মিথ্যে

জয়দীপ চক্রবর্তী

পরিদাদু চোখ কুঁচকে জিজ্ঞেস করলেন, 'তোমার বাইকে কি আর একসঙ্গে তিনজনে যাওয়া যাবে?'

'অনায়াসে', দিগন্তদা একগাল হেসে বলল, 'এমনিতেই আমার গাড়ির সিট যথেষ্টই বড়। দুজনে দিব্বি বসে পড়া যায় আমার পিছনে। আর শানু তো আস্ত একটা মানুষের পর্যায়েই পড়ে না। যা পেংলু চেহারা ওর, মেরেকেটে ওকে হাফজন বলা চলে।'

পরিদাদু দিগন্তদার কথা শুনে শাওনের দিকে একবার আড়চোখে তাকিয়ে নিয়ে খিক খিক করে হেসে উঠলেন। শাওনের মনে মনে রাগই হল একটু। সে মোটাসোটা নয় ঠিকই, তবে তাকে একেবারে রোগা কাঠিও বলা চলে না নিশ্চয়ই। আজকাল সক্কাল সক্কাল ঘুম থেকে উঠে পরিদাদুরই মতন সেও রীতিমতন গা ঘামায়। ফ্রি হ্যান্ড এক্সারসাইজ করে অন্তত আধ ঘণ্টা। তারপর মিনিট পনেরো প্রাণায়াম। পরিদাদুই বলেছেন সকালবেলার হালকা ব্যায়াম আর প্রাণায়াম শরীরের সঙ্গে সঙ্গে মনটাকেও তাজা রাখে। এমনকি একাগ্রতা আর স্মৃতিশক্তিও নাকি বাড়িয়ে দেয় অনেকখানি। পরিদাদুর এই শেষের কথাটা শুনেই খুব উত্তেজিত হয়ে পড়েছিলেন সুছন্দা। শাওনের দিকে তাকিয়ে উৎসাহ নিয়ে বলে উঠেছিলেন, 'পরিদাদুর কথা শুনলি তো। কাল থেকেই লেগে পড়। স্মৃতিশক্তির যা বহর তোর, পরীক্ষা এলেই তো মালুম পাস এ কথা। কাজেই প্রাণায়াম টানায়াম করে দেখ যদি মগজের গোবরগুলো ধুয়ে মুছে সাফ করে ফেলতে পারিস খানিক।'

পরিদাদু তখন অবশ্য শাওনের পক্ষই নিয়েছিলেন। সুছন্দাকে এক ধমক দিয়ে বলেছিলেন, 'খামোখা ছেলেটাকে অমন আন্ডারএস্টিমেট করছিস কেন খুকু? শানু মোটেই গবেট নয়। পরীক্ষাতেও এমন কিছু খারাপ করে না ও। গেল বছরেও প্রথম দশ জনের মধ্যেই তো ছিল ও। তুই বলতে পারিস, কেন ও ফার্স্ট হয়নি। এ তোদের ভারি অন্যায়। সব মা যদি চায় তার ছেলেই পরীক্ষায় ফার্স হবে তাহলে সেটা বাস্তবে কি সম্ভব? কাজেই শুধুমুধু ওকে এসব না বলে পারলে তুই আর অরুণাংশুও সকালে উঠে এটা চালু করে দে।'

বাবা মা অবশ্য এক্সারসাইজ বা প্রাণায়াম কিছুই শুরু করার সময় পাননি এখনও অব্দি, কিন্তু শাওন পরিদাদুর কথায় এটা চালিয়ে যাচ্ছে নিয়ম করে। ব্যাপারটা ভালোও লাগছে তার। এমনকি পরিদাদুই একদিন বলেছেন তাকে, 'শরীরটা ফিট আর চনমনে রাখাটাই আসল কথা। বেমক্কা মেদ বাড়িয়ে স্বাস্থ্যবান হবার মানেই হয় না কোনো'। অথচ সেই পরিদাদুই আজ দিগন্তদার কথায় পক্ষান্তরে সায় দিয়ে দিলেন। মাঝে মাঝে কী যে করেন না পরিদাদু। তখন পরিদাদুকে যেন তার অচেনা মনে হয়।

দিগন্তদা আবার তাড়া লাগাল, 'পরিদাদু, চলুন। আর দেরি করলে সময়মতন পৌঁছতে পারব না কিন্তু। ওরা কিন্তু এক্কেবারে ঘড়ির কাঁটা মিলিয়ে কাজটা করে।'

'কটার সময় যেন?'

'সকাল আটটা। শীত গ্রীষ্ম বর্ষা... বারোমাস। তারপরে ঘণ্টা খানেক ঘণ্টা দেড়েক ওই পথে কেউ চলে না। জায়গাটা ফাঁকা রেখে দেয়। তারপর আবার এই ধরুন সাড়ে নটা, দশটা থেকে আবার সব স্বাভাবিক। রাস্তার কাজ, চা-বাগানে চা পাতা তোলার কাজ, বা ধরুন পাহাড়ের ঢালে ঢালে গাছের শুকনো কাঠ, শুকনো পাতা সংগ্রহ করার কাজ জ্বালানির জন্যে...'

'চলো দেখা যাক', বলে বাঁ হাত ভাঁজ করে হাতঘড়িটার দিকে একবার তাকিয়ে নিয়ে সিঁড়ি দিয়ে নীচে নামতে শুরু করলেন পরিদাদু। দিগন্তদা শাওনের দিকে চেয়ে চোখের ইশারায় ডাক দিয়ে ডানহাতের তর্জনিতে বাইকের চাবির রিংটা ঘোরাতে ঘোরাতে নিজেও নামতে শুরু করল একতলার দিকে।

ছোটমামার শরীর খারাপ শুনে পরিদাদুর সঙ্গে শিলিগুড়ি এসেছে শাওন দিন তিনেক হল। আর দু-দিন পরেই ফেরা। দার্জিলিং মেলে টিকিট আছে। মামার শরীর এখন আগের চেয়ে অনেকটাই সুস্থ। হাসপাতালে ছিলেন কয়েকদিন। এখন ছাড়া পেয়ে বাড়ি ফিরেছেন। মামাই বলছিলেন কাল রাতে, 'পরিকাকু, শানুটার কোথাও ঘোরা বেড়ানো হল না। আবার কবে এদিকে আসবে ছেলেটা তার ঠিক নেই...'

'তাতে কী আছে', পরিদাদু ছোটমামার কাঁধে হাত রেখে বলছিলেন, 'শানু তো ছোট্টটি নেই আর। ও নিজেও জানে এবারে আমরা বেড়াতে আসিনি।'

'হ্যাঁ ছোটমামু', শানুও মাথা নেড়ে পরিদাদুর কথায় সায় দিয়ে বলেছিল, 'পরে আবার আসব আমরা। তখন তুমি, মামি, তুড়িদিদি, দিগন্তদা, আমরা সব্বাই একসঙ্গে বেড়াতে যাব কোথাও একটা। খুব মজা হবে তখন।'

তুড়ি শাওনের ছোটমামার মেয়ে। বছরখানেক হল দিগন্তর সঙ্গে বিয়ে হয়েছে। আগে কিছুটা দূরে থাকত। এখন বলাকার মোড়ের কাছেই ফ্ল্যাট কিনে মামার বাড়ির কাছাকাছি চলে এসেছে। দিগন্তদা ভীষণ ভালো মানুষ। যেমন করিতকর্মা ও কর্তব্যপরায়ণ তেমনই মিলুকমিশুক। শাওনের কথা শুনে দিগন্তদাই বলে উঠল, 'পরের বার আসার আগে আমাকে শুধু একটু আগে থেকে জানিয়ে রেখো শানু। বেড়ানোর পুরো প্ল্যান আমি করে রাখব, ভাবতে হবে না তোমাদের কিচ্ছু', তারপরে ও-ই পরিদাদুর দিকে চেয়ে বলে উঠেছিল হঠাৎ, 'কাল এক জায়গায় যাবেন পরিদাদু? আপনি তো নানা রহস্যের পিছনে দৌড়েছেন বিভিন্ন সময়ে। এখানে একটা জায়গা আছে রংটং এর কাছাকাছি। শুনেছি সেখানে রোজ অদ্ভুত একটা ঘটনা ঘটে।'

'কীরকম?' আগ্রহ নিয়ে জিজ্ঞেস করলেন পরিদাদু।

'শিলিগুড়ি থেকে কার্শিয়াং এর দিকে যেতে রংটং জায়গাটা পড়ে', দিগন্তদা বলতে শুরু করে।

'হ্যাঁ জানি', পরিদাদু তার কথার মধ্যেই বলে ওঠেন, 'শুকনা পেরিয়ে তো? রংটং এ তো টয় ট্রেনের স্টেশনও আছে।'

'আপনি তো তাহলে জানেন', দিগন্তদা আবার বলে, 'রংটং রেল স্টেশনটা পেরিয়ে আরও খানিকটা এগিয়ে গেলে ডানদিকে একটা রাস্তা এঁকেবেঁকে পাহাড়ের গা বেয়ে এক্কেবারে ওপর দিকে উঠে গেছে। পথটা খাড়াই এবং নির্জন। এমনিতে লোকজনের যাতায়াত তেমন নেই ওদিকে। ওই পথে সোজা খানিকটা উঠে গিয়ে পাহাড়ের ঢালে একটা গ্রাম আছে। সেই গ্রামের লোকেরা ওদিকে যায় শুকনো কাঠ পাতা সংগ্রহ করতে। একশো দিনের কাজের জন্যে মাঝে সাঝে যখন রাস্তা মেরামত বা পরিষ্কারের দরকার হয়, তখন কিছু লোক কাজের খাতিরে ওদিকে যায়। তা না হলে এমনিতে জায়গাটা শুনশান। আগে ওখানে একটা চা বাগান ছিল। এখন বন্ধ হয়ে গেছে। ছড়িয়ে ছিটিয়ে কিছু চা গাছ আছে ঠিকই, তবে দেখভাল বা পরিচর্যা না থাকলে যা হয়... অনেকখানি ওপরে উঠলে পাহাড়ের ঢালের দিকে ডানদিকে একটা বহু প্রাচীন সমাধিভূমি আছে। অধিকাংশই তাদের মধ্যে মাটির সঙ্গে মিশে গেছে এখন। মাত্র চার পাঁচটা সমাধি ইট দিয়ে গেঁথে পরিপাটি করে বাঁধানো ছিল। সেই কটিই অবশিষ্ট আছে কেবল। একসময় সাদা পাথরের ফলকে পরিচয়লিপি খোদাই করা ছিল সমাধির গায়ে। এখন সাদা ফলকগুলো আছে, কিন্তু লেখাগুলো মুছে গেছে। সেই সমাধিভূমিও এখন পরিত্যক্ত। শেষ সেখানে মাটির নীচে শোওয়ানো হয়েছিল বন্ধ চা-বাগানের এক বেচারা শ্রমিককে। ক্ষিদের জ্বালা সইতে না পেরে সে আত্মহননের পথ বেছে নিয়েছিল...'

