নির্বেদ রায়
উনিশ শতকের শেষভাগে কুশীনদের তীরবর্তী বনাঞ্চলে শিকার করার সময়ে বিভিন্ন ধরনের অভিজ্ঞতার স্বাদ পেয়েছিলেন নীলকর জেমস ইংলিস—কিন্তু ফুসিয়া গ্রামের কাছে অরণ্যের প্রান্তদেশে রাত কাটাতে গিয়ে যে বিচিত্র ও ভয়ংকর দৃশ্য তাঁর চোখে পড়েছিল, সেই ধরনের বন্য-নাটক দর্শন করার সুযোগ পেয়েছেন খুব কম মানুষ।
ঘটনার বিবরণ নীচে দেওয়া হল :
স্থানীয় অঞ্চল ফুসিয়ার কাছে অবস্থিত নীলকুঠিটি খুব বিপজ্জনকভাবে কুশীনদের বন্যাস্রোতে প্লাবিত হয়েছিল। জেমস ইংলিস প্রয়োজনীয় কাজে ওই অঞ্চল তদারক করতে গিয়ে দেখলেন নীল রং তৈরির বিশাল চৌবাচ্চা আর পাত্রগুলি জলমগ্ন ও পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে আছে এবং নীলকুঠির ভাঙা কাঠামোর ভিজে খড়ের চাল আর অন্ধকার টালির নীচে বাস করছে অসংখ্য চামচিকে আর বাদুড়। সব মিলিয়ে একটা গা-ছমছম করা ভূতুড়ে পরিবেশ গড়ে উঠেছিল ওই কুঠিটির মধ্যে।
এমন চমৎকার জায়গায় রাত কাটাতে হবে মনে করে সাহেব খুবই বিমর্ষ হয়ে পড়েছিলেন। তাই তিনজন স্থানীয় পশুপালক যখন সাহেবের সঙ্গে দেখা করতে এল, তখন তাদের সঙ্গে কথাবার্তার সুযোগ পেয়ে সাহেব কিছুটা উৎফুল্ল হয়ে উঠলেন। তহশিলদার কর্তৃক নিযুক্ত ভৃত্যদের নৈশভোজনের জন্য প্রয়োজনীয় নির্দেশ এবং যৎসামান্য দক্ষিণা অর্থাৎ বকশিস দিয়ে ওই তিন ব্যক্তির সঙ্গে আলাপ করতে লাগলেন ইংলিস সাহেব। তাদের ভয়ার্ত বিবৃতি থেকে জানা গেল নদীর তীরবর্তী ফেরিঘাট আর নীল কারখানার মাঝখানে এক ঘন জঙ্গলের ভিতর দুটি বাঘ আস্তানা গেড়েছে। পশুপালকরা আরও বলল যে, বাঘ দুটি নাকি আকারে বিশাল, তাদের স্বভাব-চরিত্রও নাকি ভয়ংকর হিংস্র। সাহেব অবশ্য তাদের কথা বিশ্বাসযোগ্য মনে করেননি, পূর্ব-অভিজ্ঞতা থেকে তিনি জানতেন স্থানীয় অধিবাসীদের বর্ণনায় প্রত্যেকটি বাঘ 'বিশাল' আর 'ভয়ংকর হিংস্র'।
বাঘের সংবাদে কতটা 'সত্য' আর কতটা 'অসত্য' নিহিত থাকতে পারে সেই চিন্তায় যখন সাহেব মস্তিষ্ককে ঘর্মাক্ত করে তুলেছেন, সেই সময় তাঁর সামনে হস্তিপৃষ্ঠে আবির্ভূত হলেন তহশিলদার দেবনারায়ণ সিং। তহশিলদারের সঙ্গে এসেছিল একদল গ্রামবাসী, তাদের উত্তেজিত কথাবার্তা আর চিৎকার চেঁচামেচি শুনে সাহেব বুঝলেন কোনও অস্বাভাবিক ঘটনা ঘটেছে।
তহশিলদার দেবনারায়ণ সিং হাতি থেকে নেমে সেলাম জানিয়ে 'রিপোর্ট' পেশ করলেন। তাঁর বিবরণী থেকে জানা গেল নিকটবর্তী অঞ্চলে বাঘের উপস্থিতি সম্পর্কে সন্দেহ প্রকাশের কিছুমাত্র অবকাশ নেই—কারণ, তাঁর সঙ্গে যে লোকগুলো এসেছে তারা বাঘের কবলে নিহত গরুর মৃতদেহ দেখেছে। অদূরে অবস্থিত দীর্ঘ ও ঘন ঘাসজঙ্গলে পরিপূর্ণ অরণ্যের প্রান্তদেশে নীলচাষের জমির ওপর ফাঁকা জায়গায় শায়িত ছিন্নভিন্ন গরুটির মৃতদেহ থেকে তখনও গরম রক্ত ঝরে পড়ছে এবং গ্রামবাসীদের তীক্ষ্নদৃষ্টি ওইখানেই আবিষ্কার করেছে দুটি বাঘের পদচিহ্ন।
দুটি বাঘের পায়ের ছাপের কথা সাহেবের কাছে প্রথমে বিশ্বাসযোগ্য মনে হয়নি, কিন্তু অভিজ্ঞ শিকারি দেবনারায়ণ সিং জানালেন ওই পদচিহ্নের মালিক এক বাঘিনী ও তার অপ্রাপ্তবয়স্ক শাবক।
এই ব্যাখ্যাটা সাহেবের মনঃপূত হল—তিনি জানতেন বাচ্চা সম্পূর্ণ স্বাবলম্বী হওয়ার আগে অর্থাৎ মায়ের সাহায্য ছাড়া এককভাবে শিকার ধরতে সমর্থ না হওয়ায় বাঘিনী বাচ্চার সঙ্গেই থাকে।
বাঘিনী ও তার বাচ্চা নিয়ে বেশিক্ষণ মাথা ঘামালেন না সাহেব। নীলকুঠির স্যাঁৎসেঁতে ভূতুড়ে আবহাওয়া তাঁর মনের ওপর প্রভাব বিস্তার করেছিল। ফলে রাতের খাওয়াও বিশেষ জমল না। কোনওরকমে নৈশভোজন সমাপ্ত করে সাহেব যখন শুতে যাওয়ার উদযোগ করছেন, সেই সময়ে জানকী নামে নীলকুঠির তদারককারী ভৃত্যটি এসে উপস্থিত হল সাহেবের সামনে।
জানকীর কথায় সাহেব জানতে পারলেন, নীলকুঠির কাছেই তহশিলদারের নির্দেশে কয়েকটি গর্ত খোঁড়া হয়েছে—ওই গর্তের ভিতর বন্দুক হাতে অপেক্ষা করলে কয়েকটা হরিণ বা শূকরকে ঘায়েল করার সম্ভাবনা আছে; কারণ, নিকটবর্তী অরণ্যের অসংখ্য হরিণ ও শূকরের মধ্যে একাধিক পশুর ওই এলাকায় শুভ-আগমন অবশ্যম্ভাবী।
গর্তের ভিতর বসে বন্যপশুর জন্য অপেক্ষা করার শিকার পদ্ধতি জেমস সাহেবও জানতেন। কিন্তু শার্দূল-সঙ্কুল অরণ্যে, বিশেষ করে কাছেই যখন বাঘের ভয়াবহ উপস্থিতির সংবাদ পাওয়া গেছে, সেইখানে—গভীর রাত্রে গর্তের ভিতর বসে শিকারের সন্ধানে অপেক্ষা করা শিকারির পক্ষে নিরাপদ নয়। বলা তো যায় না—হরিণ কিংবা বুনো শুয়োরের পরিবর্তে বাঘের আবির্ভাবও ঘটতে পারে এবং সেক্ষেত্রে গর্তে বসে থাকা শিকারি শিকারে পরিণত হতে পারে যে-কোনও মুহূর্তে।
তবু জানকীর প্রস্তাব উপেক্ষা করলেন না সাহেব। নীলকুঠির স্যাঁৎসেঁতে ভূতুড়ে পরিবেশ থেকে নিষ্কৃতি পাওয়ার জন্য তিনি বন্দুক হাতে গর্তের ভিতর বসে রাত কাটাতে রাজি হয়ে গেলেন। বিশেষ করে তহশিলদার দেবনারায়ণ সিং-এর মতো অভিজ্ঞ শিকারি যেখানে সঙ্গে থাকবেন বলে জানা গেছে, সেখানে খুব বেশি ভয় পাওয়ার কারণ নেই। অতএব, যথেষ্ট কার্তুজ আর বন্দুক নিয়ে সাহেব বেরিয়ে পড়লেন। জানকীও প্রবল উৎসাহে তাঁর সঙ্গী হল। জানকীর উৎসাহের কারণ অন্য—হরিণ বা শূকরের মাংসভোজনের জন্যই সে লুব্ধ হয়ে উঠেছিল।
নির্দিষ্ট স্থানে এসে একটি গর্তের ভিতর আশ্রয় নিলেন জেমস ইংলিস ও জানকী, একটু দূরে ডানদিকে আর একটি গর্তের মধ্যে প্রবেশ করলেন তহশিলদার দেবনারায়ণ সিং। জানকী একটা ছোট বেতের মোড়া নিয়ে এসেছিল সাহেবের জন্য। অনেকক্ষণ গর্তের ভিতর গুঁড়ি মেরে বসে থাকলে হাতে-পায়ে খিল ধরতে পারে, তাই বেতের মোড়ার ব্যবস্থা। মোড়াতে উপবিষ্ট সাহেবের পিছনে স্থান গ্রহণ করেছিল জানকী।
রাত তখন প্রায় দশটা। খণ্ড খণ্ড মেঘের আড়াল থেকে উঁকি দিল চাঁদ। দুই একটা তারা-ও মাঝে মাঝে দেখা দেওয়ার চেষ্টা করছিল বটে, কিন্তু মেঘের দল আবার ছুটোছুটি করে তাদের ঢেকে দিচ্ছিল চটপট। দূর থেকে প্রবাহিত জলধারার কল্লোল-ধ্বনি ভেসে আসছিল শিকারিদের কানে। কুশীনদের তীরবর্তী বনভূমির বুকে রাত্রি গভীর থেকে গভীরতর হল ধীরে ধীরে...
শিকারিরা যে 'পিট' বা গর্ত দুটিতে আশ্রয় নিয়েছিলেন সেগুলি তিন থেকে সাড়ে তিন ফুট গভীর ছিল। পিছনে আবির্ভূত বাঘের অতর্কিত আক্রমণ থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য প্রচলিত রীতি অনুযায়ী কাঁটা গাছের বেড়া ফেলে দেওয়া হয়েছিল গর্তের আশেপাশে। গর্তের দুই এক ফুট ওপরে অথবা তার চেয়েও নীচে ছিল শিকারিদের মাথা—অর্থাৎ বিচরণরত পশুর পক্ষে শিকারির অস্তিত্ব আবিষ্কার করা অসম্ভব, অথচ জঙ্গলের কিনারায় ফাঁকা মাঠের ওপর দণ্ডায়মান পশুর দেহ আকাশের পটভূমিকায় খুব সহজেই ধরা পড়বে শিকারির চোখে। অতএব, বাতাস যদি শিকারির গায়ের গন্ধ পশুর নাসিকায় পৌঁছে না দেয়, তবে শিকারে সাফল্যলাভের সম্ভাবনা খুবই বেশি।
জেমস ইংলিশ ওইভাবে গর্তে বসে আগে কখনও শিকার করেননি, সেকথা আগেই বলেছি। সেই রাতে দূরদেশের এক অরণ্যময় অঞ্চলে গর্তের ভিতর বসে তাঁর মন চলে গেল বিগত দিনের স্মৃতির পাতায়, কলেজের ফেলে আসা দিনগুলোর কথা মনে পড়তে লাগল বারবার।
ব্রাহ্মী হাঁসের ডাক শোনা গেল। দূর গ্রামের গোয়াল থেকে কয়েকবার ভেসে এল গরুর গলায় বাঁধা ঘণ্টার অস্পষ্ট টুং টাং আওয়াজ। মাঝে মাঝে সতর্ক হালকা পায়ের শব্দে চমকে বন্দুক বাগিয়ে ধরেছেন শিকারিরা, কিন্তু তারপরই দেখা গেছে পদশব্দের অধিকারী হল নেউল, না হয় সজারু কিংবা শেয়াল—হতাশ হয়ে আবার উদ্যত আগ্নেয়াস্ত্র নামিয়ে রেখেছেন তাঁরা।
ভিজে স্যাঁৎসেঁতে আবহাওয়ার জন্য অরণ্য অঞ্চলের রাত্রি বেশ ঠান্ডা হয়। সেই রাত্রেও নিয়মের ব্যতিক্রম ছিল না। একঘেঁয়ে প্রতীক্ষা আর ঠান্ডা শিশিরের সংস্পর্শ সাহেবের দেহে জড়তার সঞ্চার করেছিল...
হঠাৎ হাতের ওপর জানকীর হাতের চাপ অনুভব করলেন সাহেব, সঙ্গে সঙ্গে কানে এল চাপা উত্তেজিত কণ্ঠস্বর, 'সাহেব! দেখুন, দেখুন, ডানদিকে চেয়ে দেখুন।'
জানকীর নির্দেশ অনুসারে চকিতে ঘাড় ফেরাতেই দক্ষিণ দিকের জমির ওপর অন্ধকার আকাশের পটভূমিতে আরও অন্ধকার এক বৃহৎ ও চলমান ছায়া সাহেবের দৃষ্টিগোচর হল। জানকী ফিসফিস করে জানিয়ে দিল অন্ধকারে অস্পষ্ট ওই ছায়াদেহের অধিকারী হচ্ছে এক বন্যবরাহ। হাওয়ার গতি শিকারিদের অনুকূলে ছিল বলে শূকরটি নিকটে অবস্থিত শত্রুর অস্তিত্ব সম্পর্কে সচেতন হতে পারেনি—মাটি খুঁড়ে শিকড় তুলে খেতে খেতে সে ইতস্তত বিচরণ করছিল, মাঝে মাঝে ঘুৎকার-ধ্বনিতে প্রকাশ পাচ্ছিল আহারের তৃপ্তি। এই সময় একখণ্ড মেঘের আড়াল থেকে স্পষ্ট হয়ে দেখা দিল চাঁদ এবং উন্মুক্ত প্রান্তরে ছড়িয়ে পড়ল জ্যোৎস্নার আলো। অন্ধকারে অস্পষ্ট বস্তুগুলি এখন আর একটু স্পষ্ট হল। সাহেব বন্দুক তুলে শূকরের প্রশস্ত বক্ষে লক্ষ্য স্থির করতে লাগলেন। কিন্তু গুলি চালানোর আগেই সে হঠাৎ মাথা উঁচু করে ঘুরে দাঁড়াল। তার দাঁড়ানোর ভঙ্গি দেখে সাহেব মুগ্ধ হয়ে গেলেন—দণ্ডায়মান বরাহটি যেন শক্তি ও শৌর্যের জীবন্ত প্রতীক, বন্য সৌন্দর্যের মহিমায় অপূর্ব!
