জয়দীপ চক্রবর্তী
পরিদাদু ডান হাতটা বাড়িয়ে তর্জনি দিয়ে ইশারা করে সামনের পাহাড়টা শাওনকে দেখিয়ে বললেন, 'আমাদের ওই পাহাড়টার মাথায় উঠতে হবে।' এতক্ষণ গাড়িতে আসছিল বলে মালুম হয়নি, কিন্তু কাটরায় পৌঁছে গাড়ি থেকে নামবার পর থেকেই বেশ শীত শীত করছিল শাওনের। হাত দুটোকে প্যান্টের দু—পকেটে ঢুকিয়ে পাহাড়টার দিকে তাকিয়ে চুপ করে দাঁড়িয়ে ছিল সে। পাহাড়টাকে ভারী সুন্দর দেখতে লাগছিল। ঘড়িতে প্রায় সাড়ে আটটা। পুরো উপত্যকা জুড়ে ঠান্ডা ঠান্ডা রাত নেমেছে। এখন যেখানে দাঁড়িয়ে আছে শাওনরা সেখানে আলোর অভাব নেই, কিন্তু উঁচু পাহাড়টাকে ঘিরে রয়েছে ঝুপসি অন্ধকার। আর সেই অন্ধকারের মধ্যে আরও অন্ধকার হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা পাহাড়ের গলা জড়িয়ে রয়েছে বিন্দু বিন্দু আলো। শাওনের মনে হচ্ছিল নানা দৈর্ঘ্যের আলোর মালায় সেজে বসে রয়েছে যেন মস্ত পাহাড়টা।
সুছন্দা জিজ্ঞেস করলেন, 'পরিকাকু, বৈষ্ণোমায়ের মন্দির কি একেবারে চুড়োয়?' 'প্রায়'; বলে হাসলেন পরিদাদু।
'একেবারে শেষে তো বেশ খানিকটা পথ উতরাই—এ নামতে হয়—' অরুণাংশু বললেন।
'ঠিক', পরিদাদু সমর্থন জানালেন, 'তবে যদি ভৈরোঁনাথ দর্শন করতে চাও তো একেবারে পাহাড়ের চুড়ো পর্যন্তই প্রায় ঠেলে উঠতে হবে। আর জানো তো, ভৈরোঁনাথ না গেলে বৈষ্ণোদেবী দর্শন সম্পন্ন হয় না—'
'তাই?' চোখ গোল গোল করে বললেন, সুছন্দা।
'তাই তো শুনেছি।' পরিদাদু এগোতে এগোতে বললেন।
'তাহলে আমরা কিন্তু ভৈরোঁনাথ দর্শন করে তবেই নামব।'
'ভৈরোঁনাথ তো অনেক দূরের কথা, অরুণাংশু ঠোঁট ওলটালেন সুছন্দার দিকে চেয়ে, 'আগে বৈষ্ণোদেবীর গুহামন্দির পর্যন্ত তো পৌঁছও দেখি হেঁটে—'
'আমি কি হাঁটতে পারি না নাকি,' প্রতিবাদ করে উঠলেন সুছন্দা, 'প্রতিদিন বিকেলে আমি, সঞ্জনা আর মিসেস দাস কতটা করে হাঁটি জানো—'
পরিদাদু হো হো করে হেসে উঠলেন, 'সমতলের সেই শখের হাঁটা আর পাহাড়ি পথের চড়াই ভাঙা এক নয় খুকু। এখানে পুরোটা পথই যদিও চওড়া এবং বাঁধানো, তবুও অভ্যাস না থাকলে এ পথে উঠতেই হাঁফ ধরে যায় অনেকের।'
বাবা মা এবং পরিদাদুর কথা এতক্ষণ চুপ করে শুনছিল শাওন। এবার পাহাড়ের দিক থেকে চোখ ফিরিয়ে সে জিজ্ঞেস করল, 'আমাদের কতটা পথ হাঁটতে হবে পরিদাদু?'
'তা ধর প্রায় বারো চোদ্দো কিলোমিটার', বলে শাওনের দিকে চাইলেন পরিদাদু। তার মাথার চুলে আঙুল বুলিয়ে দিয়ে বললেন, 'কীরে পারবি না?'
অরুণাংশু বললেন, 'দরকার কী। দুটো ঘোড়া করে দিই বরং। ছন্দা আর শানু ঘোড়ায় চড়ে উঠে যাক, তুমি আর আমি হাঁটতে হাঁটতে উঠে যাব ঠিক—'
শাওন সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠল, ঘোড়ায় না, আমি হেঁটেই উঠব পরিদাদু—' 'পারবি তো?' আবার বললেন অরুণাংশু।
'পারব।' শাওন আত্মবিশ্বাসী কণ্ঠে উত্তর দেয়।
সুছন্দা বললেন, 'আমারও ঘোড়ার দরকার নেই।'
ঘোড়া নিলে ভালোই করতে ছন্দা, অরুণাংশু আবার বলেন, 'মাঝপথে যেন আর পারছি না বলে বসে পড়ো না—'
'ঘোড়ায় আমার ভয় করে। ওরা বাপু বড্ড খাদের ধার দিয়ে হাঁটে।' সুছন্দা বলেন।
'ঠিক আছে ঠিক আছে', পরিদাদু মধ্যস্থতা করেন, সকলে মিলে হেঁটেই যাওয়া যাক চলো। চলতে চলতে যে ক্লান্ত বোধ করবে জিরিয়ে নেবে একটু। পথে বসার জায়গা আছে অনেক।'
'আর অন্যরা?' সুছন্দা জিজ্ঞেস করেন।
অন্যরা হাঁটতে থাকবে, পরিদাদু বলেন, 'সবাই বসতে হবে এমন কথা নেই। পথ হারানোর তো ভয় নেই। আর রাস্তাও বিপজ্জনক নয়। যে যার মতন রিল্যাক্স করে হাঁটবে—'
'সবাই তো তাহলে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাব পরিকাকু', সুছন্দা ভয় পাওয়া গলায় বলেন, 'পরে যদি খুঁজে না পাই নিজেদের—'
'আচ্ছা বেশ', পরিদাদু আশ্বস্ত করেন সুছন্দাকে, 'আমরা চেষ্টা করব একসঙ্গে চলতে, তবু যদি কেউ এগিয়ে যাই বা পিছিয়ে পড়ি, মাথায় রেখো অর্ধকুয়াঁরী ফেলে ডান হাতে যে কফিশপটা আছে তার সামনে আমরা ওয়েট করব অন্যদের জন্যে। আর একটা কথা—'
'আবার কী?' অরুণাংশু বলে ওঠেন পরিদাদুর কথার মাঝখানে।
'আমরা সকলেই সোজা পথে যাব অর্ধকুয়াঁরী হয়ে।'
'মানে?'
'আসলে চলার পথে আর একটা বিকল্প পথ পাবে। ওই পথে মোট দূরত্বও একটু কম। কিন্তু ওই পথে আমরা কেউ যাব না—'
'কেন?' শাওন জিজ্ঞেস করল এবার।
প্রথমত এ পথটায় চড়াই বেশি এবং দ্বিতীয়ত এ পথে গেলে অর্ধকুয়াঁরী যাওয়া যাবে না।
শাওনরা হাঁটা শুরু করল। পরিদাদু বলেছেন অতিদ্রুত না চলতে। শাওন আর সুছন্দা পাশাপাশি হাঁটছিল। ধীরে ধীরে। একটু সামনে পরিদাদু। অরুণাংশু অতি উৎসাহে এগিয়ে গেছেন অনেকখানি। হাঁটা শুরু করার কিছুক্ষণের মধ্যেই বার দুয়েক সিকিওরিটি চেকিং হল সেনাবাহিনীর লোকজনের উপস্থিতিতে। মাঝে মাঝে এক একটা পাকদণ্ডী পথ সোজা ওপরে উঠে গেছে। সিঁড়ি ভেঙে ওই পথে উঠতে পারলে একসঙ্গে অনেকটা পথ উঠে পড়া যায়। সময় ও হাঁটাপথের দূরত্ব কমে তাতে। পরিদাদু এবং অরুণাংশু এমনই একটা পাকদণ্ডী বেয়ে ওপর দিকে উঠে দৃষ্টির আড়ালে চলে গেলেন। সুছন্দা সেদিকে একটুক্ষণ তাকিয়ে শাওনের হাত ধরলেন। তারপর ধীরে ধীরে হাঁটতে হাঁটতে বললেন, 'ওরা যা খুশি করুক শানু। আমাদের পাকদণ্ডীর দরকার নেই। এ পথেই হাঁফ ধরে যাচ্ছে। ওই পথে যেতে গেলে ফুসফুস ফেটে যাবে আমার।
পাহাড়ি পথে একটা চক্কর দিয়ে খানিকটা ওপরে উঠতেই অরুণাংশুকে দেখতে পাওয়া গেল। রাস্তার ধারে শেডের নীচে বসে হাঁ করে হাঁফাচ্ছেন। সুছন্দা তাঁর দিকে এগিয়ে গিয়ে জিজ্ঞেস করলেন 'কী হল?'
'খুব হাঁফিয়ে গেছি ছন্দা,' অরুণাংশু হাসবার চেষ্টা করলেন। 'সিঁড়িপথে না উঠলেই ভালো হত জানো—'
'আমিও হাঁফিয়ে গেছি,' সুছন্দা বললেন, 'সরো একটু বসে নিই।'
শাওন জিজ্ঞেস করল। 'পরিদাদু—'
'এগিয়ে গেল', অরুণাংশু বললেন, 'আমায় বলল বসলে ক্লান্তি আসে, যতটা পারা যায় এগিয়ে থাকাই ভালো—'
'ক্লান্তি কাকে বলে জানেই না বোধ হয় পরিকাকু।' পরিশ্রান্ত গলায় বলেন সুছন্দা, 'সেনাবাহিনীতে ছিল তো, বডি ফিটনেসটা মারাত্মক—'
শাওনের চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকতে ইচ্ছে করছিল না। ওদের দিকে তাকিয়ে সে বলল, তোমরা একটু রেস্ট করে এসো না হয়, আমি এগোই—'
'একা?' আতঙ্কিত গলায় বলেন সুছন্দা।
'তাতে কী?' শাওন বলে, 'অন্য লোকজনও তো হাঁটছে রাস্তায়—'
'কে কেমন লোক, কী ইচ্ছে নিয়ে ঘুরছে কে বলতে পারে,' আবার বলেন সুছন্দা, 'এই তো ক—দিন আগেই ঘোষাল মাসিমা বলছিলেন ওঁর কোনো রিলেটিভ বলেছেন বৈষ্ণোদেবীর পথ থেকে একটা বাচ্চাকে তুলে নিয়ে গেছে দুষ্কৃতিরা—'
'এসব চক্র তো সব জায়গাতেই থাকে—' অরুণাংশু বলেন আকাশের দিকে মুখ করে।
'পরিদাদু তো সামনেই আছে। পা চালিয়ে আমি ঠিক ধরে নেবখন।' শাওন বোঝায় তাঁদের।
'আচ্ছা যাও। সাবধানে যাবে।'
'ঠিক আছে।'
'অচেনা লোকের সঙ্গে কথা বলতে যেও না।'
'হুঁ।'
'কেউ কিছু খেতে দিতে চাইলে খাবে না। প্রসাদ বললেও না।'
'আচ্ছা।'
শাওন হাঁটতে হাঁটতে এগিয়ে যায়। অরুণাংশু—সুছন্দাকে দেখা যাচ্ছে না আর। অফ সিজন বলে রাস্তায় ভিড় ভাড়াক্কা নেই বললেই চলে। এক দুটো ঘোড়া সওয়ারি নিয়ে হেঁটে যাচ্ছে, মাঝে মাঝে গায়ের পাশ দিয়ে। আট দশ জনের একটা দল 'জয় মাতাদি' চিৎকার করতে করতে প্রায় দৌড়ে উঠে গেল। ওরা চলে যেতেই পথটা যেন আরও চুপচাপ হয়ে গেল। আকাশে একটা বড় চাঁদ উঠেছে আজ। শাওন মাঝে মাঝে সেদিকে তাকিয়ে দেখছিল। ভারী ভালো লাগছিল ওর। হঠাৎ একটা কান্নার শব্দে পিছু ফিরল সে। আর তখনই লোকটাকে দেখতে পেল শাওন।
কালো, লম্বা ও বলিষ্ঠ চেহারার লোকটাকে দেখলেই বুকের মধ্যেটা ছাঁৎ করে ওঠে। ছাই ছাই রঙের একটা দীর্ঘ আলখাল্লার মতন পোশাক লোকটার পরনে। চোখদুটো বড় বড় ফোলা ফোলা লালচে। রাস্তার পাশে ফুটফুটে একটা ছেলেকে বসিয়ে প্রাণপনে তাকে ভোলাবার চেষ্টা করছে লোকটা। আর ছেলেটা তারস্বরে কাঁদছে হাত পা ছুঁড়ে। ছেলেটার মুখটা ভারী সুন্দর। মাথায় গোলাপি টুপি, গায়ে লাল রঙের সোয়েটার। আশেপাশে আর কোনো লোকজন নেই। স্পষ্ট বুঝতে পারল—শাওন, বাচ্ছাটা ওই লোকটার ছেলে হতেই পারে না। ছেলেটা তবে কার? তাঁরা সব গেলেনই বা কোথায়? ভয়ানক ঘাবড়ে গেল শাওন। তবে কি ঘোষাল দিদিমা যেমন বলেছিলেন, এও তেমনই কিছু? লোকটা কি চুরি করে নিয়ে যাচ্ছে ছেলেটাকে? শিরদাঁড়া দিয়ে ঠান্ডা একটা স্রোত বয়ে গেল শাওনের। একটুক্ষণ দাঁড়িয়ে ভাবল সে। তারপর মনস্থির করে ফেলল। লোকটাকে কিছুতেই চোখের আড়াল হতে দেওয়া যাবে না। পথে সামনে কোথাও পরিদাদু আছে। পরিদাদু কিছুতেই বদমাশটাকে ছাড়বে না সে জানে। তার কাজ শুধু পরিদাদুকে লোকটা সম্পর্কে ওয়াকিবহাল করা। শাওনের খুব আফশোস হল। ইশ, তার কাছে এখন যদি একটা মোবাইল ফোন থাকত—
লোকটা ছেলেটাকে কাঁধে তুলে হাঁটা দিয়েছে আবার। ছেলেটা প্রতিবাদ করছে। চিৎকার করছে। যেতে চাইছে না লোকটার সঙ্গে। শাওন অনুসরণ করল লোকটাকে। লোকটা নানা কথায় ভোলানোর চেষ্টা করল ছেলেটাকে। ছেলেটা ভুলল না। আলখাল্লার পকেট থেকে টফি বের করে ধরল ছেলেটার মুখের সামনে। ছেলেটা ফিরেও তাকালো না। লোকটা তাকে ধমক দিল। কাজ হল না। এবার ওই ভয়ানক লোকটা ছেলেটাকে চ্যাংদোলা করে পাহাড়ের খাদের কাছে নিয়ে গিয়ে দু—হাতে দোলাতে লাগল। ভয়ানক ভয় পেয়ে গেল শাওন। ছেলেটাকে কব্জা করতে না পেরে ধরা পড়বার ভয়ে ওকে খাদে ফেলে মেরেই ফেলবে নাকি লোকটা! এই আকস্মিক ঘটনায় ভয় পেয়েই বোধ হয় চুপ করে গেল ছেলেটা। শাওন আশেপাশে পাথরের টুকরো খুঁজছিল। ভাবছিল ও যদি ছেলেটাকে সত্যিই খাদে ফেলতে যায় তাহলে পাথর টাথর ছুঁড়েও যদি ওকে কিছুটা হলেও ঘায়েল করা যায়। ছেলেটা চুপ করে যেতেই লোকটা ওসব কিছুই করল না আর। বাচ্চাটাকে কাঁধে ফেলে বড় বড় পায়ে হাঁটা দিলে সামনের দিকে। এত দ্রুত এবং এত অনায়াসে চলছিল লোকটা যে শাওন আর তাল মেলাতে পারছিল না তার সঙ্গে। লোকটাকে চোখে রাখবার জন্যে প্রায় দৌড়াতে হচ্ছিল তাকে। শাওনের পা ভারী হয়ে আসছিল। দম হালকা হয়ে আসছিল ক্রমশ। তবু কিছুতেই হাল ছেড়ে দিয়ে দাঁড়াতে পারল না শাওন। মনে মনে বার বার করে বলতে লাগল সে, 'পরিদাদু তুমি কোথায়, পরিদাদু আর কত দূরে তুমি—'
লোকটা ছেলেটাকে নিয়ে একটা পাকদণ্ডী ধরল এবার। শাওন দেখল একেবারে খাড়া উঠে গেছে সিঁড়ি। প্রায় শ—দেড়েক স্টেপ। কান্না পাচ্ছিল শাওনের। আর বোধ হয় পারবে না সে। কিন্তু ওই যে ছোট্ট ছেলেটা। ওর কী হবে তাহলে? শরীরের সমস্ত শক্তি জড়ো করে সিঁড়ি দিয়ে উঠতে শুরু করল শাওন। ওপরে, আরও ওপরে—। মাথা ঝিমঝিম করছে এখন শাওনের। সারা শরীর ঘামে ভিজে জবজবে। টলমল করছে পা। আর মাত্র দু—তিন ধাপ। ফুসফুস ফেটে যাবে মনে হচ্ছে। হৃৎপিণ্ডে হাতুড়ি পেটার মতন আওয়াজ হচ্ছে ধড়াস ধড়াস করে। হঠাৎই সামনে তাকিয়ে কয়েক হাত দূরে পরিদাদুকে দেখতে পেয়ে গেল শাওন। প্রাণপণে চিৎকার করে উঠল শাওন, 'পরিদাদু—উ—উ—'
তারপরই চোখের সামনে কেমন যেন অন্ধকার ঘনিয়ে এল। বাঁ—আ—ই—করে ঘুরে গেল মাথা। হুঁমড়ি খেয়ে পথের ওপর ঘুরে পড়েই যাচ্ছিল শাওন। একটা বলিষ্ঠ হাত হঠাৎ—ই এগিয়ে এসে জড়িয়ে নিল তাকে যত্ন করে। তারপর শুইয়ে নিল তাকে তার কাঁধের ওপর। প্রাথমিক ধাক্কাটা সামলে নিয়ে চোখ খুলে মাথা ঘুরিয়ে শাওন লোকটার অন্য কোলে সেই বাচ্চা ছেলেটাকে দেখতে পেল। ছেলেটা আর কাঁদছে না এখন।
পরিদাদু হিন্দিতে বললেন, 'নবাবজি ওকে এবার নামিয়ে দিন কাঁধ থেকে। অর্ধকুয়াঁরী তো এসেই গেছে। এখানে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিলে ও ঠিক হয়ে যাবে।' লোকটা শাওনকে নামিয়ে রাস্তার পাশের বেঞ্চে বসালো। নিজেও বসল ছেলেটাকে কোলে নিয়ে। পরিদাদু শাওনের পাশে বসে ওর পিঠে হাত রাখলেন, 'বোকার মতন এত দ্রুত এ পথে আসতে গেলি কেন এতখানি পাকদণ্ডী বেয়ে— শুধুমুধু নিজের এনার্জিটা নষ্ট করলি। তাছাড়া পায়ে পা জড়িয়ে যেভাবে পড়ছিলি একটু আগে—ভাগ্যিস ঠিক সময়ে নবাবজি ধরে নিয়েছিলেন তোকে—'
শাওনের অবাক লাগছিল। ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করল সে, 'পরিদাদু এ লোকটাকে তুমি চেনো?'
'চিনতাম না। চিনে নিলাম।'
'কীভাবে?'
'ওই যে ছেলেটা, রমনিক, ওর মা বাবার সঙ্গে কথা হচ্ছিল একটু আগে। আমরা একসঙ্গে কফি খাচ্ছিলাম একটা স্টল থেকে। ওঁরা ঘোড়া নিয়েছেন। ছেলে এবং নবাবজির ডেসক্রিপশন দিয়ে বললেন দেখা হলে আমি যেন বলে দিই যে ওঁরা এগিয়ে গেছেন। রমনিককে নিয়ে যতটা তাড়াতাড়ি সম্ভব ও যেন লালজির দোকানে পৌঁছোয়। ওঁরা ওখানে ওয়েট করবেন।'
শাওন লজ্জায় মুখ নীচু করে ফেলল। লাজুক লাজুক গলায় বলল, 'পরিদাদু জানো, মা বোধ হয় ঠিক কথাই বলে?'
'কী কথা বলতো—'
'আমার আই কিউ লেভেল সত্যিই জিরো—'
'কেন?'
'আমি নবাবজিকে ছেলেধরা ভেবে ওর পিছনে ধাওয়া করেছিলাম—' 'আকাশ কাঁপিয়ে হেসে উঠলেন পরিদাদু, 'তাই বল। ওই জন্যে এমন করে দৌড়াচ্ছিলি। নবাবজি একজন দক্ষ পিট্টু। ওর সঙ্গে হেঁটে কখনও তুই আমি পারি—'
'পিট্টু মানে?'
'এখানে যারা ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের পিঠে করে পাহাড়ে ওঠে তাদের পিট্টু বলে। এটাই ওদের পেশা—'
নবাবজি রমনিককে কোলে নিয়ে উঠে দাঁড়িয়েছেন। আর বিশ্রাম নিলে চলবে না। ওঁকে এগোতে হবে। পরিদাদুর দিকে চেয়ে সেলাম জানালেন নবাবজি। শাওনের থুতনি ধরে নেড়ে দিয়ে বললেন, 'আগর তুম বহত থক গয়ে হো তো শরমাও মত। মেরে কান্ধেপে আকে বৈঠ যাও—'
শাওন লজ্জা পেয়ে মাথা নামিয়ে নিল। পরিদাদু বললেন, 'না না নবাবজি, ঠিক আছে। আপনি এগিয়ে যান।'
পরিদাদু আর শাওনকে হাত নেড়ে রমনিককে কাঁধে বসিয়ে হাঁটতে লাগলেন নবাবজি। হাঁটতে হাঁটতে পাহাড়ের বাঁকে হারিয়ে গেলেন তাঁরা। শাওন তাকিয়েই রইল সেদিকে। চাঁদটা পাহাড়ের খাঁজে অনেকটা ঢলে পড়েছে এখন। হঠাৎই নবাবজির জন্যে বুকের মধ্যেটা মন খারাপে ভারী ভারী হয়ে উঠল শাওনের।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন