জয়দীপ চক্রবর্তী
কাল সারা রাত বৃষ্টি পড়েছে। সকালটা ঘন কুয়াশার চাদরে মুড়ি দিয়ে জবুথবু হয়ে আছে। পাইনের ঘন জঙ্গল ভেদ করে এমনিতেই আলো ঢুকতে পায় না, তায় আজ আবার ফ্যাকাশে কুয়াশামাখা দিন। সকালবেলাটা সকাল বলে মনেই হচ্ছিল না। এডি বিছানা ছেড়ে উঠতেই চাইছিল না। আগের দিনে হাঁটাহাঁটি কম হয়নি। তাছাড়া এডি ছেলেটাও অমনই। খুব বেশি পরিশ্রম করার অভ্যাস বোধহয় তার নেই। এডির পুরো নাম এডোয়ার্ড। ওর বাবা ভারতীয়, মা অ্যাংলো। এখন অবশ্য তাঁদের কেউই আর বেঁচে নেই। এডি জীবিকার সন্ধানে ভারতের নানান জায়গায় ঘুরে বেড়ায়। ঠিক কী পেশায় যে সে যুক্ত তা অবশ্য জানা নেই মুকেশের। জানার খুব একটা চেষ্টাও করেননি তিনি কোনোদিন। অদ্ভুতভাবে আলাপ হয়েছিল ছেলেটার সঙ্গে। বহুল প্রচারিত এক ইংরেজি কাগজে প্রাচীন ভারতের আর্থিক ও বৌদ্ধিক সমৃদ্ধি নিয়ে মুকেশের লেখা একটা নিবন্ধ পড়ে এতটাই মুগ্ধ হয়েছিল সে, যে সরাসরি কাগজের সম্পাদককেই অনুরোধ করে বসে তাঁর ঠিকানা আর ফোন নম্বর দেবার জন্যে। সম্পাদক স্বাভাবিকভাবেই প্রথমটা রাজি হননি, কিন্তু এডির আকুলতা দেখে তিনি জিজ্ঞেস করেছিলেন মুকেশকে এডিকে তাঁর ঠিকানা দেবেন কিনা। মুকেশ রাজি হয়ে গিয়েছিলেন। তারপর থেকেই তাঁর সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখত ছেলেটা। তাঁর মুখে এই না জানা জনপদের কথা শুনে থেকে অসম্ভব উত্তেজিত হয়ে পড়েছিল এডি। সে ছেলেমানুষ, তায় আবার অ্যাডভেনচারপ্রিয়। দুর্যোধনের অনুগামীদের নিয়ে অশ্বত্থামার নতুন জনপদ তৈরির কথা শুনে থেকেই সে বলে আসছে সেখানে নিশ্চিত প্রচুর ধনসম্পত্তিও নিয়ে গিয়েছিল তারা। মুকেশ হেসেছিলেন। তার পিঠে হাত রেখে বলেছিলেন, 'এডি, শোনো, তোমার কথা হয়তো সত্যি হলেও হতে পারে। সম্ভাবনাটা আমি উড়িয়ে দিচ্ছি না একেবারে। তবে একটা কথা মাথায় রেখো। তমসা নদীর উচ্চ অববাহিকায় আমরা কিন্তু গুপ্তধনের সন্ধানে যাচ্ছি না। আমরা যাচ্ছি শুধুই একটা প্রাচীন এবং অজানা জনপদ এবং জনজাতিকে খুঁজে বের করার তাগিদে। অবশ্য এই জনজাতি এবং তাদের আজ অবধি মানুষের চোখের আড়ালে থেকে যাওয়া জনপদটি সত্যি যদি খুঁজে বের করতে পারি আমি, আমার কাছে তা কম বড় গুপ্তধন নয়।'
এডি এ কথা শুনে একটু দমে গিয়েছিল। হতাশ গলায় বলেছিল, 'তবুও... যে প্রাচীন পুঁথিটা আপনি পেয়েছেন, তাতে তেমন কিছুর উল্লেখ নেই? রাজা দুর্যোধনের সম্পদ টম্পদের কথা কিচ্ছু লেখা নেই সেখানে?'
'নাহ', মুকেশ আবার হেসেছিলেন। তারপর আকাশের দিকে মুখ তুলে একটাই কথা বলেছিলেন, 'অবশ্য এ কথাটা ওখানে ছিল যে, অশ্বত্থামা মৃত রাজা দুর্যোধনের রাজমুকুট সিংহাসনে বসিয়ে তাঁর নামেই এই নতুন সাম্রাজ্য চালাতে শুরু করেছিলেন। কিন্তু সেই সিংহাসন বা মুকুট নিয়ে আমার তেমন মাথাব্যথা নেই। থাকার কথাও নয়। এতদিনের ব্যাপার... আদৌ ওইসব ধাতব জিনিস সংরক্ষিত আছে কিনা কে জানে। আর থাকেও যদি, তার মালিকানা তো আমরা দাবী করতে পারি না কোনোমতেই...'
'তা ঠিক', মাথার লম্বা, ঘাড় পর্যন্ত নেমে আসা চুল আর দীর্ঘ লালচে দাড়িতে হাত বুলোতে বুলোতে হতাশ গলায় বলেছিল এডি। তবে সে তাঁর পিছুও ছাড়েনি।
এডির উঠতে দেরি হবার জন্যেই যাত্রা শুরু করতে খানিক দেরি হল। কিছুক্ষণ পথ চলার পরে গাইডের হাত ধরে একটা ঝোরা পেরিয়ে আসতে হল। সরু, কিন্তু অসম্ভব স্রোতযুক্ত ঝোরাটা পার হতে এডি ভয় পাচ্ছিল খুব। ওর পা টলমল করছিল। সারাদিন হেঁটে সূর্য যখন হেলে পড়েছে, সেইসময় জঙ্গলের মধ্যে খানিকটা ফাঁকা জায়গায় একটা ছোট্ট বুগিয়ালে তাঁবু খাটাবার নির্দেশ দিলেন মুকেশ। সামনে বুগিয়ালের অপর প্রান্ত থেকে জঙ্গলে ঢাকা পাহাড়ি ঢাল। কাল ওইদিকেই যেতে হবে তাঁদের। কিন্তু গোল বাঁধল সন্ধের ঠিক পরে পরেই। ডিনারে দালিয়া আর আলু ভাজা খেতে খেতে গাইড পোর্টাররা ঘোষণা করে দিল ও পথে যেতে তারা রাজি নয়।
'কেন?' অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন মুকেশ।
'ওটা নিষিদ্ধ এলাকা'। সমস্বরে জানালো ওরা।
'নিষিদ্ধ কেন? কার নিষেধ?' চোখ সরু করে জিজ্ঞেস করে এডি।
'তা বলতে পারব না স্যার। যুগ যুগ ধরে পুরুষানুক্রমে এই নিষেধ আমরা মেনে এসেছি। বহু পুরুষ ধরে আমরা এটুকুই জানি যে, ওদিকে যেতে নেই। ওদিকে গেলেই বিপদ', বলে হাতজোড় করে মুকেশের দিকে তাকায় লোকগুলো, 'ওদিকে আপনারাও দয়া করে যাবেন না স্যার। ওদিকে একবার যারা যায় তারা আর ফেরে না। বাইরের যে দু-একজন ওদিকে যাবার চেষ্টা করেছিল এর আগে, তারা যেমন ফেরেনি আর, আমাদের গ্রামেরও যারা বাপ ঠাকুর্দার নিষেধ অমান্য করে গিয়েছিল এই রাস্তায়, তারাও আর কোনোদিন ফিরে আসেনি গ্রামে।'
'খুব ইন্টারেস্টিং ব্যাপার তো', আনমনে বলেন মুকেশ। তারপর ওদের দিকে ফিরে মৃদু অথচ প্রত্যয়ের হাসি হাসেন, 'কিন্তু আমাকে যে ওই পথেই যেতে হবে কাল। আমার মন বলছে এতদিন ধরে যা খুঁজে চলেছি, তা ওই পথেই পেতে চলেছি আমি। কাজেই আমার সঙ্গে একান্তই যদি আর না যেতে চাও, তাহলে কাল সকালে গ্রামে ফিরে যেতে পারো তোমরা'। বলে এডির দিকে তাকান মুকেশ, 'তুমিও ওদের সঙ্গে নিরাপদে গ্রামে ফিরে যেতে পারো।'
'আর আপনি?' এডি জিজ্ঞেস করে।
'আমি একাই যাব।'
'আমিও যাব', স্থির গলায় বলে এডি। ওর গলায় আত্মবিশ্বাস আর সাহস ছাড়াও আরও কিছু একটা ছিল। মুকেশ চমকে উঠলেন। আড়চোখে চাইলেন এডির দিকে। ছেলেটাকে শুধুই আবেগ আর অ্যাডভেঞ্চারপ্রিয় বলে মনে হচ্ছে না আর...
টানা দেড় দিন এলাকাটা চষে ফেলার পরে যখন মনে হচ্ছিল যা খুঁজছেন তা নিশ্চিত এই অঞ্চলে নয়, হিসেবে অবশ্যই একটা ভুল হয়ে গেছে মুকেশের, ঠিক তখনই জিনিসটা চোখে পড়ল তাঁর। রডোডেনড্রনে ঢাকা ঢালু পাহাড়ের গায়ে একটা গুহামুখ। আর সেই গুহামুখের গায়ে কিছু প্রায় বোঝা যায় না এমন ছবি আর চিহ্ন। একটু আগেই ওই গুহার দেওয়ালেরই গায়ে হেলান দিয়ে বসেছিলেন মুকেশ। গাছপালার আড়ালে ফাটলটা চোখে পড়েছিল একবার। কিন্তু সরু মুখটা খানিক এগিয়েই অমন চওড়া হয়ে গেছে ভাবতেই পারেননি তিনি।
গুহামুখের সরু ফাটলটা লতা পাতার আড়ালে এমনভাবে রয়েছে, দুম করে চোখেই পড়ে না। দু-হাত দিয়ে বুনো ঝোপ আর লতাগাছ সরিয়ে মাথাটা ভিতরে বাড়িয়ে দিলেন মুকেশ। পিঠের রুকস্যাকটা মাটিতে নামিয়ে টর্চ বের করে তিনি আলো ফেললেন গুহার মধ্যে। তখনই ক্ষয়ে যাওয়া চ্যাটালো পাথরে বাঁধানো পথটা চোখে পড়ল তাঁর। পথটা দু-ভাগ হয়ে দু দিকে চলে গেছে। একদিকের ছাদ বেশ উঁচু। আর এক দিকটা নীচু। ও পথে গেলে শুরুর কিছুটা পথ প্রায় বুকে হেঁটে এগোতে হবে। খানিক দূর এগিয়ে যেতে পারলে অবশ্য গুহাটা প্রশস্ত বলেই মনে হচ্ছে টর্চের আলোয়। একটা চিমসে গন্ধ আসছিল গুহার ভিতর থেকে। মাথাটা বাইরে বের করে নিলেন মুকেশ। উত্তেজনায় বুকের মধ্যেকার লাবডুব শব্দ দ্রুততর হয়ে গেছে তাঁর। মুকেশ হাঁপাচ্ছিলেন। তবুও চিৎকার করে উঠলেন তিনি, 'ইউরেকা। পেয়েছি। এডি, সেই পুরানপথ শেষ অব্দি খুঁজে পেয়েছি আমি।'
এডি পথশ্রমে বেশ কাহিল তখন। পাহাড়ের খাড়াই পথটা যেখান থেকে গুহামুখ বেড় দিয়ে ক্রমশ আরও ওপরে উঠে গেছে, তার খানিক তফাতে একটা ঝুলন্ত গ্লেসিয়ারের পাশে সে বসে ছিল চুপটি করে। এই গ্লেসিয়ার যে বহু বহু বছরের পুরোনো তা দেখলেই বোঝা যায়। এমনই একটি প্রাচীন গ্লেসিয়ার হর কি দুন যাবার পথে পার হতে হয় পায়ে হেঁটে। মুকেশ এখানে আসার আগে বার কয়েক গেছেন সেই পথে। মূলত পুঁথির পাতার এই লুকনো জনপদের সন্ধানে ওসলা থেকে শুরু করে রুপিন নদীকে ডান দিকে রেখে সোজা চোদ্দো কিলোমিটার হেঁটে হর কি দুন পৌঁচেছেন। তারপর আরও শ্রমসাধ্য হাঁটা। রাঠাডোর, শ্যাওড়াবিড়া, সতের হাজার পাঁচশ ফুট উঁচু বোরাসু পাস পার হয়ে বুঙ্গা, জায়েরি হয়ে বসপা উপত্যকার ছিটকুল পর্যন্ত চিরুনিতল্লাশ করেছেন দিনের পর দিন। কী কষ্ট যে পেয়েছেন। কত প্রতিকূলতাকে মাড়িয়ে এসেছেন। কিন্তু পাগলের মতন যা খুঁজে চলেছেন, তার এতটুকু হদিশ তিনি করতে পারেননি কোনোখানেই। ভেবেছিলেন বরফের এই সেতু পেরিয়ে কাল ওদিককার পাহাড়ে তল্লাশি শুরু করবেন। না পেলে আবার ফিরে গিয়ে নতুন করে অভিযানের ক্ষেত্র নির্বাচন করা। এ বারে আর বেশিদিন পাহাড়ে জঙ্গলে সেই কিংবদন্তির জনপদ খুঁজে ফেরার উপায় নেই। পোর্টাররা ফিরে যাওয়ায় খুব বেশি রেশন বয়ে আনা যায়নি। কাজেই পথের রসদ শেষই হয়ে এসেছে প্রায়। মুকেশ দুই পাহাড়ের মাঝখানের ঝুলন্ত সেতুর দিকে তাকালেন। দুই পাহাড়ের সংযোগ রক্ষাকারী এই বরফ-ব্রিজ প্রকৃতি যে কত কোটি বছর আগে তৈরি করে রেখেছেন কে জানে! এডি ওখান থেকেই চেঁচিয়ে উঠল, 'পেয়েছেন?'
'বোধহয় পেয়েছি', পরিতৃপ্ত গলায় বলে ওঠেন মুকেশ চতুর্বেদি।
এক লাফে উঠে দাঁড়াল এডি। দৌড়ে এল মুকেশের কাছে। তারপর অদ্ভুতভাবে হেসে উঠে জিজ্ঞেস করল, 'আর ইউ শিওর?'
'হুঁ', বলে আঙুল দিয়ে পাহাড়ের ঢালে লতায় ঢেকে থাকা গোপন সুড়ঙ্গের দিকে দেখান মুকেশ।
'তাহলে আর তো আপনাকে আমার দরকার নেই', বলে হেসে ওঠে এডি, 'আমার ইতিহাসে আগ্রহ নেই। আমার সম্পদের দরকার। আর সেই সম্পদ আমি কারও সঙ্গে ভাগ করে নিতে রাজি নই...' কোমরে ঝোলানো ছোট্ট ব্যাগের পকেট থেকে একটা রিভলবার বের করে এডি। তারপর হিংস্র চোখে মুকেশের দিকে চেয়ে আদেশের সুরে বলে, 'সোজা হাঁটতে থাকুন। ওই গ্লেসিয়ারের ওপর দিয়ে।'
'ওটা মানুষ চলাচলের উপযুক্ত কিনা আমরা এখনও জানি না এডি। নদীটা বরফের আচ্ছাদনের কতটা নীচে তাও তো জানা নেই। আমি ওটার ওপরে হাঁটতে গেলে ব্যাপারটা বিপজ্জনক হয়ে যেতে পারে...'
'নো মোর আরগুমেন্ট', চিৎকার করে ওঠে এডি। শূন্যে গুলি ছোঁড়ে একবার। গাছের মাথা থেকে ঝকঝকে নীল রঙের লম্বা লেজ অলা একঝাঁক পাখি উড়ে যায় পাতায় ঢাকা আকাশের দিকে। গ্লেসিয়ারের ওপরে শরীরের ওজন যাতে কম পড়ে সে জন্যে দ্রুত হাঁটতে লাগলেন মুকেশ। তবুও পায়ের নীচের গ্লেসিয়ার ফেটে গেল। পা ঢুকে যাচ্ছে। ভারসাম্য রাখতে না পেরে বসে পড়লেন মুকেশ। বুঝতে পারলেন তাঁর শরীর ক্রমশ ভেঙে পড়া বরফ-আস্তরণের সঙ্গেই নীচে নেমে যাচ্ছে। নীচের দিকে নেমে যেতে যেতেই মুকেশ দেখলেন গুহার মধ্যে থেকে একটা বাদামি ভাল্লুক গদাইলশকরি চালে বেরিয়ে এগিয়ে আসছে এডির দিকে। পিছন ফিরে আছে বলে ভাল্লুকটাকে এডি দেখতেও পেল না।
সুছন্দা চোখ গোল গোল করে বলে উঠলেন, 'তোমার মাথা খারাপ হয়ে গেছে নাকি পরিকাকু? শানুকে দিয়ে ওসব হবে না। ও কিছুতেই পারবে না। ওকে নিয়ে যাবার পরিকল্পনা তুমি বাতিল করো। আমি শানুকে ওই পাহাড় জঙ্গলের হাঁটা রাস্তায় ছেড়ে দিয়ে কিছুতেই বাড়িতে স্থির হয়ে থাকতে পারব না। তবু ফোন টোন চালু থাকলে সরাসরি ওর সঙ্গে কথা বলে নিশ্চিন্ত থাকতে পারতাম। তুমি তো বলছ ওসব জায়গায় সেলফোনের টাওয়ার পাওয়ার চান্সই নেই কোনো।'
'তা সত্যিই নেই'। পরিদাদু চায়ের কাপে লম্বা চুমুক দিয়ে খুব উদ্বেগহীন গলায় বললেন শান্তভাবে।
'তাহলে? এরপরেও তুমি ওকে নিয়ে যাবার কথা তুলছ কোন সাহসে? শানুকে তো চেনোই। বেড়াতে যাবার নাম শুনলে এমনিতেই নেচে ওঠে, তারপরে আবার তোমার সঙ্গে। ওকে তো আটকে রাখাই মুশকিল হবে এরপর।'
'আটকে রাখবিই বা কেন খুকু', চায়ের কাপে আরেকটা চুমুক দিয়ে একমুঠো চানাচুর মুখে ফেললেন পরিদাদু, 'এই আটকে রাখাটারই তো নীতিগতভাবে ঘোর বিরোধী আমি। চিরকাল তোর মতন ভেতো বাঙালি মায়েরা ছেলেমেয়েদের আটকে রেখে রেখেই তো সর্বনাশ করে ছেড়েছে তাদের। আত্মবিশ্বাসহীন, ভিতু ভিতু টাইপের কিছু লালুভুলু ছেলেমেয়ে ঝুঁকিবিহীন নিশ্চিন্ত নিরাপদ জীবনের মধ্যে ঘাপটি মেরে বসে থেকেই আমৃত্যু কাটিয়ে দিচ্ছে। দেখলে গা পিত্তি জ্বলে যায়। আফশোসও হয়। সেই ডাকাবুকো বাঙালিদের আর কি ফিরে পাব না আমরা কোনোদিন?'
'সে তুমি যাই বলো পরিকাকু, শানুকে জেনেশুনে ওই বিপদের জায়গায় আমি ছেড়ে দিতে পারব না', সুছন্দা নাছোড় গলায় বলেন।
অরুণাংশু চুপ করে বসেছিলেন এতক্ষণ মোবাইলে মুখ ডুবিয়ে। এবার মুখ তুললেন। পরিদাদুর দিকে স্থির চোখে একটুক্ষণ তাকিয়ে থেকে বলে উঠলেন স্পষ্ট গলায়, 'দেখো পরি, সুছন্দার সব কথায় আমি হয়তো সায় দিতে পারি না সবসবয়, কিন্তু ওর এই কথাটায় আমার পূর্ণ সমর্থন আছে। তুমি চিরকেলে একগুঁয়ে আর ডানপিটে। অন্যের কথা কানে তোলা তোমার কুষ্ঠিতে লেখা নেই আমি জানি। কাজেই তোমায় যদি আমি এখন বলি যে বয়েস তো আমাদের দিন দিন কমছে না, বরং বাড়ছে ক্রমাগত। আর সে কথাটা ভুলে গিয়ে বোকার মতন বনেবাদাড়ে পাহাড়ে পর্বতে ঘুরে ঘুরে অযথা সেই বুড়িয়ে আসা শরীরটাকে কষ্ট না দিয়ে এবারে একটু থিতু হও, জানি তুমি শুনবে না। অতএব তুমি যা ইচ্ছে হয় করো। কিন্তু শানুকে এ যাত্রা তোমার সঙ্গে জুটিও না।'
পরিদাদু চশমার ওপর দিয়ে একবার দেখে নিলেন অরুণাংশুর মুখের দিকে। তারপর সুছন্দার দিকে তাকিয়ে হেসে বললেন, 'আচ্ছা খুকু তোর কি আমাকে খুবই অবিবেচক মনে হয়?'
'না তা নয়। তবু...'
'হর কি দুন আগেও তো গেছি আমি। চেনা রাস্তা। এমন কিছু কঠিন ট্রেক নয়। বছর পাঁচ সাত আগেও গিয়েছিলাম যখন, দেখেছি সাউথ থেকে কোন একটা স্কুলের বাচ্চা বাচ্চা ছেলেমেয়েদের নিয়ে টিচাররা এক্সকারশনে বেরিয়েছেন হর কি দুনের রাস্তায়। কী ভালো লেগেছিল আমার। এই তো চাই। ছোটবেলা থেকে প্রকৃতির মধ্যে নিয়ে আসা ছেলেমেয়েদের। আর তার বুকে ভরে দেওয়া খাঁটি অক্সিজেন। সঙ্গে ভরপুর আত্মবিশ্বাস। তাছাড়া হিমালয়কে না দেখলে কি আমাদের এই দেশটাকে চেনা যায় ঠিকঠাক? দেবেনঠাকুর সেই কোন ছোট্ট বয়েসে ছেলে রবীন্দ্রনাথকে হিমালয় দেখতে পাঠিয়েছিলেন। তবে না ছেলেটা বড় হয়ে সারা পৃথিবীকে এমন আশ্চর্য ম্যাজিক দেখিয়ে ছাড়ল। ভাব একবার, সেই সময়ে হিমালয় ভ্রমণ আরও কত কঠিন ছিল। এখন কত জায়গায় গাড়ি ঘোড়া রাস্তাঘাট হয়ে এলাহি কাণ্ড হয়ে গেছে। তখন কী হাল ছিল ওইসব পথের? কিন্তু মুশকিল হল এইসব ঘটনা থেকেও আমরা কিচ্ছুটি শিখতে পারলাম না।'
'তা তুমিই বা ওখানে যাবার জন্যে এত জেদ ধরলে কেন এই বয়েসে? বেড়ানোর আর কি কোনো জায়গা নেই? গাড়ি টাড়ি যায় এমন একটা জায়গা দেখে যাও না। বেড়িয়ে এসো কয়েকদিন। কে বাধা দিচ্ছে! চাইলে শানুকে নিয়েই যাও নাহয়...' সুছন্দা বললেন, 'হিমালয় দেখতে তো বারণ করছি না তোমার নাতিকে। এই তো গেল বছরের আগের বছর দার্জিলিং ঘুরে এলাম আমরা ওকে নিয়ে। আমার বক্তব্য বনেবাদাড়ে, নদীতে, গ্লেসিয়ারে একরাশ ঝুঁকি নিয়ে হেঁটে না বেড়ালে কি হিমালয় দেখা যায় না?'
'না সত্যিই দেখা যায় না', সোফায় পিঠটাকে হেলান দিয়ে ছাদের দিকে মাথা তুলে পরিদাদু বলে উঠলেন হতাশ গলায়, 'টুরিস্ট স্পটে ঝাঁ চকচকে হোটেল আর অসংখ্য দোকানে গিজগিজে লোকের ভিড়ে দাঁড়িয়ে সত্যি সত্যিই হিমালয়কে চেনা যায় না। সত্যিকারের হিমালয়কে দেখতে গেলে, তাকে চিনতে গেলে তার শরীরের কাছাকাছি পৌঁছে যেতে হয়। তার ঘ্রাণ নিতে হয়, তার এক্কেবারে কোলের মধ্যে বাস করা সহজ সরল মানুষগুলোর সঙ্গে মিশে যেতে হয়। শীততাপ নিয়ন্ত্রিত হোটেলের নিশ্চিন্ত আরামে গা ডুবিয়ে প্রকৃত হিমালয়কে চেনা যায় না খুকু। শানুকে আমি সত্যিকারের হিমালয় দেখাব ভেবেছিলাম। যাক কী আর করা যাবে। তোরা রাজি না থাকলে আমি তো আর জোর করে ওকে নিয়ে যেতে পারি না... শানুর জন্যে আমার কষ্ট হচ্ছে আজ। সত্যি বলতে কি তোদের জন্যেও কষ্ট হচ্ছে...' সোজা হয়ে চায়ের কাপ আবার হাতে তুললেন পরিদাদু। প্রায় নিঃশব্দে তাতে চুমুক দিতে লাগলেন।
'তা ওখানে গিয়ে উঠবে কোথায় প্রথমে? আই মিন শুরুটা হবে কোথা থেকে?' মোবাইল থেকে আবার মুখ তুললেন অরুণাংশু।
'আমার এক বন্ধু নিখিলেশ ডেহরায় থাকে', চায়ের কাপ কাচের টি টেবিলের ওপরে নামিয়ে দিয়ে সোফায় হেলান দিলেন পরিদাদু, 'ওখানকার একটা স্কুলে ইতিহাস পড়ায় ও। পাহাড় ওর কাছে নেশার মতন। সুযোগ পেলেই গাড়োয়াল আর কুমায়ুন পায়ে হেঁটে চষে বেড়ায় নিখিলেশ। আমিও ওর সঙ্গে বেরিয়েছি কয়েকবার। ধরা বাঁধা রুটের বাইরে বেরিয়ে আর পাঁচজন মানুষের এক্কেবারে অজানা সব জায়গায় ঘুরে বেড়ায় ও নিজের ইচ্ছে মতন। কত যে অদ্ভুত অদ্ভুত অভিজ্ঞতা ওর, শুনলে অবাক হয়ে যেতে হয়। নিখিলেশ বলে হিমালয়ের মতন রহস্যময় পর্বত দুনিয়ায় দ্বিতীয়টি নেই...'
'ডেহরা, মানে দেরাদুন?' আওয়াজ করে একটা হাই তুলে বলেন অরুণাংশু, 'ওখানেও ছেলেমেয়েরা ইতিহাস পড়ে?'
'পড়বে না?' হো হো করে হেসে ওঠেন পরিদাদু। তারপর গম্ভীর হয়ে বলেন, 'যতই ঠাট্টা করো অরুণ, এটাই ফ্যাক্ট যে আমাদের মতন অধিকাংশ সবজান্তা বাঙালির চেয়ে ওদিককার মানুষ অনেক বেশি ইতিহাস সচেতন। শুধু ইতিহাস সচেতনই নয়, তারা এদেশের ইতিহাস সম্পর্কে অনেক বেশি শ্রদ্ধাশীলও বটে।'
'তা তোমার ওই বন্ধু নিখিলেশবাবু, উনি কি কলকাতার লোক?' পরিদাদুকে এমন গম্ভীর হয়ে যেতে দেখে প্রসঙ্গ পালটাতে বলে ওঠেন অরুণাংশু।
'হ্যাঁ। তবে দীর্ঘদিন হল ওখানেই সেটল করে গেছে। কলকাতার দিকে আজকাল আসেও না বড় একটা। ওখানকার মোটামুটি নামি একটা কনভেন্ট স্কুলে চাকরি করছে। নিখিলেশ চিরকালই খামখেয়ালি মানুষ। বিয়ে থা করেনি। স্কুল আর পাহাড় পর্বত নিয়ে দিব্বি আছে নিজের মতন। কিছুদিন আগে ফোন করে মে মাসের দিকে যেতে বলল আমায়। হর কি দুনের দিকে যাবার ইচ্ছে নাকি আমাকে নিয়ে। আমিই নিজে থেকে শানুকে সঙ্গে নেবার কথা ভাবলাম। মনে হল, ওই সময়ে তো এমনিতেই ওর সামার ভ্যাকেশন থাকার কথা, ইস্কুল পাঠশালের ঝামেলা নেই। হিমালয়কে কাছ থেকে দেখার সুযোগ তো সবসময় সকলের হয় না। ভেবেছিলাম আমি যাচ্ছি শুনলে তোমরা না করবে না হয়তো। সে ভরসাটুকু আমার ওপরে তোমাদের আছে এমন বিশ্বাসই তো ছিল আমার এতদিন... কাজেই...' কথা শেষ না করেই চুপ করে গেলেন পরিদাদু।
'তোমার ওপরে বিশ্বাস এবং ভরসা সবই আছে আমাদের পরিকাকু', সুছন্দা বলে ওঠেন অপ্রস্তুত গলায়, 'আমরা শানুর কথা ভেবেই আপত্তি করছি। ও কি আর সত্যি সত্যি পারবে?'
'পারব'। এতক্ষণ মাথা নামিয়ে চুপ করে সকলের কথা শুনছিল শাওন। এবার সুছন্দার কথার খেই ধরে দৃঢ়স্বরে বলে উঠল।
'ভেবে দেখ একবার শানু', অরুণাংশু সোজা হয়ে বসলেন, 'আবেগের মাথায় দুম করে বায়না ধরে বসিস না, এ তোর সমতলে হাঁটা নয়। পাহাড়ে হাঁটতে গিয়ে আচ্ছা আচ্ছা লোকের জিভ বেরিয়ে যায়।'
'আমি পারব। আমার অসুবিধা হবে না'। আবার বলল শাওন, 'পরিদাদু সঙ্গে থাকলে আমি সব পারি। তাছাড়া পরিদাদুর মুখেই শুনলে তো, দক্ষিণের কোন এক স্কুলের ছাত্র-ছাত্রীরা ট্রেক করতে গিয়েছিল ওখানে তাদের টিচারদের সঙ্গে। ওরা যদি পারে আমি পারব না কেন?'