'ইশ...' ব্যথায় চোখমুখ কুঁচকে গিয়েছিল পরিদাদুর। নীচু ও করুণ স্বরে বলে উঠলেন তিনি, 'তারপর?'

'কাগজে লেখালেখি হয়েছিল ঘটনাটা', দিগন্তদা বলতে শুরু করে আবার, 'রাজনীতির লোকেদের মধ্যে কিছুদিন ঘটনাটা নিয়ে খুব খানিক চাপান উতোর হল। তারপর যা হয়, ঘটনাটা থিতিয়ে গেল ক্রমশ... চা-বাগানের ওই এলাকা একেবারে পরিত্যক্ত হয়ে গেল। যে দু-এক ঘর লোক থাকত ওদিকে, তারাও চলে গেল ওখান থেকে। নেমে এল নীচের গ্রামে। তারা একশ দিনের কাজ পেল অনেকেই...'

'ওদিকটা একেবারেই ফাঁকা হয়ে গেল তাহলে দিগন্তদা?' শাওন বলে উঠল, 'কেউ আর যেত না ওদিকে তারপর থেকে?'

'তখনও কেউ কেউ যেত। বিশেষত ওই চা-বাগানে যারা কাজ করত একসময় তাদের জায়গাটা সম্পর্কে একটা মায়া ছিল। কিন্তু একবার এমন একটা ঘটনা ঘটল...'

'কী ঘটল দিগন্তদা?'

'ফিলিপ মুর্মু নামে একটা লোক একদিন সকালে ওদিকে গিয়েছিল শুকনো কাঠ পাতার সন্ধানে। ওই সমাধির ঠিক উলটোদিকে ভারী সুন্দর ভিউ পয়েন্ট আছে একটা। অসংখ্য গাছপালা সমেত পুরো পাহাড়টা ওইদিক দিয়ে গড়িয়ে নেমে গেছে নীচের দিকে। তারপর একটা তিরতিরে নদী ছুঁয়ে আবার ওপরের দিকে মাথা তুলে আরও উঁচু সবজেটে নীল একটা পাহাড়ের সঙ্গে মিশে গেছে। খুব সুন্দর জায়গাটা। ওখানে গিয়ে দাঁড়ালে সেই নিস্তব্ধ সৌন্দর্যে নিজেকে খুব ভাগ্যবান মনে হয়। তুচ্ছও মনে হয় নিজেকে। অহংকার টহংকার থাকলে সব কেমন যেন গুঁড়ো গুঁড়ো হয়ে ঝরে পড়ে পাহাড়ি বাতাসের সঙ্গে উড়ে যায় গভীর খাদের দিকে। ওখানে একটা বসার জায়গা করা আছে। আমিও বেশ কয়েকবার বসে থেকেছি একলা একলা ওই বেঞ্চিতে। আর আমার মন খারাপ থাকলে ভালো হয়ে গেছে মন', বলতে বলতে কথার খেই হারিয়ে ফেলে যেন দিগন্তদা। পরিদাদুই খেই ধরিয়ে দিয়ে বললেন, 'দিগন্ত, তুমি ফিলিপ মুর্মুর কী একটা কথা যেন বলছিলে?'

'হ্যাঁ হ্যাঁ', দিগন্তদা কোলের ওপরে একটা বালিশ চাপিয়ে নিয়ে বলে, 'ফিলিপ ওই বেঞ্চে বসে গামছায় বেঁধে আনা খাবার বের করে খাচ্ছিল। খাওয়া শুরু করেছে যেই, অমনি শুকনো পাতায় একটা খসখস আওয়াজে চমকে পিছন ফেরে সে। আর তখনই ব্যাপারটা তার চোখে পড়ে যায়। আর ভয়ে সারা শরীর হিম হয়ে যায় ফিলিপের। বেঞ্চের ওপরেই খাবারদাবার ফেলে রেখে পাঁই পাঁই করে দৌড়ে নীচে নেমে আসে সে।'

