ভাগ্যের জোর

নির্বেদ রায়

গ্রীষ্মকালে কুশীনদের জল অরণ্যের মধ্যে অসংখ্য ধারা, স্রোতের সৃষ্টি করে ছড়িয়ে পড়ে। ওই জলস্রোতগুলির মধ্যে কয়েকটি অগভীর, জল সেখানে এত অল্প যে পাখির পক্ষেও অনায়াসে জল ভেঙে এপার-ওপার করা সম্ভব। আবার কিছু কিছু জায়গায় জল গভীর, স্রোত এত তীব্র যে, হাতির মতো প্রকাণ্ড জানোয়ারও সেই স্রোতের মুখে অসহায়।

একটু আগে নীলকর সাহেবের যে 'মৃগয়া' আয়োজনের কিছু বিবরণ আমরা পেয়েছি, সেরকম এক ছুটির মেজাজেই ওই রকম একটি জলস্রোতের পাশে তাঁবু ফেলেছিলেন শ্বেতাঙ্গ শিকারির দল। জলস্রোতটি সুগভীর না হলেও একেবারে অগভীর ছিল না। ভাগ্যক্রমে স্রোতের টানে তীব্রতাও ছিল কম। 'ভাগ্যক্রমে' কথাটা কেন বললাম সেটা পরে বোঝা যাবে।

সারাদিন শিকার-অভিযান চালিয়ে সাহেবরা যখন নৈশ ভোজনের আগে তাঁবুর মধ্যে আড্ডা জমিয়েছিলেন, তখন তাঁরা ধারণা করতে পারেননি যে তাঁদের উপর হানা দিতে প্রস্তুত হচ্ছে এক ভয়ংকর মৃত্যুদূত!...

মৃদুমন্দ বাতাসে পাখির পালকের মতো মলো ঘাসের ডগা দুলছে অরণ্যের বুকে, জলের ওপর জাগছে এলোমেলো ঢেউ। যে তাঁবুতে খাওয়ার ব্যবস্থা হয়েছে সেখানে আলো জ্বলছে। সাদা পোশাক পরে এদিক-ওদিক যাতায়াত করছে বেয়ারার দল। শিকারিদের আলাপ আলোচনার ফাঁকে ফাঁকে প্যাট হাডসন নামে ইংলিস সাহেবের এক বন্ধু একটা জার্মান বাদ্যযন্ত্রে সুর তোলার ব্যর্থ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন—আর এক বন্ধু 'বুড়ো ম্যাক' (ম্যাক সত্যি সত্যি বুড়ো নয়, ওটা আদরের ডাক) খুব আয়েশ করে আরামকেদারায় শুয়ে তাঁর প্রিয় পাইপ থেকে অনবরত ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে জায়গাটাকে আচ্ছন্ন করে ফেলেছেন।

বাজনা থামিয়ে প্যাট হঠাৎ বলে উঠলেন, 'হাতিটার আজকের চালচলন স্বাভাবিক ছিল বলে আমার মনে হয়নি।'

জো বললেন, 'ওটা একেবারে খেপে গেছে। এখন পর্যন্ত জন্তুটা যে-কোনও ঝঞ্ঝাট বাধিয়ে বসেনি সেটাই আশ্চর্যের বিষয়।'

জর্জ পরামর্শ দিলেন, 'ওহে প্যাট, অন্য হাতির পিঠে তোমার হাওদা লাগানোর ব্যবস্থা করো।'

যে জন্তুটার সম্পর্কে প্রসঙ্গের অবতারণা, সেটি হল একটি বিরাট দাঁতাল হাতি। এক প্রতিবেশী, করদ রাজ্যের রাজা প্যাট সাহেবকে ওই হাতিটা ধার হিসাবে দিয়েছিলেন—অর্থাৎ সাময়িকভাবে জন্তুটাকে শিকারের জন্য ব্যবহার করতে দিয়েছিলেন।

