ক্যাপ্টেন দাসের জপযন্ত্র

জয়দীপ চক্রবর্তী

ভালুকপঙ থেকে বমডিলা আসার পথে পাহাড় ছেয়ে ছিল অসংখ্য কলাগাছ। ছোট, বড়, মাঝারি নানা আকারের। কোনো কোনো গাছে কলার লম্বা লম্বা কাঁদিও ঝুলছিল। সুছন্দা মুখ বেঁকিয়ে বলে উঠলেন, 'কী গো পরিকাকু, এতদিন ধরে এত পরিকল্পনা—প্রস্তুতির পরে শেষে কিনা এতদূরে কলাগাছ দেখাতে নিয়ে এলে?'

অরুণাংশু বরাবরই একটু আরামপ্রিয় আর ঘরকুনো। সুছন্দার কথার সূত্র ধরে বলতে শুরু করলেন তিনি, এর চেয়ে বাবা গুয়াহাটির আশপাশ ঘুরে শিলঙের দিকে চলে গেলেই হত। সেও তো পাহাড়ই। কত পাহাড়ি জায়গায় তো ঘুরলাম। সব পাহাড়ের চরিত্রই মোটামুটি এক।

পরিদাদু চুপ করে বসেছিলেন এতক্ষণ। এবার কথা বলে উঠলেন, 'নো স্যার, আই অবজেক্ট—'

'নো বললেই হল—' আবার বলে উঠলেন অরুণাংশু।

'হল।' হালকা হেসে বললেন পরিদাদু, 'সব পাহাড়ের সৌন্দর্য এক নয়। এমনকি একই পাহাড় বিভিন্ন ঋতুতে দেখবে আমাদের জন্যে আলাদা আলাদা রকমের সৌন্দর্য নিয়ে অপেক্ষা করে থাকে। এখন এসব কথা বলছ বটে। তবে বমডিলাটা পেরোতে দাও, দেখবে এই পাহাড়টাই তখন তোমাদের কাছে অন্যরকম লাগবে। আমি নিশ্চিত, আমাকে তখন আর একটুও দোষ দিতে ইচ্ছে করবে না তোমাদের—'

পরিদাদুকে কেউ কোনোভাবে দোষারোপ করলে শাওনের একদম ভালো লাগে না। এখনও মা বাবার কথায় মনে মনে অসন্তুষ্ট হচ্ছিল সে। পরিদাদু কথা থামাতেই শাওন বলে উঠল, 'তুমি যে কলাগাছ কলাগাছ বলে অমন করছ মা, এই কলাগাছগুলোও কিন্তু অন্যরকম। আমাদের ওখানকার কলাগাছগুলোর থেকে আলাদা।'

'কীরকম?' গাড়ির সিটে গা এলিয়ে দিয়ে জিজ্ঞেস করলেন অরুণাংশু।

'এই কলাগাছগুলোর গা—টা একেবারে মিশকালো, পাতাগুলোও গাঢ় সবুজ—'

'সত্যিই তো,' জানলার কাচের বাইরে চোখ ফিরিয়ে বলে উঠলেন সুছন্দা 'শানু তো ঠিকই বলেছে, আমি খেয়ালই করিনি একদম।

'তাছাড়া আমাদের সঙ্গে সঙ্গে পাহাড়ের নীচ দিয়ে ওই যে ঝরঝর সর সর আওয়াজ করে জিয়াভরলি নদী বয়ে চলেছে, ওটাও কী সুন্দর বলো—' উৎসাহ পেয়ে বলে ওঠে শাওন।

'নদীটা সত্যিই খুব কিউট—' সুছন্দা ছেলের কথায় সায় দিয়ে বলেন। সামনে ড্রাইভার রাভা আঙ্কলের পাশের সিটে বসেছিলেন পরিদাদু। শাওনের কথায় ঘাড় ঘুরিয়ে পিছনে তাকালেন তিনি। হাত বাড়িয়ে শাওনের মাথায় একটা হালকা ঝাঁকুনি দিয়ে তিনি বলে উঠলেন, 'কিন্তু তথ্যে যে একটু গন্ডগোল হয়ে গেল শানুবাবু—'

'ক্যানো?' অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করে শাওন।

'আপার ভালুকপঙে যেখানে ইনার লাইন পারমিট দেখিয়ে চেকপোস্ট পেরোতে হল আমাদের, সেখানে নদীর ওই নামটাও আমরা ছেড়ে রেখে এসেছি। এখন এই নদীটার নাম কামেং—'

'তাই?' লজ্জা পাওয়া গলায় বলে শাওন।

'হুঁ।' ওপর নীচে মাথা নাড়েন পরিদাদু।

'তবে নদীটার আগের নামটাই ভালো ছিল, বলো পরিদাদু?'

'তা হয়তো ছিল। তবে নাম পালটালেও নদীটা তো পালটায়নি', শানুকে আশ্বাস দিয়ে বলেন পরিদাদু, 'ও আমাদের সঙ্গে এখন অনেক পথই চলবে একসঙ্গে।'

বমডিলা পেরিয়ে আসার পর আশপাশের পাহাড়টা সত্যিই বদলে গেল। এমন সুন্দর সবুজ পাহাড় অরুণাচলে না এলে ভাবতেই পারা যায় না। আর সেই সবুজ গাছে সাজানো পাহাড়গুলোকে আরও সুন্দর আর রঙিন করে রেখেছে রংবেরঙের রডোডেনড্রন। লাল—গোলাপি—সাদা হলুদ আকাশী—কত যে রং তাদের! এত বিচিত্র রঙের রডোডেনড্রন ফুল আগে কখনও দেখেনি শাওন। সুছন্দা অরুণাংশুও না। এর আগে সিকিম যাবার সময়েও গাছের শাখায় শাখায় ফুটে থাকা রডোডেনড্রনগুচ্ছ চোখে পড়েছে ওদের, কিন্তু রঙের এমন বিচিত্রতা সেখানে ছিল না। শাওন সুছন্দা তো বটেই, অরুণাংশুও এখন পরিদাদুকে ধন্যবাদ জানাচ্ছিলেন গ্রীষ্মের ছুটিতে এবারে বেড়াতে আসার জন্য এই জায়গাটাকে বেছে নেওয়ার জন্য।

