মাদলের মাঠ

জয়দীপ চক্রবর্তী

একটা হালকা হেঁচকি তুলে আর দুবার গোঁ গোঁ আওয়াজ করে পিন্টুদার পুরোনো রাজদূত মোটরবাইকটা দাঁড়িয়ে পড়ল রাস্তার মাঝমধ্যিখানে। পরিদাদু আর শাওন পিছনে বসেছিল। পিন্টুদাকে রাস্তার মাঝখানে গাড়ি থামাতে দেখে পরিদাদু বলে উঠলেন, 'কী ব্যাপার, থামলে কেন?'

'মনে হচ্ছে রাস্তাটা গুলিয়ে ফেলেছি', পকেট থেকে রুমাল বের করে কপালের ঘাম মুছতে মুছতে বলল পিন্টুদা। পিন্টুদা বছর তিনেক হল এখানকার একটা এন জি ও তে কাজ করে। পুরুলিয়ার গ্রামে গ্রামে ঘুরে উন্নয়নের নানা কাজের তদারকি করতে হয় ওকে। গ্রামের লোকেরা সবাই পিন্টুদাকে খুব ভালোবাসে। আর পিন্টুদাও ওদের জন্যে একেবারে নিবেদিতপ্রাণ। অরুণাংশুর পিসতুতো দাদার ছেলে ও। ছোটবেলায় অরুণাংশুর কাছে থেকে পড়াশুনাও করেছে কিছুদিন। কাজেই চিরকালই অরুণাংশুর খুব ন্যাওটা ও। বোঙ্গাবাড়িতে আসার পর থেকেই প্রায়ই ঘ্যান ঘ্যান করত ওর ওখান থেকে একবার ঘুরে আসার জন্যে। যাচ্ছি যাব করে যাওয়া হয়নি এতদিন। এবারে পরিদাদুর ইচ্ছেতেই মূলত আসা এখানে। পরিদাদু গ্রামে গঞ্জে ঘুরতে চিরকালই ভালোবাসেন। পিন্টুদার কথা শুনে তিনি একেবারে লাফিয়ে উঠলেন। চায়ের কাপে লম্বা চুমুক দিয়ে সুছন্দার দিকে চেয়ে বললেন,'চলই না খুকু একবার, ছেলেটা এত করে বলছে যখন—ওর কথাটাও ভাব, একলা একধারে পড়ে আছে, ওরও তো ইচ্ছে করে পাঁচটা আপনার লোকের সঙ্গে কথা কইতে, আনন্দ করতে'— অরুণাংশুও সায় দিয়ে বললেন, 'পুরুলিয়ায় এমনিতে বেড়াবার জায়গারও অভাব নেই। বেড়াতে যাওয়া মানেই যে দূর দূরান্তে ছুটতে হবে সবসময় এমন তো কথা নেই, কাছে পিঠেই কত জায়গা রয়েছে যেখানে সহজে যাওয়া যায় অথচ যাওয়ার কথা মনেই হয় না আমাদের।'

'ঠিক ঠিক', অরুণাংশুর কথায় মাথা নাড়তে শুরু করেন পরিদাদু, 'রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন মনে নেই, দেখা হয় নাই চক্ষু মেলিয়া ঘর হতে শুধু দুই পা ফেলিয়া—' অতএব শাওনদের এবারে কদিনের জন্যে পুরুলিয়ায় পিন্টুদার কাছে বেড়াতে আসা। এসে থেকে মন্দও লাগেনি অবশ্য শাওনের। পিন্টুদা একটা গাড়ি ঠিক করে দিয়েছিল। তাইতে দমভোর ঘোরা হয়েছে ক দিন। তাছাড়া পিন্টুদা যে জায়গাটায় থাকে সেটাও ভারী সুন্দর। বড় বড় অর্জুন আর শাল মহুয়ায় ঘেরা বাংলো। সকালে ঘুম থেকে উঠে ঘরের দরজা জানালাগুলো খুলে দিলেই চোখ যেন একেবারে জুড়িয়ে যায়। কোথাও না গিয়ে ওই গাছপালাগুলোর দিকে চেয়ে বসে থাকলেই সময় কেটে যায় হু হু করে। গাছের ডালে ডালে কতরকম পাখি এসে হুটোপাটি করে, লাল লাল কাঁকুরে কঠিন পথের ওপর দিয়ে দৌড়ে গিয়ে গাছে উঠে পড়ে কাঠবিড়ালিরা। শাওন হাঁ করে দেখে সব। আজ সকালে পিন্টুদা যখন দূরের গ্রামে বেড়াতে যাওয়ার কথা বলল অরুণাংশু সুছন্দা উৎসাহ দেখাননি, কিন্তু শাওন লাফিয়ে উঠেছে শুরুতেই। আর পরিদাদু। পরিদাদু বললেন, 'আমাদের দেশটা তো গ্রাম দিয়েই গড়া। শহরের চাকচিক্য যতই বাড়ুক না কেন দেশটাকে ঠিকঠাক চিনতে গেলে গ্রাম আর গ্রামের মানুষজনকে তোমায় জানতেই হবে।'