'ফিলিপ মুর্মু কী দেখেছিল দিগন্তদা?' শাওন অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করে।

'দুটো হাত। কালো, শীর্ণ দুটো হাত।'

'দুটো হাত?' অবিশ্বাসের গলায় বলে ওঠেন পরিদাদু।

'হ্যাঁ। দুটো হাত। একটা জীর্ণ সমাধির মধ্যে থেকে বেরিয়ে এসে হাত দুটো খেতে চাইছিল।'

'যাহ!' শাওন চোখ গোল গোল করে বলে ওঠে। দিগন্তদা বলে চলে, 'বীরু চন্দ না খেতে পেয়ে মরেছিল তো, গ্রামের সকলেই বলল মরার পরেও বীরুর ক্ষিদে যায়নি। ফিলিপের কথা শুনে তারা খানিক বাদে দেখতে এসেছিল।'

'কী দেখল তারা দিগন্তদা?' শাওন আবার জিজ্ঞেস করল।

'দেখল বেঞ্চের ওপরে ফিলিপের থালা বাসনগুলো পড়ে আছে, কিন্তু খাবারের কণামাত্রও পড়ে নেই। বীরু এক্কেবারে চেটেপুটে খেয়ে গেছে সব। সেই রাতে ঘুমের মধ্যেই মারা যায় ফিলিপ। সকলে বলে বীরুর অশরীরি আত্মাকে দেখে ফেলার জন্যেই মারা যায় সে। সেই থেকে রোজ সকালে গ্রামের লোকেরা সবাই মিলে বীরুর জন্যে খাবার রেখে আসে সমাধিভূমিতে। রোজ সকাল আটটার সময়। রেখে দিয়েই কোনো দিকে না তাকিয়ে দুদ্দাড় করে নেমে আসে। আবার ঘণ্টা দেড়েক বাদে ফিরে গিয়ে থালা বাসনগুলো নামিয়ে আনে সেখান থেকে। প্রতিদিনই থালা বাসন ফাঁকা করে খেয়ে সমাধিভূমির বাইরে রাস্তায় এনে রেখে যায় বীরু।'

'বীরুই যে তার প্রমাণ কী?' পরিদাদু বলেন।

'ওদিকে যে জনবসতি নেই পরিদাদু। কাউকে যেতে গেলে এই গ্রাম টপকে এ রাস্তা দিয়েই তো যেতে হবে'। দিগন্তদা বলে।

'কোনো জন্তু জানোয়ারেও তো খেতে পারে'। পরিদাদু আবার বলেন।

'জন্তু জানোয়ার কি কাঁটা বেছে রেখে মাছ খায় পরিদাদু? হাড় বাদ দিয়ে মাংস? তাছাড়া খাবার পরে তারা থালা বাসন সমাধির বাইরে রাস্তায় এনে রাখবে কেন?' দিগন্তদা বোঝানোর চেষ্টা করে পরিদাদুকে।

'আমি ওখানে গিয়ে নিজে চোখে ব্যাপারটা দেখতে চাই দিগন্ত', পরিদাদু গম্ভীর গলায় বলেন, 'তুমি কি আমায় ওখানে নিয়ে যেতে পারো?'

'পারি। কবে যাবেন বলুন'।

'কাল'।

'কালই?'

'আমার হাতে যে বেশি সময় নেই। ফেরার সময় হয়ে গেছে যে।'

তুড়িদিদি ভয় পাওয়া গলায় বলে উঠল, 'দরকার কি পরিদাদু? ওসব অলুক্ষুনে জায়গায় না গেলেই কি নয়? শুনছ তো বীরু চন্দের প্রেতাত্মাকে দেখে কী হাল হয়েছিল ফিলিপ নামে লোকটার...'

'দিগন্ত, তুড়ি ভয় পাচ্ছে যখন তোমার গিয়ে কাজ নেই ভাই, জায়গাটা আমি অনুমান করতে পারছি। আমি একাই চলে যাবখন কাল সকালে', পরিদাদু দিগন্তদার কাঁধে চাপড় মেরে বললেন।

'পাগল নাকি!' দিগন্তদা প্রতিবাদ করে উঠল, 'আপনি ভাবলেন কী করে যে আপনাকে আমি একলা ছেড়ে দেব! আর তুড়ির কথায় আমি ভয় পেয়ে যাব এতটাই ভিতু নাকি আমি? আমি বরং বলি এসব ঝামেলায় শানুকে জড়িয়ে কাজ নেই। আমরা দুজনেই কাল ঘুরে আসি আমার বাইকে চেপে।'

'পরিদাদু গেলে আমিও যাব', চেয়ার থেকে লাফিয়ে দাঁড়িয়ে উঠল শাওন।

তুড়িদিদি ওর দিকে চেয়ে বলল, 'শানু তোর ভয় করবে না?'

'পরিদাদু সঙ্গে থাকলে আমি কোনোকিছুকে ভয় পাই না', জোর গলায় বলল শাওন।

হিলকার্ট রোড ধরে সোজা এগিয়ে ডি পি এস স্কুল পেরিয়ে যাবার পরেই চারপাশটা দুম করে যেন পালটে গেল। শিলিগুড়ি শহরের ঘিঞ্জি ভাবটা আর নেই এদিকে। ডানদিকে মহানন্দা ওয়াইল্ড লাইফ স্যাংচুয়ারি পেরোতেই দু-দিকে জঙ্গল শুরু হয়ে গেল। বাতাসটাও ঠান্ডা হয়ে গেল দুম করে। শীত করছে না, কিন্তু সেপ্টেম্বারের শুরুর গুমোট আবহাওয়াটা আর নেই। শুকনা টয়ট্রেন স্টেশন পেরিয়ে আরও বেশ কিছুটা এগিয়ে রংটং। রাস্তার ডানদিকে টয়ট্রেনের স্টেশনে লেখা বোর্ড থেকে শাওন জানতে পারল জায়গাটার উচ্চতা চোদ্দোশো ফুট। পরিদাদু ঘড়ি দেখলেন। নিজের মনেই বললেন, 'সাতটা পাঁচ'।

দিগন্তদা বলল, 'চিন্তা নেই পরিদাদু। মিনিট পনেরো কুড়ির মধ্যেই পৌঁছে যাব আমরা। আরও আগেই হয়ে যেত, কিন্তু আর একটু এগিয়েই মূল রাস্তা থেকে ডান দিকে বেঁকে ওপরে উঠে যেতে হবে আমাদের। ওই রাস্তাটা খাড়াই আর এবড়োখেবড়ো। জোরে গাড়ি চালানো যাবে না।'

'অযথা ঝুঁকি নেবার দরকার নেই। জোরে যেতে হবে না। তুমি আস্তেই চলো'। পরিদাদু বললেন।

পুরোনো সমাধিক্ষেত্রটার কাছে এসে পৌঁছলো যখন ওরা, তখন সাড়ে সাতটা। এটা একটা হিলটপ। কিছুটা সমান চাতাল ডিঙিয়ে রাস্তাটা আবার নীচু হয়ে নামতে শুরু করেছে সামনের দিকে। পুরো এলাকাটাই অসম্ভব রকমের শান্ত। পরিদাদু সমাধিক্ষেত্রগুলোর সামনে গিয়ে দাঁড়ালেন। মন দিয়ে দেখলেন সেগুলোকে। সাকুল্যে গোটা পাঁচেক বাঁধানো সমাধি। কাদের সমাধি বোঝার উপায় নেই আর। তারপরেই পাহাড়ি ঢাল বন্য লতা ঝোপ জঙ্গল গায়ে জড়িয়ে নীচে নেমে গেছে। সমাধিক্ষেত্রের পাশে একটা মস্ত পাকুড় গাছ। আরও একটা ঝাঁকড়াগাছ রয়েছে, কিন্তু সেটা কী গাছ শাওন বুঝতে পারল না। গাছ থেকে শুকনো পাতা ঝরে পড়ছে সমাধির ওপরে। কয়েকটা পাখি নিজেদের মনেই কিচিরমিচির করছে গাছের ডালে ডালে। কোথায় কী ঘটে যাচ্ছে, কোনোদিকেই খেয়াল নেই তাদের। লতা আর ঝোপের আড়ালে এই দিনের বেলাতেও ঝিঁ ঝিঁ ডাকছে। পরিদাদু রাস্তার উলটোদিকে চলে এলেন। এদিক থেকে অপূর্ব লাগছিল খাদের ওপারের আরো অনেক উঁচু পাহাড়গুলো। পুরো পাহাড়টাই সবুজ। কত যে গাছ পাহাড়ের গা জড়িয়ে, আর তাদের পাতা যে কত বিচিত্র রকমের সবুজ, হাঁ করে দেখছিল শাওন। বার বার মনে হচ্ছিল তার যত রং পেনসিল আর ওয়াটার কালারই থাক না, প্রকৃতির দেওয়া এই যে রঙ তাকে কিছুতেই কাগজের ওপরে ধরা যাবে না। দিগন্তদা তার পাশে এসে দাঁড়াল। বলল, 'জায়গাটা সুন্দর না শানু?'

'খুব'। ছোট্ট করে উত্তর দিল শাওন। পরিদাদু হাতের ইশারায় চুপ করতে বললেন তাদের। দূরে মানুষের গলার আওয়াজ পাওয়া যাচ্ছে। দিগন্তদা বলল, 'পরিদাদু, ওরা আসছে। বীরু চন্দের জন্যে খাবার নিয়ে আসছে ওরা।'

পরিদাদু চাপা গলায় বললেন, 'দিগন্ত কুইক। তোমার বাইকটা আর একটু দূরে রেখে এসো। আর চলো আমরা রাস্তার এইদিকেই একটু ঢালের দিকে নেমে গিয়ে ঝোপের আড়ালে লুকিয়ে পড়ি। আমি চাই না আমাদের উপস্থিতিটা এক্ষুনি কারও কাছে এক্সপোজড হোক'। ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা বাঁধানো সমাধিগুলো থেকে খানিক তফাতে রাস্তার উলটোদিকে একটা মোটা গাছ আর লতায় মোড়া ঝুপসি বুনো ঝোপের আড়ালে দ্রুত লুকিয়ে ফেলল ওরা নিজেদের। তারপর অপেক্ষা করতে লাগল চুপটি করে।

সাত-আটজনের একটা দল নিজেদের মধ্যে কথা বলতে বলতে এসে থামল সেই সমাধিক্ষেত্রের সামনে। তারপর একটা বাঁধানো উঁচু সমাধির ওপরে পড়ে থাকা পাতাগুলো ঝাঁট দিয়ে পরিষ্কার করে খুব যত্নের সঙ্গে থালা এবং বাটিতে খাবার সাজিয়ে রাখতে শুরু করল। খাবার বাড়া হয়ে গেলে বোতলে করে জল রাখল তারা। পাতায় করে সাজিয়ে রাখল কিছু গোটা ফল। তারপর সেই সমাধিভূমির চারদিকে ঘুরতে ঘুরতে সুর করে কীসব বলতে লাগল। পরিদাদু ফিসফিস করে বললেন, 'বীরু চন্দের মৃত আত্মার মুক্তির জন্যে সকলে মিলে প্রার্থনা করছে ওরা মৃত্যুর দেবতার কাছে'। শাওন ঠিকঠাকই ছিল এতক্ষণ। পরিদাদুর কথা শুনে হঠাৎই গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠল তার। ছমছম করে উঠল বুকের ভিতরটা। লোকগুলো সমাধিভূমির সামনে স্থির হয়ে দাঁড়াল কয়েক মুহূর্ত। তারপরেই যেদিক থেকে এসেছিল, সেদিকেই আবার হাঁটা লাগাল হন হন করে। একটিবারের জন্যেও তাদের একজনও আর পিছন ফিরে তাকাল না। পরিদাদুকে কী একটা জিজ্ঞেস করতে যাছিল শাওন। পরিদাদু ঠোঁটের ওপরে ডান হাতের তর্জনি ঠেকিয়ে শ শ শ... আওয়াজ করে কথা বলতে বারণ করলেন তাকে। তারপর এই আবডাল থেকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন সেই সমাধিটার দিকে। এক মিনিট, দু মিনিট, তিন মিনিট... হঠাৎই চাপা গলায় দিগন্তদা ভয়ার্ত কণ্ঠে ডেকে উঠল, 'পরিদাদু'—

পরিদাদু চোখ না সরিয়েই বিহ্বল গলায় শুধু বলে উঠলেন, 'দেখেছি'।

শাওনের বুকের মধ্যে ধড়াস ধড়াস করে শব্দ হচ্ছিল। ভয়ে গলার কাছটা শুকিয়ে কাঠ। এমন কিছু ঠান্ডা নেই, তবু হাতের তালু, পায়ের পাতা উষ্ণতা হারিয়ে ফেলছে দ্রুত। তীব্র আতঙ্কে দিগন্তদার হাতটা প্রাণপণে চেপে ধরল শাওন। পুরোনো সমাধিক্ষেত্রের উঁচু সমাধির বাঁধানো মসৃণ অংশটায় দুটো হাত তখন খুঁজে বেড়াচ্ছে ভাতের থালাটা। দুটো শীর্ণ, কালো কুচকুচে হাত। ক্রমশ সেই দুর্বল হাতদুটোর ওপরে ভর দিয়েই সমাধির ওপরের চ্যাটানো চত্বরটার ওপরে উঠে এল একটা রোগা শরীর। পরনে রংচটা পুরোনো ময়লা প্যান্ট, গা খালি। মাথায় একরাশ চিরুনিবিহীন উসকোখুসকো ঝাঁকড়া চুল। সমাধির ওপরে রাখা ভাতের থালার ওপরে উপুড় হয়ে পড়ে সে গোগ্রাসে খেতে লাগল কোনোদিকে না তাকিয়ে।

দিগন্তদা কাঁপা কাঁপা ভয় পাওয়া গলায় জিজ্ঞেস করল, 'পরিদাদু, গ্রামের লোকেরা তাহলে সত্যি কথাই বলে? এই তাহলে বীরু চন্দ?'

'না', পরিদাদু দীর্ঘশ্বাস ফেলেন, 'এ বীরু চন্দ নয়। এ নেহাতই বাচ্চা ছেলে। সম্ভবত শাওন টাওনেরই বয়েসি, বা আর একটু বেশি'।

'এও কি ভূত?' জিজ্ঞেস করল শাওন। পরিদাদু উত্তর দিলেন না।

ছেলেটা থালার ভাত চেটেপুটে খেয়ে বোতলের জলে হাত ধুয়ে নিল। ঢক ঢক করে খেলও খানিক। তারপর থালা বাটি হাতে নিয়ে এগিয়ে এল রাস্তার দিকে। দিগন্তদা আবার জিজ্ঞেস করল, 'ছেলেটা কে পরিদাদু? এই সমাধিভূমিতে তাহলে কি গ্রামের লোকেদের দেওয়া খাবার একাধিক প্রেত এসে খেয়ে যায়?'

'সেটা জানার চেষ্টা করতে হবে', বলেই আড়াল ছেড়ে বাইরে বেরিয়ে রাস্তায় ছেলেটার এক্কেবারে সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে পড়লেন পরিদাদু। দিগন্ত এবং শাওন দুজনেই আটকানোর চেষ্টা করেছিল তাঁকে, কিন্তু পরিদাদুর জেদ তাদের হার মানালো। চোখের সামনে হঠাৎ পরিদাদুকে দেখে বেজায় ঘাবড়ে গেল ছেলেটা। মুহূর্তের মধ্যে ফ্যাকাশে হয়ে গেল তার মুখ। পরিদাদুর নাগাল এড়িয়ে এক দৌড় লাগালো সে সমাধিভূমির দিকে, কিন্তু লম্বা পা ফেলে তাকে ধরে ফেললেন পরিদাদু। হেসে বললেন, 'ভয় পাস না। আমি তোর বন্ধু।'

ছেলেটা তবু ভয় পাচ্ছিল। তার চোখে কান্না আর আতঙ্ক মিলেমিশে যাচ্ছিল। হাতের আঙুলগুলো থিরথির করে কাঁপছিল তার। দিগন্ত আর শাওনও এবার এসে দাঁড়াল পরিদাদুর পাশে। ছেলেটার দিকে অবাক হয়ে কিছুক্ষণ তাকিয়ে দিগন্ত জিজ্ঞেস করল, 'তুই কে?'

ঝরঝর করে কেঁদে ফেলল এবার ছেলেটা। হাতদুটো বুকের কাছে জড়ো করে বলে উঠল, 'আমাকে ছেড়ে দাও। আর কখনও এমন কাজ করব না আমি। গ্রামের কাউকে আমার কথা বোলো না। সব জানলে ওরা আমাকে মেরেই ফেলবে হয়তো...'

পরিদাদু ওর রুক্ষ মাথায় হাত রাখলেন। শান্ত গলায় বললেন, 'আমরা কাউকে তোর কথা বলব না। শুধু বল তুই এখানে এইভাবে কী করে এলি?'

'আমি রোজ আসি', ছেলেটা পরিদাদুর মুখের দিকে চেয়ে বলল, 'আমার বাবা এখানেই চা-বাগানে কাজ করত একসময়। চা-বাগান বন্ধ হয়ে যাবার পর আমরা খুব গরিব হয়ে পড়লাম। খেতেই পেতাম না। বাবা অভাবে গলায় দড়ি দিল। আমার মা কাজ খুঁজতে টাউনে গিয়ে আর ফিরে এল না। আমার খুব খিদে পেত। কতজনের কাছে খাবার চাইতাম। বেশিরভাগই দিত না। বয়েস কম বলে একশো দিনের কাজেও আমাকে নেয় না। সকলে বলে ছোট বলে আমাকে নাকি কাজে নেওয়া বারণ। আচ্ছা ছোট বলে আমার কি খিদে পাওয়াও বারণ? এই কবরখানার পিছনে একটা জঙ্গলে ঢাকা খাড়াই পাকদণ্ডী আছে। খুব মন খারাপ লাগলে আমি সেই পথ বেয়ে ওপরে উঠে এসে বসে থাকতাম এখানে। দূরের পাহাড়টাকে দেখতাম। গাছ দেখতাম। এখানকার পাখিদের সঙ্গে আমার ভাব হয়ে গেল। ওরা গান গাইত আমায় দেখলে। একটু এগোলে এখানে কিছু জংলি ফলের গাছ আছে। পাখিরা তার ফল খায় দেখে আমিও খেতাম ওই ফল। একটু টক, তবু খিদের মুখে মন্দ লাগত না...' বলে ছেলেটা থামল। জল খেল বোতল থেকে। দিগন্ত কৌতূহলী গলায় জিজ্ঞেস করল, 'তারপর?'

'তারপর...', বলে আকাশের দিকে চাইল ছেলেটা। থেমে থেমে বলতে লাগল, 'সেদিনও পাহাড়ি খাড়াই পাকদণ্ডী বেয়ে ওপরে উঠে ওই কবরটার পিছন থেকে বাইরে বেরিয়ে আসছিলাম আমি। রাস্তার উলটোদিকের বেঞ্চে একজন লোক বসে খাচ্ছিল। আমায় দেখে কেন কে জানে, লোকটা ভয় পেয়ে গেল। বেঞ্চ থেকে উঠে দাঁড়িয়ে পাগলের মতন দৌড়তে লাগল সে নীচের গ্রামের দিকে। আমি অপেক্ষা করলাম। কিন্তু লোকটা ফিরল না। বড্ড খিদে পেয়েছিল তো, লোকটার ফেলে রাখা খাবার আমিই খেয়ে নিয়েছিলাম। তারপর কী হল কে জানে! গ্রামের লোক এখানে খাবার দিয়ে যেতে লাগল রোজ। ওরা খাবার দেয় আর আমার বাবার জন্যে প্রার্থনা করে রোজ। যখনই ওই খাবার খাই, আমার মনে হয় বাবাই আমার জন্যে খাবার পাঠিয়ে দিয়েছে। আসলে বাবা আমাকে খুব ভালোবাসতো তো... আমার জন্যে এখন অনেক খাবার। আমি রোজ একবেলা পেট ভরে খেতে পাই। পরের বেলাটুকু উপোষে থাকতে তাই আর কষ্ট হয় না এখন আগের মতন', ছেলেটা মাথা নীচু করল, 'কিন্তু এবারে সকলে জেনে যাবে বীরু চন্দের ভূত সত্যি সত্যি খেতে আসে না ওই খাবার। আর এখানে খাবার সাজিয়ে রাখবে না গ্রামের লোকেরা...' বলতে বলতে চোখ জলে ভরে এল ছেলেটার। শাওনেরও কান্না কান্না পাচ্ছিল ছেলেটার কথা শুনে। আড়চোখে পরিদাদুর দিকে চেয়ে শাওন দেখল ওঁর চোখদুটোও ভারি নরম হয়ে গেছে। দিগন্ত পরিদাদুর দিকে চেয়ে বলল, 'পরিদাদু, আমাদের এবার রওনা দিতে হবে। আর একটু পরে গ্রামের লোকেরা ফিরে আসবে আবার এখানে। থালা বাসনগুলো সংগ্রহ করবে রাস্তা থেকে। ওর আর এখানে থাকা ঠিক হবে না। আমাদেরও।'

পরিদাদু দিগন্তদার কথায় মাথা নেড়ে সায় দিলেন। ছেলেটার অবিন্যস্ত চুল আঙুল দিয়ে আরও ঘেঁটে দিয়ে বললেন, 'আর দাঁড়াস না। পালা এবার। ভয় নেই। কেউ কিচ্ছু জানবে না। বীরু চন্দের উদ্দেশ্যে দেওয়া খাবার তোরই থাকল এখনও কিছুদিন। তবে নিজেও অন্য কোনো উপায় খুঁজিস এবার। মনে রাখিস সত্যিটা কেউ না কেউ আবারও একদিন জেনে ফেলবে নিশ্চিত। কাজেই নিজের খাবার নিজেই জুটিয়ে নেবার মতন যোগ্য তোকে যে করেই হোক হতেই হবে। সে আজ হোক বা কাল'। ছেলেটা একটুক্ষণ তাকিয়ে রইল পরিদাদুর দিকে। তারপর এক ছুটে হারিয়ে গেল পুরোনো সমাধিভূমির পিছনের জঙ্গলে ঢাকা ঢালু পাকদণ্ডীর আড়ালে।

হই হই করে পথ আটকে দিগন্তদার মোটরবাইকের সামনে দাঁড়িয়ে পড়ল লোকগুলো। ভয়ংকর উত্তেজিত লাগছিল তাদের। হাত পা নেড়ে বার বার জিজ্ঞেস করতে লাগল তারা দিগন্তরা পাহাড়ের মাথার পুরোনো গোরস্তানের দিক থেকে আসছে কিনা। পরিদাদু ঘাড় কাত করে হ্যাঁ বলতেই শাওনদের একেবারে ঘিরে ফেলল তারা। চোখ গোল করে জিজ্ঞেস করতে লাগল, ওখানে অস্বাভাবিক কিছু চোখে পড়ল কিনা তাদের। শাওন মনে মনে ভয় পেয়ে গেল। পরিদাদু মিথ্যে বলেন না সাধারণত। মিথ্যে বররবর ভীষণই অপছন্দ তাঁর। কিন্তু আজ শাওনকে স্বস্তি দিয়ে চোখে মুখে অসম্ভব আতঙ্ক ফুটিয়ে তুলে তিনি বলতে লাগলেন, 'সে এক অসম্ভব দৃশ্য। ভাবতে এখনও শিউরে উঠছি আমি। পাহাড়ের মাথায় যে পরিত্যক্ত গোরস্তান, তার একটা বাঁধানো কবরের ওপরে সাজানো খাবারের থালায় মাথা নীচু করে ঝুঁকে পড়েছে দেখলাম এক প্রেতশরীর। তার কালো, শীর্ণ এবং দীর্ঘ হাত, সেই হাতে বড় বড় নোখ...' পরিদাদুর কথার মাঝখানেই হই হই করে উঠল লোকগুলো। সেইখানেই, রাস্তার ওপরে দাঁড়িয়ে বীরু চন্দের অতৃপ্ত, ক্ষুধার্ত আত্মার জন্যে প্রার্থনা শুরু করে দিল তারা আবার। পরিদাদু দিগন্তদার কানে কানে বলে উঠলেন, 'দেরি কোরো না। গাড়ি স্টার্ট দাও এবার...'

রাস্তায় আসতে আসতে অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল শাওন, 'কিন্তু পরিদাদু, ফিলিপের ওই হঠাৎ মৃত্যুটা?'

'কাকতালীয়। সম্ভবত সেরিব্রাল স্ট্রোক বা অন্য কিছু...'।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%