আজকের জার্নিটা বেশ লম্বা। বমডিলা থেকে তাওয়াং কম পথ নয়। মাঝে পার হতে হবে সেলা পাস। আবহাওয়া খারাপ হয়ে গেলে এই পথে পাড়ি দেওয়াটা বাস্তবিকই বিপজ্জনক। অনেকেই বমডিলা হয়ে তাওয়াং যাওয়ার পথে দিরাং—এ একরাত্রি কাটিয়ে যান। তাতে পথের ক্লান্তি কিছুটা কমে। তাছাড়া দিরাং শহরটাও ভারী সুন্দর। মনে হয় পাহাড়ের ঢালে শহরটাকে যেন এঁকে রেখেছে কেউ। অরুণাংশুর ইচ্ছে ছিল এখানে একরাত থেকে যাওয়ার। পরিদাদু বারণ করলেন। বললেন, 'তাওয়াং—এর জন্য অন্তত তিনটে দিন হাতে রাখতে হবে। পারলে চার। তাওয়াং—এর প্রাচীন গুম্ফাগুলো তো দেখবেই, তাছাড়া ওখান থেকে গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে পিটিসো লেক, সাঙ্গেটসার লেক ঘুরে বুমলা পাস পর্যন্ত যেতে হবে।

'বুমলা পাসে কী আছে পরিদাদু?' শাওন জিজ্ঞেস করে।

'বুমলা পাস ভারত চীন সীমান্ত। তার চেয়েও বড় কথা, জায়গাটা এত সুন্দর যে ওখানে না গেলে তাওয়াং ভ্রমণ অসম্পূর্ণ থেকে যাবে—'

'তাহলে তো ওখানে যেতেই হবে—' উত্তেজিত গলায় বলে উঠলেন সুছন্দা।

'যেতে তো হবেই', বললেন পরিদাদু—'কিন্তু বুমলা যাওয়ার জন্য তাওয়াং থেকে পারমিশন করাতে হবে। কাজেই হাতে সময় রাখা দরকার আমাদের।'

একদিনে এতটা পথ যেতে হবে বলে আজ একেবারে সকাল সকাল বমডিলা থেকে রওনা দিতে হয়েছে শাওনদের। রাভা আঙ্কল বলছিলেন, তাওয়াং পৌঁছতে তাতেও হয়তো সন্ধ্যা পেরিয়ে যাবে। পরিদাদু বললেন, 'খুব প্রয়োজন ছাড়া রাস্তায় গাড়ি থামিয়ে অযথা সময় নষ্ট করা চলবে না আজ। রাভা আঙ্কলও সায় দিয়েছিলেন তাঁর কথায়। অথচ জে—ঘর লেখা একটা মাইলস্টোন পেরিয়ে রাস্তার পাশে চওড়া ফাঁকা জায়গায় গাড়ি দাঁড় করিয়ে দিলেন তিনি। তারপর পরিদাদুর দিকে ফিরে ভাঙা ভাঙা হিন্দিতে বললেন, 'নেমে আসুন নীচে—'

পরিদাদু বিরক্ত হলেন। বললেন, 'এখানে গাড়ি থামালে কেন? আমরা তো নামব বলিনি—'

রাভাজি গম্ভীরভাবে বললেন, 'এ হচ্ছে যশবন্ত ঘর। এখানে নামতেই হয়। এখানে নেমে চা সামোসা খেয়ে নিন—'

সুছন্দাও মাথা নেড়ে আপত্তি জানালেন এবার, 'এক্ষুনি চা না খেলেও তো চলবে আমাদের রাভাজি। কী দরকার শুধুমুধু এখানে সময় নষ্ট করবার? এমনিতেই আকাশ মেঘলা এখন। কখন আরও মেঘ এসে সামনের রাস্তা ঢেকে দেবে বলা যায় না। এখনও কত পথ বাকি, বৃষ্টি এসে গেলে এ পথে যাওয়া তো মস্ত ঝুঁকির ব্যাপার হয়ে যাবে—'

রাভা আঙ্কল সুছন্দার কথায় একটুও প্রভাবিত হলেন না। তাঁর কথায় কোনো উত্তর না দিয়ে গাড়ির দরজা খুলে প্রায় আদেশের ভঙ্গিতে বললেন, 'নেমে আসুন।'

গাড়ি থেকে নীচে নামতেই কনকনে ঠান্ডা বাতাস যেন ঝাঁপিয়ে পড়ল শাওনদের ওপর। গাড়ির ভিতরে জানলার কাচ বন্ধ করে বসে বোঝাই যাচ্ছিল না যে বাইরে এতখানি ঠান্ডা। শাওন তাড়াতাড়ি করে মাঙ্কি টুপিতে কান মাথা ঢেকে ফেলল। রাভা আঙ্কল রাস্তার বাঁ—দিকে পাহাড়ের ওপরের সাদা স্মৃতিসৌধটির দিকে আঙুল তুলে বললেন, 'ওইটাই বীর শহিদ যশবন্ত সিং রাওয়াতের স্মৃতি মন্দির। ওঁর নামেই এই জায়গার নাম যশবন্ত ঘর। বাষট্টি সালের চীন—ভারত যুদ্ধে অসীম সাহসের সঙ্গে লড়াই করে তিনি শহিদ হন। ওই স্মৃতিসৌধের মধ্যে তাঁর মূর্তি ও ব্যবহৃত জিনিসপত্র নিয়ে একটা ছোটখাটো মিউজিয়াম বানিয়ে রেখেছে ভারতীয় সেনাবাহিনী। রাস্তার ডানদিকে মিলিটারি স্টোর্স ও টি স্টল। এই জায়গা দিয়ে যত পর্যটক যাতায়াত করেন ভারতীয় সেনা জওয়ানরা তাঁদের গরম চা খাইয়ে আপ্যায়িত করেন। তাঁদের বিশ্বাস, শহীদ যশোবন্ত সিং রাওয়াতজির আত্মা এতে তৃপ্তি পান।'