ইংলিস সাহেবের শিকার অভিযানে যে হাতির দলটা সেবার উপস্থিত হয়েছিল, তাদের মধ্যে ওই জন্তুটাই ছিল সবচেয়ে বড়, সবচেয়ে সুন্দর, সবচেয়ে জমকালো। সব মিলিয়ে সাঁইত্রিশটি হাতি ছিল শিকারের দলে। শিকারিদের আস্তানার চারপাশে হাতিগুলোকে বেঁধে রাখা হয়েছিল।

আবছা চাঁদের আলোয় অতগুলো বিরাট পাহাড়ের মতো জন্তুর শুঁড় আর লেজ দুলিয়ে, কান নাড়িয়ে অবিরাম নড়াচড়া করার দৃশ্য রীতিমতো অলৌকিক মনে হলেও শিকারিরা তাতে অভ্যস্ত হয়ে উঠেছিলেন। চারপাশে অবস্থিত নৈসর্গিক দৃশ্যের মতোই হাতিগুলো ছিল শিকারিদের চোখে নিতান্ত স্বাভাবিক।

ইংলিস সাহেবের 'হান্টিং ক্যাম্প' বা শিকারের আস্তানার ভৌগোলিক পরিবেশ সম্পর্কে কয়েকটি কথা এখানে বলা দরকার। একটু উঁচু জায়গা বেছে নিয়ে পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন করে শিকারিদের তাঁবু খাটানো হয়েছিল—তাঁবুর ডাইনে-বাঁয়ে ও পিছনে লম্বা লম্বা ঘাসের জঙ্গল, সামনে বয়ে যাচ্ছে নদী। গাছপালা বলতে ঘাসজমির ওপর গজিয়ে ওঠা এক শিমূল আর কয়েকটা সাবুগাছ, কয়েক মাইলের মধ্যে কোথাও আর গাছের চিহ্ন নেই। 'ক্যাম্প' থেকে একটু দূরে মাটিতে বেশ শক্ত করে পোঁতা একটা খুঁটির সঙ্গে বাঁধা রয়েছে প্যাটের হাতি। তাকে পাহারা দিচ্ছে কয়েকজন মাহুত ও বল্লমধারী প্রহরী। হাতির অন্যান্য মাহুত এবং বিভিন্ন কাজের জন্য নিযুক্ত ভৃত্যের দল রাতের খাবার তৈরি করতে ব্যস্ত। তাঁবুর বাইরে একটা সামিয়ানা খাটিয়ে তার মধ্যেই আলাপ-আলোচনায় ব্যস্ত ছিলেন শিকারিরা।

রাতের ঠান্ডা হাওয়া মার্চ মাসের প্রচণ্ড গরমকে তাড়িয়ে দিতে পারেনি। শেকল বাঁধা মত্ত হাতির ক্রুদ্ধ বৃংহণধ্বনি শিকারিদের মনোযোগ আকৃষ্ট করছিল বারবার। জন্তুটা তার শুঁড় দিয়ে ক্রমাগত ধুলোবালি তুলে নিজের পিঠে আর মাথায় ছুঁড়ে ছুঁড়ে দিচ্ছিল। সামনে হাতির খাবার হিসাবে যেসব গাছপালা সাজানো ছিল, সেখান থেকে মাঝে মাঝে মোটা গাছের ডাল তুলে নিয়ে আঘাতের পর আঘাতে সামনের জমিকে ক্ষতবিক্ষত করে তুলছিল।

হাতিটা যে ক্ষিপ্ত হয়ে উঠেছে সে বিষয়ে আর কোনও সন্দেহ ছিল না। অন্যান্য হাতি আতঙ্কিত না হলেও অস্বস্তি বোধ করেছিল। চাকরদের মধ্যেও একটা ভয়ের ভাব ছিল। অর্থাৎ, শিকারিদের দ্বিপদ ও চতুষ্পদ সঙ্গীরা সকলেই সন্ত্রস্ত।

দিনের বেলা যখন জঙ্গল ভেঙে জানোয়ার তাড়ানোর 'বিট' শুরু হয়েছিল, সেই সময়েই জর্জ এবং জো-র তীক্ষ্ন দৃষ্টিতে ধরা পড়েছিল ওই হাতিটার অস্বাভাবিক আচরণ। দুই বন্ধুরই সন্দেহ হল, যে শারীরিক পরিবর্তনের ফলে হাতি ভয়ংকর হয়ে উঠেছে, সেই 'মদমত্ত' অবস্থায় পৌঁছেচে জন্তুটা।

পুরুষ হাতি যে সময়ে হস্তিনীর সঙ্গে মিলিত হওয়ার জন্য উন্মুখ হয়, সেইসময় তার চোখের নীচে অতি ক্ষুদ্র ছিদ্র থেকে এক ধরনের হলুদ রং-এর চটচটে আঠার মতো ঘন নির্যাস বা রস গড়িয়ে পড়তে থাকে এবং হাতির স্বভাব হয়ে ওঠে অত্যন্ত উগ্র।

হস্তিদেহ নিঃসৃত ওই নির্যাসকেই 'মদস্রাব' বলা হয়, আর মদস্রাবে সিক্তগণ্ড, উগ্রমূর্তি হস্তিকেই 'মদমত্ত' হাতি বলা হয়।

মদমত্ত বন্য হাতির তো কথাই নেই, পোষা হাতিও ওই সময়ে এমন ভয়ানক হয়ে ওঠে যে হাতির মাহুতও তাকে ভয় পায়। গৃহপালিত হাতির কয়েকটি আচরণে আসন্ন মদস্রাবের লক্ষণ বোঝা যায়—সে অকারণে বিরক্তি প্রকাশ করে, শুঁড়ের সাহায্যে মাটির ঢেলা আর ধুলোবালি তুলে এদিক-ওদিক ছুঁড়তে থাকে, খাবারে রুচি থাকে না এবং অকারণ ক্রোধে উন্মত্ত হয়ে চিৎকার করতে করতে সচল অথবা অচল যে-কোনও প্রাণী বা পদার্থের ওপর সেই রাগ মেটাতে চায়।

যে দিনের কথা বলছি, সেই দিনটা খুব গরম ছিল। ভীষণ গরমের মধ্যেই অনেকখানি জঙ্গল ভেঙে 'বিট' হয়েছিল, অর্থাৎ জানোয়ার তাড়িয়ে শিকারের চেষ্টা হয়েছিল। ফল অবশ্য নেহাত খারাপ হয়নি—দুটো বাঘ, দুটো বুনো মোষ, অনেকগুলো শূয়োর, হরিণ আর পাখি মারা পড়েছিল শিকারিদের গুলিতে। বাঘ আর মহিষ ছাড়া অন্যান্য জন্তু ও পাখিগুলোকে রাখা হয়েছিল ভৃত্যবর্গ ও শিকারিদের আহারের জন্য। প্যাট কিন্তু সারাদিনই তাঁর হাতি সম্বন্ধে অভিযোগ জানিয়েছেন—বাস্তবিক, জঙ্গল ভাঙার সময়েও জন্তুটার আচরণ ছিল অত্যন্ত অস্বাভাবিক। সারিবদ্ধ হস্তিযূথের শৃঙ্খলা নষ্ট করে বারবার জন্তুটা সবেগে সামনে এগিয়ে গেছে, কাছাকাছি অবস্থিত অন্য হাতিকে আক্রমণের চেষ্টা করেছে, দূরাগত মেঘের ডাকের মতো গুরগুর শব্দ করছে সর্বদাই—তারপর হঠাৎ সামনে একদল গৃহপালিত গরুমহিষ দেখে তাদের ওপর হামলার চেষ্টা চালিয়েছে। অবশ্য তার সেই চেষ্টাকে মাহুত সফল হতে দেয়নি।

জন্তুটা থেকে থেকে হঠাৎ-হঠাৎ সজোরে ঝাঁকানি দিয়ে হাওদাটা স্থানচ্যুত করতে চেয়েছে অনেকবার—সৌভাগ্যের বিষয় তার বিপজ্জনক ইচ্ছেটাকে কার্যকরি করতে পারেনি সে। ওই হাতিতে চড়ে শিকার করা যে অত্যন্ত বিপজ্জনক, সেটা সকলেই বুঝতে পারছিল। এর মধ্যে এক অসতর্ক ঘেসেড়া হাতিটার কাছে এসে পড়েছিল—শুঁড়ের প্রচণ্ড আঘাতে লোকটা ছিটকে পড়ল একটা কাটা ঘাসের স্তূপের ওপর। সে আহত হয়েছিল, তবে আঘাত মারাত্মক হয়নি।

শিকারপর্ব সেদিনের মতো শেষ হতেই খ্যাপা হাতির মাহুত জগরু একটা মজবুত খুঁটির সঙ্গে খুব মোটা আর শক্ত একটা লোহার শিকল দিয়ে জন্তুটাকে বেঁধে ফেলল, তারপর বিরাট এক মাটির কলসি থেকে বার বার জল ঢেলে হাতিকে ঠান্ডা করার চেষ্টা করতে লাগল। চেষ্টার ফল ভালোই হল—কয়েক কলসি জল মাথায় ঢালার পর একটু শান্ত হল 'শমশের' নামের ওই ক্ষিপ্ত হাতি।...সামিয়ানা খাটিয়ে শিকারিরা আড্ডা জমিয়েছিলেন।

শিকারের সাফল্য, সারাদিনের ক্লান্তির পর নদীর স্রোতে স্নান এবং নৈশভোজে বিভিন্ন ধরনের মাংসভোজনে রসনা ও উদরকে তৃপ্ত করার আশু সম্ভাবনা শিকারিদের খুবই উৎফুল্ল করে তুলেছিল—অতএব তাঁদের আড্ডাটা যে জমে উঠেছিল, সে বিষয়ে সন্দেহ নেই।

আচম্বিতে বিনামেঘে বজ্রাঘাতের মতো জেগে উঠল প্রচণ্ড কোলাহল। তারপরই স্তম্ভিত শিকারিদের কানে এল মনুষ্যকণ্ঠের অন্তিম আর্তস্বর। পরক্ষণেই বহুকণ্ঠে চিৎকার—'পালাও! পালাও! দাঁতাল খেপে গিয়ে শিকল ছিঁড়ে ফেলেছে।'

বলে কী! হাতি শিকল ছিঁড়ে ফেলেছে! শিকারিরা সকলেই চমকে উঠে দাঁড়ালেন। জর্জ অবশ্য সেখানে ছিলেন না, একটু আগেই তিনি নদীর ধারে রান্নার কাজ তদারক করতে গিয়েছিলেন। খোলা আকাশের নীচে যেখানে রান্নার কাজ চলছিল, সেই জায়গাটার কাছেই লোহার শিকল দিয়ে বেঁধে রাখা হয়েছিল খ্যাপা হাতিটাকে।

প্রকাণ্ড জন্তুটা অনেকক্ষণ ধরেই শিকলটাকে ভাঙার চেষ্টা চালিয়েছিল, অবশেষে হাতির অধ্যবসায় ও প্রচণ্ড শক্তির কাছে পরাজয় স্বীকার করল লৌহশৃঙ্খল—এক হ্যাঁচকা টানে শিকল ভেঙে ফেলে ক্রুদ্ধ বৃংহণধ্বনিতে চারদিক কাঁপিয়ে ধেয়ে এল মত্তহাতি চারপাশের মানুষগুলোর দিকে। বর্শাধারী প্রহরীরা হাতের অস্ত্র ফেলে তিরবেগে ছুটে পালাল। একটি লোক ভাত রান্নার জন্য আগুন ধরাতে চেষ্টা করছিল, ব্যাপারটা কী হচ্ছে বুঝতে পারার আগেই সে শুঁড়ের বাঁধনে বন্দি হয়ে গেল—পরক্ষণেই ক্ষিপ্ত দানবের হাঁটুর ওপর সবেগে আছড়ে পড়ে তার মাথার খুলি হল চূর্ণবিচূর্ণ। মরার আগে সে একবারই চিৎকার করার সুযোগ পেয়েছিল, সেই অন্তিম আর্তনাদই একটু আগে শুনতে পেয়েছিলেন শিকারিরা।

মানুষটাকে খুন করেই হাতি এবার ঘোড়াদের আক্রমণ করল। ঘোড়াগুলো বাঁধন ছেঁড়ার চেষ্টা করছিল প্রাণপণে। একটি আফগান ঘোড়ার ওপর এসে পড়ল হাতি, ঘোড়ার পাঁজর ভেদ করে বসে গেল সুদীর্ঘ দুই গজদন্ত।

অন্যান্য হাতিগুলোকে মাহুতরা বন্ধনদশা থেকে মুক্ত করে দিয়েছিল। সঙ্গে সঙ্গে নিকটবর্তী অরণ্যের দিকে ছুটল হাতির দল এবং কিছুক্ষণের মধ্যেই অদৃশ্য হয়ে গেল অন্ধকার অরণ্যের গর্ভে। জন্তুগুলো বুঝেছিল মত্তহস্তির অন্ধ ক্রোধ তার স্বজাতিকেও নিষ্কৃতি দেবে না।

জর্জ একটা পাত্রের ওপর ঝুঁকে পড়ে রান্নার তদারক করছিলেন। পাত্রের মধ্যে টগবগ করে ফুটছিল তাঁর পছন্দসই এক বিশেষ ধরনের ঝোল। এত দ্রুত ঘটনাগুলো ঘটে গিয়েছিল আর রান্না নিয়ে জর্জ ছিলেন এতই তন্ময় যে, খ্যাপা হাতির কাণ্ডকারখানা তিনি কিছুই টের পাননি—হঠাৎ সচমকে তিনি আবিষ্কার করলেন চলমান পর্বতের মতো হাতি প্রায় তাঁর ঘাড়ের ওপর এসে পড়ছে।

একটু আগেই নিহত মানুষটির মতো জর্জেরও মৃত্যু হওয়ার সম্ভাবনা ছিল, কিন্তু জর্জ পাকা-শিকারি—হাতে বন্দুক না থাকলে কী হবে, ফুটন্ত ঝোল তো রয়েছে—বিদ্যুৎবেগে অগ্নিকুণ্ড থেকে পাত্রটা তুলে নিয়ে সেই ফুটন্ত ঝোল হাতির হাঁ করা মুখের মধ্যে ছুঁড়ে দিলেন জর্জ—

অব্যর্থ সন্ধান! ফুটন্ত ঝোল নির্ভুল লক্ষ্যে পৌঁছে গেল যথাস্থানে।

মুখের ভিতর আগুনের মতো গরম ঝোলের উত্তপ্ত অভ্যর্থনা হাতির মতো জন্তুর পক্ষেও হজম করা কঠিন—শুঁড়ের এক ঝটকায় জর্জকে শূন্যপথের যাত্রী করে দিয়ে হাতি অন্যদিকে ছুটল এবং জর্জের দেহ উড়ে গিয়ে পড়ল জলস্রোতের মাঝখানে।

ওদিকে অন্যান্য শিকারিরা তখন গুলিভরা বন্দুক হস্তগত করে মারমুখো হাতিকে রুখতে চাইলেন—কিন্তু হায়! হায়! যে চাকরটা বন্দুকগুলো খুলে পরিষ্কার করছিল, লোকজনের চিৎকার কানে আসতেই ব্যাপারটা বুঝতে পেরে সে সোজা চম্পট দিয়েছে। ফলে হাতে অস্ত্র জুটলো না। ম্যাক নামে শিকারিটি তাড়াতাড়ি ইজিচেয়ার ছেড়ে উঠতে গিয়ে ধরাশায়ী হলেন, মুহূর্তের মধ্যে দেখা গেল ম্যাক উলটে পড়েছেন নীচে এবং তাঁর ওপর অবস্থান করছে ইজিচেয়ার!

আর ঠিক সেই সময়েই চিৎকারে চারদিক কাঁপিয়ে সামিয়ানার ওপর চড়াও হল মত্তহস্তি। দড়িগুলো হাতির আক্রমণে সুতোর মতো পটাপট ছিঁড়ে গেল, তাঁবু খাটানোর বাঁশের খুঁটিগুলো দেশলাই কাঠির মতো ভেঙে ছিটকে পড়ল এবং চুপসে-যাওয়া প্রকাণ্ড বেলুনের মতো তাঁবুটা নেমে এল মাটির ওপর। জেমস ইংলিস আর তাঁর বন্ধুরা ইজিচেয়ারের নীচে ভূপতিত ম্যাকের দিকে একবারও তাকালেন না, বিদ্যুৎবেগে ছুটলেন যে যেদিকে পারেন—'চাচা, আপন প্রাণ বাঁচা।'

জনা দুই শিকারি সাঁতার কেটে নদী পার হয়ে অপর দিকে উঠলেন। ওই দুজনের মধ্যে একজন হলেন জেমস ইংলিস। তাঁদের অনেক আগেই অবশ্য নদী পার হয়ে উলটোদিকের তীরে উঠে প্রাণে বেঁচেছেন জর্জ। জর্জ সাহেব তখন ভ্রু কুঁচকে নিজের হাতেই নিজের পিঠ মালিশ করার চেষ্টা করছিলেন আর হস্তি-জাতি সম্পর্কে বিশেষ করে খ্যাপা হাতির সম্পর্কে—যে সব মতামত প্রকাশ করছিলেন, সেগুলো ছাপার অক্ষরে প্রকাশ করা সম্ভব নয়।

এত তাড়াতাড়ি হাতির আক্রমণ ঘটেছিল যে, শিকারিরা চিন্তাভাবনা করার সময় পাননি। আর চিন্তা করেই বা কী লাভ? বন্দুকের অবস্থা তো আগেই বলেছি—চলন্ত পাহাড়ের মতো ক্ষিপ্ত হাতির সামনে দাঁড়িয়ে নিরস্ত্র মানুষ কিই বা করতে পারে?

জলধারার অপর তীর অর্থাৎ তাঁবুর দিক থেকে শিকারিরা ভৃত্যদের আর্তস্বর শুনতে পেলেন—

'হায়! হায়! আমাদের প্রভু মারা গেছেন!'

মারা গেছেন! বলে কি! শিকারিরা চটপট নিজেদের গুণে ফেললেন। দেখা গেল জর্জ, জো আর জেমস ইংলিস অক্ষত অবস্থায় এক জায়গাতেই বিরাজ করছেন। বাট্টি, আর হাডসনকে নিয়ে চিন্তা নেই, কারণ নদীতীর ধরে তাঁরা খরগোশের মতো দ্রুতবেগে পা চালিয়ে অদৃশ্য হয়েছেন এবং সেই দৃশ্য দেখেছেন ওরা তিন শিকারি একটু আগে। কিন্তু ম্যাক? ম্যাকের কী হল? ম্যাককে তো কোথাও দেখা যাচ্ছে না। খ্যাপা হাতি যখন তাঁবুর ওপর এসে পড়েছিল, ম্যাক তখন ইজিচেয়ারের নীচে ধরাশায়ী সেই কথাটাই এখন সকলের মনে পড়ল।

'সর্বনাশ। ও কি এখনও ওখানেই আছে?' জো সভয়ে প্রশ্ন করলেন। জেমস ইংলিস কোনও উত্তর না দিয়ে তীব্রস্বরে একটা আওয়াজ করলেন, 'কু-ঈ-ঈ' শব্দে তাঁর আহ্বান ছুটে গেল রাতের অন্ধকারে।

নদীর অপর পাড়ে এক জায়গা থেকে পলাতক হাডসনের কণ্ঠে উত্তর ভেসে এল। আবার আওয়াজ করলেন জেমস, 'কু-ঈ-ঈ!' ম্যাকের সাড়াশব্দ পাওয়া গেল না।

এইবার আতঙ্কের অনুভূতি ছড়িয়ে পড়ল শিকারিদের মধ্যে। নদীর উলটোদিক থেকে ভয়ংকর জানোয়ারটাকে তাঁরা স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছিলেন, হাঁটু পেতে বসে তাঁবুর কাপড়, বাঁশ আর আসবাবপত্রের ওপর সবেগে বারংবার দন্তাঘাত করছিল উন্মত্ত দানব।

শিকারিরা তখন ম্যাকের জীবনের আশা ছেড়ে দিয়েছেন। তাঁবুর ধ্বংসাবশেষের নীচে সম্ভবত ক্ষিপ্ত হাতির পায়ে পিষ্ট হয়েই তিনি মৃত্যুবরণ করেছেন, অথবা গজদন্তের নিষ্ঠুর আঘাতে তাঁর দেহ হয়ে গেছে ছিন্নভিন্ন।

হঠাৎ একসময়ে উঠে দাঁড়াল মত্ত হাতি। এতক্ষণ সে হাঁটু পেতে বসেছিল, এবার উঠে দাঁড়িয়ে তীব্র তীক্ষ্ন চিৎকারে ক্রোধ প্রকাশ করে সে দ্রুত ছুটল বনের দিকে—পরক্ষণেই অন্ধকার অরণ্যে হারিয়ে গেল তার প্রকাণ্ড দেহ। খুব সম্ভব, তার মত্ত মস্তিষ্কে কোনও নতুন পরিকল্পনার উদ্ভব হয়েছিল।

হস্তির অন্তর্ধানপর্ব শেষ হতেই শিকারিদের মধ্যে নেমে এল এক ভয়াবহ স্তব্ধতা। হঠাৎ ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠলেন জর্জ—'ম্যাক! বেচারা ম্যাক।'

কেউ কথা বলল না। তীব্র শোকের অনুভূতি তখন সকলের চেতনাকেই আচ্ছন্ন করে দিয়েছে।

এই সময়ে পলাতক ভৃত্যদের মধ্যে কয়েকজন ফাঁকা জায়গায় আত্মপ্রকাশ করল। নীরবে সাঁতার কেটে এপারে এলেন জেমস ইংলিস, জো আর জর্জ। প্যাট আর বাট্টি চিৎকার করে সাড়া দিলেন। তাঁবুর সামনে এসে তাঁরা দেখলেন অবস্থা অতি শোচনীয়—এক প্রকাণ্ড দানব অন্ধ আক্রোশে যেন ধ্বংসের তাণ্ডব চালিয়েছে। তাঁবুর শক্ত আবরণ গজদন্তে ছিন্নভিন্ন হয়ে পড়ে আছে, আসবাবপত্র চূর্ণবিচূর্ণ।

শিকারিরা চিৎকার করে চাকরদের নাম ধরে ডাকতে লাগলেন। দুই-একজন ম্যাকের নাম ধরে আর্তস্বরে শোক প্রকাশ করলেন!

আর ঠিক তখনই ছেঁড়াখোঁড়া তাঁবুটার তলা থেকে একটা অস্পষ্ট গোঙানির শব্দ ভেসে এল, পরক্ষণেই জাগল ম্যাকের পরিচিত কণ্ঠস্বর 'ওহে, তোমরা করছ কী! আমাকে চটপট বার করো! দমবন্ধ হয়ে মারা গেলাম যে!'

মহা আনন্দে জর্জ চেঁচিয়ে উঠলেন, 'আরে ম্যাক। তুমি!'

তাঁবুর তলা থেকে উত্তর এল, 'আমি ছাড়া আর কোন পাগল এখানে মরতে আসবে?'

তৎক্ষণাৎ ছিন্নভিন্ন তাঁবুর আবরণ সরিয়ে ম্যাক সাহেবকে উদ্ধার করা হল। তারপর জানা গেল কী আশ্চর্যভাবে নিশ্চিত মৃত্যুর কবল থেকে নিষ্কৃতি পেয়েছেন ম্যাক।

হাতির আক্রমণ শুরু হতেই ম্যাক পালানোর চেষ্টা করেন, কিন্তু তাড়াতাড়িতে তাঁবুর একটা দড়ি তাঁর পায়ে জড়িয়ে যায় এবং তারপরই তাঁবুটা হুড়মুড় করে তার ওপর এসে পড়ে—ওই সঙ্গে ক্যাম্পের টেবিল আর কয়েকটা বেতের চেয়ার এসে পড়ে তাঁর ধরাশায়ী দেহের ওপর। জিনিসগুলোর নীচে চাপা পড়লেও শ্বাসগ্রহণের অসুবিধা তখন বোধ করেননি ম্যাক, কিন্তু তিনি একটুও নড়তে সাহস করেননি—কারণ, চোখে না দেখলেও তাঁবুর ওপর যে খ্যাপা হাতির তাণ্ডবলীলা শুরু হয়েছে, সেটা মাটিতে শুয়ে শুয়েই ম্যাক বুঝতে পেরেছিলেন। নিতান্ত ভাগ্যের জোরেই তিনি মৃত্যুর কবল থেকে নিষ্কৃতি লাভ করেছেন। তাঁবুর কাপড়ে এক এক সময়ে এত জোরে চাপ পড়েছে যে, ম্যাকের প্রায় দমবন্ধ হয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে। মত্ত হাতি যখন অন্ধ ক্রোধে ভূপতিত তাঁবুর ওপর দন্তাঘাত করছিল, সেই সময় একবার ম্যাকের একটা হাত আর পাঁজরের মাঝখানে গায়ের জামা ফুটো করে মাটির ভিতর ঢুকে গিয়েছিল গজদন্ত। ম্যাক জানালেন ওই সময় তিনি আতঙ্কে প্রায় অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিলেন। সৌভাগ্যের বিষয় হাতিটা তখনই অকুস্থল পরিত্যাগ করে অন্যত্র চলে যাওয়ার ফলে বন্ধুরা এসে তাঁকে উদ্ধার করতে সমর্থ হয়েছেন।

প্রায় শ্বাসরুদ্ধ অবস্থা এবং স্নায়ু আর মগজের ওপর তীব্র আতঙ্কের চাপ ম্যাক সাহেবকে প্রায় মূর্ছিত করে ফেলেছিল বটে, কিন্তু খানিকটা ব্রান্ডি আর সোডা পান করেই তিনি আবার চাঙ্গা হয়ে উঠলেন। সুস্থ হয়ে উঠে প্রথমেই তাঁর পাইপটার জন্য তিনি ব্যস্ত হয়ে খোঁজাখুঁজি শুরু করলেন। আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে, পাইপটাকে সম্পূর্ণ আস্ত ও অক্ষত অবস্থায় পাওয়া গেল।

তৎক্ষণাৎ সেই পাইপে আগুন ধরিয়ে ম্যাক আবার ধূমপানে মনোনিবেশ করলেন—তখন তাঁকে দেখে কে বলবে যে, নিশ্চিত মৃত্যুর মুখ থেকে মানুষটি এইমাত্র ফিরে এসেছেন।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%