মন্দিরে মৃত্যুর সাথে

নির্বেদ রায়

কুশীনদের দক্ষিণপাড়ে অবস্থিত রুসেরা গ্রামটি একসময়ে বর্ধিষ্ণু জনপদ ছিল বটে; কিন্তু জেমস ইংলিস ও তাঁর সঙ্গীরা যখন ভারতে এসেছিলেন তখন গ্রামটির অবস্থা অত্যন্ত শোচনীয়।

খামখেয়ালি নদীর জলস্রোত ওই গ্রামের বেশিরভাগ উর্বর জমিকে কৃষি কাজের অনুপযুক্ত করে তুলেছিল। গ্রামের বহু মানুষের আন্তরিক চেষ্টা আর পরিশ্রমের ফলে যেসব পুকুর খোঁড়া হয়েছিল, সেই চমৎকার জলাশয়গুলির বেশিরভাগ তখন শুকনো বালি আর জলজ উদ্ভিদের নীচে চাপা পড়েছে। একসময়ে যে গ্রাম মানুষ-জন, হাট-বাজারে রমরম করত, আজ সেইখানে মাত্র কয়েকটি বাড়িতেই মানুষের বসবাস। ওই বাড়িগুলির অবস্থাও ভালো নয়—পচা ঘুণধরা বাঁশের কাঠামো আর ভাঙা ছাত নিয়ে খোলা জায়গার ওপর এদিকে-ওদিকে ছড়িয়ে ওই বাড়িগুলি, এবং তাদের সর্বাঙ্গ জড়িয়ে আছে বুনোলতা আর লাউগাছ। দূর থেকে মনে হয় মাটির ওপর পড়ে আছে অনেকগুলি সবুজ উইঢিপি।

বিধ্বস্ত গ্রামের চারদিক ঘিরে দাঁড়িয়ে আছে দলে দলে জরাজীর্ণ শুকনো আমগাছ, তাদের প্রসারিত পত্রবিহীন শাখাপ্রশাখার দিকে তাকালে মনে হয় বিগত অতীতের সবুজ পাতায় ঢাকা দিনগুলোর কথা স্মরণ করে তারা যেন হাহাকার করছে নীরবে। মাটির অবস্থা চটচটে, ভিজে স্যাঁৎসেঁতে। ভাঙা গাছের গুঁড়ি আর উদ্ভিদের আবর্জনার মধ্যে এখানে-সেখানে নদীর তটভূমির চেহারা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে প্রকাণ্ড বালির স্তূপ—সহজেই বোঝা যায় দুদিকে বালি আর আবর্জনা ছড়িয়ে ওইখান দিয়েই বারবার ছুটে গেছে বন্যার খরস্রোত। কয়েকটি বিধ্বস্ত অট্টালিকার ভগ্নাবশেষ প্রমাণ করছে একসময়ে ওই গ্রামে ধনবান মানুষের অস্তিত্ব ছিল। গ্রামের বর্তমান অধিবাসীদের মধ্যে অবশ্য কোনও ধনীব্যক্তি ছিল না, অতি অল্পসংখ্যক দরিদ্র মানুষ সেখানে পশুপালন ও কৃষিকাজ অবলম্বন করে বেঁচে থাকার চেষ্টা করছিল। বিধ্বস্ত রুসেরা গ্রামের চারদিকে নিবিড় বনভূমি। মানুষের বাসভূমিকে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়ার জন্য প্রকৃতি সেখানে বদ্ধপরিকর; একদা-সমৃদ্ধ রুসেরা গ্রামকে গ্রাস করতে অরণ্য এগিয়ে আসছিল ধীরে ধীরে।

গো-মহিষের চারণভূমিকে লুপ্ত করে জেগে উঠেছিল ঘন ঘাসবন, বাঁশের ঝাড় এবং বিভিন্ন ধরনের গাছগাছালি ও লতাগুল্ম। গ্রামের মন্দিরগুলি সংস্কারের অভাবে প্রায় অবলুপ্ত—শুধুমাত্র একটি জরাজীর্ণ মন্দির কোনওরকমে কালের আক্রমণ ঠেকিয়ে নিজের অস্তিত্ব বজায় রেখেছিল। দূর গ্রাম থেকে এক ভক্ত পুরোহিত মাঝে মাঝে ওই মন্দিরে দেবতাকে পূজা নিবেদন করতে আসত।

জায়গাটার পরিবেশ ছিল বিষাদ-আচ্ছন্ন। ওই অঞ্চলে কোনোদিনই রাজস্ব আদায় হতো না ঠিকভাবে। প্রায় সবসময় খাজনা বাকি থাকত।

খাজনার প্রধান অংশ ধার্য ছিল গরু-মহিষের ওপর। প্রতিবৎসর বন্যার জল সরে যাওয়ার পরে সাময়িকভাবে উর্বর মাটির ওপর জেগে উঠত শ্যামল বনভূমি। ওই বনভূমিতে খাদ্যসংগ্রহ করতে যেসব গরু-মহিষ বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আসত, সেই জন্তুগুলির মাথাপিছু একটা খাজনা ধার্য করা হত পশুর মালিকদের ওপর। রাজকর্মচারী ঠিকভাবে খাজনার টাকা আদায় করতে পারত না বটে, কিন্তু মাংসের খাজনা আদায় করতে ওই সময়ে বন থেকে বাঘের দল এসে গো-মহিষের ওপর প্রায়ই হামলা করত। অতএব, শিকারিরা জানতেন রুসেরার বন-অঞ্চলে হানা দিলে বাঘের সঙ্গে সাক্ষাৎ সম্ভব হতে পারে!

ওই রুসেরাতেই একদিন ঘটনাচক্রে এসে উপস্থিত হলেন জেমস ইংলিসের বন্ধু জো সাহেব। জো-র বাবা ছিলেন পাকা শিকারি, কিন্তু তিনি নিজে উপস্থিত না থাকলে ছেলেকে হাতি নিয়েও বাঘশিকারে যাওয়ার অনুমতি বড় একটা দিতেন না। হঠাৎ সেবার পাশের গ্রাম থেকে কয়েকটা হাতি নিয়ে জো সাহেব শিকারে বেরিয়ে পড়লেন। পিতার অনুমতি নেওয়া হয়েছিল কি না, সে বিষয়ে জো সম্পূর্ণ নীরব—মনে হয় পিতৃদেবের অগোচরেই তিনি বেরিয়ে পড়েছিলেন। জো-র সঙ্গে ছিলেন তাঁর ভাই জর্জ। অভিভাবকের সাহচর্য ছেড়ে স্বাধীনভাবে সেই প্রথম শিকার অভিযানে দুই তরুণ সাহেবেরই উৎসাহ ছিল প্রচণ্ড, কিন্তু অভিজ্ঞতা ছিল নিতান্তই অল্প।

বাসমতিয়া নামে একটি ছোট দ্বীপের মতো জঙ্গলে হাতি চালিয়ে শিকারের চেষ্টা করলেন তাঁরা, কিন্তু কয়েকটা শুয়োর আর হরিণ ছাড়া কিছুই পাওয়া গেল না। খুবই গরম ছিল। জঙ্গলে আগুন ধরিয়ে তাঁরা শিকারের চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু অভিযানের শেষে জ্বলন্ত অরণ্যকে পিছনে ফেলে দুই ভাই এসে থামলেন পাকুড়িয়া ফেরিঘাটের কাছে। সেইখানেই দুপুরের খাওয়াটা সেরে নেবেন বলে ঠিক করলেন।

সাহেবরা যখন দুধ ও কেক দিয়ে খিদে মেটানোর চেষ্টা করছেন, সেই সময়ে স্থানীয় এক রাখাল এসে তাঁদের জানাল যে রুসেরা গ্রামে মানুষখেকো বাঘ দেখা দিয়েছে। সাহেবরা তখনই একজন বিশ্বস্ত ভৃত্যকে সংবাদের সত্যতা যাচাই করতে পাঠালেন। ভৃত্য ঘুরে এসে খবর দিল রাখালের কথা সম্পূর্ণ সত্য—একটা মানুষখেকো বাঘ সেখানে উপস্থিত হয়েছে বটে।

তৎক্ষণাৎ হাতি সাজিয়ে দুই সাহেব উপস্থিত হলেন রুসেরাতে। গ্রামের চারপাশের জঙ্গলে যে সব জায়গায় বাঘ লুকিয়ে থাকার সম্ভাবনা, সেই জায়গাগুলিতে বিস্তর খোঁজাখুঁজি করেও কিছু পাওয়া গেল না। সাহেবরা ভাবলেন তাঁদের বাজে খবর দেওয়া হয়েছে। সেদিনের মতো তাঁরা অন্বেষণ-পর্ব স্থগিত রাখাই উচিত মনে করলেন।

শিকারিরা যেখানে অবস্থান করছিলেন তার থেকে একটু দূরেই ছিল একটি ছোট পুকুর। পুকুরের জল ঘন উদ্ভিদের আড়ালে এমনভাবে অদৃশ্য হয়েছিল যে, হাতির পক্ষে জায়গাটাকে শুকনো মাঠ বলে ভুল করার এবং ভুলের ফলে বিপজ্জনক পরিস্থিতির উদ্ভব হওয়ার সম্ভাবনা ছিল যথেষ্ট। পুকুরের পাড়ে একটা নিঃসঙ্গ শিমুল গাছকে বেষ্টন করে দাঁড়িয়েছিল বুনো বাঁশের সারি। অসংখ্য লতাগুল্ম জড়ানো ওই বাঁশঝাড়ের ফাঁক দিয়ে একটা পোড়ো মন্দিরের চূড়া শিকারিদের চোখে পড়ল। মন্দিরের ফাটল থেকে বেরিয়ে এসে যে সব বুনো লতা আত্মপ্রকাশ করছিল, তাদের মধ্যে একটা পিপুল গাছ শিকারিদের দৃষ্টি আকর্ণণ করল বিশেষভাবে। মন্দিরের তলার দিকটা গুহা-গহ্বরের মতোই অন্ধকার এবং সেখানকার মাটি এত নরম যে, ওইদিকে যে হাতিগুলো এগিয়ে যাচ্ছিল তাদের পা বসে যাচ্ছিল মাটির মধ্যে! ঘন লতাগুল্ম আর বনজ উদ্ভিদের দুর্ভেদ্য সমাবেশে আচ্ছন্ন ওই জায়গায় বাঘের মতো প্রকাণ্ড জন্তুর উপস্থিতির কথা কেউ ভাবতে পারেনি। শিকারিরা জায়গাটাকে অতিক্রম করে চলে যেতেন, সেখানে বাঘের সন্ধান করার চিন্তা ঘুণাক্ষরেও তাঁদের মাথায় আসত না—কিন্তু জর্জ সাহেবের মাহুত হঠাৎ গাছের ওপর কয়েকটা আঁচড়ের দাগ আবিষ্কার করে উত্তেজিত হয়ে জানাল ওই দাগগুলি হচ্ছে বাঘের নখ-ঘষার চিহ্ন।

বিড়ালের মতো বাঘও গাছের গায়ে নখ ঘষে, সে কথা শিকারিরা জানতেন। তবে, মাটি থেকে প্রায় এগারো ফুট ওপরে গাছের গায়ে আঁচড়ের দাগকে বাঘের নখরচিহ্ন বলে বিশ্বাস করতে রাজি হলেন না জো আর জর্জ। পরে অভিজ্ঞতার ফলে তাঁরা জেনেছিলেন, আরও অনেক বেশি উঁচুতে গাছের গায়ে বাঘের নখাঘাতের চিহ্ন দেখা যায়।

যাই হোক, ব্যাপারটা ভালো করে তদারক করতে চাইলেন জো। হাতির ওপর থেকে গাছের তলায় জমাট অন্ধকার মাখা উদ্ভিদের মধ্যে দৃষ্টিকে চালিত করা সম্ভব নয়, তাই জো সাহেব হাতি থেকে নেমে পড়লেন। নিবিড় লতাগুল্ম ও ঘন বাঁশঝাড়ের মধ্যে বন্দুক হাতে এগিয়ে যাওয়া খুব কঠিন, তাই বন্দুকের পরিবর্তে জো-র কোমরে ছিল একটা পিস্তল। তার ওপর নির্ভর করেই এগোলেন।