রাভা আঙ্কলের কথা শুনতে শুনতে মোহিত হয়ে গিয়েছিল শাওন। আবেগে গলার কাছটা ভারী হয়ে আসছিল তার। মনে মনে বীর শহিদের উদ্দেশ্যে প্রণাম জানাল শাওন। অরুণাংশু বললেন, 'এখানে একবার না নামলে সত্যিই খুব অন্যায় হত রাভাজি—'

রাভাজি হাসলেন। বললেন, 'চলুন চা খাওয়া যাক। যশোবন্তজি দুঃখ পাবেন না হলে।

শাওন চা খায় না। তবু আজ খেল। মনটা ভালো লাগছিল তার। কী এক অজানা কারণে এই দেশে জন্মানোর জন্যে আজ ভারী গর্ববোধ হচ্ছিল তার। অরুণাংশু বললেন, 'এই ঠান্ডার মধ্যে চা খেয়ে সত্যিই খুব আরাম হচ্ছে—'

সুছন্দা বললেন, 'আর এক কাপ করে খাবে?'

রাভাজি বললেন, 'যতবার খুশি খান। পয়সা লাগবে না। খাওয়াতে বিরক্ত হয় না এরা। শিঙাড়া খেতে চাইলে অবশ্য কিনে খেতে হবে—

শাওন বলল, 'তোমরা চা খাও, আমি বরং ওপরে মিউজিয়ামটা দেখে আসি—'

সুছন্দা বললেন, 'সাবধানে ওপরে উঠবে। সিঁড়ির দিকে চোখ রেখে।'

পরিদাদু বললেন, 'একদম দেরি করবি না কিন্তু শানু। চা খেয়েই রওনা দেব আমরা। আকাশের অবস্থা ভালো নয়। যে কোনো সময় বৃষ্টি নামতে পারে—'

রাভা আঙ্কলও মাথা নাড়লেন তাঁর কথায়।

'ঠিক আছে পরিদাদু—'বলেই রাস্তা পেরিয়ে পাহাড়ের ওপরে ওঠার সিঁড়ির দিকে দৌড় লাগালো শাওন।

যশোবন্ত সিং রাওয়াতজির স্মৃতিতে তৈরি মিউজিয়াম দেখতে দেখতে পরিদাদুর সাবধানবাণীর কথা মনে রইল না শাওনের। শহীদ যশোবন্ত ব্যবহৃত অস্ত্র, তাঁর ব্যবহৃত পোশাক এবং অন্যান্য দ্রষ্টব্য বস্তুগুলো দেখতে দেখতে বেশ কিছুটা সময় পেরিয়ে গেল। যশোবন্তজির পাওয়া মরণোত্তর মহাবীরচক্র পদকের সামনে দাঁড়িয়ে চোখে জল এসে গেল শাওনের। চোখে টলটলে জল নিয়েই ভিজিটর্স বুকে সে লিখল 'আশীর্বাদ করো যেন আমি তোমারই মতন দেশকে ভালোবাসতে পারি—'

স্মৃতিমন্দির থেকে যখন শাওন বাইরে বেরিয়ে এল, কালো কালো ধোঁয়ার মতন মেঘের দল তখন পাহাড়ের ওপর থেকে গড়িয়ে গড়িয়ে নীচে নেমে এসেছে। সামনের দিকটা অনেকটা আবছা হয়ে গেছে এখন। নীচের দিকে তাকিয়ে শাওন দেখল মেঘ ওখানে আরও জমাট। সেই মেঘের চাদরের ওপারে রাস্তা, দোকান, গাড়ি কিংবা মা বাবা পরিদাদু রাভা আঙ্কল কাউকেই দেখতে পেল না শাওন। ওপর দিকে চোখ ফেরাতে সে দেখতে পেল কাঁটাতারে ঘেরা আবছা আবছা সমাধিক্ষেত্রটাকে। যুদ্ধে মৃত চীনা ও ভারতীয় সৈনিকদের কেউ কেউ ওখানেই নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে আছেন পাহাড়ের কোলের মধ্যে। আর একটু ডানদিকে পাহাড়ের খাঁজে খাঁজে রয়েছে ওই সময়ের যুদ্ধে ভারতীয় সেনাদের ব্যবহৃত বাঙ্কারগুলো।

আলো কমে আসছে দ্রুত, তবু শাওনের মনে হল ওপরে উঠে আরও একটু কাছ থেকে দেখে আসি ওগুলো। ফেরার সময়ে আদৌ এ জায়গাটা আর ভালো করে দেখার সুযোগ হবে কিনা কে জানে। শাওন সিঁড়ি বেয়ে একটু ওপরে উঠে থমকে দাঁড়াল। এরপর সিঁড়িগুলো সরু এবং অসমান। ধাপগুলোর উচ্চতাও সমান নয়। এতক্ষণ সিঁড়ির পাশে লোহার সুদৃশ্য রেলিং ছিল। আর একটু ওপরে উঠলে তাও আর নেই। পাশে বেশ নিচু খাদ। সত্যিই যদি বৃষ্টি নামে, তাহলে পথটা পিচ্ছিল এবং বিপজ্জনক হয়ে যাবে। তাছাড়া মা বাবাও নিশ্চিত বকাবকি করবেন তাকে খুব। পরিদাদুও ওপরে ওঠার সময় বলে দিয়েছেন ওপরে যাচ্ছ যাও, কিন্তু সাবধানে। অযথা ঝুঁকি নেবে না কক্ষনো। জায়গাটা দ্রুত ফাঁকা হয়ে যাচ্ছে। আবহাওয়া খারাপ হয়ে যাচ্ছে বলে পড়ি কি মরি করে নীচে নেমে যাচ্ছে সব্বাই। ও এক্ষুনি নেমে না গেলে মা বাবাও দুশ্চিন্তা করবেন খুব। তবুও নীচে নামতে ইচ্ছে করল না শাওনের। ওপরের ওই সমাধিক্ষেত্র আর বাঙ্কারগুলো যেন তীব্র আকর্ষণে টানছে তাকে। সেই টান উপেক্ষা করা খুবই কঠিন মনে হল শাওনের। অতএব মেঘের আড়ালে সরে আসা আলোর মধ্যেই প্রায় যন্ত্রচলিতের মতন ওপর দিকে উঠতে শুরু করল শাওন।

পায়ে পায়ে দু—চার ধাপ উঠতে না উঠতেই কালচে জমাট মেঘ ঘিরে ফেলল শাওনকে। সামনে কিছুই দেখা যাচ্ছে না আর। বাঁ পাশের পাহাড় ধরে ধরে আরও একটু ওপরে উঠে গেল সে। ঠান্ডা হাওয়ার ঝাপটা এসে লাগছে তার গায়ে। বাঁ দিকের পাহাড় এতক্ষণ যে দেওয়াল তুলে রেখেছিল সেটা হঠাৎই শেষ হয়ে গেল এবার। শাওন ভয় পেয়ে গেল খুব। গলা শুকিয়ে কাঠ। সামনে কিছুটি দেখা যাচ্ছে না। নীচের দিকেও একইরকম মেঘলা অন্ধকার। ভয়ে পরিদাদুকে চিৎকার করে ডাকতে গিয়েও চুপ করে গেল শাওন। তার ডাক পরিদাদুর কাছ পর্যন্ত পৌঁছনো অসম্ভব। শাওনের মনে হল তার হাঁটুদুটোও যেন থিরথির করে কাঁপতে শুরু করল এখন। তবু এভাবে দাঁড়িয়ে থাকলেও তো চলবে না। টিপটিপ করে বৃষ্টি শুরু হয়ে গেছে। এরপর হয়তো বৃষ্টির বেগ আরও বাড়বে। সঙ্গে রেনকোট—ছাতা কিছু নেই। অনন্যোপায় শাওন মরিয়া হয়ে সামনে পা বাড়াতে গেল। আর তখনি ভয়ংকর গম্ভীর একটা কণ্ঠস্বর গমগমে গলায় চিৎকার করে উঠল, 'আগে মত বাড় বেটা—ডোন্ট মুভ—'

এমন চমকে উঠল শাওন যে প্রায় পড়েই যাচ্ছিল সে। দুটো বলিষ্ঠ হাত এইসময় পিছন থেকে শক্ত করে চেপে ধরল তাকে। একটু সামলে নিয়ে ঘাড় ঘুরিয়ে শাওন দেখল একজন দীর্ঘদেহী সৈনিক স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন তার দিকে। শাওন তাঁর দিকে তাকাতেই গম্ভীর গলায় হিন্দিতে শাওনকে জিজ্ঞেস করলেন তিনি, 'কী নাম তোমার? কার সঙ্গে এসেছো এখানে?'

'আমি শাওন, শাওন চ্যাটার্জী' হিন্দিতেই উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করল শাওন, আমার মা বাবা আর—',

'তুমি বাঙালি?' শাওনকে কথা শেষ করতে না দিয়েই স্পষ্ট বাংলায় বলে উঠলেন সেই সৈনিকটি।

'হুঁ', মাথা নেড়ে বলল শাওন। তারপর বিস্ময়ভরা কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল, 'আপনিও বাঙালি?'

'অফকোর্স, একগাল হেসে বললেন তিনি, 'আমি ক্যাপ্টেন বি.এন.দাস—আমি অ্যাকচুয়ালি দক্ষিণ কলকাতার লোক—' বলেই শাওনের দিকে ফিরে গম্ভীর হয়ে গেলেন তিনি, কিন্তু শাওনবাবু তুমি যে এক্ষুনি একটা মস্ত বিপদ বাঁধিয়ে ফেলছিলে—'

'কেন?' ভয়ে ভয়ে জিজ্ঞেস করে শাওন।

'সামনে পা বাড়ালেই যে খাদে গিয়ে পড়তে তুমি—'

'খাদ?'

'হুঁ!'

'খাদে পড়লে কি আমি মারা যেতাম?'

'তা হয়তো যেতে না। খাদটা তেমন গভীর নয়। তবে হাত পা ভাঙত, মাথাতেও বড়সড় চোট এসে যেতে পারত—'

'আমি দেখতেই পাইনি।' ভয়ে জড়সড় হয়ে বলে উঠল শাওন।

'এইরকম খারাপ আবহাওয়ায় একা একা কোথায় যাচ্ছিলে তুমি, তোমার সঙ্গের অন্য লোকজনই বা কোথায়?'

'সকলে নীচে', লাজুক লাজুক গলায় উত্তর দেয় শাওন, 'আসলে আমার খুব ইচ্ছে হচ্ছিল ওপরের ওই গ্রেভইয়ার্ড আর বাঙ্কারগুলো দেখতে—আর আবহাওয়াটাও তখন এত খারাপ ছিল না। আমি ভেবেছিলাম চট করে ওপরটা দেখে নিয়ে নীচে নেমে যেতে পারব—' কথা বলতে বলতেই টিপটিপে বৃষ্টিটা ঝমঝম করে নামল।

'রেনকোট, ছাতা কিছু সঙ্গে আছে?' ক্যাপ্টেন দাস জিজ্ঞেস করলেন শাওনকে।

'উঁহু—'

'তাহলে একদম দেরি করা যাবে না', বলেই বলিষ্ঠ দুটো হাত দিয়ে অবলীলায় শাওনকে চ্যাংদোলা করে কোলে তুলে নিলেন তিনি।

'এই বৃষ্টিতে ভিজে গেলেই শরীর খারাপ হয়ে যাবে তোমার' বলতে বলতেই প্রায় কিছু দেখতে না পাওয়া খাড়াই পথ বেয়ে অবিশ্বাস্য ক্ষিপ্রতায় পাহাড়ের মাথায় উঠে একটা হাঁ মুখ বাঙ্কারের মধ্যে ঢুকে গেলেন তিনি শাওনকে নিয়ে।

বাঙ্কারের মধ্যেটা দু'জনে বসে থাকার পক্ষে যথেষ্ট বড়। শাওন চোখ গোল গোল করে চারপাশটা দেখছিল। ক্যাপ্টেন দাস কৌতুকমাখা চোখে তার দিকে তাকিয়ে হালকা গলায় বললেন, 'কী দেখছো শাওন?'

শাওন অবাক গলায় বলল, 'এর মধ্যে থেকে আপনাদের লড়াই করতে হয়?'

'হুঁ!'

'এগুলো কি এখনও ব্যবহৃত হয়?'

'উঁহু। বাষট্টির যুদ্ধে এগুলো ব্যবহার করা হয়েছিল। কিছু কিছু বাঙ্কার তার পরেও বানানো। এখন এগুলো পরিত্যক্ত।'

শাওনের গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠল। উত্তেজিত গলায় সে বলল, 'এই বাঙ্কারের মধ্যে থেকেও কেউ হয়তো লড়াই করেছিলেন শত্রু সৈন্যের বিরুদ্ধে?'

'হয়তো।'

'এই বাঙ্কারের মধ্যেই হয়তো কেউ দেশের জন্যে শহিদ হয়েছিলেন?' 'হয়তো।' বলেই আনমনা হয়ে গেলেন ক্যাপ্টেন দাস, তার হয়তো তোমারই মতন এমন সুন্দর একটা ছেলে ছিল—

চমকে ক্যাপ্টেন দাসের দিকে ফিরে তাকাল শাওন। তিনি তার দিকে তাকিয়ে হাসলেন। লজ্জা পেয়ে গেল শাওন।

ক্যাপ্টেন দাস তার মাথার চুলে আঙুল বোলাতে বোলাতে বললেন, 'দেশকে ভালোবেসে যাঁরা শহিদ হয়েছেন তাদের কথা ভেবে কষ্ট হচ্ছে তোমার শাওন?'

'হুঁ।' বলে মাথা নীচু করল শাওন। আবেগে গলার কাছটা টনটন করছে। চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে এল তার।

ক্যাপ্টেন দাস ভারি স্নেহের সঙ্গে আঙুল দিয়ে সেই জল মুছে দিলেন। তারপর খুব নরম গলায় বললেন, তাঁদেরও খুব কষ্ট হয় যখন তাঁরা দেখেন তোমরা যারা আগামী দিনের সৈনিক, তারা এই সুন্দর দেশটাকে ঠিকমতন যত্ন করছ না, সেবা করছ না, ভালোবাসছো না—

'আমরা সবাই তো সৈনিক হব না দাস আঙ্কল—'

হা হা করে হেসে উঠলেন ক্যাপ্টেন দাস 'বোকা ছেলে। হাতে অস্ত্র নিয়ে যুদ্ধক্ষেত্রে যাঁরা লড়েন তারাই কি শুধূ সৈনিক? এ দেশের প্রত্যেক নাগরিক—ডাক্তার—শিক্ষক—উকিল—ইঞ্জিনিয়ার সবাই দেশের জন্যে যুদ্ধে শামিল। নতুন শক্তিশালী দেশ গড়ার লক্ষে সবাই সৈনিক। শুধু দেখা চাই দেশের জন্যে এই লড়াই— এ তিনি সৎ কিনা—

শাওন হাঁ করে তাকিয়ে ছিল তাঁর দিকে। শাওনের দিকে তাকিয়ে তিনি হাসলেন। বললেন, 'আমি কি বোর করছি তোমায়?'

'একটুও না। আমার ভালো লাগছে।'

'তোমরা কি তাওয়াং যাচ্ছ নাকি ফিরছো ওখান থেকে?' সম্পূর্ণ অন্য প্রসঙ্গে চলে গিয়ে কথা বললেন ক্যাপ্টেন দাস।

'যাচ্ছি।'

'ভেরি গুড। তাহলে আমার একটা কাজ করে দেবে তুমি শাওন।'

'দেব।'

'কাজটা কিন্তু খুব ইম্পরট্যান্ট—'

কী কাজ বলুন—'

তাওয়াং—এ নিশ্চয়ই তোমরা ওয়ার মেমোরিয়ালে বেড়াতে যাবে—

'আমি জানি না। পরিদাদু জানে—'

'তাওয়াং থেকে কি অন্য কোথাও যাবে তোমরা?'

'আমরা বুমলা বেড়াতে যাব।'

'বুমলা যেতে গেলে ওখানে যেতেই হবে তোমাদের। ভালোই হল।

আমি তোমাকে একটা জিনিস দেব শাওন। ওয়ার মেমোরিয়ালে গিয়ে কর্নেল সি. কে. মজুমদারের সঙ্গে দেখা করে জিনিসটা দিয়ে দিও তাঁকে।'

'আচ্ছা—'

'খবর্দার অন্য কাউকে এ বিষয়ে কিছু বোলো না। আর কর্নেল মজুমদার ছাড়া আর কারও হাতে দেবে না এটা'—বলতে বলতে জামার পকেট থেকে একটা তামার জপযন্ত্র বের করে শাওনের হাতে দিলেন তিনি। বমডিলার বিভিন্ন দোকানে এমন জপযন্ত্র দেখেছে শাওন। এই জপযন্ত্র ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে মন্ত্র উচ্চারণ করে আরাধনা করেন এখানকার মানুষ।

বাইরে বৃষ্টি থেমে গেছে। মেঘ সরে গিয়ে ঝকমকে রোদ্দুর এসে পড়েছে পাহাড়ের গায়ে। ক্যাপ্টেন দাস শাওনের হাত ধরে টান মারলেন, 'আর একটুও দেরি নয়। নীচে চলো। তোমার বাড়ির লোক নিশ্চিত ভয়ানক চিন্তা করছেন তোমার জন্য।

দাস আঙ্কলের হাত ধরে বাঙ্কার থেকে বাইরে বেরিয়ে এল শাওন। ক্যাপ্টেন দাস হেসে হাত নাড়লেন তাকে। বললেন 'সাবধানে পা রাখবে পাথরের সিঁড়িতে। বেশি হুটোপাটা করে নামতে যেও না।'

'হ্যাঁ আঙ্কল।' শাওন আশ্বস্ত করে তাঁকে।

'দেশকে ভালোবেসো মন দিয়ে।'

'হুঁ।'

'যে কাজটা দিয়েছি মনে থাকবে?'

'থাকবে।'

'আর কাউকে বোলো না।'

'ঠিক আছে।'

'প্রমিস?'

'প্রমিস।'

'তাহলে এসো।' বলে পিছু ফিরে পাহাড়ের ওপর দিকে হাঁটতে শুরু করলেন ক্যাপ্টেন দাস। একটুক্ষণ সেদিকে তাকিয়ে থেকে জপযন্ত্রটা সাবধানে জ্যাকেটের পকেটে রেখে দ্রুত পায়ে নীচে নামতে লাগল শাওন।

শাওন নীচে নামতেই একছুটে তার কাছে এসে সুছন্দা জড়িয়ে ধরলেন তাকে। অরুণাংশু ধমক দিয়ে বললেন, 'কোথায় ছিলি এতক্ষণ?' পরিদাদু গম্ভীর গলায় বললেন, 'আর কোনো কথা নয়। এমনিতেই বহু দেরি হয়ে গেছে। এবার গাড়িতে চড়ো সব্বাই। বহু পথ যেতে হবে এখনও। পথে যেতে যেতে বাকি কথা সেরে নিও তোমরা।'

পথে কোথাও কোথাও আকাশ মেঘলা থাকলেও বৃষ্টি আসেনি। সেলা পাসে প্রথম জমে থাকা বরফ দেখল শাওন। সেলা পাসে গাড়ি থেকে নেমে অল্প অল্প মাথা ঘুরছিল সুছন্দার। পরিদাদু বললেন হাই অলটিচুডে কারও কারও নাকি অমন হয়। শাওনের অবশ্য কোনো অসুবিধা হল না। দীর্ঘপথ পাড়ি দিয়ে অবশেষে শাওনরা যখন তাওয়াং পৌঁছল, সন্ধে পেরিয়ে রাত নেমেছে তখন। পথশ্রমের ক্লান্তি তো ছিলই, তাছাড়া তাওয়াং এর ঠান্ডা রাত হাড় কাঁপানো।

অরুণাংশু হোটেলে ঢুকেই কম্বলের নীচে তলিয়ে গেলেন। শাওনও। পরিদাদু বললেন, 'আজ রেস্ট করো। কাল কিন্তু সকাল সকাল রেডি হয়ে ব্রেকফাস্ট সেরে বেরোতে হবে।'

'কোথায়?' বড় করে হাই তুলে জিজ্ঞেস করলেন সুছন্দা।

'তাওয়াং এর মূল গুম্ফা ঘুরে আমরা যাব অ্যানিগুম্ফা দেখতে। তার মাঝে তাওয়াং এর প্রশাসনিক ভবনে যেতে হবে বুমলা যাওয়ার পারমিশন নিতে।

'অ্যানিগুম্ফাটা আবার কী?' ঘুম ঘুম গলায় জিজ্ঞেস করলেন অরুণাংশু।

'অ্যানি মানে মহিলা। এই গুম্ফাটি সন্ন্যাসিনীদের।'

'আর ওয়ার মেমোরিয়ালে কখন যাব আমরা পরিদাদু?' উৎকণ্ঠিত গলায় জিজ্ঞেস করল শাওন।

'বিকেলে। বুমলা যাওয়ার প্রাথমিক ছাড়পত্র পাবার পর।'

'প্রাথমিক ছাড়পত্র মানে?' অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করেন অরুণাংশু।

'বুমলা যাওয়ার আলটিমেট পারমিশন দেবেন আর্মি অফিসাররা। মেমোরিয়ালের কাছ থেকে। তাছাড়া একটু বিকেল করে ওখানে যেতে চাইছি আরও একটা কারণে—'

'কী কারণ?'

'সন্ধের পর লাইট এন্ড সাউন্ডে বাষট্টির যুদ্ধের একটা ডেমো দেখানো হয় ওখানে। ওই শো—টা শুনেছি অসাধারণ।'

'সত্যি?' সুছন্দা জিজ্ঞেস করেন চোখ গোল গোল করে।

'তাই তো শুনেছি।' বলে শব্দ করে হাই তুলতে তুলতে নিজের ঘরের দিকে পা বাড়ান পরিদাদু।

পরদিন শাওনরা যখন তাওয়াং ওয়ার মেমোরিয়ালের সামনে এসে দাঁড়াল তখন বিকেল পাঁচটা বেজে গেছে। পরিদাদু তড়িঘড়ি ছুটলেন বুমলা যাবার পারমিশন আদায় করতে। অরুণাংশু আর সুছন্দাও তার সঙ্গে এগোলেন। শাওনের অন্য কোনোদিকে মন ছিল না। একটা চাপা উত্তেজনায় ছটফট করছিল সে মনে মনে। এবার সেই গুরুদায়িত্বটা পালন করতে হবে তাকে। এই দু—দিন অত্যন্ত যত্নে জিনিসটাকে বয়ে বেড়িয়েছে সে। ওটার কথা কাউকে বলেনি। এমনকি পরিদাদুকেও নয়। জ্যাকেটের পকেটে রাখা জপযন্ত্রটাকে হাত দিয়ে একবার স্পর্শ করে নিল সে। তারপর গুটি গুটি পায়ে এগিয়ে গেল ওয়ার মেমোরিয়ালের উলটোদিকের যে রাস্তাটা দু—সারি গাছের মাঝখান দিয়ে এগিয়ে গেছে মিলিটারি কোয়াটার্সের দিকে তার গেটে দাঁড়ানো তরুণ আর্মি অফিসারটির দিকে। শাওনকে তাঁর সামনে এসে দাঁড়াতে দেখে অফিসারটি মিষ্টি করে হাসলেন। তারপর শাওনের কাঁধে হাত রেখে হিন্দিতে প্রশ্ন করলেন, 'কিছু বলবে আমায়?'

'হ্যাঁ।' ওপর নীচ মাথা নাড়ায় শাওন।

'বলো।'

'আমি কর্নেল সি কে মজুমদারের সঙ্গে দেখা করতে চাই।'

'কেন?'

'সেটা তাঁকেই বলতে হবে।' হিন্দি ইংরেজি মিলিয়ে মিশিয়ে কথা বলে চলল শাওন।

তুমি কি তাঁকে চেনো?

'না।'

'তাহলে?'

'আমি ওঁকে একটা জিনিস দিতে চাই।'

'কী জিনিস?'

'সেটা আপনাকে বলা যাবে না—'

শাওনের সঙ্গে ওই অফিসারের কথোপকথনের মাঝখানেই পরিদাদু, সুছন্দা, অরুণাংশু ও রাভা আঙ্কল এসে দাঁড়ালেন শাওনের কাছে। শাওনের কথা শুনে তাঁরাও বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গেলেন। শাওনের কাঁধে হাত রেখে পরিদাদুও জিজ্ঞেস করলেন এবার, 'কর্নেল মজুমদারকে কী এমন জিনিস দিতে চাস তুই শাওন, যার কথা কাউকে বলা যায় না। এমনকি আমাদেরকেও তো তুই এ বিষয়ে আগে কিছু বলিসনি—'

'বলা বারণ পরিদাদু—' অসহায় ভঙ্গিতে মাথা নেড়ে বলে শাওন।

'কার বারণ?'

'দাস আঙ্কলের—'

'মানে যশোবন্ত ঘরে যিনি তোকে রেসকিউ করেছিলেন?'

'হুঁ।'

'তিনিই কি জিনিসটা তোকে দিয়েছেন?'

'হ্যাঁ।'

সুছন্দা এগিয়ে এসে শাওনের মাথায় হাত রেখে বললেন, 'জিনিসটাতো তুমি এঁকেই দিয়ে দিতে পারো শাওন, ইনিই না হয় পৌঁছে দেবেন ওটা কর্নেল মজুমদারকে—

'ওটা আর কারও হাতে দেওয়া যাবে না মা। আমি প্রমিস করেছি দাস আঙ্কলের কাছে।'

আর্মি অফিসারটি হাত তুলে বললেন, 'ওকে ওকে। তারপর আর দু—একজন সিনিয়র অফিসারের সঙ্গে কথা বলে টেলিফোনের রিসিভার তুলে নাম্বার ডায়াল করতে লাগলেন।

মিনিট পাঁচেকের মধ্যে অত্যন্ত স্মার্ট এবং রাশভারী একজন অফিসার এসে দাঁড়ালেন শাওনের সামনে। অন্যান্য জওয়ানেরা তাঁকে স্যালুট করে সসম্ভ্রমে নিজেদের জায়গায় ফিরে গেলেন। ইউনিফর্মের বুক পকেটের ওপরে থাকা নেমপ্লেট দেখে তাঁকে চিনে নিতে অসুবিধা হল না শাওনের। সে এগিয়ে গেল তাঁর দিকে। তিনি শাওনের মাথায় হাত রাখলেন। চওড়া কাঁচাপাকা গোঁফের আড়ালে মৃদু হেসে স্পষ্ট বাংলায় বললেন, 'বলো মিঃ শাওন আমাকে কী দরকার তোমার?' শাওন জ্যাকেটের পকেট থেকে খুব সাবধানে জপযন্ত্রটা বের করে কর্নেল মজুমদারের দিকে বাড়িয়ে দিল, 'এটা আপনাকে দেবার জন্যেই... কী এটা?' অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন কর্নেল মজুমদার।

'আমিও জানি না দাস আঙ্কল কেন এই জপযন্ত্রটা এত গোপনীয়তার সঙ্গে রাখতে বললেন এবং শুধুমাত্র আপনার হাতেই—'

'কোন দাস আঙ্কল?' জপযন্ত্রটা হাতে নিয়ে ঘোরাতে ঘোরাতে সরু চোখে জিজ্ঞেস করলেন কর্নেল মজুমদার।

'যশবন্ত ঘরের দাস আঙ্কল, ক্যাপ্টেন বি. এন দাস—'

'হোয়াট?' প্রায় চিৎকার করে উঠলেন কর্নেল মজুমদার, 'তুমি তাঁকে দেখেছো?'

'হ্যাঁ।' শান্ত কণ্ঠে বলে শাওন।

'কেমন দেখতে তাঁকে মনে আছে?' উত্তেজিত কণ্ঠে বললেন তিনি।

'আছে। খুব লম্বা চওড়া, ডান গালে কালো জড়ুল—

'এই রকম?' বলে শাওনের হাত ধরে টেনে নিয়ে গিয়ে ওয়ার মেমোরিয়ালের ভেতরে একটা সাদাকালো গ্রুপ ফটোর সামনে দাঁড় করিয়ে দিলেন কর্নেল মজুমদার। তারপর একটা ছবির ওপর আঙুল রেখে বললেন, 'দিস ক্যাপ্টেন দাস?'

'হ্যাঁ ইনিই।' খুব শান্তভাবে বলে শাওন।

'স্ট্রেঞ্জ, স্ট্রেঞ্জ—' বলতে বলতে জপযন্ত্রটার দিকে একটুক্ষণ তাকিয়ে রইলেন কর্নেল মজুমদার। তারপর কী মনে করে ওটার ওপরের ঢাকনা মতন অংশটা খুলে ফেললেন। জপযন্ত্রের দণ্ডে গোল করে একটা কাগজ পাকিয়ে রাখা রয়েছে। সব জপযন্ত্রেই এটা থাকে! তিব্বতি ভাষায় নানা পবিত্র মন্ত্র লেখা থাকে ওই কাগজে। দু—আঙুলে খুব যত্ন করে কাগজটা দণ্ড থেকে খুলে ফেললেন কর্নেল মজুমদার। তারপর কাগজটাকে সোজা করে মেলে ধরলেন চোখের সামনে। দু—এক মুহূর্তের মধ্যেই উদ্ভাসিত হয়ে উঠল তাঁর মুখ। কাঁপা কাঁপা গলায় দু—বার 'মাই গড' বললেন তিনি। তারপর শাওনের দিকে ফিরে 'আনবিলিভেবল' বলে দু—হাতে জড়িয়ে ধরলেন তাকে।

অন্যদের কাছে পুরো ব্যাপারটাই ধোঁয়াশা। শাওন নিজেও ভারী অপ্রস্তুত বোধ করছিল মনে মনে। কৌতূহল চেপে রাখতে না পেরে পরিদাদুই শেষে জিজ্ঞেস করলেন, 'জপযন্ত্রটায় কী আছে কর্নেল মজুমদার?'

'পুরো ব্যাপারটা বলা যাবে না,' কর্নেল মজুমদার মৃদু হাসলেন,

'বিষয়টা সামরিক স্ট্র্যাটেজি সংক্রান্ত এবং সিক্রেট। শুধু এটুকু বলতে পারি যে এটা অত্যন্ত ইমপরট্যাক্ট এবং প্রয়োজনীয়। এই বিষয়ে আমরা এই মুহূর্তে কাজ করছি। ক্যাপ্টেন দাস এ নিয়ে সার্ভে করেছিলেন সিক্সটি টুতে। কাজটা শত্রুদের হাতে পড়লে আমাদের ক্ষতি হতে পারত। ফরচুনেটলি তিনি হতে দেননি। তাঁকে ধরে ফেললেও এটা শত্রুরা পায়নি। সেনাবাহিনী এ বিষয়টা জানতো। পরে এটার অনুসন্ধানও হয়েছে প্রচুর, কিন্তু এটাকে ট্রেস করা যায়নি। আমরা আমাদের সিনিয়ার অফিসিয়ালদের কাছে এ ব্যাপারে প্রচুর আক্ষেপ শুনেছি।

'তাহলে ক্যাপ্টেন দাস এটা এতদিন লুকিয়ে রাখলেন কেন? আরও আগেই তো এটা দিয়ে দিতে পারতেন উনি—' জিজ্ঞেস করলেন অরুণাংশু।

'পারতেন না—' দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন কর্নেল মজুমদার।

'কেন?' অবাক গলায় জিজ্ঞেস করলেন সুছন্দা।

কর্নেল মজুমদার হাসলেন, 'সিক্সটি টুতে যে আর্মি অফিসার দেশের হয়ে যুদ্ধ করেছিলেন তিনি কি এখনও জোয়ান থাকতে পারেন?'

'মানে?'

'আসুন আমার সঙ্গে—' বলে হাঁটতে হাঁটতে একটা দেওয়ালজোড়া শ্বেত পাথরের ফলকের সামনে এসে দাঁড়ালেন কর্নেল মজুমদার। 'বাষট্টির যুদ্ধে নিহত শহীদদের তালিকা'— বলে একটি নামের ওপর আঙুল রাখলেন তিনি, 'দেখুন—'

ক্যাপ্টেন বি. এন. দাস—কালো ইংরেজি হরফে স্পষ্ট করে লেখা রয়েছে সেখানে নামটা।

কামেং উপত্যকায় সবুজ সবুজ পাহাড়ের মাথায় গোলাপি আলোর আভা ছড়িয়ে সূর্য পাটে যাচ্ছে তখন। সেনাবাহিনীর বিউগল—এ বেজে উঠেছে বিদায়বেলার সুর। শ্রদ্ধায় ও মর্যাদায় নামিয়ে নেওয়া হচ্ছে জাতীয় পতাকা। পাথরের মতন স্থির অথচ দৃঢ়ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে জাতীয় পতাকাকে স্যালুট জানাচ্ছেন সেনাজওয়ানরা। সেদিক তাকিয়ে বুকের মধ্যেটা ভারী হয়ে উঠল শাওনের। চোখে জল এসে গেল তার। অজান্তে তার নিজের ডানহাতটাও স্যালুটের ভঙ্গিতে উঠে গেল কপালের কাছে। দেশের জন্যে, জাতীয় পতাকার জন্যে, এমনকি যশোবন্ত ঘরের ক্যাপ্টেন দাস আঙ্কলের জন্যেও।

অধ্যায় ১ / ১৩
সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%