নির্বেদ রায়
'ভারতের মাটিতে সেরা শিকার—বুনো শুয়োর!'
জেমস ইংলিস সারাজীবনে ভারতের উত্তর-পূর্ব অঞ্চল জুড়ে বহু শিকার করেছেন। কখনও শখে, কখনও একান্ত প্রয়োজনে। নীলকরের কাজ করতে করতে বিহার আর নেপালের সীমান্তে ঘোরাঘুরি করতে হয়েছে তাকে। শহরে নয়, অনেক সময় অজ পাড়াগাঁয়ে; কখনো গ্রামের থেকেও দূরে প্রত্যন্ত জঙ্গলে। কখনো নীলের চাষ করার জমি খুঁজতে, প্রয়োজনে বন কেটে চাষের ব্যবস্থা করতে—'বন কেটে আবাদ করা' বোধহয় একেই বলে।
লন্ডনের সম্ভ্রান্ত পরিবেশ ছেড়ে, এমনকী কলকাতার প্রাসাদনগরীর আহ্বানকে প্রত্যাখ্যান করে এই জীবন আর পেশা গ্রহণ করার জন্য শুধু পয়সার আকর্ষণ থাকলে হয় না, জীবনকে অ্যাডভেঞ্চার-প্রিয় করে তুলতে হয়, বা এই রোমাঞ্চের স্বাদ-গন্ধ নিয়ে বাঁচতে জানতে হয়। ইংলিস সেটা জানতেন।
এই জীবনের সঙ্গে মিলে থাকে শিকারের রোমাঞ্চ আর তীব্র আনন্দ। 'শখের শিকার' বলছি বটে, কিন্তু ভারতের বনে যে জীবজন্তু বসবাস করে, এক মুহূর্তের দেরি আমরা ভুলের জন্য তার প্রায়শ্চিত্ত করার সুযোগ পাওয়া কঠিন, জীবন দিয়েই সে ভুল কেবল শোধরানো সম্ভব; নয়তো নেহাত কপালের জোর!
আর 'নরখাদকের' আক্রমণ শুরু হলে গ্রামের পর গ্রাম খালি হতে শুরু করে, লোকে প্রাণ বাঁচাতে গ্রাম ছেড়ে পালিয়ে যায়। নীলচাষের মাঠে কাজ করার লোক জোটে না। সাহেবদের তখন ছুটতে হয় সেই 'নরখাদক' বাঘ বা চিতাবাঘ মারতে। ফলে আতঙ্ক আর ভয় যতই থাকুক, চাষ বাঁচাতে আর তার জন্য মানুষকে রক্ষা করতে বন্দুক হাতে বেরোতেই হয়। মানুষখেকো বাঘ বা লেপার্ডের অসম্ভব ধূর্ত-গতিবিধির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে শিকারিকেও চলতে হয়, নয়তো যে-কোনও সময়ে শিকারি নিজে শিকার হয়ে যেতে বাধ্য।
জেমস ইংলিস নরখাদক মেরেছেন। আমরা সে গল্প শুনেছি।
সেই মানুষ যদি বলে, 'ভারতের মাটিতে সেরা শিকার—বুনো শুয়োর।' তখন আমরা অবাক হই, জানতে ইচ্ছা করে কি কারণে এমন কথা বলা হল?
আলোচনায় যাওয়ার আগে এ দেশের বুনো শুয়োর সম্পর্কে দু-এক কথা জেনে নেওয়া ভালো।
ভারতে দু-ধরনের বুনো শুয়োর পাওয়া যায়। একটার রং কালো, অন্যটার ধূসর। কালো শূয়োরের মুখের গঠন, আরও ভালোভাবে দেখলে করোটির গঠন একটু ছোট আর উঁচু; ধূসর রঙের শুয়োরের করোটি চেপ্টা আর চওড়া গোছের। কালো-টা বিরাট আকৃতির হয়, ধূসর-টা তুলনায় ছোট, কিন্তু ধূসর-টা আক্রমণের ক্ষেত্রে বেশি ভয়ঙ্কর। ধূসর জন্তুগুলোর জন্মসময় গায়ে ডোরা ডোরা দাগ থাকে, পরে মিলিয়ে যায়। কালোগুলোর জন্ম থেকে বড় হয়ে ওঠা পর্যন্ত সব একইরকম রঙে হয়ে থাকে।
অনেকে প্রকাণ্ড দাঁতাল শুয়োরের কথা বলে থাকে—চল্লিশ ইঞ্চি উঁচু। কিন্তু আমি বা আমার বন্ধুবান্ধব কেউই আটত্রিশ ইঞ্চির বেশি উঁচু শুয়োর দেখিনি। যেসব বন্ধুদের মতামতের উপর নির্ভর করা যায়, তাদের কথা বলছি। যদিও তাদের মধ্যে একজন একটা সাড়ে ঊনচল্লিশ ইঞ্চির শুয়োর মেরেছিল। জন্তুটা বিশাল আর অসম্ভব লড়াই করার ক্ষমতা ছিল। তবে সন্তান ছিল না তার।
কিন্তু 'পিগ-স্টিকিং' কাকে বলে সেটা পাঠকদের একটু জানা দরকার। যারা জানে তাদের কথা বাদ দিলেও, অনেক পাঠক এ বিষয়টা জানেন না। তাদের জন্য একটু বলে নেওয়া দরকার।
শুয়োর শিকার করা আর পিগ-স্টিকিং দুটো আলাদা ব্যাপার, অনেকটা আলাদা। রোমাঞ্চ আর জীবনের ঝুঁকি শিকারির ক্ষেত্রে অনেকটাই বেশি পিগ-স্টিকিং-এ; দুরন্ত গতিতে ছুটে আসা সবচেয়ে একরোখা জন্তু এই শুয়োর, তাকে ঘোড়ায় চড়ে বর্শা দিয়ে বিদ্ধ করতে হয়। একটা আঘাতে শুয়োর মরে না, পালিয়েও যায় না—বারবার ফিরে আসে আক্রমণে। বর্শা ফস্কে গেলে তো বিপদ বটেই, বর্শার ফলা শরীরে নিয়েও শুয়োরের আক্রমণে তার শত্রুপক্ষ, ঘোড়া অথবা মানুষ মারাত্মক আহত হয়, মারাও যায়। বর্শার আঘাতে মৃত্যু না হওয়া পর্যন্ত শিকারি বা তার ঘোড়া স্বস্তি পায় না, বুনো শুয়োর বড় বিপজ্জনক জানোয়ার। সবচেয়ে বিপজ্জনক তার একজোড়া দাঁত, মুখের দুপাশে বেরিয়ে থাকে দু-ইঞ্চি থেকে তিন ইঞ্চির মতো।
ঘোড়া, হাতি বা মোষের পিঠে সওয়ার হয়ে শুয়োরকে বর্শাবিদ্ধ করার নাম পিগ স্টিকিং। অনেকে মাটিতে দাঁড়িয়ে এই শিকার করে।
কিন্তু শুয়োর শিকার করতে বন্দুক ব্যবহার করা হয়। জেমস নিজে অন্তত একবার কুশী নদীর পাড়ে মহারাজনগর গ্রামে কয়েকটা হাতি নিয়ে জায়গাটা বুনো জন্তুদের থেকে মুক্ত করতে যান। বুনো জন্তু বলতে প্রধানত বন্যবরাহ; এরা রাতে চাষের ফসল খেয়ে ফেলে, আর যতটা না খায় তার থেকে বেশি উপড়ে ফেলে নষ্ট করে। বড় একটা নীলের খেত প্রস্তুত করার জন্য জায়গাটাকে পরিষ্কার করা দরকার ছিল। একদিনে গুলি করে তেষট্টিটা বুনো শুয়োর মেরেছিলেন জেমস, সঙ্গে আরও দু-তিনজন শিকারি ছিল। নীল চাষ করার জমি তৈরি হল বটে, কিন্তু এটা নিছক বন্য জীবনকে মানুষের প্রয়োজনে হত্যা করা, এ কাজে রোমাঞ্চ নেই।
অবশ্য একেবারে কিছু নেই বললে ভুল বলা হবে, কারণ জেমস বলেছেন আহত বাঘের গর্জিত আক্রমণের সামনে শিক্ষিত হাতি দাঁড়িয়ে থাকে, কিন্তু বড় বন্যবরাহের আক্রমণের মুখে সেই হাতি লেজ গুটিয়ে পালায়। সুতরাং, তেষট্টিটা শুয়োর মারা সোজা কাজ ছিল না, বিশেষ করে প্রত্যেকটা যখন প্রাপ্তবয়স্ক!
এবার আসছি পিগ-স্টিকিং-এর কথায়।
'ভারতে পিগ-স্টিকিং-এর কায়দায় শুয়োর শিকার' ইংরেজদের কাছে সবচেয়ে জনপ্রিয় ছিল রানি ভিক্টোরিয়ার আমলে, আর পরে রাজা এডওয়ার্ডের শাসনকালে। কিন্তু এদেশের মানুষ ইংরেজ শাসনের দিনকাল দেখে শিকারে যাননি। জাঠ, গুজ্জর, রাজপুত ও শিখদের মধ্যে এই শিকার প্রিয় শিকার, আর মহারাজা-রাজাদের মধ্যে।
কিন্তু 'গোয়ালা'-রা যে ভাবে বুনো শুয়োর শিকার করে তা না দেখলে হবে না। জেমস বলেছেন, আমি চেষ্টা করেছি বর্ণনা দিতে, কিন্তু অসমসাহসী ওই মানুষদের কায়দাকানুন না বুঝলে, তাদের সাহসের পরিমাপ করা সম্ভব নয়। অন্তত আমার তাই মনে হয়েছে।
এই গোয়ালারা গ্রাম থেকে দূরে বনের মধ্যে একটা করে বড়সড়ো আস্তানা গাড়ে, সেখানে গরু-মোষ রাতের বেলা থাকে, গোয়ালারাও সঙ্গে থাকে। বৃষ্টির সময় সমস্ত নদী ফুলে ওঠে, বানের জল ভাসিয়ে নিয়ে যায় চারদিক। যখন জল নেমে যায়, সমস্ত নদীপাড় জুড়ে পলি পড়ে আর ঘাস-গুল্ম-লতা জন্মায় প্রচুর পরিমাণে। তখন গোয়ালার দল তাদের গরু-মোষ নিয়ে জঙ্গলে ফাঁকা জায়গা দেখে 'বাতান' তৈরি করে। গ্রাম থেকে দূরে। মাসের পর মাস গবাদি পশু ওই খাদ্য খেয়ে বেঁচে থাকে। প্রচুর খাবার। তার সঙ্গে গোয়ালারা দু-বেলা দুধ দুয়ে নিয়ে গ্রামে-শহরে পাঠায়, যেটা কাছে হয় সেখানেই পাঠায়। কুশী নদীর পাড়ে এইরকম অনেক আস্তানা দেখেছি। গোয়ালাদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে হয় বিভিন্ন সময়ে, বিভিন্ন কাজে। শিকারে যাওয়ার সময় তো বটেই। জঙ্গল ওদের থেকে ভালো আর কে চেনে? বিপদের সংকেত দেয় নিজেদের মধ্যে এক অদ্ভুত শব্দ করে, আর অস্ত্র বলতে ব্যবহার করে লাঠি। আর বর্শা! চওড়া ফলার বর্শা। লাঠি মোটা শক্ত ও পেতলের বা লোহার নাল লাগানো। এই লাঠি দিয়ে শুধু শুয়োর নয়, বাঘের মোকাবিলা করে গোয়ালার দল।
চম্পারন বা আশপাশের এলাকায় অনেক স্থানীয় শিকারি আছে, যারা প্রায় প্রত্যেকে ওস্তাদ ঘোড়সওয়ার।
'যে কায়দায় গোয়ালারা শুয়োর শিকার করে, তার বর্ণনা দিতে পারি', এই বলে জেমস ইংলিস শুরু করেছেন। মোষের পিঠে সওয়ারি হয়ে 'বাতানিয়া' বা 'বাতান'-এর কোনও গোয়ালা আস্তে-আস্তে শুয়োরের যাতায়াতের পথে এগোয়। হাতে থাকে চওড়া বর্শার ফলা আর তার সঙ্গে বাঁধা মোটা দড়ি, যার অন্যপ্রান্ত বাঁধা থাকে শক্ত খুঁটির সঙ্গে। বর্শার হাতল একটু ছোট আর ভারী হয়।
শুয়োর কাছাকাছি চলে এলে গোয়ালা মোষের পিঠে বসে বর্শা ছোঁড়ে। বর্শায় বিদ্ধ হয়ে শুয়োর দৌড়ে কোনও জঙ্গলে ঢুকে পড়ে। খানিকক্ষণ টানাটানির পর, হয় শুয়োর বর্শা খুলে ফেলে, নাহয় রক্তপাত আর যন্ত্রণায় কাবু হয়ে মাটিতে শুয়ে পড়ে। মাটিতে পড়ে গেলে গোয়ালা মোষের পিঠ থেকে নেমে লাঠির ঘায়ে শুয়োর শিকার করে।
জমিদারের নাম ছিল 'মধুবনীবাবু'। আমার শুয়োর শিকারের কাহিনি ওই অঞ্চলে। আসল নাম জানার প্রয়োজন হয়নি, কারণ গ্রামের লোক, এলাকার লোক বা জমিদারির মধ্যে বা আশেপাশের লোকজন তাকে এই নামেই ডাকত, ওই নামেই চিনত।' (জেমস ইংলিস বলেছেন এখান থেকে হিমালয়ের রাজকীয় শৃঙ্গগুলো চোখে পড়ে, পরিষ্কার নীল আকাশের বুকে ঝকঝকে বরফের মুকুট, কখনো রুপোলি কখনও ভোরের সূর্যের আলো পড়ে সোনালি, আবার কখনও রঙের সমাহার, যেন ছবির পর ছবি এঁকে যাচ্ছেন কোনও মহান শিল্পী।)
মধুবনীবাবু তার এলাকার জঙ্গলটাকে খেয়াল রেখেছেন, ফলে বিস্তীর্ণ ঘাসে ঢাকা জমি আর তার মাঝখানে ঘন গাছের অরণ্য, মাঝে খাদ আর পাহাড়ি উঁচু-নীচুর মাঝখানে কোনও চোরা-শিকারির যাতায়াত নেই।
জমিদারকে জনিয়ে শিকার করা যেতে পারে; অন্তত আমার ক্ষেত্রে শুধু অনুমতি দেওয়া নয়, তার উৎসাহ ছিল ঐকান্তিক।
এখানে পিগ-স্টিকিং-এর কোনও অভাব বা অসুবিধা কোনওটাই ছিল না।
আমরা ক্যাম্প করেছি একটা পাহাড়ি নদীর ধারে। কাচের মতো পরিষ্কার জল বয়ে চলেছে, পাথরের চাঁই নদীর পথ এঁকেবেঁকে তৈরি করেছে। ওখানে শুয়োর জল খেতে আসে। নদী হাঁটুজলের বেশি গভীর নয়, জন্তু-জানোয়ার হেঁটে পার হয়ে যায়।
ইংরেজদের বা বিদেশিদের পিগ-স্টিকিং-এর নিয়মকানুন আছে, সেটা মেনে চলতে হয়। না মানলে বিপদ অবধারিত। তুমি যখন তাড়া করছ তখন একটু দেখে শুনে কোরো, কারণ পালাবার সময় যখন কোনও প্রাকৃতিক বাধা, যেমন কোনও খাদ বা বড় পাথরের চাঁই অথবা নদী সামনে এসে পড়ে তখন জন্তুটা রুখে দাঁড়ায়। তখন তোমার আর জন্তুটার মাঝখানে দূরত্ব কমে এসেছে, ঠিক এরকম মুহূর্তে সে তোমাকে তীব্রগতিতে পাল্টা আক্রমণ করবে। ঘোড়া যদি তার পূর্ণগতিতে না থাকে, তাহলে প্রতি আক্রমণ সামলানো খুব কঠিন। ঘোড়া অথবা সওয়ার দুজনেই মারাত্মক আহত হতে পারে, এমনকী মৃত্যু হওয়াও আশ্চর্যের নয়।
আমার শিক্ষা পাওয়ার ঘটনাটা বলি—

সেদিন সকালে একটা শুয়োরকে তাড়া করেছি, অনেকটা পথ তাড়া করতে-করতে পেরিয়ে এসেছি। সঙ্গে দুজন সঙ্গী ছিল—জ্যামি আর গিবলেটস। দুজনেই ওস্তাদ ঘোড়সওয়ার। এসে পড়েছি একটা ছোট ঝোপের কাছে, ঝোপটা আমগাছের। কয়েকটা আমগাছ পাশাপাশি বেড়ে উঠেছে, ডালপালা আর পাতা জড়াজড়ি করে ঝোপের মতো তৈরি করেছে জায়গাটাকে। ঝোপের পরে নদী আর অন্যদিকে খাদ।
আমি একটু এগিয়ে গিয়েছিলাম। জ্যামি আমাকে থামতে বলেছিল, কিন্তু আমি কথাটার কোনও গুরুত্ব দিইনি। শিকারের উত্তেজনা আমার শরীর-মন সবটাই দখল করে ছিল। খানিকটা দূরেই 'শিকার'—হাতের বর্শা মেপে হিসাব করলে কুড়ি বর্শা দূরে, নাগালের মধ্যে!
ঝোপ পেরিয়েই দেখলাম, আমার ঘোড়া আর শুয়োর একদম মুখোমুখি। দেখলাম, শুয়োরের সমস্ত লোম খাড়া হয়ে আছে। ঘোড়া দাঁড়িয়ে পড়ে এক মুহূর্ত সুযোগ পেল না, বরাহ আক্রমণ করল—বিদ্যুৎগতিতে। আমি বর্শা ছুঁড়লাম বটে, কিন্তু অপ্রস্তুত অবস্থায়—ঘোড়াও আক্রমণ থেকে বাঁচার জন্য সরে যেতে চাইছে। ঠিক এই সময় চাবুকের মতো একটা গাছের ডাল আমার মুখে আঘাত করল, 'পাগড়ি'টাও ছিটকে পড়ে গেল। সেই সঙ্গে আমিও ধরাশায়ী। আর আক্রমণে উদ্যত বুনো শুয়োর আমার পাশে, একেবারে পাশাপাশি।
আমার পায়ে ঘোড়ায় চড়ার জন্য 'রাইডিং বুট' পরা ছিল, এক কামড়ে সেই জুতোর শক্ত গোড়ালির অংশ ছিঁড়ে চলে গেল, যেন কাগজের তৈরি। তারপর বন্যবরাহের চোখ গেল ঘোড়ার দিকে। ঘোড়া ততক্ষণে দূরে পালিয়ে গেছে, কিন্তু একরোখা জন্তুটা তাকে তাড়া করতে ছাড়ল না। সেজন্য আমি বেঁচে গেলাম।
সেইদিনই আরেকটা ঘটনা ঘটল। আমার বন্ধু প্যাট আর ম্যানেজার ছেলেটি মিলে গিয়েছিল আরেকদিকে শুয়োর শিকারে। ম্যানেজার ছেলেটি ছোকরা, অল্পবয়স, সাহসী—আর প্যাট অভিজ্ঞ শিকারি, ফলে জুটি বেঁধে দুজনে শিকারে গিয়েছিল। কিন্তু ওদের জায়গাটা ভালো ছিল না, এখানে ওখানে গর্ত আর খানাখন্দে ভরা। ঘোড়া চালানো খুব কষ্টের, বিশেষ করে জোরে এরকম অপরিচিত রাস্তায় ঘোড়া ছুটলে চোট-আঘাতের ভয় থাকে, বিশেষ করে ঘোড়া পড়ে যেতে পারে, খুব খারাপ চোট লাগতে পারে, অস্বাভাবিক কিছু নয়!
ঠিক তাই হল। আমার ম্যানেজারের ঘোড়া একটা ইঁদুরের তৈরি বড় গর্তে পা দিয়ে পিছলে গেল, সওয়ারি শুদ্ধ একেবারে পপাত ধরণীতলে। চোটটা বড়, ঘোড়ার আর উঠে দৌড়োবার সামর্থ্য ছিল না। ম্যানেজার ছেলেটি কিন্তু থামল না, বল্লম হাতে সে দৌড়োল বুনো শুয়োরের পিছনে পিছনে, যাকে এতক্ষণ সে ঘোড়ায় চড়ে তাড়া করছিল। পরিস্থিতি পাল্টে গেছে, কথাটা শুধু শিকারিরা খেয়াল করেছে এমন নয়, শিকারও খেয়াল করেছে।
ফলে ম্যানেজার 'ম্যাক' যখন বর্শা নিয়ে দৌড়োচ্ছে, তখন শুয়োরও তার প্রকৃতি পাল্টে ফেলেছে। সে ঘুরে তাড়া করেছে ম্যাককে। 'পালাও, পালাও, পালিয়ে যাও!' প্যাট চিৎকার করছে পিছন থেকে, কানে ঢুকছে না ম্যাকের। সে বর্শা হাতে অ-সম যুদ্ধের জন্য তৈরি। প্রকাণ্ড বন্যবরাহ ছুটে আসছে, তীব্র গতি, দাঁত প্রায় তিন ইঞ্চি করে দু-দিকে দুটো বেরিয়ে আছে, শানিত কিরিচের মতো। আর মাত্র কয়েকটা মুহূর্ত।
কিন্তু ম্যাকের ভাগ্য প্রায় প্রসন্ন। দু-এক সেকেন্ডের মধ্যে মাটিতে যার দলে-মুচড়ে যাওয়া মৃতদেহ পড়ে থাকার কথা ছিল সেটা হল না। প্যাটের অভিজ্ঞ হাতের বর্শা নিখুঁত লক্ষ্যে এসে বিঁধল শুয়োরকে।
এবার পিপরা ফ্যাক্টরি অঞ্চলের শুয়োর-শিকার দিয়ে কাহিনি শেষ করব।
পিপরা কুঠি অনেকদিন পুরোনো। কুঠির চারপাশে জঙ্গল, ছড়ানো-ছেটানো হ্রদ—এটা শুয়োর শিকারের প্রিয় জায়গা, তবে অবশ্যই পিগ-স্টিকিং-এর, গুলি করে শুয়োর মারার জন্য নয়।
এখানে আমরা প্রায়ই আসতাম, আমার পুরোনো বন্ধু প্যাট আর তার অতিথিবৎসল স্ত্রী-র জন্য। আর এখানে এলে শুয়োর শিকার ছিল অবধারিত—রুটিন তাছাড়া কমপ্লিট হত না।
পিপরা কুঠির জঙ্গলে শিকার করতে গিয়ে মারা গেল জ্যামির ঘোড়া, 'বনি মর্ন', বনি মর্ন মানে সুন্দর সকাল বা এই ধরনের কিছু। কিন্তু বনি মর্নের মৃত্যু হল খুব দুঃখজনকভাবে। শুয়োরের দেহে বর্ষা গেঁথে দেওয়ার সময় ঘোড়সওয়ারকে প্রচণ্ড বেগে শুয়োরকে তাড়া করতে হয়। সেই প্রচণ্ড গতিতেই দৌড়োচ্ছিল 'বনি মর্ন', কিন্তু সেই গতিতে একটা গর্তের মধ্যে তার পা গিয়ে পড়ল; হুমড়ি খেয়ে পড়ল ঘোড়াটা।
শিরদাঁড়া ভেঙে গিয়েছিল, তবু মৃত্যুর সময় প্রভুর ডাক শুনে ঘুরে তাকিয়েছিল ঘোড়াটা, দু-ফোঁটা জল যেন দেখা গেল তার চোখের কোণে! বনি মর্নের জন্য শোক পালন করলাম সবাই, বড় আদরের ঘোড়া ছিল বনি।
ওই অঞ্চলে একটা ভয়ঙ্কর বরাহ ঘুরে বেড়াত। অনেক চেষ্টা করেও তাকে ধরা যায়নি। শিকারির দল আর স্থানীয় লোকজনের কাছে তার পরিচিতি তৈরি হয়ে গিয়েছিল। এক নামেই লোকে চিনত। তার নাম ছিল 'ল্যাংড়া'! বোধহয় যুবক বয়সে তার পায়ে আঘাত লেগেছিল কোনও শিকারির সঙ্গে লড়াই করতে গিয়ে, তারপর বহুদিন কেটে গেছে—তার চোট-খাওয়া পা ঠিক হয়ে গেছে, তার গোঁফও এখন সাদা, সে প্রাপ্তবয়স্ক আর প্রবীণ হয়ে উঠেছে, তবে আক্রমণের তেজ কমেনি, বরং সঙ্গে অভিজ্ঞতা যুক্ত হয়েছে।
এত সাহসী জন্তু আমি জীবনে দেখিনি। বিটারদের চিৎকার-চেঁচামেচি আর ড্রাম বাজানোর উৎকট আওয়াজে জন্তুটা এক-পা নড়বে না, বার বার হাতিদের তাড়া করে জঙ্গল থেকে বের করে দেবে; আর এই সব করতে করতে যখন তার ধৈর্য্যের বাঁধ ভেঙে যাবে তখন ধীরে ধীরে জঙ্গল থেকে বেরোবে। সমস্ত পরিস্থিতি দেখেশুনে নিয়ে সে হঠাৎ উল্কার গতিতে আক্রমণ শুরু করবে। সবচেয়ে কাছে যে ঘোড়া আর ঘোড়সওয়ার থাকবে, তারা হবে শুয়োরের প্রথম লক্ষ্য।
এবারে আক্রমণও এভাবেই শুরু হল।
প্রথমে যে ঘোড়াটা সামনে ছিল সেটার দিকে ছুটে গেল 'লাংড়া'। সওয়ার ছেলেটা বর্শা ছুড়ল, কিন্তু আশ্চর্যের ব্যাপার হল বর্শা ছিটকে পড়ল শুয়োরের গায়ে লেগে, যেন গন্ডারের চামড়া! তারপর এক মুহূর্তের মধ্যে ঘোড়ার ঘাড়ে এসে পড়ল ল্যাংড়া। মুখের দু-পাশের দুটো বেরিয়ে থাকা দাঁতের মারাত্মক আঘাতে ঘোড়ার ঘাড়টা জখম হল।
এরপর প্যাটের পালা। তার ঘোড়াটাও আহত হল। অস্ত্র ওই দাঁত দুটো। যদিও প্যাট তার বর্শাটা শুয়োরের গায়ে বিঁধিয়ে দিতে পেরেছিল। জন্তুটাকে দেখে যদিও মারাত্মক জখম হয়েছে বলে মনে হল না। প্যাটের ঘোড়ার জখম কিন্তু শুয়োরের চেয়ে বেশি।
পরের ঘোড়সওয়ারের বাহন কালো অস্ট্রেলিয়ান ওয়েলার ঘোড়া, এবার জখম হল তার পা, গোড়ালির কাছে। সারাজীবন খুঁড়িয়ে চলা ছাড়া উপায় নেই।
পর পর আরও দুটো ঘোড়া জখম হল। প্রত্যেকের চোট-আঘাত বেশ ভালোরকম, অনেকদিন ভোগাবে। আর ল্যাংড়া, সারা শরীরে চারটে বর্শা গাঁথা, এই অবস্থায় একটা বড় ওক গাছের আড়ালে দাঁড়িয়ে পরের আক্রমণের জন্য অপেক্ষা করছে।
দু-পক্ষই মরীয়া। বুনো শুয়োর চারটে বর্শা শরীরে বিদ্ধ হওয়ার পরও অপেক্ষা করছে পরের লোকটা কে আসবে তার জন্য, তার ঘোড়াটার জন্য। আর আমরা পর পর পাঁচজন আক্রমণ করার পর, আর ভয়ঙ্কর জন্তুটার প্রতি-আক্রমণে পাঁচটা ঘোড়া জখম হওয়ার পরও আবার ঘুরে আক্রমণ করার জন্য তৈরি হচ্ছি।
বার-বার একই ঘটনা ঘটছে। প্রতিবার আমরা আঘাত করছি, বর্শা বিদ্ধও হচ্ছে জন্তুটার দেহে, কিন্তু আঘাত কিছুতেই সেরকম মারাত্মক হচ্ছে না—দুটো কারণে এটা হচ্ছে না। প্রথম কারণ, জন্তুটার চামড়া—অসম্ভব শক্ত, ফলে বর্শা তাকে বিদ্ধ করলেও গভীর ঢুকে মর্মস্পর্শী হচ্ছে না; আর শুয়োরের গতি—জোরে ছুটছে সেটা বড় কথা নয়, সব শুয়োরই জোরে তাড়া করে বা দৌড়ে পালায়, কিন্তু যেভাবে এপাশ-ওপাশ করে ছুটছে সেটা বর্শাধারীকে নিশানা স্থির করতে দিচ্ছে না।
শেষ পর্যন্ত 'জ্যামি' যে বর্শা ছুঁড়ল, সেটা শুয়োরকে মাটিতে ফেলে দিল। ভাগ্য বলেই আমাদের মনে হল, জ্যামি নিজেও সেটা মেনে নিতে দ্বিধা করেনি।
ধূসর রঙের বিরাট শুয়োর, ভয়াবহ হিংস্র 'ল্যাংড়া' মারা গেল।
এই শিকার আমাদের কয়েকটা জিনিস শিখিয়েছিল। আমি ভারতে থাকাকালীন সেটা ভুলিনি। পরে দেশে ফিরেও মনে ছিল।
ভুলিনি এ দেশের প্রকৃতি আর বন্যপ্রাণীদের। ভুলিনি যে সাহস আর উদ্দীপনা নিয়ে শিকার করেছি সেটাও।
ভুলতে পারিনি ভয়ংকর চতুর নরখাদক বাঘদের। স্বীকার করতে দ্বিধা নেই যে, যে উত্তেজনা আর সাহস নিয়ে তাদের শিকার করেছি, সেটা জীবনে যত কম আসে তত ভালো। আমার কথা ভবিষ্যতে যত শিকারি শিকার করবেন বা আমার আগে করেছেন তারা সবাই স্বীকার করবেন। নরখাদক শিকারে কোনও 'আনন্দ' নেই বরং আতঙ্ক লুকিয়ে থাকে মনের মধ্যে, সবসময়।
কিন্তু সত্যিকারের শিকারের আনন্দ আর উত্তেজনা পাওয়া যায় এই পিগ-স্টিকিং—শিকার ও শিকারির লড়াইয়ে, তাই আমি একে ভারতের সেরা শিকার বলেছি।

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন