কামারের এক ঘা

নির্বেদ রায়

প্রবাদটা বাংলায় চালু, কিন্তু জেমস জানতেন না। 'স্যাকরার ঠুক ঠাক' তিনি কতটা দেখেছেন বলতে পারব না, তবে 'কামারের এক ঘা' তাঁর অভিজ্ঞতায় বড় জায়গা দখল করে ছিল।

আমরা জানি যে সময়টা নীলবিদ্রোহের কাছাকাছি সময়, আর জেমস ইংলিস ছিলেন এক নীলকর সাহেব। নীলচাষিদের উপর অত্যাচার আর শোষণের গল্প আমরা শুনেছি, জেনেছি; কারণটাও নেহাত অজানা নয়—নীলের ব্যবসায় যে অবিশ্বাস্য লাভ ঘরে উঠেছে, তার 'লোভ' সাহেবদের এই কষ্টসাধ্য চাষের ক্ষেত্রে নিয়ে আসত। আর অত্যাচারের কারণও অবশ্যই অর্থ—প্রচুর, অপর্যাপ্ত পয়সা।

জেমস ইংলিস তার বইতে শুধু পূর্ণিয়া, ভাগলপুর কি নেপাল সীমান্তের বণ্যজীবনের কথা লেখেননি, লিখেছেন সেদিনের গ্রাম-ভারতের এক বিস্তারিত ছবি; পূর্বভারতের গ্রাম—সেখানে শালের বন, বনদেবী, গ্রামের অন্ধ কুসংস্কার, ডাইনিপ্রথা, জাত-পাতের লড়াই—এ সব কিছুই এসেছে তাঁর লেখায়, শুধু বাদ পড়েছে নীলকর সাহেবদের অত্যাচারের গল্প।

কিন্তু যে বর্ণনা তার লেখাতে পাওয়া যায়, তা এক কথায় অসাধারণ। এখন সেখানেই চোখ রাখি—

'সেদিন বাঘের খোঁজ আর পাওয়া গেল না, ফলে শামিয়ানার নীচে বসে আলোচনা শুরু হল ভাল্লুক নিয়ে। ভাল্লুক নিয়ে আলোচনার কারণ আছে—আমাদের বন্ধু 'প্যাট' একটা ভাল্লুকের চামড়ার খোঁজ করছিল, তার কোনও বন্ধুকে পাঠাবে বলে। সেখান থেকেই ভাল্লুকের কথা আলোচনায় এসে পড়ল।

'এত নীচু জায়গায়, সমতলে তুমি ভাল্লুক পাবে না, ভাল্লুক আরও উঁচুতে থাকা পছন্দ করে।' জো বলল।

'না, ঠিক বলছ না; এখানে অনেক ভাল্লুক আছে।' আমার উত্তর।

'না, না, ওরা উঁচু পাহাড়ি অঞ্চলে থাকে, এইরকম ঘাসের জঙ্গলে খুব বরাতজোর থাকলে দেখা যায়।' জো-র কথায় যেন একটু অভিজ্ঞতার ছাপ আছে বলে এবার মনে হল।

'গুলি করা কঠিন?' কেউ প্রশ্ন করল।

'খুব কঠিন নয়।' জো-র উত্তর এল।

'কিন্তু মুখোমুখি পড়ে গেলে খুব বিপজ্জনক।' আমার মন্তব্য শেষ হওয়ার সঙ্গে-সঙ্গে জো প্রশ্ন করল, 'কী করে বলছ? কোনও ভাল্লুকের মুখোমুখি হয়েছ নাকি, কখনও?'

'না, যে গল্প বলছি তার মূল চরিত্র আমি নই। ভাল্লুক আমি মেরেছি, গুলি করেই মেরেছি; আরও অনেককে মারতেও দেখেছি; কিন্তু আজ যে ঘটনার কথা বলছি, সারাজীবনে তার থেকে ভয়ংকর ঘটনার সাক্ষী থাকতে হয়নি, একথা জোর দিয়ে বলতে পারি।' আমি বললাম।

একটু চুপচাপ, সবাই। তারপর যে যার নিজের জায়গা নিয়ে বসে পড়ল। পানীয় আর পাইপের ধোঁয়ায় আস্তে আস্তে জায়গাটা আচ্ছন্ন হতে শুরু করল। সবাই গল্পটা শুনতে আগ্রহী।

'বিলি প্যারোটকে মনে আছে তোমার!' প্যাটকে বললাম।

'কেন মনে থাকবে না? বিলিকে একবার দেখলে ভোলা খুবই কঠিন, তোমার কি মনে হয়!'

'কামারের কাজ করত, রামপুরে মেশিনপত্র দেখভাল করতে এসেছিল।'

'ঠিক বলেছ। তবে বিলি পেশাটা কামারের হলেও ওর প্রথম পেশা ছিল নাবিকের। প্রায় অর্ধেক পৃথিবী ঘোরা হয়ে গিয়েছিল ওর, তারপর কলকাতায় এসে টাঁকশালে কাজ পায়; মাত্র ৪০ কি ৫০ টাকা মাস মাইনেয়। তারপর যখন ইংরেজ রাজপুরুষদের নজরে আসে, আর তারা বিলি-র কাজ দেখে খুশি হয় তখন তিরহূতে তাকে নিয়ে আসে, মাইনে বেড়ে হয় দেড়শো টাকা। প্রায় চারগুণ বেড়ে যায় মাইনে—

'বিলি ছোটখাটো চেহারার মানুষ। তবে উচ্চতায় ছোট হলেও সে বহরে সেটা পুষিয়ে নিয়েছিল পুরোমাত্রায়। বিলি অসাধারণ কুস্তিগীর, ষাঁড়ের মতো শক্তি আছে মানুষটার গায়ে—চমৎকার মেজাজ, তবে মহিলাদের সামনে খুব অপ্রস্তুত মনে বিলিকে। শুধু একটাই তার দুর্বলতা, সেটা 'সুরা', বিলি মদ খেতে খুবই ভালোবাসে। আর একটা ভালোবাসার জিনিস আছে বিলির, সেটা গান। স্কটিশ সুর—'টোয়েনকে ডিডল ও, টোয়েনকে ডিডল ও...'

এই হল বিলি প্যারোট।

স্থানীয় ধনী মানুষদের একটা প্রিয় খেলা ছিল। খেলা একটাই, শুধু কখনো মোরগ, কখনও ভেড়া—এভাবে পাল্টাত। মোরগের লড়াই আর ভেড়ার লড়াই। মোরগের অস্ত্র তাদের পায়ে বাঁধা ছোট ছুরি, আর ভেড়া লড়াই করত শিং বাগিয়ে। ভেড়া আর মোরগ আগে থেকে প্রশিক্ষিত, তাদের মালিকরা ভালো করে শিখিয়ে-পড়িয়ে তৈরি করে রাখত। এই লড়াই ভারতীয় গ্রাম-শহরের বিভিন্ন জায়গায় বড় মনোরঞ্জনের বিষয়। ভিড় করে লোক দেখতে আসে।

বিলির একটা প্রশিক্ষিত ভেড়া ছিল। আমি দেখেছি সে মাটিতে বসে তার হাতের পেশি শক্ত করে ভেড়াটাকে ইঙ্গিত করত, আর ভেড়াটা ছুটে এসে পেশিতে ঢুঁ মারত। সে এক অসম্ভব অনুশীলনের পর্ব।

'টোয়েনকে ডিডল ও, টোয়েনকে ডিডল ও...' প্যাট হঠাৎ তার হেঁড়ে গলায় গান ধরল; শামিয়ানায় বসে থাকা সমস্ত লোকজন তার সঙ্গে গলা মেলাল।

শোরগোল থামলে আবার সবাই যে যার জায়গায় বসে পড়ল গল্প শুনতে। আমি ভাবলাম গল্প বলার আগে পাঠকদের জন্য, ভারতের বনাঞ্চলে যে 'ব্ল্যাক শ্লথ' ভাল্লুক ঘুরে বেড়ায়, তার সম্পর্কে দু-এক কথা বলে বিলি আর ভাল্লুকের ঘটনায় ঢুকব।

ইংরিজিতে যাকে 'কমন ব্ল্যাক শ্লথ বেয়ার' বলে, যারা লম্বায় ছয় থেকে সাত ফুট, দু'থেকে তিন ফুট উঁচু, ওজন একশো থেকে দেড়শো কিলোগ্রামের কাছাকাছি হয়। ভাল্লুকটার বিশেষ গুণ হল, বাচ্চাকে পিঠের উপর বয়ে নিয়ে চলা। আর পিপঁড়ে কি উইয়ের ঢিবি খুঁজে বের করে ওগুলো খেয়ে পেট ভরানো। নখের জোর এতটা যে সিমেন্টের মতো শক্ত উইঢিবি ভেঙে ফেলে অনায়াসে। জন্তুটা বিপজ্জনক তাতে কোনও সন্দেহ নেই। উই বা পিঁপড়ে ছাড়া গাছের মূল, মধু আর অন্যান্য পোকামাকড়েও তার কোনও আপত্তি নেই। বিপজ্জনক বলতে তখনই, যখন মানুষকে আক্রমণ করে বসে, আর কোনও কারণ ছাড়া। সাধারণত মানুষকে এড়িয়ে চলে, দিনের বেলা গুহাকন্দরে কাটায়। কদাচিৎ দিনের বেলায় জঙ্গলে দেখা মেলে। স্থানীয় মানুষ নাম দিয়েছে 'মানব সন্তান', স্থানীয় ভাষায় 'আদম জাদ'।

সারা ভারতেই এরা ঘোরাঘুরি করে, তবে পশ্চিম ভারতে প্রচুর সংখ্যায় দেখা পাওয়া যায়। ফর্সাইথ তাঁর 'দি হাইল্যান্ডস অফ সেন্ট্রাল ইন্ডিয়া' বইটিতে এই জন্তুর বিস্তারিত বর্ণনা দিয়েছেন।

আমি গুলি করে 'শ্লথ বেয়ার' মেরেছি উত্তর ভাগলপুরে, নেপাল সীমান্তে। আর মেরেছি অযোধ্যার সীমান্ত অঞ্চলের জঙ্গলে। কিন্তু আজ যে ঘটনার কথা বলছি সেটা হয়েছে বাঁকুড়ায়, রাজমহল পাহাড়ের কাছে। বাংলায় এই অঞ্চলে বন্যপ্রাণীর সংখ্যা প্রচুর।

আমাদের প্রাক্তন—পুলিশ সুপারিনটেন্ডেন্ট শিকারের জন্য আমন্ত্রণ জানালেন বাঁকুড়া থেকে। ভাল্লুক শিকারের নিমন্ত্রণ, আমিও লোভ সামলাতে না পেরে রওনা হলাম বাঁকুড়া, হাতে কাজ কিছু কম ছিল।

সাহেবগঞ্জে পৌঁছে বিলির সঙ্গে দেখা, ডাকবাংলোর লোকজনের সঙ্গে গোলমাল বাঁধিয়েছে। কারণ, মদ! চালান নেই, অথচ চাহিদা আছে—বিলি মদ ছাড়া থাকতে পারে না। এটা না জানলে অসুবিধা, আর আমি জানি ওটুকুর ব্যবস্থা করে দিলে বিলির চেয়ে কর্মক্ষম মানুষ পাওয়া মুশকিল, শিকারযাত্রায় এইরকম লোক দরকার। আমি বিলিকে আমার সঙ্গে নিয়ে নিলাম। যথাসময়ে বাঁকুড়ায় এসে পৌঁছলাম।

আমাদের শিকার-পার্টিতে আমি আর বিলি ছাড়া ছিল জেলা-জজ, একজন অথবা দুজন কলকাতার ব্যারিস্টার, আমার বন্ধু পিলার।

শিকারে যেদিন বেরোলাম, বিলিকে একটা বন্দুক ধার দিলাম। আমি সবসময় বাড়তি অস্ত্র রাখি। শিকার-দলের সঙ্গে একজন ডাক্তারও ছিলেন, 'বিশেষ কারণে' বিলি তার ভক্ত হয়ে উঠল।

বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা হয়ে এল শুশুনিয়ায় পৌঁছতে। তখন ঠান্ডা লাগছে, সমস্ত বনভূমি জুড়ে পাহাড়ি গুহা, এবড়ো-খেবড়ো পাথরের বিস্তার, মাঝখান দিয়ে চলে গেছে শুকনো নালা। আর মার্বেল পাথরের খনি তার মধ্যে দেখা যাচ্ছে। জায়গাটা শিকারের জন্য খুবই উপযুক্ত, আর শিকারি বা পর্যটকের পক্ষে অসাধারণ।

রাত আটটা নাগাদ খাবার জন্য ডাক এল। সব কিছু বাদ দিলেও ভারতে ইংরেজদের যে আদর যত্ন করা হয় সেটার কথা বলতেই হবে। দুদিন আগে যে জায়গাটা পোড়ো বাড়ি আর কামারশালা ছিল, সেটা আমাদের জন্য সাজিয়ে তোলা হয়েছে। মেঝেতে সাদা মার্বেল পাথর কাছের খনি থেকে আনা হয়েছে। মাকড়শার জাল উধাও, রাজমিস্ত্রির হাত পড়েছে দেওয়ালগুলোয়। ঝকঝকে সাদা চুনকাম হয়েছে বাংলো জুড়ে, পর্দা টাঙানো হয়েছে দরজা-জানালায়।

ভোর সাড়ে তিনটে—

সারা রাত ধরে খাওয়া-দাওয়া চলেছে, যখন সবাই শুতে গেছে তখন রাত গভীর হয়েছে, অন্তত শুশুনিয়াতে নিশুতি রাত। কলকাতা শহরের কথা ভাবলে হবে না।

আস্তে আস্তে কেউ ডাকছে, 'সাহেব ওঠো, সাড়ে তিনটে বেজে গেছে।'

কোনও সাড়াশব্দ নেই। গভীর ঘুমে সবাই। আবার ডাক এল, 'সাহেব ওঠো, ওঠো।'

কোনও আওয়াজ না পেয়ে তিনবারের বার সাহেবের পায়ের বুড়ো আঙুলে মোচড় পড়ল, 'তাড়াতাড়ি ওঠো সাহেব।'

এবার সাহেবের মুখ থেকে গালি বেরোল, 'জাহান্নমে যাও বদমাশ।' ততক্ষণে লোকটা বাইরে চলে গেছে। কিন্তু কাজের কাজ করে গেছে। সবাই উঠে পড়েছে ওই গালাগালি শুনে, গলার জোর আছে...

চার মাইল দূরে যেতে হবে আমাদের, হাতির উপর চেপে অস্ত্রশস্ত্র আর দলবল নিয়ে এগোলাম গন্তব্যপথের দিকে।

আমরা রওনা হওয়ার আগে দুজন কুলি একটা কাঠের লম্বা বাক্স বয়ে নিয়ে গেল। বাক্সটা 'বেশ সন্দেজনক'। প্রশ্ন করতে উত্তর এল, 'বাজি! ওটা আতশবাজির বাক্স। শিকারের সময়ে দরকার হতে পারে।' সঙ্গে মুখ টিপে হাসি।

বুঝলাম, ওটা কীরকম আতশবাজি! এটা বিলির আর ডাক্তারের বিষয়, মনোযোগী বিষয়! সারাদিন সূর্যের প্রখর রৌদ্রে ক্লান্ত হওয়ার পর আমাদেরও এই 'বাজির বাক্স' দরকার হতে পারে।

জঙ্গলে পৌঁছে দেখলাম পুলিশের লোকজন আগে থেকে সমস্ত ব্যবস্থা করে রেখে দিয়েছে। একটা গভীর খাদের পাশে আমাদের জন্য মাচান তৈরি করা হয়েছে, প্রতিটা মাচান প্রায় পঞ্চাশ ফুট দূরত্বে গাছের উপর বাঁধা হয়েছে। একটা মাচান থেকে অন্যটার দূরত্ব পঞ্চাশ ফুট।

আমি অতিথি। নিমন্ত্রণ পেয়ে এসেছি। আর শিকারে দীর্ঘ অভিজ্ঞতা আছে—এইসব ভেবেচিন্তে আমাকে একদম ডান দিকের মাচান দেওয়া হয়েছে। মাচানের নীচ দিয়ে একটু পাশে হরিণ চলার পথ দেখলাম, মন্দ নয়। বিলি পেয়েছে একদম বাঁদিকের মাচান, আর পুলিশের বড়কর্তা বসেছেন ঠিক আমার পাশের মাচানে।

অন্য অনভিজ্ঞ মানুষরা একটু অস্বস্তিতে পড়েছে বটে, তবে শেষ পর্যন্ত উঠে পড়েছে গাছের উপর।

'বিট' শুরু হয়ে গেছে। চিৎকার করতে করতে আসছে বিটারের দল। আমি গাছ থেকে একটু নেমে চারদিকটা দেখছিলাম, শুধু রিভলভার কোমরে লাগানো ছিল, রাইফেল গাছের উপরে, বিট শুরু হতেই গাছে উঠে বসলাম।

খানিকক্ষণ পরে সামনের ঝোপে একটা নড়াচড়া দেখলাম। আমার গাছ থেকে ভালো দেখা যায় না, পাশের মাচান থেকে গুলির আওয়াজ পেলাম। একটা হরিণ—রেভিন ডিয়ার। আসলে খাদে-খন্দরে বাস করে এই এন্টিলোপ। হরিণটা ছোট আর গুলি লেগেছে তার ডান পায়ে, তবু যা হোক আমার বন্ধু 'পিলার' আর একটা গুলিতে সেটাকে মারল। আসলে জেলা-জজ আর ব্যারিস্টার ভদ্রজনের শিকারের অভিজ্ঞতা নেই, তাই যে-কোনও বন্যজন্তু পেলেই গুলি করো, এই ভাবেই দলকে বলা হয়েছিল। তারাও সেভাবে চলছে—এরমধ্যে আমি আমার 'ধার নেওয়া' বন্দুকের কয়েকটা আওয়াজ পেয়েছি, অর্থাৎ বিলিও গুলি চালাচ্ছে! কিন্তু সে পর্বে কিছু হল না, মানে এত চেঁচামেচিতেও ভাল্লুকের 'ঘুম ভাঙছে' বলে মনে হল না। বিটাররাও ফিরে এসেছে, সাঁওতাল ছেলেরাও সঙ্গে আছে। ওদের মাদল কাল রাতে শুনেছি, ভালো লেগেছে।

এর মাঝে একটা বড় হরিণ মেরেছি। 'পিলার' প্রথমে গুলি করেছে বটে, কিন্তু আমার গুলিতেই মরেছে।

বিটাররা থেমে যেতে চারদিকে যেন এক অদ্ভুত নিস্তব্ধতা নেমে এসেছে। এবার ওরা পশ্চিমদিকে জঙ্গল 'বিট' করতে যাবে।

হঠাৎ সামনে একটা বড় ঝোপ নড়ে উঠল। আমি আর এক বন্ধু মিলে হালকা দু-একটা কথা বলছিলাম। দুজনে ঝটিতি হাতে বন্দুক তুলে নিলাম। ঝোপের দিকে লক্ষ্য স্থির করেছি, এমন সময় ঝোপ সরিয়ে এগিয়ে এল বিলি।

'আমি শুকিয়ে চূনের ভাঁটি হয়ে গেছি, এক চুমুক দেখি...'

বিলিকে বললাম, 'এখন? যে-কোনও সময় এখন ভাল্লুক বেরোতে পারে, সাংঘাতিক ঝুঁকি...তুমি একটু পরে নিও।'

'দুত্তোর ভাল্লুক!' বিলি আমার কথায় বেশ বিরক্ত 'আমার অবস্থা এখন শুকনো দেশলাই কাঠি, আর আমাকে ভাল্লুক দেখাচ্ছে। দাও এক চুমুক...তাড়াতাড়ি করো।'

বিলির ভাবেভঙ্গিতে একটা বেপরোয়া মানুষ খুঁজে পেলাম, যে জন্য আমি নিজেও গাছ থেকে নেমে পড়লাম। একেবারে খালি হাতে। যেটা শিকারে গেলে একেবারেই উচিত নয়। কিন্তু সেই অনুচিত কাজটা করে আমি আমার বন্ধুর দিকে হাত বাড়ালাম—এক পাত্র হলে তো মন্দ হয় না! বিলি প্যারোট ততক্ষণে চারটে বড় বড় চুমুক দিয়ে বোতলটা ফিরিয়ে দিয়েছে।

একটা তীক্ষ্ন শিষের আওয়াজ। সবাই চমকে উঠেছি; জঙ্গলের অভিজ্ঞতায় জানি ও শিষ কে দিয়েছে, কোথা থেকে আসছে!

জজ-সাহেবের চিৎকার শোনা গেল, 'সাবধান, এই ছেলেরা; ভাল্লুক বেরিয়েছে...'

বিলি বুঝেছে যে জন্তুটা ওর কাছে কোনও ঝোপ-জঙ্গলে লুকিয়ে ছিল, এবার বেরোচ্ছে।

'না, লুকোবার কোনও ব্যাপার নেই। এটা সরাসরি আক্রমণ...আমি একথা বুঝে দৌড়েছি আমার মাচানের দিকে। বিলিও পালাতে চাইছিল, কিন্তু মাত্র পাঁচ সেকেন্ডের মধ্যে ভাল্লুক একেবারে সামনাসামনি চলে এল। বড় ভাল্লুক; তার পিঠে গোল কালো বলের মতো বাচ্চা ভাল্লুক ঝুলছে। বিলি তার সামনে যে মাচান থেকে বোতলটা নিয়েছিল, সেদিকে দৌড়োল। কিন্তু নীচু হয়েও আমাদের বন্ধুটার হাত বিলি পর্যন্ত পৌঁছল না।

আমি একটা ভুল করলাম। ভাল্লুক আক্রমণ করেছে ভেবে অভ্যাসমতো রিভলভার থেকে গুলি ছুঁড়লাম। গুলিটা গিয়ে লাগল ভাল্লুকের চোয়ালে; চোয়ালের নীচের অংশ ভেঙে গেল বটে, কিন্ত তৎক্ষণাৎ ভাল্লুক বিলিকে আক্রমণ করল। মনে হল, গুলি না চালালে হয়তো আক্রমণ এড়ানো যেত।

বিলি গাছে উঠতে না পেরে অন্যদিকে দৌড়তে গেল। তখন ভাল্লুকের নিশ্বাস তার গায়ের উপর পড়ছে। কিন্তু দৌড়োনো আর হল না, একটা মোটা লতায় পা আটকে সে হোঁচট খেয়ে পড়ল, আর ভাল্লুক তার উপর ঝাঁপ দিল।

আমি আর আমার বন্ধু, ধরা যাক তার নাম 'সি', কারণ কিছু সরকারি কারণে তার নাম গোপন করতে হচেছ—দুজনেই তখন বন্দুক হাতে নিয়ে নিয়েছি, কিন্তু গুলি চালানো অসম্ভব। যদিও ভাল্লুকের দাঁত খুব সাংঘাতিক বস্তু, আর আমাদের স্বস্তি বলতে এইটুকু যে সেই দাঁত সে ব্যবহার করতে পারছে না, গুলিতে নীচের চোয়াল ভেঙে গেছে বলে—কিন্তু তার নখ! সে নখ দিয়ে সে পাথরের মতো শক্ত ঢিবি ভেঙে ফেলে, সেই নখ মানুষের শরীরে কি করতে পারে, সেটা অনুমান করতে পণ্ডিত হতে হয় না, যতই বিলি প্যারোটের পেটানো চেহারা হোক!

গুলি করা দূরের কথা, হাতুড়ি বা ছোরা দিয়েও কিছু করার নেই। ভাল্লুক আর বিলি দুজনেই দুজনকে জড়িয়ে ধরেছে আর পাক খেয়ে খেয়ে ঘুরছে, একদণ্ড স্থির থাকছে না কোথাও।

আমরা অসহায়ের মতো দাঁড়িয়ে আছি, ভাবছি যদি সুযোগ পাই। তারমধ্যে এল বড় বিপদ! বিলি আর ভাল্লুক গড়াতে গড়াতে এগিয়ে যাচ্ছে খাদের কিনারায়। বাচ্চা ভাল্লুকটার দেখা নেই, সে মায়ের পিঠ থেকে কখন নেমে পড়েছে কেউ খেয়াল করেনি, কিন্তু বিলি আর ভাল্লুক যদি একবার খাদ থেকে নীচে পড়ে, তাহলে দুজনেরই নির্ঘাত মৃত্যু। অন্তত বিলির তো বটেই। তাই সবাই মিলে চিৎকার করছি তারস্বরে। জানি চিৎকার করে কিছু হবে না, কিন্তু অসহায় মানুষের চিৎকারই সম্বল।

ভাল্লুক বিলিকে ছাড়ছে না, আর বিলি তার জানা যত কুস্তির প্যাঁচ আছে সবক'টা একের পর এক প্রয়োগ করে যাচ্ছে শত্রুর উপর। পা-দুটো দিয়ে এমনভাবে ভাল্লুকের কোমর জড়িয়ে ধরেছে যে পায়ের নখগুলো, বিশেষ করে পিছনের পায়ের নখ সে ব্যবহার করতে পারছে না। কিন্তু দুটো শরীর, মানুষ আর জন্তুর, গড়িয়ে চলেছে খাদের দিকে।

শেষ পর্যন্ত যা হওয়ার ছিল, তাই হল। খাদের ধার থেকে দুটো দেহ গড়িয়ে নীচে অদৃশ্য হল। আমরা সবাই স্তব্ধ, স্তম্ভিত, চুপ!

গভীর পাহাড়ি খাদ; অত গভীর খাদে পড়লে বিলির কি হতে পারে সেটা সবাই জানি। একটু পরে নীরবতা ভেঙে আমার বন্ধু 'সি' বলল, 'চলো, ওর কি হল দেখে আসি।'

কি হয়েছে বিলির, সবাই জানি, কিন্তু যেতে তো হবে। চুপচাপ দু-চারজন, একটু ঘুরে গিয়ে খাদের নীচে নামার পথ ধরলাম। হরিণ যাতায়াতের পথটাই ধরলাম।

রাস্তাটা খুব খারাপ, আসলে রাস্তা বলে কিছু নেই। শুধু বন-জঙ্গল আর পাথরের চাঁই।

'সি' সামনে পথ দেখিয়ে এগোচ্ছিল। একটা বড় পাথরের চাঁই টপকাবার জন্য চেষ্টা চালাচ্ছিল। পাথরটার চারদিকে ঘন জঙ্গল আর পাথরের দেয়াল দিয়ে ঘেরা।

খুব সম্ভব বিলি আর ভাল্লুক এখানেই পড়েছে। উপরের দিকে তাকিয়ে দেখলাম। না, অত উঁচু থেকে এই পাথরের রাজ্যে পড়লে বাঁচা সম্ভব নয়, কিন্তু বিলির শরীরের অংশ তো এখানেই পাওয়া যাবে; যদিও পাথর টপকাতে সময় লাগছে। আমি পিছন থেকে 'সি'-কে সাহায্য করছি, সে-ও প্রাণপণে ঘাসের গোছা, যেগুলো পাথরের ফাঁক দিয়ে বেরিয়েছে, সেগুলো মুঠো করে ধরে ওঠার চেষ্টা করছে...

এমন সময় স্তব্ধতা ভেঙে একটা ক্ষীণ আওয়াজ আমাদের কানে ভেসে এল—

'সি' পড়ে যেতে যেতে বেঁচে গেল, মুঠো করে শক্ত ঘাসের গোছা ধরা ছিল বলে—আর আমি দাঁড়িয়ে রইলাম বোকার মতো। কী শুনলাম!

হ্যাঁ, এই তো আবার শুনছি—'টোয়ানকে ডিডল ও, টোয়ানকে ডিডল ও! টোয়ানকে ডিডল ইডল ইডল ও...'

পৃথিবীতে এ গলা একজনের—বিলি প্যারোট!

স্থানীয় আদিবাসিদের সাহায্যে বিলিকে নিয়ে উঠলাম উপরে, তারপর তাকে বাংলোতে নিয়ে যাওয়া হল। বিলির উরুতে বড় আঘাত লেগেছে, আর লেগেছে কাঁধে। সঙ্গে ডাক্তার ছিল বলে সুবিধা, ক্ষতস্থান পরিষ্কার করে ওষুধ দিয়ে ব্যান্ডেজ বেঁধে দিলেন তিনি।

ভাল্লুকের দেহ পরীক্ষা করে দেখা গেল দেশলাই কাঠির মতো তার পাঁজরের সবক'টা হাড় ভেঙে গেছে। বিলির কপাল ভালো, ভাল্লুক উপর থেকে আগে মাটিতে পড়েছে। বিলি পাথরে এতটুকু চোট পায়নি।

কিন্তু বাচ্চা ভাল্লুকটা! তার কী হল? খবর নিয়ে জানলাম যে শোনপুরের মেলায় তাকে কেউ কিনে নিয়ে গেছে। সে এখন খেলা দেখায়, নাচে, মানুষকে আনন্দ দেয়।

যখন প্রিন্স অফ ওয়েলস ভারতে আসেন তখন আমি খুব অসুস্থ। কলকাতায় ক্যাথিড্রাল-এর কাছে হাসপাতালে (মনে হয় প্রেসিডেন্সি জেনারেল হাসপাতাল বা পি.জি. হাসপাতাল, সেন্ট পলস ক্যাথিড্রেলের কাছে) ভর্তি। প্রতি মুহূর্তে নার্সের প্রয়োজন। আমার ওঠার ক্ষমতা ছিল না, কিন্তু আমার পাশের ঘরে যে মানুষটি থাকত, সে বেশ চলাফেরা করতে পারত। মাঝেমধ্যে আমার ঘরেও আসত। কিন্তু তার মুখ আর মাথা ব্যান্ডেজে ঢাকা থাকত।

শালীনতা রাখতে কোনওদিন জিজ্ঞাসা করিনি, কি হয়েছে তার? কিন্তু কয়েকদিন পরে সে নিজেই আমাকে বলল তার কাহিনি—

সে পেশায় একজন সার্ভেয়ার। অর্থাৎ একটি অঞ্চলের উঁচু-নীচু, পরিমাপ করে বেড়ায়। পরিমাপক বলা হয়, এরা ইঞ্জিনিয়র। এই লোকটি তখন নর্মদা ভ্যালিতে সার্ভের কাজে ব্যস্ত। ইন্ডিয়ান সার্ভে ডিপার্টমেন্ট তাকে পাঠিয়েছে এই নদী বিধৌত উপত্যকা মাপ করার জন্য। জরিপের যন্ত্র 'থিওডোলাইটে' চোখ লাগিয়ে তিনি একদিন কাজ করছেন, এমন সময় একটা বড় ভাল্লুক এসে তার দৃষ্টিপথ আড়াল করে দাঁড়াল। সার্ভে করার আগে সেই অঞ্চল কেটেকুটে ঝোপঝাড় পরিষ্কার করে নেওয়া রীতি। সেইভাবে পরিষ্কার করার পর সার্ভে করা হচ্ছিল; ভাল্লুক একেবারে শান্তভাবে সেই খোলা রাস্তায় এসে দাঁড়িয়েছে।

সার্ভেয়ার শিকারি নয়, ভাল্লুক দেখে ভয় পেয়ে সে সঙ্গে রাখা বন্দুক থেকে গুলি ছুঁড়ল। আর ভাল্লুক সঙ্গে সঙ্গে মাটিতে পড়ে গেল।

সার্ভেয়ার ছেলেটির আনন্দ হওয়ারই কথা, তার এক গুলিতেই অত বড় ভুল্লুকটা মারা গেছে। সেই আনন্দের চোটে, সে বড় ভুলটা করে ফেলল। দৌড়ে গেল তার জীবনে শিকারের প্রথম প্রাইজ দেখতে। 'মরা' ভাল্লুক দাঁড়িয়ে উঠল, তারপর ছেলেটির মুখে মারল এক সাংঘাতিক থাপ্পড়। সনখ থাবার একটি মাত্র আঘাতে লোকটির ডান গাল, নীচের আঁখিপল্লব, অর্ধেক ঠোঁট আর নাকের অংশ সম্পূর্ণ উড়ে গেল।

সঙ্গের লোকজন তাকে জব্বলপুর নিয়ে যায়। ডাক্তার সেখানে প্রাথমিক শুশ্রূষা সেরে, বম্বে নিয়ে যেতে বলেন তাকে। ছেলেটি বম্বে যায়, কিন্তু বম্বে কিছু করতে পারেনি। কলকাতায় এসে সে অপারেশন করায়। স্যার জোসেফ ফে তার অপারেশন করেন। সেইসময়ের এক বিখ্যাত অপারেশন বলা হয় এটিকে। তার শরীরে বিভিন্ন অংশ থেকে চামড়া নিয়ে মুখ 'গড়ে' তোলা হয়।

খুবই আনন্দের কথা সে সার্ভেয়ারটি এখন সাংসারিক জীবনযাপন করছে। যার সঙ্গে তার বিয়ের কথা ছিল, সেই মেয়েটিকেই বিয়ে করে তারা খুব খুশি। আনন্দেই সংসার করছে।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%