যে গাছের ওপর বাঘের নখের দাগ দেখা গিয়েছিল, অনেক কষ্টে, সেই গাছটার নীচে এসে জো দেখলেন নির্ভুলভাবে সেখানে বিরাজ করছে বাঘের পায়ের ছাপ। কয়েক গজ জায়গা নিয়ে নরম মাটির ওপর যে সব চিহ্ন জো-র চোখে পড়ল, তাতে তিনি বুঝলেন গাছের গায়ে খাড়া হয়ে দাঁড়িয়ে ঘষে ঘষে নখ পরিষ্কার করছিল বাঘ। ওপরের চিহ্নগুলির চাইতে তলার চিহ্ন অনেক বেশি টাটকা—গাছের ছাল ছিঁড়ে সাদা দুধের মতো রস গড়িয়ে পড়ে প্রমাণ করে দিচ্ছিল একটু আগেই এখানে বাঘ নখ ঘষে গেছে।

জো যদি নিতান্ত অনভিজ্ঞ না হতেন, তাহলে সেখান থেকেই পিছন ফিরে হাতির পিঠে উঠে বসতেন। পরবর্তীকালে বিভিন্ন শিকার অভিযানে অভিজ্ঞতা অর্জন করে জো বুঝেছিলেন পায়ে হেঁটে ঘন উদ্ভিদের নিবিড় সমাবেশের ভিতর বাঘের অনুসন্ধানের চেষ্টা নিতান্তই নির্বোধের কাজ—কিন্তু সেইদিন অভিজ্ঞতার অভাব ছিল বলেই তিনি বিপদের গুরুত্ব না বুঝে ওইভাবেই বাঘের পিছু নিয়েছিলেন।

ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ করে পুকুরের ধারে এক জায়গায় বাঘের পা হড়কে যাওয়ার চিহ্ন আবিষ্কার করলেন জো। জলপান করার সময়ে বাঘের পা হড়কে গিয়েছিল। কর্দমাক্ত জল দেখে জো বুঝলেন একটু আগেই সেখানে তৃষ্ণা নিবারণ করে স্থানত্যাগ করেছে বাঘ। জো-র সর্বাঙ্গ হল ঘর্মাক্ত। তিনি চিৎকার করে জর্জকে জানালেন বাঘের বসবাসের চিহ্ন সেখানে রয়েছে বটে, তবে সেই মুহূর্তে ঘন উদ্ভিদ জালের মধ্যে কোথাও বাঘ আছে বলে মনে হয় না। দূর থেকে চিৎকার করে জর্জ জানতে চাইলেন, 'বাঘের ''মড়ি'' দেখতে পেয়েছ?' 'নাঃ, এখন পর্যন্ত বাঘের মারা জন্তু বা মানুষ কিছুই চোখে পড়েনি। তবে দাঁড়াও ভালো করে দেখি,' বললেন জো। তারপর দুর্ভেদ্য লতাগুল্ম, শিকড়, গাছের ডাল প্রভৃতি কাটাতে কাটতে হামাগুড়ি দিয়ে অগ্রসর হলেন জো সাহেব—তাঁর হাতে ছুরি, কটিবন্ধে গুলি ভরা পিস্তল।

জো প্রবেশ করলেন ঘন উদ্ভিদের অরণ্যে...নিবিড় থেকে নিবিড়তর হয়ে উঠল উদ্ভিদের জাল; ক্ষীণ থেকে ক্ষীণতর হয়ে এল জঙ্গলের বাইরে অপেক্ষমান মানুষজনের কণ্ঠস্বর আর হাতির আওয়াজ...তবু এগিয়ে আরও এগিয়ে আরও এগিয়ে চলছেন জো...

মাঝে মাঝে জর্জের চিৎকার ভেসে আসছিল জো-র কানে, তিনিও তারস্বরে উত্তর দিচ্ছিলেন। ওইভাবে একবার চেঁচিয়ে উত্তর দেওয়ার পরই হঠাৎ জো সাহেবের মনে হল তাঁর সামনে ঘন উদ্ভিদের জঙ্গল ভেদ করে কোনও জীবন্ত প্রাণী যেন সতর্কচরণে অগ্রসর হচ্ছে এবং গাছপালা ও লতার সঙ্গে ওই জীবটির দেহের সংঘাতের অস্পষ্ট শব্দই যেন ভেসে এসেছে তাঁর কানে। সর্বাঙ্গে আতঙ্কের শিহরন অনুভব করলেন জো। কিন্তু সেখানে বাঘ লুকিয়ে থাকতে পারে, এমন কথা তখনও বিশ্বাস করতে পারছিলেন না তিনি। বিশ্বাস না করার কারণ ছিল, ওইটুকু ছোট জায়গায় ঘন গাছগাছালির দুর্ভেদ্য সমাবেশের মধ্যে বাঘের মতো প্রকাণ্ড জন্তুর অস্তিত্ব কল্পনা করা যায় না—তা ছাড়া রুসেরা মন্দির সম্পর্কে অনেক অলৌকিক কাহিনি শুনেছিলেন জো, সেই কাহিনিগুলি তাঁর মনে প্রভাব বিস্তার করেছিল।

এর মধ্যে সর্বাঙ্গে কাদা আর উদ্ভিদের আবর্জনা মেখে ঘর্মাক্ত হয়ে উঠেছেন জো, কিন্তু এতক্ষণ পরিশ্রমের ফলে তিনি মন্দিরের ভাঙাচোরা দেয়ালের কাছাকাছি এসে পৌঁছেচেন। তাঁর চারদিকে তখন ছড়িয়ে আছে ভগ্ন মন্দিরের বিভিন্ন অংশের ধ্বংসস্তূপ এবং সামনেই অবস্থান করছে ভাঙাচোরা এক দ্বারপথ। দরজার কাঠামো ভেঙে গেছে কোনকালে, কাঠের কাঠামোটা কোনওমতে আটকে আছে মন্দিরের গায়ে। একটা নীচু দেয়াল ভাঙাচোরা অবস্থায় মন্দির প্রাঙ্গণ ঘিরে দাঁড়িয়ে আছে। ওই প্রাঙ্গণের ওপর আর চারপাশের দেয়ালে জমে উঠেছে ঘন শ্যাওলা, ঘাসঝোপ প্রভৃতি।

চারদিকে কেবল ধ্বংসের চিহ্ন। বাতাস কটুগন্ধে ভরে আছে। যেন এক মৃত্যুপুরী, জীবিত প্রাণীর প্রবেশ সেখানে নিষিদ্ধ। জো-র বিপরীত দিকে মূর্তিমান অমঙ্গলের মতো একটা শেয়াল চকিতে দেখা দিয়েও অদৃশ্য হল, অন্যদিকের পাঁচিলের ফাটলের ভিতর নিঃশব্দে প্রবেশ করল একটা কুৎসিত গোসাপ। পচা গাছের পাতা আর ভাঙা ডাল গা থেকে ঝেড়ে ফেলে সোজা হয়ে উঠে দাঁড়ালেন জো, সঙ্গে সঙ্গে তাঁকে অভ্যর্থনা জানাতেই যেন ভাঙা মন্দিরের একটা গহ্বর থেকে একঝাঁক বাদুড় উড়ে এসে সাহেবকে প্রদক্ষিণ করে আবার অন্ধকারের আশ্রয়ে হারিয়ে গেল ভৌতিক অপচ্ছায়ার মতো।

মন্দিরের প্রবেশদ্বারে কয়েকটা জরাজীর্ণ ফাটা সিঁড়ির ধাপ মাকড়সার জালে আচ্ছন্ন হয়ে উঠে গিয়েছিল অর্ধ-গোলাকৃতি দালানের দিকে। বাইরে থেকেই ভিতরের ডিম্বাকৃতি আধারে শায়িত কালো পাথরে তৈরি প্রস্তরফলক সাহেবের দৃষ্টিগোচর হল। (বর্ণনা থেকে বোঝা যায় ওই বেদিটা শিবলিঙ্গ ছাড়া আর কিছু নয়। হিন্দুধর্মে অজ্ঞ জো সাহেব সেকথা বুঝতে পারেননি।)

জো সাহেব মন্দিরের ভিতর উঁকি দিলেন। এখানে-ওখানে মন্দিরের ফাটল দিয়ে বাইরের আলো আসছিল বটে, কিন্তু ভিতরের জমাট অন্ধকারের রাজ্যে ওইটুকু আলো নিতান্তই তুচ্ছ। মন্দিরের ছাত বেশ উঁচু। সেখান থেকে বাদুড়দের ডানার আওয়াজ ভেসে আসছিল। দু-একটা বাদুড় মাঝে মাঝে নেমে এসে জো সাহেবের মুখ স্পর্শ করার চেষ্টা করছিল—সঙ্গে সঙ্গে শিউরে উঠে পিছিয়ে যাচ্ছিলেন জো। ধীরে ধীরে তাঁর চোখে অন্ধকার সহনীয় হয়ে উঠল,—জো দেখলেন, একটা ডুমুর গাছের অনেকগুলি শিকড় মন্দিরের বিভিন্ন ফাটলের মধ্যে প্রবেশ করে জরাজীর্ণ মন্দিরের অস্তিত্বকে আরও বিপন্ন করে তুলেছে। ভাঙাচোরা দেয়াল আর ছাতের ওপরে ও নীচে মেঝের গায়ে সেই শিকড়গুলিকে দেখে মনে হচ্ছিল অসংখ্য অতিকায় সর্প কুণ্ডলী পাকিয়ে সেখানে অবস্থান করছে। ফাটলের ভিতর দিয়ে আসা ক্ষীণ আলোকধারার সাহায্যে সেই অন্ধকারের রাজ্যে কিছুই স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছিলেন না জো, কিন্তু দূরে অস্পষ্ট অর্ধগোলাকৃতি প্রবেশপথ আর ভাঙা মন্দিরের ফাঁকে একটা জ্বলন্ত বস্তু তাঁর দৃষ্টিগোচর হল। জো ভাবলেন ওটা টিনের টুকরো, আলো পড়ে জ্বলে জ্বলে উঠছে—পরক্ষণেই তাঁর মনে হল বস্তুটি তুচ্ছ টিন না হয়ে মূল্যবান হীরা-জহরত বা মণিমুক্তাও হতে পারে। মন্দিরের মধ্যে গুপ্তধনের গুজব জো সাহেবের কানে এসেছিল। মন্দিরদ্বার থেকে মাথা সরিয়ে যথাসাধ্য জোরে চিৎকার করে তিনি জর্জকে একটি অনুচরের হাতে দেশলাই পাঠিয়ে দিতে বললেন। দেশলাই জ্বালিয়ে মন্দিরের গর্ভে তল্লাশ করতে চেয়েছিলেন জো।

কণ্ঠস্বরের প্রতিধ্বনি তখনও মন্দিরের গায়ে বেজে বেজে উঠছে, হঠাৎ সাহেবের মনে হল অন্ধকারের ভিতর থেকে যেন একটা শব্দ ভেসে এল। শব্দটা ক্রুদ্ধ বিড়ালের ফ্যাঁস ফ্যাঁস আওয়াজের মতো—কিন্তু জো শব্দটাকে কোনও ফাটলের ভিতর সাপের ফোঁস-ফোঁসানি অথবা বাদুড়ের ডানার আওয়াজ মনে করে সে বিষয়ে মনোযোগ দেওয়ার প্রয়োজন অনুভব করলেন না।

বাইরে থেকে জর্জের উত্তর শুনে বোঝা গেল তিনি ভাই-এর সঙ্গে যোগ দিতে এগিয়ে আসছেন। তারপরই জো শুনলেন জর্জের হাতি বাঁশ-ঝাড় ভেঙে অগ্রসর হওয়ার চেষ্টা করেছে সশব্দে। একটু পরে শব্দটা থেমে গেল। জো বুঝলেন হাতির পক্ষেও বাঁশঝাড় ও উদ্ভিদের নিবিড় ব্যূহ ভেদ করে এগিয়ে আসা সম্ভব নয়। আবার চিৎকার করে ভাইকে ডাকলেন জো। আবার তাঁর মনে হল মন্দিরের অন্ধকার অন্তঃপুর থেকে ভেসে এল সেই 'ফ্যাঁস ফ্যাঁস' শব্দ!

জর্জের পদব্রজে এগিয়ে আসার শব্দ শুনতে পেলেন জো। লতাগুল্মের আলিঙ্গন ভেদ করে বাঁশঝাড়ের ফাঁকে ফাঁকে ভাই-এর পথ চলার চিহ্ন অনুসরণ করে দ্রুত আসতে পারছিলেন না জর্জ, ঝোপ-ঝাড় এবং গাছের ধারালো ডালগুলোকে জর্জ গালাগালি দিচ্ছিলেন প্রাণভরে, তবে তাতে তাঁর অগ্রগতির যে বিশেষ সাহায্য হচ্ছিল সেকথা বলা যায় না।

ভাই-এর দেরি দেখে জো অধৈর্য হয়ে আবার মন্দিরের ভিতর উঁকি মারলেন। সঙ্গে সঙ্গে চমকে উঠলেন তিনি। গুহার মুখের মতো অর্ধগোলাকার প্রবেশপথের তলা দিয়ে মন্দিরের ভিতর দিকে জ্বলছে একজোড়া সবুজ অগ্নিপিণ্ড! আলোর প্রতিফলনে যেভাবে হীরকখণ্ড জ্বলে জ্বলে ওঠে, সেইভাবেই জ্বলছিল সবুজ আলোর টুকরো দুটি। প্রায় মিনিটখানেক ধরে অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলেন জো। তিনি শুনতে পেলেন উদ্ভিদজালের শেষ বাধাটিকেও অতিক্রম করে জর্জ তাঁর দিকেই এগিয়ে আসছেন। নিকটেই ভাই-এর উপস্থিতি জো সাহেবের মনকে ভয়শূন্য করে দিল।

সামনে জ্বলন্ত জহরতের আলো আরও তীব্র হয়ে জ্বলে উঠল। 'এসো হে, জর্জ,' বলে চিৎকার করে নীচু হয়ে মন্দিরের অনুচ্চ দ্বারপথে প্রবেশ করে ভিতর দিকে এগিয়ে গেলেন জো।

সঙ্গে সঙ্গে বজ্রনাদের মতো ভয়ংকর এক গর্জনধ্বনিতে মন্দিরের ভিতরটা থর থর করে কেঁপে উঠল, তীব্র থেকে তীব্রতর হয়ে জ্বলে উঠল সবুজবর্ণ দুই অগ্নিপিণ্ড। দারুণ আতঙ্কে জো সাহেবের হৃৎপিণ্ড লাফিয়ে উঠল বুকের মধ্যে, তিনি বুঝলেন অন্ধকার মন্দিরের বদ্ধ এলাকায় মৃত্যুফাঁদে ধরা পড়েছেন তিনি—তার সামনে অবস্থান করছে কালান্তক যমের মতো নরখাদক বাঘ। সবুজ আলোর টুকরো দুটো হীরে-জহরত নয়, ও দুটো মানুষখেকো বাঘের জ্বলন্ত চোখ।

গুরুভোজনের পর মন্দিরের অন্ধকারে আত্মগোপন করে বাঘ ভেবেছিল সে শিকারিকে ফাঁকি দিতে পারবে—এখন সে বুঝেছে তার অস্তিত্ব আর শিকারির চোখে গোপন নেই। তাই আক্রমণই আত্মরক্ষার শ্রেষ্ঠ উপায় ধরে নিয়ে সে সগর্জনে ঝাঁপিয়ে পড়তে চাইছে শত্রুর ওপর। অতি দ্রুত চিন্তাস্রোতের ভিতর দিয়ে এই কথাগুলো জো সাহেবের মগজে ধাক্কা দিল, তৎক্ষণাৎ উপুড় হয়ে তিনি শুয়ে পড়লেন এবং অনুভব করলেন তাঁর শায়িত দেহের ওপর দিয়ে তিরবেগে ছুটে গেল একটা প্রকাণ্ড সরল বস্তু। পরক্ষণেই জর্জের ভয়ার্ত চিৎকার শুনতে পেলেন জো। মন্দিরের ভিতর দিকের দালানটিকে যে স্তম্ভটা ধরে রেখেছে, সেই থামটার পিছনে জো সরে গেলেন। বাঘ তখন মন্দিরের মাঝখানে পাক দিয়ে ঘুরছে এবং ক্রুদ্ধ কণ্ঠে গর্জন করছে বারংবার।

ভাই-এর বিপদ বুঝে জর্জ তখন চিৎকার করে মাহুত আর অন্যান্য অনুচরদের ডাকছেন। বাঘ সাময়িকভাবে মন্দিরের ভিতর শত্রুর উপস্থিতি ভুলে গেল; একাগ্রদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল সেই প্রবেশপথের দিকে, যেখান দিয়ে ভেসে আসছে জর্জের কণ্ঠস্বর।

জো এইবার কোমরের পিস্তলে হাত দিলেন। পিস্তলের 'হ্যামার' পড়ার সামান্য আওয়াজেই বাঘ চমকে জো-র দিকে ফিরে চাপা গর্জনে ক্রোধ প্রকাশ করল।

সঙ্গে সঙ্গে সশব্দে অগ্নিবর্ষণ করল জো সাহেবের পিস্তল—

একবার! দুবার! তিনবার!

মন্দিরের মধ্যে এবার আগ্নেয়াস্ত্রের শব্দে প্রতিধ্বনি জাগল, কিন্তু বাঘের গর্জন আর শোনা গেল না। পিস্তলের গুলি তার গর্জিত কণ্ঠকে চিরতরে স্তব্ধ করে দিয়েছে। প্রথম গুলিটা প্রাণঘাতী নিশানায় বিদ্ধ হয়েছিল বাঘের মগজে।

মৃত শ্বাপদের সামনে এসে দেখা গেল সেটা বাঘ নয়, বাঘিনী। জন্তুটার সবক'টি দাঁতই প্রায় পড়ে গিয়েছিল। অধিকাংশ নরখাদকের মতো এই মানুষখেকো বাঘিনীটাও ছিল চর্মরোগে আক্রান্ত, তার শরীরে লোম প্রায় ছিল না বললেই চলে। মাপ নিয়ে দেখা গেল বাঘিনী দৈর্ঘ্যে আট ফুট চার ইঞ্চি।

প্রায় দন্তহীন অবস্থায় রুগ্ন দেহ নিয়ে বুনো জানোয়ার ধরা কঠিন, খুব সম্ভব সেইজন্যই মানুষ মেরে পেট ভরাতে সচেষ্ট হয়েছিল বাঘিনী। জন্তুটা মোটেই সাহসী ছিল না, কিন্তু তা হলেও জো সাহেবের পক্ষে ওইভাবে নিবিড় উদ্ভিদের ব্যুহ ভেদ করে পায়ে হেঁটে বাঘিনীর পিছু নেওয়া মূর্খের কাজ হয়েছিল সন্দেহ নেই।

জো নিজেই বলেছেন, লতাগুল্ম আর উদ্ভিদের বেড়াজাল ভেঙে এগিয়ে যাওয়ার সময়ে তিনি নিশ্চয়ই অনেকবার অজ্ঞাতসারে বাঘিনীর কাছাকাছি এসেছিলেন—জন্তুটা ইচ্ছে করলেই ওই সময়ে এক থাবায় তাঁকে বধ করতে পারত। পরবর্তীকালে কুশীনদের সন্নিহিত বনভূমিতে অনেক বাঘ মেরেছিলেন জো, কিন্তু কাছে কোথাও বাঘের পায়ের ছাপ দেখতে পেলে তিনি আর কখনও হাতির পিঠ ছেড়ে মাটিতে নামেননি।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%