কিন্তু শূকরটা এমন উৎকর্ণ হয়ে কী দেখছে? নিশ্চয়ই কোনও কারণে তার শান্তির ব্যাঘাত ঘটেছে।
শূকরের শান্তিভঙ্গের কারণ নিয়ে শিকারিদের বেশিক্ষণ মাথা ঘামাতে হল না, অরণ্যের অন্তঃপুর থেকে ভেসে এল গম্ভীর গর্জনধ্বনি।
সভয়ে সাহেবের হাত চেপে ধরে রুদ্ধস্বরে জানকী বলে উঠল, 'বাঘ এসেছে! ভগবান, আমাদের রক্ষা করো।'
অরণ্যগর্ভ থেকে আগত পরিচিত গর্জনধ্বনি শূকরটিকে বিশেষ বিচলিত করেছে বলে মনে হল না। ক্রুদ্ধ ভঙ্গিতে মাথা নীচু করে সে একবার ঝাঁকানি দিল, তার কণ্ঠ থেকে নির্গত হল এক ভয়ংকর রণ-আহ্বান, 'হু! হু!'
শূকরের আহ্বানে সাড়া দিয়ে বনের ভিতর থেকে জাগল আগের চেয়েও জোরালো এক প্রচণ্ড গর্জন, পরক্ষণেই জঙ্গলের আড়াল থেকে ফাঁকা জায়গার ওপর বেরিয়ে এল একটি বাঘ।
বাঘটি তরুণ পুরুষ। তার মেদহীন পাঁজরের ওপর ক্রুদ্ধ আবেগে আছড়ে পড়ছিল সুদীর্ঘ লাঙ্গুল, দীর্ঘ গোঁফের সারি কাঁপছিল দারুণ আক্রোশে এবং সংকুচিত ওষ্ঠাধরের ফাঁকে ফাঁকে দন্তের সারি ও মুখের চারপাশে স্ফীত রোমরাশি এক দৃশ্যের অবতারণা করছিল। সাহেবের মনে হল তর্জন-গর্জন আর আস্ফালনের জোরে এই তরুণ বাঘ প্রতিদ্বন্দ্বীকে ভয় পাইয়ে জয়লাভ করতে চায়।

কিন্তু বন্য যুদ্ধের রীতিনীতি সম্পর্কে সে যে নিতান্তই অজ্ঞ, সেকথা সহজেই বুঝতে পারলেন ইংলিস সাহেব। নিরীহ হরিণ অথবা দল থেকে ছিটকে পড়া গরু-মহিষের নিঃসঙ্গ যেসব বাচ্চা তার গর্জনে আতঙ্কে অভিভূত হয়ে পড়ে, সেইসব দুর্বল জীব নিয়ে এই ব্যাঘ্রযুবকের ধারণা জন্মেছে বটে, তার জননীকে অন্যান্য চতুস্পদ জন্তুর বিরুদ্ধে যুদ্ধে জয়লাভ করতে দেখেছে এই বাঘটি, সম্ভবত আজ সে মায়ের সাহায্য ছেড়ে নিজেই শিকার সংগ্রহ করতে সচেষ্ট হয়েছে—কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয় তার এই শিকার অভিযানে মূর্তিমান বিঘ্নের মতো এসে দাঁড়াল এক ধূসর বন্যবরাহ—যে জীবটি অরণ্যচারী কোনও শ্বাপদকেই পরোয়া করে না।
বাঘের হাবভাব দেখে বোঝা গেল তার সামনে 'রণং দেহি' মূর্তিতে রুখে দাঁড়াতে পারে এমন কোনও জীবের সাক্ষাৎ সে আগে কখনও পায়নি—সে যেন বেশ একটু অবাক হয়ে গেছে। অপর পক্ষে শূকরের চালচলনে ভয়ের লেশমাত্র ছিল না, তীব্র 'হু-হু' শব্দে ক্রোধ জানিয়ে সে সবেগে বাঘের দিকে খানিকটা এগিয়ে গেল। যুদ্ধের জন্য সে উদগ্রীব হয়ে উঠেছে।
বাঘ ভড়কে গিয়েছিল বটে, কিন্তু স্থানত্যাগ করতে রাজি হল না। শূকর ক্রমশ উগ্র হয়ে উঠতে লাগল, তার আচরণে বোঝা গেল বাঘকে সে এক অনাহূত আপদ বলে ধরে নিয়েছে। এই হতচ্ছাড়া পাজি, ঝগড়াটে জানোয়ারটাকে সে বুঝিয়ে দিতে চায় যে অপরের এলাকায় অনধিকার প্রবেশ করলে তার ফল হয় খুবই খারাপ।
বাঘ আর শুয়োরের মধ্যে আসন্ন দ্বন্দ্বযুদ্ধের সম্ভাবনা দেখে শিকারিরা এমন অভিভূত হয়ে পড়েছিলেন যে, হাতের বন্দুকের কথা তাঁদের মনেই ছিল না। পরিণাম অবশ্য ভালোই হয়েছিল বলতে হবে—কারণ, সামান্য নড়াচড়ার ফলেও যদি জন্তুদুটির মধ্যে কোনও একটির, অথবা দুটিরই দৃষ্টি আকৃষ্ট হত শিকারিদের দিকে এবং তার ফলে দুজনেই যদি পরস্পরের বিরুদ্ধে লড়াই না করে তৃতীয় পক্ষকে একসঙ্গে আক্রমণ করত, তাহলে শিকারিদের অবস্থা খুব সুবিধার হত বলে মনে হয় না।
যাই হোক, অরণ্যের রঙ্গমঞ্চে বন্য নাটক তখন জমজমাট, আলো-আঁধারির মধ্যে দৃষ্টিকে প্রাণপণে চালনা করে শিকারিরা ঘটনার পরিণতি লক্ষ করতে লাগলেন সাগ্রহে।
বাঘ তখন নীচু হয়ে গুঁড়ি মেরে শূকরের চারপাশে ঘুরছে, সঙ্গে সঙ্গে বাঘের দিকে মুখ রেখে ঘুরে যাচ্ছে শূকর—তার ছুরির মতো ধারালো দুই ভয়ংকর দাঁত সর্বদাই শত্রুর দিকে উদ্যত। ঘুরতে ঘুরতে দুই প্রতিদ্বন্দ্বীর দূরত্ব খুব কমে এল, তারা এসে পড়ল শিকারিদেরও খুব কাছাকাছি। বাঘ তখন চাপাগর্জনে দন্ত বিস্তার করে ক্রোধ জানাচ্ছে। সে এত নীচু হয়েছে যে, তার ছিপছিপে শরীর প্রায় মাটির সঙ্গে মিশে গেছে, অর্থাৎ সে লাফ দেবার জন্য প্রস্তুত হচ্ছে। আচম্বিতে চারদিকের স্তব্ধতা ভঙ্গ করে জাগল শ্বাপদের বজ্রনাদ, পরক্ষণেই জীবন্ত বিদ্যুতের মতো বাঘ ঝাঁপ দিল শত্রুর দিকে!
চোয়ালের ওপর থাবার প্রচণ্ড এক চপেটাঘাতে শূকরকে ধরাশায়ী করার উপক্রম করল বাঘ, কিন্তু মুহূর্তের মধ্যে নিজেকে সামলে কর্কশস্বরে ক্রোধ জানিয়ে প্রতি-আক্রমণ করল শূকর—বলিষ্ঠ ঘাড় ও মাথা সবেগে চালনা করে দুই ধারালো দাঁতের আঘাতে শত্রুর দেহকে করে তুলল রক্তাক্ত। বরাহের দন্তাঘাতে বাঘের ডোরার সংখ্যা কিছু বৃদ্ধি পেল—অবশ্য প্রকৃতিদত্ত ডোরার রং কালো আর শুয়োরের দাঁতে আঁকা ডোরাগুলো ছিল রক্তে রাঙানো টকটকে লাল!
দুই যোদ্ধার দেহ তখন ক্ষতবিক্ষত। এটা হল পয়লা কিস্তির লড়াই। লড়াই-এর ফল প্রায়, সমান সমান। বাঘ মেরেছে বটে, কিন্তু মার খেয়েছেও ভালোরকম।
তীক্ষ্ন নখরযুক্ত থাবার প্রচণ্ড থাপ্পড়ে শূকরের ললাট ও গণ্ডদেশ ছিন্নভিন্ন, একটা মাংসের টুকরো কপাল থেকে ছিঁড়ে এমনভাবে ঝুলছে যে শূকর প্রায় অন্ধ হয়ে পড়েছে।
অপর পক্ষে ডোরাদার বিড়ালটিও অক্ষত নয়। তার বুক আর ঘাড়ের ওপর শূকরের দন্তাঘাতে জেগে উঠেছে দু-তিনটি সুগভীর ক্ষতরেখা এবং সেই ক্ষত থেকে ঝরছে রক্তের ধারা। বাঘের সুদীর্ঘ লাঙ্গুলের ঘন ঘন আন্দোলন থেকে তার মনের ভাব বুঝতে পারছিলেন অভিজ্ঞ শিকারিরা—বাঘ যেন বলতে চায়, 'এই ঝামেলার মধ্যে না জড়ালেই ভালো ছিল।'
এইবার যুদ্ধ ঘোষণা করল বরাহ। ক্রুদ্ধকণ্ঠে চিৎকার করে সে সোজা ছুটে এল বাঘের দিকে। বাঘ সুকৌশলে শত্রুর মারাত্মক দাঁত দুটিকে এড়িয়ে পাশ কাটিয়ে গেল। তারপর বিড়াল যেভাবে ইঁদুরের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে, ঠিক সেইভাবে শূকরের পিঠে লাফিয়ে পড়ে তার ঘাড়ে দাঁত বসাল বাঘ এবং থাবার ধারালো নখগুলোর ব্যবহার করতে লাগল সজোরে ও সবেগে। দাঁত আর নখের আক্রমণে শূকরের কম্পিত দেহ থেকে ছিটকে পড়তে লাগল, খণ্ড-খণ্ড মাংসের রক্তাক্ত টুকরো। দ্বিতীয় কিস্তির লড়াইতে বাঘ জিতেছে সন্দেহাতীতভাবে।
আক্রমণের তীব্রতায় না আত্মরক্ষার কৌশলে কে জানে, বন্যশূকরটি সামনের দিকে হুমড়ি খেয়ে পড়ে গেল। এতে ফল হল আশ্চর্য। ঘাড়ের ওপর থেকে আক্রমণকারী বাঘের দেহটা এসে পড়ল শূকরের মাথা ডিঙিয়ে সামনের জমির উপর।
এইবার লড়াই-এর তৃতীয় কিস্তি। মরণাহত শুয়োরের শেষ আক্রমণ ছিল মারাত্মক। সামনের দুই পা দিয়ে বাঘের শরীরটা চেপে ধরে সে দুবার কি তিনবার সজোরে দন্তাঘাত করল। কিরীচের মতো দীর্ঘ ও তীক্ষ্ম দুই দাঁতের আঘাতে বিদীর্ণ হয়ে গেল বাঘের উদর। আক্রমণের চেষ্টায় আহত শূকরের জীবনীশক্তি নিঃশেষ হয়ে এসেছিল, টলতে টলতে সে শত্রুর পাশেই শুয়ে পড়ল—কিন্তু তার মুখটা বাঘের দিকেই ফেরানো ছিল এবং ওই অবস্থাতেই শুয়ে শুয়ে সে দাঁত কড়মড় করছিল সশব্দে!
দুই যোদ্ধার পরিস্থিতি তখন শোচনীয়। শূকরের কথা তো আগেই বলেছি, বাঘেরও তখন আর উঠে দাঁড়ানোর ক্ষমতা নেই। ইংলিস সাহেব বিবেচনা করলেন এইবার তৃতীয় পক্ষের হস্তক্ষেপ প্রয়োজন—বন্দুকের দুটি গুলিতে এই 'ডুয়েলে'-র দুই বীর যোদ্ধাকে মৃত্যুযাতনা থেকে মুক্তি দিলেন ইংলিস সাহেব।

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন