রহস্যময় মঠের খোঁজে

জয়দীপ চক্রবর্তী

পথটা বেশ খাড়াই। সাবানের ফেনার মতন বরফ পড়ে জমে রয়েছে রডোডেনড্রন গাছের গোড়ায় গোড়ায়। হাঁটতে হাঁটতে শাওন অনেকখানি পিছিয়ে পড়েছিল। বেশ হাঁপিয়ে গেছে সে। পরিদাদু হাতের লাঠিতে ভর দিয়ে ধীর পায়ে সামনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিলেন। এগোতে এগোতেই পিছন ফিরে চাইলেন তিনি। শাওন তখন দাঁড়িয়ে পড়েছে। হাতের লাঠির ওপরে একটু ঝুঁকে দাঁড়িয়ে জোরে জোরে প্রশ্বাস নিচ্ছিল সে। ওকে দাঁড়িয়ে পড়তে দেখে পরিদাদু থামলেন। শাওনের দিকে চেয়ে বললেন, 'খুব কষ্ট হচ্ছে শানু?'

'খুব কষ্ট হচ্ছে যে এমন নয়', পরিদাদুর দিকে চেয়ে হাসে শাওন, 'হাঁপিয়ে গেছি। দাঁড়াও একটু দম নিয়ে নিই।'

'পথটা বেশ খাড়াই। কষ্ট হবারই কথা। আমার নিজেরই দমের ঘাটতি হয়ে যাচ্ছে মনে হচ্ছে। তাছাড়া চালু রাস্তাও তো কিছু নেই। পথ করে এগোতে হচ্ছে আমাদের। এই ধরনের পাহাড় চড়ায় বিপদও থাকে নানারকম। ওইজন্যেই বলেছিলাম তোর আসার দরকার নেই। খুকু আর অরুণাংশুর সঙ্গে দিব্বি হোটেলে থেকে যেতে পারতিস তুই। তা না বোকার মতন জেদ ধরলি যে আমার সাথে আসবি...' পরিদাদু থেমে থেমে দম নিয়ে নিয়ে বলতে লাগলেন।

'আমি ঠিক আছি পরিদাদু। আর কোনো অসুবিধে নেই। চলো'। বলে শাওন সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল। তারপর দু-হাত দিয়ে পিঠের ন্যাপস্যাকটার স্ট্র্যাপদুটো ধরে একটু ঝাঁকিয়ে ব্যাগটাকে সোজা করে নিয়ে হাঁটতে লাগল পরিদাদুর দিকে। পরিদাদু কয়েক পা পিছিয়ে এসে ওর মাথায় হাত রেখে হেসে উঠলেন। তারপর শাওনের কাঁধে আলতো চাপড় মেরে বলে উঠলেন, 'বুঝেছি বুঝেছি। মস্ত বীরপুরুষ তুই শানু। নে নে, হয়েছে। জোর জবরদস্তি হাঁটতে যাস না বাহাদুরি করে। দু-মিনিট জিরিয়ে নিয়েই না হয় আবার রওনা হওয়া যাবেখন। সবসময় একটা কথা মাথায় রেখে দিবি। পাহাড়ের সঙ্গে কক্ষনও চালাকি চলে না। পাহাড়কে চ্যালেঞ্জও জানাতে নেই কোনোদিন। তার কাছে মাথা নীচু করে দীনের মতন প্রার্থনা জানাতে হয় যাতে সে তার সৌন্দর্য আর রহস্য নিজে থেকে আনফোল্ড করে আমাদের কাছে। অহংকার আর লোভ নিয়ে তার কাছে গিয়েছো কি মরেছো। সে তার মতন করে তোমার ওপরে প্রতিশোধ নেবেই।'

মিস্টার লি হো তখন খানিক তফাতে দাঁড়িয়ে রাস্তার পাশের একটা উঁচু চ্যাটালো পাথরের ওপরে তাঁর ব্যাগ থেকে হাতে আঁকা একটা ম্যাপ বের করে বিছিয়ে খুব মন দিয়ে দেখছিলেন। পরিদাদু সেদিকে তাকিয়ে গলা তুলে জিজ্ঞেস করলেন, 'মিস্টার লি, আর কতদূর? এখনই তো প্রায় এগারোটা বেজে গেছে। আপনি যে বলেছিলেন ওখানে একদিনের মধ্যেই গিয়ে ফিরে আসা যায় আবার। মাত্রই আট আট ষোলো কিলোমিটারের মতন ট্রেক। খুব বেশি হলে যাওয়া আসা মিলে সতেরো আঠেরো?'

লি কাগজটা থেকে চোখ তুললেন না। গম্ভীর গলায় বললেন, 'ম্যাপ বলছে প্রায় এসেই গেছি আমরা। সামনে একটা খাড়া পাহাড় পড়বে। ওটা পেরোলেই একটা রেকট্যাঙ্গুলার মস্ত ভ্যালি আছে। জায়গাটা ওই উপত্যকারই আশেপাশে। অন্তত সাইরাস আমাকে তাই বলেছিল।'

'সাইরাস কে?' পরিদাদু চোখ কুঁচকে জিজ্ঞেস করেন।

'পাহাড়ে ঘুরে বেড়ানোটা সাইরাসের একটা নেশা। হিমালয়ের বিভিন্ন প্রান্তে সে ঘুরে ঘুরে বেড়াত। দীর্ঘদিন ধরে এই পর্বতের বিভিন্ন দিকে নানা অবস্কিওর জায়গায় ঘুরে বেড়িয়েছে সাইরাস। গত দশ বছরে আমি নিজেও বহুবার তার সঙ্গী হয়েছি। লাদাখ থেকে নেপাল বহু জায়গায় আমি তার অভিযানে সঙ্গ দিয়েছি। এই অঞ্চলেও এসেছি এর আগে। কিন্তু ওই মঠটাকে খুঁজে পাইনি। শুনেছি তিব্বতের কাছাকাছি কোথাও জায়গাটা। অথচ এগজ্যাক্ট লোকেশনটা বের করতে পারিনি কোনোভাবেই। বহুজনকে জিজ্ঞেস করেছি মঠটা কোথায়। অনেকেই বলেছে এই মঠের কথা তারা শুনেছে। এই অঞ্চলে হঠাৎ দুর্যোগে পড়ে গিয়ে এই মঠের সন্ন্যাসীদের সাহায্যে বেঁচেও ফিরেছে তাদের কেউ কেউ। এমনকি সাইরাসও। এই অঞ্চলে ঘুরতে ঘুরতে মারাত্মক প্রাকৃতিক দুর্যোগের মধ্যে পড়ে গিয়েছিল সাইরাস। তুমুল ঝোড়ো হাওয়ায় তার টেন্ট ছিঁড়ে গিয়েছিল। সেইসময়েই এক সন্ন্যাসী... তার মুখেই শুনেছি ছোটদের ভারি ভালোবাসে তারা। ছোটরা যদি মন দিয়ে চায় সেখানে যেতে...'

