নির্বেদ রায়
লেপার্ড বড় ভয়ংকর জন্তু।
পৃথিবীর সেরা শিকারি আর আরণ্যক জীবনে অভিজ্ঞ মানুষ এককথায় স্বীকার করেন এই সার কথাটুকু। জেমস ইংলিসও তাদের সঙ্গে একমত হয়েছিলেন নিজের জীবনের অভিজ্ঞতা দিয়ে।
উনিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে ভারতে এসে নীলের চাষ আর ব্যবসা শুরু করেন জেমস। স্কটল্যান্ডে জন্ম, কিশোর বয়সেই লেখাপড়ার পাঠ শেষ করে 'গোল্ডরাশ'-এর স্বপ্ন নিয়ে পাড়ি দেন নিউজিল্যান্ডের সমুদ্রপাড়ে। সেখান থেকে ভাই আলেকজান্ডারের ডাক পেয়ে কলকাতায়। আলেকজান্ডার এখানে তখন চা-এর ব্যবসা জমিয়ে তুলেছেন, কিন্তু ইংরেজ উপনিবেশের রাজধানী কলকাতার জাঁকজমক মন টানল না জেমসের। সদ্য যুবক জেমস ইংলিস গিয়ে ডেরা বাঁধলেন কুশীনদের তীরে বিহারের অরণ্য সন্নিহিত অঞ্চলে—শুরু করলেন নীলচাষের আয়োজন।
জেমস যখন এই নীলকরের জীবন ও পেশা বেছে নিলেন, তখন নীলবিদ্রোহের আগুন নিভে গেলেও অল্পসল্প আঁচ ছড়াচ্ছে। ইন্ডিগো কমিশন তৈরি হচ্ছে, ব্রিটিশ পার্লামেন্টের আসন উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে তার আলোচনায়।
কিন্তু বহু দূরের এই উপনিবেশে এক অরণ্যসংকুল, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ সম্পর্কে তাদের কোনো ধ্যানধারণা ছিল না, স্বদেশের বন্ধুবান্ধব ও আত্মীয়পরিজনের সঙ্গে কথা বলে এই ধারণা বদ্ধমূল হয়েছিল জেমসের, আর সেই কারণে তার ভারতের অভিজ্ঞতা সম্পর্কে বই লেখার কথা প্রথম মাথায় আসে।
নীলের ব্যবসায় তখন প্রচুর লাভ। অমানুষিক শোষণ এই লাভের মূল কারণ তো বটেই। ইংরেজও স্বীকার করছে যে ভারত থেকে আমদানি হওয়া প্রতিটি নীলের খণ্ডে লেগে থাকে নীলচাষির রক্তের দাগ। বিপুল এই লাভ আর তার লোভ নীলকরকে টেনে আনে এই স্যাঁতসেঁতে গরম আর বিপজ্জনক জীবনের মধ্যে।
সারাদিন নীলচাষের তদারকি আর নীল তৈরির ফ্যাক্টারির কাজ সেরে সাহেবদের জীবনে অবসর বিনোদনের কোনো আয়োজন কি বন্দোবস্ত এখানে নেই।
সেই একঘেঁয়ে জীবনের মাঝে ক'টা দিন ফাঁক পেলে তাই তারা ছুটত শিকারের রোমাঞ্চ উপভোগ করতে। আর শিকার এখানে প্রচুর।
ঠিক এইখানে এসে একটা কথা বলেছেন জেমস, যে কথাটা এড়িয়ে গেলে ভুল হবে। শিকার প্রচুর সন্দেহ নেই—সেদিনের কুশীনদের তীরবর্তী অরণ্যে কালো মেঘের মতো বুনোমোষের দল, সম্বর কি চিতল হরিণের বিস্তর আনাগোনা ছাড়াও ছিল শিকারের সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ বস্তু—বাঘ।
ইংরেজ পাঠকের কাছে এই পাণ্ডববর্জিত দেশে, শিকারের অভিজ্ঞতা বলতে বসে এই জীবজন্তু সম্পর্কে অনেক তথ্য খাড়া করতে হয়েছে জেমসকে। কারণ, অধিকাংশ জন্তু সম্পর্কেই 'তাঁর পাঠকের' সম্যক ধারণা নেই। যেমন তার নিজেরও ছিল না এদেশে আসার আগে।
বাঘ বা চিতাবাঘ বুঝতে তারও সময় লেগেছে। কপাল ভালো যে সেই অভিজ্ঞতা অর্জন করতে গিয়ে তাকে চরম মূল্য দিতে হয়নি। বহু বাঘ বা চিতাবাঘ শিকারিকে যা দিতে হয়েছে ওই উনিশ শতকেই। তার আগেও, তার পরেও।
কিন্তু আমরা অন্য কথায় চলে গেছি। জেমসের সেই কথায় ফিরে আসি, যা কিনা গুরুত্বপূর্ণ বলে আমাদের মনে হচ্ছে।
জেমস লিখছেন, শিকারে আনন্দ আছে রোমাঞ্চও আছে। বিশেষ করে এই একঘেঁয়ে জীবনে এইটুকু আনন্দ আর রোমাঞ্চের কত প্রয়োজন, এর মূল্য কতটা তা বলে বোঝানো যাবে না তাদের কাছে যারা এই জীবন কাটাননি; কিন্তু সবসময় আনন্দের খোঁজে যে শিকার করতে গেছি এমন নয়। বহুক্ষেত্রে বাধ্য হয়ে যেতে হয়েছে। অনিচ্ছায় গেছি, এমনকী প্রবল ভয় আর আতঙ্কের মধ্যে যেতে হয়েছে আমাদের প্রজাদের জীবনরক্ষা করতে। না-হলে গ্রামের পর গ্রাম শূন্য হয়ে গেছে। জীবনের ভয়ে পালিয়েছে চাষির দল। নীলের খেত পড়ে থেকেছে জনশূন্য অবস্থায়। তখন জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বেরোতে হয়েছে নরখাদকের খোঁজে। নরখাদক বাঘ ভীষণ ধূর্ত জানোয়ার। কিন্তু ব্যবসা বড় বালাই, তার জন্যে জীবন বাজি রাখতে হয়েছে নীলকর সাহেবদের।
শিকারের শখ মেটাতে ধীরেসুস্থে, সুযোগ বুঝে এগোনো যায় বটে, কিন্তু নরখাদকের খোঁজে বেরোনো একেবারে অন্য ব্যাপার, অনেক সময়ে নিতান্ত বাধ্য হয়ে বিপজ্জনক ঝুঁকি নিয়েই বেরোতে হয়েছে জেমসকে বা তার বন্ধুদের।
লেপার্ডের যে কাহিনি জেমস আমাদের বলছেন, তখনও এই জন্তুটা সম্পর্কে তিনি ভালোভাবে জেনেছেন বা বুঝেছেন এমন মনে হয় না। সম্বল বলতে চিতাবাঘ বা লেপার্ড সম্পর্কে তার বন্ধুদের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার গল্প। যে গল্প জন্তুটা সম্পর্কে খুব স্বস্তিদায়ক ধারণা তৈরি করে না মোটেই।
অযোধ্যার কাছে এক জঙ্গলে জেমস ইংলিসের এক ইংরেজ বন্ধু লেপার্ড শিকারে বেরিয়েছেন। সঙ্গে বনবিভাগের এক স্থানীয় কর্মচারী। ভালো শিকারি। অযোধ্যার জঙ্গল তখন চিতাবাঘের বড় বাসস্থান। অল্প খোঁজাখুজি করতেই তার মুখোমুখি হওয়া গেল। দু-দুটো বন্দুক হাতে মানুষ দেখে এড়িয়ে যাওয়া বা পালিয়ে যাওয়া দূরের কথা, জন্তুটা সোজা তেড়ে এল শিকারিদের দিকে। বনকর্মী গুলি চালালেন। অব্যর্থ লক্ষ্য। চিতাবাঘ মরল না বটে, কিন্তু মারাত্মক আহত হল।
কিন্তু তার চেয়েও মারাত্মক হল যে, সেই সাংঘাতিক জখম নিয়েই লেপার্ড আক্রমণ করল শিকারিকে। একটা ঝোপের আড়াল থেকে বনকর্মীটি গুলি চালিয়েছিল, চিতাবাঘের বিদ্যুতের মতো গতি সে সামলে উঠতে পারল না। কোনওক্রমে দাঁড়িয়ে উঠে বাধা দেওয়ার আগেই চকিত আক্রমণে তার ওপর এসে পড়ল বাঘ। তার হাতে কামড় বসানোর সঙ্গে চারটে থাবার কুড়িটা বাঁকা ছুরির মতো নখ সমস্ত শরীরটাকে মুহূর্তের মধ্যে রক্তাক্ত করে তুলল।
লেপার্ডের এই আক্রমণ বড় ভয়ংকর। শিকার হতবুদ্ধি হয়ে তখন সব প্রতিরোধের শক্তি হারিয়ে ফেলে। কিন্তু বনকর্মীটি বলিষ্ঠ মানুষ, তার ওপর চাকরির কারণে জঙ্গল তার ঘরবাড়ি। বন্যজন্তুর আক্রমণের ধারা তার জানা। সে বুদ্ধি হারায়নি। একটু দূরে একটা মোটা শালগাছের গুঁড়ি, সেই থামের মতো গুঁড়ির সারা গায়ে উই আর পিঁপড়ের দল বাসা বেঁধেছে, ক্ষতবিক্ষত গাছটার গায়ে যেন কেউ অনেকগুলো লোহার ছুঁচোলো গোঁজ পুঁতে দিয়েছে বলে মনে হয়, আসলে পোকাদের আক্রমণেই গাছের ওইরকম চেহারা দাঁড়িয়েছে।
বলিষ্ঠদেহী বনকর্মী লেপার্ডটাকে বয়ে নিয়েই প্রায় সেই শালগাছটার কাছে পৌঁছল। তারপর প্রচণ্ড শক্তিতে জন্তুটাকে ঠুকতে শুরু করল সেই গাছের গায়ে। অমানুষিক লড়াই সন্দেহ নেই। শরীরের মর্মস্থানে গুলির কামড় বাঘটাকে বেশ ভালোভাবে জখম করেছিল, এখন এই প্রবল আঘাত তার সহ্য হল না। সে ধরাশায়ী হল। কিন্তু বনকর্মীর তখন শোচনীয় অবস্থা। জেমস পরে জেনেছিলেন যে প্রাণে বাঁচলেও হাতটাকে পুরো বাঁচানো যায়নি ওই লোকটির। আক্রান্ত হাতের অনেকটা কেটে বাদ দিতে হয়।
দীর্ঘ অভিজ্ঞতা থেকে পরবর্তীকালে জেমস বলেছেন যে পারতপক্ষে সামনাসামনি লেপার্ডকে গুলি করতে নেই। কারণ, আহত লেপার্ড পালিয়ে যাবে না, সরাসরি শিকারিকে আক্রমণ করবে চরম হিংস্রতায় আর তীব্র গতিতে। সেই আক্রমণ ঠেকানো মুশকিল। বরং সে যদি তোমার পাশ দিয়ে যায়, তখন গুলি চালানো যেতে পারে, সেক্ষেত্রে আহত জন্তুটা যন্ত্রণায় অস্থির হয়ে সামনের দিকে ছুটে যায়, শিকারি তার আক্রমণের লক্ষ্য থাকে না। যদিও সবচেয়ে ভালো পথ হল গাছের ওপর মাচা বেঁধে নীচে ছাগল বা ওই জাতীয় টোপ রেখে শিকার করা, কিন্তু রাতের বেলা সাবধান। লেপার্ডের মতো গাছে চড়ায় ওস্তাদ জন্তু আর নেই।
লেপার্ড নিয়ে অন্য অভিজ্ঞতার কথা শোনার আগে এইখানে পাঠকদের কয়েকটা কথা বলে রাখা দরকার—
যে সময়ের কথা, তখন ভারতবর্ষ থেকে চিতা অবলুপ্ত হয়ে যায়নি। লেপার্ড বা চিতাবাঘের সংখ্যাও প্রচুর। যে পাঠক বন্য জীবন অথবা শিকার কাহিনিতে মনোযোগী তারা জানেন যে অতিকায় মার্জার পরিবারের এই দুই সদস্যের বাংলা নাম কাছাকাছি হলেও পার্থক্য প্রচুর।
চিতা বিদ্যুৎগতির প্রাণী, চিতাবাঘ বা লেপার্ড হিংস্রতম। চিতার গায়ে কালো ফোঁটা বা 'স্পটস', চিতাবাঘের গায়ের চামড়ায় 'রসেটস' বা কালো চাকা-চাকা ছাপ। চিতা তুলনায় লম্বা আর উঁচুও বটে, লেপার্ড অনেক পেশীবদ্ধ, বলিষ্ঠ কিন্তু আকারে-আয়তনে একটু ছোট। আরও বহু অমিল আছে দুই আত্মীয়ের মধ্যে। কিন্তু আজ সে ভুল আর হওয়ার নয়। প্রায় সত্তর বছর হল ভারতের বনভূমি থেকে চিতা উধাও হয়েছে। এখন যা আছে তা লেপার্ড, যাকে আমরা চিতাবাঘ বলে থাকি।
ভারতের পাহাড়ি জঙ্গলে বা তার আশেপাশের বাংলো কি বাড়ির বারান্দায় লেপার্ডের দেখা পাওয়া কোনো অস্বাভাবিক ঘটনা নয়, বরং বাসিন্দারা এ ঘটনাতেই বেশি অভ্যস্ত। একটু সতর্কই থাকেন তারা, বিশেষ করে সন্ধ্যার পরে।
দু-তিন বছর আগে ভাগলপুর স্টেশনে এক ধর্মযাজক দিনের বেলাতেই লেপার্ড মারেন। সেদিন ছিল আবার রবিবার। চার্চের কাজকর্ম সেরে বেরিয়েছিলেন ভদ্রলোক, সামনে স্টেশন। পথেই খবর পেলেন যে একটা চিতাবাঘ স্টেশন চত্বরে এসে ঘোরাফেরা করছে। ধর্মযাজক ভদ্রলোককে স্থানীয় লোকজন খবর দেওয়ার মূল কারণ অবশ্য যে তারা জানত ওর কাছে বন্দুক আছে। লেপার্ডটাকে মারা হল। জেমস এখবর শোনেন প্রায় তিন বছর বাদে এই অঞ্চলে এসে।
কিন্তু ডেংরাঘাট ডাকবাংলোর ঘটনাটা বিপজ্জনক হলেও সাহেব তার মধ্যে একটু মজার খোঁজ পেয়েছিলেন বলেই মনে হয়।
জেমস ইংলিসের লেখায় এই মজাটুকু মাঝেমধ্যে উঠে আসে। সে পাগলা হাতির আক্রমণের মুখে হোক, অথবা ভালুকের সঙ্গে এক মল্লযোদ্ধার কুস্তির গল্পেই হোক। প্রাণসংশয়ের মুখে দাঁড়িয়ে যেখানে শেষ পর্যন্ত মধুরেণ সমাপয়েৎ, সেই সব ক্ষেত্রে বিশেষ করে হাস্যরস পরিবেশন করতে কার্পণ্য করেননি জেমস। জীবনের কঠিন পাঠ, মৃত্যুর মুখে দাঁড়িয়ে শেষ পর্যন্ত বেঁচেবর্ত্তে ফেরার মধ্যে এক আশ্চর্য মজা উপভোগ করেছেন তিনি। কখনও এই পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছেন তিনি নিজে, আবার কখনো তার বন্ধু বা সঙ্গীসাথিরা। তবু হাসিটুকু ধরে রেখেছেন।
তার এক ইংরেজ বন্ধুর কাছেই এমন এক ঘটনার বিবরণ শুনেছেন জেমস। পাত্র হল পূর্তবিভাগের সহকারী পদে থাকা এক সরকারি কর্মচারী। ভারতীয় তরুণ। প্রাণচঞ্চল, কাজকর্মে উদ্যোগী, চনমনে এই ছেলেটি একদিন কাজে রীতিমতো ব্যস্ত, চারদিকে লোকজন—বিশেষ করে সরকারের কাজকর্মে যে সব ব্যবসায়ী খুচরো জিনিসপত্র চালান দেয় তারা ভিড় জমিয়ে ছিল তার টেবিল ঘিরে। ঠিক তখনই খবর এল—অফিস থেকে একটু দূরে পরিত্যক্ত একটা গুদামঘরের মধ্যেই জন্তুটা আস্তানা গেড়েছে। খবরটা ছড়ালে আতঙ্কও ছড়াবে। যুবক কর্মচারী লাফ দিয়ে উঠে দৌড়োল গুদাম ঘরটার দিকে। সঙ্গে বন্দুক। পিছনে ভিড় করে ছুটল ব্যবসায়ীর দল। অফিসে একটা বন্দুক রাখাই থাকে, এই ধরনের ঘটনার মোকাবিলার জন্য। কিন্তু উৎসাহ যতটা, অভিজ্ঞতা ততটা নয় যুবক অফিসারের, থাকলে ভালো হত। পিছনে লোকজন ছুটছে, ফলে আগ্রহ আরও বেড়ে গিয়ে থাকবে তার। ঘরের দরজা ভেজানো। যে ঘরে চিতাবাঘ ঢুকেছে তার সামনে এসে এক ধাক্কায় দরজা খুলে ভিতরে ঢুকেছে সে। আলো-আঁধারীর মধ্যেই একেবারে মুখোমুখি চিতাবাঘ। সঙ্গে সঙ্গে গুলি ছুঁড়ল কর্মচারী যুবক। আওতার মধ্যে বাঘ, গুলি লক্ষ্য ভ্রষ্ট হল না। কিন্তু আহত লেপার্ড শিকারিকে আক্রমণ করল তৎক্ষণাৎ। প্রতি-আক্রমণের জন্য ছেলেটি প্রস্তুত ছিল না। সে পিছন ফিরে দরজা দিয়ে পালাতে গেল; বাঘ এসে পড়ল তার পিঠের ওপর।
সঙ্গিন অবস্থা। হাতে বন্দুক, কিন্তু সে বন্দুক কোনো কাজে লাগছে না। দরজার বাইরে সে বেরিয়ে এসেছে বটে, কিন্তু পিঠে ঝুলছে আহত লেপার্ড। জন্তুটার দাঁত আর নখের আঘাতে পিঠ হয়ে উঠেছে রক্তাক্ত। তারস্বরে ছেলেটা চিৎকার করে চলেছে সাহায্যের জন্য, কিন্তু সঙ্গী লোকজন ওই দৃশ্য দেখে আর দেরি না করে দৌড়ে পালিয়েছে।
জেমস ইংলিসের কল্পনায় দৃশ্যটা বেশ কৌতুকের বলে মনে হলেও, বাস্তবে নিশ্চয়ই তা নয়।
তবু কর্মচারীটির ভাগ্য ভালো। ভিড়ের মধ্যে থেকে তার অফিসেরই এক সহকর্মী লাঠি হাতে এগিয়ে এল। ছেলেটি অফিসে বেয়ারার কাজ করে, শক্তপোক্ত জোয়ান ছেলে, সাহস আছে। বেশ বড়সড় পাকা বাঁশের লাঠি দিয়ে মোক্ষম কয়েক ঘা বসিয়ে দিল বাঘের পিঠে। গুলি খেয়ে ভালোমতো আহত হয়েছিল বাঘ, তার উপর ভারি লাঠির ঘা একের পর-এক পিঠে শরীরে পড়ার ফলে সে আর সামলাতে পারল না। লোকটার পিঠ থেকে ছিটকে পড়ল মাটিতে। সঙ্গে সঙ্গে লাঠির ঘা পড়তে থাকল বৃষ্টির মতো ক্রমাগত—লেপার্ড মরলো বটে কিন্তু শত্রুকে ভালোমতো জখম করে গেল সে। সারাজীবন কর্মচারীটিকে ভুগতে হয়েছে তার জন্য।
পুরো কাহিনির একটা সারবাক্য আছে—চিতাবাঘের সঙ্গে মুখোমুখি লড়াই হলে, হয় এস্পার নয় ওস্পার। মাঝামাঝি কিছু হতে পারে, এমন আশা করা দুরাশামাত্র।
গাছের ওপর মাচা বেঁধে শিকারি বসে অপেক্ষা করবেন বাঘের জন্য, নীচে গাছের গুঁড়ির সঙ্গে বাঁধা ছাগল বা ওই ধরনের কোনো লোভনীয় টোপ যতক্ষণ না বাঘকে ডেকে আনতে পারে।
ব্যাপারটা যত সহজে বলে ফেলা গেল, বাস্তবে অত সহজ নয় মোটেই। একথা অভিজ্ঞ পাঠকমাত্রেই জানে। প্রথম কারণ হল, চিতাবাঘ অত্যন্ত সতর্ক আর সাবধানী জন্তু—চারদিকে চোখ চালিয়ে অনেক দেখভালের পর নিশ্চিন্ত হয়ে তবে সে টোপের দিকে এগোবে, দ্বিতীয় কারণ, মাচার ওপর বসে শিকারি কি যথেষ্ট সুরক্ষিত? বোধহয় না, কারণ গাছে চড়ার ব্যাপারে লেপার্ডের দক্ষতা প্রশ্নাতীত। এ কাজে সে এতটা দক্ষ যে শুধু বানরের মতো নিঃশব্দে সে গাছে উঠতে পারে তাই নয়, নিজের সমান ওজনের শিকার সমেত সে অনায়াসে ডাল থেকে ডালে হেঁটে চলে যেতে সক্ষম। এমন বেয়াড়া জন্তুর মোকাবিলা করার শখ সাধারণত কোনো মানুষের থাকার কথা নয়, তবে মাঝে মাঝে বাধ্য হয়ে বেরোতে হয়—
অযোধ্যায় ইংলিস সাহেবের নীল কারখানা। সামনে বাংলো। বাংলোর হাতার মধ্যে শখ করে একটা ছোটখাট হরিণ পুষেছিলেন সাহেব। এখানে হরিণ সম্পর্কে একটা ছোট কথা বলে রাখা ভালো। ইংরেজিতে 'ডিয়ার' আর 'এন্ট্রিলোপ' দুটো আলাদা প্রজাতি, কিন্তু বাংলায় সব ক'টাই হরিণ। সাহেবের পোষ্য একটা 'এন্ট্রিলোপ', চার শিং-ওয়ালা হরিণ—স্থানীয় ভাষায় চৌশিঙ্গা। আঠারো-উনিশ কিলো ওজন, মাটি থেকে ঘাড় পর্যন্ত প্রায় দু-ফুট উঁচু, খাটো ল্যাজ, সরু পা-ওয়ালা লালচে-বাদামি এই চৌশিঙ্গা হরিণটা ভারি পছন্দের ছিল জেমসের।
ভরদুপুরে একেবারে বাংলোর চৌহদ্দি থেকে কয়েকজন কুলির চোখের সামনে চিতাবাঘ হরিণটাকে তুলে নিয়ে গেল। সাহেব তখন বাড়ি ছিলেন না। থাকলে চিতাবাঘের কপালে অন্তত একটা গুলি পাওনা থাকত।
বাড়ি বয়ে এসে সাহেবের শখের হরিণ শিকার করে নিয়ে যাওয়া, তা-ও দিনদুপুরে কুলিদের চোখের সামনে। সাহেবকে যেন সরাসরি উপেক্ষা করল বাঘটা। এভাবে চললে নীলের ফ্যাক্টরির কুলি-কামিনের দল কি আর তাকে মানবে? আড়ালে-আবডালে এখনই যে হাসাহাসি চলছে তা বুঝতে বাকি নেই সাহেবের।

ফলে অন্তত মান-সম্মান রাখতে সাহেবকে বেরোতে হল ওই লেপার্ডের খোঁজে। কিন্তু কপাল মন্দ। গাছের ওপর মাচা বেঁধে আর নীচে জ্যান্ত ছাগল টোপ রেখে পরপর তিনদিন অপেক্ষা করলেন জেমস সাহেব, কিন্তু অপেক্ষাই সার হল। লেপার্ড টোপ ছুঁয়েও দেখল না। আরও হতাশার কথা হল, রাতে মাঝেমধ্যেই ছাগল তারস্বরে চিৎকার করেছে, কখনো বা হঠাৎ চুপ করে গেছে, বনের ভাষা জেমসকে জানিয়ে দিয়েছে যে লেপার্ড একেবারে কাছে এসে পড়েছে,—বাঁদরের ডাক আর লাফালাফি, নিশাচর পাখির ডানা ঝাপটানো; এই সব ভাষা অভিজ্ঞ শিকারির জানা, এই ভাষা নির্ভুল সংকেত পাঠায়।
এবারেও ভুল হয়নি। ভোরের আলো ফুটে যাওয়ার পর গাছ থেকে নেমে জেমস বুঝেছেন যে লেপার্ড গত রাতে টোপের আশপাশ দিয়ে ঘুরে গেছে, লক্ষ্য করেছে, সতর্ক চোখে কিন্তু বন্যজন্তুর ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় তাকে ছাগলের কাছে আসতে বাধা দিয়েছে; বুঝিয়ে দিয়েছে—সাবধান, সামনে বিপদ! না হলে তার প্রখর দৃষ্টিশক্তি হয়তো ছাগলের বেশ কয়েক ফুট ওপরে এক শরীরী নড়াচড়া লক্ষ্য করেই আর এগোয়নি। কে জানে? তবে এককথায় তিন-তিনটে রাত্রি বিফলে গেছে। কাজের চাপে জেমসকে আপাতত শিকারে দাঁড়ি টেনে ফিরতে হয়েছে নীলের কারখানায়।
দিনেকয়েক বাদে অবশ্য আয়োজন করেই শিকারে বেরিয়েছেন জেমস ইংলিস, সঙ্গে ওস্তাদ শিকারি ও বন্ধু প্যাটারসন। বিট করে মানে সোজা কথায় জঙ্গল খেদিয়ে চিতাবাঘ শিকার করা, মাচা বেঁধে আর ধৈর্যের পরীক্ষা দিতে চান না।
জঙ্গল বিট করে জন্তু বার করে আনা খুব নিশ্চিত উপায় শিকারের এবং শিকারির জন্য। কিন্তু তার আয়োজন বিরাট, খরচও অনেক। তার ওপর একটা ঝুঁকি থেকেই যায়, সব উদ্যোগ-আয়োজন করার পর তেমন কোনো জন্তু সেই বিটের এলাকার মধ্যে না থাকলে পর্বত মূষিক-প্রসব করবে। আর বিপজ্জনক জানোয়ার বিটারদের প্রচণ্ড আওয়াজ আর আকাশ ফাটানো ক্যানেস্তারা পেটানোর শব্দে অনেক সময় বিটারদের ব্যূহ ভেঙে পালাবার চেষ্টা করে, পালিয়েও যায়। সেক্ষেত্রে বিটারদের কেউ কেউ বিপজ্জনকভাবে আহত হয়। তবু এ পদ্ধতি পৃথিবী জুড়েই চালু।
জঙ্গল ঘিরে বিট শুরু হল। অনেকটা জায়গা ঘিরে...
জঙ্গল খেদানোর কাজ শুরু হওয়ার আগে শিকারির দল তাদের জায়গা বেছে আড়াল খুঁজে নিয়েছে—জেমস ডান দিক ধরে জঙ্গলের এক প্রান্তে জায়গা নিয়েছেন, সামনে জঙ্গলের সীমা শেষ হয়ে একটা বেশ বড় ধানের খেত। প্যাট জায়গা নিয়েছেন প্রকাণ্ড ঝুরি-নামা এক বটগাছের আড়ালে। সবার উদ্দেশ্যই এক—সামনে খানিকটা ফাঁকা জায়গা রেখে দাঁড়ানো। অন্তত খানিকক্ষণের জন্য যেন বাঘ চোখের সামনে থাকে, একটু সময় পাওয়া যায় গুলি ছোঁড়ার!
বিট শুরু হলেও অতদূর থেকে এখানে তার আওয়াজ এখনো এসে পৌঁছোয়নি। চারদিক শান্ত। জেমস আর তার বন্ধু। ধরা যাক তার নাম 'এইচ', কারণ নাম প্রকাশ করেননি জেমস তার লেখায়—হালকা মেজাজে গাছের ওপর বাঁদরদের কার্যকলাপ দেখছিলেন মন দিয়ে, অন্যদিকে সতর্ক হওয়ার কারণ ঘটেনি বলেই। কিন্তু 'প্যাট' জাত শিকারি। জঙ্গলে ঢোকামাত্র তার সমস্ত স্নায়ু, চোখ, কান, সতর্ক হয়ে ওঠে বন্যজন্তুর মতো। বিশাল গাছটার পিছনে একটা আড়াল দেখে যে আশ্রয় নিয়েছিল, কিন্তু তার বন্ধুরা যখন গাছের ডালে বাঁদরামি দেখতে ব্যস্ত ছিল তখন তার কানে এড়ায়নি খানিকটা দূরে হঠাৎ শুকনো পাতা মাড়িয়ে যাওয়ার সামান্য শব্দটুকু।
সেদিকে চোখ ফেরাতেই তার তীক্ষ্মদৃষ্টিতে ধরা পড়ল হলদের ওপর কালো ছোপওয়ালা গাত্রচর্ম। একটা নয়, একেবারে দু-দুটো চিতাবাঘ।
মুহূর্তের মধ্যে বন্দুক তাক করে গুলি চালাল প্যাট। পরপর দুটো গুলি। অভ্রান্ত লক্ষ্য। প্রথম গুলিতে পুরুষ চিতাবাঘ ওইখানেই পড়ল। গুলি তার বুকে গিয়ে লেগেছে। সে আর উঠল না। স্ত্রী বাঘটাও আহত হয়েছিল দু-নম্বর গুলিতে। কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে ধরাশায়ী হয়নি। সে ছুটে এল ইংলিসদের দিকে।
প্যাট-এর গুলির আওয়াজ ততক্ষণে সবাইকে সতর্ক করে দিয়েছে, তাই নিশ্চিত লক্ষ্যে গুলি চালিয়ে আহত জন্তুটাকে শিকার করতে ভুল হয়নি জেমস ইংলিসের। একটার খোঁজে এসে দু-দুটো লেপার্ড। সাহেবরা খুব খুশি। এ ছাড়াও জেমস আরও খুশি এই কারণে যে বাঘদুটোর একটা যে তার সাধের হরিণটাকে মেরেছিল সে ব্যাপারে তিনি নিশ্চিত।
এদিকে পরপর গুলির আওয়াজ শুনে জঙ্গল-তাড়ুয়াদের দল এসে জমা হয়েছে মেহরমান সিং-এর নেতৃত্বে। তাদের মধ্যে অনেকেই কাছাকাছি গ্রামে থাকে। এই লেপার্ড দুটো তাদের ছাগল আর বাছুর টেনে নিয়ে গেছে বহুবার। বাঘ দুটোর মরা দেহের ওপরই লাঠিপেটা করে যেন রাগ মেটাল তারা। সঙ্গে জয়ের উল্লাস, সব মিলিয়ে এক উৎসব।
নীলবিদ্রোহের দিন সবে কয়েক বছর হল, স্কটল্যান্ডের এক সাহেব এসে নীলকরের ব্যবসা ফেঁদে বসলেন বিহারে কুশী নদীর পাড়ে—পরে তার কাজকর্ম বিস্তৃত হয় অযোধ্যা আর নেপালের সীমান্ত অঞ্চলে। সাহেবের নাম জেমস ইংলিস।
তার বিরল বিবরণ ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ নথি বটে, কিন্তু এই নথির প্রতি পাতায় যে রোমাঞ্চ আর অ্যাডভেঞ্চার সাজানো আছে সেটি বিরলতম।

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন