলুন'।

'চলুন', বলে গাড়ির দিকে পা বাড়ালেন প্রীতম রায়।

গাড়ি ছাড়ার পর থেকেই নিজের হ্যান্ডিক্যামে ছবি তুলছিলেন উপল। রাস্তার ছবি, রাস্তার পাশের গাছ, মানুষ, গ্রাম, নদী সবকিছুর ছবি। শাওন মাঝে মাঝেই তাকিয়ে দেখছিল তাঁকে। উনি কি পুরোপুরি সজ্ঞানে ছবিগুলো তুলছেন? অনেক এমন ছবি তিনি ক্যামেরাবন্দি করছেন যা তোলার মানেই হয় না। তবু কোনো কথা বলল না সে। অরুণাংশু একবার জিজ্ঞেস করলেন, 'কি এত ছবি তুলছেন মিস্টার দত্ত?'

'তুলছি কিছু, যা চোখের সামনে পড়ে', বলে চুপ করে গেলেন উপল। অরুণাংশুও আর কথা বাড়ালেন না। পরিদাদু একদম গম্ভীর হয়ে বসে আছেন। সুছন্দা বললেন, 'আচ্ছা প্রীতমবাবু, ব্যাপারটা কী করে সম্ভব বলুন তো। রুমের চাবি তো আপনার কাছেই ছিল?'

'হুঁ।'

'তাহলে আপনাদের রুমে লোক ঢুকল কেমন করে?'

'আমিও তো এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পাচ্ছি না ম্যাডাম।'

'আপনার ভুল হচ্ছে না তো কোথাও?'

'উহুঁ।'

'আমি তো ঘরে ঢুকেই বুঝলাম আমাদের দুজনের রুকস্যাক খুলে ঘাঁটা হয়েছে। এমনকি আমাদের বিছানা বালিশও। যেন অতি দ্রুত ঘর তোলপাড় করে কেউ কিছু একটা খুঁজে বেড়িয়েছে ঘরের মধ্যে।'

'অথচ হোটেলের রিসেপশন তো স্পষ্ট বলে দিল কেউ ভিতরে ঢোকেনি।'

'আরও আশ্চর্য, আমাদের কারও কিছুই খোয়া যায়নি ঘর থেকে।'

'রায় আঙ্কল, দত্ত আঙ্কলের টুপিটা কোথায় ছিল তখন?' শাওন জিজ্ঞেস করল।

'ওর রুকস্যাকের মধ্যেই।'

'ওটা আছে?'

'আছে', প্রীতম রায় নন, পরিদাদু উত্তর দিলেন, 'আর সে জন্যেই তো সব জট পাকিয়ে যাচ্ছে আবার। টুপিটা পাওয়া না গেলে রহস্যটা এত জটিল হয়ে যেত না।'

'আরও একটা গোলমেলে ব্যাপার আমার চোখে পড়েছে জানো তো পরিদাদু?'

'কী?'

'আমাদের গাড়িটা রওনা দেবার সময় সেই লোকদুটোকে আবার দেখলাম।'

'কাল বিকেলে যারা হোটেলের সামনে বাইক নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল।'

'ঠিক দেখেছিস?'

'কোনো ভুল নেই।'

'এখানকার অধিকাংশ মানুষ কিন্তু দেখতে একইরকম।'

'আমার ভুল হয়নি।'

'গুড', লোকগুলো কী করছিল দেখেছিস?'

'মনে হল আমাদের গাড়ির নাম্বারটা মোবাইলে নোট করে নিল।'

'কী করে বুঝলি?'

'আমি শিওর নই, আমার এটা মনে হল। ওরা আমাদের গাড়ির পিছনদিকেই ছিল। বারবার ওরা গাড়িটার দিকে চাইছিল আর মোবাইলে কী লিখছিল।'

'হুঁ' বলে চুপ করে রইলেন পরিদাদু।

অরুণাংশু বললেন, 'কী বুঝছো?'

'সবকিছু তালগোল পাকিয়ে যাচ্ছে অরুণ, একটার সঙ্গে আর একটা সূত্রকে কিছুতেই মেলাতে পারছি না আর'— বলে মাথাটাকে ডানদিক বাঁদিকে অসহায়ের মতন নাড়াতে লাগলেন পরিদাদু।

ঘণ্টা দুই তিন চলার পর রাস্তার অবস্থা সত্যিই খুব খারাপ হয়ে গেল। পুরো পথটাই ছোট বড় পাথরে বোঝাই। একদিকে রুক্ষ ক্ষয়ে ক্ষয়ে যাওয়া পাহাড় আর অন্যদিকে নীচে তুমুল শব্দ করে বয়ে যাওয়া নদী, এই দৃশ্যের মাঝমধ্যিখান দিয়ে গোঁ গোঁ আওয়াজ করতে করতে আর লাফাতে লাফাতে এগিয়ে চলেছে গাড়িটা। নদীর দিকে একটুক্ষণ চুপ করে তাকিয়ে থেকে চাপা গলায় শাওন অরুণাংশুকে জিজ্ঞেস করল,

'এটাই কি কালি গণ্ডকি?'

'হ্যাঁ। ছোট্ট জবাব দেন 'অরুণাংশু।

'নদীটায় খুব স্রোত তো, আর কী আওয়াজ'—আবার বলে শাওন।

'পাহাড়ি নদী এমনই তো হয় শাওনবাবু', প্রীতম রায় বললেন, 'এই নদীটাকে দারুণ এনজয় করবে যদি মারফা গ্রামে থাকো। কাগবেনি থেকেও ভালো লাগে বলে শুনেছি নদীটাকে।'

'কাগবেনি কি জমসমের আগে।'

'না। জমসম পেরিয়ে।'

'আচ্ছা আঙ্কল', শাওন আবার জিজ্ঞেস করল, 'এই কালি গণ্ডকি নদী কি মুক্তিনাথ থেকেই উৎপন্ন হয়েছে?'

'আমি তো জিওগ্রাফির লোক নই, সঠিক বলা মুশকিল, তবে যদ্দুর মনে হয় নদীটা তিব্বত থেকে আসছে।'

'ও'। বলে আবার বাইরে তাকায় শাওন।

উপল দত্তকে একটু অস্থির লাগছে এখন। হাতের হ্যান্ডিক্যামটা পাশে সিটের ওপর নামিয়ে রেখে ঝুঁকে পড়ে পায়ের কাছে রাখা হাত ব্যাগটায় কী যেন একটা কিছু খুঁজছিলেন উনি। সুছন্দা খুব মোলায়েম গলায় বললেন, 'কী খুঁজছেন আপনি উপলবাবু, আপনার কি কিছু হারিয়েছে মনে হচ্ছে?'

'উঁহু', একটা অদ্ভুত শূন্য দৃষ্টিতে সুছন্দার দিকে চেয়ে বললেন উপল, 'হারায় নি। তবে হারিয়ে যাবে। আমি জানি। ওরা ঠিক নিয়ে নেবে।'

'কী?' অবাক হয়ে বলেন সুছন্দা।

'আমার নতুন কেনা টুপিটা।'

'কারা নিয়ে নেবে?'

'সন্ত্রাসবাদীরা।'

'সন্ত্রাসবাদী এখানে কোথায়?'

'আছে। আপনারা দেখতে পাচ্ছেন না।'

উত্তরে সুছন্দা আবার কী একটা বলতে যাচ্ছিলেন, পরিদাদু তাঁকে থামিয়ে দিলেন। তারপর খুব আব্দারের ভঙ্গিতে বললেন, 'উপলবাবু, আপনার ওই টুপিটা আমায় একটু দেখতে দেবেন?'

পরিদাদুর দিকে একটুক্ষণ স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন তিনি। তারপর বললেন, 'আপনি আবার আমায় ওটা ফেরত দিয়ে দেবেন?'

'নিশ্চয়', পরিদাদু হাতটা তাঁর দিকে বাড়িয়ে দিলেন, 'প্রমিস'।

উপল পরিদাদুর দিকে সন্দিগ্ধভাবে তাকিয়ে রইলেন একটু। তারপর চাপা গলায় বললেন, 'ভয় পেয়ে ওদের দিয়ে দেবেন না তো টুপিটা?'

'না না। আমি আপনাকে কথা দিলাম যে'—

'ও কে, নিন'— বলে টুপিটা ব্যাগ থেকে বের করে পরিদাদুর দিকে বাড়িয়ে দিলেন তিনি।

'থাঙ্ক য়ু'— বলে টুপিটা হাতে নিয়ে গভীর মনোযোগের সঙ্গে নেড়ে চেড়ে দেখতে লাগলেন পরিদাদু। প্রীতম রায় মাথায় হাত দিয়ে বসেছিলেন। উপলকে নজর করছিলেন তীক্ষ্ন চোখে। পরিদাদুর সঙ্গে ওঁর কথোপকথন শুনতে শুনতে দীর্ঘশ্বাস ফেলে অরুণাংশুকে বললেন তিনি, 'উপলের ব্যাপারটা আমার মোটেও ভালো লাগছে না। ওর আচরণ ক্রমশই যেন কীরকম অস্বাভাবিক হয়ে যাচ্ছে। যে উপলকে আমি চিনি, তার সঙ্গে এই মানুষটাকে যেন মেলানোই যাচ্ছে না। খুব টেনশন হচ্ছে আমার। কী করে ওকে যে সুস্থ শরীরে বাড়ি নিয়ে যাব'—

'টেনশন করবেন না প্লিজ', সুছন্দা বললেন আন্তরিকভাবে, 'কিচ্ছু হবে না ওঁর দেখবেন। আর এত ভাবছেন কেন, আপনি তো একা নন, আমরা সবাই আপনার সঙ্গে আছি।'

অরুণাংশু একদৃষ্টিতে পরিদাদুর দিকে চেয়েছিলেন। এখন জিজ্ঞেস করলেন, 'টুপিটার মধ্যে এক্সট্রা অরডিনারি কিছু পেলে পরি?'

'উঁহু'। দুদিকে মাথা নাড়লেন পরিদাদু। তারপর টুপিটা বাড়িয়ে দিলেন উপল দত্তের দিকে। উপল টুপিটা হাতে পেয়ে নিশ্চিন্ত হয়ে সেটাকে মাথায় চাপিয়েই বসে রইলেন গাড়ির ভিতরে।

তাতোপানি পৌঁছতে পৌঁছতেই বেলা গড়িয়ে গেল। এখান থেকে জমসম আরও অনেকটা পথ। ড্রাইভার রেশম বাহাদুর জানালো জমসম পৌঁছতে অনেক রাত হয়ে যাবে। অরুণাংশু জিজ্ঞেস করলেন, 'কী করা উচিত আমাদের রেশম ভাই, রাত নেমে যাওয়ার পর আর এগোনো কি ঠিক হবে?'

রেশম ভরাট গলায় জানালেন, 'আপ কা মরজি সাব, আমায় বললে আমি এগিয়ে যাব। তবে পাহাড়ি রাস্তায় রাতে গাড়ি চালানো সবসময়েই বিপজ্জনক। আর এই রাস্তায় বিপদ আরও বেশি, কেননা রাস্তার যা অবস্থা তাতে দিনে গাড়ি চালানোও কম বিপজ্জনক নয়।'

তাতোপানিতে নেমে দেখার কথা ছিল। এখানে একটা হট স্প্রিং আছে। জমসম যাওয়ার পথে ডান দিকে পড়ে। পরিদাদু বললেন, 'হট স্প্রিং দেখার জন্যে নামার দরকার নেই। রাত হয়ে যাচ্ছে এমনিতেই। আমরা বরং যতটা পারি এগিয়ে থাকি।'

অতএব গাড়ি থেকেই তাতোপানি দেখতে হল শাওনকে। দেখার পরে অবশ্য নেমে না দেখার জন্যে আফশোস থাকল না শাওনের। ফাঁকা জায়গায় ছোট্ট হট স্প্রিংটা একলা একলা অপেক্ষায় রয়েছে পথিকের জন্যে। অথচ কেউ তার কাছে নেই। ওর চেয়েও বড় গরম জলের কুণ্ড আগে অনেকবার দেখা হয়েছে। অবশেষে ঘাসা পৌঁছে গাড়ি দাঁড় করাতে বললেন পরিদাদু। অন্যেরাও বলছিলেন অনেকক্ষণ একনাগাড়ে গাড়ি চড়া হচ্ছে, কাজেই এবার একটু নামা দরকার গাড়ি থেকে। উপল দত্ত কথা প্রায় বলছেনই না। গাড়ি থামতেই পরিদাদুকে জিজ্ঞেস করলেন, 'এখানে কি চা পাওয়া যাবে?'

'সম্ভবত যাবে, চলুন দেখা যাক নেমে,' বলে গাড়ি থেকে নেমে উপলবাবুর দিকে হাত বাড়িয়ে দিলেন তিনি, 'আসুন'—

উপল নামলেন। সন্ধে পেরিয়ে গেছে তখন। তবুও মাথায় টুপিটা রয়েছে তাঁর। প্রীতম বললেন, 'টুপিটা খোলো এবার'— তাঁর কথাটা পাত্তাই দিলেন না উপলবাবু। বরং মাথায় টুপিটা আরও শক্ত করে চেপে বসিয়ে দিলেন তিনি। রাস্তার পাশের একটা ছোট্ট দোকানে এসে বসলেন সবাই। আরও একটা গাড়ি এসময় এসে থামল সেখানে। একজন ফরসা লোক গাড়ি থেকে নেমে এলেন। গায়ে টি শার্ট এবং পরনে জিন্সের বারমুডা। ফ্রেঞ্চ কাট দাড়ি, চোখে চশমা। কোমরে আটকানো কালো রঙের চামড়ার পাউচ থেকে সিগারেট আর দেশলাই বের করলেন ভদ্রলোক। তারপর দেশলাই—এর ওপর সিগারেটটা আলতো করে ঠুকতে ঠুকতে পরিদাদুর কাছে এগিয়ে এসে বিশুদ্ধ ইংরেজিতে জিজ্ঞেস করলেন, 'কোত্থেকে আসছেন?'

'কলকাতা'। পরিদাদু হেসে বললেন, 'আপনি'?

'দেরাদুন।'

'ও।'

'মুক্তিনাথ চললেন তো'? আবার জিজ্ঞেস করলেন ভদ্রলোক।

'হ্যাঁ।'

'অন্ধকার নেমে এল যে, থাকবেন কোথায়?'

'দেখি', পরিদাদু মাথার ওপরে দু—হাত তুলে আড়মোড়া ভাঙলেন, 'জমসম পর্যন্ত যাবার ইচ্ছেই তো ছিল'—

'পারবেন না', ভদ্রলোক হাসলেন, 'জমসম এখনও অনেক পথ। আমি ভাবছি কালোপানিতে নাইট স্টে করব আজ। আপনারাও ওখানে থেকে যেতে পারেন ইচ্ছে করলে। ও জায়গাটাও মন্দ না'—

'আপনি আগে গেছেন ওদিকে?'

'অনেকবার। আমি সুযোগ পেলেই চলে আসি এদিকে। খুব ভালো লাগে আমার এ অঞ্চলটা। আমি তো মারফা গ্রামে বেশ কিছুদিন কাটিয়ে গিয়েছিলাম আগের বার। বিউটিফুল জায়গা। এ বারেও তো ভাবছি'—

'আমাদেরও এরকম ইচ্ছে ছিল, আই মিন আমার আর উপলের, কিন্তু হল না'.. প্রীতম রায় বললেন।

'কেন'? অবাক হওয়া গলায় জিজ্ঞেস করলেন ভদ্রলোক।

'আমার বন্ধু উপলের শরীরটা হঠাৎ বিট্রে করল', বলে উপলের দিকে চাইলেন প্রীতম।

'কী প্রোব্লেম?'

'এপিলেপ্টিক সিম্পটম, সঙ্গে পারসিয়ালি মেমোরি লস'—

'আই সি', বলে চায়ের অর্ডার দিয়ে দোকানের মধ্যে ঢুকে গেলেন ভদ্রলোক।

উপল খুব অস্থিরভাবে পায়চারি করছিলেন। মাঝে মাঝেই দোকানের ভিতর ও বাইরের লোকগুলোকে সরু চোখে দেখছিলেন তীক্ষ্ন দৃষ্টিতে। একসময় চাপা গলায় পরিদাদুকে বললেন, 'তাড়াতাড়ি গাড়িতে উঠে পড়ুন, জায়গাটা মোটেই সুবিধের ঠেকছে না। সব লোক এখানে ট্রেচারস'—

পরিদাদু বললেন, 'এক্ষুনি উঠে যাবো মিস্টার দত্ত, চা খাওয়া হয়ে গেলে এক মুহূর্তও দাঁড়াব না এখানে।'

'গুড', বলে চারদিকটা একবার সাবধানী দৃষ্টিতে দেখে নিলেন উপল দত্ত। তারপর পরিদাদুকে বললেন, 'একটু আসছি।'

'কোথায় চললেন আপনি?' দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হয়ে জিজ্ঞেস করলেন পরিদাদু।

'টয়লেট', বলে সামনে পা বাড়ালেন উপল।

'সাবধানে, দূরে যাবেন না কিন্তু', অরুণাংশু বললেন।

'চিন্তা নেই, ঠিক আছি আমি, দু—মিনিটের মধ্যে চলে আসবো। আপনারা বরং চোখ কান খোলা রাখবেন', বলতে বলতে আবছা অন্ধকারে মিলিয়ে গেলেন উপল দত্ত।

প্রীতম রায় পরিদাদুর পাশে এসে দাঁড়ালেন। চিন্তিতভাবে বললেন, 'ওকে একা একা না ছাড়লেই বোধহয় ভালো হত পরিমলবাবু। ও তো ঠিক সুস্থ নেই, আমার কেমন যেন মনের মধ্যে একটা চাপা টেনশন হচ্ছে।

বাই চান্স যদি আবার কনভালশন হয়ে যায়, টাল সামলাতে না পেরে যদি— এদিকে গভীর খাদ। আমি বরং একটু এগিয়ে দেখি।'

'চলুন আমিও যাই আপনার সঙ্গে', অরুণাংশু বললেন, 'পিছনের সিটে বসেছিলাম তো, এত জার্কিং হচ্ছিল যে গা গতরে একেবারে ব্যথা হয়ে গেছে মশাই। আপনার সঙ্গে গেলে তবু দু—চার পা হাঁটাহাঁটি হবে। তাতে যদি কোমরের জং ছাড়ে একটু'—

'চলুন', আপত্তি করেন না প্রীতম।

পরিদাদু বললেন, 'আকাশ পরিষ্কার বলে হালকা আলোটা আছে, তবু ব্যাগ থেকে টর্চটা বের করে নিয়ে যাও অরুণ। ওটা কাজে লেগে যেতে পারে। অরুণাংশু শাওনের দিকে চাইলেন, 'টর্চটা বের করে দে তো শানু কোথায় আছে'—

শাওন গাড়ির মধ্যে থেকে টর্চটা বের করে এনে অরুণাংশুর হাতে দিল। পরিদাদু বললেন, 'এতক্ষণে তো ওঁর ফিরে আসার কথা। এত দেরি হবার কথা তো নয়।'

প্রীতম এবং অরুণাংশু রওনা দেবার তিন মিনিটের মধ্যে অরুণাংশুর চিৎকার কানে এল। খুব উত্তেজিত গলায় পরিদাদুর নাম ধরে ডাকছিলেন তিনি। পরিদাদু দৌড়লেন সেই ডাক শুনে। সুছন্দা ভয় পাওয়া গলায় বললেন, 'নিশ্চিত উপলবাবুর কোনো বিপদ হয়েছে। চল শানু আমরাও এগিয়ে গিয়ে দেখি কী ব্যাপার।'

ড্রাইভার রেশম বাহাদুর গাড়ির গায়ে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে বোতল থেকে জল খাচ্ছিল। চিৎকার শুনে সেও এগিয়ে এল শাওনদের কাছে। সুছন্দার দিকে চেয়ে জিজ্ঞেস করল, 'ক্যা হুয়া, এনি প্রবলেম?'

সুছন্দা সংক্ষেপে উপলবাবুর অসুস্থতা আর অরুণাংশুর চিৎকারের কথা বলায় সে বলল, 'চলিয়ে, আমিও আপনাদের সঙ্গে যাচ্ছি।'

উপল দত্ত রাস্তার পাশে কাত হয়ে শুয়ে ছিলেন পাহাড়ের একটা খাঁজে পা ভাঁজ করে। পরিদাদু তাঁর মুখের ওপর ঝুঁকে পড়ে বললেন, 'সেন্স হারিয়েছেন। একটু জল দরকার।'

অরুণাংশু টর্চের আলোটা চারদিকে একবার ঘুরিয়ে নিয়ে বললেন, 'এখানে তো পাওয়া যাবে না। আমাদের দোকানের কাছে যেতে হবে।'

রেশম বাহাদুর এগিয়ে এলেন সেই সময়েই। হাতে ধরা জলের বোতলটার ছিপি খুলে পরিদাদুর দিকে এগিয়ে দিয়ে বললেন, 'সাব, এ লিজিয়ে পানি'—

চোখে মুখে একটু জলের ছিটে দিতেই উপলবাবু চোখ মেললেন। তাঁর চোট গুরুতর নয়। কিছুক্ষণের মধ্যেই সুস্থ হয়ে গেলেন তিনি। হাতে আর পায়ে হালকা চোট লেগেছে পড়ে গিয়ে। উপল বললেন, 'অসুবিধে নেই'। প্রীতম উদ্বিগ্ন স্বরে জিজ্ঞেস করলেন, 'পড়ে গেলে কী করে, আবার কি শরীরটা খারাপ হয়েছিল?'

'উঁহু, উপল দত্ত একটু ভেবে বললেন, 'আমি টয়লেট করে ফিরছিলাম। হঠাৎ ওপর থেকে একটা পাথর গড়িয়ে এল। আর একটু হলে আমার মাথাতেই পড়ত। ভাগ্য জোরে বেঁচে গেছি এ যাত্রা বুঝলে প্রীতম ভায়া, আমার মরণ এত তাড়াতাড়ি হচ্ছে না বোধহয়।'

প্রীতম হালকা হাসলেন। সুছন্দা এবং অরুণাংশুও। পরিদাদু কিন্তু হাসলেন না। শাওন তাকিয়ে ছিল তাঁর দিকে। পরিদাদুকে চিন্তিত দেখাচ্ছিল খুব। রেশম বাহাদুর তাড়া দিল, 'দেরি হয়ে যাচ্ছে, সাব চলিয়ে আভি'—

গাড়ির দিকে এগোতে এগোতে পরিদাদু বলে উঠলেন, 'উপলবাবু, আপনার টুপি?'

'তাইতো, আমার টুপিটা কোথায় গেল', বলে অসহিষ্ণু হয়ে মাথায় হাত দিয়ে পায়চারি করতে লাগলেন তিনি। পরিদাদু বললেন, 'শানু চল তো একবার, উপলবাবু যেখানে পড়ে গিয়েছিলেন সে জায়গাটা আর একবার খুঁজে দেখে আসি। টুপিটা যদি পাওয়া যায়'—

টুপিটা অবশ্য আর পাওয়া গেল না। শাওন এবং পরিদাদু তন্ন তন্ন করে আশপাশটা খোঁজার পরেও। গাড়িতে উঠে প্রথমটা খুব স্বাভাবিক আচরণই করছিলেন উপল, কিন্তু একটু পর থেকেই আবার তাঁর আচরণে অস্বাভাবিকতা ফুটে উঠতে শুরু করল। একসময় পরিদাদুর দিকে তাকিয়েই হিংস্রভাবে বলে উঠলেন তিনি, 'আপনাকে চিনতে ভুল হয়েছিল আমার। আপনিই আসলে পালের গোদা, উগ্রপন্থীদের নেতা আপনি। শেষপর্যন্ত আমার টুপিটা আপনিই চুরি করে নিয়েছেন সুযোগ বুঝে'। শাওনের খুব খারাপ লাগল কথাটা শুনে। অরুণাংশু বোঝানোর চেষ্টা করলেন তাঁকে, কিন্তু কাজ হল না। প্রীতম হাত জোড় করে ক্ষমা চাইলেন পরিদাদুর কাছে লজ্জিত হয়ে। পরিদাদু অপ্রস্তুত হয়ে বললেন, 'ছি ছি এমন করছেন কেন, আমরা তো সবাই জানি উনি সুস্থ নন। আপনি তো সুস্থ। আপনিও যদি এমন করেন তাহলে তো বিপদের কথা মশাই।'

শাওনদের নিয়ে গাড়ি যখন কালোপানি পৌঁছল তখন রাতের অন্ধকার নেমেছে। টিপ টিপ করে বৃষ্টিও শুরু হয়েছে তখন। ড্রাইভার সাহেব জানাল, 'এ অবস্থায় আর এগোনো ঠিক হবে না।' পরিদাদুও তার কথায় সায় দিলেন। রাস্তার বাঁ দিক ঘেঁষে গাড়ি দাঁড় করিয়ে দেওয়া হল। পাশেই একটা ছোট্ট রেস্টুরেন্ট, আর তার লাগোয়া থাকবার জায়গা।

পরিদাদু বললেন— 'আজ রাতটা এখানেই কাটিয়ে দেওয়া যাক।'

অরুণাংশুও বললেন, 'ভালো হোটেলের কমফোর্ট তো আর এখানে এক্সপেক্ট করা যাবে না, কাজেই মন্দ কী—

রেস্টুরেন্টে ঢুকেই ঘাসায় আলাপ হওয়া সেই ভদ্রলোককে দেখতে পেল শাওন। চেয়ারে বসেছিলেন তিনি কফির মাগ হাতে। শাওনরা ঢুকতেই হাত নাড়ালেন তিনি শাওনের দিকে, 'ওয়েলকাম মাই বয়'। শাওন হাসল তাঁর দিকে চেয়ে। অন্যদের দিকে চেয়ে তিনি বললেন, 'ফ্রেশ হয়ে চলে আসুন। ডিনারের অর্ডার দিয়ে এখানে বসে এক কাপ করে কফি খেয়ে নিন। এতটা জার্নি করে এসেছেন তো গরম কফি খেতে ভালো লাগবে দেখবেন। তাছাড়া কফিটা সত্যি ভালো বানায়ও এরা।'

'আসছি। চেঞ্জ করে নিই আগে,' পরিদাদু বললেন, 'ব্যাগ খুলে সোয়েটারও বের করতে হবে একটা। বেশ ঠান্ডা লাগছে এখানে।'

শাওন জিজ্ঞেস করল, 'পরিদাদু, এই জায়গাটার হাইট কেমন হবে?'

পরিদাদু একটু চিন্তা করে বললেন, 'জমসম দু—হাজার সাতশো মিটারের কিছু বেশি। তার মানে এখানকার হাইট দু—হাজার একশ দেড়শ মিটারের কাছাকাছি হবে হয়তো।

অন্য একটা টেবিলে দুজন স্থানীয় লোক বসে কিছু একটা পানীয় খাচ্ছিল আর আড়চোখে শাওনদের দেখছিল মাঝেমাঝে। শাওন সেদিকে পরিদাদুর দৃষ্টি আকর্ষণ করার চেষ্টা করায় পরিদাদু একবার চাইলেন সেদিকে তবে খুব একটা গুরুত্ব দিলেন বলে মনে হল না। উপল বাবু সেই লোকদুটোকে দেখে একটু ভয় পেয়ে গেলেন। তারপর পরিদাদুর দিকে চেয়ে চেঁচিয়ে উঠলেন, 'আমায় এতদূরে ধরে নিয়ে এলেন কেন? আমার টুপিটা তো নিয়ে নিয়েছেন, এবার আমায় যেতে দিন। বিশ্বাস করুন বাড়িতে অনেক কাজ পড়ে রয়েছে আমার। তাছাড়া আমায় গুম করে কী লাভ আপনার? কেন আমায় মেরে ফেলতে চাইছেন আপনারা?'

প্রীতম জোর করে তাঁকে ঘরে নিয়ে গেলেন। শাওনও তার মা বাবা আর পরিদাদুর সঙ্গে রেস্টুরেন্ট পেরিয়ে ভিতরে পা বাড়ালো ঘরে যাবার জন্যে। ভিতরে ছোট্ট একটা উঠোন। উঠোনের একপাশে বাথরুম আর অন্য পাশে ইংরেজি এল অক্ষরের মতন সাজানো পাশাপাশি পাঁচ ছটা ঘর। একদিকের দুটো ঘর পরিদাদু নিলেন। তার পাশের দুটো ঘরে বাড়ির মালিকের থাকার বন্দোবস্ত। একটা ঘর প্রীতমদের জন্যে আর তার পাশে উঠেছেন ঘাসার সেই ভদ্রলোক। বাকি যে দুজন দোকানে রয়েছে তারা কোন ঘরে থাকবে কে জানে। অন্য কোনো ঘর অন্য কোনোদিকে আছে কি না জানা নেই। অথবা খেয়ে দেয়ে হয়তো চলে যাবে ওরা। সুছন্দা ঘরে ঢুকেই বললেন, 'শানু, বাইরে বেশ ঠান্ডা। গরম টুপি বের করে দিচ্ছি, মাথায় দিয়ে নে।'

টুপির কথা উঠতেই অরুণাংশু বললেন, 'যাই বলো পরি, উপলবাবুর টুপিটা খোওয়া যাওয়ায় একদিক দিয়ে অন্তত নিশ্চিন্ত হওয়া গেছে।'

'কোন দিক দিয়ে গো?' ব্যাগ থেকে জামাকাপড় বের করতে করতে বললেন সুছন্দা।

টুপির জন্যে যে লোকগুলো অ্যাদ্দিন ধাওয়া করছিল আমাদের, তারা হয়তো ক্ষান্ত দেবে এবার। বাকি ট্যুরটা এবার খোলা মনে বেড়ানো যাবে।'

'আচ্ছা এমনও তো হতে পারে, উপল আঙ্কল যে টুপিটা পরিদাদুকে গিফট করেছেন সেটাই হয়তো ওই লোকটার টুপি। পরিদাদুর কাছে থাকা টুপিটাই হয়তো হন্যে হয়ে খুঁজে বেড়াচ্ছে লোকগুলো'—

শাওনের দিকে একটুক্ষণ হাঁ করে তাকিয়ে থাকলেন পরিদাদু। তারপর বললেন, 'আমি সত্যি সত্যিই বোকা কূলচূড়ামণি রে শাওন। আমার মাথাটা একেবারে গোবরে ঠাসা হয়ে গেছে। এতকিছুর মধ্যে এই সরল সম্ভাবনাটার কথা একবারও মাথায় এল না আমার। টুপিটা হাতে পেয়ে আহ্লাদে আটখানা হয়ে সেই যে ব্যাগে পুরে দিলাম, ওটার কথা মাথা থেকেই বেরিয়ে গেল একেবারে'। পরিদাদু ব্যাগটা তুলে নিয়ে ব্যস্ত হয়ে ছুটলেন নিজের ঘরের দিকে।

১০

ফ্রেশ হয়ে জামা প্যান্ট পালটে গায়ে সোয়েটার এবং মাথায় টুপি চাপিয়ে শাওন যখন পরিদাদুর ঘরে ঢুকল পরিদাদু তখনও টুপিটা হাতে নিয়ে সিঙ্গল তক্তোপোষের শক্ত বিছানার ওপর চুপ করে বসে আছেন। শাওন কাছে গিয়ে দাঁড়াতে প্রথমটা কোনো কথাই বললেন না তিনি। তারপর ধীরে ধীরে বললেন, 'আমাকে টুপিটার কথা মনে করিয়ে দিয়ে আজ যে উপকার তুই করেছিস তার জন্যে তোর একটা ভালো প্রাইজ পাওনা হল শানু, আমি কথা দিচ্ছি ঠিক সময়ে ওটা তোকে আমি দিয়ে দেব।'

পরিদাদুকে খুব উত্তেজিত মনে হচ্ছিল শাওনের। সে পরিদাদুর কাছে গিয়ে বসে পড়ল। জিজ্ঞেস করল, 'পরিদাদু, এই টুপিটাই?'

'হ্যাঁ।'

'কী করে বুঝলে?'

'হাতে নিলেই বোঝা যায় যদি বোঝার চোখটা থাকে।'

'কী রকম?' অবাক হয়ে বলে শাওন।

'এই দ্যাখ', বলে টুপিটা উলটে দিলেন পরিদাদু। তারপর শাওনের সামনে টুপিটা এগিয়ে দিয়ে বললেন,

'কী দেখছিস?'

'কী?' অবাক হয়ে বলে শাওন।

'টুপিটার বাইরে যেখানে বর্ডার দেওয়া তার ভিতর দিকের অংশটা দ্যাখ ভালো করে।'

শাওন দেখল। পরিদাদু বললেন, 'একটা কালচে দাগ গোল হয়ে লেগে আছে টুপিটার মধ্যে দেখেছিস?

দাগটা এবার চোখে পড়ল শাওনের। ব্যবহৃত টুপিতে ঘাম আর তেলে এমন দাগ হয়। শাওন উত্তেজিত হয়ে বলল, 'এই টুপিটা নতুন নয়। এটা ব্যবহার করা হয়েছে।'

'বুঝেছিস তো?'

'হ্যাঁ, এই যে মাথার তেল আর ঘামের হালকা দাগ রয়েছে। তবে এ টুপিটাও খুব পুরোনো নয়। তাহলে টুপিটা এত চকচকে থাকত না, আর দাগটাও আরও প্রমিনেন্ট হত।'

'গুড।'

'কিন্তু এই টুপিটায় কী এমন আছে পরিদাদু যার জন্যে এমন মরিয়া হয়ে খুঁজছে ওরা'—

'সেইটাই তো কথা শানুবাবু', পরিদাদু হাসলেন, 'টুপিটা যে আমার জিম্মাতেই আছে এবং এখনও ওদের হাতে পৌঁছয়নি এর জন্য ঈশ্বরকে ধন্যবাদ দে।'

শাওন উত্তেজিত বোধ করল মনে মনে। নিশ্চিত একটা কোনো বড়সড় রহস্য দানা বেঁধে উঠেছে টুপিটাকে কেন্দ্র করে। শাওনের বার বার মনে হচ্ছিল পরিদাদু অবশ্যই সেই রহস্যের সন্ধান পেয়ে গেছেন। শাওন নিজের কৌতূহল আর চেপে রাখতে পারল না। গোল গোল চোখ করে সে পরিদাদুকে জিজ্ঞেস করল, 'তুমি কি টুপিটার মধ্যে লুকিয়ে থাকা রহস্যের সন্ধান পেয়ে গেছ পরিদাদু?'

'হ্যাঁ।' পরিদাদু সংক্ষিপ্ত উত্তর দিলেন।

'কী সেই রহস্য?' আবার জিজ্ঞেস করে শাওন।

পরিদাদু টুপিটা শাওনের হাত থেকে নিজের হাতে নিলেন। তারপর টুপিটা উলটে নিয়ে যত্ন করে রাখলেন নিজের কোলের ওপরে। এতক্ষণে অরুণাংশু আর সুছন্দাও এসে দাঁড়িয়েছেন ঘরের মধ্যে। পরিদাদু টুপিটার মধ্যে হাত গলিয়ে দিয়ে ছোট্ট, প্রায় চোখেই পড়ে না এমন একটা চেন ধরে টান দিলেন। টুপির মধ্যে বাড়তি কাপড়ের টুকরো দিয়ে বানানো এটা আসলে একটা গোপন পকেট। টুপির রঙের সঙ্গে মিলিয়ে কাপড়টা এমনভাবে আটকানো যে সহজে নজরেই আসবে না কারো।

অরুণাংশু বললেন, 'কী আছে ওই লুকোনো পকেটে, হীরে টিরে নাকি?'

'অথবা সোনার বিস্কুট'— সুছন্দাও তাঁর অনুমানের কথা জানালেন।

'উঁহু, দু দিকে মাথা নাড়লেন পরিদাদু, 'তার চেয়েও অনেক বেশি মারাত্মক জিনিস।'

'কী এমন মারাত্মক জিনিস রাখা আছে পরিদাদু এই লুকোনো খোপটার মধ্যে?' জিজ্ঞেস করল শাওন অবাক হয়ে।

'একটা সংকেত।'

'সংকেত?' অরুণাংশু জিজ্ঞেস করেন আবার, 'কীসের সংকেত?'

'একটা ভয়ংকর ষড়যন্ত্রের', বলে সেই লুকোনো পকেটের মধ্যে রোল করে রাখা একটা কাগজ দু—আঙুলে ধরে বের করে আনলেন পরিদাদু। তারপর কাগজটা সোজা করে মেলে ধরলেন সকলের চোখের সামনে। কাগজের ওপরে বাঁ দিকে গোটা গোটা ইংরেজি অক্ষরে 'কিং লায়ন' কথাটা লেখা আছে পড়া গেল। কিন্তু তারপর থেকে পাতাজোড়া কিছু দুর্বোধ্য সংকেত। সেগুলো কোথাও কোথাও বাচ্ছা ছেলে মেয়ের অপটু হাতে আঁকা হিজিবিজি ছবির মতন, আবার কোথাও দেখলে মনে হচ্ছে যেন টুকরো টুকরো কিছু রুট ম্যাপ।

সুছন্দা হতাশ গলায় বললেন, 'এ আবার কী গো পরিকাকু, শেষপর্যন্ত এই ছাইপাঁশ ছবি আঁকা কাগজের টুকরোর জন্যে লোকগুলো এত কাণ্ড করল?'

'এটা ছাইপাঁশ কাগজ নয় রে খুকু, এ কাগজটা অত্যন্ত জরুরি এবং গোপন বার্তা সম্বলিত', চিন্তিত মুখে বললেন পরিদাদু।

'মানে?' উত্তেজিত গলায় বললেন অরুণাংশু।

'চিঠিটা যে কোড ল্যাংগুয়েজে লেখা তা তো বুঝতেই পারছ, আর সৌভাগ্যবশত ডিফেন্সে বেশ কিছুদিন চাকরি করার সুবাদে এই কোড ল্যাংগুয়েজের অনেকখানিই আমি ডিকোড করতে পারছি'—

'বলো কী গো পরিকাকু, ওই হিজিবিজি ছবিগুলোর মানে বুঝে ফেলেছো তুমি?' অবিশ্বাসের সঙ্গে বলেন সুছন্দা।

'পুরোটা না হলেও অনেকখানিই, আর যতটুকু বুঝতে পেরেছি আপাতত সেটাই যথেষ্ট অ্যালার্মিং'—

'কী আছে ওতে পরিদাদু?' শাওন কৌতূহলী হয়ে জিজ্ঞেস করে।

'একটা সিরিয়াল ব্লাস্টিং এর পরিকল্পনা। ভারতে। আগামী মাসের মাঝামাঝি।'

'সর্বনাশ'। অরুণাংশু আঁতকে উঠলেন কথাটা শুনে।

'আরও আছে'। পরিদাদু বললেন চাপা গলায়, 'কিং লায়নকে ওরা গুহা থেকে জঙ্গলের গভীরে যেতে নির্দেশ দিচ্ছে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব। আর'— বলেই কথা থামিয়ে লাফিয়ে উঠলেন পরিদাদু। আর তখনই দরজার বাইরে একটা আবছা ছায়া সাঁৎ করে সরে গেল অন্যদিকে। হালকা স্বরে 'কে'— বলে উঠেই কাগজটা সন্তর্পণে জামার বুক পকেটে ঢুকিয়ে নিয়ে পরিদাদু দরজা দিয়ে দ্রুত ছুটলেন বাইরের দিকে।

দরজার বাইরে একটু দূরে উঠোনের খোলা জায়গায় হাসি হাসি মুখে ঘাসায় আলাপ হওয়া সেই ভদ্রলোক দাঁড়িয়ে ছিলেন চুপ করে। পরিদাদুকে হন্তদন্ত হয়ে দরজা দিয়ে বাইরে বেরোতে দেখে খুব স্বাভাবিক গলায় জিজ্ঞেস করলেন, 'এনি প্রবলেম?'

'না তো', বলে তাঁর দিকে স্থির চোখে একটুক্ষণ তাকিয়ে রইলেন পরিদাদু। তারপর ঠান্ডা গলায় বললেন, 'আপনি একা একা এখানে এভাবে দাঁড়িয়ে কী করছেন?'

'আমি তো একাই', ভদ্রলোক আবার হাসলেন, 'আপনার সেই সঙ্গীর কী খবর, যিনি অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন।'

'আছেন মোটামুটি, কেন বলুন তো?'

'এমনিই, খোঁজ নিচ্ছিলাম আর কী। আপনাদের সঙ্গে আলাপ হল পথে। আর উনি ওরকম— আচ্ছা ঘাসায় দুম করে উনি অমন পড়ে গিয়েছিলেন কেমন করে?'

'অন্ধকারে পা পিছলে গিয়েছিল বোধহয়', পরিদাদু হাত নেড়ে বললেন, 'এখন চলি, ওঁরা কেমন আছেন খোঁজ খবর নিয়ে আসি একটু।'

'আসুন। ডিনারে আসছেন তো, তাড়াতাড়ি আসবেন। এখানে একটু রাত হলে কিন্তু কিছুই পাবেন না আর। আপনার সঙ্গে খাওয়ার পরে গল্প করা যাবে। একটা ভালো জিনিস দেখাব তখন আপনাকে।'

'কী জিনিস?' পরিদাদু চোখ সরু করে জিজ্ঞেস করলেন।

'ওটা তখনই বলব, এখন থেকে বলে রেখে আলটিমেটলি যদি দেখাতে না পারি'—

'ও কে।'

'আসবেন তো?'

'আসব'। বলে পরিদাদু প্রীতমদের ঘরের দিকে হাঁটতে লাগলেন ধীর পায়ে। দরজায় মৃদু নক করতেই প্রীতম দরজা খুলে দিলেন। পরিদাদু জিজ্ঞেস করলেন, 'উনি কেমন আছেন?'

'ওকে দেখে আর ওর কথা শুনে মনে হচ্ছে ওর সামহাউ মেমোরি লস হয়ে যাচ্ছে মাঝে মাঝে। তখন আমাকেও চিনতে পারছে না ঠিক ঠাক। আমি ওকে ট্র্যাঙ্কুলাইজার দিয়েছি। ও ঘুমোচ্ছে। ভাবছি নিজে থেকে না উঠলে খাবার জন্যে ওকে আর ডাকব না।'

'আপনি খেতে আসবেন তো?'

'দেখি।'

'আপনি কি একটু আগে আমাদের ঘরের দিকে গিয়েছিলেন?'

'আমি', অবাক হয়ে বললেন প্রীতম, 'কই না তো'—

'আচ্ছা, ঠিক আছে। রেস্ট করুন। উপল বাবুর খেয়াল রাখবেন।'

'রাখব', প্রীতম হাসলেন, 'একটা ঝামেলা তো এখন গেছে। কাজেই অনেক নিশ্চিন্ত লাগছে। বাপরে একটা টুপি নিয়ে যা কাণ্ড হল, টুপিটা গিয়ে থেকে সত্যি বলতে কি একটু রিলিভড ফিল করছি মশাই'—

পরিদাদু হাসলেন, 'দেখা যাক কী হয়, আসি এখন।'

পরিদাদু ঘরে ফিরতেই অরুণাংশু জিজ্ঞেস করল, 'কী ব্যাপার পরি, কী বুঝলে?'

'কিছু জায়গা এখনও বোঝা যাচ্ছে না অরুণ, অথচ জট খোলার জন্যে এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুব জরুরি',

পরিদাদু ঘরের মধ্যে পায়চারি করতে করতে বলতে লাগলেন।

'কী এমন প্রশ্ন গো পরিকাকু যার জন্যে এতো দুশ্চিন্তা করছ তুমি?' সুছন্দা জিজ্ঞেস করলেন।

'বলব। কিন্তু তার আগে একটা ফোন করা দরকার'। পরিদাদু অস্থির হয়ে বললেন।

'কাকে?' অরুণাংশু জিজ্ঞেস করলেন।

'তোমরা চিনবে না। আমার এক বন্ধু, শ্রীবাস্তব। ও এন এস জি তে আছে এখন। ওর হেল্প পেলে বড় সুবিধে হত এ সময়ে।'

'এন এস জি টা কী পরিদাদু?' শাওন জিজ্ঞেস করল।

'ন্যাশনাল সিকিউরিটি গ্রুপ', পরিদাদু বললেন থেমে থেমে, 'কিন্তু মুশকিল হল আমার ফোনে নেট ওয়ার্ক নেই এখানে।'

'আমারটা তো পোখরা থেকেই গেছে', অরুণাংশু ঠোঁট উলটে বললেন।

'আমারও', সুছন্দা বললেন।

'তাহলে উপায়?' পরিদাদু ভুরু নাচিয়ে প্রশ্ন করলেন অরুণাংশুর দিকে চেয়ে।

'এখানে পাবলিক বুথ পাবে না বলো?' সুছন্দা অরুণাংশুর দিকে তাকিয়ে বললেন।

'ধুস', হাত নাড়ালেন পরিদাদু।

'আচ্ছা পরিদাদু, আমাদের ড্রাইভার রেশম বাহাদুরের মোবাইলটা নিয়ে ট্রাই করলে হয় না' শাওন বলল।

'ভেরি গুড শানু, বলতে দ্বিধা নেই তুই কিন্তু ক্রমশ জিনিয়াস হয়ে উঠছিস', বলে শাওনের গালটা আদর করে টিপে দিলেন পরিদাদু। শাওন লজ্জা পেয়ে গেল। সুছন্দাও ঠাট্টা করে বললেন, 'দেখিস, এসব কথায় ফুলে গিয়ে বাড়ি ফিরে পড়াশুনোতে যেন আবার ফাঁকিবাজি শুরু করে দিস না শানু'। শাওন কোনো উত্তর দিল না। পরিদাদু উঠে পড়লেন, 'নষ্ট করার মতন সময় একটুও নেই আর। দেখি রেশমের ফোনটা কোনো কাজে লাগে কি না'—

রেশম রেস্টুরেন্টের বাইরে গাড়ির কাছে দাঁড়িয়ে একটা কাপড়ের টুকরো দিয়ে গাড়ির সামনের কাচটাকে ঘষে ঘষে পরিষ্কার করছিল। পরিদাদু ফোনের কথা বলতে এক কথায় ফোনটা দিয়ে দিল সে। পরিদাদু একটু তফাতে সরে গেলেন। সাবধানি চোখে তাকিয়ে নিলেন চারদিকে। তারপর নিজের মোবাইলের কনট্যাক্ট লিস্ট দেখে রেশমের মোবাইলের বোতাম টিপতে লাগলেন সন্তর্পণে। প্রথম দু—বার নাম্বারাটা লাগল না। তৃতীয়বারে তাঁর বন্ধু শ্রীবাস্তবকে পেয়ে গেলেন পরিদাদু। বাইরে বেশ ঠান্ডা এখন। তাছাড়া শিরশিরে একটা হাওয়া বইছে সর্বক্ষণ। সুছন্দা বললেন, 'আমার শীত করছে, আমি বরং ভিতরে যাই।'

অরুণাংশু আর শাওন দাঁড়িয়ে রইল। শাওনেরও শীত করছিল, কিন্তু পরিদাদুকে ছেড়ে যেতে ইচ্ছে করছিল না। এ সময়েই ফ্রেঞ্চ কাট ভদ্রলোক বাইরে এসে দাঁড়ালেন। শাওনের দিকে চেয়ে বললেন, 'কী, বাড়িতে খবর দেওয়া হচ্ছে বুঝি?' শাওন হাসল, উত্তর দিল না। পরিদাদু ফিরে এলেন কাছে। রেশমের কল লিস্ট থেকে এক্ষুনি করা ফোনের নাম্বারটা ডিলিট করে দিলেন। রেশমের হাতে কিছু টাকা দিয়ে বললেন, 'থাঙ্ক য়ু'— তারপর শাওনদের দিকে ফিরে বললেন, 'বাইরের আবহাওয়াটা ভালো নয়, ঠান্ডা লেগে যেতে পারে চট করে। চল আমরা এখন ভিতরে যাই।'

ঘরে ঢুকেই অরুণাংশু জিজ্ঞেস করলেন, 'কথা হল?'

'হল'। পরিদাদু গম্ভীর মুখে বললেন।

'কী বললেন উনি?'

পরিদাদু উঠে গিয়ে ঘরের দরজাটা বন্ধ করে দিয়ে এলেন ভিতর থেকে। তারপর খুব নীচু স্বরে বললেন,

'অরুণ অজান্তে আমরা একটা বিপজ্জনক সমস্যায় জড়িয়ে ফেলেছি নিজেদের।'

'কী রকম?'

'একটা মারাত্মক শক্তিশালী এবং লুন্যাটিক মিলিট্যান্ট গ্রুপকে লিড করছে এই কিং লায়ন নামক লোকটা। নেপালকে সেন্টার করে এরা ছড়িয়ে পড়েছে ভারতের বিহার, ছত্তিশগড় হয়ে অন্ধ্র পর্যন্ত। এমনকি পশ্চিমবঙ্গেও এরা ক্রমশ সক্রিয় হচ্ছে। ভারতীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রক ও গোয়েন্দা বাহিনীর কাছে খবর আছে যে কিছুদিনের মধ্যেই একযোগে ভারত ও নেপালে ভয়ংকর নাশকতামূলক কাণ্ড ঘটাতে চলেছে ওরা। ভারতে গতকালই গোয়েন্দাদের জালে এদের একজন ধরা পড়েছে'—

'তাই নাকি, কোত্থেকে?' উত্তেজিত হয়ে পরিদাদুর কথার মাঝখানেই বলে ওঠেন অরুণাংশু।

'জিজ্ঞেস করিনি', পরিদাদু বলে চললেন, 'শ্রীবাস্তবের কথা অনুযায়ী, কিং লায়নকে ধরার জন্যে ভারত এবং নেপাল যৌথ কর্মসূচি নিয়ে কাজ করছে। নেপাল সরকার ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থাকে নিরন্তর ইনফরমেশন দিয়ে যাচ্ছে এদের গতিবিধি সম্পর্কে। এই মুহূর্তে খবর কিং লায়ন মুক্তিনাথের পথে মারফা গ্রামের আশপাশে কোথাও গা ঢাকা দিয়ে আছে। আমাদের হাতে কোনোভাবে ওর কাছে পাঠানো কোনো মেসেজ ভুলক্রমে চলে এসেছে 'উপলবাবুর টুপিপ্রীতির জন্যে'। পরিদাদু থামলেন। জল খেলেন একটু। তারপর আবার বললেন, 'থ্যাঙ্কস টু মিস্টার দত্ত। ওটা আমাদের হাতে না এলে এতক্ষণে হয়তো কত মানুষের প্রাণ নাশের ছক কষা হয়ে যেত।'

'আমরা তো তাহলে এখনও ঘোর বিপদের মধ্যে পরিকাকু?' সুছন্দা ভয় পাওয়া গলায় বললেন।

'হ্যাঁ', পরিদাদু সোজাসুজি বললেন, 'ওরা নিশ্চিত হয়ে গেছে এখন যে ঘাসায় উপলবাবুকে মেরে ধরে যে টুপিটা ওরা নিয়ে গেছে সেটাও আসল টুপিটা নয়। ওরা ঘাসা পর্যন্ত যখন ধাওয়া করেছে, এখানে নিশ্চিত আসবে। তাছাড়া এই অঞ্চলটাই তো ওদের ডেন। সবচেয়ে যেটা বিপদের, এবার নিশ্চিত ওরা মরিয়া হয়ে ওটা পেতে চাইবে আর সেক্ষেত্রে কারও প্রাণ নিতেও হয়তো আর দ্বিধা করবে না ওরা'—

'অর্থাৎ উপল দত্তের জীবন এখন সংকটের মধ্যে'— অরুণাংশু বললেন।

'শুধু উপল দত্ত কেন, আমাদের সকলের প্রাণই এখন সংকটে'। পরিদাদু বড় করে নিশ্বাস ফেললেন।

'আমাদের তাহলে এখন কী করা উচিত পরি?'

'শ্রীবাস্তবের কথা অনুযায়ী আমাদের কাল সক্কালবেলাই এখান থেকে পোখরা ব্যাক করে ওখানকার অ্যাডমিনিস্ট্রেশনকে সাংকেতিক চিঠিটা দেখিয়ে সব বলা দরকার। আর ও ওখানে যাকে যেটুকু ইনফর্ম করা দরকার করে রাখছে বলে আমায় জানিয়েছে।'

'তুমি কী বলছ?'

'আমি আর আলাদা করে কী বলব বল', বলে একটু থামলেন পরিদাদু। তারপর মৃদু অথচ দৃঢ় স্বরে বললেন, 'তবে ফিরে যাবার আগে আমায় যে জেনে যেতে হবে অরুণ, কারা টুপিটা এমনভাবে ফিরে পেতে চাইছে। তাছাড়া আর একটা কথা না জানলে যে কিছুতেই স্বস্তি পাবো না আমি'—

'কী পরিদাদু?' শাওন বলল।

'ট্রেনের সেই ভালোমানুষ ব্যবসায়ী বিকাশ বসু কেন এমন ছদ্মবেশে ফলো করছে আমাদের সেই ঘাসা থেকে'—

'বিকাশ বসুকে কোথায় পেলে পরি?' অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন অরুণাংশু।

'ফ্রেঞ্চ কাট দাড়িওলা লোকটাকে সত্যি কেউ চিনতে পারোনি তোমরা?'

'ওই লোকটা, যাহ'— অবিশ্বাসের সঙ্গে বলেন সুছন্দা।

'লোকটা ছদ্মবেশ ভালোই নেয়, স্বীকার করছি আমি', পরিদাদু বললেন, 'আর এটাও ঠিক অ্যাট আ গ্ল্যান্স ওনাকে চেনা সহজ নয়। কিন্তু আমায় লোকটা বোকা বানাতে পারল কই! আমি যে চিনে ফেলেছি ওকে।'

'চিনলে কী করে বলোতো', অরুণাংশু বললেন, 'আমি তো এখনও ভাবতে পারছি না।'

'প্রথমত ওর একটা ছোট্ট ভুল আর দ্বিতীয়ত আমার পর্যবেক্ষণ।'

'কীরকম?' শাওন জিজ্ঞেস করল।

'ট্রেনের বার্থ থেকে নেমে পায়ে চটি গলিয়ে বাথরুমে গিয়েছিলেন বিকাশ বসু মনে আছে?'

'হ্যাঁ'—

'ঘাসায় ওই একই চটিটা দেখেই প্রথম খটকা লাগে আমার। বার বার মনে হচ্ছিল কোথায় যেন দেখেছি এই চটি, এই হাঁটার ভঙ্গি। তারপর কানের পাশের কাটা দাগটা যেই চোখে পড়ল আমার ওমনি মনে পড়ে গেল'। পরিদাদু হাসলেন।

'এখন তবে কী পরিকল্পনা তোমার', অরুণাংশু জিজ্ঞেস করলেন চাপা গলায়।

'টোপ দেব'।

'কাকে ?'

'যারা সাংকেতিক চিঠিটা উদ্ধার করতে চাইছে, তাদের।'

'মানে ওই ছদ্মবেশী বিকাশ বসুকে?'

'দেখা যাক।'

'তোমার টোপটা কী?'

'ওই টুপিটা।'

'অ্যাঁ!'

'হ্যাঁ, আমি টুপিটা পরে ডিনারে যাব এখন।'

'সে কী কেন?'

'আমি চাইছি না বেচারা উপলবাবুর ওপর ফারদার অ্যাটাক হোক। আর লড়াইটা আমি নিজে নিচ্ছি এবার। দেখি কে টুপিটা নিতে আসে আমার কাছে।'

'পরি তুমি পাগলামি করছ', অরুণাংশু বলে ওঠেন, 'মস্ত রিস্ক নেওয়া হয়ে যাচ্ছে এটা। এতবড় বিপদে ইচ্ছে করে নিজেকে জড়িয়ে জীবন নিয়ে ফাটকা খেলার সত্যিই কোনো মানে হয় না।'

'হয়তো তোমার কথাই ঠিক,' পরিদাদু ঘরের সিলিং এর দিকে মুখ করে বললেন, 'কিন্তু অরুণ, নিজের প্রাণের কথা ভেবে আজ যদি পিছিয়ে যাই তাহলে কিছুদিনের মধ্যে কত মানুষের প্রাণ বিপন্ন হবে ভেবে দেখেছ? আমি সে কথা জেনেও হাত গুটিয়ে পালাব?'

'আমার ভয় করছে পরি', অরুণাংশু বললেন আবার। পরিদাদু উঠে গিয়ে কাঁধে হাত রাখলেন তাঁর, 'চিন্তা কোরো না, জীবন নিয়ে খেলার অভ্যেস আমার আছে তো, সেনাবাহিনীতে ছিলাম যখন তখনও তো জানতাম প্রাণটা যে কোনো সময়েই চলে যেতে পারে। তখন যায়নি তো শেষপর্যন্ত, এখনও যাবে না দেখো, আমার মন বলছে।'

'টেক কেয়ার' বলে তাঁর পিঠের ওপরে আলতো চাপড় মারলেন অরুণাংশু। পরিদাদু তাঁর হাতটা শক্ত করে চেপে ধরলেন নিজের মুঠোর মধ্যে।

১১

পরিদাদু রেস্টুরেন্টের ডাইনিং হলে এলেন নটা নাগাদ। হলটা প্রায় ফাঁকাই তখন। একটা টেবিলে বসে পড়লেন তিনি শাওন অরুণাংশু আর সুছন্দাকে নিয়ে। পরিদাদুর মাথায় সেই টুপিটা। টুপিটা মাথায় দিয়ে পরিদাদুকে অন্যরকম লাগছিল। সুছন্দা বললেন, 'আমার জন্যে হালকা কিছু খাবার বল। শরীরটা ভালো লাগছে না'। অরুণাংশু বললেন, 'আমারও তাই'। পরিদাদু হাসলেন, 'কী ব্যাপার, টেনশন?'

'না না এমনিই', অরুণাংশু হাসলেন। পরিদাদু বললেন, 'তোমরা দুজনে বরং এখান থেকে কিছু স্ন্যাক্স কিনে নিয়ে ঘরে চলে যাও।'

'ঘরে চলে যাব', ইতস্তত করতে লাগলেন অরুণাংশু। পরিদাদু চোখের ইশারায় যেতে বললেন তাঁকে। বিকাশ বসু দুটো টেবিল পরে একা বসেছিলেন। অরুণাংশু সুছন্দাকে নিয়ে চলে যেতেই পরিদাদু হাত নাড়লেন তাঁর দিকে চেয়ে। তারপর তাঁকে ডেকে নিলেন নিজের টেবিলে। ভদ্রলোক উঠে এলেন। ইংরেজিতে বললেন, 'থ্যাঙ্কস। আপনাদের জন্যেই অপেক্ষা করছিলাম।'

শাওন লক্ষ করল পরিদাদুর মাথার টুপিটার দিকে লোকটা তাকালোই না ভালো করে। পরিদাদু মাথা থেকে টুপিটা খুলে টেবিলের ওপরে রাখলেন। হাত দিয়ে মাথার চুল ঠিক করলেন। তারপর হাতছানি দিয়ে রেস্টুরেন্টের ছেলেটাকে কাছে ডাকলেন। ছেলেটা সামনে এসে দাঁড়াতেই খাবারের অর্ডার দিলেন তিনি। তারপর বিকাশ বসুর দিকে তাকিয়ে বললেন, 'আপনার জন্যে কী বলব।'

'আমি বলছি'। ভদ্রলোক হাসলেন।

পরিদাদু খুব কঠিন অথচ চাপা গলায় স্পষ্ট বাংলায় বললেন, 'বিকাশবাবু, আপনি ট্রেনে আমাদের চা অফার করেছিলেন আমার মনে আছে। আবার কবে আপনার সঙ্গে একসঙ্গে সাপারের সুযোগ আসবে আমার তো জানা নেই, কাজেই আপনাকে একটা ট্রিট দেবার সুযোগ দিলেনই না হয়'—

শাওনের বুকের মধ্যে ধড়াস ধড়াস করে আওয়াজ হচ্ছে এখন। ও বিকাশ বসুর মুখের দিকে তাকাল। শাওন ভেবেছিল পরিদাদু তাঁকে চিনে ফেলেছেন দেখে লোকটা নিশ্চিত ঘাবড়ে যাবে খুব। অথচ বিকাশ বসু একটুও অপ্রতিভ হলেন না। পরিদাদুর দিকে চেয়ে ঠোঁটের কোণে আলতো হাসি টেনে এনে বললেন, 'আমার ছদ্মবেশটা ধরে ফেলেছেন তাহলে। যাই হোক, বাংলাটা কিন্তু বলা যাবে না এখন। ইংরেজিটা চালিয়ে যান।'

'কেন বলুন তো'? পরিদাদু অবাক হয়ে বললেন।

'আপনি চিনে ফেলেছেন ঠিক আছে। কিন্তু আমি চাইছি না অন্যেরাও আমার এই প্রেসেন্ট আইডেন্টিটিটাকে সন্দেহ করুক।'

'কার কাছ থেকে নিজেকে আড়াল করতে চাইছেন আপনি?' খুব নীচু গলায় জিজ্ঞেস করলেন পরিদাদু।

হলের এক কোণে সন্ধেবেলায় দেখা সেই দুজন লোক একটা টেবিলে তখনও বসেছিল। এবার তারা উঠল। আড়চোখে পরিদাদুর দিকে দেখল একবার। তারপর ধীর পায়ে বাইরে বেরিয়ে গেল। পরিদাদু তাদের যাওয়াটা খুব মনোযোগ দিয়ে দেখলেন। বিকাশ বসুও তাদের দিকে চোখ সরু করে তাকিয়ে রইলেন কপালে ভাঁজ ফেলে। পরিদাদু টুপিটা টেবিল থেকে তুলে মাথার ওপরে চেপে বসিয়ে দিলেন আবার।

'অ্যাকচুয়্যালি আমি একটা মিশন নিয়ে এদিকে এসেছি', বিকাশ বললেন।

'কী মিশন জানতে পারি?'

'না'। বিকাশ বসু হাসলেন।

'ক্রমাগত আমাদের পিছু নেওয়া, আমাদের ঘরের দরজায় আড়ি পাতাটাও আপনার মিশনের মধ্যে পড়ে বলছেন?' খুব চাঁছাছোলা ভঙ্গিতে জিজ্ঞেস করলেন পরিদাদু।

'পড়ে। আমি তো আসলে একটা পাজলের পিছনে দৌড়চ্ছি, যেখানেই মনে হচ্ছে পাজলটার কাছে পৌঁছনোর দরজা দেখা যাচ্ছে, সেখানেই একবার করে ঘা মারছি আমি।'

'এখন সেই পাজলটার থেকে কত দূরে আপনি?'

'ঠিক জানি না। তবে মন বলছে বোধহয় খুব কাছাকাছি এসে পড়েছি।'

'পাজলটা কী সে সম্পর্কে জানতে পারি?'

'উঁহু'।

'স্ট্রেঞ্জ', পরিদাদু বললেন খেতে খেতে, 'আপনার এই বিকাশ বসু নামটাও কি সঠিক?'

'না'। অকপটে বললেন ভদ্রলোক।

'তাহলে আপনার সঠিক পরিচয়?'

'এখনও দেবার সময় আসেনি। আমাকে কতকগুলি বিষয়ে আর একটু নিশ্চিত হতে হবে'। বলেই নিজের ট্রাউজারের ডান পকেটে হাত দিলেন ভদ্রলোক। তারপরেই পকেট থেকে সেল ফোনটা বের করে স্ক্রিনের ওপরে চোখ রাখলেন। উঠে দাঁড়িয়ে 'এক্সকিউজ মি' বলেই কলটা রিসিভ করতে যতটা সম্ভব দূরে সরে গিয়ে শাওনদের চোখের আড়ালে হারিয়ে গেলেন তিনি। লোকটার মিলিয়ে যাওয়া চেহারাটার দিকে তাকিয়ে মাথা নাড়তে নাড়তে পরিদাদু বললেন, 'সব নতুন করে ভাবতে হবে আবার শানুবাবু, রহস্য অন্যদিকে ঘুরে গেল যে। কে তাহলে এই বিকাশ বসু, কী তাঁর মিশন যে এমন ছদ্মবেশে ঘুরতে হচ্ছে তাঁকে। টুপির প্রতি তাঁর বিন্দুমাত্র আগ্রহও চোখে পড়ল না যখন, তাহলে এ লোকটাকে তো কিং লায়নের দলের লোকদের মধ্যে ফেলা যাচ্ছে না আর।'

পরিদাদুর কথার উত্তরে কী একটা বলতে যাচ্ছিল শাওন। কথাটা বলা হল না তার। ঠিক তখনি একেবারে আচম্বিতে কাণ্ডটা ঘটে গেল চোখের পলকে। দুটো ষণ্ডা মতন লোক প্রায় দৌড়ে ভিতরে ঢুকে পড়ল। পরিদাদুর কাছে এসে কোনো কথা না বলেই দুম করে একটা ঘুঁষি লাগাল তাঁর মুখে। শাওন সামনে এসে পড়ায় এক ধাক্কায় তাকে দূরে সরিয়ে দিল একটা লোক। শাওন ধাক্কার চোটে ঠিকরে পড়ে গেল কাঠের মেঝের ওপর। লোক দুজন জোর করে ঘরের বাইরে নিয়ে গেল পরিদাদুকে। পরিদাদু বাধা দেবার চেষ্টা করতেই বড় বাঁটঅলা ছোরার মতন দেখতে একটা অস্ত্র বের করল একজন। তারপর তার বাঁট দিয়ে আঘাত করল তাঁর মাথায়। পরিদাদুর মাথাটা সামনের দিকে ঝুঁকে পড়ল। লোকদুটো প্রায় চ্যাংদোলা করে পরিদাদুকে নিয়ে বাইরে বেরিয়ে গেল। শাওন মেঝে থেকে উঠে দৌড়ে দরজার কাছে গিয়ে দেখল একটা জিপ রেস্টুরেন্টের সামনের রাস্তায় একবার হালকা গর্জন করে উঠে পাড়ি দিল পাহাড়ি রাস্তায়। খুব কান্না পেয়ে গেল শাওনের। 'পরিদাদু— পরিদাদু' বলে গলা ফাটিয়ে চিৎকার করে উঠল সে।

বিকাশ বসু খুব উত্তেজিত ভঙ্গিতে ফিরে এলেন। শাওনের কাছে এসে তার দিকে ভালো করে না তাকিয়েই বলে উঠলেন, 'মিস্টার চ্যাটার্জি কোথায়?' শাওন কোনো উত্তর না দিয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল। বিকাশ বসু এতক্ষণে তার দিকে চাইলেন ভালো করে। শাওনের কপালের কাছে ফুলে উঠেছিল। সেদিকে তাকিয়ে উদ্বেগের সঙ্গে জিজ্ঞেস করলেন তিনি, 'কী হয়েছে?'

আতঙ্কিত শাওন বুঝতে পারছিল না কতখানি বিশ্বাস করা যায় তাঁকে। বিকাশ বসু তার সংশয়টা সম্ভবত বুঝতে পারলেন। তার আরও কাছে সরে এসে চাপা গলায় তিনি বললেন, 'আমাকে অবিশ্বাস করার কারণ নেই। আমি তোমাদের শত্রু নই। তোমার দাদুর সঙ্গে আমার ইমিডিয়েটলি কথা বলা দরকার শাওন, ফর গডস সেক'—

বিকাশ বসুকে আর অবিশ্বাস করতে ইচ্ছে হল না শাওনের পরিদাদুও শেষের দিকে তেমন কথাই বলছিলেন মনে পড়ল তার। ওর মনে হল পরিদাদুকে বাঁচানোর জন্যে বরং এই লোকটির সাহায্যই পাওয়া যেতে পারে। দু—চোখ জল নিয়ে বিকাশ বসুর দিকে চাইল সে। তারপর ধরা ধরা গলায় বলল, 'পরিদাদুকে ধরে নিয়ে গেছে'—

'হোয়াট'— দু—হাতে শাওনকে শক্ত করে চেপে ধরে বলে উঠলেন বিকাশ, 'কী বলছ তুমি, কখন কীভাবে ঘটল এসব?'

শাওন সংক্ষেপে ঘটনাটা তাঁকে জানাতেই 'ওঃ শিট, আমারই বোকামির জন্যে এটা হল', বলে নিজের বাঁ হাতের চেটোর ওপর ডান হাত দিয়ে ঘুষি মারলেন তিনি। তারপর শাওনকে তাড়া দিলেন, 'শিগগির ঘরে চল। পুরো ঘটনাটা দ্রুত জেনে নিতে হবে আমায়।'

অরুণাংশু, সুছন্দা কিছুই জানতেন না। শাওনরা ঘরে এসে খবরটা বলতেই ঝর ঝর করে কেঁদে ফেললেন সুছন্দা। অরুণাংশুও হতাশ গলায় বলে উঠলেন, 'কতবার বারণ করেছি পরিকে অহেতুক এসব উটকো ঝামেলায় জড়িয়ে না পড়তে। কোনোদিন কোনো কথাই কি সে শুনল আমার— কী হবে এখন, আর ওকে মনে হয় জীবিত ফিরিয়ে নিয়ে যেতে পারব না আমরা।'

বিকাশ বসু মৃদু ধমক দিলেন দুজনকেই। তারপর খুব দৃঢ়স্বরে বললেন, 'অযথা শোক করার বা অহেতুক দুশ্চিন্তা করে নষ্ট করার সময় এটা নয়। তাতে লাভ তো হবেই না, উলটে সত্যিই খারাপ কিছু একটা ঘটে যাবে। আমায় ঠান্ডা মাথায় কাজ করতে দিন। এখন দু—একটা প্রশ্নের সংক্ষিপ্ত উত্তর দিন সে বিষয়গুলো সম্পর্কে যতখানি জানেন।'

'বলুন'। অরুণাংশু বললেন।

'পরিমলবাবুর কাছে কিং লায়ন সম্পর্কে কী ইনফরমেশন ছিল?'

অরুণাংশু ইতস্তত করতে লাগলেন। বিকাশ হালকা হাসলেন, 'আমি ভারতীয় গোয়েন্দা বিভাগের পক্ষে কিং লায়নকে ধরার জন্যেই এ অঞ্চলে ঘুরছি। নেপাল সরকার ব্যাপারটা সম্পর্কে ওয়াকিবহাল এবং সাধ্যমতন সহায়তা দিচ্ছেন তাঁরা আমায়। এখন আমরা যেখানে আছি তার খুব কাছেই কিং লায়নের ঘাঁটি বলে আমাদের কাছে খবর আছে। আমাদের ইনফরমারেরা ওদের লোকেদের ওপরে তীক্ষ্ন নজর রাখছে এখন। যেমন ওরা নজর রাখছিল আপনাদের, স্পেশালি উপল দত্ত অ্যান্ড প্রীতমের ওপর'—

'কেন?' তাঁর কথার মধ্যেই অবাক হয়ে প্রশ্ন করলেন সুছন্দা।

'পোখরায় তাঁর ওপরে প্রথম অ্যাটাকের পরেই সন্দেহটা আসে আমাদের মাথায়। আমাদের ইনফরমেশন অনুযায়ী যারা ওঁকে ধাক্কা মেরেছিল তারা আমাদের সন্দেহভাজনের তালিকায় থাকা লোক। আমার মনে হয়েছিল লায়নের গ্রুপের সঙ্গে নিশ্চিত একটা কিছু যোগসূত্র আছে এই ঘটনার। উপলবাবুর মুখে বারবার সন্ত্রাসবাদীদের প্রসঙ্গ আমায় আরও উৎসাহিত করে। আমিই পোখরায় প্রশাসনকে জানিয়ে হোটেলে ওদের রুমে তল্লাশি চালাই। হোটেল মালিককে বিষয়টা গোপন রাখার নির্দেশ দেওয়া ছিল বিশেষভাবে'—

চোখ গোল গোল করে ওঁর কথা শুনছিল শাওন। বিস্ময়ের সঙ্গে বলে উঠল সে, 'আপনি তল্লাশি করিয়েছিলেন ওনাদের ঘরে?'

'হ্যাঁ, যদিও সন্দেহজনক কিছুই পাওয়া যায়নি, আমি তবুও ঘাসা পর্যন্ত ধাওয়া করি এবং সেখানে ওঁর ওপরে দ্বিতীয়বার আঘাত আসে। ওখানে আমি বুঝে গিয়েছিলাম যে ওই মিলিট্যান্ট গ্রুপের সঙ্গে কোথাও একটা লিঙ্ক আছে আপনাদের। যে কোনো কারণেই হোক আপনারা ওদের সুনজরে নেই। আমি চেষ্টা করেও এই লিঙ্কটা বুঝতে পারছিলাম না। একটু আগে দিল্লি থেকে আমার কাছে একটা ফোন আসে। সেই ফোনকল থেকেই পরিমলবাবুর পাওয়া সাংকেতিক চিঠিটার কথা জেনে আমার কাছে বিষয়টা পরিষ্কার হয়। থ্যাঙ্কস গড, নিজেদের অজান্তে এই গ্যাংটার সঙ্গে ঝামেলায় জড়িয়ে গিয়ে আমাদের অশেষ উপকার করেছেন আপনারা। আপনাদের জন্যেই এত তাড়াতাড়ি ওদের এতখানি কাছাকাছি পৌঁছে যেতে পেরেছি আমরা। এক্ষেত্রে আপনাদের আর একটু সহযোগিতা আমি প্রার্থনা করছি। দয়া করে ওদের সম্পর্কে কোনো ইনফরমেশন আমার কাছে গোপন করবেন না আর।'

অরুণাংশু এবার ধীরে ধীরে টুপি কেনা থেকে শুরু করে সমস্ত ঘটনা সংক্ষেপে জানাতে থাকেন বিকাশ বসুকে। উপলের অসুখ সম্পর্কেও বিস্তারিত বলেন তিনি। এমনকি সেই সাঙ্কেতিক চিঠির বিষয়েও যতটুকু জানা ছিল, সব।'

'আই সি', বলে একমুহূর্ত চুপ থাকলেন তিনি। তারপর উঠে পড়লেন। বললেন, 'চলুন বাইরে বেরোনো যাক। আমার জন্যে কী খবর আছে জেনে নিই এবার। চিন্তা করবেন না। পরিমলবাবুকে আশা করি ফিরিয়ে দেওয়া যাবে আপনাদের কাছে।'

'দেখুন কী করতে পারেন', বলে তাঁর হাত দুটো নিজের দু—হাত দিয়ে চেপে ধরলেন 'অরুণাংশু।

বিকাশ ঘর থেকে বেরিয়ে উঠোন পেরিয়ে সেই রেস্টুরেন্টের মধ্যে এসে দাঁড়ালেন আবার। রেস্টুরেন্ট ফাঁকা হয়ে গেছে তখন। একটা কম বয়েসি ছেলে বাসনপত্র পরিষ্কার করছিল এক ধারে দাঁড়িয়ে। বিকাশ তার দিকে তাকিয়ে চোখের ইশারা করতেই সে দরজা খুলে দিল। বাইরে ফুট ফুট করছে তখন জ্যোৎস্না। সেই জ্যোৎস্নায় মাথায় বরফের টুপি চাপিয়ে পাহাড়ের চূড়াগুলো ভিজছিল। বিকাশ সেদিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ছাড়লেন একবার। তারপর আপন মনে বলে উঠলেন, 'এই চিরসুন্দরের মাঝে থেকেও কী করে যে মানুষ হিংসা ও সন্ত্রাসের কথা ভাবতে পারে কে জানে।'

রাস্তার পাশে বিকাশের গাড়িটা দাঁড়িয়ে ছিল চুপ করে। সেই গাড়ির মধ্যে থেকে একজন লোক নিঃশব্দে নেমে এসে বিকাশ বসুর সামনে এসে দাঁড়াল। লোকটাকে চিনতে পারল শাওন। সেই সন্ধে থেকেই যে দুজন রেস্টুরেন্টে বসে ছিল এ তাদেরই একজন। বিকাশ তার দিকে চেয়ে চাপা গলায় বললেন, 'কোনো খবর?'

নরিন্দর ওদের ফলো করে জায়গাটা লোকেট করেছে সার।'

'গুড, এখান থেকে কতদূর?'

'কাছেই। খুব বেশি হলে দু—তিন কিলোমিটার। রাস্তা থেকে নেমে জঙ্গলের মধ্যে।'

'পরিমলবাবু ওদের জিম্মায়?'

'জি সাব'।

'উনি ঠিক আছেন তো?'

'মুঝে মালুম নেহি সাব, 'আভিতক বেহোশ'—

'নিয়ারেস্ট চেকপোস্টে খবর পাঠানো হয়েছে?'

'জি সাব। দু দিক থেকেই জায়গাটাকে ক্রমশ ক্লোজ করে ফেলা হচ্ছে। ওদের কাছেও কিছু একটা খবর ছিল সার। ওরা এখান থেকে সরে যাচ্ছে। এখানে খুব বেশি লোক নেই আর'—

'থাকার কথাও না। ওরা বিভিন্ন দিকে ছড়িয়ে পড়ে নির্দেশের অপেক্ষায় রয়েছে এখন। এই চিঠির সংকেত অনুযায়ী কিং লায়নের ওদের নির্দেশ দেওয়ার কথা।'

'কী মারাত্মক', অরুণাংশু বলে ওঠেন। বিকাশ শাওনদের দিকে তাকালেন, 'আপনারা ঘরে ঢুকে পড়ুন। আমরা এবার আমাদের কাজ শুরু করব।'

'আমরা কি আপনার কাজে সঙ্গী হতে পারি না?' অরুণাংশু বললেন।

'না'। বিকাশ কঠিন গলায় বললেন, 'আমরা বেড়াতে যাচ্ছি না। অযথা আপনাদের আমি কোনো রিস্কের মধ্যে জড়িয়ে দিতে পারি না। আসুন প্লিজ'— বিকাশবাবু গাড়িতে উঠে পড়লেন। আলো নিভিয়ে, চাঁদের আলোয় খুব ধীরে ধীরে পাহাড়ি পথে গড়িয়ে গড়িয়ে এগিয়ে চলল গাড়িটা।

১২

পরিদাদু মাথায় চোট পাওয়ার পরেই তাঁর চোখের সামনে অন্ধকার ঘনিয়ে এল। চোখ বন্ধ হয়ে এল তাঁর। মনে হল হাত পা সব যেন কেমন শিথিল হয়ে আসছে। শরীরের কোনো অংশের ওপরেই আর কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই তাঁর। এই অবস্থাতেই লোকগুলো তাঁকে দুমড়ে মুচড়ে একটা গাড়ির মধ্যে ঢুকিয়ে দিল, তিনি বুঝতে পারলেন; কিন্তু প্রতিরোধ করতে পারলেন না। একটা লোক তাঁর মাথা থেকে টুপিটা খুলে নিল। গাড়িটা চলতে শুরু করল ধীর গতিতে। অল্প সময়ের মধ্যেই পরিদাদু অবশ্য অনেকটাই সুস্থ বোধ করলেন। হাত পায়ের শক্তিও ক্রমশ ফিরে এল। মাথায় একটা ব্যথা হচ্ছে, কে জানে হয়তো অল্প কেটেকুটেও যেতে পারে। তবুও চোটটা খুব গুরুতর বলে মনে হল না পরিদাদুর। গাড়ির মধ্যে ফিকে অন্ধকার। সন্তর্পণে চোখ খুলে গাড়ির ভিতরটা একবার নজর বুলিয়ে দিলেন পরিদাদু। গাড়ির মধ্যে মাত্র দুজন লোক রয়েছে। তাদের একজনকে চিনতে পারলেন পরিদাদু। এই লেকাটাই পোখরার সেই দোকানে স্লিপিং ব্যাগ কিনতে এসেছিল। এই লোকটার মাথা থেকেই টুপি খুলে নিয়ে ওইরকম টুপি দেখাতে বলেছিলেন উপল দত্ত, তারপর টুপি বদল। এত টেনশন এবং শারীরিক কষ্টের মধ্যেই পরিদাদুর লোকটার কথা ভেবে হাসি পেল। বেচারা, টুপি হারিয়ে কি নাচারেই না পড়েছে। দলের মধ্যেও লোকটা নিশ্চিত এ মুহূর্তে স্বস্তিতে নেই। ওর এই অপরাধে কী শাস্তি যে ওর জন্যে নির্ধারণ করেছে কিং লায়ন কে জানে।

পরিদাদু অজ্ঞান হয়ে আছেন জেনে দুজনেই বেশ অসতর্ক অবস্থায় নিশ্চিন্ত মনে বসে আছে। পরিদাদু ভাবলেন অতর্কিতে ওদের ওপর আক্রমণ করে ওদের হাত থেকে বাইরে বেরিয়ে যাওয়াটাও খুব কঠিন হবে না। গাড়িটাও যে গতিতে চলেছে তাতে গাড়ি থেকে লাফিয়ে নেমে পড়লেও খুব বেশি চোট লাগার কথা নয়। তবু নিজেকে সংযত করলেন তিনি। কিং লায়নকে সামনাসামনি দেখার ভারি ইচ্ছে হল তাঁর। মনে হল এই সুযোগে ওদের ডেরাটারও একটা সন্ধান পেয়ে যেতে পারেন তিনি। কাজেই পরিদাদু কোনো সাড়াশব্দ করলেন না। ওভাবেই চুপ করে পড়ে রইলেন অজ্ঞানের ভান করে। আর একটুক্ষণ চলার পরেই একটা হালকা ঝাঁকুনি দিয়ে গাড়িটা থেমে গেল। যে লোকটার হাতে পরিদাদুর টুপিটা ছিল, সে টুপিটা এবার নিজের মাথায় দিয়ে নিল। তারপর সঙ্গের লোকটাকে ইশারা করে বলল, 'চল, দুজনে মিলে চাগিয়ে ধরে নামাই লোকটাকে'। সে লোকটা চাপা গলায় হাসল। বলল, 'মরে গেল নাকি লোকটা?'

'ধুস, মরবে কী রে, অজ্ঞান হয়ে আছে। একটু পরেই জ্ঞান ফিরে আসবেখন।'

দ্বিতীয় লোকটা আবার বলল, 'টুপিটা পাওয়াই গেছে যখন লোকটাকে শুধুমুধু বয়ে নিয়ে যাওয়ার দরকারটাই বা কী, এখানে ফেলে দিয়ে চলে গেলেই তো হতো।'

'লায়নের নির্দেশ তো টুপিসমেত লোকটাকে তুলে নিয়ে যাওয়ার'। বলেই পরিদাদুকে কাঁধের ওপরে ফেলে গাড়ি থেকে নেমে পাহাড়ি পথ বেয়ে নীচের জঙ্গলে ঢাকা একচিলতে পাহাড়ি ঢালে কোনোক্রমে দাঁড়িয়ে থাকা একটা সবুজ রং করা টিনের বাড়ির সামনে এসে থামল লোকটা। ওর সঙ্গী দরজায় আলতো টোকা মেরে চাপা গলায় ডাক দিল, 'লায়ন'—

'গুরুং, কাজ হাসিল হয়েছে?' ঘরের ভিতর থেকে জিজ্ঞেস করল একজন।

'জি সার', চাপা গলাতেই উত্তর দিল আবার গুরুং নামে লোকটা।

আজ রাতে আকাশে একটুও মেঘ নেই। জ্যোৎস্নায় ভেসে যাচ্ছে চারদিক। ধওলাগিরি আর অন্নপূর্ণার চূড়া অদ্ভুত সৌন্দর্য বিছিয়ে রেখেছে চারদিকে। এই অঞ্চল থেকেই অন্নপূর্ণা বেস ক্যাম্পের উদ্দেশ্যে রওনা দেন পাহাড়কে ভালোবেসে পাহাড়ের একেবারে শরীরের মধ্যে ঢুকে পড়তে চাওয়া মানুষের দল। পরিদাদুর খুব ইচ্ছে হচ্ছিল এই রাতে এই নির্জন গাছপালা মোড়া পাহাড়ি ঢালে চুপ করে বসে পাহাড়ের এই রূপ প্রাণভরে উপভোগ করার। অথচ লায়নের দলের পাল্লায় পড়ে সে ইচ্ছেটাকে মনের মধ্যে আপতত চাপা দিয়ে রাখতে হল তাঁকে।

লায়ন দরজা খুলে বাইরে বেরিয়ে এল। পরিদাদু লোকটাকে দেখে অবাকই হলেন একটু। জিন্স আর ফর্মাল শার্টের ওপরে হাফ স্লিভ সোয়েটার পরা মাঝারি উচ্চতার লোকটাকে দেখে মনেই হল না এতবড় একটা বিপজ্জনক দলের একজন পাণ্ডা সে। লোকগুলো পরিদাদুকে ঘরের সামনে মাটিতে শুইয়ে রেখেছিল। এবার গা ঝাড়া দিয়ে উঠে বসলেন তিনি। প্রথমটা খুবই অবাক হওয়ার ভান করলেন। যেন বুঝতেই পারছেন না এখানে কেমন করে এলেন। ফ্যাল ফ্যাল করে তিনি তাকাতে লাগলেন লায়ন, তার সঙ্গী লোকদুটো, আর আশপাশের পাহাড় গাছপালার দিকে।

লায়ন গুরুং—এর কাছ থেকে টুপিটা চাইল। তারপর পরিদাদুকে দেখিয়ে চোখ নাচিয়ে জিজ্ঞেস করল, 'কী ব্যাপার?' গুরুং টুপিটা তার হাতে দিল। পরিদাদুকে ধরে আনার কাহিনী ও তাঁর জ্ঞান হারানোর কথা জানালো সংক্ষেপে। লায়ন পরিদাদুর দিকে চাইল। খুব শান্তভাবে জিজ্ঞেস করল, 'কেমন বোধ করছেন এখন?'

'ঠিক আছি'। ছোট্ট উত্তর দিলেন পরিদাদু।

'জল খাবেন একটু?' আবার জিজ্ঞেস করল লায়ন।

'খাব'। ওপর নীচে মাথা নাড়িয়ে বললেন পরিদাদু। লায়ন গুরুংকে চোখের ইশারা করে জল দিতে বলল পরিদাদুকে। গুরুং বোতলে করে জল এনে দিল। পরিদাদু অনেকটা জল খেলেন। সত্যিই খুব তেষ্টা পেয়েছিল তাঁর। লায়ন খুব ভদ্রভাবেই কথা শুরু করল, 'আপনার সঙ্গে আমাদের শত্রুতা নেই। কিন্তু এই টুপিটার ব্যাপারে এমনভাবে আপনি জড়িয়ে পড়লেন যে বাধ্য হয়ে আপনাকে তুলে আনতে হল। আমরা ভুলবশত আপনার এক সঙ্গীকে দুবার হ্যারাস করে ফেলেছি তার জন্যে ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি। তবে ওঁর কিছু কথাবার্তাও আমাদের কাছে সন্দেহজনক মনে হয়েছিল। আলটিমেটলি আমরা যে টুপিটা খুঁজছিলাম সেটা পাওয়া গেছে। আপনারা জানতেন না টুপিটা পালটে গিয়ে কতখানি সমস্যায় পড়ে গিয়েছিলাম আমরা।'

'জানি'। খুব শান্তভাবে বলে উঠলেন এবার পরিদাদু।

লায়নের চোখদুটো ধক করে জ্বলে উঠল একবার। পরক্ষণেই নিজেকে সামলে নিল সে। পরিদাদুর চোখে চোখ রেখে সে জিজ্ঞেস করল, 'আপনি জানেন?'

'হুঁ'। পরিদাদুর মুখে মৃদু হাসি।

'কী জানেন?' লায়নের গলার শান্ত ভাবটা ক্রমশ কমে যাচ্ছে এখন।

'টুপিটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ আপনাদের কাছে।'

'কী বলতে চাইছেন আপনি?' লায়নের কণ্ঠস্বর কর্কশ হল।

'একটা সামান্য টুপির জন্যে কেউ এত মেহনত তো করে না। টুপির মধ্যে নিশ্চয়ই এমন কিছু আছে যেটা খুবই দরকারি আর গোপনীয়'। পরিদাদু মিটি মিটি হাসতে লাগলেন।

লায়ন স্থির চোখে পরিদাদুর দিকে তাকিয়ে রইল একটুক্ষণ। তারপর টুপিটা উলটে ফেলে দ্রুত হাত দিয়ে খুলে ফেলল তার লুকোনো পকেটটা। দুটো আঙুল পকেটের মধ্যে ঢুকিয়ে তন্ন তন্ন করে খুঁজতে লাগল সেই সাংকেতিক চিঠিটা। তারপর চিঠিটা না পেয়ে হিংস্র দৃষ্টিতে তাকাল পরিদাদুর দিকে। পরিদাদুর চুপ করে দাঁড়িয়ে ছিলেন। অন্য দুজনেও চুপ, হতবাক। লায়ন পাগলের মতন ছুটে এসে পরিদাদুর গলাটা চেপে ধরল দু—হাত দিয়ে। চিৎকার করে উঠল, 'কাগজটা কোথায়?'

'কী কাগজ মিস্টার লায়ন?' পরিদাদু না জানার ভান করলেন।

'আপনি জানেন। আপনিই কাগজটা সরিয়েছেন নিশ্চিত'। বলেই কোমরে গুঁজে রাখা আগ্নেয়াস্ত্রটা বের করে লায়ন। পরিদাদুর একেবারে কাছে সরে এসে অস্ত্রটা তাঁর কপালে ঠেকিয়ে বলে ওঠে, 'চালাকি আমি পছন্দ করি না। ওটা কোথায় আছে বলে দিন, না হলে আপনার খুলি উড়িয়ে দিতে একটুও হাত কাঁপবে না আমার কিন্তু।'

'জানি, পরিদাদু বললেন স্পষ্ট উচ্চরণে, 'যারা বিনা কারণে শত শত নির্দোষ মানুষকে খুন করার ষড়যন্ত্র করে ঠান্ডা মাথায় তাদের আমার মতন একজন নিরস্ত্র এবং একা মানুষকে মারতে হাত কাঁপার তো কথা নয়।'

'শয়তান', বলে ঠাস করে পরিদাদুর গালে একটা চড় কষিয়ে দেয় লায়ন। গুরুং এর দিকে ফিরে রাগে কাঁপতে কাঁপতে বলে, 'সার্চ হিম গুরুং, কুইক। আমাদের হাতে সময় বেশি নেই। খবর আছে এ জায়গাটা ছেড়ে খুব শিগগিরই অন্য জায়গায় শিফট করতে হবে আমাদের। কিন্তু তার আগে কাগজটা না পেলে সব বানচাল হয়ে যাবে, পুরো প্ল্যান ফেইল করে যাবে আমাদের। এমনকি নেক্সট ডেসটিনেশনটাও জানা যাবে না।'

গুরুং লাফিয়ে পড়ল পরিদাদুর ওপরে। পরিদাদু টাল খেয়ে মাটিতে পড়ে গেলেন। গড়িয়ে গেলেন ছোট্ট অপরিসর উপত্যকার ঢাল বেয়ে অনেকখানিই খাদের দিকে। পরিদাদু ওঠার চেষ্টা করতেই গুরুং—এর সঙ্গের লোকটা চেপে ধরল তাঁকে মাটির ওপর। গুরুং তল্লাশি চালাতে লাগল তাঁর শরীর জুড়ে। পরিদাদু চিৎকার করে বললেন, 'লায়ন আমাকে উঠতে দাও। এভাবে ওই টুকরো কাগজ খুঁজে পাওয়া যে সহজ নয় তুমি তো জানো।'

লায়ন হিসহিসে গলায় বলল, 'ও কে, একটা চান্স দিচ্ছি। কাগজটা ভালোয় ভালোয় আমাকে ফিরিয়ে দে, আর তা নাহলে এই পাহাড় থেকে ছুঁড়ে ফেলে দেওয়া হবে তোকে ওই খাদের মধ্যে। এতক্ষণ অনেক ভদ্রতা করেছি তোর সঙ্গে, কিন্তু ভদ্র ব্যবহারের যোগ্য তুই নোস।'

লায়নের ইশারায় গুরুং আর অন্য লোকটা পরিদাদুকে ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। পরিদাদু বললেন, 'লায়ন আমি তোমাকে কাগজটা ফিরিয়ে দিচ্ছি, কিন্তু আমার অনুরোধ এই জঘন্য নোংরা রাস্তা থেকে সরে গিয়ে তুমি জীবনের মূলস্রোতে ফিরে যাও। সত্যিকারের মানুষের মতন মাথা উঁচু করে বাঁচবার চেষ্টা করো নতুন করে। মানুষকে মারার চেয়ে তাকে ভালবাসার আনন্দ অনেক বেশি'—

লায়ন হা হা করে হেসে উঠল। পরিদাদুর দিকে চেয়ে বলল, 'আমি কোনো শর্ত বা পরামর্শ গ্রহণ করতে শিখিনি। আমি আমার অধিকার ছিনিয়ে নিতে জানি এবং আমি জানি আমার কাজে আমি সফল হবই।'

'হবে না, হতে পারো না লায়ন। পৃথিবীর ইতিহাস তাই বলে'। পরিদাদু চিৎকার করে বললেন প্রত্যয়ের সঙ্গে। লায়ন কানই দিল না সে কথায়। ডান হাতে রিভলবারটা শক্ত করে ধরে পরিদাদুর দিকে বাঁ হাত বাড়িয়ে সে এগিয়ে চলল। ক্রুদ্ধ কণ্ঠে পরিদাদুকে বলল, 'আমার আর কথা বলার সময় নেই। কাগজটা দিয়ে দে'—

পরিদাদু জামার ভিতরের পকেট থেকে ডান হাতের দু—আঙুলে ধরে কাগজটা বের করে আনলেন। অপেক্ষা করতে লাগলেন কাগজটাকে নিজের মুখের সামনে ধরে। লায়ন আরও, ক্রমশ আরও কাছে এগিয়ে আসছে তাঁর। রাত শেষের ক্লান্ত চাঁদের আলোয় তার দীর্ঘ ছায়া পড়েছে উপত্যকার কালচে রঙা ঘাসে ঢাকা মাটির ওপরে। লায়ন আবার আদেশের ভঙ্গিতে বলল, 'দিয়ে দে'—

যখন হাতের প্রায় নাগালের মধ্যে এসে গেছে লায়ন তখনই 'নাও তবে' বলে কাগজটা হঠাৎই বাতাসে ভাসিয়ে দিলেন পরিদাদু। আর পাহাড়ি বাতাসে ভর দিয়ে সেটা উড়ে গেল পরিদাদুর ডান পাশের প্রায় হাজার দেড়েক ফুট গভীর খাদের দিকে। লায়ন কাগজটা ধরার জন্যে রিফ্লেক্স অ্যাকশনেই প্রায় বাঁ হাতটা শূন্যে ছুঁড়ে দিল শরীরটাকে যতটা সম্ভব বাঁদিকে ঝুঁকিয়ে। তার পা শরীরের ভারসাম্য রাখতে না পেরে দুমড়ে গেল আচমকাই। একটা তীব্র আর্তনাদ। কাগজের টুকরো আর লায়ন দুজনেই হারিয়ে গেল অতল পাহাড়ি খাদের আবছা অন্ধকারে। গুরুং আর তার সঙ্গের লোকটা ঘটনার আকস্মিকতায় প্রথমটা হকচকিয়ে গিয়ে চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল একটুক্ষণ। তারপরেই পরিদাদুর দিকে ঘুরে তাকালো তারা। রাগে চোখমুখ লাল হয়ে উঠল তাদের। হাতের তীক্ষ্ন লম্বা ছোরাটা বাগিয়ে ধরে পরিদাদুর দিকে এগোতে শুরু করল গুরুং। আর ঠিক তখনি একটা ভারী কণ্ঠস্বর প্রায় গর্জে উঠল পাহাড়ি উপত্যকাটাকে কাঁপিয়ে দিয়ে, 'খবরদার, একটা পাও এগোবে না আর। কোনোরকম চালাকি করেছ কি গুলি করে একেবারে ঝাঁঝরা করে দেব তোমাদের। মনে রাখো যারা ষড়যন্ত্র করে নিরীহ মানুষের ওপর আঘাত হানে, নির্বিচারে হত্যা করে এমনকি অসহায় শিশু, বৃদ্ধ, নারীদের, তাদের মেরে ফেলতে আমার একটুও হাত কাঁপবে না। বরং এমন একটা কাজ করতে পারলে ভালোই লাগবে আমার। মনে করতে পারব পৃথিবীকে খানিকটা হলেও জঞ্জাল মুক্ত করা গেল।'

পরিদাদু বিকাশ বসুকে দেখতে পেলেন এবার। মানুষটাকে একেবারে অন্যরকম লাগছিল এখন। পরিদাদু এগিয়ে এসে হাত বাড়িয়ে দিলেন বিকাশ বসুর দিকে, 'থ্যাংক য়ু মিস্টার বোস, আপনি আমার প্রাণ বাঁচালেন আজ। আপনি আসতে যদি আর একটু দেরি করতেন'—

পরিদাদুকে খুব ক্লান্ত লাগছিল। বিকাশবাবুর সঙ্গে আসা নেপাল পুলিশের লোকজন গুরুং আর তার সঙ্গীকে পাকড়াও করে গাড়িতে তুলে ফেলল। বিকাশ তাদের উদ্দেশ্যে নির্দেশ দিলেন ঘরের মধ্যেটা ভালো করে খুঁটিয়ে দেখে নিতে। কাগজপত্র অথবা অস্ত্রশস্ত্র যদি কিছু চোখে পড়ে সব তুলে নিতে বললেন গাড়িতে। তারপর পরিদাদুর দিকে চেয়ে বললেন, 'ওয়েল ডান মিস্টার চ্যাটার্জি, আপনি দারুণভাবে হেল্প করলেন ইন্ডিয়া এবং নেপাল দু—দেশের সরকারকেই। ইউ ক্যান নট ইম্যাজিন আমরা কী ভীষণ ওরিড ছিলাম এই গ্যাংটাকে নিয়ে। শুধু একটাই ফেলিওর থেকে গেল জানেন'—

'কী বলুন তো?' ক্লান্ত গলায় বললেন পরিদাদু।

'ওই টুকরো কাগজটা, ওটা খুব ইম্পরট্যান্ট ছিল পরিমলবাবু টোটাল গ্যাংটা সম্পর্কে ইনফরমেশন কালেক্ট করার জন্যে। অবশ্য আপনারও ওই সিচুয়েশনে কিছু করার ছিল না বুঝতে পারছি। লায়নের হাত থেকে বাঁচার জন্যে'—

বিকাশ বসুর কথা শেষ হবার আগেই হো হো করে হাসতে থাকেন পরিদাদু, 'কিচ্ছু হারায়নি বিকাশবাবু, সব আছে'—

'মানে?' অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করেন বিকাশ।

'ওটা তো নকল। কালোপানির হোটেলে বসে আমার নিজের হাতে বানানো। কিছুদিন আগে ইন্টারনেটে এনিগমা সম্পর্কে কিছু তথ্য দেখে ইন্টারেস্টেড হয়ে পড়াশুনো করছিলাম। সেকেন্ড ওয়ার্ল্ড ওয়ারের সময় থেকে এই অদ্ভুত ডিকোডিং সিস্টেম কী ধুন্ধুমার কাণ্ডই না বাঁধিয়েছিল বলুন। আমি নিজেও তো ডিফেন্সে ছিলাম বেশ কিছুদিন। এ ব্যাপারগুলো সম্পর্কে প্রাথমিক ধারণাও ছিল কিছুটা। দেখুন এই সব কিছুই কেমন কাজে লেগে গেল। বলে না জীবনের ধন কিছুই ফেলা যায় না। আপনার চিন্তা নেই, অরিজিনাল সাংকেতিক চিঠিটা আমার হাত ব্যাগে রাখা আছে আমার ঘরে। আপনি চলুন, ওটা আপনাকে হ্যান্ড ওভার করে রেহাই পাই আমি। একটা চিঠির জন্যে যা ঝক্কি পোয়াতে হল মশাই আমাদের'—

বিকাশবাবু উত্তেজিত হয়ে পরিদাদুকে একেবারে জড়িয়ে ধরলেন দু—হাত দিয়ে, 'আপনি মারাত্মক লোক মশাই। তুলনা নেই আপনার। একেবারে কামাল করে দিয়েছেন তো দেখছি।'

'অ্যাকচুয়্যালি আমি কিছুই করিনি', পরিদাদু লাজুক মুখে বললেন, 'সবই সম্ভব হল ওই টুপিটা এক্সচেঞ্জ হয়ে গিয়ে', বলতে বলতেই চোখ ঘুরিয়ে নিজের বাঁ দিকে তাকালেন পরিদাদু। টুপিটা অত্যন্ত অবহেলায় পাহাড়ের এক কোণে একটা বুনো ঝোপের ওপরে পড়ে রয়েছে একদিকে কাত হয়ে। পরিদাদু ছুটে গিয়ে বড় যত্ন করে টুপিটাকে নিজের হাতে তুলে নিলেন। বিকাশ বসু তাড়া দিলেন পরিদাদুকে, 'আর দেরি কেন, চলুন এবার। ওদিকে আপনার বাড়ির লোকেরা যে চিন্তায় রয়েছেন। তাছাড়া উপলবাবুর ফিজিক্যাল কন্ডিশন এখন কেমন সে খোঁজটাও তো নেওয়া দরকার।'

পরিদাদু টুপিটা মাথায় দিয়েই ধীর পায়ে পাহাড় বেয়ে ওপরে উঠে এলেন। বিকাশ বসু নিজে গাড়ির দরজা খুলে দিয়ে হাত বাড়ালেন তাঁর দিকে, 'আসুন, উঠে পড়ুন ভিতরে'। গাড়ি ছেড়ে দিল। আকাশ আলো করে পাহাড়ের মাথায় মাথায় রোদ ছড়িয়ে পড়ছে তখন। বিকাশ বললেন, 'পাহাড়ের রঙিন চূড়াগুলো দেখুন, কী অসামান্য লাগছে। রাতে চাঁদের আলোতেও টেরিফিক লাগে পিকগুলো। কাল আপনাকে দেখাব ভেবেছিলাম। আমার ভাবতে অবাক লাগে মাঝে মাঝে জানেন তো, এত নিখুঁত সুন্দরের মধ্যে থেকেও মানুষ মনে মনে কদর্য হয় কী করে'—

পরিদাদু এ কথার কোনো উত্তর দিলেন না। গাড়ির জানালা দিয়ে বাইরের আকাশের দিকে তাকিয়ে রইলেন আনমনে।

১৩

উপল দত্তের শরীরের অবস্থা উদ্বেগজনক। প্রীতম ছটফট করছিলেন উত্তেজনায়। উপলের স্মৃতি প্রায় কিছুই কাজ করছে না। এমনকি প্রীতমকেও চিনতে পারছেন না তিনি আর। তাঁর ধারণা নেপাল নয়, তিনি নিজের বাড়িতেই আছেন। কাজেই এখান থেকে কোথাও যেতে হবে বললে অ্যারোগ্যান্ট হয়ে যাচ্ছেন। তাঁর ধারণা একদল মন্দ লোক জোর করে তুলে নিয়ে যেতে চাইছে তাঁকে বাড়ি থেকে। প্রীতম প্রায় কাঁদো কাঁদো মুখে অরুণাংশুদের সামনে এসে দাঁড়ালেন। অসহায়ভাবে বললেন, 'কী করি বলুন দেখি এখন, ওকে নিয়ে আর তো মুক্তিনাথের পথে এগোনো সম্ভব নয়। ইমিডিয়েটলি ওকে হস্পিটালাইজড না করলেই নয় এ যা অবস্থা এখন। অথচ আমরা তো নিজেদের গাড়ি আনিনি। আপনাদের তো বলা যায় না যে আমাদের জন্যে আপনারাও ফিরে চলুন'—

'কেন বলা যাবে না প্রীতমবাবু,' পরিদাদু তাঁর কাঁধে হাত রাখলেন, 'বিপদের সময় আপনাকে ছেড়ে চলে যাব এমন বন্ধুআমরা নই। চলুন আমরা সকলেই ফিরে যাই এবার। মুক্তিনাথ যাওয়া তো আর পালিয়ে যাচ্ছে না, কী বল অরুণ?'

'তাছাড়া তোমার ওপর দিয়েও তো ধকল কম গেল না পরি', অরুণাংশু বললেন, 'তোমার মাথার চোটটাও হসপিটালে একবার দেখিয়ে নেওয়া দরকার।'

বিকাশ বসু বললেন, 'আমি আপনাদের সঙ্গে যেতে পারছি না বলে দুঃখিত। এখানে কতকগুলো ফরম্যালিটিস সেরে বেরবো আমি। আপনারা দেরি করবেন না। কোথাও না থেমে সোজা পোখরা মনিপাল হাসপাতালে নিয়ে চলে যান। অত্যন্ত ভালো পরিষেবা ওখানে। আমিও এখান থেকে ফোনে আগাম ব্রিফ করে রাখছি ওদের। চিন্তার কারণ নেই, উপলবাবুর যে সিম্পটম দেখছি তাতে মনে হয় ইটস আ কেস অফ বি পি ডি, প্রপার ট্রিটমেন্ট পেলে একদম ঠিক হয়ে যাবেন উনি। আপনারা ওঁর ট্রিটমেন্টটা স্টার্ট করান, আমি হসপিটালে গিয়ে আপনাদের মিট করে নিচ্ছি।'

'বি পি ডি টা কী মিস্টার বোস, গোলমেলে কিছু?' প্রীতম জিজ্ঞেস করলেন।

'বি পি ডি স্ট্যান্ডস ফর বাইপোলার ডিসঅর্ডার', পরিদাদু বললেন, 'আসলে নর্মাল কনশাস মাইন্ডের পাশাপাশি অ্যাবনরমাল মাইন্ডটাও মাঝে মাঝে সামনে এসে যায় এক্ষেত্রে। সব তালগোল পাকিয়ে যায় তখন।'

'এগজ্যাক্টলি'। বিকাশ বসু হাসলেন, 'ঠিক আছে, রওনা দিন তাহলে। ওখানে আবার দেখা হচ্ছে আমাদের।'

ব্যাগ ট্যাগ সব গাড়ির মাথায় তোলা হয়ে গেলেও গোলমাল বাঁধল উপল দত্তকে নিয়ে। কিছুতেই যেতে রাজি নন তিনি। তাঁর ধারণা, পথে ঘাটে সন্ত্রাসবাদীরা ওঁত পেতে আছে। তাঁকে দেখলেই ধরে নিয়ে গিয়ে গুম করে রাখবে কোথাও। সবাই মিলে চেষ্টা করেও তাঁকে বিশ্বাস করানো গেল না যে তিনি বাড়িতে নয়, নেপালে আছেন এ মুহূর্তে। শেষমেশ পরিদাদু এগিয়ে গেলেন তাঁর দিকে। বাচ্চা ছেলে মেয়েকে ভোলানোর ভঙ্গিতে সেই টুপিটা উপলবাবুর সামনে দোলাতে দোলাতে তিনি জিজ্ঞেস করলেন তাঁকে, 'এই টুপিটা আপনার পছন্দ উপলবাবু?' একটুক্ষণ টুপিটার দিকে তাকিয়েই চোখদুটো চক চক করে উঠল তাঁর। ছেলেমানুষের মতন হাত বাড়িয়ে টুপিটাকে ধরতে গেলেন তিনি। পরিদাদু দ্রুত হাতটা সরিয়ে নিয়ে 'উঁহু, উঁহু,— এখন তো দেব না', বলে মিষ্টি করে হাসলেন, 'এটা আপনাকে দেব, কিন্তু তার জন্যে আপনাকে যেতে হবে আমাদের সঙ্গে।'

'সত্যি দেবেন, প্রমিস'— শিশুর মতন বলে উঠলেন উপল।

'প্রমিস'। পরিদাদু বললেন তাঁর চোখে চোখ রেখে। উপল আর কোনো প্রশ্ন করলেন না। লক্ষ্মী ছেলের মতন গুটি গুটি পায়ে উঠে গেলেন গাড়ির মধ্যে।

গাড়ি ছেড়ে দিলে দু—হাত কপালে ঠেকিয়ে 'দুগ্গা দুগ্গা' বলে উঠলেন সুছন্দা। তারপর পরিদাদুকে চাপা গলায় বললেন, 'জানো পরিকাকু, খুব ইচ্ছে ছিল প্রাণ ভরে পুজো দেব মুক্তিনাথ নারায়ণকে। কিন্তু আমার পুজো তিনি নিলেন না।'

পরিদাদু তার মাথায় হাত রেখে হাসলেন, 'দূর বোকা মেয়ে, কে বলেছে তিনি পুজো নেননি তোর; আসল নারায়ণ তো মানুষের শরীরের মধ্যেই লুকিয়ে বসে থাকেন চুপটি করে আর ঠিকঠাক পুজো পাবার জন্যে অপেক্ষা করেন। এই যে অসুস্থ আর বিপদগ্রস্ত মানুষদুটির পাশে দাঁড়ালাম আমরা মন প্রাণ দিয়ে, এ তো আসলে তাঁরই পুজো করা'—

'সত্যি বলছ পরিকাকু, তিনি আমাদের এ পুজো গ্রহণ করেছেন?'

'কোনো সংশয় নেই', পরিদাদু হাসতে থাকেন, 'সত্যি, সত্যি, সত্যি'—

সকালের ঝকঝকে রোদে হাসতে হাসতে গাছপালা, পাহাড় নদী সকলেই পরিদাদুর সঙ্গে গলা মিলিয়ে বলতে থাকে 'সত্যি সত্যি সত্যি'—

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%