পরিদাদু তাঁর কথার মাঝখানেই বলে উঠলেন, 'তার মানে আপনি নিজে জায়গাটা চেনেন না।'

'চিনি না মানে নিজে যাইনি কখনও সেখানে। তবে অনেকের কাছেই শুনেছি জায়গাটা এখানেই। সাইরাসের বর্ণনা থেকে যে ম্যাপ আমি তৈরি করে নিয়েছি... আশা করছি এই রুট ম্যাপ আমাদের ভুল পথে নিয়ে যাবে না। আমরা জায়গাটা ঠিক খুঁজে বের করব। আমাদের খুঁজে বের করতেই হবে।'

'সাইরাস স্পষ্ট কিছু নিশানা দেয়নি?' পরিদাদু অবাক হয়ে বলেন, 'আপনি যে তবে বলেছিলেন জায়গাটা আপনার চেনা? আপনার কাছে নির্দিষ্ট রুটম্যাপ আছে?'

'ম্যাপ তো রয়েছেই', লি বলেন, 'আসলে একেবারে শেষটায় ওই মঠে কী করে ঢুকেছিল সেটা সাইরাস আমায় ঠিকমতন বলতে পারেনি। ও নাকি মনে করতে পারছিল না। সাইরাস বেশ অসুস্থ তখন। তাছাড়া ওর মাথা কাজ করছিল না। অ্যালঝাইমার স্টার্ট করে গেছে...'

'অমন একটা মানুষের কথার ওপরে নির্ভর করে তাহলে আমাদের এখানে আসাটা ঠিক হয়নি', পরিদাদু বিরক্ত হয়ে বলেন, 'এ ধরনের মিথ বহু মানুষের মুখেই শোনা যায়। ইন ফ্যাক্ট তাওয়াং মোনাস্টারি সম্পর্কেও এমন অনেক গল্প শুনেছি আমি অনেকের মুখে। কিন্তু নিজে গিয়ে প্রায় কিছুই চোখে পড়েনি আমার। অবশ্য তাওয়াং গুম্ফার অনেক গুপ্ত প্রকোষ্ঠও আছে। তার সবগুলোয় ওঁরা আমাকে অ্যালাও করেননি... বাই দা বাই, আমার মনে হয় আমাদের এবারে ফিরে যাওয়া উচিত লি।'

'কক্ষনও না', গম্ভীর গলায় বলে ওঠেন লি, 'লক্ষ্যের এত কাছে এসে কিছুতেই আমি ফিরব না'।

লি র কণ্ঠস্বরে এমন কিছু ছিল যে বুক কেঁপে উঠল শাওনের। সে স্পষ্ট বুঝতে পারল যে তারা একটা কোনো বিপদে পড়তে চলেছে। আড়চোখে একবার পরিদাদুর দিকে তাকাল সে। পরিদাদুও কি আঁচ করেছেন কিছু? তা নইলে এমন মরিয়া হয়ে ফিরে যেতে চাইছেন কেন পরিদাদু? শুধুই কি পাহাড়ি পথের দুর্গমতা আর ক্লান্তির জন্যে? নিশ্চিত তা নয়। শুধু সে কারন হলে তাঁর মুখটা অমন পালটে যেত না। পরিদাদুর পাথরের মতন কঠিন এই মুখটাকে শাওন চেনে। পরিদাদু এগিয়ে এসে শাওনের বাঁ হাতটা চেপে ধরলেন ডান হাত দিয়ে। তারপর ঘুরে দাঁড়িয়ে বললেন, 'চল শানু, আমরা ফিরে যাই। আর অপেক্ষা করলে দেরি হয়ে যেতে পারে।'

লি দৌড়ে এসে পরিদাদুর লাঠিধরা বাঁ হাতটা চেপে ধরলেন, 'লিসন, চ্যাটার্জী, ওই খাড়া পাহাড়টা টপকালেই কিন্তু সেই গুপ্ত মঠ। আমি খবর নিয়েছি। এত কাছে এসেও অমন আশ্চর্য মঠটা একবার চোখে দেখবেন না? আপনি সাহসী মানুষ। তাছাড়া এসব বিষয়ে আপনার এমন আগ্রহ বলেই এতবার করে বলছি আপনাকে। এমন মিস্টেরিয়াস একটা জিনিস... ফেলে রেখে পালাবেন... ঠিক আছে আই সোয়্যার, ওই উঁচু চড়াই ডিঙিয়ে ওপারে গিয়েও যদি কিছু না পাই তাহলে আমরা ব্যাক করব ওকে?'

'ঠিক আছে। এটাই ফাইনাল', অনিচ্ছে নিয়েও যেন রাজি হলেন পরিদাদু, 'আমি একা থাকলে কোনো ব্যাপার ছিল না, কিন্তু আমার সঙ্গে শানু আছে...'

'শানু আছে বলেই আপনাকে এত করে থেকে যেতে বলছি মিস্তার চ্যাতার্জি', লি হাসেন, 'দেশের পুরনো গ্লোরিগুলো ছোট বয়েসে দেখলে তবেই না দেশের প্রতি একটা শ্রদ্ধা তৈরি হয়, মনে হয় দেয়ার আর সো মেনি থিংস টু বি প্রাউড়..' লি ম্যাপটা সরু করে পাকিয়ে পিঠ ব্যাগটায় ভরে ফেলে হাঁটতে শুরু করেন আবার সামনের পাহাড়টার দিকে। পরিদাদু শাওনের দিকে তাকান। বোতল থেকে জল খান এক ঢোক। তারপর বলেন, 'চল। বেশি এগিয়ে বা পিছিয়ে যাস না। আমার সঙ্গে সঙ্গে থাকিস।'

লি হো-র সঙ্গে আলাপ হয়েছিল গতকাল। বুমলা পাসে। সক্কালবেলা তাওয়াং থেকে বেরিয়ে সাঙ্গেটসার লেক দেখে বুমলা পৌঁছেছিল ওরা। বুমলার দু-আড়াই কিলোমিটার আগে থেকে রাস্তা এতটাই খারাপ ছিল যে শেষটা হেঁটেই উঠতে হল ওদের। ভাগ্যিস উঠেছিল। না হলে জানাই হত না জায়গাটা এত সুন্দর। আর্মির লোকেরা গরম গরম পকোড়া আর চা খাইয়েছিলেন। সাদা বরফে মোড়া এলাকাটা জুড়ে হু হু করে ঠান্ডা কনকনে হাওয়া বইছিল সারাক্ষণ। হাড়ের ভিতর পর্যন্ত ঢুকে গিয়ে সেই হাওয়া শরীর কাঁপিয়ে দিচ্ছিল ক্রমাগত। পাহাড়ি পথে হেঁটে এতটা পথ উঠে বেশ হাঁপিয়ে গিয়েছিলেন সুছন্দা। অরুণাংশুকেও কাহিল লাগছিল। সেইসময় গরম চা খেয়ে খুব তৃপ্তি পেয়েছিল সব্বাই। সামনের গোল মতন পাথরটার দিকে অবাক হয়ে চেয়েছিল শাওন। পরিদাদু বলছিলেন, 'বুঝলি শানু, পাথরের ওদিকটাই চীন...'

'তাই?' অবাক হয়ে বলছিল শাওন, 'ওই যে ওইদিকে যে পাহাড়গুলো দেখা যাচ্ছে ওগুলো তাহলে আমাদের দেশের নয়?'

'উঁহু', দু দিকে মাথা নাড়েন পরিদাদু।

'দূরের পাহাড়গুলোকে কেমন যেন রহস্যে মোড়া বলে মনে হয় বলো পরিদাদু?' শাওন বলছিল। ঠিক সেইসময়েই কথা বলে উঠেছিলেন ভদ্রলোক ভাঙা ভাঙা বাংলায়। শাওনের মাথার টুপির ওপরে হাত বুলিয়ে বলেছিলেন, 'টিবেট ইজ আ ভেরি মিস্টেরিয়াস ল্যান্ড। কিন্তু এদিককার পাহাড়ের ফাঁকে ফোকরেও যে কত আনসলভড মিস্ট্রি ভরে রাখা রয়েছে শত শত বছর ধরে তার ইয়ত্তা নেই।'

পরিদাদু তাঁর দিকে ঘুরে তাকাতেই হেসে পরিদাদুর দিকে হাত বাড়িয়ে দিলেন তিনি, 'আমার নাম লি মিন হো।'

'আপনি চাইনিজ?' সুছন্দা জিজ্ঞেস করলেন এগিয়ে এসে।

'আমার ফোরফাদাররা তাই। আমি অবশ্য এ দেশেই... আপনারা কলকাতা থেকে তো?'

'হুঁ।'

'আপনি তো দিব্বি বাংলা বলেন মশাই?' অরুণাংশু অবাক হয়ে বলেন।

'আমি দীর্ঘদিন কলকাতায় ছিলাম। ট্যাংরা অঞ্চলের কাছাকাছি'। লি হো হেসে বলেন।

'আই সি'। অরুণাংশু মাথা নাড়েন।

'এদিকের পাহাড়ের কী যেন আনসলভড মিস্ট্রির কথা বলছিলেন মিস্টার হো?' পরিদাদু আগ্রহ নিয়ে জিজ্ঞেস করেন।

'অরুণাচলের তাওয়াং গুম্ফা নিয়েও বিস্তর মিথ আছে শুনেছেন কি না জানি না', লি হো বলতে শুরু করলেন। পরিদাদু তাঁকে কথার মাঝপথেই থামিয়ে দিলেন, 'আমি শুনেছি। ইন ফ্যাক্ট বৌদ্ধ তান্ত্রিকতা এবং বৌদ্ধ লামাদের অদ্ভুত সব কাণ্ডকারখানার বিষয়ে আমার ব্যক্তিগত আগ্রহ আছে। তাওয়াং তেমনই এক প্রাচীন গুম্ফা আমি জানি। এখানেও অনেক বিস্ময় আড়াল করে রাখা আছে মানুষের দৃষ্টির বাইরে। আমি সেই রহস্যের কাছাকাছি পৌঁছতে চেয়েছিলাম। তাওয়াং এ আসার উদ্দেশ্যও ছিল আমার খানিকটা তাই...'

'কিছু পেলেন?' উজ্জ্বল চোখে জিজ্ঞেস করলেন লি।

'উঁহু', দু দিকে মাথা নাড়লেন পরিদাদু।

'দে আর টু মাচ কনসাস', মাথা নেড়ে বললেন লি, 'ওরা আপনাকে সেই রহস্যের ধারে কাছে পৌঁছতেই দেবে না। আমিও ট্রাই করেছিলাম। পাইনি কিছু। ওখানে একটা পুরোনো লাইব্রেরি আছে। বহু প্রাচীন আর দুস্প্রাপ্য পুঁথি আছে সেখানে। সোনা দিয়ে লেখা পুঁথি। বহু রিকোয়েস্ট করার পরেও ওরা আমায় অ্যালাও করেনি লাইব্রেরিতে...'

'আমিও ঢুকতে চেয়েছিলাম', পরিদাদু লি র কথায় সায় দিয়ে বলেন, 'কিন্তু আমায় বলল যে লামার কাছে চাবি থাকে তিনি নেই। আমি বললাম বেশ পরের দিন আবার আসব। তাতে ওঁরা বললেন সে লামার ফিরতে একমাসও নাকি লেগে যেতে পারে। বুঝলাম ওরা আমাকে ওখানে যেতে দিতে চান না।'

'বললাম তো। কম দিন ঘুরছি এই লাইনে?' লি আফশোসের ঢং এ বললেন।

'আপনারও কি এই বিষয়ে ইন্টারেস্ট আছে?' অরুণাংশু জিজ্ঞেস করলেন।

'পুরোনো পুঁথি আর আশ্চর্য যোগ বিদ্যা নিয়ে একটা পেপার তৈরি করছি আমি।'

'ও'। পরিদাদু বললেন।

'লি হঠাৎই পরিদাদুর দিকে চাইলেন, 'আপনাদের হাতে দিন কয়েক সময় আছে?'

'দিন কয়েক মানে? কত দিন?'

'এই ধরুন দুটো দিন স্পেয়ার করতে পারবেন? তাহলে একটা রিমার্কেবল এক্সপিডিশনের এক্সপিরিয়েন্স হয়ে যেতে পারে আপনাদের।'

'কী রকম?'

'এখান থেকে খুব দূরে নয় জায়গাটা', লি হো বলতে শুরু করেন, 'তবে পথটা কঠিন। একদিনের মধ্যে গিয়ে ফিরে আসা যাবে একটু কষ্ট করতে পারলে...'

'কী আছে ওখানে?'

'এক আশ্চর্য মঠ। হাজার বছর বয়েসি সন্ন্যাসীরা পর্যন্ত ওখানে আছেন বলে শুনেছি। কেউ কেউ তার চেয়েও বেশি বয়েসি...'

'যাহ, তা আবার হয় নাকি?' সুছন্দা বলে ওঠেন অবিশ্বাসী গলায়।

'অতিরঞ্জিত', অরুণাংশু বলেন। লি হো বলতে শুরু করেন আবার, 'মৃত্যুকে নাকি জয় করেছেন ওঁরা। সময়কেও বেঁধে ফেলেছেন নিজেদের ইচ্ছে মতন। মর্জি মাফিক তাঁরা পার্থিব যে কোনো জিনিস তৈরি বা ধ্বংস করে ফেলতে পারেন। সেই আশ্চর্য মঠের বৈজ্ঞানিক সন্ন্যাসীরা সূর্যবিজ্ঞান ও চন্দ্রবিজ্ঞান করায়ত্ত করেছেন বহুদিন আগেই। পুঁথির পর পুঁথি জুড়ে তাঁদের গবেষণার পদ্ধতি ও প্রয়োগ বিস্তারিতভাবে লিখে তাঁরা যুগ যুগ ধরে সংরক্ষণ করছেন সেই মঠের অসম্ভব লোভনীয় গ্রন্থাগারে।'

'এমন একটা অলৌকিক জ্ঞানমঠের কথা আমি শুনেছিলাম, কিন্তু বিশ্বাস করিনি', পরিদাদু বললেন।

'একটা নয়', লি আকাশের দিকে চেয়ে বললেন, 'তিব্বত ও ভারত মিলিয়ে এমন মঠের সংখ্যা অন্তত বারোটি।'

'অদ্ভুত', অরুণাংশু বললেন, 'কিন্তু সেখানে কি যে কেউ ইচ্ছে করলেই যেতে পারে?'

'তেমন শারীরিক আর মানসিক জোর থাকলে না যাবারই বা কী আছে। ওখানে গেছে এমন একজনের থেকেই আমি এই জায়গাটার সন্ধান পেয়েছি। জায়গাটা লোকেট করে ম্যাপও তৈরি করে নিয়েছি আমি। কাল রওনা হচ্ছি। আপনার ব্যাপারটায় আগ্রহ আছে বলে বলছি চাইলে আপনারা যেতে পারেন।'

'অমন দুর্গম রাস্তায় আমরা কী করে যাব। আমাদের কি আর পাহাড় বাইবার অভ্যেস আছে?' সুছন্দা বলে উঠলেন।

'আমিও যেতে পারব না। আজ বুমলা উঠতেই যেমন হাঁপ ধরে গেল, আপনার সঙ্গে গেলে কাল নির্ঘাত ফুসফুস বাস্ট করবে আমার', অরুণাংশু ঠোঁট উলটে বললেন।

'আমি যাব', পরিদাদু বলে উঠলেন।

'আমিও যাব পরিদাদুর সঙ্গে', শাওন সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠল।

'খবর্দার না', সুছন্দা বলে উঠলেন, 'তুই পারবি না। শেষে ঘুরতে এসে কোথায় কী বিপদ বাঁধাবি। আর তোমাকেও বলিহারি পরিকাকু, যেই শুনলে রহস্যের কথা অমনি ছুট! বয়েস হচ্ছে তো সে কথাটা আর কবে মনে রাখবে...'

'একদিনেরই তো ব্যাপার খুকু', আবদার করার ঢং-এ বললেন পরিদাদু, 'তোরা হোটেলে আমার জন্যে ওয়েট করিস একটা দিন। পারলে আশেপাশে একটু ঘুরে নিস নিজেদের মতন। আমি তো পরের দিনেই ফিরে আসব আবার।'

'আমি কিন্তু তোমার সঙ্গে যাব পরিদাদু', শাওন আবার বলে।

'ছেলেমানুষের মতন বায়না করিস না শানু', পরিদাদু বোঝাবার চেষ্টা করেন তাকে। কিন্তু শানু জেদ ধরেই থাকে, 'তুমি গেলে আমিও যাব'। শেষে লি হো-ই ভরসা দিলেন। বললেন, 'ঠিক আছে চলুক। ভয় নেই। এলাকায় মঠের সন্ন্যাসীরা নজর রাখেন সবসময়। অসুবিধা হবে বলে মনে হয় না।'

তারপর আজ সকালেই লি পরিদাদু আর শাওন বেরিয়ে পড়েছে একেবারে কাকভোরে। সুছন্দা আর অরুণাংশু কালই ফিরে গেছেন তাওয়াং-এ। ওখানেই অপেক্ষা করবেন তাঁরা পরিদাদু আর শাওনের জন্যে।

রাস্তাটা এতটাই খাড়া যে দম বন্ধ হয়ে আসছিল শাওনের। পরিদাদুও প্রশ্বাস নিচ্ছিলেন হাঁপরের মতন। লি-কে দেখেও বোঝা যাচ্ছিল আর পারছেন না ভদ্রলোক। তবু ওদের দু-জনের তুলনায় এখনও অনেকটাই স্টেডি তিনি। পরিদাদু বললেন, 'শানু তোর বোতল থেকে এক ঢোক জল দে তো, আমার বোতল শেষ'।

'দিচ্ছি দাঁড়াও' বলে পিঠ থেকে ন্যাপস্যাকটা নামায় শাওন। পাশের খোপ থেকে জলের বোতলটা বের করে। তারপর শুকনো গলায় বলে আমার বোতলের জলও শেষ পরিদাদু। দু-ঢোক হবে বড়জোর।'

'রেখে দে তাহলে। তোর জল লাগবে তো', ক্লান্ত গলায় বলেন পরিদাদু।

'না না নাও তুমি'। শাওন বোতল এগিয়ে দেয় পরিদাদুর দিকে।

পরিদাদু শাওনের দিকে তাকিয়ে হাসেন। বলেন, 'ঠিক আছে এক ঢোক আমার, এক ঢোক তোর।'

দুপুর গড়াতে শুরু করেছে তখন। খাড়াই পথ শেষ। এবার ঢালু হয়ে পাহাড়টা নীচের দিকে নামছে। তার পায়ের কাছে বেশ অনেকখানি চ্যাটালো সমতল। লি হো আনন্দে চিৎকার করে উঠলেন, 'ওই তো সেই উপত্যকা'। পরিদাদু সেদিকে তাকিয়ে রইলেন কিছুক্ষণ। তারপর লি-র দিকে চেয়ে বললেন, 'কিন্তু কোনো মঠ বা গুম্ফা তো চোখে পড়ছে না...'

'আছে, আছে, নিশয়ই আছে', বলতে বলতে ঢালু পথে প্রায় দৌড়েই নীচে নামতে লাগলেন লি হো। পরিদাদু আর শাওনও তাঁকে অনুসরণ করে দ্রুত নেমে আসতে লাগল পাহাড়টার পায়ের কাছে।

পাহাড়ের নীচের উপত্যকা জুড়ে হু হু করে হাওয়া বইছিল। ঠান্ডা কনকনে হাওয়া। হাড়ের মধ্যে ঠোকাঠুকি লেগে যাচ্ছিল সেই হাওয়ায়। ক্লান্ত, তৃষ্ণার্ত শরীর সেই হাওয়ার সঙ্গে যুঁঝতে পারছিল না। শাওনের কাহিল লাগছিল নিজেকে। পরিদাদু নিজেও খুব অবসন্ন বোধ করছিলেন। লি হো স্থির দৃষ্টিতে চেয়ে ছিলেন উপত্যকার অপর প্রান্তের গভীর খাদের দিকে যেদিক থেকে ঘন মেঘের দল রোদ্দুর আড়াল করে ক্রমশ এগিয়ে আসছে আমাদের দিকে। পরিদাদু অবসন্ন গলায় বললেন, 'কোথায় আপনার গুপ্ত মঠ মিস্টার লি?'

লি হো উত্তর দিলেন না। আকাশ মেঘে ঢেকে গেল। বৃষ্টি পড়তে শুরু করল ঝির ঝির করে। শাওন পরিদাদু লি সক্কলে অসহায়ের মতন সেই বৃষ্টিতে ভিজতে লাগলেন দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে। বৃষ্টির সঙ্গে সঙ্গে হাওয়ার দাপটও বাড়ছিল। ঠান্ডাটাও সহ্যের বাইরে চলে যাচ্ছে ক্রমাগত। হাত পা অসাড় হয়ে আসছিল শাওনের। মনে হচ্ছিল পড়ে যাবে সে। পরিদাদু কাঁপা গলায় বললেন, 'আমরা খুব বিপদে পড়ে গেছি শানু। জানি না কীভাবে এতটা পথ ফিরে যাব আবার'। হাওয়ার জোর এতটাই বেড়ে গেছে এখন যে আর সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা যাচ্ছে না। মাটির ওপরে প্রায় মুখ গুঁজে বসে পড়ল শাওন। লি হো নিজেও বসে পড়লেন মাটির ওপরে। পরিদাদু বলে উঠলেন, 'এভাবে বসে থাকলে চলবে না শানু। যে করেই হোক আমাদের ফেরার পথ ধরতে হবে'। বললেন বটে, কিন্তু নিজেও সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে পারলেন না আর। শাওনের মনে হচ্ছিল এখান থেকে আর কোনোদিনই ফিরে যাওয়া হবে না তাদের। হঠাৎই মায়ের জন্যে খুব মন কেমন করে উঠল তার। আর ঠিক তখনই ঢং ঢং করে গম্ভীর গমগমে শব্দে কোথা থেকে যেন ঘণ্টা বেজে উঠল। ঘণ্টার সেই আওয়াজ পাক খেতে খেতে ঘুরতে লাগল সমস্ত উপত্যকা জুড়ে। লি চকিতে লাফিয়ে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল। চিৎকার করে উঠল, 'পেয়েছি। পৌঁছে গেছি আমরা সেই গুপ্ত মঠের কাছে'। শাওন পরিদাদু দুজনেই মুখ তুললেন। আর তখনই সেই সন্ন্যাসীকে দেখতে পাওয়া গেল। উপত্যকার দূর প্রান্ত থেকে ধীর শান্ত ভাবে হেঁটে আসছেন তিনি তাদের দিকে। হাওয়ায় পত পত করে উড়ছে তাঁর গৈরিক উত্তরীয়। ন্যাড়া মাথা। পরনে গেরুয়া কৌপিন। লি আবার চিৎকার করে উঠলেন, 'হেল্প, হেল্প। আমাদের মঠে আশ্রয় দিন প্লিজ। সঙ্গে বাচ্চা নিয়ে খুব বিপদে পড়ে গেছি আমরা...'

সন্ন্যাসী কথা বললেন না। এগিয়ে এসে হাত নেড়ে শুধু অনুসরণ করতে বললেন তাঁকে। পরিদাদু, লি হো আর শাওন ক্লান্ত পায়ে তাঁর পিছনে হাঁটতে লাগল। সন্ন্যাসী পাহাড়ের কোলের কাছে গিয়ে দাঁড়ালেন। পাহাড়ের গায়ে একটা সরু ফাটল। সন্ন্যাসী গম্ভীর গলায় বললেন, 'এসো'। কাত হয়ে সেই ফাটলের মধ্যে দিয়ে শরীরটাকে গলিয়ে দিয়ে ভিতরে ঢুকে পড়ল ওরা। ভিতরে ঢুকতেই পথটা চওড়া হয়ে গেল। কোথা থেকে যে একটা আবছা নীলচে আলো ঢুকছে সেখানে কে জানে। এখানে আর ঠান্ডা নেই। শাওনের মনে হল তার শরীরের ভিজে যাওয়া জামাকাপড়ও যেন শুকিয়ে গেছে এখানে আসার পরে পরেই। বেশ কিছুক্ষণ হাঁটার পরে সন্ন্যাসী দাঁড়ালেন।

পথটা একটা লম্বাটে হলঘরে এসে মিশেছে। ঘরের মেঝের ওপরে লাল কার্পেট পাতা। ঘরের মধ্যে সিংহাসনের মতন দেখতে চেয়ার পাতা অনেকগুলো। সন্ন্যাসী বললেন, 'বোসো এখানে। মহর্ষি মহারুদ্র তপস্যায় আছেন। তিনিই তোমাদের উদ্ধারের জন্যে আমাকে পাঠিয়েছিলেন। এখানে বিশ্রাম করো। জল খাও। প্রসাদ গ্রহণ করো। তারপর আমরাই আবার নিরাপদে পৌঁছে দিয়ে আসব তোমাদের। বলেই শাওনের ব্যাগ থেকে তার বোতলটা বের করে নিজের কপালের কাছে ধরলেন তিনি। খালি বোতলটা মুহূর্তের মধ্যে জলে ভর্তি হয়ে গেল। পরিদাদু এবং লি হো-র জলের বোতলও একইভাবে ভরে দিলেন তিনি। তারপর দু-হাতে তিনবার তালি দিলেন সন্ন্যাসী। আর একজন সন্ন্যাসী, যিনি বয়েসে বেশ তরুণ, ঘরে ঢুকলেন এবার। এই সন্ন্যাসীকে প্রণাম করলেন মাথা নীচু করে। সন্ন্যাসী আদেশ দিলেন, 'এরা ক্ষুধার্ত। এদের কিছু খেতে দাও। তরুণ সন্ন্যাসী মাথার ওপরে হাত তুলে তিনবার ঘোরালেন। চোখ বুজিয়ে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন দু-তিন সেকেন্ড। তারপরেই ডানহাতের তর্জনি দিয়ে বৃত্তাকার তিনটে মণ্ডল আঁকলেন শাওনদের সামনের টেবিলটার ওপরে। টেবিলের ওপরে তিনটে ঝকঝকে সোনার থালা তৈরি হল। সন্ন্যাসী আবার চোখ বুজোলেন। সেই থালা সুস্বাদু ফল, মিষ্টি আর পায়েসে ভরে গেল। সন্ন্যাসী হাসলেন। বললেন খেয়ে নাও'। পরিদাদু অবাক হয়ে এই অদ্ভুত কাণ্ড দেখছিলেন। শাওনও। লি-র চোখদুটো চক চক করে উঠল। সে জিজ্ঞেস করল, 'এটা কি ম্যাজিক, নাকি সম্মোহন? কী করে সম্ভব এটা?'

'এটা বিজ্ঞান', তরুণ সন্ন্যাসী মৃদু হাসলেন, 'আমাদের গুরুদেব মহর্ষি মহারুদ্রের কৃপায় এই বিজ্ঞান করায়ত্ত করেছি আমরা।'

'আমি তাঁর সঙ্গে দেখা করতে চাই'। লি বলে উঠলেন।

'দেখা হবে', বলে রহস্যময় হাসি হাসলেন সন্ন্যাসী, 'তিনি আমাদের তোমার কথা বলেছেন। বলেছেন তুমি আসছো।'

'আর কি বলেছেন?' অসহিষ্ণুকণ্ঠে জিজ্ঞেস করলেন লি মিন হো। সন্ন্যাসী উত্তর দিলেন না। হেসে বললেন, 'খেয়ে নাও তোমরা। প্রভু অপেক্ষায় আছেন। আমি আসছি এখন। একটু পরেই ফিরে আসছি তোমাদের প্রভুর কাছে নিয়ে যাবার জন্যে'। দুজন সন্ন্যাসীই ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেলেন।

পরিদাদু চোখ ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে ঘরের চারদিকটা দেখছিলেন। শাওনের মনে হচ্ছিল একটা অদ্ভুত স্বপ্ন দেখছে সে। লি হো-কে খুব অস্থির লাগছিল। কোনো কারনে খুব উত্তেজিত লাগছিল তাঁকে। একজন সাদা পোশাক পরা ব্রহ্মচারী ঘরে ঢুকলেন। পরিদাদুদের দিকে চেয়ে মৃদু হেসে বললেন, 'আসুন। মহর্ষি মহারুদ্র আপনাদের ডাকছেন'। পরিদাদু উঠে দাঁড়ালেন। শাওনও। লি হো হাতটাকে দু বার নিজের ডান কোমরের কাছে বুলিয়ে নিয়ে উঠে দাঁড়ালেন। ভারী গলায় বললেন, 'চলুন'।

একটা মস্ত কারুকার্য করা সিংহাসনের ওপরে একটা পায়ের ওপরে আর একটা পা তুলে বসেছিলেন মহর্ষি মহারুদ্র। চোখ বন্ধ। মুখে অপার প্রশান্তি। তাঁর দিকে তাকালেই যেন মন ভালো হয়ে যায়। শাওনের মায়ের জন্যে মন কেমন করে উঠল। মা এখানে আসতে পেলে খুব খুশি হত। সঙ্গী ব্রহ্মচারী প্রণাম করলেন তাঁকে। ইশারায় শাওনদেরও বললেন প্রণাম করতে তাঁকে। শাওন মাটিতে মাথা ঠেকিয়ে প্রণাম করে উঠতেই ব্রহ্মচারী ফিসফিস করে বললেন, 'ইনিই এই মঠের সচিব। এঁর বয়েস প্রায় সাড়ে চারশো বছর'। শাওন অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল মহর্ষির মুখের দিকে। তাঁকে দেখলে কে বলবে এত বয়েস তাঁর! খুব বেশি হলে যেন বছর পঞ্চাশ বয়েস তাঁর। যেন পরিদাদুরই সমবয়েসি তিনি। মহারুদ্র চোখ খুললেন এই সময়। নরম চোখে শাওনের দিকে চেয়ে মৃদু হেসে পরিষ্কার বাংলায় বললেন, 'সত্যিই আমার এই দেহটার বয়েস এখন চারশো তিপ্পান্ন বছর। আসলে মৃত্যু এখানে আমাদের নিয়ন্ত্রণাধীন। আমাদের হিংসা নেই, লোভ নেই। কাজেই আমাদের রোগ শোকও নেই।

'আপনি বাংলা জানেন?' অবাক হয়ে বলে শাওন।

'আমাদের সামনে যে মানুষ যে ভাষাতেই চিন্তা করে সেই তরঙ্গ পড়ে নিয়ে অনায়াসে সে ভাষায় কথা বলতে পারি আমরা। আমরা প্রকৃতির নিজস্ব নির্মাণ কৌশল আমাদের বিজ্ঞান সাধনা দিয়ে করায়ত্ত করেছি। এ পৃথিবীতে যা কিছু আছে, ইচ্ছামাত্র তা তৈরি করতে পারি আমরা, ধ্বংসও করে ফেলতে পারি যদি চাই।'

'এ কী করে সম্ভব?' পরিদাদু অবিশ্বাসের সঙ্গে জিজ্ঞেস করেন।

'সহজ বিজ্ঞান। শুধু দুটো তত্ত্ব। নির্মাণ এবং বিনির্মাণ। এই যে আমার পিছনে লাল শালুতে মোড়া পুঁথিগুলো দেখছো, ওর মধ্যে সূত্রাকারে সব লিখে রেখেছি আমরা। পৃথিবী ঢুঁড়ে সঠিক মানুষ খুঁজে আনি আমরা যারা এই সাধনার উত্তরসূরি হয়ে আমাদের কাজ এগিয়ে নিয়ে যেতে পারবে। আমরা নিজেদের স্বার্থে আমাদের জ্ঞান ব্যবহার করি না। জগৎ কল্যাণই একমাত্র লক্ষ্য আমাদের।'

'ওই পুঁথিগুলো আমার চাই', লি হো-র এমন কর্কশ কণ্ঠ আগে কখনও শোনেনি শাওন। পরিদাদুও চমকে পিছনে ফিরলেন। ডানহাতে জ্যাকেটের নীচে কোমরের কাছে ঝুলিয়ে রাখা রিভলভারটা ততক্ষণে বের করে ফেলেছেন লি। সামনে হাত বাড়িয়ে সে সোজা তাক করল সেটা মহর্ষি মহারুদ্রের দিকে, 'দীর্ঘদিন ধরে এই গুপ্ত ঘাঁটিটা খুঁজে বের করার চেষ্টা করছি আমরা। দেশ ছেড়ে দশ দশটা বছর ধরে এ দেশের পাহাড় চষে ফেলেছি আমি এখানে পৌঁছনোর জন্যে।'

'জানি', অদ্ভুত অনুত্তেজিত গলায় বললেন মহারুদ্র, 'বাষট্টির যুদ্ধের আসল কারণটাও তো ছিল বোধহয় এটাই। কিন্তু আমাদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে এই মঠ যে খুঁজে পাওয়া যায় না মিস্টার স্পাই, এখানে পৌঁছনোও যায় না...'

'আমি তো পৌঁছেছি। জানতাম সঙ্গে শিশু বা মহিলা থাকলে বিপদে পড়লে আপনারা আমাদের রেসকু করতে আসবেনই। তাই তো এঁদের বুঝিয়ে শুনিয়ে...'

'আমি এনেছি বলেই এখানে আসতে পেরেছো বাচ্চা', খুব স্নেহের সুরে আবার বলেন মহারুদ্র।

'নষ্ট করার মতন সময় আমার নেই', রুক্ষ গলায় বলেন লি, 'আমাকে ফিরতে হবে। তার আগে ওই পুঁথিগুলো আমার চাই। ওগুলো পেলে আমাদের দেশ শুধু এশিয়া মহাদেশ নয়, এই গ্রহটারই প্রভু হয়ে যাবে কিছুদিনের মধ্যে। আর যাবার আগে এই ঘাঁটিটাকেও পৃথিবীর মানচিত্র থেকে মুছে দিয়ে যেতে হবে আমায়।'

'কিন্তু এই বিজ্ঞান তো তোমার মতন মানুষের জন্যে নয় বাছা', মহারুদ্র নিরুত্তাপ গলায় আবার বললেন, 'তুমি যে লোভী। ক্ষমতার জন্যে তুমি মানুষের ক্ষতিও করতে পারো। সূক্ষ্ম বিজ্ঞান তো লোভী আর স্বার্থপরের হাতে ধরা দেয় না...'

'কোনো কথা শুনতে চাই না', গর্জন করে উঠলেন লি হো। তারপরেই বাঁ হাত দিয়ে শাওনকে এক হ্যাঁচকা টানে নিজের কাছে টেনে নিয়ে ডান হাতে ধরা রিভলভারটা ঠেসে ধরলেন তার কপালের ওপর, 'পুঁথিগুলো আমার হাতে দিয়ে দিন। এক্ষুনি। নইলে আপনার চোখের সামনে কুকুরের মতন এই ছেলেটাকে গুলি করব আমি।'

'খবর্দার', চিৎকার করে উঠলেন পরিদাদু, 'আমি বেঁচে থাকতে একটা আঁচড় কেউ কাটতে পারবে না শানুর গায়ে। তাছাড়া আমার দেশের সম্পদ, আমার দেশের বহু সাধনার অর্জন জীবন থাকতে তোমায় কেড়ে নিয়ে যেতে দেব না লি...'

'সাবাশ', মহারুদ্র তারিফের ভঙ্গিতে চাইলেন পরিদাদুর দিকে। তারপর চোখের ইশারায় শান্ত হতে বললেন তাঁকে। লি হো আবার বলে উঠল ঠান্ডা, নিষ্ঠুর গলায়, 'কী হল, পুঁথিগুলো দিন আমায়...'

মহারুদ্র সিংহাসন থেকে নেমে সোজা হয়ে দাঁড়ালেন লি হো-র মুখোমুখি। লি-র চোখের ওপর চোখ রেখে গম্ভীর গলায় বলে উঠলেন, 'চালাও গুলি। চালাও।'

শাওনের কপাল থেকে রিভলভারের নল সরিয়ে মহারুদ্রের দিকে তাক করলেন লি হো। ডান হাতের তর্জনি ট্রিগারের ওপর। শাওন কেঁদে ফেলল, 'না, না, না...'

লি হো-র হাতের আঙুল ক্রমশই চেপে বসছে ট্রিগারের ওপরে। হিসহিসে গলায় আবার বলে উঠলেন তিনি, 'দিয়ে দিন পুঁথিগুলো'।

'না'। মহারুদ্রের মুখে এখনও স্মিত হাসি।

'তাহলে মরুন', বলেই তর্জনি দিয়ে পুরো চাপ দিলেন লি হো। মহর্ষি মহারুদ্র তাঁর ডান হাতের তালু আকাশের দিকে পেতে দিলেন হাত বাড়িয়ে। আর কী আশ্চর্য, লি মিন হো-র রিভলভার তাঁর হাত ছাড়িয়ে শূন্যে লাফিয়ে উঠল। মহারুদ্র হাতের তর্জনি দিয়ে শূন্যে বৃত্ত আঁকলেন। আস্ত রিভলভারটা যেন ভোজবাজির মতন সেই অলীক বৃত্তের মধ্যে ঢুকে হারিয়ে গেল। কোনো অস্তিত্বই রইল না ওটার। লি স্তম্ভিত হয়ে চেঁচিয়ে উঠলেন, 'আমার রিভলভার?'

'ওটার দরকার নেই তো', শান্ত কণ্ঠে বললেন মহারুদ্র, 'ওটা আপাতত মহাশূন্যের গর্ভে জমা করে রাখলাম আমি। এখন বাইরের পৃথিবীতে যাওয়া হবে না তোমার। বাইরের পৃথিবী মানুষের। আমাদের ল্যাবরেটরিতে নতুন করে গড়ে পিটে তোমাকে মানুষ করে নিতে হবে। নিতে হবে আবার'। লি মিন হো দাঁড়িয়ে রইলেন মাথা নীচু করে। মহারুদ্র পরিদাদু আর শাওনের দিকে চাইলেন, 'এবারে রওনা দিতে হবে তোমাদের। পাহাড়ি পথে এতখানি পথ ফিরতে হবে। বাইরে বৃষ্টি থেমেছে। আমি শুদ্ধদীপকে সঙ্গে দিচ্ছি। ও তোমাদের পথ দেখিয়ে নিরাপদ জায়গায় রেখে আসবে।'

'আবার কি আমাদের দেখা হবে কখনও?' মহারুদ্রকে প্রণাম করে জিজ্ঞেস করে শাওন।

'যদি মহাকাল এমন কোনো মুহূর্ত তৈরির প্রয়োজন বোধ করেন আবার তাহলে নিশ্চয়ই দেখা হবে'। উত্তর দিলেন তিনি।

'আর যদি সেই মুহূর্ত না তৈরি হয়?'

'আর দেখা হবে না আমাদের।'

'আমরা নিজেরা কি এখানে ফিরে আসতে পারি না?'

'উঁহু', হাসি মুখে মাথা নাড়েন সন্ন্যাসী, 'এই মঠ চতুর্থ আয়মে অবস্থিত। নিজেদের ইচ্ছেয় এখানে আসা অসম্ভব। তাই শত্রু দেশের শত চেষ্টাতেও আমাদের খুঁজে পাওয়া যায়নি। খুঁজে পাওয়া যাবেও না কোনোদিন যদি না আমরা বিশেষ প্রয়োজনে নিজেরাই নিজেদের খোঁজ দিই।'

ব্রহ্মচারী শুদ্ধদীপ গুপ্তপথে যেখানে ছেড়ে দিয়ে গেলেন, সেখান থেকে তাওয়াং ফেরার মূল পথে পৌঁছনো আর দুরূহ নয়। মাথার ওপরে নীল ঝকঝকে আকাশ থেকে চকচকে রোদ্দুর ঝরে পড়ছে তখন শাওন আর পরিদাদুর মাথার ওপরে। শুদ্ধদীপ দৃষ্টিপথের আড়ালে হারিয়ে যাবার পরে শাওনের কাঁধে হাত রাখলেন পরিদাদু, 'লোভ এই পৃথিবীর স্বাভাবিক আলো হাওয়া রোদ্দুর থেকে কত দূরে সরিয়ে দিল লি মিন হো লোকটাকে বল শানু?'

'আবার একদিন তিনি হয়তো ফিরে আসবেন', ফিরতি পথে পা বাড়িয়ে দিয়ে বলে শাওন।

'হয়তো', পরিদাদুও হাঁটতে শুরু করেন, 'তখন লি হো অন্য একজন মানুষ। যে লি হো-কে পিছনে ফেলে রেখে এলাম আমরা, সেই লোকটার মৃত্যু হয়ে গিয়ে ফোর্থ ডাইমেনশনে থাকা রহস্যময় গুপ্ত মঠের অলৌকিক ল্যাবরেটরিতে তখন জন্ম নেবে অন্য একজন লি মিন হো। যিনি অর্ধেক মানুষ নন, প্রকৃত অর্থেই সম্পূর্ণ মানুষ একজন।'

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%