পরিদাদুর কথায় পিন্টুদাও সায় দিল মাথা নেড়ে। বলল, 'পরিদাদু ঠিকই বলেছেন জানিস শানু, আগে বুঝতাম না, কিন্তু এখানে আসার পর দেখেছি কত মানুষ আর কী বিচিত্র তাদের জীবনযাপন—এই বৈচিত্র্য নিজে চোখে না দেখলে বিশ্বাস করা যায় না।' সুছন্দা ওদের কথা শুনছিলেন বিছানায় আড় হয়ে বসে। পিন্টুদার কথায় হেসে বললেন, 'তোরাই তাহলে বৈচিত্র্য খুঁজে বেড়া বাপু। আমি আজ আর তোদের দলে নেই। কদিন ধরে টানা গাড়িতে ঘুরে ঘুরে কোমর পিঠে ব্যথা হয়ে গেছে, আমি বরং বাড়ি বসে রেস্ট নিই।' অরুণাংশুও মাথার ওপর দু-হাত তুলে আড়মোড়া ভেঙে হাই তুলে বললেন,'আমিও খুকুর দলে। তাছাড়া লছমি আজ বনমোরগের ঝোল খাওয়াবে বলেছে দুপুরবেলা। গাঁয়েগঞ্জে ঘুরে বেড়িয়ে লছমির হাতের মোরগের ঝোল বাপু আমি মিস করতে পারব না।' পিন্টুদা বলল, 'ঠিক আছে তোমরা বাড়িতেই থাকো তাহলে। রেস্ট নাও। কিছু দরকার হলে লছমিকে বোলো। আমরা তিনজনেই যদি বেরোই তাহলে আর গাড়ি বলব না, আমার টু হুইলারটা নিয়েই বেরিয়ে পড়ব।' বলে পরিদাদুর দিকে তাকালো পিন্টুদা, 'তিনজনে বাইকে গেলে আপনার অসুবিধা নেই তো দাদু?'

'না না,' পরিদাদু হাসলেন, 'আমার অসুবিধে নেই কিছুতেই। তাছাড়া শানুকে তো আর আস্ত লোক বলা যাবে না, কাজেই তোমার টু হুইলারে স্থান সঙ্কুলানেও অসুবিধা হবার কথা নয়—'

আজ সারাদিন পিন্টুদার সঙ্গে ঘুরে সত্যিই ভালো লেগেছে শাওনের। পরিদাদু বার বার বলছিলেন, 'দেখে নে শাওন, মানুষকে কত কষ্ট করে বাঁচতে হয় এখানে। আমরা শহরের মানুষ এই কষ্টের কথা ভাবতেই পারি না।' শাওন নিজেও ভাবছিল কথাটা। সিমুদূরি গ্রামের মুখিয়াকাকার বাড়ি বসে ওদের কষ্টের কথা শুনেছে আজ শাওন। কী ভীষণ দারিদ্র্য এখানকার মানুষের। তাছাড়া খাবারদাবার, ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রও পাওয়া যায় না এখানে সবসময়। সপ্তায় এক একদিনে এক একটা গাঁয়ে হাট বসে। ভিন গাঁয়ের লোকেদের পায়ে হেঁটে সেই হাটে যেতে হয় জিনিসপত্র সওদা করতে। সেই হাঁটা পথের দূরত্ব কখনও কখনও আট-দশ কিলোমিটারও হয়ে যায়। এমনকি এ গ্রামে খাবার জলেরও সংকট। প্রায় তিন মাইল হেঁটে জল আনতে হয় কুঁয়ারি নদীর শাখা থেকে। তবু মানুষগুলোর মুখে হাসির অন্ত নেই। কত অল্পেই খুশি হয়ে যেতে পারে এরা। মুখিয়াকাকা বলছিলেন প্রতি বছর বোশেখ মাসে এই গ্রামে মেলা বসে একটা। খুব মজা হয় তখন। শিবঠাকুরের পুজো হয়। মুরগি বলি চড়ানো হয় সেই পুজোয়। শাওন এ কথা শুনে অবাক হয়ে গেল। মুখিয়াকাকার বাড়ি থেকে বাইরে বেরিয়ে এসে সে জিজ্ঞেস করল, 'আচ্ছা পরিদাদু, পুজোয় কি কখনও মুরগি বলি দেওয়া হয়?' 'সাধারণত হয়না,' পরিদাদু হাসলেন,' তবে মানুষ ভালোবেসে দিলে ওঁরাই বা কী করেন বল—'

'তাই বলে মুরগি?' চোখ কুঁচকে বলে শাওন। 'তাতে কী, কামাক্ষায় তো পায়রা বলি দেওয়া হয়—' পরিদাদু বলেন। পিন্টুদা বলতে থাকে, 'এদের অদ্ভুত অদ্ভুত সব বিশ্বাস জানো তো, পথে ঘাটে ভূতেদের হাত থেকে রেহাই পেতেও পুজো দেয় এরা নিয়ম করে—'

'তাই নাকি?' অবাক হয়ে বলে শাওন।

'এরা বিশ্বাস করে এই গ্রামের মৃত মানুষেরা গাঁ ছেড়ে যায় না কখনও', পিন্টুদা বলে, 'পালা পরবে জ্যান্ত মানুষের গা ঘেঁষে ওরাও নাকি ঘোরে ফেরে—জ্যোৎস্না রাতে মাঝে মাঝে ওদের নাচ গানের আওয়াজ নাকি এখনও শোনা যায় কখনও কখনও' পিন্টুদা হেসে ওঠে হো হো করে। পরিদাদু কথা বলেন না। চুপ করে বসে থাকেন বাইকের পিছনে। পিন্টুদা অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করে, 'আপনি কি ভূতে বিশ্বাস করেন পরিদাদু?' পরিদাদু হাসেন, 'আমি বিশ্বাস করি কি করি না নিজের কাছেই আজ পর্যন্ত ব্যাপারটা স্পষ্ট হল না। তবে একটা কথা আমাকে খুব ভাবায়।'

'কী কথা পরিদাদু?' জিজ্ঞেস করে শাওন।

'একটা ভুল ধারণা, একটা কুসংস্কারই যদি বলি' পরিদাদু গম্ভীর গলায় বলতে থাকেন,'সারা পৃথিবী জুড়ে গড়ে ওঠে কী ভাবে? যুগ যুগ ধরে পৃথিবীর নানা প্রান্তের মানুষ একই ভুল, একই কল্পনা করে কী করে বলো দেখি—'

'আমার তো ভূতে বিশ্বাস না করে উপায়ই নেই' শাওন বলে, 'অরুণাচলের ক্যাপ্টেন দাস আঙ্কলের কথা তোমায় তো বলেছি পিন্টুদা—'

পিন্টুদা চুপ করে থাকে একটুক্ষণ। তারপর বলে, 'তবু যেন বিশ্বাস করতে কষ্ট হয় রে শানু, আসলে নিজে চোখে তো দেখিনি কখনও—'

পিন্টুদার কথার জবাবে একটা কিছু বলতে যাচ্ছিল শাওন। ঠিক তখনই গাড়ি থামিয়ে পথের ওপর দাঁড়িয়ে পড়ল পিন্টু। বলল পথ গুলিয়ে গেছে। পথ বলছি বটে, কিন্তু এ রাস্তায় তো আর নির্দিষ্ট পথ বলে কিছু নেই। আদিগন্ত প্রসারিত ধু ধু প্রান্তর। রুক্ষ, গাছপালাহীন, উঁচুনীচু। জ্যোৎস্নায় ভরে আছে চারপাশ। রাস্তায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা অভ্রকুচির ওপর সেই আলো পড়ে ঝিকমিক করছে চারদিক। মনে হচ্ছে আকাশের নক্ষত্রেরা আজ বোধহয় মাটির ওপরে নেমে এসেছে। কী মায়াবী লাগছে চারপাশ। শাওনের মন্দ লাগছিল না। পরিদাদু টু হুইলার থেকে নেমে দাঁড়ালেন। চারদিকে চোখ বুলিয়ে নিয়ে বললেন 'তাহলে পিন্টুবাবু, অতঃ-কিম?'

পিন্টুদাও নামল বাইক থেকে। তারপর ধীরে ধীরে বলল, 'কথা বলতে বলতে এমনই অন্যমনস্ক হয়ে গেলাম আমি, অথচ এ জায়গাটায় আনমাইন্ডফুল হলেই বিপদ আমি জানি—'

'বাদ দাও,' পরিদাদু বললেন, 'ও নিয়ে ভেবে তো আর লাভ নেই। বরং এক কাজ করি চলো, সোজা চালাও। দু-দশ কিলোমিটারের মধ্যে নিশ্চিত গ্রাম এসে যাবে কোনো। ওখানে গিয়েই নাহয় পথের হদিস নিয়ে নেওয়া যাবেখন।'

পিন্টুদা মাথা নাড়ল, 'আজ আমি সবদিক দিয়েই ডুবেছি পরিদাদু। তেল খুব বেশি নেই আর। ভুলভাল রাস্তায় আরো দূরে চলে গেলে বিপদের আর শেষ থাকবে না।'

'তাহলে তো সত্যিই সমস্যায় পড়া গেল হে' বলতে বলতে জ্যোৎস্না ভেজা রুক্ষ মাটির ওপর বসে পড়লেন পরিদাদু। শাওনও চুপটি করে বসে পড়ল তাঁর পাশে। পিন্টুদা গাড়িটাকে স্ট্যান্ড করে ওদের পাশে এসে দাঁড়িয়ে চারদিক জরিপ করতে লাগল এক মনে। শাওন তার দিকে তাকাল। উদ্বিগ্ন গলায় বলল, 'পথ পেলে পিন্টুদা?'

'দেখছি' বলে একটু চুপ করে রইল সে। তারপর হঠাৎ পরিদাদুর দিকে চেয়ে বলে উঠল, 'পরিদাদু, শুনতে পাচ্ছেন?'

'কী বলো দেখি?' পরিদাদু অবাক হয়ে বললেন।

'মাদলের শব্দ।' পিন্টুদা বলে, 'তার মানে গ্রাম বেশি দূরে নয়।'

'রাতে অনেক দূরের শব্দও কিন্তু কাছে বলে মনে হয় পিন্টু—' পরিদাদু বললেন।

'শব্দটা ক্রমশই যেন আরও স্পষ্ট ও জোরে হচ্ছে পরিদাদু' শাওন বলে ওঠে।

'একটা দল বোধহয় দূর থেকে এসে জমা হচ্ছে কোথাও।' পিন্টুদা বলল।

'তা হলে আর একটু সময় অপেক্ষা করে দেখা যাক, নাকি বলো—' পরিদাদু বলেন।

মাদলের আওয়াজটা অল্পক্ষণের মধ্যেই খুবই স্পষ্ট হয়ে উঠল। মনে হতে লাগল যেন হাত ছোঁয়া দূরত্ব থেকেই ভেসে আসছে আওয়াজটা। পিন্টুদা বলল,'পরিদাদু খুব কাছেই মনে হচ্ছে রয়েছে এরা। বাইকে চেপে তেল খরচ করে লাভ নেই, চলুন তিনজনে পায়ে হেঁটেই দেখে আসি ব্যাপারটা। ওদের কাছে পৌঁছে গেলে আর কোনো চিন্তা নেই। ওরা আমাদের বলে দেবে কোন পথে যেতে হবে।'

'বেশ, দেখা যাক।' বলে পরিদাদু উঠে পড়লেন। শাওনও। তিনজনে মিলে আওয়াজ লক্ষ করে এগোতে শুরু করলেন। বেশ কিছুটা হাঁটার পর পরিদাদু থামলেন। পিন্টুদার দিকে চেয়ে বললেন, 'পিন্টু, আমার কেমন যেন গোলমাল ঠেকছে—'

'কেন বলুন তো?' পিন্টুদা জিজ্ঞেস করে কপালের ঘাম মুছতে মুছতে।

'আওয়াজটা মনে হচ্ছে যেন ফাঁদে ফেলতে চাইছে আমাদের—'

'যাঃ, তা আবার হয় নাকি?'

'আমরা কিন্তু অনেকটা পথ চলে এসেছি। অথচ শব্দের কোনো উৎস এখনও খুঁজে পাওয়া গেল না। আরও এগিয়ে যাওয়ার আগে আমাদের একবার ভেবে নেওয়া উচিত, পিছিয়ে যাওয়ার পথটাও না হারিয়ে ফেলি আমরা—'

এতক্ষণ কিছু মনে হয়নি। এবার শাওনের খুব ভয় করতে লাগল। মা বাবার কথা মনে পড়তে লাগল বার বার। পরিদাদু সঙ্গে আছেন ঠিকই, তবুও মা হয়তো খুব চিন্তা করতে শুরু করে দিয়েছেন এতক্ষণে। সত্যিই যদি পথ খুঁজে না পেয়ে একেবারে হারিয়ে যায় তারা? খপ্পরে পড়ে যায় কোনো দুষ্টচক্রের যারা মাদলের শব্দ শুনিয়ে অজানা কোথাও টেনে নিয়ে যাচ্ছে তাদের।

পিন্টুদা একটু চিন্তা করল চুপ করে। তারপর বলল, 'কথাটা খারাপ বলেননি দাদু। শব্দের কাছে পৌঁছতে এতটা সময় সত্যিই লাগা উচিত নয় আমাদের। আজকাল এসব অঞ্চলে নানা সন্ত্রাসবাদী কার্যকলাপও মাথা চাড়া দিচ্ছে। তাদের পাতা ফাঁদ হয় যদি এটা তাহলে আমাদের আগেভাগে সতর্ক হওয়াই উচিত—'

'তাই যদি হয় তাহলে ওদের নজরে আমরা তো পড়েই গেছি পিন্টু,' পরিদাদু হালকা হাসলেন, 'আমরা পালাবো ভাবলেই ওরা কি আর পালাতে দেবে, তার চেয়ে চলো আর একটু এগিয়ে দেখি—'

'আমার ভয় করছে পরিদাদু—' পিন্টু বলে।

'আমারও'— কাঁপা গলায় বলে শাওন।

'তাহলে বরং একটা কাজ করো পিন্টু', পরিদাদু বলেন, 'সকলে একসাথে বিপদে পড়ে লাভ নেই। আমি একা একটু এগিয়ে দেখে আসি পরিস্থিতিটা ঠিক কী, তোমরা ততক্ষণ এখানেই অপেক্ষা করো—'

পরিদাদু সামনে পা বাড়ালেন অজানা গন্তব্যের উদ্দেশ্যে। আর ঠিক তখনই সেই ফাঁকা মাঠে, জ্যোৎস্নায় মাদলের দ্রিমি দ্রিমি আওয়াজ ছাপিয়ে এক অদ্ভুত বাঁশির আওয়াজ ঠিকরে উঠল। পরিদাদু থেমে গেলেন। বাঁশির আওয়াজ হাওয়ার সাথে দুলতে দুলতে ক্রমশ কাছে আরো কাছে এগিয়ে আসতে লাগল। পিন্টুদা স্বস্তির নিঃশ্বাস ছেড়ে বলল, 'বাঁচা গেল। আর ভয় নেই।'

'মানে?' অবাক হয় জিজ্ঞেস করেন পরিদাদু।

'এ বাঁশি এই অঞ্চলের সবার চেনা। এমন আশ্চর্য বাঁশি কেবল বুধুয়াই বাজাতে পারে।'

'বুধুয়া কে পিন্টুদা?' জিজ্ঞেস করে শাওন।

'এক হতভাগ্য অন্ধ মানুষ। বাড়ি বিহারের কোনো এক গ্রামে। জন্ম থেকেই চোখে দেখে না ও। বাপ মা মারা যাবার পর অন্য ভাই-এরা ওকে পুরুলিয়ায় ছেড়ে দিয়ে চলে যায় ট্রেনে করে—'

'কেন?' অবাক হয়ে বলে শাওন।

'আর কেন। অন্ধ অশক্ত বুধুর দায় কেন বইবে তারা।' বড় করে শ্বাস নেয় পিন্টু, 'সেই থেকে এখানেই থেকে গেছে। বাঁশি বাজায় আর এ গ্রাম থেকে ও গ্রাম ঘুরে বেড়ায় পায়ে হেঁটে। সবাই ভালোবাসে ওকে। ওকে ঘিরে বসে বাঁশি শোনে। এ গাঁয়ের ও গাঁয়ের খবর নেয়। বিনিময়ে বুধুকে খেতে শুতে দেয় ওরা।' পিন্টুর কথার মধ্যেই বুধুর ছায়া ছায়া শরীরটা নজরে আসে ওদের। বাঁশি বাজাতে বাজাতে জ্যোৎস্নায় মাখামাখি হয়ে সে এগিয়ে আসছে ওদের দিকে। লোকটা আরও একটু কাছে আসতেই উচ্ছ্বাসের সঙ্গে হাঁক দিয়ে উঠল পিন্টুদা, 'বুধুয়া, বুধুয়া—'

লোকটা দাঁড়িয়ে পড়ল। তারপর একগাল হেসে বলল, 'বোঙ্গাবাড়ির পিন্টুদাদা না?'

'হ্যাঁ—'

'সঙ্গে কারা গো, আরও যেন পয়ের শব্দ পেলুম—'

'আমার দাদু আর ভাই, কলকাতা থেকে বেড়াতে এসেছে এখানে—'

'বেশ, বেড়ানো কেমন হল বাবুরা এই রুখা দেশে?'

'ভালোই।' পরিদাদু জবাব দিলেন। তারপর বুধুর দিকে চেয়ে বললেন, 'তুমি এই রাত বিরেতে বাঁশি বাজিয়ে কোথায় চলেছো ভাই?'

বুধু খুব খানিকটা হাসল। তারপর বলল, 'আমার তো দিনে রাতে প্রভেদ নেই বাবু। আমার চব্বিশ ঘণ্টাই তো রাত। কাজেই ইচ্ছে হলে হাঁটি আমি আর ইচ্ছে না করলে থামি। আজ হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ মনে হল যেন চেনা পায়ের শব্দ পেলুম। তাই এগিয়ে এলুম। এ পথে তো কারও আসার কথা নয়। এ যে নিষিদ্ধ পথ—'

'নিষিদ্ধ পথ মানে?' অবাক হয়ে বলে পিন্টু।

'মাদলের মাঠের কথা শোনেননি বাবু?'

'মাদলের মাঠ কী বুধুভাই?'

'আমার অবাক লাগছে পিন্টুদাদা, অ্যাদ্দিন আছো এখানে, তুমিও মাদলের মাঠের কথা শোনোনি?'

'সত্যি শুনিনি বুধুভাই।'

বুধুয়া একটুক্ষণ চুপ করে থাকে। তারপর আনমনে বলতে থাকে, 'মাদলের মাঠ বড় সাংঘাতিক জায়গা। এ মাঠ ঠিক কোথায় কেউ জানে না, কেউ জানে না কী ভাবে যেতে হয় সেখানে। তবু সেই মাঠ আছে। কোনো কোনো চাঁদভাসি রাতে সেই মাঠ মাদলের শব্দ তুলে মানুষজনকে কাছে ডাকে। আর একবার যদি সেই আয় আয় ডাক শুনে কেউ যায় তার কাছে, মাদলের মাঠ এক্কেবারে গ্রাস করে নেয় তাকে, আর ফিরতে দেয় না কখনও।'

'যাঃ, সত্যি সত্যি তেমন আবার হয় নাকি?' অবিশ্বাসী গলায় বলে শাওন।

'হয় গো দাদা হয়,' আবার বলতে থাকে বুধুয়া আকাশের দিকে মুখ তুলে আনমনে,' এ পৃথিবীতে রোজ কত কী যে ঘটে যায় তার কতটুকু জানি আমরা, কত রহস্যে মোড়া এ জগত, কে সেই রহস্যের কিনারা করবে দাদা—'

'মাদলের মাঠের সেই ডাক তুমি কখনও শুনেছো বুধু?' পিন্টু জিজ্ঞেস করে অবাক হয়ে।

'আগে কখনও শুনিনি দাদা, আজ শুনলাম প্রথম। আর তাই তো তোমাদের সাবধান করতে ছুটে এলুম। আর এগিয়ো না। ফিরতে পারবে না তাহলে। মাদলের মাঠ ডাকতে শুরু করেছে তোমাদের। বেজে উঠেছে তার মাদল—'

'এ মাদল কে বাজায় বুধুদাদা?' আবার জিজ্ঞেস করে শাওন।

'এই শুনশান প্রান্তরে রাত বিরেতে কোন মানুষ আর মাদল বাজাতে আসবে ভাই, এ মাদল যারা বাজায় তারা জীবনের অন্য পারে থাকে,' বলেই চুপ করল বুধু। তারপর ফিসফিস করে বলল, 'ওই আবার শুরু হয়েছে। শুনতে পাচ্ছেন?'

'কী?' পরিদাদু জিজ্ঞেস করেন।

'মাদলের মাঠ জেগে উঠছে আবার। পালান শিগ্গির। আমার বাঁশির সুর দিয়ে মাদলের মাঠের ডাক এতক্ষণ ঢেকে রেখেছিলুম আমি। সে বাঁশির সুর ফুটো করে মাদলের শব্দ ছুটে আসছে আবার। আর সময় নেই। পালান। পিছনে হাঁটতে থাকুন পা চালিয়ে। রাস্তাটা কচ্ছপের পিঠের মতন উঁচু হয়ে গেছে যেখানে সেখান থেকে সোজা পুবদিক—' বলে পরিদাদুর গায়ে ঠেলা মারল বুধুয়া।

'আর তুমি?' চেঁচিয়ে ওঠে শাওন। বুধু নিঃশব্দে হাসে। তারপর ধীরে ধীরে হাঁটতে থাকে উল্টোদিকে। পিন্টুদা তাকে ডাকে। শাওন ডাকে। পরিদাদু ডাকেন। বুধু সাড়া দেয় না। তার বাঁশি তুলে ধরে সে মুখের সামনে। আকাশ পর্যন্ত উঠে যায় সেই সুর। ফেরার পথে পরিদাদু বলছিলেন, 'বুধু মানুষটা ভারী ভালো পিন্টু। তাই ওর জন্যে বড় কষ্ট হচ্ছে। কিছু একটা মেন্টাল ডিসঅর্ডার কাজ করছে ওর মধ্যে। ঠিকঠাক ট্রিটমেন্ট পেলে হয়তো ব্যাপারটা সেরে যেত।'

'কিন্তু ফাঁকা মাঠে মাদলের আওয়াজ তো আমরাও শুনেছি পরিদাদু,' শাওন বলে, আমাদের শোনাটা তো মিথ্যে নয়—'

'কোনো দূরের গাঁ থেকেই হয়ত এসেছিল আওয়াজটা। ফাঁকা রাতে মনে হয়েছে আওয়াজটা কাছ থেকে আসছে।' বলে চুপ করে গেলেন পরিদাদু।

পরদিন সকালে লছমি কাজে এল বেশ দেরি করে। ওর মুখচোখ অন্যরকম লাগছিল। পিন্টুদা জিজ্ঞেস করল, 'কী হয়েছে লছমি?'

লছমি হাউমাউ করে কেঁদে উঠল, 'সে তো আমার কেউ না দাদাবাবু, তবু মনটা মোচড়াচ্ছে যেন—'

'কী হয়েছে বলবি তো—' আবার বলে পিন্টুদা।

'বেচারা বুধুয়াটা মারা গেছে পরশু রাতে। কাল বিকেলে ওর শরীরটা পাওয়া গেছে জনপদ থেকে বহু দূরে। কেন যে মরতে হতভাগাটা অতদূরে চলে গেল সকলের নজর এড়িয়ে—'

পিন্টুর মুখে কথা সরল না। পরিদাদু আর শাওনও চুপ করে রইল। লছমি বলে চলল, আমাদের গাঁয়ের বুড়ো মুখিয়াটা বলছিল মাদলের মাঠ নাকি ডেকে নিয়ে গেছে ছেলেটাকে। এমন করে ওই মাঠ যুগ যুগ ধরে মানুষকে নাকি ডাকে। সে ডাকে সাড়া দিয়ে একবার ওখানে পৌঁছলে আর ফেরা যায় না কখনও। বুধুয়াটারও তাই আর ফেরা হল না। জ্যোৎস্না রাতে সেও এখন থেকে ছায়াশরীর নিয়ে বাঁশি বাজাবে ওই মাঠে। চিরকাল।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%