'ওদের কথা বাদ দে', সুছন্দা এগিয়ে এসে শাওনের মাথায় হাত রাখলেন।
'কেন বাদ দেব মা', শাওন হাসে, 'ওরাও তো আমারই মতন সমতলের ছেলে মেয়ে। আমি পারব না কেন তাহলে। তাছাড়া এই প্রথম কি পাহাড়ে হাঁটছি আমি? এর আগেও তো অরুণাচলে পরিদাদুর সঙ্গে পাহাড়ে চড়েছি আমি।'
'সাবাশ', শাওনের পিঠে আদর করে হাত ছোঁয়ালেন পরিদাদু, 'এতক্ষণে মনে হচ্ছে তুই আমারই নাতি। খবরদার মায়ের আঁচলের তলায় লুকিয়ে থাকা আলুভাতে মার্কা ভেতো বাঙালি হয়ে বাঁচবি না কোনোদিন।'
শাওন হেসে ফেলল তাঁর কথা শুনে। অরুণাংশুও হেসে ফেললেন এবার পরিদাদুর কথা বলার ঢঙ দেখে। তারপর তিনিই সুছন্দার দিকে চেয়ে বললেন, 'আর আটকাতে চেয়ে লাভ নেই বুঝলে। যেমন দাদু তেমনই নাতি। দুটোই সমান গোঁয়ার। সবই তো বুঝছো। পরির কাছে যে ট্রেনিং পেয়েছে, তাতে ওকে আর ঘরে আটকে রাখতে পারবে না তুমি। কাজে কাজেই সম্মানজনক রিট্রিটই বেটার। পারমিশনটা দিয়েই দিই বুঝলে...'
'আমি আর কী বলব। যা ভালো বোঝো করো', বলে রান্নাঘরের দিকে চলে গেলেন সুছন্দা।
'তাহলে টিকিট করে ফেলি?' একগাল হেসে বলে ওঠেন পরিদাদু।
'ফেলো'। অরুণাংশু মাথা নাড়েন।
'থ্যাঙ্ক ইউ বাবা', বলে লাফিয়ে উঠে অরুণাংশুর গলা জড়িয়ে ধরল শাওন।
'ভাগ্যিস এসি কোচে টিকিট কেটেছিলে পরিদাদু, নাহলে বিহার ইউ পির ওপর দিয়ে আসার সময় গরমে একেবারে ঝলসে যেতাম, কাচের জানালার বাইরে এই শেষ সকালের উজ্জ্বল রোদ্দুরের দিকে চেয়ে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে বলে উঠল শাওন। কিছুক্ষণ আগে কোন একটা স্টেশনে দাঁড়িয়েছিল ট্রেনটা। জলের বোতল কেনার জন্যে শাওনকে নীচে নামতে হয়েছিল একবার, মনে হচ্ছিল গায়ের চামড়া যেন পুড়ে যাচ্ছে। স্লিপার কোচের যাত্রীদের অবস্থাটা তখনই অনুমান করতে পারছিল সে। কাল সারাদিনে তাকে একবারও নামতে হয়নি ট্রেন থেকে। জলের বোতল কেনার জন্যে এবং টুকটাক খাবার দাবার কেনার জন্যে যতবার নামতে হয়েছে পরিদাদুই নেমেছিলেন। শাওনের খারাপ লাগছিল। তাই আজ নিজে থেকেই বলেছিল, 'তুমি বোসো পরিদাদু, আমি যাচ্ছি।'
'পারবি তো?' পরিদাদু জিজ্ঞেস করেছিলেন স্নেহের সঙ্গে, 'ট্রেনের দিকে খেয়াল রাখবি সবসময়। কখন সিগন্যাল হয়ে যাবে, নিঃশব্দে ট্রেন ছেড়ে চলে যাবে তোকে প্ল্যাটফর্মের জলের দোকানে ফেলে রেখে...'
'ধুস, কী যে বলো', শাওন হাসে, 'অসুবিধা হবে না'। ভাগ্যিস নেমেছিল। নইলে শাওন বুঝতেই পারত না ট্রেনের ভিতরটা এতখানি আরামদায়ক বাইরের আবহাওয়ার নিরিখে।
'হুঁ', হালকা হেসে জবাব দেন পরিদাদু, 'আমার অভিজ্ঞতা ছিল। খুব জানতাম এ সি টিকিট না থাকলে কী পরিস্থিতি হতে পারে এই সময়ে।'
'এরকম সময়ে তুমি স্লিপারে চড়ে আগে এসেছো এ দিকে?' শাওন জিজ্ঞেস করে ব্যাগ থেকে বিস্কুটের প্যাকেট বের করতে করতে।
'এসেছিলাম বছর পাঁচেক আগে', পরিদাদু জানালার বাইরের দিকে তাকিয়ে নিয়ে বলেন, 'সেবারে এ সি টিকিট পাইনি। অথচ আসতেই হত এমন ইমার্জেন্সি ছিল। এত গরম লেগেছিল... কম্পার্টমেন্টের আপার বার্থে ওঠার সিঁড়িতে অসাবধানে হাত লেগে গেলে একেবারে ফোসকা পড়ে যাওয়ার উপক্রম হচ্ছিল। লু বইছিল সারাক্ষণ। সারাদিন গামছা ভিজিয়ে চোখে মুখে চাপা দিয়ে বসে থাকতে হয়েছিল আমায়'। শাওনের দিকে হাত বাড়িয়ে দেন পরিদাদু, 'দে আমাকেও দুটো বিস্কুট দে দেখি, ক্ষিদে পেয়ে গেছে।'
হরিদ্বার পর্যন্ত দুর্দান্ত এসেছিল ট্রেনটা। এক্কেবারে ঠিক সময়ে সক্কালবেলা হরিদ্বার স্টেশনে পৌঁছে গিয়েছিল ওরা। ওখানে প্রায় পুরো কামরাটাই খালি হয়ে গেল। পরিদাদু বলেছিলেন আর খুব বেশিক্ষণ লাগবে না দেরাদুন পৌঁছতে। কিন্তু হরিদ্বার ছাড়ানোর পরেই গাড়িটা কেমন যেন গড়াতে গড়াতে চলতে লাগল। যেন ক্লান্তিতে আর এগোতে মন চাইছে না ওর। যেখানে দাঁড়াচ্ছে সেখানে দাঁড়িয়েই থাকছে। এই করতে করতে দেরাদুন পৌঁছতে পৌঁছতে প্রায় সাড়ে এগারোটা বাজিয়ে দিল ট্রেনটা। পরিদাদু ঝুঁকে পড়ে বার্থের নীচে থেকে রুকস্যাক দুটো বের করতে করতে বললেন, 'তাড়াহুড়ো করার দরকার নেই। সকলে নেমে যাক।'
ভিড় হালকা হয়ে গেলে রুকস্যাক পিঠে তুলল শাওন। পরিদাদুর দিকে চেয়ে বলল, 'এবারে নামি?'
'নাম। চল', বলে নিজের লম্বা রুকস্যাকটা পিঠে তুলে নিয়ে ছোট্ট পাউচ ব্যাগটা কোমরে আটকে নিলেন পরিদাদু।
নিখিলেশ স্টেশনের ঠিক বাইরেই দাঁড়িয়ে ছিলেন। স্টেশন চত্বর থেকে বাইরে বেরিয়েই ওঁকে দেখতে পেয়ে গেলেন পরিদাদু। নিখিলেশও ওদের দেখতে পেয়ে এগিয়ে এলেন। পরিদাদুকে দেখে একেবারে জড়িয়ে ধরলেন দু-হাত দিয়ে। তারপর আবেগমাখা গলায় বললেন, 'সত্যিই এলি তাহলে।'
'আসব না', পরিদাদু হাসেন, 'তোর ডাক কবেই বা এড়াতে পেরেছি বল'। পরিদাদুর কথা শুনে শাওনও হেসে ফেলল। আর তখনই তার দিকে নজর পড়ল নিখিলেশ দাদুর, 'তুমিই তো শাওন, রাইট?' বলে শাওনের মাথার চুল আঙুল দিয়ে ঘেঁটে এলোমেলো করে দিলেন তিনি আদর করে। তারপর একগাল হেসে বললেন, 'তুমিও যে আসছ আগে তো সে কথা পরি বলেইনি আমাকে। কালই আমাকে প্রথম জানালো ট্রেন থেকে ফোন করে। এটা সত্যিই দারুণ একটা সারপ্রাইজ আমার জন্যে।'
'হুঁ', হেসে ওপর নীচ মাথা নাড়ে শাওন। নিখিলেশদাদুও হাসেন, 'ওয়েলকাম শানুবাবু, তোমাকে দেখে সত্যিই খুব ভালো লাগছে', বলেই পরিদাদুর দিকে চাইলেন তিনি, 'আর একদম দেরি নয়। চল বেরিয়ে পড়ি আমরা। আমি গাড়ি এনেছি। লাগেজ গাড়িতে রেখে দিই চল। আগে ফ্রেশ হয়ে নিয়ে মুখে দে কিছু। নিশ্চিত খুব ক্ষিদে পেয়ে গেছে?' প্রশ্নটা করলেন তিনি শাওনের দিকে তাকিয়েই।
'না না তেমন কিছু নয়। এই তো ট্রেন থেকে নামার আগেই হাল্কা ব্রেকফাস্ট সেরে নিলাম আমরা', লাজুক গলায় বলে শাওন। কিন্তু সত্যিই ক্ষিদে পাচ্ছিল তার। নিখিলেশদাদু ততক্ষণে হাঁটতে শুরু করে দিয়েছেন সামনের দিকে। পরিদাদু আর শাওন অনুসরণ করল তাঁকে।
গাড়িটা একটু দূরেই দাঁড়িয়ে ছিল। নিখিলেশ এগিয়ে যেতেই ড্রাইভার দরজা খুলে বাইরে বেরিয়ে এলেন। নিখিলেশ হিন্দিতে বললেন, 'মহিন্দার, এদের লাগেজগুলো গাড়িতে তুলে নাও। দেখো কোথায় কীভাবে রাখা যায় এগুলো।' বলেই পরিদাদুর দিকে চেয়ে বললেন, 'আয়, উঠে পড়', তারপর শাওনের দিকে মুখ ফিরিয়ে ডাক দিলেন উঁচু গলায়,'শানু এসো বসে পড়ো।'
দেরাদুন শহরটা বেশ ঘিঞ্জি। লোকজন, দোকানপাটের অভাব নেই। গাড়িতে ওঠার আগেই টের পাওয়া গেছে শহরটায় গরমও ভালোই। তবে দেরাদুন পেরিয়ে গাড়ি পাহাড়ি পথে ওপরের দিকে ওঠা শুরু করতেই প্রকৃতি, পরিবেশ ও দৃশ্যপট সবকিছুই এক লহমায় যেন বদলে গেল। পরিদাদু অবাক হয়ে বললেন, 'আমাদের কোথায় নিয়ে যাচ্ছিস নিখিল?'
'আমার বাড়ি', নিখিলেশদাদু হাসলেন।
'তুই স্কুলের কোয়ার্টারেই ছিলি না...সেটা এত দূরে ছিল না তো!'
'চিরকাল কি পরের দয়ায় থাকব', নিখিলদাদু দরাজ গলায় হেসে উঠলেন হো হো করে, 'যখন চাকরি থাকবে না তখন কি গাছতলায় গিয়ে দাঁড়াব পরি?'
'না মানে আগেরবার যখন এসেছিলাম তখন বোধহয় তোর ওই স্কুলের টিচার্স কোয়ার্টারেই উঠেছিলাম', পরিদাদু অপ্রস্তুত গলায় বললেন।
'হ্যাঁ', নিখিলদাদু ওপর নীচ মাথা দোলালেন, 'তখনও নিজের এই আস্তানাটা বানিয়ে উঠতে পারিনি।'
মূল মুসৌরি শহরের সামান্য আগে রাস্তার বাঁদিকে মোরাম বিছনো অপেক্ষাকৃত সরু একটা পথে বেঁকে গিয়ে খানিক এগিয়েই ছবির মতন সুন্দর একটা একতলা বাড়ির সামনে এসে গাড়িটা থেমে গেল। নিখিলদাদু একগাল হেসে বললেন, 'এই তো এসে গেছি। এই আমার বাড়ি। আয় পরি। নেমে পড়। দু দিনের ট্রেন জার্নি। বুঝতেই পারছি ধকল গেছে খুব। যতই ডানপিটেমি করে বেড়াস চারদিকে, বয়েস তো আর দাঁড়িয়ে নেই বাবা। সে তার মতন করে ঠিক থাবা বসিয়েই চলেছে তোর আমার ওপরে। কাজেই নো সময় নষ্ট। বাড়িতে ঢুকে তাড়াতাড়ি ফ্রেস হয়ে নে দুজনে। তারপরে কিঞ্চিৎ জলযোগ এবং ঘুম। খানিকক্ষণ বিশ্রামের পর কথাবার্তা বলা যাবেখন।'
'দুর, ধকলের আর কী আছে', বলতে বলতেই গাড়ি থেকে নেমে বাড়ির মধ্যে ঢুকে পড়েন পরিদাদু, 'এসি কোচে দিব্বি শুয়ে বসে আরাম করে এসেছি। খিদে পেলে খেয়েছি, যখনই চা খেতে মন চেয়েছে স্টেশনে নেমে চা খেয়ে এসেছি...'
'তবু একটা অস্বস্তি থাকেই। আমার তো বাপু একটানা বেশ কয়েকঘণ্টা ট্রেন চড়ার পরে গন্তব্যে নেমে পড়লেও মনে হয় ট্রেনের দুলুনিটা যেন শরীরে লেগে রয়েছে। আমায় ছেড়ে যেতে চাইছে না', নিখিলদাদু মজা করে বলেন। তারপরেই হাঁক ছাড়েন, 'রাম সিং, কোথায় গেলি রে, লাগেজগুলো গাড়ি থেকে নামিয়ে নিয়ে আয় বাপ'। নিখিলদাদুর চিৎকার শুনেই বোধহয় একটা বছর আঠেরো উনিশের ছেলে ঘর থেকে বেরিয়ে এসে শাওনের পাশ দিয়ে দৌড়ে এগিয়ে গেল গাড়ির দিকে। শাওন বুঝল এই রাম সিং, নিখিলদাদুর খাস আদমি...
রাম সিং বেশ চটপটে। লাগেজ টাগেজ সব একা হাতেই গাড়ি থেকে নামিয়ে পরিপাটি করে ঘরের একধারে সাজিয়ে রেখে পরিদাদুকে হাতের ইশারায় একটা ঘরের দিকে দেখিয়ে দিল, 'আইয়ে সাব, ইয়ে হ্যায় আপকা ঘর...'
ঘরের মধ্যে দুটো সিঙ্গল বিছানায় সাদা ধপধপে চাদর পাতা টানটান করে। মাথার বালিশ, পাশপালিশ, পায়ের কাছে পাতলা কম্বল, সমস্ত কিছুই সুন্দর করে গুছিয়ে রাখা। ঘরের লাগোয়া চানঘর। রাম সিং বলল, 'গরম পানি মউজুত হ্যায়। আগার আপলোগ চাহে তো নাহা সকতা।'
'বিউটিফুল', খুশি হয়ে বললেন পরিদাদু, 'তুমি সত্যিই খুব কাজের ছেলে রাম, নিখিল একটুও বাড়িয়ে বলেনি আমার কাছে তোমার নামে'। পরিদাদুর কথা শুনে রাম সিং বোধহয় লজ্জা পেল একটু। তার ফর্সা গোল মুখটায় লালচে আভা ছড়িয়ে পড়ল। সরু চোখদুটো চিকচিক করে উঠল আনন্দে। মাথা নীচু করে পরিদাদুকে অভিবাদন করে সে ঘর ছেড়ে বাইরে বেরিয়ে গেল।
বাথরুমের বেসিনে গিয়ে চোখে মুখে জলের ছিটে দিলেন পরিদাদু। তারপর শাওনের দিকে চেয়ে বললেন, 'তুই আগে চান করে নিবি নাকি আমি আগে যাব?'
'তুমি যা বলবে', শাওন হাসে।
'তাহলে আমি আগে যাচ্ছি। তুই ততক্ষণে রেডি হয়ে নে।'
'ঠিক আছে', মাথা নাড়ে শাওন।
চান টান করে কিছু খাওয়ার পরে সত্যিই ঘুম এসে গেল চোখে। পরিদাদুও বললেন, 'বয়েস সত্যিই বাড়ছে রে শানু। সকলে ঠিকই বলছে। এবার আমি বিলকুল বুড়ো হয়েছি। শরীরটা বিছানায় টান টান করতে বড্ড লোভ হচ্ছে এইবার।'
রাম সিং-ই লাঞ্চের আগে ডেকে দিল ঘুম থেকে। পরিদাদু অবশ্য আগেই উঠে পড়েছিলেন। চোখে মুখে জল দিয়ে খাবার টেবিলে এসে বসল শাওন। পরিদাদু আর নিখিলদাদু আগের থেকেই বসেছিলেন সেখানে। দুই বন্ধু কথা বলছিলেন নীচু গলায়। শাওন এসে বসতে নিখিলদাদু তার দিকে চেয়ে হাসলেন, 'ঘুম হল শানু?'
'খুব জোর ঘুমিয়ে পড়েছিলাম', শাওন লাজুক গলায় বলে।
'খুব ভালো করেছো', নিখিলদাদু তার মাথায় হাত রাখলেন এগিয়ে এসে, 'ঘুমটা দরকার ছিল। সব ক্লান্তি কেটে যাবে এবার দেখো।'
রাম সিং খুব পরিপাটি করে খাবার সাজাচ্ছিল টেবিলে। সরু চালের সুগন্ধি ভাত। হিঙের গন্ধওড়া ডাল আর আলুভাজা। সঙ্গে চিকেন এবং টক দই। নিখিলেশদাদু জিজ্ঞেস করলেন, 'শানু, দইতে মিষ্টি লাগবে তোমার?'
'হ্যাঁ', ওপর নীচে মাথা দুলিয়ে বলে শাওন। নিখিলেশদাদু রাম সিংকে ডেকে শাওনের দইতে চিনি দিতে বলে পরিদাদুর দিকে চাইলেন, 'তোর?'
'উঁহু'। পরিদাদু দু দিকে মাথা নাড়ালেন।
'আমিও চিনি ছাড়াই খাই', নিখিলেশদাদু খাওয়া শুরু করলেন, 'জার্নি করে আসছ এত পথ, ওইজন্যে খুব লাইট খাবার বানাতে বলেছিলাম।'
'এক্কেবারে ঠিক কাজ করেছিস', পরিদাদু তাঁর কথায় সায় দিয়ে বলেন, 'তাছাড়া আমি বা শানু কেউই খুব একটা খাওনদার মানুষ নই। অতএব খাওয়া দাওয়া নিয়ে কোনো বাহুল্যের দরকার নেই।'
'তোর জন্যে তো চিন্তা নেই, তোকে তো কবে থেকেই চিনি। কিন্তু শাওন প্রথমবার এল আমার কাছে। ছেলেমানুষ। ওকে একটু তো যত্নআত্তি করতেই হয়...' নিখিলেশদাদু বাঁ হাতটা শাওনের মাথায় একবার বুলিয়ে নিয়ে বলেন।
'শাওনও আমারই মতন', পরিদাদু হাসেন, 'খাওয়ার ব্যাপারে কোনো বায়নাক্কা নেই। আমি ওকে শিখিয়েছি সবরকম পরিস্থিতির সঙ্গে কীভাবে প্রতি মুহূর্তে নিজেকে মানিয়ে নিতে হয়...'
'বটেই তো, তা নাহলে তোর ঠিকঠাক চ্যালা হবে কেমন করে', বলেই একটু চুপ করে রইলেন নিখিলেশদাদু। তারপর বললেন, 'পরি, আমার চারটে বাড়ি পরে থাকেন মিস্টার পানিগ্রাহি। বিউটুফুল গাই। মিসেস পানিগ্রাহিও অসম্ভব ভালো মানুষ। ওদের এক মেয়ে, অঙ্কিতা। আমি ওদের কালই বলে রেখেছি তোরা আসছিস। স্পেশালি শানুর জন্যেই বলা। অঙ্কিতা ওর খুব বন্ধু হয়ে যাবে আমি জানি। সি ইজ ভেরি অ্যাকোমোডেটিভ। ওরা শানুকে এই অঞ্চলের সব টুরিস্ট স্পট ঘুরিয়ে দেখাবে বলেছে। ওদের নিজেদের গাড়ি আছে। ইনফ্যাক্ট অঙ্কিতা তো লাফাচ্ছে শাওনের সঙ্গে একসাথে বেড়াবার জন্যে। ও এখানে থাকলে কী হবে, বাংলার প্রতি খুব ন্যাক। নিজের চেষ্টাতেই বাংলা শিখেছে। দিব্বি লিখতে পড়তে পারে। কলকাতা থেকে বাংলা বই আনিয়ে পড়েও নিয়মিত। তোর এবং শাওনের নানান কাহিনিও বাংলা গল্পের বই থেকে পড়েছে মেয়েটা। সত্যি বলতে কী, তোদের এত সব দস্যিপনার খবর আমি নিজেই জানতাম না। অঙ্কিতাই আমাকে তোদের ব্যাপারে আপ টু ডেট রেখে দিয়েছে বলতে পারিস...'
'তুই কী বলতে চাইছিস আমার ঠিক মাথায় ঢুকছে না নিখিল', খাওয়া থামিয়ে নিখিলেশদাদুর কথার মাঝখানেই বলে উঠলেন পরিদাদু, 'এই যে আমাকে ফোনে বার বার বললি আমরা হর কি দুন ট্রেক করব...'
'সে তো করতেই হবে। তবে ট্রেকিং রুটটা ঠিক হর কি দুনের পথ নয়, ওই পথে কিছুটা এগিয়ে একটু অন্যদিকে যেতে হবে আমাদের। কাজেই, অভিযানটা কিছুটা অপ্রচলিত পথেই বলতে পারিস। যাই হোক, অলরেডি আমি ও ব্যাপারটা অ্যারেঞ্জ করেও ফেলেছি খানিকটা। পরশু ব্রেকফাস্ট করে নিয়েই আমরা রওনা দেব। জার্নিটা একটু বেশি হলেও কিছু করার নেই, কেননা আমাদের হাতে খুব বেশি সময় নেই। তোদেরও ফেরার ব্যাপারটা মাথায় রাখতে হচ্ছে...কাজেই এক্কেবারে শাঁকরিতেই চলে যাব আমরা প্রথম দিনে। ওখানে নাইট স্টে করে পরদিন পোর্টার কালেক্ট করে নিয়ে যত সকাল সকাল পারি তালুকা পৌঁছতে হবে। ওখানেই সামান্য খাওয়াদাওয়া সেরে নিয়ে হাঁটা শুরু করে দেব আমরা। ভালো ও বিশ্বস্ত পোর্টার রাওয়াত দেখে রাখবে। ওকে বলা আছে আমার। শাঁকরিতে থাকার ব্যাপারটাও ওই অ্যারেঞ্জ করবে বলে রেখেছে।'
'রাওয়াত কে?' পরিদাদু জিজ্ঞেস করলেন।
'আমার অনেকদিনের পরিচিত। বন্ধুই বলতে পারিস। শাঁকরিতে ওর হোটেল আর হোম স্টে-র বিজনেস আছে। এছাড়া ট্রেকারদের যাবতীয় প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম ও ভাড়া দেয়। ট্রেকারদের কাছে রাওয়াত খুবই জনপ্রিয়। ওর ব্যবসাটাও যথেষ্ট চালু ব্যবসা। সবথেকে বড় কথা ছেলেটা খুব রিলায়েবেল।'
খাওয়া শেষ করে উঠে পড়লেন নিখিলদাদু। বেসিনে হাত ধুয়ে একটা ছোট কৌটো থেকে দু-টুকরো আমলকী মুখে ফেলে তিনি বললেন, 'আমাদের এই জার্নিটায় শানুকে আমি নিতে চাইছি না। মূলত সেই কারনেই তোকে যখন এখানে আসার কথা বলি, শানুকে আনার কথা আমি বলিনি।'
শাওন পরিদাদু আর নিখিলদাদুর কথা শুনতে শুনতে চুপ করে খাচ্ছিল। নিখিলদাদুর শেষ কথাটা শুনে চমকে মুখ তুলল সে। পরিদাদুও রীতিমতন চমকে উঠলেন। অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন তিনি, 'কেন, শানুকে না নিয়ে যাবার কারন কী?'
সকলেরই ততক্ষণে খাওয়া শেষ হয়েছে। রাম সিং এসে টেবিল থেকে খাওয়া থালা বাসনগুলো সরিয়ে নিচ্ছে তখন। বাইরে বাগানের গাছে বসে একটা পাখি ডাকছে ট্রিইই ট্রিইই করে। নিখিলদাদু ডাইনিং হল থেকে নিজের বেডরুমে এসে বিছানার ওপরে বজ্রাসন করে বসলেন। পরিদাদু আর শাওনকে সামনের চেয়ারে বসতে বলে নীচু গলায় বলতে শুরু করলেন, 'আমি এই যে হর কি দুনের দিকে যেতে চাইছি তা ঠিক ট্রেক করার উদ্দেশ্যে নয়...'
'মানে?' নড়েচড়ে বসলেন পরিদাদু, 'তোর উদ্দেশ্যটা ঠিক কী সেটা একটু ঝেড়ে কাশ দিকিনি এবার। সন্দেহ আমার তখনই হয়েছিল যখন জোর দিয়ে বললি আমাকে আসতেই হবে। ভাবছিলাম কী এমন হল যে হঠাৎ হর কি দুন যাবার ঝোঁক চাপল তোর মাথায়... তারপর নিজেই নিজেকে বোঝালাম মানুষটা তো তুই চিরকালই ক্ষ্যাপাটে, কাজেই দুম করে মনে হতেই পারে স্বর্গারোহিণীকে একবার কাছ থেকে দেখেই আসি, হাজার হোক স্বর্গে যাবার ওইটেই তো পথ... আগে থেকে পথ ঘাট দেখে রেখে এলে পরে বিস্তর সুবিধে। আলটিমেটলি যেতে তো হবেই...'
নিখিলদাদু হাসলেন, 'স্বর্গেই যে যাব কে বলতে পারে পরি...' তারপর একটু চুপ করে থেকে গম্ভীর গলায় বললেন, 'তবে ব্যাপারটা হাসি ঠাট্টার কথা নয়। একজন অত্যন্ত গুণী মানুষ একটা অদ্ভুত আবিষ্কারের তাগিদে বেরিয়ে মাস ছয়েক হল নিরুদ্দেশ হয়েছেন এই পথে। মানুষটি শুধুই যে একজন পণ্ডিত এবং গুণী মানুষ তাই নয়, তিনি আমার খুবই অন্তরঙ্গ বন্ধু। তাঁর এই হঠাৎ হারিয়ে যাওয়াটা আমার কাছে স্বাভাবিক ঠেকছে না কিছুতেই। কোথায় কী একটা যেন চাপা রহস্যের গন্ধ পাচ্ছি আমি গত কয়েক মাস ধরে। আমি তোকে সঙ্গে নিয়ে তাঁর খোঁজ করতে চাইছি।'
'সেই বন্ধুটি কে?' পরিদাদু চোখ সরু করে তাকালেন নিখিলদাদুর দিকে।
'মুকেশ চতুর্বেদী। নাম শুনেছিস?'
পরিদাদু চোখ বন্ধ করে ভাবলেন খানিক। তারপর বললেন, 'যদ্দূর মনে পড়ছে হিমালয়ের সঙ্গে জড়িত নানান মিথোলজিক্যাল স্টোরি এবং তাদের ভিত্তি ও সত্যসম্ভাবনা নিয়ে তাঁর লেখা একটা বই পড়েছিলাম ইংরেজিতে।'
'কারেক্ট, কাজটা একসময় প্রশংসিত হয়েছিল খুব', নিখিলদাদু উজ্জ্বল চোখে বললেন, 'হিমালয় ছিল মুকেশজির একটা অদ্ভুত অবশেসন। গাড়োয়াল আর কুমায়ুন একেবারে চষে ফেলেছিলেন ভদ্রলোক। এবং অনেক প্রফেশনাল ট্রেকার যেসব জায়গায় যাবার কথা ভাবতেও পারেন না, হিমালয়ের সেইসব প্রত্যন্ত এলাকাও দীর্ঘদিন ধরে ঘুরে বেড়িয়েছেন তিনি পায়ে হেঁটে। ইদানীং হর কি দুনের আশেপাশের যে হিমালয়ান রিজিয়ন, সেখানে এক অতি প্রাচীন জনগোষ্ঠী এবং জনপদের সন্ধান করছিলেন তিনি, যা এখনও পর্যন্ত, এই একবিংশ শতাব্দীতেও মানুষের অজানাই থেকে গেছে।'
'বলিস কী রে?' পরিদাদু নড়েচড়ে বসেন, 'এই স্যাটেলাইট পিকচারের জমানায় এমন অঞ্চলও আছে, যেখানে দিব্বি মানুষ বাস করে অথচ আমরা তার সন্ধান পাইনি?'
'তাঁর কথা বিশ্বাস করতে গেলে বলতে হবে আছে। এবং বহাল তবিয়তে আছে। দু-চারশো বছর নয়, এই জনগোষ্ঠী কয়েক হাজার বছর ধরে নিজেদেরকে আড়ালে রেখে দিয়েছে ইচ্ছে করে।'
'আশ্চর্য!' আবার বললেন পরিদাদু, 'এ বিষয়ে তুই কতটুকু জানিস?'
'তথ্য এখনও পর্যন্ত যতটুকু পেয়েছি আর যা ভাবছি তা যদি সত্যি হয় তাহলে এটা একটা অদ্ভুত আবিষ্কার রে পরি ... বজ্রাসন ভেঙে স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বিছানায় পা ঝুলিয়ে বসলেন নিখিলেশদাদু, 'একটা অজানা ইতিহাসের সন্ধান করছিলেন মুকেশ চতুর্বেদী। একটা মিস্ট্রি। মিস্ট্রি না বলে বরং এটাকে মিথই বলি বুঝলি। অবশ্য সত্যি যদি জায়গাটা শেষ পর্যন্ত খুঁজে পাওয়া যায় তাহলে মারাত্মক ব্যাপার হবে ঘটনাটা। ভারতবর্ষের যাবতীয় ইতিহাস বই হয়ত নতুন করে লিখতে হবে আবার...'
পরিদাদু হাঁ করে তাকিয়ে ছিলেন নিখিলদাদুর দিকে। তাঁর চোখও চকচক করছিল। নতুন একটা কোনো রহস্যের গন্ধ পেয়ে শাওনও ভিতরে ভিতরে উত্তেজনা বোধ করছিল খুব। পরিদাদু সোজা হয়ে বসে নিখিলদাদুকে জিজ্ঞেস করলেন, 'তুই ঠিক কী বলতে চাইছিস বল তো নিখিল?'
'মহাভারত খুঁটিয়ে পড়া আছে তোর?' পরিদাদুর প্রশ্নের সরাসরি কোনো উত্তর না দিয়ে জিজ্ঞেস করলেন নিখিলদাদু।
'খুঁটিয়ে পড়া মানে ওই কালী সিংহি আর রাজশেখর বসু...' পরিদাদু বললেন।
'ওতেই কাজ চলে যাবে। এই বইয়ের ডিটেলিংটা খুব মন্দ নয়। তবে কী জানিস তো, কোনো মহাভারতই স্বয়ংসম্পূর্ণ নয়। খুব সম্ভবত সম্পূর্ণ এবং মূল মহাভারতও এগুলো নয়। বিভিন্ন ভাষায় অনুবাদ হবার সময় এবং বিভিন্ন সময়ে কালের প্রলেপ পড়ে পড়ে মহাভারতের মূল কাহিনির নানান পরিবর্তন ও পরিমার্জন হয়েছে তা তো তুই জানিস নিশ্চয়ই?' পরিদাদুর দিকে চেয়ে জিজ্ঞেস করলেন নিখিলেশ।
'জানি', পরিদাদু হাই তুললেন, 'এগুলো তো প্রক্ষিপ্ত মহাকাব্য। রামায়ণ, মহাভারত দুই মহাকাব্যেই কালে কালে পাবলিক সেন্টিমেন্ট অনুযায়ী কবিদের হাতে প্রচুর সংযোজন বিয়োজন হয়েছে ভাষান্তরের সময়। আকর গ্রন্থ হিসেবে যে কোনো একটিকে যদি ধরে নিই আমরা, তার সঙ্গে অন্য মহাভারতগুলোর বিস্তর ফারাক চোখে পড়ে বলেই শুনেছি। অবশ্য মেইন স্টোরিলাইনটা সকলে একই রেখেছেন...'
'ঠিক', নিখিলদাদু পরিদাদুর কথায় সায় দেন। তারপর শাওনের দিকে চেয়ে জিজ্ঞেস করেন, 'শানু পড়েছো মহাভারত?'
'হ্যাঁ', ঘাড় কাত করে শাওন, 'আমাদের বাড়িতে শশিভূষণ দাশগুপ্তের মহাভারত আছে। ছোটদের জন্যে লেখা। একবার জন্মদিনে উপহার পেয়েছিলাম।'
'গুড', নিখিলদাদু খুশি হয়ে মাথা নাড়লেন। তারপর আবার তাঁর নিজের কথা শুরু করলেন। পরিদাদুর দিকে ফিরে জিজ্ঞেস করলেন তিনি, 'দুর্যোধনের মৃত্যুর পরে পাণ্ডবরা তো রাজা হল। কিন্তু দুর্যোধনের যারা অনুগামী ছিল তাদের কী হল? তারা কি সোনামুখ করে পাণ্ডবদের প্রভুত্ব মেনে নিল মনে করিস পরি? মেনে নেওয়া কি সম্ভব ছিল আদৌ? বিশেষত যারা যুদ্ধশেষে বেঁচে রইল, তোর কি বিশ্বাস হয়, তারা নিজেদের পক্ষের একের পর এক মহারথীর বিনাশের কথা ভুলে গিয়ে পাণ্ডবদের বিনা শর্তে ক্ষমা করে দিয়ে তাদের সেবা শুশ্রুষা করে বাকি জীবন কাটিয়ে দেবার মতন কাপুরুষ ছিল?'
'তুই কী যে বলতে চাইছিস ঠিক বুঝতে পারছি না নিখিল'। আবার বললেন পরিদাদু।
'তুই তো আগে হর কি দুন গেছিস?' নিখিলদাদু পরিদাদুকে জিজ্ঞেস করলেন।
'গেছি'।
'ওসলা গ্রামের কথা মনে আছে?'
'হ্যাঁ। ভারি সুন্দর জায়গা। পাহাড়ের ওপরে ছোট্ট একটা গ্রাম। পাশ দিয়ে ঝরঝর করে নদী বয়ে চলেছে... নদীর ও পাশে একটু নীচে সীমা গ্রাম...'
'ওসলা গ্রামে একটা মন্দির আছে মনে করতে পারছিস?'পরিদাদুর কথার মাঝখানেই বলে ওঠেন নিখিলদাদু।
'ইয়েস। দুর্যোধন মন্দির। কাঠের বহু প্রাচীন মন্দির একটা।'
'স্পেÏন্ডিড', বলে ওঠেন নিখিলদাদু, 'দিব্বি তো মনে আছে তোর। একটু ভেবে বল তো, সারা ভারতের নানা জায়গায় তো কর্মসূত্রে এবং নিজের খেয়ালে টো টো করে ঘুরে বেড়িয়েছিস তুই, কিন্তু ভারতের আর কোথাও দুর্যোধনের মন্দিরের কথা শুনেছিস?'
পরিদাদু একটুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন, 'সত্যি বলতে কি, কিছুদিন আগে পর্যন্ত শুনিনি। কিন্তু এখানে আসার আগে যখন হর কি দুনের আশেপাশের অঞ্চল সম্পর্কে খানিক ধারণা তৈরি করার কথা ভাবছি, সেই সময়েই আমার বন্ধু সমুদ্রের মুখে আরেকটা দুর্যোধন মন্দিরের কথা শুনলাম।'
'সমুদ্র?' নিখিলদাদু চোখ কুঁচকে জিগ্যেস করলেন।
'তুই চিনবি না', পরিদাদু হাসলেন, 'সমুদ্র বসু আমার তরুণ বন্ধুদের মধ্যে একজন। পেশাগত দিক থেকে আই টি সেক্টরে যথেষ্ট সম্ভ্রম জাগানো নাম হলে কী হবে, বাংলা সাহিত্য জগতে শিশু কিশোর সাহিত্যসংগ্রাহক এবং গবেষক হিসেবেই তার পরিচিতি। ছেলেটা বিস্তর ঘোরাঘুরি করে। মূলত ভারতবর্ষের দক্ষিণ দিকটা তার একেবারে হাতের তালুর মতন চেনা। সমুদ্রই আমাকে কেরলের পরুভাজহী পেরুভিরুথি 'মালানদ দুর্যোধন মন্দিরের কথা জানাল। কেরলের এই মন্দিরটা আকারে আয়তনে ওসলার মন্দিরের চেয়েও বড়।'
'তাই নাকি?'
'তাই তো শুনলাম।'
'তার মানে দুর্যোধনের মন্দির ভারতে দু-খানা। একটা উত্তরে, আর একটা দক্ষিণে?'
'তাই তো দাঁড়াচ্ছে ব্যাপারটা', পরিদাদু হাসেন।
'আচ্ছা ওই অঞ্চলের লোকজনও কি দুর্যোধনদের প্রতিই অনুগত?'
'অনুগত?' পরিদাদু গাল চুলকোতে চুলকোতে বললেন, 'মন্দির চত্বরে দুর্যোধন ছাড়াও শকুনি, কর্ণ, দুঃশলার মন্দিরও আছে শুনেছি ওখানে, কিন্তু আনুগত্যের কথা তো শুনিনি তেমন কিছু। উত্তরের এই মন্দিরের আশেপাশের মানুষ কি এখনও সত্যি সত্যিই দুর্যোধন আর তাঁর সাঙ্গপাঙ্গদের প্রতিই অনুরক্ত?' পরিদাদু অবাক হয়ে বলেন, 'তাই যদি হয় তাহলে তো বিষয়টা বেশ ইন্টারেস্টিং। আচ্ছা মহাভারতের খলনায়ক দুর্যোধনের প্রতি এমন আনুগত্য আর ভক্তির কথা শুনলে আশ্চর্য লাগে না আজকের দিনে দাঁড়িয়ে?'
'আশ্চর্য তো লাগেই', নিখিলদাদু হাসেন, 'এই ব্যাপারটা বহুদিন আগে থেকেই আমাকে হন্ট করত। আর এই কৌতূহলটাই আরও বেড়ে গিয়েছিল ডক্টর চতুর্বেদীর সঙ্গে আলাপ হবার পর।'
'ওঁর সঙ্গে তোর আলাপ কীভাবে?' পরিদাদু জিজ্ঞেস করলেন।
'একটা সেমিনারে। 'অ্যানসিয়েন্ট ইন্ডিয়ান গ্লোরি' বিষয়ে অনবদ্য বক্তব্য রেখেছিলেন ভদ্রলোক। আমি মুগ্ধ হয়ে গিয়ে আলাপ করি ওঁর সঙ্গে। অসম্ভব ভালো মানুষ ছিলেন চতুর্বেদী। একসময় বেনারস হিন্দু ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক ছিলেন। পরে চাকরি ছেড়ে দেন। প্রাচীন ভারতীয় সভ্যতা সম্পর্কে ওনার গবেষণামূলক একাধিক পেপার আছে। কুমায়ুন এবং গাড়োয়াল হিমালয়ের বহু অঞ্চল ঘুরে বেড়িয়ে দারুণ দারুণ সব তথ্য সংগ্রহ করেছিলেন তিনি।'
'আচ্ছা বার বার চতুর্বেদী সম্পর্কে ছিলেন বলে বলছিস কেন তুই?' নিখিলদাদুর কথার মাঝখানে বলে ওঠেন পরিদাদু, 'উনি যে আর বেঁচে নেই এ বিষয়ে আমরা তো এখনও নিশ্চিত নই।'
'তা ঠিক। তবু এতগুলো দিন হয়ে গেল...'
'এমন কি হতে পারে না, কোনো বিশেষ অনুসন্ধানে এতদিন ধরেই হয়ত পাহাড়ে পর্বতে ঘুরে বেড়াচ্ছেন তিনি?'
'হয়ত তাই। আগে এমন হয়েওছে। তবে সেটা এক দু-মাসের বেশি নয়। তাছাড়া এ ভাবে ঘুরে বেড়ালে কোথাও না কোথাও তো তাঁকে দেখা যেত। অন্তত আমার সঙ্গেও তো উনি যোগাযোগ করার চেষ্টা করতেন। আগে তেমনই তো করেছেন। তাছাড়া...'
'তাছাড়া?'
'কিছুদিন আগে একটা অদ্ভুত ঘটনা ঘটে গেছে আমার বাড়ি।'
'কীরকম?'
'আমার বাড়ি চোর এসেছিল।'
'এটা অদ্ভুত ঘটনা কেন? এখানে কি কারও বাড়ি চোর আসে না?'
'না। সত্যিই আসে না। তাছাড়া চোর আমার স্টাডিতে ঢুকে আমার বইপত্র তছনচ করে হাঁটকেছে। শোবার ঘরের বিছানা উলটে, তোষক তুলে, ড্রয়ার খুলে কিছু খুঁজেছে তন্ন তন্ন করে...'
'রাম সিং ছিল না তখন?'
'না। ছুটিতে ছিল কয়েকদিন। আমি ছিলাম স্কুলে। ফিরে দেখি দরজার লক ভাঙা। এবং আশ্চর্য, একটি কানাকড়িও খোয়া যায়নি আমার।'
'এই ঘটনার সঙ্গে কি চতুর্বেদীর নিরুদ্দেশ হবার কোনো সম্পর্ক আছে বলে মনে হয় তোর?'
'আমি শিওর নই, তবে সম্পর্ক থাকতেও তো পারে। এতদিন তো এমন হয়নি...'
'তোর কাছে এমন কিছু কি থাকতে পারে যা আপাতভাবে দামি নয়, কিন্তু দামি?'
'আছে', নিখিলদাদু হাসেন।
'কী?'
'একটা প্রাচীন মহাভারতের কয়েকটা পাতা আর একটা অস্পষ্ট ম্যাপ...'
'কোথায় আছে?'
'যেখানে আছে সেখান থেকে চোরেদের পাওয়া সম্ভব ছিল না ওভাবে।'
'মানে?'
'ওগুলো আছে আমার মোবাইলে। ডিজিটাইজ করে রাখা। আসল তো মুকেশের কাছে ছিল।'
'তোর কি মনে হয় ওটা পেতেই চোর এসেছিল তোর বাড়িতে?'
'হতে তো পারে। মনে কর, মুকেশের এই আবিষ্কারের কৃতিত্ব অন্য কেউ যদি কেড়ে নিতে চায়... এমনও কি হতে পারে না, মুকেশকে তারাই হয়তো গুম করে রেখেছে কোথাও। চাপ দিচ্ছে সেই গোপন জনপদের ঠিকানা বলে দেবার জন্যে। আমার সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠতার কথা জানে বলেই হয়তো তারা একটা রিস্ক নিয়েছিল...যদি আমার কাছে থেকে থাকে কিছু...'
'আচ্ছা নিখিল, মুকেশ উধাও হয়েছেন ঠিক কোন জায়গা থেকে? আই মিন সব শেষ কোথায় দেখতে পাওয়া গিয়েছিল তাঁকে?'
'সেবারে তাঁকে লাস্ট দেখা গিয়েছিল ওসলাতেই। এবং ওখানকার মানুষজনের বয়ান অনুযায়ী তিনি ওসলা থেকে অপ্রচলিত পথে এগিয়েছিলেন।'
'তিনি একাই ছিলেন? সঙ্গে কোনো পোর্টার ছিল না?'
'ছিল, কিন্তু ওসলা থেকে জংলি পথে কিছুদূর এগিয়ে তিনি তাকে ছেড়ে দিয়েছিলেন।'
'কেন?'
'সেটা জানা যায়নি ঠিকঠাক। তবে ওই পোর্টারের কথা অনুযায়ী তাকে ছেড়ে দিয়ে ডক্টর এবং এডি নামে তাঁর এক সফরসঙ্গী নাকি নিষিদ্ধ হিমালয়ের পথে যাবেন মনস্থ করেছিলেন। পোর্টাররা তাঁকে বিস্তর বোঝানোর চেষ্টা করেছিল। বার বার চতুর্বেদীজিকে বারণ করেছিল ওই এলাকায় ঢুকতে। ওই এলাকাটি নাকি যুগ যুগ ধরে পাহাড়বাসীর কাছে নিষিদ্ধ। জায়গাটা দুর্গমও বটে। এতকাল ধরে ও পথে অতিরিক্ত কৌতূহলে অথবা ভুল করেও নাকি যারা গিয়ে পড়েছে, কেউই আর ফিরে আসেনি। ওরা নিশ্চিত, ডক্টর চতুর্বেদীও নাকি হিমালয় দেবতার অভিশাপে ওই দিককার নিষিদ্ধ জঙ্গলে ভূর্জপত্রের গাছ হয়ে গেছেন। মানুষের শরীর নিয়ে চলে ফিরে বেড়ানো তাঁর পক্ষে আর সম্ভব নয় কোনোদিন...'
'আর তাঁর সেই সঙ্গীটি?'
'তাকেও কেউ ফিরে আসতে দেখেনি ওসলার দিকে। নিষিদ্ধ হিমালয়ে সেও হারিয়ে গেছে ডক্টর চতুর্বেদীর সঙ্গেই।'
'ও দিকটা নিষিদ্ধ কেন?'
'তার কারণ কেউ জানে না। হিমালয়ের প্রত্যন্ত গ্রামগুলোয় এমন অনেক সংস্কার আবহমানকাল ধরে মানুষ বিশ্বাস করে আসছে। মেনেও আসছে নিষ্ঠার সঙ্গে। কোনো কারণ না জেনেই।'
'আশ্চর্য ব্যাপার তো!' পরিদাদু বললেন।
'আশ্চর্য তো বটেই। তবে এর চেয়েও আশ্চর্য হবার মতন তথ্য হারিয়ে যাবার আগে ডক্টর চতুর্বেদী আমাকে দিয়ে গিয়েছিলেন। এবং আমার বিশ্বাস সেই আশ্চর্য সম্ভাবনার অনুসন্ধান করতেই তিনি নিষিদ্ধ হিমালয়ের পথে বেরিয়েছিলেন।'
'কী সম্ভাবনা?' অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন পরিদাদু।
'ওই যে একটু আগে বলছিলাম, বেশ কিছুদিন ধরে একটা গোপন জনপদ ও জনজাতির সন্ধান করছিলেন তিনি এই অঞ্চলে। এই জনপদের উল্লেখ পান তিনি একটা প্রাচীন মহাভারতের হাতে লেখা পুঁথির পাতায়। সেই পুঁথির কয়েকটাই মাত্র পাতা তিনি সংগ্রহ করেছিলেন এক সন্ন্যাসীর কাছে। বদ্রীনাথ থেকে মাইল কয়েক দূরে। মানা গ্রাম হয়ে শতপন্থ যাবার পথে। সেই দেবনাগরী অক্ষরে হাতে লেখা ভূর্জপত্রের পাতায় অদ্ভুত এক তথ্য পেয়েছিলেন তিনি, যে তথ্য প্রচলিত কোনো মহাভারতে পাওয়া যায়নি কক্ষনও।'
'স্ট্রেঞ্জ! কী এমন তথ্য পেয়েছিলেন তিনি?'
'মহাভারতের যুদ্ধে পাণ্ডব এবং কৌরব উভয় পক্ষেরই প্রায় সব রথী মহারথীরই মৃত্যু হয়েছিল। বেঁচে গিয়েছিলেন শুধু পাণ্ডবেরা পাঁচ ভাই এবং কৌরব পক্ষে যুদ্ধে অংশ নেওয়া অশ্বত্থামা, কৃপাচার্য, কৃতবর্মাসহ হাতে গোনা গুটিকয় বীর সৈনিক। কিন্তু প্রশ্ন হল, পাণ্ডবেরা রাজা হবার পরে কৌরব অনুগামীরা গেল কোথায়?' খুব নীচু গলায় বলতে শুরু করলেন নিখিলেশদাদু, 'মহাভারত খুঁটিয়ে পড়লে দেখবে, রাজা হিসেবে দুর্যোধন কিন্তু খুব অযোগ্য ছিলেন না। তাঁর বৈরিতাও ছিল মূলত পাণ্ডবদের সঙ্গেই। প্রজাদের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক একেবারে তলানিতে পৌঁছে গিয়েছিল এমন প্রমাণ কিন্তু মহাভারতে স্পষ্ট করে পাওয়া যায়নি। যদিও মনে মনে একটা বড় সংখ্যক প্রজা রাজা হিসেবে পাণ্ডবদেরই পছন্দ করত, তবু দুর্যোধনের শাসনে থাকতেও খুব একটা আপত্তি ছিল না তাদের। এই প্রজাদের বাইরে এমন কিছু প্রজাও ছিল যারা স্পষ্টতই দুর্যোধন এবং কর্ণদের অনুগামী। কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে এই দুই বীরের সঙ্গেই যে অন্যায় যুদ্ধ হয়েছিল তা তারা মন থেকে কিছুতেই মেনে নিতে পারেনি। তাছাড়া,তারা যে দুর্যোধনের অনুগামী এই তথ্য তো পাণ্ডবদেরও অজানা ছিল না। কাজেই রাজা হিসেবে পাণ্ডবদের তারা বিশ্বাসও করেনি, আনুগত্যও স্বীকার করেনি। বুঝতেই পারছিস, পাণ্ডবদের রাজত্বে বাস করা তাদের পক্ষে খুব নিরাপদ ছিল না। সুতরাং তারা হস্তিনাপুর থেকে দূরে সরে যায়। ইন্দ্রপ্রস্থের ধারেকাছেও ঘেঁষেনি তারা। রাজা দুর্যোধনের নামে, সেইসব মানুষ কোনো গুপ্ত অঞ্চলে নতুন জনপদ তৈরি করে...'
'অদ্ভুত ব্যাপার তো!' অনেক্ষণ চুপ করে থাকার পরে কথা বলে ওঠে শাওন, 'আমি তো মহাভারতের গল্প পড়েছি। শুনেছিও কতবার। কিন্তু এমন কথা কক্ষনও শুনিনি।'
'আমিই কী আর শুনেছিলাম শানুবাবু', নিখিলদাদু হাসেন, 'ডক্টর চতুর্বেদীর কাছে ভূর্জপত্রে লেখা সেই অগ্রন্থিত মহাভারতের টুকরো কাহিনিতেই আমিও প্রথম এমন এক জনপদ থাকার কথা জানতে পারি। এবং জানতে পারি সেই জনপদ মূলত গড়ে উঠেছিল অশ্বত্থামার নেতৃত্বে এবং তত্ত্বাবধানে...'
'অশ্বত্থামা?' পরিদাদু অবাক হয়ে বলেন।
'হ্যাঁ, অশ্বত্থামাই। অন্তত ওই পাতাগুলো তেমনই ইঙ্গিত দিয়েছে দেখেছি।'
'তুই নিজে সেই পুঁথির পাতা দেখেছিস?' পরিদাদু জিজ্ঞেস করলেন নিখিলদাদুকে।
'দেখেছি। এবং তার ছবিও তুলে রেখেছি আমার মোবাইলে। তোকে দেখাবখন সেই ছবি। অবশ্য যেটুকু চতুর্বেদীজি আমায় দেখিয়েছিলেন সেটুকুই। তাঁর কাছে আরও কয়েকটা ভূর্জপত্রের টুকরো ছিল। সেগুলো তিনি আমাকে দেখাননি। সম্ভবত সেখানেই জায়গাটার একটা হালকা হদিশ দেওয়া ছিল। যদিও সেই হদিশ এত বছর পরে হুবহু মেলা সম্ভব নয়, তবু লুকনো জায়গাটা সম্পর্কে একটা ধারণা পাবার জন্যে ওই সূত্রটুকু খুবই গুরুত্বপূর্ণ...'
'হুঁ', পরিদাদুকে এই প্রথম খুব গম্ভীর দেখাল।
নিখিলেশের দিকে তাকিয়ে শাওন বলল, 'আচ্ছা দাদু, মহাভারতের এইসব চরিত্র তাহলে সত্যিই ছিল?'
'সম্ভবত', মাথা নেড়ে বললেন নিখিলেশ,'বাস্তবের কিছু ঘটনাকে কেন্দ্র করেই তো সাহিত্য রচিত হয়...পুরোটাই কি আর কল্পনা বলে উড়িয়ে দেওয়া চলে? তাছাড়া এই ভূখণ্ডের যে নিপুণ বর্ণনা এবং বিপুল সামাজিক রাজনৈতিক তথ্য এই মহাগ্রন্থ থেকে উঠে আসে, তার সবটাই বানানো কী করে বলি বলো দেখি শানুবাবু।'
'অশ্বত্থামাকে নিয়ে কী যেন বলছিলি?' পরিদাদু কথা ধরিয়ে দেন নিখিলদাদুকে। তাঁর কপালে লম্বা লম্বা দুখানা ভাঁজ।
'হ্যাঁ, যা বলছিলাম', কেশে গলাটাকে একটু পরিষ্কার করে নিয়ে আবার বলতে শুরু করেন নিখিলদাদু, 'অর্জুনের সঙ্গে ব্রহ্মাস্ত্র ছোঁড়াছুঁড়ি করে অশ্বত্থামাকে ভারি নাকাল হতে হয়েছিল। মাথার বহুমূল্য মণি খোয়াতে হয়েছিল বেচারিকে। সেজন্যে তার মাথায় এমন ঘা হয়ে যায়, যে সে ঘা আর শুকোয়নি কোনোদিন। ঘা তার মনেও হয়েছিল। সেই ঘায়ের ক্ষত ছিল আরও গভীর। আরও যন্ত্রণাদায়ক। সেই ঘা পাণ্ডবদের সঙ্গে তার সম্পর্ককে কক্ষনও সহজ হতে দিল না আর।'
'সম্পর্ক সহজ করার চেষ্টা পাণ্ডবরাই কি করেছিল কখনও?'
'করেছিল। দুটো কারনে।'
'যেমন?'
'প্রথমত যুধিষ্ঠির লোকটা ছিলেন খানিক ভালো মানুষ গোছের। মনের মধ্যে প্যাঁচ পয়জার বিশেষ ছিল না। অশ্বত্থামা যেহেতু তাঁদের গুরুপুত্র, তার সঙ্গে তিনি একটা সমঝোতা করে নিতে চেয়েছিলেন...'
'আর দ্বিতীয়ত?' পরিদাদু জিজ্ঞেস করলেন।
'অশ্বত্থামা কম বড় বীর ছিল না। বেমক্কা তাকে শত্রু বানিয়ে রেখে নিজেদের বিপদ বাড়াতে কেন চাইবেন তাঁরা? কিন্তু মুশকিল হল, অশ্বত্থামা কিছুতেই আর তাঁদের পক্ষে এল না। এক তার বাবার মৃত্যু। অতবড় অন্যায় সে হজম করতে পারেনি, আর দুই নিজের অপমান। তীর্থে তীর্থে ঘোরার নাম করে সে আসলে এই জনগোষ্ঠীকে একত্রিত করে পাণ্ডবদের চোখের আড়ালে থেকে নিরাপদ দূরত্বে একটা গোপন জনপদ তৈরি করে। পরে কখনও প্রতিশোধ নেবার পরিকল্পনাও হয়তো ছিল তার। কে জানে! যদিও তা আর হয়ে ওঠেনি...'
ডোরবেল বেজে ওঠায় নিখিলদাদু থামলেন। বললেন, 'বিবেক এসে গেল বোধহয়।'
'বিবেক কে?' পরিদাদু জিজ্ঞেস করলেন চোখ কুঁচকে।
'মুকেশ চতুর্বেদীর ভাইপো। উনি নিজে ব্যাচেলর ছিলেন। নিখোঁজ হবার পরে কাগজে লেখালেখি হয়েছিল খানিক। তবে তেমন একটা হইচই করার লোক পাওয়া যায়নি, যার ফলে প্রশাসনের ওপরে চাপ সৃষ্টি করে তাঁর খোঁজে বিশেষ তদন্তকারী দল টল পাঠানো যায়। মাস তিনেক আগে সোশাল মিডিয়ার থ্রুতে আমার সঙ্গে বিবেকের আলাপ হয়। ও-ই নিজের পরিচয় দিয়ে ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট পাঠায় আমাকে। প্রস্তাব দেয়, মুকেশজিকে খুঁজে বের করার ব্যাপারে আমরা নিজেরাই উদ্যোগী হতে পারি। আমি তখন তোর কথা জানাই ওকে। তোর বুদ্ধি, তোর সাহস, তোর বিশ্লেষণী ক্ষমতা আমাদের কাজে লাগতে পারে বলে বোঝাই বিবেককে। আমাদের এই এক্সপিডিশনের ব্যাপারে ওর উৎসাহই ছিল সবচেয়ে বেশি। ধরতে পারিস বিবেকই আমাকে উৎসাহিত করেছে ডক্টর মুকেশ চতুর্বেদীর মিসিং হয়ে যাওয়ার আশ্চর্য ঘটনাটার একটা গ্রহণযোগ্য সমাধান খুঁজে বের করবার তাগিদ তৈরিতে। দরজা খোলবার জন্যে উঠতে উঠতে নিখিলদাদু বললেন, 'পরশু বিবেকও আমাদের সঙ্গে যাচ্ছে।'
'আমিও যাচ্ছি', তড়িঘড়ি বলে ওঠে শাওন, 'আমি কিন্তু মোটেই তোমার মিস্টার এন্ড মিসেস পানিগ্রাহীর আতিথ্য গ্রহণ করছি না নিখিলদাদু। তোমরা যখন এমন একটা অ্যাডভেঞ্চারে গিয়ে পাহাড়ে জঙ্গলে সেই মহাভারতের যুগ থেকে লোকচক্ষুর আড়ালে থাকা একটা জনপদ খুঁজে বেড়াবে, আর সেইসঙ্গে মুকেশদাদুর হঠাৎ হারিয়ে যাওয়ার রহস্যের সমাধান করবে, সেইসময় বোকার মতন অঙ্কিতার সঙ্গে সময় নষ্ট করার একটুও ইচ্ছে নেই আমার।'
পরিদাদু বললেন, 'শানু, আবেগের বশে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলাটা ঠিক নয়। আমার এখন মনে হচ্ছে তোকে না আনলেই ভালো হত। খুকু আর অরুণের কথা না শুনে আমি বোধহয় ভুলই করেছি। অন্তত এই অভিযানে আমাদের যথেষ্ট বিপদ আর ঝুঁকি নিয়ে চলতে হবে বলেই আমার বিশ্বাস। আর সেই বিপদে তোকে কিছুতেই জড়াতে চাই না আমি। আমিও নিখিলের কথাই মেনে নেবার পক্ষে। তুই বরং থেকেই যা। অঙ্কিতাদের সঙ্গে ঘুরে টুরে নে কটাদিন।'
'মোটেই না। তোমাকে ছেড়ে কিছুতেই এখানে থেকে যেতে পারব না আমি', জেদি গলায় বলে শাওন, 'তোমাকে বিপদের মুখে ফেলে দিয়ে আমি মনের আনন্দে ঘুরে বেড়াব, এ কথা তুমি ভাবলে কী করে পরিদাদু? আর তুমিই না বলেছো বিপদ দেখে পিছিয়ে আসা আলুভাতে মার্কা টিপিকাল বাঙালি ছেলেরা দু-চক্ষের বিষ তোমার? তুমি কি চাও আমিও অমন ছেলে হব, যে সামনে বিপদ দেখে ভয় পেয়ে ঘরে বসে থাকব তোমাকে একলা বিপদের মধ্যে ফেলে রেখে?'
'কথাটা হয়তো ঠিকই বলছিস', অসহায় ভঙ্গিতে মাথা নেড়ে বলেন পরিদাদু, 'কিন্তু তোর মা বাবা কী মনে করবে বল...'
'কিচ্ছু মনে করবে না। বরং এই অবস্থায় তোমাকে একা ফেলে রেখে আমি যদি অঙ্কিতাদের সঙ্গে আমোদ করে বেড়াই তাহলেই হয়তো মা বাবা খারাপ ভাববে আমায়। তারা ভাববে...' মাঝপথেই কথা থামিয়ে দেয় শাওন। নিখিলেশদাদুর সঙ্গে ফর্সা ফুটফুটে ফুট ছয়েক উচ্চতার একজন যুবক ঘরে ঢুকে এসেছেন তখন। পরনে ট্রাউজার আর ঘাড় পর্যন্ত কলার তোলা কালো টি শার্ট। ক্লিন শেভন। ছোট করে ছাঁটা চুলের সিঁথি ডানদিকে। শাওন বুঝতে পারল ইনিই বিবেক চতুর্বেদী। হারিয়ে যাওয়া মুকেশ চতুর্বেদীজির ভাইপো।
মসৃণ রাস্তা দিয়ে দ্রুত গতিতে ছুটছিল গাড়িটা। সামনে ড্রাইভারের পাশে বসেছেন বিবেক। পিছনের সিটে পাশাপাশি শাওন, পরিদাদু এবং নিখিলদাদু। লাগেজ গাড়ির মাথায় তুলে দিয়ে প্লাসটিক দিয়ে বেঁধে রাখা হয়েছে শক্ত করে। পড়ে যাওয়ার ভয় নেই। হঠাৎ বৃষ্টি এসে গেলে ভিজে যাবারও ভয় নেই। কাল অঙ্কিতারা এসেছিল নিখিলদাদুর বাড়িতে। ওর মা বাবা শাওনকে খুব করে থেকে যেতে বলছিলেন ওঁদের সঙ্গে। অঙ্কিতা অবশ্য থাকার জন্যে জোরাজুরি করেনি। বরং নিজেই এই অভিযানে তাদের সঙ্গী হবার জন্যে বায়না জুড়ে দিয়েছিল। পরিদাদু এবং নিখিলদাদু দুজনেই তাকে জোর গলায় না করে দিয়েছেন। বেচারা অঙ্কিতা, ভেবেছিল শাওন যখন যাচ্ছে, ও গেলেই বা অসুবিধে কীসের। আপন মনেই হেসে ফেলল শাওন।
অঙ্কিতা মেয়েটা এমনিতে খারাপ নয় অবশ্য। কম সময়ের মধ্যেই দিব্বি বন্ধুত্ব হয়ে গিয়েছিল ওর শাওনের সঙ্গে। পরিদাদুর দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করে শাওনকে বলছিল মেয়েটা, 'পরিদাদু লুকস সো ইয়াং। তোমাদের গল্প পড়ে আমি তো পরিদাদুকে বুড়ো মানুষই ভেবেছিলাম। আই মিন দাদু বলতে মানুষের মনে যে রকম ছবি ভেসে ওঠে, আমি ওঁকে তেমনই ভেবেছিলাম...'
'যাহ, পরিদাদু মোটেই বুড়ো মানুষ নয়', অঙ্কিতাকে থামিয়ে দিয়ে বলে উঠেছিল শাওন, 'পরিদাদু আমার দাদু ঠিকই, কিন্তু বয়েসে পরিদাদু আমার বাবারই সমবয়েসি প্রায়। গল্পে দেখেছো তো পরিদাদু আর আমার বাবা দুজনেই দুজনকে নাম ধরে ডাকে...আসলে উনি আমার মায়ের সম্পর্কে কাকা হন। সেজন্যেই আমি পরিদাদু বলে ডাকি। পরিদাদু কিন্তু আমার বাবার বন্ধু...' শাওন ভাবছিল অঙ্কিতা থাকলে তার সত্যিই একজন সঙ্গী হত। অন্তত কথাবার্তা বলার একটা মানুষ পাওয়া যেত। অবশ্য এটাও ঠিক, এই ধরনের অভিযানে তার আসাটা ঝুঁকিরও হয়ে যেত। এর আগে পরিদাদুর সঙ্গে বেড়াতে গিয়ে অনেক রকম বিপদেরই মুখোমুখি হয়েছে শাওন। সংকটের সময়ে মাথা ঠান্ডা রাখার প্রাথমিক পাঠটাও পরিদাদুর কাছে নেওয়া আছে তার। কিন্তু অঙ্কিতা নিশ্চিত এইসব ঝুট ঝামেলার মধ্যে পড়লে দিশেহারা হয়ে যাবে। গল্পের বইতে অ্যাডভেঞ্চার পড়া আর নিজে সত্যি সত্যি সেই অ্যাডভেঞ্চারে জড়িয়ে পড়া তো আর এক নয়...'
দেরাদুন থেকে শাঁকরি পথ কম নয়। পরিদাদু বলেই দিয়েছিলেন শাঁকরি পৌঁছতে পৌঁছতে হয়তো বিকেল হয়ে যাবে। নিখিলদাদুও সায় দিয়েছিলেন তাঁর কথায়। বিবেক চতুর্বেদী খুবই কম কথা বলেন। অত্যন্ত শান্ত এবং নির্ভেজাল ভালো মানুষ তিনি। কাল বার বার নিখিলদাদুকে বলছিলেন, তাঁর কাকার জন্যে এই যে নিখিলদাদু বা পরিদাদু এত ঝুঁকি নিয়েও পাহাড়ে জঙ্গলে অনুসন্ধানে যাবার জন্যে রাজি হয়েছেন, এর জন্যে তিনি আন্তরিকভাবে কৃতজ্ঞ। প্রাচীন ভারতীয় ইতিহাস বা মিথ সম্পর্কে তিনি খুব একটা ওয়াকিবহাল নন। আগ্রহীও নন। তাঁর একটাই লক্ষ্য। এবং তা হল তাঁর কাকার খোঁজ পাবার চেষ্টা করা। ডক্টর চতুর্বেদী আদৌ বেঁচে আছেন অথবা তিনি মৃত,অন্তত এই বিষয়ে একটা গ্রহণযোগ্য সিদ্ধান্তে আসতে চান তিনি।
আঁকাবাঁকা পাহাড়ি রাস্তা ধরে গাড়ি ছুটছিল। যমুনা ব্রিজ, নয়নবাগ, পুরোলা, নওগাঁ হয়ে নেটোয়ারে এসে গাড়ি রাস্তার একপাশে সরে এসে থেমে গেল। দেরাদুন থেকে দীর্ঘ পথ। মাঝে কয়েকবার খাওয়া দাওয়া ও অন্য প্রয়োজনে গাড়ি থেমেছিল অবশ্য। থেমেছিল বলেই রক্ষে। নইলে এতক্ষণ একনাগাড়ে পা ভাঁজ করে গাড়ির মধ্যে বসে থাকা সত্যিই কষ্টকর। বিবেক নেমে পড়েছেন গাড়ি থেকে। পরিদাদু এবং নিখিলদাদুও। এখানে হর কি দুন যাওয়ার জন্যে অনুমতিপত্র নিতে হবে। উল্লেখ করতে হবে কতদিনের জন্যে এই অঞ্চলে থাকবেন তাঁরা। প্রয়োজনীয় কাগজপত্র দেখিয়ে সেই অনুমতিপত্র নিচ্ছিলেন পরিদাদু আর নিখিলদাদু। বিবেক হাতছানি দিয়ে শাওনকে নীচে ডাকলেন। শাওন গাড়ি থেকে নেমে তাঁর কাছে যেতেই শান্ত ও নীচু গলায় হিন্দি আর ইংরেজি মিশিয়ে শাওনের সঙ্গে গল্প করতে লাগলেন তিনি, 'তোমার পাহাড় ভালো লাগে?'
'হুঁ'। শাওন মাথা হেলায়।
'তোমার দাদুরও ভালো লাগে পাহাড়?'
'হ্যাঁ। পরিদাদু পাহাড় বিশেষত হিমালয়ে বেড়াতে খুবই ভালোবাসেন। উনি বলেন হিমালয়কে না জানলে নাকি ভারতবর্ষকেই জানা যায় না।'
'ঠিকই বলেন। এই হিমালয় খুব রহস্যময় একটা পর্বত।'
'কেন?'
'কত অজানা গাছপালা, পশুপাখি যে রয়েছে এই পর্বতে, আমরা তার খোঁজই রাখি না। কত বড় এলাকা জুড়ে এই পর্বত। তার সবটা জানা কি সম্ভব?'
'এই হিমালয়েই নাকি দেবতারা থাকেন। আমার মা বলেন'। শাওন বলে।
বিবেক হেসে ওঠেন, 'তা কে জানে। থাকতেও পারেন। তবে কিছুদিন আগে একটা অদ্ভুত খবর ভাইরাল হয়েছিল। খবরের কাগজেও এ বিষয়টা নিয়ে লেখালেখি হয়েছিল। আমার কাছে হোয়াটস অ্যাপে খবরটা এসেছিল...'
'কী খবর?' কৌতূহলী হয়ে বলে শাওন।
'তুমি কি মহাভারতের গল্প জানো?'
'জানি।'
'বাহ। তুমি তো খুব ভালো ছেলে। অনেক কিছুই জানো। আমি তো এখনও এসব প্রায় কিছুই জানি না। ওই খবরটা পেয়ে খানিক খোঁজ নিয়েছিলাম।'
'কী খবর?'
'আচ্ছা তুমি অশ্বত্থামার নাম শুনেছো তো?'
'হ্যাঁ দ্রোণাচার্যের ছেলে। মস্ত বীর ছিলেন। পরশু নিখিলদাদু আর পরিদাদু অশ্বত্থামাকে নিয়ে অনেক কিছু বলছিলেন। সেসব কথা আমি কোত্থাও পড়িনি আগে। শুনিওনি।'
'তাই? কী বলছিলেন ওঁরা?'
'অশ্বত্থামা নাকি কিছু লোকজনকে নিয়ে একটা গোপন জনপদ গঠন করেছিলেন এই অঞ্চলে।'
'সেই জনপদ কোথায় ওঁরা জানেন? আমার কাকার কাছেও এমন একটা কথা শুনেছিলাম।'
'জানেন না বোধহয়।'
'কী করে জানলে?'
'ওঁদের কথা শুনে তাই মনে হল। তাছাড়া আপনি পরিদাদুকে তো জানেন না ঠিক...পরিদাদু খুব যুক্তিবাদী মানুষ। একটা মহাকাব্যের চরিত্রকে আজ এত বছর পরে বাস্তবের মাটি খুঁড়ে বের করতে তিনি খুব আগ্রহী হবেন কিনা আমার সন্দেহ আছে।'
'অশ্বথামা নাকি অমর, জানো তো...'
'ধুস তা আবার হয় নাকি?' অবিশ্বাসী গলায় বলে শাওন।
'আপাতভাবে তাই জানি আমরা যে জন্মালে মৃত্যু অনিবার্য, কিন্তু ওই লোকটার বেলায় তা নাকি হয়নি। অন্তত ওই ভাইরাল হয়ে যাওয়া নিউজ থ্রেড তাই বলছে...'
'কী বলছে?'
'অশ্বত্থামা নামের মহাভারতের চরিত্রটি শুধু যে সত্যি তাই নয়, সে লোকটি এখনও জীবিত। কিছুদিন আগেও এই অঞ্চলের ওসলা গ্রামে সে লোকটিকে নাকি দেখা গেছে। বিশেষ কিছু তিথিতে সে নাকি গ্রামে আসে। গ্রামের লোকের কাছ থেকে কর বাবদ নানা জিনিস নিয়ে যায়। খাদ্য, বস্ত্র, পশু, অন্যান্য উপঢৌকন...দীর্ঘ চেহারা, মাথায় সাদা কাপড়ের ব্যান্ডেজ...সে কোথা থেকে আসে এবং করসামগ্রী গ্রহণ করার পরে কোথায় যায় কেউ জানে না। ওসলা গ্রামের সকলে বিশ্বাস করে ওই মাথায় ব্যান্ডেজ বাঁধা লোকটি আর কেউ নন। তিনি স্বয়ং অশ্বত্থামা। রাজা দুর্যোধনের নামে তিনি এখনও কর সংগ্রহ করেন প্রজাদের কাছ থেকে...'
'ঠিকই শুনেছেন মিস্টার চতুর্বেদী', পরিদাদু কখন যে শাওনদের পিছনে এসে দাঁড়িয়েছেন খেয়ালই করেনি শাওনরা। পরিদাদুর কণ্ঠস্বরে চমকে পিছনে ফিরল তারা। পরিদাদু বলে চললেন, 'সমগ্র ভারতবর্ষে দুর্যোধনের একমাত্র মন্দির ওই ওসলা গ্রামেই। শুধু তাই নয়, মনে রাখতে হবে, নিম্ন তমসা উপত্যকার বাসিন্দা জৌনসারিরা পাণ্ডবভক্ত হলেও উচ্চ তমসা উপত্যকার রাওয়াইরা কিন্তু এখনও কৌরবদেরই অনুগামী।'
'কিন্তু তাই বলে অশ্বত্থামা এখনও...'
'আপনার এই সন্দেহটা জাস্টিফায়েড। মেনে নিলাম। একটা লোকের পক্ষে পাঁচ হাজার বছর পার করেও বেঁচে থাকা...ইটস টু মাচ...কিন্তু...'
পরিদাদুর কথা শেষ হল না। নিখিলদাদু হাঁক পাড়লেন, 'আর দেরি নয়। এমনিতেই অনেক লেটে রান করছি আমরা। কোনো কথা না বলে গাড়িতে উঠে পড়ো সবাই।'
গাড়ি চলতে শুরু করল আবার। বাইরে সূর্যের আলো মরে আসছে তখন। আকাশেও মেঘের ছুটোছুটি শুরু হয়ে গেছে। সেদিকে তাকিয়ে পরিদাদু বললেন, 'ঘণ্টা খানেকের মধ্যেই বৃষ্টি নামবে।'
শাওনরা যখন শাঁকরি পৌঁছলো তখন অন্ধকার নেমে গেছে। রাস্তার ডান দিকের ঢালু পথ বেয়ে ওপরে উঠে যাওয়া রাস্তার মাথায় দাঁড়ানো গাড়োয়াল মণ্ডল বিকাশ নিগমের বাংলোর মাথায় টিনের চালে ছোটাছুটি করতে করতে ততক্ষণে টুপটাপ টুপটাপ আওয়াজ তুলেছে বড় বড় ফোঁটার বৃষ্টিরা।
ফোঁটা ফোঁটা বৃষ্টির মধ্যেই শাওনরা গাড়ি থেকে নেমে পড়ল। নিখিলদাদু ড্রাইভারকে ভাড়া মিটিয়ে দিতেই গাড়ি নিয়ে তড়িঘড়ি তিনি উলটোপথে দেরাদুন রওনা হলেন। পাহাড়ি পথে অন্ধকারে এতখানি পথ ফেরা তাঁর পক্ষে সত্যিই বেশ বিপদের। বেশ শিরশিরে ঠান্ডা এখানে। সঙ্গে জোলো হিমেল হাওয়া। পরিদাদু শাওনের দিকে চেয়ে রাস্তার বাঁ দিকের একতলা বাংলোর মতন দেখতে রাওয়াত পোর্টার এন্ড গাইড সেন্টারের বারান্দার দিকে ইশারা করে বললেন, 'শেডের নীচে চলে যা শানু। অযথা বৃষ্টিতে ভিজিস না। দুম করে ঠান্ডা লেগে যাবে।'
নিজেদের রুকস্যাক কাঁধে নিয়ে রাওয়াতের বারান্দায় উঠে আসতেই সামনের অফিস থেকে একজন ঝকঝকে স্মার্ট লোক শাওনদের দিকে এগিয়ে এল। পরনে ফেডেড জিন্স আর ফুল স্লিভ শার্ট। লোকটার দিকে ভালো করে তাকিয়েও শাওন তার বয়েস অনুমান করতে পারল না। পাহাড়ের লোকদের ক্ষেত্রে এটা খুব হয়। আগেও দেখেছে শাওন। কিছুতেই বোঝা যায় না সে লোকটা যুবক নাকি প্রৌঢ়। পরিদাদুর দিকে চেয়ে লোকটা তার ডান হাত বাড়িয়ে দিল, 'মিস্টার নিখিলেশ ডাট, রাইট?'
'আমি পরিমল চ্যাটার্জী। আপনিই তো মিস্টার রাওয়াত তাই না?' পরিদাদু হেসে বললেন হিন্দি আর গাড়োয়ালি ভাষা মিশিয়ে।
'আমিই নিখিলেশ', নিখিলদাদু এগিয়ে এসে নিজের পরিচয় দিলেন, 'কিন্তু বিক্রম কোথায় গেল? ওর তো এখানে থাকার কথা ছিল। শাঁকরিতে আমরা কোথায় উঠছি সে ব্যাপারটা আদৌ ঠিক করে রেখেছে তো ও?'
'একটা বিশেষ কাজে পুরোলা গেছে ও। ফিরতে ফিরতে কাল। আমাকে সব বুঝিয়ে বলে গেছে বিক্রম। আপনাদের কোনো তকলিফ হবে না স্যার। আমার নাম পুলক, পুলক সিং। বিক্রমের ব্যবসার পার্টনার। আমি আপনাদের জন্যে সব বন্দোবস্ত পাকা করে রেখেছি। আজ রাতটা আপনারা আরাম করুন। কাল সুবা রওনা হয়ে যাবেন তালুকা। আমি চক্রু সিং আওর পণ্ডিতজিকে বলে রেখেছি আপনাদের সঙ্গে যাবার জন্যে। কাল এক্কেবারে ভোরে এইখানে চলে আসবে ওরা। পণ্ডিতজি খুব আচ্ছা গাইড এন্ড পোর্টার। চক্রুও খুব বিশ্বাসী। আপনাদের টুর ঠিকঠাকই হবে দেখবেন। গ্যারান্টেড।'
'আমরা কি আজ রাতে তাহলে জি এম ভি এনের বাংলোতেই থাকছি?' এতক্ষণ পরে কথা বলে উঠলেন বিবেক।
'জি না স্যার', দু দিকে মাথা নাড়ালো পুলক, 'একটা বড় ট্রেকার্স টিম ঢুকে গেছে আজ। অনেকদিন আগে থেকে বুকিং ছিল ওদের। জি এম ভি এন ফাঁকা নেই।'
'তাহলে কি ফরেস্ট ডিপার্টমেন্টের বাংলো?' পরিদাদু চোখ কুঁচকে বললেন।
'ওটাও পাওয়া যায়নি। আমাদের হোটেলের দুটো ঘরও আজ ভর্তি। কাল দুপুরে ফাঁকা হবে'। নির্বিকার গলায় বলে পুলক।
'তাহলে এই বৃষ্টির মধ্যে আমরা কোথায় যাব এখন? রাত্তিরে কোথাও একটা তো মাথা গুঁজতে হবে?' নিখিলদাদুকে স্পষ্টতই বিরক্ত লাগছিল, 'আমি যখন বিক্রমকে আমাদের আসার কথা জানালাম ও আমাকে এ কথা জানাল না কেন? ও তো দিব্বি ভরসা দিল আমায়। বলল কোনো চিন্তা না করতে। বলল বিক্রম আছে যখন আমাদের থাকার জায়গার অভাব হবে না শাঁকরিতে...'
'ঠিকই তো বলেছে', পুলক মিষ্টি করে হাসল।
'মানে?'
'আপনারা হোম স্টে করবেন। ভালো লাগবে দেখবেন, কমফোর্টের দিক থেকে কোনো অসুবিধা হবে না। একটাই শুধু অসুবিধা, বাড়িটা এখান থেকে এক দেড় কিলোমিটার দূরে। ওই পথটুকু আপনাদের আমার সঙ্গে হেঁটে যেতে হবে।'
'এই অন্ধকারে?'
'জি।'
'অসম্ভব', নিখিলদাদু বললেন।
'চিন্তা মত কিজিয়ে স্যার। আমি তো থাকছি আপনাদের সঙ্গে'। ভরসা দেয় পুলক, 'বড়া লাগেজ এই অফিসে ছেড়ে যান। শুধু রাতে যেটুকু লাগবে, নিয়ে চলে আসুন আমার সঙ্গে। আমার বিবির বানানো গরমাগরম চাপাটি খেয়ে আজ রাতটা আরামসে রেস্ট করুন।'
'লাগেজ এখানে রেখে...' নিখিলদাদু ইতস্তত করতে লাগলেন, 'যদি কিছু হয়ে যায় রাত্তিরবেলা? অফিসে তো আর রাতে থাকবে না কেউ...'
'কুছ নেহি হোগা সাব', আবার ভরসা দেয় পুলক, 'আরামসে রেখে যান এখানে।'
পরিদাদুই প্রথম তাঁর বড় রুকস্যাকটা অফিসঘরে রাখলেন। শানুকেও বললেন, 'তোর ব্যাগটাও রেখে দে শানু। কোনো চিন্তা নেই। পাহাড়ের মানুষ কেমন হয় তুই তো জানিস', বলেই নিখিলদাদুর দিকে চাইলেন তিনি, 'নিখিল, যেতে যদি হয়ই ব্যাগ পত্তর রেখে দ্রুত রওনা দিই চল। এতটা পথ হেঁটে যেতে হবে। কাজেই অযথা দেরি করে লাভ নেই। তাছাড়া বৃষ্টি জোরে এলে হাঁটাও মুশকিল হয়ে যাবে।'
বিবেক বললেন, 'আমার রুকস্যাক আমি রেখে যাব না। সঙ্গে নিয়েই যাব।'
'যা ভালো বোঝেন...' পুলক হাসে।
পুলকের আতিথ্যের সত্যিই তুলনা নেই। রাতের অন্ধকারে হেঁটে আসতে খানিক কষ্ট হল বটে, কিন্তু কাঠের সুন্দর করে গোছানো বিরাট হলঘরটায় ঢুকে সকলেরই মন ভালো হয়ে গেল। কাঠের মেঝের ওপরে গাঢ় নীল রঙের কার্পেট পাতা। কাঠেরই দেওয়াল। দেওয়ালে পালিশ করা কাঠের র্যাকে খুব রুচিসম্পন্ন শো পিস। টিনের ছাদের নীচে কাঠের সিলিং। পুরো ঘরটাতেই যত্ন ও পারিপাট্যের ছাপ। ঘরে দুটো ডাবল বেড এবং একটা সিঙ্গল বেড। পরিপাটি করে চাদর বালিশ আর কম্বল রাখা প্রতিটি বিছানায়। কাচের টপ লাগানো নীচু টেবিলে জলের জাগ এবং কাচের গ্লাস রাখা আছে।
ঘরে ঢুকে আপনাআপনিই পরিদাদুর মুখ থেকে শব্দটা ছিটকে এল, 'বিউটিফুল...'
নিখিলদাদুও বললেন, 'খুব ভালো বন্দোবস্ত করেছো পুলক। অনেক ধন্যবাদ তোমাকে। সারাদিনের জার্নির পরে একটা আরামের ঘুম চাইছিল শরীর। মানতে দ্বিধা নেই, সেই আরামের যে ব্যবস্থা তুমি করেছ, জি এম ভি এনে উঠলেও তা পেতাম না আমরা।'
ঘরে ঢুকে চারদিকে চোখ বুলিয়ে নিয়ে বিবেক বললেন, 'আমি ওই সিঙ্গল বেডটা অকুপাই করছি। আমি একলা ঘুমোতেই পছন্দ করি'। তারপরেই পুলকের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলেন তিনি, 'এক রাতের জন্যে এই ঘরের কত ভাড়া নেবেন আপনি? এবং সেই ভাড়া কি রাতের খাবারের চার্জ সহ?'
বিবেকের কথায় জিভ কাটল পুলক, 'ছি ছি, ভাড়ার কথা কী বলছেন স্যার, আপনারা বিক্রমের দোস্ত। মানে আপনারা আমার মেহমান। আমি আমার ঘর ভাড়া দিই না। আমাদের নিজেদের থাকার জন্যেই এই ঘরদোর। আপনারা আমাদের গরিবের বাড়িতে এক রাত কাটাবেন এ আমরা আমাদের সৌভাগ্য বলেই মনে করব।'
পুলকের কথায় লজ্জা পেয়েই বোধহয় এরপর এক্কেবারে চুপ করে গেলেন বিবেক। পুলক বলল, 'আপনারা সকলেই টায়ার্ড। আমি বরং তাড়াতাড়ি খানা লাগাতে বলি আপনাদের জন্যে।'
পুলকের স্ত্রীর রান্না সত্যিই খুবই সুস্বাদু। সেই খাবারের স্বাদ আরও বেড়ে গিয়েছিল তাদের আন্তরিকতায়। খাওয়া দাওয়ার পরে বিছানায় পিঠ ঠেকাতে না ঠেকাতেই নাক ডাকতে শুরু করল নিখিলদাদু আর বিবেক চতুর্বেদীর। পরিদাদু আর শাওন একই বিছানায় শুয়েছিলেন। একটা লম্বা হাই তুলে পরিদাদু বললেন, 'তুই তো জানিস শানু, পাহাড়ের লোকেদের আন্তরিকতা যেমন মনে রাখবার মতন, তেমনি তাদের আত্মসম্মানবোধও ভীষণ রকম প্রবল। কাজেই কাল সকালে এখান থেকে চলে যাবার সময় জোর করেও পুলক বা তার স্ত্রীকে এই রয়্যাল রাত্রিবাসের জন্যে একটি টাকাও গছিয়ে দেওয়া যাবে না। কিন্তু সত্যিই আমার ওদেরকে কিছু দিতে ইচ্ছে করছে। আমাদের মতন শহর মফসসলের স্বার্থপর মানুষদের এদের দেখে সত্যিই কত কিছু শেখার আছে। এমন কিছু ধনী মানুষ তো নয় ছেলেটা। তবু, শুধু আমরা বিক্রমের চেনা, এইজন্যে বাড়ির সবচেয়ে ভালো ঘরটা বিনা পয়সায় আমাদের ছেড়ে দিয়ে ছেলেটা বউ আর দুই বাচ্চাকে নিয়ে পাশের ছোট্ট ঘরটায় আনন্দে ঘুমোচ্ছে কষ্টের কথা না ভেবে। পরিদাদুর কথা শুনতে শুনতেই চোখের পাতা ভারী হয়ে আসছিল শাওনের। পরিদাদুর পরের কথাগুলো সবটা সে আর শুনতে পেল না। ঘুমিয়ে পড়ল শাওন।
একটা চাপা কিন্তু স্পষ্ট আওয়াজে ঘুম ভেঙে গেল শাওনের। সে বিছানার ওপরে উঠে বসতে যেতেই পরিদাদুর একটা হাত চেপে শুইয়ে দিল তাকে। পাশের বিছানায় নিখিলদাদু নেই। বিবেককেও তার বিছানায় দেখতে পেল না শাওন। বাইরে হাওয়া দিচ্ছে। সেই হাওয়ায় দরজার পাল্লা দুলে দুলে লোহার কড়ায় হালকা ঠুক ঠুক আওয়াজ উঠছে। বাইরে নীচু গলায় কথা বলছেন নিখিলদাদু। কার সঙ্গে? বিবেক চতুর্বেদীর সঙ্গেই কী? একটুখানি অপেক্ষা করলেন পরিদাদু। তারপর বিছানা থেকে খুব ধীরে উঠে বসে দরজার দিকে তাকালেন। খুব চাপা গলায় জিজ্ঞেস করল শাওন, 'বাইরে বেরোবে?'
'হুঁ।'
'আমিও যাব?'
'না।'
পরিদাদু দরজার দিকে এগোলেন। সতর্ক হয়ে পা ফেলা সত্ত্বেও হালকা আওয়াজ হল কাঠের মেঝেতে। বাইরের কথা থেমে গেল। পরিদাদু বিবেকের বিছানার দিকে চাইলেন। তার রুকস্যাকটা খোলা। দু-একটা জিনিস ব্যাগ থেকে বের করে বিছানার ওপরে ইতস্তত ছড়িয়ে রাখা রয়েছে। পরিদাদু দরজার পাল্লা খুলতেই একঝাঁক ঠান্ডা হাওয়া ঘরে ঢুকে পড়ল। নিখিলদাদুও ঘরে এসে ঢুকলেন। পরিদাদুর দিকে চেয়ে বললেন, 'কী রে ঘুম ভেঙে গেল?'
'কার সঙ্গে কথা বলছিলি বাইরে?'
'কথা বলিনি তো?' নিখিলদাদু হাসলেন। ঘুম ভেঙে যেতে কেমন যেন অস্বস্তি হচ্ছিল। দরজা খুলে বাইরে গিয়ে দাঁড়িয়েছিলাম। আকাশ পরিষ্কার হয়ে চাঁদ উঠেছে। পাহাড়ের গায়ে সেই আলো পড়ে এত সুন্দর লাগছিল, হাঁ করে দেখছিলাম। তারপরেই বিবেক বাইরে এসে দাঁড়াল। ওকে একটু অস্থির লাগছিল। জিজ্ঞেস করলাম, 'কী হয়েছে?'
বলল, 'একটা দরকারি কাগজ খুঁজে পাচ্ছি না। স্পষ্ট মনে আছে ব্যাগেই রেখে দিয়েছিলাম। কিন্তু ব্যাগে নেই। বাইরের দিকের একটা খোপে ছিল, পড়ে টড়ে গেল কিনা কে জানে'... বলতে বলতে সামনের রাস্তায় নেমে গেল'।
'ও', পরিদাদু গম্ভীর গলায় বললেন। তারপর ফিরে এসে বিছানায় বসে পড়লেন আবার। নিখিলদাদুর দিকে ফিরে চাপা গলায় জিজ্ঞেস করলেন, 'বিবেকের সঙ্গে তোর আলাপ ঠিক কতদিনের?'
'মাস চারেক।'
'মুকেশ চতুর্বেদীজি কখনও ওর কথা বলেছিলেন তোর কাছে?'
'না। মানুষটা এমনিতেই খুব চাপা স্বভাবের ছিলেন।'
'মুকেশজির কাছে যতবার গেছিস কখনও দেখা হয়নি বিবেকের সঙ্গে?'
'না তো।'
'এই চার মাসে ওর সঙ্গে যা কথা হয়েছে তাতে তোর কী মনে হয়েছে, ওসলার আশেপাশের অঞ্চলে কোথাও যে একটা অমন ঐতিহাসিক জনপদ লুকিয়ে আছে সে সম্পর্কে ও কতটা ওয়াকিবহাল?'
'এ ব্যাপারটা ও জানে। মানে ডক্টর চতুর্বেদীর কাছে শুনেছে হয়তো। তবে এসব নিয়ে ওর খুব একটা আগ্রহ আছে বলে মনে হয়নি। তবে কাকাকে অসম্ভব ভালোবাসে ছেলেটা।'
'সেটা বোঝা যাচ্ছে। নইলে এই বিপদ মাথায় করে বনে জঙ্গলে কাকাকে খুঁজতে আসত না ছেলেটা'। পরিদাদু মাথা নাড়লেন।
বিবেক ঘরে ঢুকে পড়ায় চুপ করে গেলেন দুজনে।
পরিদাদু নরম গলায় জিজ্ঞেস করলেন, 'কোথায় গিয়েছিলেন?'
'কোথাও না', বিষণ্ণ গলায় বলে বিবেক, 'মন খারাপ লাগছিল। মনে হচ্ছিল এই অঞ্চলের কোথাও গিয়েই হারিয়ে গেছেন আমার কাকা। কী অসাধারণ একটা আবিষ্কার তাঁর নামের পাশে লেখা থাকত, অথচ...'
পরিদাদু এগিয়ে গিয়ে তার পিঠে হাত রাখলেন। নরম গলায় বললেন, 'জীবিত থাকলে আমরা নিশ্চিত খুঁজে বের করব তাঁকে বিবেক। আমি কথা দিলাম আপনাকে। আর এ কথাও দিলাম, এই অঞ্চলটি পরবর্তীকালে যদি মানুষের সামনে আসে তাহলে তার সম্পূর্ণ কৃতিত্বের অংশীদার যাতে তিনিই হন সে ব্যবস্থাও করব।'
'থ্যাঙ্ক ইউ।'
'আপনার কী একটা দরকারি কাগজ নাকি হারিয়ে গেছে শুনছিলাম?'
'ও হ্যাঁ'। ইতস্তত ভঙ্গিতে বলে বিবেক।
'পেলেন?'
'নাহ।'
আর কোনো কথা বললেন না পরিদাদু। নিজের বিছানায় ফিরে এসে শুয়ে পড়লেন কম্বল মুড়ি দিয়ে।
সকালে পরিদাদুই সব্বার প্রথমে উঠেছিলেন। অভ্যাস মতন ব্রাশ টাশ করে হেঁটে এসেছেন খানিক। তারপর শাওনকে তুলে দিয়েছেন ঠ্যালা মেরে, 'আর কত ঘুমোবি? পাহাড়ে এসে কেউ ঘুমিয়ে সময় নষ্ট করে? ভোরবেলার সৌন্দর্যটা দেখে নে প্রাণ ভরে'। শাওনের প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই নিখিলদাদু আর বিবেক উঠলেন। একটু পরে সামান্য নাস্তা আর চা খেয়েই বেরিয়ে পড়া। পরিদাদু পুলকের স্ত্রীর সঙ্গে কথা বলছিলেন খানিক তফাতে দাঁড়িয়ে। চলে আসার সময় শাওনের থুতনি ধরে নেড়ে দিয়ে আদর করে দিলেন তিনি। তারপর চাপা গলায় বললেন, 'আমি জানি, আমরা হাজার বারণ করলেও হয়তো কথা শুনবে না তোমরা। তবু বলি, যেদিকে যাবে তোমরা, সেদিকটা ভালো নয়। ওদিকেই আছে হিমালয়ের নিষিদ্ধ এলাকা। বাইরের লোকেরা জানে না, কিন্তু আমরা জানি জায়গাটা বিপদের। ওখানে গেলে কেউ আর ফেরে না। ডাক্তারবাবু আর তার সাহেব সঙ্গীও ফেরেনি। ওই পথে তোমরা যেও না। যদি ভুল করে গিয়েও পড়ো, বিপদে পড়লে লব কুশ মহারাজের স্মরণ নিও। অথবা রাজা দুর্যোধনের প্রতিনিধি অশ্বত্থামা মহারাজজিউকে ডেকো সাহায্যের জন্যে। ভালো মানুষ বিপদে পড়লে তিনি এখনও সাহায্য করেন। মনে রেখো কথাটা।'
'তাহলে মুকেশজিকে উনি সাহায্য করলেন না কেন?' শাওন বলল নীচু গলায়, 'উনি তো ভালো মানুষই ছিলেন...'
'ভালো মানুষদের উনি ঠিকই সাহায্য করেন', আবার বললেন উনি, 'আর একটা কথা মনে রেখো।'
'কী?'
'ফেরার সময় আবার এখানে এসে থেকে যেও কেমন?' বলে মিষ্টি হেসে ঘরের দিকে চলে গেলেন মহিলা। শাওনের মন কেমন করে উঠল। হঠাৎ নিজের মায়ের কথা মনে পড়ে গেল ওর। পরিদাদু তাড়া লাগালেন, 'আর দেরি করিস না শানু, চল এবারে'। রওনা দিল ওরা।
শাঁকরি থেকে তালুকা প্রায় পনেরো কিলোমিটার রাস্তা। এই পথ হেঁটেই যেতে হত আগে। পরিদাদু আগে এদিকে এসেছিলেন যখন শাঁকরি থেকেই হাঁটা শুরু করেছিলেন। এখন এই রাস্তাটুকু জিপ চলাচল করে। রাস্তা যদিও বেজায় খারাপ। পুরোটাই বোল্ডার ফেলা। এবড়োখেবড়ো। তবু হাঁটার পরিশ্রম আর সময় কমানোর জন্যে জিপই ধরলেন পরিদাদু। একটা জিপেই সকলে উঠে পড়লেন মালপত্তর নিয়ে। শাঁকরি থেকেই ছ জনের এক সপ্তাহের মতন রেশন নিয়ে নেওয়া হল। নিখিলদাদু জিজ্ঞেস করলেন, 'পরি, কী মনে হয় তোর, এই কদিনের মধ্যেই মুকেশজির হদিশ পেয়ে যাব আমরা, নাকি আরও কিছুদিন বেশি লাগতে পারে ধরে নিয়ে সেইমতন প্রস্তুতি নিয়ে নেব একেবারে?'
'যদি খুঁজে পাই এর মধ্যেই পাব', প্রত্যয়ী গলায় বলেন পরিদাদু, 'নাহলে ধরে নিতে পারিস, ওঁকে পাবার আর কোনো সম্ভাবনা নেই।'
শাওন অবাক হল। পরিদাদুর এই কণ্ঠস্বর তার চেনা। পরিদাদু নিশ্চিত একটা কিছু রহস্যের সন্ধান পেয়েছেন পুরো ব্যাপারটার মধ্যে। বুকের মধ্যে রোমাঞ্চ অনুভব করল শাওন। এবারের অভিযানও তাহলে এক্কেবারে পানসে হবার কথা নয় আর।
তালুকা থেকে খাড়াই অনেকখানি নীচে নেমে গেছে পথটা। হাতের লাঠিতে ভারসাম্য রেখে খুব সাবধানে নেমে এল সক্কলে। কলকল শব্দে তমসা নদী বয়ে যাচ্ছে বাঁ দিক দিয়ে। রুপিন আর সুপিন দুখানা নদীর জল একসঙ্গে বয়ে নিয়ে পাথুরে পথের বাধা টপকে সেই কবে থেকে একটুও না হাঁপিয়ে ছুটে চলেছে এই সুন্দর নদীটা। সবুজের মধ্যে লুকিয়ে চুরিয়ে এগিয়ে যাওয়া একটা পাকদণ্ডী ধরে এগোতে হচ্ছে এখন শাওনদের। রাস্তাটা মোটামুটি সোজা এগিয়েছে। চড়াই উতরাই তেমন নেই। হালকা হাওয়া বইছে। পাখি ডাকছে ঝোপ জঙ্গল গাছপালার আড়াল আবডাল থেকে। একটা অদ্ভুত বুনো গন্ধ উড়ে এসে লাগছে নাকে। হাঁটতে দিব্বি লাগছিল শাওনের। পোর্টার পণ্ডিতজি পিঠে গোটা দুই রুকস্যাক নিয়ে অনেকখানি এগিয়ে গিয়েছিলেন। সামনে একটা জায়গায় রাস্তা দু-ভাগ হয়ে দু দিকে চলে গেছে দেখে থমকাতেই কানে এল তাঁর উচ্চকণ্ঠের আওয়াজ, 'লব কুশ মহারাজ কি জ্যায়।'
শাওন পরিদাদুর দিকে চাইল, 'আচ্ছা পরিদাদু, এই কি সেই তমসা, রামায়ণে যে নদীর কথা পড়েছি?'
'হ্যাঁ', পরিদাদু মাথা নাড়েন। তারপর হাঁটতে হাঁটতেই বলতে থাকেন, 'এই তমসা নদীর ধারেই কোথাও সেই কোন ফেলে আসা সময়ে প্রাচীন ভারতবর্ষের মস্ত বড় এক কবি বসবাস করতেন ছবির মতন সুন্দর একটা অপূর্ব তপস্থলীতে।
'কে পরিদাদু?' বোকার মতন বলে ওঠে শাওন। বলে নিজেই লজ্জা পেয়ে যায়। বাল্মীকির মতন এতবড় কবি কজন হতে পারেন? কী কল্পনা আর কী কলমের জোর। নইলে সেই কবে লেখা একখানা মহাকাব্য আজও মানুষ পড়ে?
পরিদাদু আবেগতাড়িত হয়ে বলে চলেছেন, 'ভাবতে পারিস এই নদীরই কাছে স্নান করতে এসে এক বেয়াড়া ব্যাধের হাতে একজোড়া বকের মধ্যে একটাকে তিরবিদ্ধ হতে দেখে শোকে ভারাক্রান্ত ঋষি, আমাদের আদি কবি বাল্মীকির মুখ থেকে বেরিয়ে এল এক আশ্চর্য শ্লোক, মা নিষাদ প্রতিষ্ঠাং... পৃথিবীর প্রথম কবিতা...ভাবতেই গায়ে কাঁটা দেয়। কে বলতে পারে এখন যে জায়গাটা দিয়ে হাঁটছি আমরা, এ হয়তো সেই জায়গাটাই...'
সত্যিই গা যেন শিরশির করে উঠল শাওনের। এইখানেই সীতাকে বনবাসের জন্যে রেখে দিয়ে গিয়েছিলেন লক্ষ্মণ। পরে এখানেই কোথাও অশ্বমেধের ঘোড়া আটকে দিয়ে বালক লব কুশ যুদ্ধ করেছিল তাদের বাবা রামচন্দ্রের সঙ্গে। তারা অবশ্য জানতই না তখন যে এই মানুষটা আসলে তাদের বাবা। কে জানে এসব কাহিনি সত্যি কিনা...কিন্তু কাহিনির পটভূমিটা তো মিথ্যে নয়। আর সেই পটভূমিতেই আজ এত বছর পরে হেঁটে চলেছে তারা। শাওন কেমন একটা যেন ঘোরের মধ্যে থেকে বলল, 'আচ্ছা পরিদাদু, লক্ষ্মণ এত জায়গা থাকতে সীতাকে হঠাৎ এইখানে এসে রেখে গেলেন কেন বলো তো?'
নিখিলদাদু এগিয়ে গিয়েছিলেন প্রথমটা। এখন ক্রমশ পিছিয়ে পড়ে শাওনদের সঙ্গে সঙ্গেই হাঁটছেন ধীর পায়ে। শাওনের প্রশ্ন শুনে তিনি হাসলেন, 'এর নির্দিষ্ট কোনো কারণ তো রামায়ণে লেখা নেই শানুবাবু। তবে সব কাজের পিছনেই নিশ্চিত একটা লজিক থাকে। কাজেই কারণ এক্ষেত্রেও অবশ্যই ছিল কিছু একটা। আমাদের সেটা অনুমান করে নিতে হবে। আমার মনে হয় লক্ষ্মণ ভেবেছিলেন ঋষি বাল্মীকির আশ্রম তাঁর বউদির পক্ষে সবচেয়ে নিরাপদ জায়গা।'
'কেন তাঁর এমন মনে হল?' শাওন জিজ্ঞেস করল বড় বড় চোখ তুলে।
'ভেরি গুড কোয়েশ্চেন শানু', নিখিলদাদু মাথা নাড়লেন। চুপ করে দম নিলেন খানিক। এবারে একটা দীর্ঘ চড়াই ভাঙতে হবে। রাস্তাটা ঢালু হয়ে একটু নেমেই সোজা ওপরে উঠে গেছে অনেকখানি। এবড়োখেবড়ো ছোট বড় পাথর ডিঙিয়ে এগোতে হবে সেই পথে। সেইদিকে তাকিয়ে নিখিলদাদু বললেন,'আমার ধারণা যদি ঠিক হয় তাহলে সেই কারণটা যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ এবং আমাদের এই অভিযানের সঙ্গেও এই কারণটার একটা সম্পর্ক থেকে যাচ্ছে।'
'কীরকম?' কৌতূহলী হয়ে জিজ্ঞেস করেন পরিদাদু।
মহাপ্রস্থানের পথে পাণ্ডবেরাও স্বর্গারোহণ করেছিলেন এই স্বর্গারোহিণী শৃঙ্গের দিকে এগিয়েই। কিন্তু লক্ষ্যণীয়, তাঁরা এগিয়েছিলেন আমাদের ঠিক উলটোদিকের রাস্তায়, বদ্রীবিশালের মন্দির পেরিয়ে মানা গ্রাম হয়ে শতপন্থের দিক দিয়ে। অর্থাৎ ওই অঞ্চলটাই সাধারণ মানুষের জানা পথ এবং প্রচলিত পথ। কিন্তু এই ঘটনার আগে ত্রেতা যুগে লক্ষ্মণ সীতাকে এই অঞ্চলে বনবাসে রেখে দিয়ে গেলেন। এর থেকে একটা কথা তো স্পষ্ট...'
'কী কথা?' পরিদাদু জিজ্ঞেস করলেন।
'এই দিকটা ছিল বেশি দুর্গম, এবং মানুষের আসা যাওয়ার পথের বাইরের কোনো জায়গা। কাজেই কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের পরে যাঁরা পাণ্ডবদের চোখের আড়ালে লুকিয়ে থাকতে চেয়েছিল, তাদের পক্ষে এই দিকের কোনো গোপন জায়গায় আশ্রয় নেওয়াটাই বেশি যুক্তিযুক্ত।'
'ঠিক', পরিদাদু সায় দেন নিখিলদাদুর কথায়, 'কথাটা যুক্তিপূর্ণ। তুই ঠিকই বলছিস মনে হয়। শুধু তুই নয়, মহাভারতের যে অজানা অংশের সূত্র ধরে ডক্টর চতুর্বেদী এই অঞ্চলে এসেছিলেন, সেটাও উড়িয়ে দেবার মতন তথ্য নয়'।
'আমারও তাই মনে হয়।'
'এখানে কি তাহলে আমার কাকাকে পেয়ে যাবার সম্ভাবনা আছে বলছেন?' বিবেক এগিয়ে গিয়েছিলেন। এখন চড়াই পথে পিছিয়ে এসে শাওনদের কাছাকাছি এসে গেছেন তিনি।
'আমরা তো সেই আশাতেই চলেছি', নিখিলদাদু বললেন, 'তবে জায়গাটা এখানে হবে না। যতদূর শুনেছি তাঁর কাছে এবং যতখানি অনুমান করতে পারি, সে জায়গায় পৌঁছতে এখনও বিস্তর পথ এগোতে হবে আমাদের। ওসলা গ্রাম পেরিয়ে হিমালয়ের সেই অজানা নিষিদ্ধ অঞ্চলে ঢুকতে হবে আমাদের।'
'কিন্তু নিষিদ্ধ অঞ্চলের ভাঙা প্রাচীরের ধ্বংসাবশেষের কাছাকাছি পৌঁছলেই কি তিনি ফিরে আসবেন আমাদের কাছে?' আবার বলেন বিবেক।
পরিদাদু সরু চোখে তাঁর দিকে তাকিয়ে বললেন, 'দেখা যাক। যদি বেঁচে থাকেন তাঁর কাছে অবশ্যই পৌঁছব আমরা।'
খাড়াই পথে ক্রমাগত ওপরে ওঠার মেহনতিতে পরিদাদু হাঁপাচ্ছিলেন। নিখিলদাদুকেও বেশ কাহিল লাগছিল। শাওনের দম বন্ধ হয়ে আসছিল কষ্টে। কিন্তু মুখে কিছু বলছিল না। এমন কষ্ট সহ্য করার অভ্যাস তার আছে। এর আগে একবার তাওয়াং এর কিছু দূরে এক রহস্যময় মঠ খুঁজতে পরিদাদুর সঙ্গী হয়েছিল সে। সেবারেও অসম্ভব কষ্ট সহ্য করতে হয়েছিল তাদের।
বিবেক বললেন, 'একটু দাঁড়ালে হয় না? বড্ড কাহিল হয়ে পড়েছি।'
'বেশ। চলুন, জিরিয়ে নেওয়া যাক খানিক'। পরিদাদু নিজেও দাঁড়িয়ে পড়লেন লাঠির ওপরে ভর দিয়ে। একদল পাহাড়ি মানুষ ওপারের খাড়াই বেয়ে উঠে এসে এদিকে নেমে আসছিল। তাদেরই মধ্যে একজন বেশ বয়স্ক মহিলা হঠাৎই পথের ধারে বসে পড়ল। যন্ত্রণায় কুঁকড়ে উঠেছে তার মুখ। কষ্টের আওয়াজ বেরোচ্ছে তার অপারগ কণ্ঠ থেকে। শাওনদের দেখে হাত বাড়িয়ে সেই মহিলা বলে উঠল, 'থোড়া সা পানি দো বাবা...'
শাওন তার দিকে এগিয়ে গেল। বিবেক মৃদু স্বরে বলে উঠলেন, 'শানু খাবার জল খুব বুঝে খরচ করো ভাই। নিজের প্রয়োজনে মাথা খুঁড়ে মরলেও চলার পথে ইচ্ছে করলেই জল পাবে না এসব জায়গায়।'
শাওন তবুও এগিয়ে গেল। পিঠের ন্যাপস্যাক থেকে জলের বোতল বের করে এগিয়ে দিল সেই মহিলার দিকে। মহিলার সঙ্গে যারা হেঁটে আসছিল, খানিক এগিয়ে গিয়ে তারাও দাঁড়িয়ে পড়ল। মাথা ঘুরিয়ে দেখতে লাগল শাওনের দিকে। মহিলা শাওনের হাত থেকে জল নিয়ে কয়েক ঢোক খেয়ে বোতলটা শাওনের দিকে ফিরিয়ে দিয়ে একগাল হেসে বললেন, 'রাখ দো বেটা'। পরিদাদুও ততক্ষণে এগিয়ে এসেছেন। পকেট থেকে একটা লজেন্স বের করে বাড়িয়ে দিয়েছেন মহিলার দিকে। মহিলার হাসি আরও চওড়া হল লজেন্সটার দিকে তাকিয়ে। পরিদাদুর হাত থেকে লজেন্স নিয়ে মুখে পুরে চুষতে চুষতে আবার হাত বাড়িয়ে দিয়ে বলল, 'আওর মিঠাই দো ভাইয়া।'
পরিদাদু আরও কয়েকটা লজেন্স তার হাতে দিয়ে গাড়োয়ালি হিন্দি মিশিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, 'কষ্ট কমেছে এখন একটু?'
'কমেছে, তবে পায়ে বহোত দর্দ' মুখ বিকৃত করে মহিলা বলে উঠল। তারপর পায়ের কাছ থেকে খানিক শাড়ি উঠিয়ে শাওনকে পায়ের ডিমের কাছটা দেখিয়ে বলল আবার, 'বহুত দর্দ বেটা। দাওয়া হ্যায় কুছ তেরা পাস?'
শাওনের ব্যাগে মলম ছিল একটা। খুব যত্ন করে সেই মলমের টিউব থেকে কিছুটা বের করে নিয়ে মহিলার পায়ে মালিশ করে দিল শাওন। পরিদাদু ব্যাগ থেকে হোমিওপ্যাথি ওষুধ বের করে খাইয়ে দিলেন তাকে। শাওনের দিকে ফিরে বললেন, 'এই ওষুধটুকুই ম্যাজিকের মতন কাজ করবে ওঁর শরীরে।'
'কেন?'
'ওঁদের শরীর তো সাধারনত বাইরের ওষুধের সাপোর্ট পায় না। কাজেই ওঁর ক্ষেত্রে ওষুধ খুব দ্রুত কাজ করারই কথা।'
ওষুধ খেয়ে ও লাগিয়ে মহিলার আরাম হচ্ছিল বোধহয়। মুখে একটা স্বস্তির শব্দ তুলে শাওনকে জিজ্ঞেস করলেন তিনি, 'কাঁহা যানা বেটা?'
শাওন পরিদাদুর দিকে তাকাল। পরিদাদু বুঝিয়ে বললেন যে আপাতত ওসলা যাবেন তাঁরা। তারপর ওসলা থেকে পাহাড়ি জংলি পথে...'
'হর কি দুন?' আবার জিজ্ঞেস করলেন মহিলা।
'কিছুই ঠিক নেই', পরিদাদু মাথা নাড়ালেন, 'আমাদের ইচ্ছে পরিচিত পথে না গিয়ে অপরিচিত জঙ্গলে ঘুরে বেড়ানো।' বলে যেদিকে তাঁদের যাবার কথা মহিলাকে তার একটা আভাস দিলেন পরিদাদু।
'মাত যানা বেটা' বলে প্রবল বেগে মাথা নাড়াতে লাগল সেই পাহাড়ি মহিলা, 'ও পথে বহোত খতড়া...' চোখ গোল করে আরও কিছু বলতে চাইছিল সে, কিন্তু তার সঙ্গীরা হাঁক পাড়ল। তাড়া দিতে লাগল বার বার। মহিলা উঠে দাঁড়িয়ে পড়ল। নিজের পথে পা বাড়াতে গিয়েও কী মনে করে থমকে দাঁড়িয়ে পড়ে পিঠের ঝোলা খুলে তার থেকে দুটো পুঁথির মালা বের করে পরিয়ে দিল পরিদাদু আর শাওনের গলায়। তারপর চাপা গলায় বলে উঠল, 'মালাটা পরে থেকো। জানি না কখন কোথায় কী বিপদ অপেক্ষা করছে তোমাদের জন্যে। এই সুরক্ষাকবচ গলায় রইল। মহারাজ অশ্বত্থামা তোমাদের কৃপা করুন, মঙ্গল করুন।'
শাওনদের দিকে আর একবারও না তাকিয়ে মহিলা হাঁটা লাগাল এবার। পরিদাদু আর শাওন তার চলে যাওয়া দেখলেন চুপ করে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে। শাওন পরিদাদুকে জিজ্ঞেস করল, 'মালাটা কী করব পরিদাদু?'
'পরেই থাক না', পরিদাদু হাসেন, 'ভালোবাসার জিনিস দুম করে কি খুলে ফেলা যায়? মনে রাখিস সবসময়, পাহাড়ের এই মানুষগুলো খাঁটি সোনার মতন। এদের মনে কোনো জটিলতা নেই। এদের মতন এমন বিশুদ্ধ ভালোবাসা সারা জীবনে কেউ তোকে দিতে পারবে না রে শানু। কাজেই যে কদিন পাহাড়ে আছি, চল এদের আদর আর আশীর্বাদটুকু গলার মালা করে রেখে দিই যত্ন করে।'
পরিদাদু আবার হাঁটতে শুরু করলেন লাঠিতে ভর দিয়ে। শাওনও হাঁটতে লাগল নিঃশব্দে। মাথার ওপরে ঝকঝক করছে নীল আকাশ। এমন নীল সমতলের মানুষ শহরে থেকে কল্পনাও করতে পারবে না। পাহাড়ের গায়ে পাহাড়ি বুনো গোলাপ ফুটে আছে। পায়ের কাছেও ঘাসের ফাঁকে ফাঁকে নাম না জানা বিচিত্র রঙের ফুল। হাঁটতে কষ্ট হচ্ছে, তবু চার পাশে বিছিয়ে থাকা এই বিপুল সুন্দরের সমারোহে সেই কষ্ট ভুলে যাচ্ছিল শাওন। বিকেল যখন প্রায় চারটে, সীমা গ্রামে এসে পৌঁছল শাওনরা। আকাশ মেঘে ঢেকে গেছে তখন। পাহাড়ের এই হল দস্তুর। সারাদিন যতই ঝকমকে রোদ্দুর থাক না কেন, বিকেল হলেই বৃষ্টি এসে স্নান করাতে থাকে পাহাড় আর পাহাড়ি গাছেদের। আরও উঁচু পাহাড়ে তখন বরফ ঝরে। রুপোলি মুকুটে মাথা ঢেকে নেয় পাহাড়ের চুড়োগুলো।
চক্রু সিং আর পণ্ডিতজি আগেই পৌঁচেছেন। জি এম ভি এনের বাংলোয় মালপত্র তুলে দিয়ে রান্নার যোগাড়যন্ত্র শুরু করে দিয়েছেন তাঁরা এরমধ্যেই। খুব ক্লান্ত লাগছিল শাওনের। নিখিলদাদু আর বিবেককেও বেশ কাহিল লাগছিল। শুধু পরিদাদুই ঘরে ঢুকে পিঠের ব্যাগ থেকে রেইন কোট আর টর্চ বের করে নিয়ে শাওনের দিকে চেয়ে বললেন, 'গরম জলে হাত মুখ ধুয়ে খানিক রেস্ট নিয়ে নে শানু। চক্রু চা বসিয়েছে। গরম গরম চা খেয়ে বাইরের বারান্দায় বেরিয়ে চারপাশটা খানিক দেখেশুনেও নিতে পারিস। আমি একটু ঘুরে আসি। চলে আসব সন্ধে নামার আগেই। বারান্দায় বেরোলে কান মাথা ঢেকে নিস ভালো করে। বৃষ্টির ফোঁটার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ঠান্ডাও বাড়ছে। ঠিকঠাক প্রোটেকশন না নিলে দুম করে ঠান্ডা লেগে যাবে মনে রাখিস।'
একেবারে কাকভোরে উঠে জি এম ভি এন-এর বাংলোতেই সকালের খাওয়া দাওয়া সেরে ওসলার পথে বেরিয়ে পড়ল শাওনরা। মাত্র এক কিলোমিটার পথ, কিন্তু পুরো পথটাই অসম্ভব খাড়াই। এই ওসলা গ্রামেই রয়েছে উত্তরভারতের একমাত্র মন্দির যেখানে মহাভারতের খলনায়ক দুর্যোধনের পুজো করা হয়। তমসা উপত্যকার বিভিন্ন অঞ্চলেই মহাভারতের চরিত্রেরা জীবন্ত হয়ে আছেন এখনও। চক্রতার কাছে বিরাট খোই-তে আছে বিরাট রাজ্যের ধ্বংসাবশেষ, লাখামণ্ডলে জতুগৃহ, আবার দেওড়া গ্রামে রয়েছে কর্ণের মন্দির। কাঠের তৈরি প্রাচীন দুর্যোধন মন্দিরের গায়ে মহাভারত অবলম্বনে নানান ছবি খোদাই করা রয়েছে। পরিদাদু হাত বাড়িয়ে বাড়িয়ে শাওনকে সেই ছবিগুলো দেখিয়ে কী জানি বলছিলেন। নিখিলদাদু তাড়া দিলেন। পণ্ডিতজি এবং চক্রু সিং-ও বলল, 'সাব, আমাদের এগোতে হবে। অনেকটা পথ পেরোতে হবে আজ আমাদের একদিনে।'
কাজেই আবার পথ চলা শুরু হল। এই পথে চড়াই খুব বেশি নেই। কিছু পথ হাঁটার পরেই একটা সরু নদী পেরোতে হল জলের মধ্যে ডুবে থাকা পাথরখণ্ডের ওপরে সাবধানে পা ফেলে ফেলে। উলটোদিকে হর কি দুনের পথ সবুজ ঘাস চিরে আড়াআড়ি উঠে গেছে। বাঁ দিকে ঘন জঙ্গল। একটুও না থেমে, টানা হেঁটে বেলা প্রায় একটা দেড়টা নাগাদ ঘন ঘাসের কার্পেটে মোড়া এক বিস্তৃত উপত্যকায় এসে পৌঁছলেন পরিদাদুরা সক্কলে।
সারা উপত্যকা জুড়ে সবুজ ঘাসের ওপরে সাদা, বেগুনি, লাল, নানান রঙের ছোট ছোট ফুল ফুটে আছে। দীর্ঘ পথ পেরিয়ে আসার ক্লান্তি মুছে দিচ্ছিল সেইসব নাম না জানা অপূর্ব ফুলের সৌন্দর্য।
পণ্ডিতজি বললেন, 'এই হল দেবসু বুগিয়াল।'
চক্রু সিং পিঠ থেকে বোঝা মাটিতে নামিয়ে রেখে বলল, 'আজ এখানেই তাঁবু ফেলব আমরা।'
ঝকঝকে নীল আকাশ ততক্ষণে ফ্যাকাশে মেঘে ভরে গেছে। সেদিকে তাকিয়ে পরিদাদু বললেন, 'একটু পরেই বৃষ্টি নামবে'। নিখিলদাদুকে খুব ক্লান্ত দেখাচ্ছিল। শুধু বিবেককেই দেখা গেল চনমনে, ছটফটে। তাঁবু টাঙিয়ে পণ্ডিতজি এবং চক্রু সিং রুকস্যাক আর রান্নার জিনিসপত্র ভেতরে ঢুকিয়ে গুছিয়ে রাখতে না রাখতেই বৃষ্টি নামল।
পরদিন যাত্রা শুরু করতে দেরি হয়ে গেল। সকাল থেকে এতটাই কুয়াশা ঘিরে ছিল সমস্ত উপত্যকা জুড়ে যে পণ্ডিতজি বললেন, 'আর একটু অপেক্ষা করা যাক। এই ঘন কুয়াশায় রাস্তা ঠাওর করা না গেলে ঘোর বিপদ নেমে আসতে পারে যে কোনো সময়ে'। চক্রু সিং এবং পরিদাদুও সায় দিলেন পণ্ডিতজির কথায়। নিখিল এবং বিবেকও সহমত পোষণ করলেন। না করে উপায়ও ছিল না। পাহাড়ে এসে হটকারিতা চলে না, এই সত্য তাঁদের অজানা ছিল না। আকাশ একটু পরিষ্কার হতেই আবার হাঁটা শুরু হল। বিস্তৃত হর কি দুন-এর শৃঙ্গগুলি ক্রমশ স্পষ্ট হচ্ছে এইবার। পাইনের জঙ্গল ছাড়িয়ে দেবসু বুগিয়ালের শেষপ্রান্তে এসে দাঁড়াতেই ভি আকৃতির পাহাড়ের মধ্যে দিয়ে একঝাঁক পাহাড়চুড়ো দেখতে পাওয়া গেল। শাওন হাঁ করে তাকিয়ে ছিল সেই পর্বতশৃঙ্গগুলোর দিকে। চক্রু সিং শাওনের পাশে গিয়ে দাঁড়িয়ে শৃঙ্গগুলোকে চিনিয়ে দিল। ডান হাতের তর্জনি বাড়িয়ে সে শাওনকে এক এক করে দেখিয়ে দিল কোনটা কালানাগ, কোনটা বন্দর পুঞ্চ, আর কার নাম বড়াসুখা এবং রুইসারা।
পরিদাদু বললেন, 'এদের মধ্যে কালানাগ সবচেয়ে উঁচু। সম্ভবত কুড়ি হাজার নশো ছাপ্পান্ন ফুট হাইট। ফনা তোলা সাপের মতন দেখতে এই চুড়োটার একদিক এমন খাড়াই যে এর গায়ে বরফ জমতে পারে না।'
সামনের রাস্তা ছেড়ে এবার বুগিয়ালের বাঁ দিক ধরে ঘন জঙ্গল আর পচা পাতার মধ্যে দিয়ে নামা শুরু হল। পথটা বেশ বিপজ্জনক। পা পিছলে যাবার ভয়ে খুবই সাবধানে এগোতে হচ্ছে সকলকে। এইভাবে পাঁচশো ফুট মতন নেমে গিয়ে রুইসার নদী। পণ্ডিতজি একটা পড়ে থাকা গাছের গুঁড়ি দেখিয়ে বললেন, 'সকলে মিলে ঠেলে এটাকে নদীর দিকে নিয়ে গিয়ে সেতু বানাতে হবে। নইলে নদী পার হওয়া অসম্ভব। মারাত্মক টান এখানে নদীর।'
বিবেক, শাওন, পণ্ডিতজি নিজে আর চক্রু সিং সেই গুঁড়িটার দিকে এগোতেই পরিদাদু হাত তুলে নিষেধ করলেন। গলা তুলে বললেন, 'এতক্ষণ পণ্ডিতজি আমাদের পথ দেখিয়ে এনেছেন। এবারে যে পথে যাব সে পথের সন্ধান তো পণ্ডিতজির জানা নেই। নিখিলের কাছে পাওয়া কাগজপত্র, লোকজনের দেওয়া নির্দেশ এবং নিজের অনুমানের ভিত্তিতে আমি একটা গাইডম্যাপ তৈরি করেছি। সেই ম্যাপ অনুযায়ীই এখন থেকে ঠিক করতে হবে কোন পথে যাব আমরা।'
'তাহলে এখন আমরা কোন দিকে যাব?' নিখিলদাদু জিজ্ঞেস করলেন।
'আমরা এখন ডান দিকের ঘন জঙ্গলের পথে এগোব', নির্দেশ দিলেন পরিদাদু।
'কিন্তু রুইসার হ্রদ তো ওই দিকে নয় সাব...' পণ্ডিতজি বলে উঠলেন বিস্মিত কণ্ঠে, 'আপনারা রুইসার হ্রদে যাবেন না?'
'না।'
'হ্রদটা না দেখলে মিস করবেন', চক্রু বলতে লাগল,'প্রকৃতিদেবী এত সুন্দর করে সাজিয়ে দিয়েছেন জায়গাটা...অল্প কিছুদিনের মধ্যে সে জায়গাটা আরও সুন্দর হয়ে উঠবে...ব্রহ্মকমল আর ফেনকমলে ভরে যাবে পুরো এলাকা... সে জায়গা দেখবেন না আপনারা?'
'না', বললেন নিখিলদাদু,'আমরা বেড়াতে তো আসিনি চক্রু, আমরা এসেছি আমাদের এক বন্ধুকে খুঁজে বের করতে। এখানকারই কোনো জায়গায় লুকিয়ে থাকা একটা প্রাচীন জনপদ খুঁজে বের করতে এসে তিনি হারিয়ে গেছেন আশ্চর্যজনকভাবে...'
'ডাক্তার সাব? আপনারা কি ডাক্তার সাবের খোঁজে এই পাহাড়ি পথে এসেছেন এত কষ্ট করে?' পণ্ডিতজি জিজ্ঞেস করলেন।
'তুমি ডক্টর মুকেশ চতুর্বেদীকে চেন?' পরিদাদু অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন।
'জী সাব', মাথা নাড়েন পণ্ডিতজি, 'আমাদের এলাকার অনেকেই তাঁকে চেনে। বড় ভালো মানুষ ছিলেন। এই পাহাড়ের হাজারো গাছ চিনতেন তিনি। তাদের গুণ জানতেন। রোগে পড়ে এই অঞ্চলের গ্রামগুলোর অনেক আদমি ডাক্তার সাবের চিকিৎসায় বিলকুল সেরে উঠেছে অনেকবার...শুনেছি নিষিদ্ধ পাহাড়ের এলাকায় ঢুকে তিনি ভূর্জপত্রের গাছ হয়ে গেছেন। মানুষের মাঝখানে আর ফিরে আসবেন না তিনি কোনোদিন।'
'তুমি এই গল্প বিশ্বাস করো? তুমিও মানো, একটা জলজ্যান্ত মানুষ ভূর্জপত্রের গাছ হয়ে যেতে পারে সত্যি সত্যি?'
'মানি', সম্মতিসূচক মাথা নেড়ে উত্তর দেন পণ্ডিতজি। চক্রু সিং-ও সায় দেয় তাঁর কথায়।
'এটা কখনও হওয়া সম্ভব?'
'ওদিকটা অশ্বত্থামা মহারাজের রাজত্ব। ওখানে অনেক কিছুই সম্ভব', পণ্ডিতজি গম্ভীর গলায় বলেন।
'আমরা সেই রাজত্বে ঢুকতে চাই', বিবেক চুপ করে ছিল এতক্ষণ। এইবার কথা বলে উঠল গম্ভীর প্রত্যয়ী কণ্ঠে।
'সেখানে যারা ঢোকে, তারা আর ফেরে না কখনও।'
'তবুও যাব আমরা।'
'আপনারাও ডাক্তার সাবের মতন ভূর্জপত্রের গাছ হয়ে যাবেন তাহলে।'
'আমরা এইসব আজগুবি গল্প বিশ্বাস করি না।'
'আমরা করি', পণ্ডিতজির মতন শান্ত মানুষের চোয়ালও ক্রমশ শক্ত হয়ে উঠছে, লক্ষ করল শাওন। নিখিলদাদু আর বিবেক সামনের গভীর জঙ্গলের দিকে হাঁটা লাগিয়েছিলেন। পণ্ডিতজি ভারী গলায় বলে উঠলেন, 'আপনাদের বিশ্বাস অবিশ্বাসে কিছু এসে যায় না আমাদের। আমাদের ঘর আছে, বিবি বাচ্চা আছে। জান সমঝকে আমরা প্রাণ খোয়াতে পারব না। আমরা ওই জঙ্গলের পথে যাব না।'
বিবেক চলা থামিয়ে ঘুরে দাঁড়াল। চক্রুর দিকে চেয়ে বলল, 'আর তুমি?'
'আমিও যাব না ওই পথে', দৃঢ় কণ্ঠে জানিয়ে দিল চক্রু সিং-ও।
'এই পথে গেলে আজ থেকে ডবল টাকা দেব তোমাদের', আবার বলল বিবেক।
'টাকার লোভ দেখাবেন না সাহেব', চক্রু বলল অসন্তুষ্ট গলায়। টাকার চেয়ে জানের দাম বেশি। না যদি বাঁচি, কী করব বাড়তি টাকা নিয়ে?'
পণ্ডিতজি পরিদাদুর দিকে চাইলেন, 'আপনি খোকাবাবুকে নিয়ে আমাদের সঙ্গে ফিরে চলুন সাব।'
'বন্ধুদের ফেলে কী করে ফিরে যাই আমি পন্ডিতজি?' হালকা হেসে পণ্ডিতজির কাঁধে হাত রাখেন পরিদাদু, 'আমাদের জন্যে আপনার এই ভালোবাসা আমরা মনে রাখব।'
'এই জঙ্গলে আরও ঘণ্টা দুই এগোলে একটা সরু ঝোরা আছে। তার দু পাশেই ছোট্ট দুটো বুগিয়াল। ওই পর্যন্ত আপনাদের এগিয়ে দিতে পারি আমরা', পণ্ডিতজি বললেন, 'আজ রাত্তিরে ওখানেই তাঁবু পড়বে। সকালে ওখান থেকেই আমি আর চক্রু ফিরে আসব। ঝোরা পেরিয়ে ওদিকে আমরা যেতে পারি না। যাওয়া নিষেধ। আমরা পাহাড়ের মানুষ বছরের পর বছর এই নিষেধ মেনে এসেছি।'
'ঠিক আছে। আপাতত ওই পর্যন্ত তো যাওয়া যাক', নিজের রুকস্যাক পিঠে তুলে নিয়ে সামনের দিকে পা বাড়িয়ে বললেন নিখিলদাদু।
সকলের আগে হেঁটে চলেছেন বিবেক। পরিদাদু পা চালিয়ে তার কাছাকাছি যাবার চেষ্টা করতে গিয়ে ঢালু পথে পচা পাতার আস্তরণে পা পিছলে বেসামাল হয়ে পিছন থেকে হাত বাড়িয়ে বিবেকের উইন্ড চিটারের পিছনটা খামচে ধরে টাল সামলাতে গিয়ে বিবেককে নিয়েই গড়িয়ে পড়লেন মাটিতে। জঙ্গলে দীর্ঘদিনের জমে থাকা পাতার ওপরে পড়ায় দুজনের কারোরই লাগল না তেমন, কিন্তু বিবেক স্পষ্টতই বিরক্ত হলেন পরিদাদুর ওপরে। পরিদাদু কাঁচুমাচু মুখে সরি টরি বলে ক্ষমা চেয়ে নিয়ে পিছিয়ে এসে শাওনের পাশাপাশি হাঁটতে লাগলেন। আড়চোখে পরিদাদুর দিকে তাকিয়ে তাঁকে একটু বেশিই গম্ভীর মনে হল শাওনের। পরিদাদুর কপালে গভীর ভাঁজ। কিছু একটা বিষয়ে খুব নিবিড়ভাবে ভাবছেন পরিদাদু। কী ভাবছেন পরিদাদু? অসম্ভব কৌতূহল হল শাওনের। কিন্তু পরিদাদুর গম্ভীর চিন্তামগ্ন মুখের দিকে তাকিয়ে কিছু জিজ্ঞেস করতে সাহস হল না তার। সেও চুপচাপ হাঁটতে লাগল পরিদাদুর পাশে পাশে।
ক্রমশ নীচের দিকে তলিয়ে যেতে যেতেও এক অদ্ভুত প্রতিবর্ত ক্রিয়ায় দু- হাত দু-দিকে প্রসারিত করে হিমবাহের জমা বরফের স্তর আঁকড়ে ধরে নিজের শরীরের অবশ্যম্ভাবী পতন রোধ করার আপ্রাণ চেষ্টা করতে লাগলেন মুকেশ। তাতে শেষ রক্ষা হল না ঠিকই, কিন্তু বরফের এই অংশটা তুলনায় শক্তপোক্ত হওয়ায় খুব জোরে না পড়ে অপেক্ষাকৃত কম গতিবেগে নীচের দিকে নেমে এসে একটা বড়সড়, চ্যাটালো শক্ত পাথরের ওপরে আছড়ে পড়লেন তিনি। পড়ার সময়েই হিমবাহের ওপরের পৃথিবীতে আরেকবার গুলির শব্দ শুনলেন বলে মনে হল তাঁর। মুকেশের আঘাত লাগল খানিক, তবে সেই আঘাত খুব গুরুতর কিছু নয়। একটু সময় নিয়ে ধীরে সুস্থে তিনি আবার উঠে দাঁড়ালেন। মাথার ওপরে বরফের ছাদ। পাশে কুলকুল করে পাহাড়ি নদীটা বয়ে যাচ্ছে ছোট বড় নানান আকৃতির পাথরের ওপর দিয়ে লাফাতে লাফাতে। নদীটা গভীর নয়। খুব বেশি হলে হাঁটু অবধি জল হবে। কী নদী এটা কে জানে! অসম্ভব ঠান্ডা সেই নদীর জলই অল্প একটু খেয়ে নিলেন মুকেশ। আঁজলা ভরে জল নিয়ে চোখে মুখেও ছিটিয়ে দিলেন। তাকিয়ে দেখলেন নদীর তীর বরাবর একটা আবছা আলোয় মাখা পথ নদীরই সঙ্গে তাল মিলিয়ে এঁকেবেঁকে এগিয়ে গেছে। মুকেশের সামনে সেই পথ ধরে এগিয়ে যাওয়া ছাড়া অন্য কোনো উপায় ছিল না। তিনি এগিয়েই চললেন। এগোতে এগোতে ক্লান্ত হয়ে একাধিকবার বসে পড়লেন। আবার উঠে হাঁটতে লাগলেন। হোঁচট খেলেন কয়েকবার। তবু এগোতে লাগলেন তিনি। অনেকখানি হাঁটার পর থমকে দাঁড়িয়ে পড়লেন মুকেশ। আর যে পথ নেই। নদী চওড়া হয়ে পথকে গ্রাস করে নিয়েছে এইবার। মাথার ওপরে পাতলা বরফের আস্তরণ। কী করবেন, ভাবতে ভাবতেই হঠাৎ ডানদিকে পাহাড়ের গায়ে ফাটলটা চোখে পড়ল তাঁর। গুহা একটা। আজ রাত্তিরটা অন্তত ওখানেই আশ্রয় নেওয়া যেতে পারে ভেবে পাথরের খাঁজে পা রেখে সন্তর্পণে গুহাটার এক্কেবারে কাছে পৌঁছে গেলেন তিনি। গুহার মুখটা বেশ বড়সড়ই। মুকেশ গুহার মধ্যে ঢুকে পড়লেন। গুহাটা সোজা এগিয়ে অন্ধকারে মিশে গেছে। কতদূর পর্যন্ত লম্বা এই গুহা, তা বোঝার উপায় নেই অন্ধকারে। মুকেশ ব্যাগ থেকে টর্চ বের করলেন। তারপর সেই অন্ধকার গুহাপথে এগিয়ে চললেন সামনের দিকে। ডাইনে বাঁয়ে এঁকেবেঁকে ঘণ্টাখানেক চলার পরে পথটা ক্রমশই নীচের দিকে নামতে লাগল। ঢালু পথে সন্তর্পণে নামতে নামতেও পা পিছলে গড়িয়ে পড়লেন মুকেশ। ঝুপুস করে আওয়াজ হল একটা। সারা শরীরে হিম জলের স্পর্শ লাগাতে মুকেশ বুঝতে পারলেন গুহার মধ্যে দিয়ে বইতে থাকা কোনো জলপ্রবাহের মধ্যে এসে পড়েছেন তিনি। হাতের টর্চ ঠিকরে চলে গেছে দূরে কোথাও। টর্চের আলো নিভে গিয়ে গুহাটা আরও অন্ধকার, আরও ভয়ঙ্কর মনে হতে লাগল। জলের স্রোতে ভেসে যেতে যেতেই প্রাণপণে অবলম্বন খুঁজছিলেন মুকেশ। কিন্তু অন্ধকারে ঠাওর হচ্ছিল না কিছু। মুকেশের মনে হল এই পথের বোধহয় শেষ নেই কোনো। এইভাবে নদীর স্রোতের সঙ্গে নামতে নামতেই একসময় একটা ক্ষীণ আলোর আভাস পেলেন বলে মনে হল তাঁর। আলোটা স্পষ্ট হচ্ছে ক্রমাগত। বোঝা যাচ্ছে, গুহাটা শেষ হতে চলেছে এইবার। নদীর স্রোত ডান দিকে বাঁক নিল হঠাৎ করেই। দ্রুত একটা বড় পাথরকে দু- হাতে জাপটে ধরতে গিয়েও সামনের পাথরের দেওয়ালে সজোরে ধাক্কা খেলেন মুকেশ। মনে হল শরীরের সমস্ত হাড়গোড় বোধহয় ভেঙেচুরে দলা পাকিয়ে গেল এক লহমায়। বাইরে থেকে আলোর রেখা এখন ঝাঁপিয়ে ঢুকে পড়ছে, তবু দু-চোখে গাঢ় অন্ধকার নেমে এল মুকেশ চতুর্বেদীর। তিনি জ্ঞান হারিয়ে ফেললেন।
যখন আবার চোখ মেললেন, মুকেশ দেখলেন তিনি একটা বিছানার ওপরে শুয়ে আছেন। সারা গায়ে বেশ ব্যথা। সামনেই একজন লোক উদ্বিগ্ন মুখে দাঁড়িয়ে ছিল। লোকটাকে মুকেশের চেনা মনে হল না। তিনি বিছানায় উঠে বসতে যেতেই লোকটা দু দিকে মাথা নেড়ে তাঁকে উঠতে নিষেধ করল। তারপর ছুট্টে বাইরে বেরিয়ে গেল। মুকেশ কোথায় আছেন কিছুতেই বুঝে উঠতে পারলেন না। সেই গুহা, নদীস্রোত এ তাঁকে কোথায় নিয়ে এল? মুহূর্তে বিদ্যুৎ খেলে গেল তাঁর শরীরে। এই কি তবে সেই জায়গা, যার সন্ধানে গত কয়েক বছর ধরে ঘুরে বেড়াচ্ছেন তিনি হিমালয়ের বিস্তৃত একটা অঞ্চল জুড়ে?
লোকটার নিষেধ সত্ত্বেও বিছানার ওপরে উঠে বসলেন মুকেশ। আর তখনই সেই লোকটা আরও কয়েকজনকে সঙ্গে নিয়ে ফিরে এল তাঁর কাছে। তারা সবাই মাথা ঝুঁকিয়ে অভিবাদন জানালো তাঁকে। মুকেশে অবাক হলেন। এরা তাঁকে এমন সম্মান করছেন কেন? লোকগুলোর মধ্যে একজন এগিয়ে এল মুকেশের দিকে। অদ্ভুত সম্ভ্রান্ত তার চেহারা। ডান হাত বাড়িয়ে তাঁর কপালে হাত রাখল সে। চোখ টেনে দেখল দু-বার। তারপর জিজ্ঞেস করল, 'এখন কেমন লাগছে শরীর? পরশু গুহানদীর স্রোতে ভেসে এসেছিলেন যখন, আমরা ভেবেছিলাম আপনাকে বাঁচানোই যাবে না আর...প্রভু দুর্যোধনের অশেষ কৃপা আপনার প্রাণ রক্ষা হয়েছে শেষ পর্যন্ত...'
মুকেশ চমকে উঠলেন। পরশু এখানে এসেছেন? তার মানে প্রায় দু দিন অচৈতন্য হয়ে ছিলেন তিনি, আর এরাই শুশ্রূষা করে বাঁচিয়ে তুলেছে তাঁকে! মনে মনে এই মানুষগুলোর জন্যে ডক্টর চতুর্বেদী খুবই কৃতজ্ঞ বোধ করলেন। সে কথা জানালেনও তিনি। বললেন, 'আপনারা কে আমি জানি না। আমি এখন কোথায় তাও বুঝতে পারছি না। তবু আপনাদের প্রতি আমি কৃতজ্ঞ। আপনারাই প্রাণ বাঁচিয়েছেন আমার।'
'আপনার আঘাত যথেষ্টই ছিল। ক্লান্তও ছিলেন খুব। আমরা আপনাকে দীর্ঘ ঘুমের আরক খাইয়েছিলাম', লোকটি মিষ্টি করে হাসল, 'সেই সঙ্গে দ্রুত আঘাত থেকে সেরে ওঠার প্রয়োজনীয় ওষুধের প্রলেপও লাগিয়ে দেওয়া হয়েছিল আপনার সারা শরীরে। এই ওষুধ অসম্ভব কার্যকরী। যে কোনো চোট, আঘাত আর ক্ষত মেরামতে নির্দিষ্ট কিছু গুল্ম থেকে নির্মিত এই ঔষধ হাজার হাজার বছর ধরে যুদ্ধে আহত মৃতকল্প সৈনিকদের উপরে প্রয়োগ করে আসছি আমরা, আর অভ্রান্ত ফল পেয়ে আসছি প্রত্যেক বারেই।'
'আপনি কি বৈদ্য?'
'হ্যাঁ', উপর নীচ মাথা নাড়ায় লোকটি, 'রাজা অশ্বত্থামার চিকিৎসার ভার আমিই পালন করি।'
ডাক্তার চতুর্বেদী উত্তেজনায় উঠে বসলেন। এই অদ্ভুত জনপদের রাজবৈদ্যের দিকে হাঁ করে তাকিয়ে রইলেন কিছুক্ষণ। তারপর অবিশ্বাসের সঙ্গে বলে উঠলেন, 'এও কি সম্ভব? রাজা অশ্বত্থামা কীভাবে বেঁচে থাকতে পারেন আজ এই একবিংশ শতাব্দীর পৃথিবীতে?'
রাজবৈদ্যের মুখে এক অদ্ভুত রহস্যময় হাসি খেলা করে গেল। মুকেশের প্রশ্নের জবাব না দিয়ে তাঁর চোখের দিকে সরাসরি তাকালেন তিনি, 'আমাদের এই জনপদ বাইরের পৃথিবীর মানুষের কাছ থেকে হাজার হাজার বছর ধরে লুকিয়ে রেখেছি আমরা। বাইরের পৃথিবীর মানুষকে আমরা এখানে প্রবেশের অনুমতি দিই না। প্রচলিত যে পথগুলি দিয়ে এখানে আসা যায়, সে পথ এতটাই গোপন যে সাধারণ মানুষের পক্ষে তার সন্ধান পাওয়া সম্ভব নয়। তবুও সেখানে আমাদের প্রহরীরা নিরন্তর প্রহরায় আছে আত্মগোপন করে। অবশিষ্ট জগতের মানুষ এখানে আসে না, তবু ভুল করে কেউ যদি এসেও পড়ে, তারা হয় তাদের প্রতিহত করে, অথবা বন্দি। সেইসব বন্দিরা এখানে দাসত্ব করে। সেই পাণ্ডবপন্থী দাসেরা রাজা দুর্যোধনের আনুগত্য স্বীকার না করলে অথবা বিশ্বাসঘাতকতা করার চেষ্টা করলে প্রভু দুর্যোধনের গদা তাদের উপযুক্ত দণ্ডবিধান করে। এই শক্তিশালী গদা আর দণ্ড দেয় তাদের, যারা লোভী, যারা তস্কর। যুগের পর যুগ ধরে এই প্রথাই চলে আসছে।'
মুকেশ উঠে দাঁড়ালেন। দুর্বল পায়ে ঘরের বাইরে এসে দাঁড়ালেন। মাথার ওপরে উন্মুক্ত আকাশ। চারদিকে উঁচু পর্বতে ঘেরা দুর্গের মতন এ এক আশ্চর্য উপত্যকা। গাছপালা, নদী আর তপোবনের মতন সাজানো পরিচ্ছন্ন বাসভূমি। মুকেশ সেই দূষণহীন বাতাসে প্রাণ ভরে প্রশ্বাস নিলেন। তারপর বললেন, 'আমাকে মৃত্যুদণ্ড দিলেও আমার আক্ষেপ নেই আর। যে গুপ্ত ইতিহাসের সন্ধানে পাহাড়, নদী, হিমবাহ ডিঙিয়ে মাসের পর মাস, বছরের পর বছর ঘুরে বেড়িয়েছি, তার সন্ধান অবশেষে আমি পেয়েছি। আমি তৃপ্ত।'
রাজবৈদ্য মুকেশের পাশে এসে দাঁড়ালেন। তারপর অত্যন্ত বিনীতভাবে বললেন, 'মৃত্যুদণ্ডই যদি ধার্য হত আপনার জন্যে, তাহলে আপনাকে এত কষ্ট করে বাঁচিয়ে তুলতাম না। আমাদের এই প্রদেশ অবশিষ্ট মনুষ্যসভ্যতা থেকে বিচ্ছিন্ন বটে, কিন্তু বহির্বিশ্বের কোনো খবরই আমরা রাখি না, এমন ভেবে বসবেন না যেন। গুপ্ত পথে পাহাড়ি গ্রামগুলোয় নিয়মিত যাতায়াত আছে আমাদের। এমনকি আমাদের প্রভু দুর্যোধনের মন্দিরে নিত্যদিন পূজা করে আসি আমরা পালা করে। গোপনে। লোকচক্ষুর অন্তরালে। শুধুমাত্র বিশ্বস্ত রাওয়াইরাই আমাদের গতিবিধি সম্পর্কে সচেতন। আর কেউই এ কথা জানে না। জানবেও না কখনও।'
'মৃত্যুদণ্ড না দিয়ে আমাকে কি আপনাদের দাস বানাতে চান?'
'না।'
'তাহলে?'
'এই মুহূর্তে আমরা আপনার সাহায্যপ্রার্থী।'
'কী সাহায্য জানতে পারি?'
'জানাবো। তার আগে আপনি কিছু খেয়ে নিন। গায়ে স্বাভাবিক শক্তি ফিরে এলে এই এলাকা, এখানকার গাছপালা, ঘাস, মাঠ, ফুল সব ঘুরিয়ে দেখাবো আপনাকে। আমরা আপনাকে শনাক্ত করতে পেরেছি। বিশ্বস্ত রাওয়াইদের কাছে আমরা শুনেছি হিমালয়ের গাছপালা সম্পর্কে প্রচুর খোঁজ রাখেন আপনি। তাদের গুণাগুনও আপনার নখদর্পণে। সেইসব গাছগাছড়া থেকে আপনার তৈরি ওষুধ ওসলা ও তার আশেপাশের গ্রামে অনেককেই নাকি অলৌকিক আরোগ্য দিয়েছে। প্রাচীনকাল থেকেই এখানে প্রচুর ওষধি আছে, যাদের সম্পর্কে আমি নিজেও ওয়াকিবহাল নই এখনও। আমরা চাই সেই গাছগাছড়া পর্যবেক্ষণ করে আপনি আমাদের রাজার জন্যে দীর্ঘতর জীবনের উপযোগী কোনো ঔষধ প্রস্তুত করুন।'
'আমি?' অবাক হয়ে বলেন মুকেশ।
'হ্যাঁ। আপনিই', সম্ভ্রমের সঙ্গে বলেন রাজবৈদ্য, 'এই গুহানদী আমাদের কাছে অতি পবিত্র। এই নদীপথে কেউ কখনও এই রাজ্যে ঢুকতে পারেনি। আমাদের এখানে প্রাচীন কিংবদন্তি আছে, রাজার সংকটে এই গুহানদী বেয়েই আসবেন তাঁর রক্ষাকর্তা। কোনো সন্দেহ নেই, আপনিই সেই ত্রাণকারক।'
মুকেশ হাঁ করে শুনছিলেন রাজবৈদ্যের কথা। তিনি তাঁর কথার প্রতিবাদ করলেন না। মনে মনে ভাবলেন, এই মুহূর্তে নিজের প্রাণরক্ষার এটাই উৎকৃষ্ট উপায়।
'কিন্তু রাজা অশ্বত্থামা তো অমর, অন্তত মহাভারতে তাই তো লেখা আছে দেখেছি আমরা। সেই তিনিই যদি এখানকার রাজা হন তাহলে তাঁর দীর্ঘ জীবন নিয়ে আপনাদের এমন সংশয় থাকার তো কথা নয়...' মুকেশ জিজ্ঞেস করলেন অবাক হয়ে।
'এই প্রশ্নের উত্তর মহারাজ নিজেই আপনাকে দেবেন', বলে হাতে তালি দিয়ে তিনি অনুচরদের ডেকে নিয়ে আদেশ দিলেন মুকেশজির জন্যে খাবার আনতে। তারপর আবার মুকেশের দিকে ফিরে বললেন, 'আমি একটু পরে আবার আসছি। প্রভু দুর্যোধনের অসীম শক্তিশালী গদাকে প্রণাম করে আপনাকে রাজ সন্দর্শনে নিয়ে যাব আমি।'
রাজবৈদ্যের সঙ্গে ঘুরতে ঘুরতেই মুকেশ জানলেন এই গুপ্ত জনপদের নাম কৌরবক্ষেত্র। জনপদটি খুব বড় নয়, কিন্তু চারদিকে পর্বতের পাঁচিল দেওয়া এই উপত্যকা অত্যন্ত উর্বর। এখানে কৃষি এবং পশুপালনই প্রধান জীবিকা। উপত্যকার একপ্রান্তে ঘন অরণ্য। নানান বৃক্ষ, গুল্ম ও লতায় আচ্ছাদিত সেই অরণ্য থেকে কৌরবক্ষেত্রের মানুষ চিরকাল পেয়ে এসেছেন জ্বালানি, ঔষধ, এবং সুস্বাদু নানা ফলও। শিকারের পশুও তারা পায় এই অরণ্যের মধ্যেই। কৌরবক্ষেত্রের মানুষ শুধু খাদ্যের জন্যেই পশুহত্যা করেন। নিছক আনন্দের জন্যে মৃগয়া এখানে নিষিদ্ধ। এই জনপদে পাথরের তৈরি নানান গৃহস্থালির সামগ্রীও তৈরি করেন কেউ কেউ। পাহাড় খনন করে সুড়ঙ্গপথ নির্মাণে এঁরা অত্যন্ত দক্ষ। সেইসব সুড়ঙ্গপথেই বহির্জগতের সঙ্গে এঁদের যোগাযোগ এবং পণ্যের আদানপ্রদান। নিজেরা কৌরবক্ষেত্রের বাইরে বিচরণ করলেও অবশিষ্ট পৃথিবীর কাছে নিজেদের এই উপত্যকাকে পুরুষানুক্রমে গোপন রেখেছেন এঁরা সব্বাই।
কৌরবক্ষেত্রের মধ্যে দিয়েই গুহা থেকে বেরিয়ে আসা সেই পবিত্র নদী বয়ে গেছে অপর একটি পর্বতের দিকে। সেই চওড়া স্রোতস্বিনী নদীর পাশেই পাহাড়ের গা ঘেঁষে একটি বিশাল গুহামন্দির। গুহার সামনে কাঠের অপূর্ব কারুকার্য করা তোরণ ও প্রবেশদ্বার।
রাজবৈদ্য বললেন, 'আসুন'।
তাঁর সঙ্গে এগিয়ে গিয়ে ডক্টর চতুর্বেদী দাঁড়ালেন সেই গুহামন্দিরের প্রবেশদ্বারের সামনে। গুহার ঠিক মাঝখানে পাথরের উঁচু বেদি। সেই বেদির ওপরে আরও একটি আশ্চর্য পাথরখণ্ড। সেই বিশাল পাথরখণ্ডের ওপর দিক প্রশস্ত ও চ্যাপ্টা। নীচের দিকে ক্রমশ সরু হয়ে ছুঁচলো শেষ ভাগ আয়তাকার পাথরের বেদির মধ্যে ঢুকে গেছে। অনেকটা সাঁওতালদের বাদ্যযন্ত্র ধামসার মতন দেখতে সেই শঙ্কু আকৃতির পাথরের ওপরে মোটা সোনার আংটায় আটকে শুইয়ে রাখা আছে মস্ত এক গদা। সোনায় মোড়া। তার ওপরে অসংখ্য দামি আর দৃষ্টিনন্দন রত্নরাজির কারুকার্য। পুরোহিতের পোশাক পরা দুজন মানুষ মস্ত কাঠের হাতলের সাহায্যে একটি নির্দিষ্ট অভিমুখে গদাসহ সেই শঙ্কু আকৃতির পাথরখণ্ডটিকে ক্রমান্বয়ে ঘুরিয়ে চলেছেন। একবার জোরে ঘুরিয়ে দিলেই কুমোরের চাকের মতন বনবন করে ঘুরতে শুরু করছে সেই পাথর। ঘূর্ণনের গতি কমে এলেই আবার সেটি ঘুরিয়ে দিচ্ছেন তাঁরা। এই ঘূর্ণায়মান বেদি, আর তার ওপরের নিরন্তর ঘুরতে থাকা সেই গদাটির পিছনেই এক স্বর্ণ সিংহাসন। সিংহাসনের ওপরে ভেলভেটের মতন নরম আর উজ্জ্বল কাপড়ের ওপরে রাখা রয়েছে এক অপূর্ব সুন্দর স্বর্ণমুকুট। রত্নমালিকায় ঘেরা।
মুকেশ বিস্ময়ে হতবাক হয়ে সেই দৃশ্য দেখছিলেন। রাজবৈদ্য নির্দেশ দিলেন, 'প্রণাম করুন। এই সিংহাসন, এই রাজমুকুট, এই প্রচণ্ড শক্তিশালী গদা, সবকিছুই স্বয়ং মহারাজ দুর্যোধনের। এই রাজমুকুট ও অলৌকিক গদাকে সাক্ষী রেখে রাজা দুর্যোধনের নামেই চিরকাল অশ্বত্থামারা এই রাজ্য শাসন করে এসেছেন...'
'অশ্বত্থামারা বলছেন কেন? অশ্বত্থামা কি একজন ব্যক্তি নন?' অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করেন মুকেশ। রাজবৈদ্য সে প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে চোখ বন্ধ করে প্রণামের ভঙ্গিতে বুকের কাছে দু-হাত জড়ো করেন। মুকেশ নিজেও প্রণাম করেন। এক অদ্ভুত রোমাঞ্চ অনুভব করছেন তিনি শরীরে। নিজের চোখে যা দেখছেন, বিশ্বাস হচ্ছে না। মনে হচ্ছে একটা স্বপ্ন দেখছেন তিনি দীর্ঘ সময় ধরে। সেই অদ্ভুত ঘোরের মধ্যে থেকেই বলে উঠলেন তিনি, 'গদাসহ পাথরের বেদিটা অমন করে ঘোরানো হচ্ছে কেন সর্বক্ষণ?'
'নিয়ম', চোখ খুললেন রাজবৈদ্য, 'আদি অনন্তকাল ধরে অমন করেই ঘুরে চলেছে গদাটি। এক মুহূর্তের জন্যেও থামেনি। বারো মাস চব্বিশ ঘণ্টা পালা করে ঘোরাতে হয় ওই পাথরটিকে। যুগ যুগ ধরে এমনই নির্দেশ। কেন এই নির্দেশ আমরা জানি না। শুধু জানি এই নির্দেশ অমান্য করলে ঘোর সংকট। সঞ্চালন থেমে গেলে ওই গদা তার অলৌকিক শক্তি হারিয়ে ফেলবে।'
'কী অলৌকিক শক্তি?'
রাজবৈদ্য নীরব থাকলেন। মুকেশ বললেন, 'আমি কি গুহায় ঢুকে সামনে গিয়ে দেখতে পারি গদাটিকে?'
'না', মাথা নাড়লেন রাজবৈদ্য।
কেন?'
'নিয়ম নেই। এই পোশাকে এভাবে আপনি গুহামন্দিরে ঢুকতে পারবেন না। তাতে রাজা দুর্যোধনের অসম্মান হবে। তাঁর কাছে যেতে গেলে শরীরে কোনো ধাতব বস্তু রাখা চলে না। হার, কুণ্ডল, অঙ্গুরীয় সব খুলে কেবলমাত্র প্রয়োজনীয় কাপড়টুকু পরে নগ্ন পায়ে এই ঘরে ঢুকতে হয়। তারপর শুধু দূর থেকে প্রণাম করা। এই গদা স্পর্শ করা নিষেধ', বলেই পিছু ফিরলেন তিনি, 'আসুন, আমরা রাজা অশ্বত্থামার কাছে যাই এইবার। তিনি আপনার জন্যে অপেক্ষা করছেন।'
'চলুন', বলে তাঁকে অনুসরণ করেন মুকেশ।
পণ্ডিতজি এবং চক্রু সিং সকালেই ফিরে গেছে। সঙ্গে নিয়ে গেছে তাদের থাকবার তাঁবু আর প্রয়োজনীয় রেশন। নিজেদের রুকস্যাক নিজেদেরকেই বইতে হচ্ছে এখন। শাওনের ব্যাগটা ছোট। তবু বেশ কষ্ট হচ্ছিল তার। পরিদাদু একবার বলেছিলেন, 'আমায় দিয়ে দে শানু। তুই পারবি না'। শাওন রাজি হয়নি। নিজের রুকস্যাক পরিদাদুকে দিয়ে বইয়ে নেবার প্রশ্নই ওঠে না। সারাদিন হেঁটে সন্ধের আগে আগে রডোডেনড্রনে ভরা একটা পাহাড়ি ঢালের কাছে পৌঁছে পরিদাদু যখন বললেন, 'আজ এখানেই থামা যাক', শাওন যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচল। সকলেই ভীষণ ক্লান্ত ছিলেন। সুবিধামতন একটা জায়গা দেখে তাঁবু ফেলে শুকনো খাবার দাবার যা ছিল তাই দিয়েই কোনোমতে রাতের খাওয়া সেরে স্লিপিং ব্যাগে ঢুকে পড়লেন সক্কলে।
একদম কাকভোরে রওনা দেওয়া হল আবার। বেশ কিছুটা পথ পাইন, ওক, আর দেবদারুর ঘন জঙ্গলে মোড়া। শাওন নীচু গলায় পরিদাদুকে জিজ্ঞেস করল, 'আচ্ছা পরিদাদু, এই জঙ্গলে বন্য জন্তু জানোয়ার থাকে নিশ্চয়ই?'
'তা থাকতেই পারে', পরিদাদু শাওনের কাঁধে ডান হাত রাখলেন, 'যে রাস্তা দিয়ে প্রথম দিন সীমা গ্রামে পৌঁছেছিলাম, সেখান থেকে শুরু করে এই উঁচু পাহাড়ি জঙ্গলের সমস্তটাই গোবিন্দ পশু বিহারের অন্তর্গত। ইংরেজিতে এই জঙ্গলের নাম গোবিন্দ ওয়াইল্ড লাইফ স্যাংচুয়ারি অ্যান্ড ন্যাশানাল পার্ক। সাড়ে নশো বর্গকিলোমিটারেরও কিছু বেশি এই অরণ্যের বিস্তার। তেরোশ মিটার থেকে ছ হাজার তিনশো তেইশ মিটার উচ্চতা অবধি বিছিয়ে থাকা এই যে বিশাল জঙ্গল, তার মধ্যে সাড়ে তিন হাজার মিটারেরও বেশি অংশ বছরের অধিকাংশ সময়ে বরফে ঢাকা থাকে। দেড়শ প্রজাতির পাখি, হরিণ, পাহাড়ি ভেড়া এবং ছাগল ছাড়াও এই অঞ্চলে কালো ও বাদামি ভাল্লুক এবং লেপার্ডও আছে বলে শুনেছি।'
'ওরে বাবা', ভয় পাওয়া গলায় বলে শাওন।
পরিদাদু হাসেন, 'আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে দেখেছি, জঙ্গলের প্রাণীরা অহেতুক মানুষকে আক্রমন করে না, বরং প্রাণপণে মানুষের ছায়া এড়িয়ে বেঁচে থাকতেই স্বস্তি বোধ করে তারা', বলে অদ্ভুত চোখে শাওনের দিকে তাকালেন পরিদাদু। তারপর নরম এবং বিষণ্ণ গলায় বললেন, 'মানুষের চেয়ে হিংস্র এবং ধূর্ত প্রাণী জঙ্গলেও নেই রে শানু। প্রাণী হিসেবে আমরা বাঘ ভাল্লুকের থেকে অনেকই খারাপ।'
আজ সকাল থেকেই বিবেককে খুব চনমনে লাগছে। গত প্রায় ঘণ্টাখানেক ধরেই বিবেক সকলের সামনে সামনে চলছিলেন। দ্রুত পা ফেলে অন্যদের থেকে অনেকখানিই এগিয়ে রয়েছেন তিনি। নিখিলদাদু একবার সন্দিগ্ধ গলায় পরিদাদুকে জিজ্ঞেস করলেন, 'পরি, আমরা কি ঠিক পথে এগোচ্ছি? তোর তৈরি করা রুটম্যাপটা বিবেককে দেখিয়েছিলি তো?'
পরিদাদুর ঠোঁটের কোণে একটা রহস্যময় হাসি ফুটে উঠল। চাপা স্বরে বলে উঠলেন তিনি, 'আমার ধারণা যদি ঠিক হয়, তাহলে ডেভিড কোদালি আমাদের ঠিক পথেই নিয়ে যাচ্ছে।'
'ডেভিড কোদালি? সে আবার কে? কি হেঁয়ালি করছিস পরি?' ভয়ানক ভ্যাবাচ্যাকা খাওয়া গলায় বলে উঠলেন নিখিলদাদু।
'ডেভিড কোদালি মূলত দক্ষিণ ভারতীয়। বাবা কেরলিয়ন, মা অ্যাংলো। ভারতীয় প্রত্নবস্তু বিদেশে পাচারের একটা বড় চক্রের সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে যুক্ত লোকটা। বছর দেড় দুই আগে বাঁকুড়ার একটা মন্দিরের প্রাচীন রাধাগোবিন্দ মূর্তি চুরির নির্দিষ্ট অভিযোগে পুলিশ তাকে ধরার জন্যে জাল পেতেছিল, কিন্তু ডেভিড পুলিশকে বোকা বানিয়ে পালিয়ে যায়। তারপর থেকেই উধাও সে। কাগজে ডেভিডের ছবিসহ খবরটা বেরিয়েছিল। মনে আছে আমার। অবিশ্যি ডেভিডের সেই ছবির সঙ্গে বিবেকের এখনকার চেহারা মেলে না। তখন তার চোখে চশমা, নাকের নীচে পুরুষ্টু গোঁফ। হেয়ার স্টাইলও সিনেমার হিরোর মতন। বিবেক, ওরফে ডেভিড কোদালিই এডি নামে ডক্টর চতুর্বেদীর সঙ্গে কিছুদিন আগে এই অঞ্চলে এসেছিল লুকনো জনপদের সন্ধানে...'
'তোর ধারণা ভুলও তো হতে পারে পরি', কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলেন নিখিলদাদু, 'তুই যা বলছিস তা তো অসম্ভব মনে হচ্ছে আমার। বিবেকের মতন একটা ওয়েল ম্যানার্ড ছেলে...'
'আমার ধারণাটা ভুল নয় নিখিল', পরিদাদু হাসেন, 'আমি যথেষ্ট নিশ্চিত হয়েই কথাটা বলছি।'
'কীভাবে বুঝলে তুমি পরিদাদু?' জিজ্ঞেস করল শাওন। এতক্ষণ সে চোখ গোল গোল করে সব কথা শুনছিল চুপ করে। উত্তেজনায় গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠছিল তার।
'যাতে তাকে কেউ চিনে ফেলতে না পারে তার জন্যে চেষ্টার ত্রুটি করেনি ডেভিড। চুল দাড়ি কেটে ঝাঁ চকচকে লুক এনেছে চেহারায়। চুলের সিঁথি বাঁ দিক থেকে ডান দিকে করেছে। কিন্তু ওকে ডুবিয়ে দিল ঘাড়ের নীচ থেকে শুরু হওয়া বাঁ কাঁধের ওই জড়ুলটা।'
'ডেভিডের আইডেন্টিফিকেশন মার্ক হিসেবে কাগজে ওই জড়ুলটার কথা বলা ছিল। ওসলা গ্রামের লোকজনদের সঙ্গে কথা বলার সময়েও শুনলাম মুকেশ চতুর্বেদীর সঙ্গে থাকা আলুথালু চেহারার লম্বা চুল দাড়ি অলা সাহেবের ঘাড়ে কালো দাগের কথা... ছেলেটার দুর্ভাগ্য। ঘাড় ছাপানো লম্বা চুলও দাগটাকে আড়াল করতে পারল না কিছুতেই। পিছনে ঝুঁকে কাঁধ থেকে রুকস্যাক নামানোর সময় চুলের ফাঁক দিয়েই বেরিয়ে পড়তো দাগটা। আমার ধারণা এ নিয়ে তার তেমন সাবধানতাও ছিল না। ওসলার মতন অজ পাহাড়ি গ্রামে তার ঘাড়ের জড়ুল নিয়ে যে কেউ মাথা ঘামাবে না, এ ব্যাপারে সে নিশ্চিত ছিল...'
'কিন্তু তুই ওর ঘাড়ের জড়ুলের কথা কী করে জানলি?' নিখিলদাদু পরিদাদুর দিকে চোখ কুঁচকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, 'শুরু থেকেই তো দেখছি ঘাড় চাপা দেওয়া উইন্ড চিটার চাপানো ওর গায়ে...'
পরিদাদু হাসলেন, 'পরশুদিন হাঁটতে হাঁটতে টাল সামলাতে না পেরে যে পিছন থেকে বিবেকের জামা টেনে ধরে হুমড়ি খেয়ে পড়লাম জঙ্গলের রাস্তায়, সে কি এমনি এমনি?'
'তুই ইচ্ছে করে পড়েছিলি?'
'হ্যাঁ'।
'ওই দাগটা ওর কাঁধে আছে কিনা দেখার জন্যে?'
'হ্যাঁ?'
'তার মানে তুই ওকে আগে থেকেই সন্দেহ করেছিলি?'
'করেছিলাম।'
'হঠাৎ সন্দেহ করতে গেলি কেন? একটা কিছু কারণ থাকবে তো?'
'কারণ তো আছেই...' পরিদাদু বলে চললেন, 'প্রথমেই যেটা খটকা লেগেছিল, কিছুতেই শাঁকরিতে ও রুকস্যাক রাওয়াতের অফিসে রেখে আসতে রাজি হল না দেখে। মনে হল ব্যাগে কী এমন আছে ওর, যে আমরা সবাই রেখে এলেও নিজের ব্যাগ ঘাড়ে করে বয়ে নিয়ে এল ছেলেটা? আমি অনুসন্ধান করি। কাজটা অন্যায় হচ্ছে জেনেও ওকে জানতে না দিয়ে ওর ব্যাগে তল্লাশি চালাই আমি। আর অদ্ভুত একটা জিনিস পেয়েও যাই রুকস্যাকের সাইড পকেটে...'
'কী জিনিস?' জিজ্ঞেস করেন নিখিলদাদু।
'মুকেশ চতুর্বেদীর নোটবই। যে নোটবইতে এই অনুসন্ধানে আসার দিনপঞ্জিকা লিখে রাখছিলেন তিনি। প্রতি রাতে টেন্টে বসে তিনি সারাদিনের অভিজ্ঞতার সংক্ষিপ্ত বিবরণ লিখে রাখছিলেন। গতকাল আমরা যে অঞ্চলে হেঁটে বেড়িয়েছি প্রায় সেই পর্যন্ত বর্ণনা তাঁর ওই ছোট্ট নোটবইতে রয়েছে। তারপরেই সব ফাঁকা। ওই বইতেই দুটো ভূর্জপত্রে লেখা পুঁথির ছেঁড়া পাতা দেখতে পাই আমি। মনে প্রশ্ন আসে এই জিনিস বিবেকের ব্যাগে কী করে আসতে পারে? তখনই সম্ভাবনাটা মাথায় এল। এই সেই এডি নয় তো, যিনি মুকেশের সঙ্গী হয়েছিলেন এই দুর্গম পথে? ধারণাটা দৃঢ় হল যখন মনে পড়ল, অসতর্কতায় কথার মাঝে বিবেক নিজেই না একদিন এই নিষিদ্ধ পাহাড়ের ধ্বংসাবশেষের কথা বলেছিল। এ কথা ও তো জানতেই পারে না, যদি না নিজে সেখানে গিয়ে থাকে... আজ আর কোনো সংশয়ই রইল না যখন দেখলাম চেনা রাস্তায় হাঁটার মতন বিবেক নিজে নিজেই এগিয়ে গেল আমাদের সকলকে পেরিয়ে...'
'ও মাই গড', অস্ফুটে বলে উঠলেন নিখিলদাদু, 'আমার বাড়ির চুরিটাও কি তাহলে...'
'সম্ভবত ডেভিডই। ভূর্জপত্রের বাকি টুকরোগুলোর খোঁজে...'
'কিন্তু একটা প্রশ্ন তবু থেকেই যাচ্ছে পরি...'
'কী?'
'মুকেশজির কী হল তাহলে?'
'সেটা ডেভিড নিশ্চিত অনেকটাই জানে...'
'এখন তবে আমাদের কী করণীয়? ওকে চেপে ধরব সবাই মিলে? মুকেশ চতুর্বেদীর কথা জিজ্ঞেস করব?'
'না।'
'তাহলে?'
'আপাতত ওকে বুঝতে দেওয়া যাবে না যে ব্যাপারটা আমরা ধরে ফেলেছি। এখন আমাদের সামনে দুটো কাজ। ওর সঙ্গে বন্ধুত্বের সহজ সম্পর্ক বজায় রেখে সেই গোপন জনপদটিকে খুঁজে বের করে ডক্টর চতুর্বেদীর অসমাপ্ত কাজটাকে সম্পূর্ণ করা এবং মুকেশজির অন্তর্ধান রহস্যের সমাধান করার চেষ্টা করা।'
'মুকেশের ব্যাপারটা জানবি কেমন করে?'
'এই কাজটা আমার মনে হয় পুলিশই করে ফেলবে এইবার।'
'তোর কথা বুঝতে পারলাম না।'
'ডেভিডকে আপাতত বিবেক হিসেবেই আগলে নিয়ে ফিরতে হবে আমাদের। ফেরার পথে যেখানে প্রথম ফোনের টাওয়ার পাওয়া যাবে সেখান থেকেই পুলিশকে ডেভিডের ব্যাপারটা ইনফর্ম করতে হবে। তারপর পুলিশই ঠিক করবে কোথায় তারা আমাদের মিট করে হেফাজতে নেবে ডেভিডকে। এরমধ্যে আমরা নিজেরা যদি ডক্টর চতুর্বেদীর খোঁজ না পাই, আমার ধারনা ডেভিডকে জেরা করে পুলিশই তাঁর সম্পর্কে প্রয়োজনীয় তথ্য জেনে নিতে পারবে।'
'ফাইন', মাথা নাড়লেন নিখিলদাদু, 'আর একটা জিজ্ঞাসা।'
'কী?'
'ডেভিড নিজেই তো ফিরে আসতে পারত এখানে। একা একাই। খামোখা আমাকে জড়াতে গেল কেন সে?'
'দুটো স্পষ্ট কারণের কথা তো সহজেই বলা যায়।'
'যেমন?'
'এক, একা এই ধরনের অভিযানে বেরনো প্রায় অসম্ভব...'
'আর দুই?' পরিদাদুর কথার মাঝখানেই বলে ওঠেন নিখিল।
'এই অঞ্চলের রাস্তাঘাট সম্পর্কে ডেভিড নিজে খুব কনফিডেন্ট ছিল না। ডক্টর চতুর্বেদীর নোট এবং রুটম্যাপ দেখে আনাড়ি লোকের পক্ষে এই পাহাড় জঙ্গলের পথে এসে ওই জায়গা খুঁজে বের করা ভীষণই কষ্টকর...'
নিখিলদাদু আবারও কী একটা বলতে যাচ্ছিলেন। কিন্তু বিবেকের গলার আওয়াজে থেমে গেলেন তিনি। লোকটা খুব উত্তেজিত কণ্ঠে চিৎকার করে তাঁদের ডাকছিলেন বেশ কিছু দূরের রডোডেনড্রন ঝোপের ওপার থেকে।
বেশ বেলা হয়ে গেছে। ঝকঝকে রোদ্দুর খেলা করছে উপত্যকার সবুজ জুড়ে। একটা ছোট্ট বুগিয়ালের সামনে দাঁড়িয়েছিলেন পরিদাদুরা। তার ওপারেই একটা ঢালু সবুজ গাছে ঢাকা পাহাড় উঁচু হয়ে আকাশের দিকে উঠে গেছে। পাহাড়ের মাথাটা ন্যাড়া। সেখানে গাছ নেই কোনো। শাওন জানে ওখানে বরফ জমে থাকে বৃষ্টি হলেই। রোদ্দুর উঠলে সেই বরফই আবার মেঘ হয়ে আকাশে উড়ে যায়। ওই ঢালু পাহাড়ের একদিকে একটা বরফের ঝুলন্ত সেতু এই উপত্যকার সঙ্গে ওদিকের পাহাড়কে জুড়ে দিয়েছে। পরিদাদু বললেন, 'ওটা বহু প্রাচীন একটা হিমবাহ।'
বিবেক দৌড়ে পাহাড়টার কাছে এগিয়ে গিয়ে পাগলের মতন কী খুঁজতে লাগল গাছের ডাল, পাতা, লতা, গুল্ম সরিয়ে। পরিদাদু খুব শান্ত গলায় জিজ্ঞেস করলেন, 'কী খুঁজছেন বিবেক?'
'এখানেই কোথাও ছিল সেটা', উত্তেজিত গলায় বলে বিবেক।
'কী?'
'গুহার মুখ। সেখান থেকে পাথরের পথ চলে গেছে ভিতর দিকে। ওই পথ দিয়েই সেই জায়গায় পৌঁছতে হবে আমাদের।'
'কী করে জানলেন?' একটু হেসে জিজ্ঞেস করলেন পরিদাদু। বিবেক পরিদাদুর প্রশ্নে বেজায় থতমত খেয়ে গেল। নিখিলদাদু আর শাওনের মুখের ওপর দিয়ে একবার চোখ বুলিয়ে নিয়ে তিনি বলে উঠলেন, 'কাকার কাছে শুনেছিলাম বোধহয়...'
'তিনিই বা কী করে আগে থেকে জেনেছিলেন এ কথা? তাঁর কাছে থাকা পুঁথিতে লেখা ছিল বোধহয়?' ভালোমানুষের মতন মুখ করে বলে উঠলেন পরিদাদু। শাওন বুঝল ডেভিডকে বাঁচার রাস্তা পরিদাদুই দেখিয়ে দিলেন আপাতত ইচ্ছে করে। বিবেক কাঁচুমাচু মুখে বলে উঠলেন, 'তাই হবে মনে হয়...'
আশেপাশের গাছপালা থেকে একটা অদ্ভুত জংলি গন্ধ উড়ে আসছিল। এখন হঠাৎ করেই গম্ভীর শব্দে জঙ্গলে জঙ্গলে যেন একসঙ্গে অজস্র ঘণ্টা বেজে উঠল। এই ধরনেরই ঘণ্টার শব্দ শাওন ডুয়ার্সের জঙ্গলে গিয়ে শুনেছিল। পরিদাদু বলেছিলেন এই শব্দ আসলে এক প্রজাতির ঝিঁঝিঁর ডানা নাড়ার শব্দ। কিন্তু এই আওয়াজটা ঠিক সেরকম নয়। আলাদা। আরও গম্ভীর। কেমন যেন বুকের মধ্যে ভয় ধরিয়ে দিচ্ছে এই শব্দ। কারা যেন সতর্ক করে দিচ্ছে তাদের। এইদিকে এসো না। পাহাড়ের এই দিক নিষিদ্ধ। কারো আসতে নেই এই এলাকায়।
চারপাশ সাবধানে খুঁজে দেখতে দেখতে পরিদাদু বলে উঠলেন, 'এই যে। বিবেক দেখুন তো, এই পথই কিনা...'
নিখিল আর শাওন এগিয়ে গিয়ে দেখল পাহাড়ের ঢালে একটা গুহামুখ লতা পাতায় যত্ন করে চাপা দিয়ে রাখা। সেখান থেকে স্পষ্ট দুটো পথ গুহার মধ্যে দিয়ে দু দিকে চলে গেছে।
বিবেক সতর্ক ভঙ্গিতে বলে উঠলেন, 'এটাই হওয়া উচিত...'
'তাহলে ভিতরে ঢোকা যাক, কী বল নিখিল?' পরিদাদু বললেন।
'চল', নিখিল পা বাড়ালেন গুহার দিকে। বিবেক উইন্ড চিটারের ওপর দিয়েই নিজের কোমরের কাছে অহেতুক হাত বুলিয়ে নিলেন কয়েকবার। তারপর নিশ্চিন্ত ভঙ্গিতে বললেন, 'চলুন। এগিয়ে যাই আমরা।'
নিখিলদাদুই প্রথম পা বাড়িয়েছিলেন গুহার দিকে। হঠাৎই গুহার মধ্যে থেকে একটা চাপা গর্জনের মতন আওয়াজ শুনে তিনি চমকে বাইরে বেরিয়ে এলেন। ওই শব্দের প্রতিধ্বনিরই মতন আর একটা আওয়াজ ছিটকে এল গুহার ঠিক ওপরের ঢালু পাহাড়টা থেকেও। প্রায় একই সঙ্গে বাদামি লোমঅলা ভাল্লুক দুটো লাফিয়ে পড়ল বিবেক আর পরিদাদুর ওপরে। টাল সামলাতে না পেরে পাহাড়ের ঢাল বেয়ে গড়িয়ে গেলেন তাঁরা দুজনেই। নীচের দিকে।
বিবেকের বুকের ওপরে চেপে বসেছে একটা ভাল্লুক। আর একটা ঝুঁকে আছে পরিদাদুর মুখের ওপরে। ভয়ে নিখিলদাদুর মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেছে। শাওনও ভয় পেয়ে গেল ভীষণ। অসহায় মনে হল নিজেকে। বিবেক চোখ বন্ধ করে ফেলেছেন আতঙ্কে। শাওনের মনে হল পরিদাদু দু-চোখে বিস্ময় নিয়ে তাকিয়ে রয়েছেন তাঁর ওপরে ঝুঁকে থাকা ভাল্লুকটার মুখের দিকে। পরিদাদুর বুকের কাছে জামাটা দু-হাতের বড় নোখ দিয়ে ছিঁড়ে ফেলার চেষ্টা করছে এখন জানোয়ারটা। বিবেক প্রাণপণে হাতটা নীচের দিকে নামিয়ে কোমরের দিকে নিয়ে যাবার চেষ্টা করেও পারছে না। কী করবে বুঝতে না পেরে দাঁড়িয়ে ছিল শাওন। হঠাৎই শাঁকরি থেকে রওনা হবার সময়ে পুলক সিং এর স্ত্রীর দেওয়া পরামর্শের কথা মনে পড়ে গেল শাওনের। পথের সেই পাহাড়ি মহিলার দেওয়া হারটা দু-হাতে আঁকড়ে ধরে সে চিৎকার করে উঠল, 'লব কুশ মহারাজ, দুর্যোধন মহারাজ, হে রাজা অশ্বত্থামা, রক্ষা করুন আমাদের। আপনারা আমার পরিদাদুকে এই ঘোর বিপদ থেকে রক্ষা করুন।'
মুহূর্তের মধ্যে ম্যাজিকের মতন কয়েকটা ঘটনা ঘটে গেল। দুটো ভালুকই বিদ্যুতের বেগে শাওনের দিকে ঘুরল একসঙ্গে। শাওনের হাতে ধরে থাকা হারটা চোখে পড়ল তাদের। পরিদাদুর মুখের কাছে ঝুঁকে পড়া ভাল্লুকটা পরিদাদুর গলায় ঝোলানো মালাটা হাত দিয়ে নেড়েচেড়ে দেখল কয়েকবার। তারপর দু-পায়ে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে একবার পরিদাদুর দিকে, আর একবার শাওনের দিকে চেয়ে মাথা ঝুঁকিয়ে সম্মান জানালো তাদের। নিখিলদাদু অবাক হয়ে তাকিয়ে ছিলেন সেইদিকে। পরিদাদু মাটি থেকে উঠে একটু ধাতস্থ হয়ে বললেন, 'শুরুতেই সন্দেহ হয়েছিল আমার। এদের হাবভাব, আকার, লাফিয়ে পড়ার ভঙ্গি, কোনোটাই ঠিক পাহাড়ি ভালুকের মতন নয়। সত্যি সত্যিই হিমালয়ান ব্রাউন বিয়ার হলে ওরা অযথা সময় নষ্ট করত না, আমাদের ছিঁড়ে ফালা ফালা করে ফেলত এতক্ষণে...'
বিবেকও নিজেকে সামলে নিয়েছেন তখন। লোকদুটো ভালুকের চামড়া মাথা থেকে একটু সরিয়ে গাড়োয়ালি ভাষায় বলল লজ্জিতভাবে, 'রাওয়াইদের সর্বোচ্চ সুরক্ষা আপনাদের সঙ্গে রয়েছে জানা ছিল না। আমাদের ক্ষমা করবেন বন্ধু। এখন বলুন কী চান আপনারা? এই নিষিদ্ধ অঞ্চলে কেন এসেছেন? কোনো বিশেষ কারণে কি রাওয়াই সর্দার মহারাজ অশ্বত্থামার কাছে দূত হিসেবে পাঠিয়েছেন আপনাদের?'
'হ্যাঁ', বেমালুম মাথা নেড়ে বলে দিলেন পরিদাদু।
'মহারাজ অশ্বত্থামা বছরের একটি নির্দিষ্ট সময়ে তো রাওয়াইদের কাছে কর সংগ্রহে যান। তাঁর কাছে যা বলার তা তো সেইসময়েই বলার কথা রাওয়াইদের। তাহলে এখন তারা আপনাদের কেন পাঠিয়েছে?'
'প্রয়োজনটি বিশেষ এবং সেই প্রয়োজনের কথা আমরা মহারাজকেই বলতে চাই', খুব বিনীতভাবে বললেন পরিদাদু।
'বেশ', মাথা নাড়িয়ে সম্মতি দিল তারা, 'কিন্তু প্রথা অনুযায়ী আমরা আপনাদের চোখ বেঁধে নিয়ে যাব। আমরা দু-হাত দিয়ে দু জনের বাহু স্পর্শ করে থাকব। আপনাদের দু-হাত বাঁধা থাকবে পিছন দিকে করে, যতক্ষন না আমরা সেখানে পৌঁছচ্ছি।'
'আমরা রাজি'। বিবেক কী একটা বলতে যাচ্ছিলেন। তাঁকে বলতে না দিয়েই বলে উঠলেন পরিদাদু।
'আর একটা কথা', ভালুকবেশধারীদের একজন বলে উঠল।
'কী কথা?' জিজ্ঞেস করলেন নিখিল।
'আপনাদের বাইরের পৃথিবীতে ফিরে আসাটা রাজা অশ্বত্থামার ইচ্ছাধীন।'
গা শিউরে উঠল শাওনের। ফিরতে না পারলে মা বাবা বন্ধুদের সঙ্গে তার আর দেখা হবে না কোনোদিন। নিখিলদাদু চাপা গলায় বললেন, 'কী করবি পরি?'
'এই আশ্চর্য অজানা রাজ্যে প্রবেশ করার এমন সুযোগ আর কখনও পাবি না নিখিল', পরিদাদু উত্তর দিলেন।
''ঠিক', তাঁর কথায় সম্মতি জানালেন নিখিলদাদু।
'বিবেক রাগ রাগ গলায় বললেন, 'চিন্তা করবেন না, আমাদের আটকে রাখার সাধ্য এই গাঁইয়াদের নেই।'
পরিদাদু তাঁর কথায় আমলই দিলেন না। খুব নরম গলায় তিনি বলে উঠলেন, 'আমরা রাজি।'
দীর্ঘ অন্ধকার গুহাপথ শেষ হয়েছে আলো নিভে যাবার কিছুক্ষণ আগে। লোকচক্ষুর অন্তরালে থাকা, চারদিক থেকে পাহাড়ে ঘেরা এই অদ্ভুত উপত্যকার একটা পাথরের ঘরে চারজনকে রেখে গেছে ওরা। দরজায় আগল দিয়ে দিয়েছে বাইরে থেকে। অর্থাৎ চারজনেই এখন বন্দি। নিজের ইচ্ছেয় ঘর থেকে বেরনোর কোনো উপায় নেই। ঘরের লাগোয়া একটি শৌচাগার। সেখানে পাথরের পাত্রে নদীর জল তুলে দিয়ে গেছে ওরা। খাবার জলও রেখে গেছে ঘরে। একটু আগেই রাতের খাবার দিয়ে গিয়েছিল একজন। সঙ্গে গায়ে দেবার কম্বল।
আকাশ এখানে অপরিসর। চারদিক থেকে পাহাড়ের পাঁচিল আড়াল করে রেখেছে তাকে। তারই মধ্যে যেটুকু আকাশ দেখা যাচ্ছিল, সেখানে তারা ফুটেছে এখন। সন্ধে থেকে ঝিরিঝিরি বৃষ্টি পড়ছিল। এখন তাহলে মেঘ কেটে গেছে। পরিদাদু, নিখিলদাদু, ডেভিড সকলেই ঘুমিয়ে পড়েছে। তাদের নিঃশ্বাসের শব্দ শুনতে শুনতেই বাইরের আকাশের দিকে তাকিয়ে ছিল শাওন। কাল মহারাজা অশ্বত্থামার সঙ্গে দেখা হবে তাদের। মহাকাব্যের এক কিংবদন্তি চোখের সামনে ধরা দেবেন কাল। কথাটা মনে হতেই গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠল শাওনের। সেই সম্ভাব্য সাক্ষাৎকারের কথা ভাবতে ভাবতেই একসময় সে নিজেও ঘুমিয়ে পড়ল।
সকালটা বেশ সুন্দর। ঝকমকে রুপোলি রোদ্দুরে ভেসে যাচ্ছে চারদিক। পাহাড়ের মাথায় মাথায় জমে থাকা বরফ সেই রোদ্দুরে ঝলমল করছে। পরিদাদু সেদিকে তাকিয়ে বলে উঠলেন, 'অপূর্ব'।
নিখিলদাদু উৎসাহিত গলায় বললেন, 'ভাবতে পারিস পরি, এমন আস্ত একটা জনপদ এত যুগ ধরে মানুষের অজানাই থেকে গেছে। আমাদের আগে কেউ জানতেই পারেনি এই জনপদ আর এই আশ্চর্য জনজাতির কথা...'
'ভুল করছিস', মাথা নাড়লেন পরিদাদু, 'কেউ জানে না তা নয়। কেউ কেউ জানে। অন্তত রাওয়াইদের মধ্যে কেউ কেউ যে জানে, এ বিষয়ে তো সন্দেহই নেই আর। কিন্তু আমি অবাক হচ্ছি সেই রাওয়াইদের সততা আর আনুগত্যের কথা ভেবে। শতাব্দীর পর শতাব্দী এরা নিষ্ঠার সঙ্গে এই উপত্যকার গোপনীয়তা রক্ষা করে এসেছে।'
'ঠিক'। পরিদাদুর কথায় সায় দিলেন নিখিল।
সকালে প্রয়োজনীয় কাজ সেরে খাবার দাবার খাওয়ার পর একজন এসে ডাকল শাওনদের। মাথা নীচু করে অভিবাদন করে বলল, 'মহারাজ অশ্বত্থামা আজই আপনাদের সঙ্গে দেখা করতে চেয়েছেন। আগামীকাল বিশেষ তিথি। এই তিথিতে ওসলায় মহারাজা দুর্যোধনের প্রাচীন মন্দিরে পুজো দিয়ে তিনি প্রজাদের কাছে কর সংগ্রহে বেরোবেন।'
'কিন্তু ওসলা তো এখান থেকে অনেক দূর?' নিখিলদাদু বলে উঠলেন।
'দূরই বটে', লোকটি হেসে উঠল, 'কিন্তু আমাদের ভূ-গর্ভের গোপন পথে সেইসব দূরকে আমরা বহুকাল আগেই কাছে এনে ফেলেছি। কৌরবক্ষেত্র থেকে, সেই পথে একদিনের মধ্যে ওসলা গিয়ে আবার ফিরেও আসা যায় ইচ্ছে করলে।'
'অবিশ্বাস্য', পরিদাদু মুগ্ধ বিস্ময়ে বলে উঠলেন।
লোকটি আবার বলতে শুরু করল, 'রীতি অনুযায়ী, যাত্রার আগের দিন, অর্থাৎ আজ, রাজা আমাদের প্রভু দুর্যোধনের গদা দর্শন করে তাঁকে প্রণাম জানাবেন। সেই অলৌকিক গদার কাছে প্রার্থনা জানাবেন যাতে তাঁর অনুপস্থিতিতে এই কৌরবক্ষেত্র সুরক্ষিত থাকে। গুহামন্দির থেকে ফিরে তিনি আপনাদের সঙ্গে কথা বলবেন।'
'গুহামন্দির? কোথায় সেটা? কী আছে সেখানে?' এতক্ষণে বিবেক এদিকে চাইলেন। প্রশ্ন করলেন তিনি লোকটিকে।
'এই গুহামন্দির বহু প্রাচীন', লোকটি বলতে শুরু করল, 'আপনাদের কাছে যেহেতু রাওয়াইদের সর্বোচ্চ সুরক্ষা আছে, আমরা ধরে নিচ্ছি আপনারা সৎ এবং নির্লোভ। আমাদের গোপনীয়তার প্রতি আপনারা শ্রদ্ধাশীল এবং এই গোপনীয়তা রক্ষার বিষয়ে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। প্রধান অশ্বত্থামাজি সেই দূর অতীতে এই মন্দির প্রতিষ্ঠা করে এখানে পরাজিত মহারাজ দুর্যোধনের ব্যবহৃত গদা এবং রাজমুকুট সংরক্ষণের ব্যবস্থা করেছিলেন। সিংহাসনে ওই রাজমুকুট রেখে এখনও অশ্বত্থামারা রাজা দুর্যোধনের নামেই শাসন করেন এই ভূখণ্ড। আদি অশ্বত্থামা এই জনপদ স্থাপনের পর অন্তর্হিত হয়েছিলেন। আজ পর্যন্ত ফেরেননি তিনি। আমরা কৌরবক্ষেত্রের মানুষ যুগ যুগ ধরে বিশ্বাস করে আসছি একদিন তিনি ফিরবেন। কেননা তিনি অমর। যতদিন তিনি না ফেরেন, এই কৌরবক্ষেত্রেরই বিশেষ চিহ্নযুক্ত একজনকে আমরা অশ্বত্থামা হিসেবে বরণ করে নিই। সর্দার হিসেবে তিনিই আদি অশ্বত্থামার নামে আমাদের শাসন করেন। বংশপরম্পরায় এই প্রথা শ্রদ্ধার সঙ্গে মেনে চলেছি আমরা।'
'আমরা ওই মন্দিরে যেতে পারি না?' বিবেক আগ্রহভরে জিজ্ঞেস করলেন।
'নিশ্চয়ই পারেন', মাথা নাড়ল লোকটি।
'তাহলে আমরা আগে মন্দিরেই যাই', আবার বলেন বিবেক, 'ওখানে গিয়ে আমরাও বরং সেই রাজমুকুট আর গদাকে শ্রদ্ধা জানিয়ে আসি। তাছাড়া মহারাজের সঙ্গেও আমাদের ওখানেই দেখা হয়ে যেতে পারে।'
'সেই ভালো', লোকটি বিবেকের প্রস্তাবে সায় দেয়, 'গুহামন্দিরে প্রণাম করে তারপরেই রাজগৃহে প্রবেশ করা রীতিসম্মত।'
'মহারাজ কি একাই মন্দিরে আসবেন, নাকি সঙ্গে সশস্ত্র প্রহরীরাও থাকবেন?' আবার জিজ্ঞেস করেন বিবেক।
পরিদাদু চোখ সরু করে চাইলেন বিবেকের দিকে। শাওন দেখল পরিদাদুর কপালে ভাঁজ। মুখটাও অসম্ভব গম্ভীর হয়ে গেছে তাঁর। লোকটি বলল, 'আমাদের কৌরবক্ষেত্রের মানুষেরা নীতিবিরুদ্ধ কাজ করে না কখনও। হিংসা ও প্রতারণারও কোনো স্থান নেই এখানে। এই উপত্যকায় রাজা সর্বদাই বিপদমুক্ত এবং আদরণীয়।'
কৌরবক্ষেত্রের মধ্যে দিয়ে প্রবল বেগে বয়ে চলা বেশ চওড়া একটি নদীর পাশে এই গুহামন্দির। পায়ের জুতো খুলে পরিদাদুরা মন্দিরের সামনের চাতালের ওপরে উঠে এলেন। সামনেই গুহার মধ্যে গর্ভমন্দির। শঙ্কু আকৃতির পাথরের বেদীর ওপরে শোয়ানো মস্ত গদাটি সারাক্ষণ আবর্তিত হচ্ছে একটি নির্দিষ্ট অভিমুখে। সেই বেদির ওপরেও গুহার ছাদে একটা মস্ত আয়তাকার কালচে পাথর আটকে আছে চাঁদোয়ার মতন। আর বেদির পিছনেই রত্ন সিংহাসন। তার ওপরে শোভা পাচ্ছে মণিমাণিক্য খচিত স্বর্ণমুকুট। বিবেক অস্ফুটে বলে উঠলেন, 'ওয়ান্ডারফুল'।
শাওনের মনে হল তাঁর চোখদুটো যেন অতিরিক্ত চকচক করছে এখন।
সঙ্গের লোকটি নদীর দিকে ফিরে জোড়হাত কপালে ঠেকিয়ে প্রণাম করে বলল, 'এই নদী আমাদের কাছে খুব পবিত্র। এই নদীপথেই আমাদের রাজার ত্রাণকারক এসে পৌঁছেছেন কৌরবক্ষেত্রে। উপযুক্ত লক্ষণ যুক্ত পরবর্তী অশ্বত্থামা খুঁজে না পাওয়া পর্যন্ত বর্তমান অশ্বত্থামাকে জীবিত ও সুস্থ রাখার দায়িত্ব তিনি নিয়েছেন। রাজা দুর্যোধনের কৃপায় মাত্র কয়েক মাসের মধ্যেই রাজার স্বাস্থ্য উদ্ধার করেছেন তিনি এই কৌরবক্ষেত্রেরই কিছু আশ্চর্য উদ্ভিদ থেকে নির্মিত ঔষধের সাহায্যে।'
'কে তিনি?' অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন নিখিলদাদু।
'তিনি কৌরবক্ষেত্রের বাইরের পৃথিবীর মানুষ...' বলতে বলতেই সসম্ভ্রমে ডান দিকে সরে গেলেন তিনি। একটা চাপা গুঞ্জন উঠল পিছন দিকে। সেদিকে তাকিয়ে লোকটি বলল, 'ওই যে মহারাজ অশ্বত্থামার সঙ্গে অশ্বারোহণে তিনি এদিকেই আসছেন...'
লোকটার দৃষ্টি অনুসরণ করে পিছন ফিরতেই সকলে দেখতে পেলেন পাশাপাশি দুটি ঘোড়ায় এগিয়ে আসছেন দুই পুরুষ। তাঁদের একজন মাঝারি উচ্চতার এক সৌম্যদর্শন প্রৌঢ়, আর একজনের দীর্ঘ বলিষ্ঠ চেহারা। দুজনেরই পরনে সাদা কাপড়। গায়ে উত্তরীয়। ঘোড়া দুটির পিছনে পিছনে কয়েকজন মানুষ হেঁটে আসছিল। ঘোড়া মন্দিরের কাছে আসতেই তাঁরা লাফিয়ে নেমে পড়লেন। পায়ের জুতো খুলে তাঁরা এগিয়ে এলেন মন্দিরের দিকে। প্রৌঢ় চাতালের কাছে এসে দাঁড়ালেন। দীর্ঘদেহী এগিয়ে গেলেন তাঁকে পিছনে রেখে। দীর্ঘদেহীর মাথায় সাদা কাপড়ের ব্যান্ডেজ। তাঁকে দেখে চাপা গলায় বলে উঠল শাওন, 'রাজা অশ্বত্থামা'।
রাজা কারও দিকে না তাকিয়ে সোজা গুহামন্দিরে ঢুকে ঘূর্ণায়মান গদাটি থেকে বেশ কিছু দূরে বসলেন হাঁটু মুড়ে।
চাতালের কাছে এসে দাঁড়ানো প্রৌঢ়ের দিকে তাকিয়ে নিখিল আনন্দে চিৎকার করে উঠলেন, 'ডক্টর চতুর্বেদী...'
'ইনিই ডক্টর মুকেশ?' পরিদাদুও অবাক। এখানে এইভাবে যে তাঁর দেখা পেয়ে যাবেন ভাবতেই পারেননি তিনি।
'এ কী করে সম্ভব?' কেমন যেন উদ্ভ্রান্তের মতন বলে উঠলেন বিবেক।
'কেন সম্ভব নয় বলুন তো?' তীক্ষ্ন স্বরে জিজ্ঞেস করলেন পরিদাদু।
'কারণ ও-ই তো ঠান্ডা মাথায় আমার মৃত্যুর সমস্ত ব্যবস্থা করেছিল নিজে হাতে। গুহাপথে ঢুকতে না পেরে এখানকার এক রক্ষীকে গুলিতে আহত করে পালিয়ে গিয়েছিল কোনোক্রমে। নিজের চেহারাটা এই কয়েক মাসে অনেকটাই পালটে ফেললে কী হবে, এডিকে চিনতে আমার ভুল হয়নি। বড্ড স্নেহ করতাম কিনা...' বিবেকের দিকে স্থির চোখে একবার তাকিয়ে নিয়ে বললেন মুকেশ।
বিবেককে কেমন বিভ্রান্ত লাগছিল। নিজের চোখকেই যেন বিশ্বাস করতে পারছিল না সে। পরিদাদু মুকেশের দিকে চেয়ে হেসে বললেন, 'এডি নামটাও কিন্তু আসল নয় ডক্টর চতুর্বেদী...'
নিখিল মুকেশের সঙ্গে পরিদাদু আর শাওনের পরিচয় করিয়ে দিলেন।
পরিদাদু বিবেকের দিকে কড়া চোখে তাকিয়ে বললেন, 'ও ডেভিড। ভারতবর্ষের মূল্যবান প্রত্নবস্তু বিদেশে চালান করার একটা বড় আন্তর্জাতিক চক্রের চাঁই...'
'মিথ্যে কথা। যা বলছেন তার প্রমাণ কই?'
'আছে', পরিদাদু হাসলেন, 'কাগজে ছবির সঙ্গে আপনার কাঁধের জড়ুলটার কথাও যে বলা আছে মিস্টার কোদালি... আর এসব কথা বাদ দিলেও আপনার বিরুদ্ধে ডক্টর চতুর্বেদীকে খুনের চেষ্টার অভিযোগ তো রইলই।'
'অভিযোগ প্রমাণের জন্যে সাক্ষীটা দেবে কে?' ক্রুর ভঙ্গিতে হেসে উঠল ডেভিড কোদালি। সেই হাসিতে রাজা গর্ভগৃহ থেকে চমকে ফিরে তাকালেন এইদিকে। ডেভিড হিংস্র রুক্ষ গলায় বলে উঠল, 'যেদিন মুকেশজির কাছে এই জায়গার কথা শুনেছিলাম, সেদিন থেকে স্থির করে রেখেছি এই জায়গার সন্ধান আমাকে পেতেই হবে। সেই সন্ধান কি এমনি এমনিই পেতে চেয়েছিলাম? আমি নিশ্চিত ছিলাম লুকনো জনপদে লুকনো ঐশর্যও কিছু থাকবে নিশ্চিত। সেই ঐশর্য এখন আমার চোখের সামনে। আমার ওগুলো চাই।'
'কী বলতে চাইছো তুমি ডেভিড?' চিৎকার করে উঠলেন নিখিল।
'ওই গদা এবং রাজমুকুট আমার চাই। শুধু ওইদুটো অ্যান্টিক বিদেশে বিক্রি করে সারা জীবন রাজার হালে কাটিয়ে দিতে পারব আমি।'
'তুমি উন্মাদ', মুকেশ হেসে উঠলেন।
'আমি উন্মাদই। পছন্দের জিনিস নিজের অধিকারে আনার জন্যে যা খুশি করতে পারি আমি', বলতে বলতেই সকলের অলক্ষে বয়ে বেড়ানো কোমরে গোঁজা রিভলবারটা বের করে আনে ডেভিড। রাজা মন্দির থেকে বেরিয়ে বাইরের চাতালে এসে দাঁড়িয়েছেন তখন। ডেভিড তাঁর মাথার দিকে রিভলভার তাক করে ঠান্ডা গলায় আবারও বলল, 'এই গদা আর মুকুট আমার চাই...'
কৌরবক্ষেত্রের যে কজন উপস্থিত ছিল সেখানে, রাজার সাহায্যে এগিয়ে যাবার চেষ্টা করতেই হাত তুলে রাজা তাদের নিরস্ত করলেন। তারপর খুব শান্ত গলায় ডেভিডের দিকে চেয়ে প্রশ্ন করলেন, 'কী চাও তুমি?'
'ওই গদা আর রাজমুকুট।'
রাজা হেসে উঠলেন, 'লোভ সংবরণ করো আগন্তুক। জানো কি, কৌরবক্ষেত্রে লোভের শাস্তি মৃত্যুদণ্ড?'
'আমাকে মৃত্যুদণ্ড কে দেবে?' চেঁচিয়ে উঠল ডেভিড, 'আমাকে ওই গদা এবং মুকুট নেবার ব্যাপারে যে বাধা দেবে তাকেই গুলি করে মেরে ফেলব আমি।'
'বেশ। অনুমতি দিলাম তোমায়', খুব শান্ত গলায় বললেন রাজা,'যদি সত্যিই ক্ষমতা থাকে, প্রভু দুর্যোধনের গদা আর তাঁর মুকুট মন্দিরের মধ্যে ঢুকে নিজেই নিয়ে নাও তুমি।'
সঙ্গে সঙ্গে প্রতিবাদ উঠল। কৌরবক্ষেত্রের মানুষ একযোগে বলে উঠল, 'এই পবিত্র গদা স্পর্শ করার অনুমতি নেই কারো। ওই লোভীর স্পর্শে আমাদের পবিত্র গদা অপবিত্র হয়ে যাবে মহারাজ...'
পরিদাদু গর্জে উঠলেন, 'জীবন থাকতে এই অন্যায় আমি হতে দেব না। ডেভিড, পারলে গুলি চালাও আমার ওপর। কিন্তু এ কাজ আমি তোমাকে করতে দেব না'। পরিদাদু ধীরে ধীরে এগোতে লাগলেন ডেভিডের দিকে। ডেভিডের রিভলবার ধরা হাত ক্রমশ ওপরে উঠে আসছে পরিদাদুর মাথা তাক করে। শাওন 'পরিদাদুউউ'— বলে চিৎকার করে উঠে দৌড়ে গিয়ে দু-হাতে জড়িয়ে ধরল তাঁকে। পরিদাদু এক ঝটকায় সরিয়ে দিলেন তাকে।
সেই সময়েই রাজা অশ্বত্থামা আবার বলে উঠলেন জলদ্গম্ভীর স্বরে, 'সরে এসো সকলে গুহামন্দিরের কাছ থেকে। এ আমার আদেশ। এই আগন্তুক যা নিতে আগ্রহী নিজে হাতে তা নিতে দাও ওকে...'
রাজার আদেশে হতবাক হয়ে গেল সক্কলে। ডেভিডের মুখে অদ্ভুত একটা হাসি ফুটে উঠল। ধীরে ধীরে সে এগোতে লাগল গুহামন্দিরের গর্ভগৃহের দিকে। ডেভিড এখন গুহার দরজার কাছে। দূরে দাঁড়িয়ে অসহায় ভঙ্গিতে তাকে দেখছেন পরিদাদু, মুকেশ, নিখিল, শাওন আর কৌরবক্ষেত্রের মানুষেরা। একমাত্র রাজা উদবেগহীন। তাঁর মুখে মৃদু হাসি। ধামসার মতন দেখতে পাথরখণ্ডটির চ্যাটালো অংশের ওপরে শোয়ানো গদা ঘুরে চলেছে। ডেভিড দু-হাত বাড়িয়ে সেই ঘুরন্ত গদার আরও একটু কাছে এগিয়ে গেল। আর তখনই সেই প্রাচীন গদা তীব্র আকর্ষণে রিভলবার সমেত ডেভিডকে টেনে নিল নিজের দিকে। ডেভিড গদাটার ওপরে আছড়ে পড়তেই একটা তীব্র আর্তনাদ উঠল গুহার মধ্যে। তারপরেই ডেভিড ছিটকে গিয়ে গুহার দেওয়ালে ধাক্কা খেয়ে আছড়ে পড়ল মাটির ওপরে। শরীর স্থির হয়ে গেল তার। রাজা হেসে বললেন, 'ও আর জেগে উঠবে না কোনোদিন। প্রভুর গদা অন্যায় লোভের উপযুক্ত শাস্তি দিয়েছে ওকে'। মহারাজ অশ্বত্থামা জমা হওয়া প্রজাদের দিকে তাকালেন। তারপর স্থির শান্ত গলায় নির্দেশ দিলেন, 'শাস্তিপ্রাপ্ত এই লোভীর শরীরটা সরিয়ে নিয়ে যাও এখান থেকে'। এগিয়ে এসে তিনি লাফিয়ে উঠে পড়লেন তাঁর ঘোড়ায়। ঘোড়া চলতে শুরু করল ধীর পায়ে।
শাওন এবং নিখিলদাদু বিস্ময়ে কথাই বলতে পারছিলেন না। পরিদাদুও চুপ করে ছিলেন ঘটনার অভিঘাতে। এতক্ষণে তিনি কথা বলে উঠলেন উত্তেজিত গলায়, 'আনথিংকেবল। আমি ভাবতেও পারিনি এটা কিছুক্ষণ আগে পর্যন্ত।'
'কী পরি?' অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন নিখিলদাদু।
'কী নিখুঁত বিজ্ঞান', আবার বললেন পরিদাদু তারিফের ভঙ্গিতে, 'আমার আগেই বোঝা উচিত ছিল, অন্তত যখন মহারাজ নিশ্চিন্তে ডেভিডকে গদা উঠিয়ে নেবার অনুমতি দিলেন...'
'বুঝতে পারছি না পরিদাদু', শাওনও বলে এইবার।
'শঙ্কু আকৃতির মস্ত পাথরটার নীচের বেদি, যার ওপরে পাথরটা আবহমানকাল ধরে ঘুরে চলেছে এবং গুহার ছাদের নীচের ওই আয়তাকার পাথরদুটো আসলে প্রাকৃতিক চুম্বক যাদের চুম্বকত্ব একমুখী', পরিদাদু বলতে শুরু করলেন,'আর গদাটি এখানে একটি চৌম্বক ধাতবদণ্ড। নিরন্তর ঘূর্ণনের ফলে গদার উভয় প্রান্তে দুই বিপরীত জাতীয় আধান বিপুল পরিমাণে সঞ্চিত রয়েছে। কোনো মানুষের শরীর এই গদার সংস্পর্শে এলে গদাটিতে এমনই তীব্র তড়িৎ প্রবাহিত হবে যার ফলে বজ্রাহত হয়ে তার মৃত্যু অনিবার্য। বেচারি ডেভিড কিচ্ছু না বুঝেই লোভে পড়ে হাতে রিভলবার নিয়ে...'
ওসলার প্রাচীন দুর্যোধন মন্দিরের কাছে পৌঁছতে বেলা গড়িয়ে গেল। একেবারে কাকভোরে বেরিয়ে কোন সুড়ঙ্গপথে যে কৌরবক্ষেত্রের লোকেরা চোখ বেঁধে নিয়ে এল তাদের কে জানে। ডক্টর চতুর্বেদী ফিরলেন না। বললেন, 'লোভ, হিংসা, বিশ্বাসঘাতকতার পৃথিবীতে ফিরে লাভ কী? তাছাড়া রাজাকে কথা দিয়েছি পরবর্তী অশ্বত্থামাকে খুঁজে না পাওয়া পর্যন্ত আমি তাঁকে ছেড়ে আসব না। আমি সে কথার খেলাপ করতে পারব না।'
মূলত তাঁর অনুরোধেই কৌরবক্ষেত্র থেকে সহজে বাইরের পৃথিবীতে ফিরে আসার ছাড়পত্র মিলেছিল রাজার কাছ থেকে। তবে ফিরে আসার সময় বার বার করে শপথ করিয়ে নিয়েছিলেন তিনি যে কৌরবক্ষেত্রের নির্দিষ্ট অবস্থান যেন গোপনই রেখে দেন পরিদাদুরা। কেননা তথাকথিত সভ্য মানুষ এই জনপদের সন্ধান পেলে কৌরবক্ষেত্রের ধ্বংস অবশ্যম্ভাবী। মানুষের লোভ কিছুই আর টিঁকিয়ে রাখবে না এই জনপদের যা কিছু প্রাচীন নিদর্শন। তাঁর কথা শুনে মাথা হেঁট হয়ে গিয়েছিল পরিদাদু আর নিখিলদাদুর। শাওনের সেইসময় কষ্ট হচ্ছিল তাঁদের জন্যে। মনে মনে বার বার শপথ নিচ্ছিল সে, জীবনে কখনও কোনো অবস্থায় ডেভিডের মতন লোভী হয়ে উঠবে না সে।
ঢালু পথে নামতে নামতে পরিদাদু বলছিলেন, 'সত্যি বলতে কি আমারও ফিরতে ইচ্ছে করছিল না। নেহাত শানু সঙ্গে ছিল তাই। ওকে তো অন্তত খুকু, অরুণাংশুর কাছে পৌঁছে দিতে হবে আমায়। আফটার অল, এটা আমার দায়িত্ব। ওকে কলকাতায় ফিরিয়ে দিয়ে, পরে কখনও হয়তো এখানেই ফিরে আসব আমি মুকেশজির কাজে সাহায্য করার জন্যে।'
পরিদাদুর কথা শুনে নিখিলের অজান্তে তাঁর হাতে কুটুশ করে চিমটি কেটে দিল শাওন। পরিদাদু তার দিকে তাকাতেই একবার জিভটাও ভেঙিয়ে দিল সে।
আকাশে মেঘ জমছিল। সীমায় গাড়োয়াল মণ্ডল বিকাশ নিগমের বাংলোয় পৌঁছনোর জন্যে দ্রুত পা চালালেন পরিদাদু। নিখিল এবং শাওনও।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন