নির্বেদ রায়
সেদিনটা ছিল সোমবার।
ভোরের দিকে জেমস ইংলিস ও তাঁর বন্ধুরা তোফা আরামে নিদ্রাসুখ উপভোগ করছিলেন, এমন সময়ে মূর্তিমান উপদ্রবের মতো ডাকাডাকি করে তাঁদের ঘুম ভাঙাতে এলেন জো সাহেব।
কাঁচা ঘুম ভেঙে গেলেও সাহেবরা কেউ রাগ করেননি, কারণ জো সাহেবের খবরটা ছিল জবর—তাঁবুর দক্ষিণ দিকের কাছাকাছি এক গ্রামে বাঘ নাকি মোষ মেরেছে।
বাঘের সংবাদ বহন করে এনেছিল এক রাখাল। সংবাদের সারমর্ম হচ্ছে গত রাতে গোয়ালের মধ্যে ঢুকে বাঘ একটা স্ত্রী-মহিষকে হত্যা করে মৃতদেহ নিয়ে অকুস্থল থেকে চম্পট দিয়েছে। খবর শুনে সাহেবরা বুঝলেন ওই জন্তুটা অত্যন্ত হিংস্র ও দুঃসাহসী—গোয়ালের মধ্যে ঢুকে একপাল মহিষের ভিতর থেকে পছন্দসই শিকারকে ধরে নিয়ে যাওয়া বাঘের মতো জন্তুর পক্ষেও সহজসাধ্য নয়।
ঘটনার বিশদ বিবরণে জানা গেল, দলের সবচেয়ে বড় আর বলবান মহিষদের ভিতর থেকেই একটি জন্তুকে ঘাড় কামড়ে মেরুদণ্ড ভেঙে বাঘ হত্যা করেছে এবং উন্মত্ত মহিষদের দাপাদাপি তুচ্ছ করে গোয়াল থেকে শিকারকে বহন করে একটা শুকনো নলখাগড়ার ঝোপের মধ্যে এনে শিকারের দেহ থেকে কিছুটা মাংস ভক্ষণ করেছে। একটা মহিষের বাচ্চাও বাঘের কবলে মারা পড়েছে। শিকার নিয়ে যাওয়ার সময়ে একটিমাত্র চপেটাঘাতে মহিষ-শাবককে হত্যা করেছিল বাঘ। রাখালরা অবশ্য খুবই চেঁচামেচি করেছিল, কিন্তু বাঘ তাদের চিৎকারে কর্ণপাত করেনি—নির্ভয়ে সকলের চোখের সামনেই শিকার নিয়ে চলে গেছে।
হুঁ, এ বাঘ বড় সহজ জন্তু নয়!—সাহেবরা ঠিক করলেন এটাকে মারতে হবে। এমন ভয়ংকর পশুর সঙ্গে লড়াই করে 'সুখ' আছে।
বিশ্বস্ত 'ট্র্যাকার' (যারা পায়ের ছাপ ধরে বুনো জানোয়ারের অনুসরণ করে) জগরু নামে লোকটিকে এরমধ্যেই জো ঘটনাস্থলে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন। অতঃপর হাতির পিঠে হাওদা লাগিয়ে শিকারির দল বাঘের সন্ধানে যাত্রা করলেন। যে নলখাগড়ার ঝোপে গুরুভোজনের পর বাঘ বিশ্রাম করছিল বলে খবর পাওয়া গিয়েছিল, সেই ঝোপটাই ছিল শিকারিদের নির্দিষ্ট গন্তব্যস্থান।
সাহেবদের বাঘ শিকারের অভিযান সত্যি একটা জমকালো ব্যাপার। শিশিরে-ভেজা লম্বা লম্বা ঘাস আর ঝাউগাছের সারি দুলিয়ে এগিয়ে চলেছে চলমান পর্বতের মতো হস্তিযূথ এবং ঝাউগাছের ওপর থেকে আলোর ফুলকি ছড়িয়ে ছিটকে পড়ছে শিশির-কণা—মাঝে মাঝে গাছের সঙ্গে হাওদার সংঘাত হয়, সঙ্গে সঙ্গে গাছ থেকে বৃষ্টির মতো শিশির ঝরে পড়ে ভিজিয়ে দেয় শিকারিদের বন্দুক আর কার্তুজ, তৎক্ষণাৎ অসতর্ক মাহুতকে তিরষ্কার করে ওঠে ভুক্তভোগী শিকারি—সব মিলিয়ে দৃশ্যটা যে অত্যন্ত চমকপ্রদ সে বিষয়ে সন্দেহ নেই।
শিকারিদের সঙ্গে তাঁদের ভৃত্য আর জঙ্গল-তাড়ুয়া 'বিটারের' দলও চলেছিল। ভৃত্যদের হাতের ছুরি, বিটারদের বল্লমের ফলা আর শিকারিদের পালিশ-করা বন্দুকের নলের ওপর ঠিকরে পড়ে জ্বলে জ্বলে উঠছিল প্রভাতসূর্যের আলোকধারা।
শিকারিদের মন আনন্দে আর উৎসাহে পরিপূর্ণ। বাঘের সংবাদে কোনও ভুল নেই। শিকারে সাফল্য প্রায় নিশ্চিত। দূর দিগন্তে ধূসর মেঘের আবির্ভাব ঝড়ের সংকেত বহন করছে বটে, কিন্তু দুপুরের আগে ঝড় ওঠার সম্ভাবনা নেই—বর্তমানে সবকিছুই শান্ত, শিশির-সিক্ত প্রভাতে গ্রীষ্মের দাবদাহ অনুপস্থিত, প্রকৃতির পরিবেশ উজ্জ্বল ও সুন্দর।
সপরিবার বন্যবরাহের দর্শন পাওয়া গেল পদ্মবনে ঢাকা খাঁড়ির জলের পাশে। ঘন জঙ্গলের ভিতর দিয়ে একটা ভগ্নস্তূপ লক্ষ্য করে ছুটল হগ-ডিয়ার—সুদূর অতীতে সম্রাট আওরঙ্গজেবের আমলে নির্মিত এক মুসলিম দুর্গের ভগ্নাবশেষ বর্তমানে হরিণদের আশ্রয়স্থল। 'ব্ল্যাক প্যাট্রিজ' নামক পাখির দল জঙ্গলের ভিতর থেকে সাড়া দিল কলকণ্ঠে, সারারাত ধরে শস্যক্ষেত্রে ধ্বংসলীলা চালিয়ে এখন ভরাপেট নিয়ে গভীর অরণ্যে প্রবেশ করতে লাগল বনমুরগির দল, অরণ্যশীর্ষে আকাশের বুকে ডানা মেলে আরও নানাজাতের পাখি প্রভাতকে করে তুলছে আনন্দময়। সেই আনন্দের ছোঁয়া লাগল শিকারিদের প্রাণে—তাঁদের মধ্যে কেউ-কেউ হাসিঠাট্টায় মেতে উঠলেন বন্ধুদের সঙ্গে, কেউ বা মহা-আনন্দে শুরু করলেন সঙ্গীতচর্চা। শিকারিদের বাহন হস্তিযূথ এগিয়ে চলছিল গজেন্দ্রগমনে। এখানে-ওখানে নলখাগড়ার সরস ডগা বেছে নিয়ে তারা চর্বণ করছিল পরমানন্দে—সঙ্গে সঙ্গে সশব্দে দুলছিল তাদের লেজ আর বিশাল কান জোড়া এবং দোদুল্যমান শুঁড়ের অস্থির আন্দোলন স্থির হয়নি একমুহূর্তের জন্যও।
একসময়ে হাতির দল নিয়ে শিকারিরা উপস্থিত হলেন নির্দিষ্ট স্থানে বাঘের আস্তানায়। বাঘকে যেখানে পাওয়া যাবে বলে খবর পাওয়া গিয়েছিল সেই জায়গাটা দেখা গেল, বিভিন্নজাতীয় গাছের সমাবেশে এক নিবিড় অরণ্য—শিমুল গাছ, ডুমুর গাছ, লায়ানা, অসংখ্য বুনো লতা আর কাঁটাগাছ মাথা তুলেছে যত্রতত্র এবং বাঁশবন আর বটগাছের প্রসারিত শিকড় সেই বৃক্ষসঙ্কুল অরণ্যকে করে তুলেছে অতিশয় দুর্গম। হাতির দল অতিকষ্টে সেই ঘনজঙ্গল ভেঙে পথ করে চলতে লাগল। জো আর জেমস ইংলিস সামনের সারিতে তৈরি থাকলেন বন্দুক হাতে, বাঘ দেখা দিলেই তাঁরা গুলি ছুঁড়তে প্রস্তুত।
বড় বড় গাছের ডাল ভেঙে পড়তে লাগল হস্তিশুণ্ডের আকর্ষণে—কাঠুরেরা যেমন অতি সহজেই শুকনো গাছের ডাল ভেঙে ফেলে, তেমনিভাবে শক্তপোক্ত ছোট-বড় ডালগুলো ভেঙে ফেলছিল হাতির দল আর পিস্তলের আওয়াজের মতো প্রচণ্ড শব্দ উঠছিল ওই ডাল ভেঙে ফেলার সময়ে—হস্তিযূথের দেহের সংঘাতে জায়গায় জায়গায় গাছের সারি নুয়ে পড়ছিল, ভেঙে যাচ্ছিল এবং সমূলে উৎপাটিত কয়েকটি বৃক্ষ সবেগে ও সশব্দে আছড়ে পড়ছিল নীচে ঘন জঙ্গলের মধ্যে...
মাঝে মাঝে শুঁড়ের ওপর কাঁটার দংশনে বেদনার্ত হস্তির বিচলিত বৃংহণে, চতুর্দিকে জঙ্গল-ভাঙার ভীষণ শব্দ আর উত্তেজিত জঙ্গল-তাড়ুয়াদের তীব্র চিৎকার বনে বনে প্রতিধ্বনি তুলে তরঙ্গায়িত শব্দের ভয়াবহ আলোড়ন সাধারণ মানুষের কাছে প্রাণান্তকর মনে হলেও শার্দূল-সন্ধানে ব্যস্ত শিকারির কানে সেই 'শব্দকল্পদ্রুম' মধুবর্ষণ করছিল সুমিষ্ট সঙ্গীতের মতো।
প্রাকৃতিক বাধা চূর্ণ করে জঙ্গলটার মাঝামাঝি এসে পৌঁছাল শিকারির দল—আর হঠাৎ, দলের মাঝখানে পট্টি সাহেবের হাতির পায়ের কাছে শোনা গেল ভীষণ গর্জন! পরক্ষণেই প্রকাণ্ড বাঘ মুহূর্তের জন্য শিকারিদের দর্শন দিয়েই বিদ্যুৎঝলকের মতো অদৃশ্য হল সামনের ঘন উদ্ভিদের নিবিড় বেড়াজালের মধ্যে! জো সাহেব বন্দুক ছুঁড়লেন। জঙ্গলের ভিতর থেকে ঘন ঘন ক্রুদ্ধ গর্জন ভেসে এসে জানিয়ে দিল গুলি লক্ষ্যভেদ করেছে। শুধু গর্জিত কণ্ঠে প্রতিবাদ জানিয়েই বাঘ ক্ষান্ত হল না, জঙ্গলের ভিতর থেকে সংহার মূর্তি ধারণ করে বেরিয়ে এল এবং সামনে যে হাতিটাকে দেখতে পেল সেটার দিকেই ছুটল হিংস্র আক্রোশ চরিতার্থ করতে। ওই হাতিটা আগে কখনও বাঘের আক্রমণের মোকাবিলা করেনি, আহত বাঘের ভয়ংকর আস্ফালন দেখে সে ভীষণ ঘাবড়ে গিয়ে পিছন ফিরে রণে-ভঙ্গ দিল—মাহুত প্রাণপণ চেষ্টা করেও হাতিকে দাঁড় করাতে পারল না, বাঘের কবল থেকে প্রাণ বাঁচাতে সে ছুটতে শুরু করল ঊর্ধ্বশ্বাসে।
আক্রমণোদ্যত ব্যাঘ্রের রুদ্রমূর্তির সামনে অটল হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে পারে শিকারে অভিজ্ঞ শিক্ষিত হাতি, পূর্ব-অভিজ্ঞতা না থাকলে বাঘের মোকাবিলা করা সম্ভব নয় হাতির পক্ষে। আক্রান্ত হাতিটি ছিল এক ধনী মোহান্তর পোষা জানোয়ার, জীবনে কখনও যে বাঘ দেখেছে কি না সন্দেহ—ভীষণ গর্জনে বন কাঁপিয়ে দাঁত খিঁচিয়ে একটা জানোয়ার তার দিকে আগুনের গোলার মতো ছুটে আসছে দেখেই তার আক্কেল-গুড়ুম হয়ে গিয়েছিল এবং সহজ বুদ্ধিতে সে বুঝে নিয়েছিল ওই ভয়ংকর জীবটির থেকে যত দূরে থাকা যায় ততই মঙ্গল, অতএব সে ছুটতে শুরু করল ঝড়ের বেগে। তার পিছনে সগর্জনে তাড়া করে ছুটল বাঘ।
বেশিক্ষণ হাতির পেছনে বাঘ তাড়া করতে পারেনি! প্যাট সাহেবের বন্দুকের গুলি বাঘের কাঁধ ভেঙে তাকে মাটিতে শুইয়ে দিল। তারপরই আবার এক গুলি। বাঘের হৃৎপিণ্ড ফুটো হয়ে গেল। সে মারা গেল তৎক্ষণাৎ।
বাঘ মারা গেল, কিন্তু হাতির দৌড় থামল না। ভয়ার্ত হাতি সবেগে প্রবেশ করল নিবিড় অরণ্যের মধ্যে। বাট্টি সাহেবের চাকর হাওদায় পিছনে বসেছিল, সে চট করে হাতির পিঠ থেকে গড়িয়ে নেমে গেল—বেচারার দুর্ভাগ্য, সে গিয়ে পড়ল একটা কাঁটা গাছের ওপর। কাঁটার খোঁচা খেয়ে সে কতটা কাহিল হয়েছিল বলা যায় না, তবে লোকটা ভীষণ ভয় পেয়েছিল—যতগুলো দেবদেবীর নাম তার জানা ছিল, সকলের নাম ধরেই সে আর্তনাদ করতে লাগল তারস্বরে। তার ভয়—এই বুঝি বাঘ এসে তাকে ধরে! লোকটির হঠাৎ অবতরণ আর আর্তনাদের ফলে হাতি ভয় পেয়ে তার গতি বাড়িয়ে দিল।
মাহুত প্রাণপণে হাতিকে সামাল দিতে চেষ্টা করছিল। একটা নীচু আর বাঁকা বৃক্ষশাখার দিকে বিপজ্জনক ভাবে এগিয়ে গেল হাতি। ওই গাছের ডালের তলা দিয়ে শুধু হাতির দেহটাই গলে যাওয়ার মতো ফাঁক ছিল, হাওদার জায়গা ছিল না। হাতি ঝড়ের বেগে ছুটে গাছের তলায় এল। অদ্ভুত কৌশলে আত্মরক্ষা করলেন বাট্টি সাহেব, একটা উঁচু গাছের ডাল দু-হাতে পাকড়ে হাতের জোরে শরীরটাকে ওপরে তুলে ফেললেন তিনি—পরক্ষণেই ধাবমান হাতির পিঠে বসানো হাওদা গাছের ডালে ধাক্কা খেয়ে টুকরো টুকরো হয়ে ভেঙে গেল। বাট্টি সাহেবের বন্দুকগুলো ছিটকে পড়ল এদিক-ওদিক, একটা বন্দুক শূন্যেই 'ফায়ার' হয়ে গেল—গাছের ভিতর দিয়ে শিষ দিতে দিতে নিক্ষিপ্ত বুলেট অত্যন্ত বিপজ্জনক ভাবে জর্জ সাহেবের কানের পাশ দিয়ে ছুটে বেরিয়ে গেল। সোডার বোতল ফাটল ফট-ফট, কার্তুজ, জলের বোতল, চুরুট, হাওদার ভাঙা বেত আর কাঠের টুকরো ছিটকে পড়ল চারদিকে এবং হাওদার ভগ্নাবশেষ সবেগে ঠোক্কর খেতে লাগল হাতির পাঁজরে। হাতি তখন দিগবিদিক জ্ঞানশূন্য, তার বিশ্বাস শয়তান বাঘটা নিশ্চয়ই তার গায়ের ওপর উঠে বসেছে—অতএব দুমদাম পা ফেলে সে আগের চেয়েও জোরে ছুটতে লাগল। জঙ্গল থেকে কয়েক মাইল দূরে গভীর রাত্রে হাতিটাকে যখন পাওয়া গেল, সে তখনও আতঙ্কে বিহ্বল,—তখন কেঁপে কেঁপে উঠছে তার সর্বাঙ্গ!
মাহুতের অবস্থা হয়েছিল সবচেয়ে শোচনীয়। গাছের ডালে ধাক্কা লেগে সে অচৈতন্য হয়ে ছিটকে পড়েছিল মাটির ওপর। তার একটা উরু ভেঙে গিয়েছিল। মরতে মরতে বেঁচে গিয়েছিল ওই মাহুত। বাট্টি সাহেবও মরতে বসেছিলেন, উপস্থিত বুদ্ধির জন্য সে যাত্রায় বেঁচে গেলেন কোনোমতে।
ইংলিস সাহেব লিখেছেন, তা হলে দেখা যাচ্ছে বাঘ শিকারের সময়ে বাঘের চেয়েও বিপজ্জনক হচ্ছে ভড়কে-যাওয়া হাতি। আতঙ্কবিহ্বল হস্তির ছুটোছুটির ফলে শিকারির প্রাণহানি ঘটতে পারে যে-কোনও মুহূর্তে।
প্রসঙ্গত আর একটি ঘটনার উল্লেখ করছি। এই ঘটনাটি অবশ্য স্বচক্ষে দেখেননি ইংলিস সাহেব, কিন্তু ঘটনার সত্যতা সম্পর্কে সন্দেহের অবকাশ নেই—আলোচ্য ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী ছিলেন এক ম্যাজিস্ট্রেট এবং তাঁর কাছ থেকেই সমগ্র বিবরণী শুনে ঘটনাকে লিপিবদ্ধ করেছেন জেমস ইংলিস।
মিঃ অবার্ট নামে এক নীলকর সাহেব হাতি সাজিয়ে বাঘশিকারে গিয়েছিলেন। একটা বাঘ গুলি খেয়ে মাটিতে পড়ে ছটফট করছিল। তাকে ঘিরে দাঁড়িয়েছিল শিকারির দল। মিঃ অবার্ট যে হাতির পিঠে ছিলেন, সেই জন্তুটা হঠাৎ ভয় পেয়ে দৌড় দেবার উপক্রম করল। মাহুত তাড়াতাড়ি হাতিকে নিরস্ত করার চেষ্টা করল বটে, কিন্তু তার চেষ্টা সফল হল না। একটা মস্ত গাছের ডাল মূল কাণ্ড থেকে বেরিয়ে এসে মাটির দিকে ঝুঁকে পড়েছিল এবং সেই গাছটারই নীচে ছটফট করতে করতে ব্যর্থ আক্রোশে গর্জন করছিল আহত বাঘ—হাতি সোজা ছুটে বেরিয়ে গেল সেই গাছেরই তলা দিয়ে, ফলে নিচু গাছের ডালে ধাক্কা লেগে তার পিঠের হাওদা হয়ে গেল চূর্ণবিচূর্ণ।
বিপদ বুঝে মিঃ অবার্ট আগেই লাফ দিয়ে হাওদা ছেড়ে গাছের ডাল ধরে ফেলেছিলেন। দুর্ভাগ্যের বিষয় ডাল ধরে কিছুক্ষণ ঝোলার পর তাঁর হাতের মুঠি শিথিল হয়ে গেল, দেহটাকে তিনি ডালের উপর টেনে তুলতে পারলেন না—সটান পড়ে গেলেন নীচে আহত বাঘের গায়ের ওপর। বাঘের তখন মৃত্যু আসন্ন, কিন্তু ওই অবস্থাতেই সে মরণ-কামড় বসাল—ধারালো দাঁতের চাপে মিঃ অবার্টের একখানি পা দেহ থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল। পরের দিনই মারা গেলেন মিঃ অবার্ট।
ভড়কে-যাওয়া হাতির গতিবিধির ফলে নানাভাবে শিকারির সংকট হতে পারে। শুধু যে বাঘের সান্নিধ্যেই হাতি ভয় পেয়ে পালায় তা নয়, আরও একটি বনবাসী জীবকে হাতি ভয় করে যমের মতো। শিকারে অভিজ্ঞ শিক্ষিত হস্তী নির্ভয়ে বন্যবরাহ, গণ্ডার এবং বাঘের সামনে অটল চরণে দাঁড়িয়ে থাকতে পারে, কিন্তু দলবদ্ধ ভীমরুল আক্রমণ করলে অত্যন্ত নির্ভীক হস্তিও সভয়ে ছুটে পালায় দিগবিদিক জ্ঞান হারিয়ে।
ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে ভীমরুলের উপনিবেশ দেখা যায়। ওই সব অঞ্চলে গাছে গাছে ঝোলে ভীমরুলের চাক। হাতি যখন লতাগুল্ম আর গাছের ডাল ভাঙতে ভাঙতে এগিয়ে চলে, তখন অনেক সময় তার দেহের ধাক্কা লেগে ভীমরুলের চাক ভেঙে মাটির ওপর ছিটকে পড়ে। তৎক্ষণাৎ ঝাঁকে ঝাঁকে ভীমরুল ঝাঁপিয়ে পড়ে হাতির ওপর। অসংখ্য বিষাক্ত হুলের খোঁচায় যাতনাকাতর হস্তি প্রাণপণে ছুটতে থাকে, আর সেই সময়ই মাহুত এবং হস্তিপৃষ্ঠে অবস্থিত শিকারির প্রাণসংশয় ঘটে। মাহুত যদি হাতির গতি নিয়ন্ত্রণ করতে পারে তো ভালো, কিন্তু অধিকাংশ সময়েই সেটা সম্ভব হয় না। হাতির পিঠ থেকে গড়িয়ে মাটিতে নেমে পড়লে ওই সময়ে আরোহী প্রাণে বাঁচতে পারে। তবে পড়ার সময়ে সমস্ত শরীর কম্বল দিয়ে জড়িয়ে নেওয়া উচিত, না হলে ক্রুদ্ধ ভীমরুলরা ধরাশায়ী মানুষের ওপরই ক্রোধ চরিতার্থ করতে সচেষ্ট হয়। লোকটির অবস্থা তখন 'ফুটন্ত কড়াই থেকে জ্বলন্ত উনুনের মধ্যে গিয়ে পড়ার' মতো হয়। গাছের ডালে ধাক্কা লেগে মাথা ভাঙার পরিবর্তে সর্বাঙ্গে বিষাক্ত হুলবিদ্ধ হয়ে তার মরার সম্ভাবনা থাকে।
ভীমরুলের আক্রমণে মৃত্যুবরণের একাধিক ঘটনার উল্লেখ করেছেন জেমস ইংলিস।
ইংলিস সাহেব তাঁর লিখিত বিবরণীতে মন্তব্য করেছেন শিকারির পক্ষে বাঘের চেয়েও বিপজ্জনক এবং ভয়ানক হচ্ছে ভড়কে-যাওয়া হাতি। প্রত্যক্ষদর্শীর অভিজ্ঞতার কাহিনি পাঠ করলে মনে হয় খাঁটি কথাই বলেছেন ইংলিস সাহেব।

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন