বাঘ শিকারের সেরা উপায়

নির্বেদ রায়

১৮৭৫ সালে দেশে ফিরলাম মাসকয়েকের জন্য। নয়-নয় করে বারোটা বছর নীলের চাষ আর ব্যবসার তদারকি করে কাটিয়ে এসেছি ভারতে।

দেশে ফিরে লোকজনের সঙ্গে, পাড়া-প্রতিবেশীর সঙ্গে কথা বলে দেখলাম যে অনেকগুলো দিন যেমন মাঝখানে কেটে গেছে তেমনই যে দেশে এই বারো বছর আমি কাটিয়ে এসেছি সেই দেশ সম্পর্কে কোনও ঠিকঠাক ধারণা শুধু আমার ছোট শহর নয়, গোটা স্কটল্যান্ড বা ইংল্যান্ডের মানুষের ভিতরেও গড়ে ওঠেনি। দেশটার শাসনভার নিলেও, ব্রিটেনের প্রধান উপনিবেশ হলেও সাধারণ ইংরেজ বা স্কট নাগরিকের কাছে ভারত এখনও রহস্যের, রূপকথার দেশ। অদ্ভুত আর বিচিত্র সব ধারণা ঘিরে আছে তাদের।

তখনই মনে হল, নীলকরের অভিজ্ঞতা থেকে একটা বিবরণ লেখার চেষ্টা করা যেতে পারে। নেহাত অভিজ্ঞতার সংকলন—আমি রাজনীতির লোক নই, সমাজবিজ্ঞানী অথবা নৃতত্ত্বের পণ্ডিত নই; সোজাসাপটা প্রতিদিনের কথাবার্তা তুলে ধরব, এ ছাড়া কিছু নয়।

ভারতবর্ষের এক জনপদে বা মফস্বলে একজন নীলকরের প্রতিদিনের জীবন, নীলচাষ আর সে ব্যবসায় কতরকমের বৈচিত্র্য, মানুষজন—আর যতটুকু জেনেছি তাদের আচার-ব্যবহার, রীতিনীতি; আর সবচেয়ে রোমাঞ্চ মিশে আছে আমাদের যে অবসর সময়কে ঘিরে—খেলাধুলো, পিকনিক, বন-জঙ্গলে নতুন নতুন গাছ আর জীব-জন্তু, পাখি-পতঙ্গ খুঁজে পাওয়ার আনন্দ আর...শিকার!

তবে শিকার সবসময় ঠিক খেলার আনন্দে করা হয় না, অনেক সময় উপনিবেশের শাসন অথবা ব্যবসার খাতিরে করতে হয় বাধ্য হয়ে, প্রজা বা চাষিদের ভরসা দিতে—তেমন আবার কখনও শিকারী পরিণত হয়ে যায় শিকারে; তার সম্ভাবনা মাঝেমধ্যেই প্রবল হয়ে ওঠে। ভুললে চলবে না, ভারতের অরণ্যভূমি বিচিত্র জীবজন্তুর চারণভূমিও বটে। তবে এই রোমাঞ্চকর জীবনের সবচেয়ে বিপজ্জনক অভিজ্ঞতার নাম—বাঘ! আরও ভয়ংকর যখন সে বাঘ মানুষখেকো হয়ে ওঠে। পৃথিবীর সবচেয়ে ধূর্ত, হিংস্র আর কঠিন প্রতিদ্বন্দ্বী একজন শিকারীর কাছে—নরখাদক বাঘ!

আমার এই অভিজ্ঞতা পাঠকের কাছে তুলে ধরার জন্য 'স্পোর্ট এন্ড ওয়ার্ক ইন নেপাল ফ্রন্টিয়ার' বইটি লেখায় উদ্যোগী হয়েছিলাম।

রথ দেখা আর কলা বেচা একসঙ্গে হবে। বন্ধুরা ভারত সম্পর্কে কিছু সঠিক তথ্য জানতে পারবেন, তেমন আমার কিছু বিরল অভিজ্ঞতার কথাও লিপিবদ্ধ থেকে যাবে। বইটদ্ধ সাড়া পেল আশাতীতভাবে।

আমার জীবনের ভাগ্যবিধাতা যেমন এক কিশোরকে ছুটিয়ে নিয়ে গিয়েছিল পৃথিবীর একপ্রান্ত থেকে অন্যপ্রান্তে—স্কটল্যান্ড, ইংল্যান্ড হয়ে নিউজিল্যান্ডে—আবার নিউজিল্যান্ড থেকে কলকাতা শহরে, সেখান থেকে বিহারে কুশীনদের পাড়ে, অযোধ্যায়, নেপাল সীমান্তে...তারপর আবার দেশে ফিরে এই বিবরণ লেখা।

কিন্তু এখানেই কি ইতি টানা গেল? জানলে এই বইয়ের ভূমিকায় নিশ্চয়ই লেখা হত না যে আমি রাজনীতির লোক নই...ভাগ্যদেবী মৃদু হেসেছিলেন!

নইলে 'গোল্ডরাশ', নীলের চাষ, শিকারি জীবন নিয়ে জীবন কাটানো একজন মানুষ বড়জোর ভারতবর্ষের ভাগলপুরে দুর্ভিক্ষ সামলাতে 'ফেমিন কমিশনার' হতে পারে; কিন্তু তাই বলে একেবারে অস্ট্রেলিয়ার শিক্ষামন্ত্রী! তার সঙ্গে চা-এর ব্যবসা!

চা-এর ব্যবসায় যোগ দেওয়ার কথা প্রথম বলেছিল আমার ভাই আলেকজান্ডার। নিউজিল্যান্ড থেকে ভারতে আসার প্রথম ডাক এসেছিল তার কাছ থেকে। তখন আলেকজান্ডার কলকাতায় জাঁকিয়ে বসে চা-ব্যবসা করছে। কলকাতার জমকালো পরিবেশ আমাকে মুগ্ধ করেছিল, কিন্তু ব্রিটিশ ভারতের রাজধানী, পৃথিবীর অন্যতম সেরা শহরের কোলাহল, শৌর্য আর ব্যস্ততা আমাকে দিশাহারা করে দিয়েছিল। অন্য জীবনের খোঁজে সেদিন আমার গন্তব্য ছিল কুশীনদীর পাড়ে নীলচাষের বিস্তৃত অঞ্চল। অরণ্য, গ্রাম, প্রকৃতির বিপুল বিস্তার। আমার প্রিয় পরিবেশ।

সেই চা-র ব্যবসা ফিরে এল পনেরো বছর বাদে। আমি তখন অস্ট্রেলিয়ার নাগরিক।

ব্যবসা আর রাজনীতির ব্যস্ততা কিন্তু 'আমার ভারতবর্ষকে' ভোলাতে পারেনি। তাই তারই ফাঁকে লিখে ফেলেছি 'টেন্টলাইফ ইন টাইগারল্যান্ড'। প্রথম বই-এর দ্বিতীয় ভাগ 'নেপাল ফ্রন্টিয়ার' আর 'টেন্টলাইফ' দুটো একসঙ্গে মিলেই সম্পূর্ণ এই পর্ব। প্রথম বই প্রকাশিত হয়েছিল ১৮৭৮ সালে, দ্বিতীয় খণ্ড প্রকাশ পেল তার প্রায় ১৪ বছর বাদে, ১৮৯২-তে।'

জেমস ইংলিসের বয়ান থেকে আমরা এই বিবরণ পাই; এই অংশ গুরুত্বপূর্ণ কারণ, জেমস ইংলিস মানুষটার বৈচিত্র্যময় জীবনের খানিকটা আভাস এই সংক্ষিপ্ত বর্ণনায় যেমন আমরা খুঁজে পাই; তেমনই সমসাময়িক ভারতের চেহারা-চরিত্র আর ইংলন্ডের সাধারণ মানুষের এই দেশ সম্পর্কে ধ্যান-ধারণা ঠিক কীরকম ছিল সেটুকুও বুঝতে অসুবিধা হয় না।

কিন্তু উনিশ শতকের দ্বিতীয় ভাগের সমাজচিত্র, সাহেবদের জীবনযাত্রার বর্ণনার চেয়ে অনেক জায়গায় প্রধান হয়ে উঠেছে শিকারের রোমহর্ষক বিবরণ। অথচ সময়টা নীলবিদ্রোহের কাছাকাছি সময়, বছর তিন-চারেক আগেই বিদ্রোহের আগুন ছড়িয়েছে বাংলা জুড়ে। তবু ওই নীলের ব্যবসাতেই মন দিয়েছেন সাহেব, শুধু বাংলায় নয় বিহারে—আরও পরিষ্কার করে বলতে গেলে উত্তর-বিহারে।

অ্যাডভেঞ্চার-প্রিয় জেমস ইংলিসের লেখায় শিকার গুরুত্ব পেয়েছে বটে, কিন্তু বাঘ গুরুত্ব পেয়েছে সব থেকে বেশি।

বাঘের বসতি কোথায় কোথায় আছে ভারতবর্ষে, এই রাজকীয় শ্বাপদটির আচার-ব্যবহার আর চলাফেরা ইত্যাদি প্রায় সবকিছু নিয়ে তার অভিজ্ঞতা অনুযায়ী আলোচনা করেছেন জেমস ইংলিস এই বিবরণে—

উত্তর-বাংলার তরাই-এর জঙ্গলে তখন বাঘের ঘনবসতি বলা যেতে পারে, উনিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে ভারত কার্যত 'বাঘের দেশ'। এমনকী জনাকীর্ণ তিরহূতেও বাঘের দেখা মিলেছে জেমসের। অযোধ্যা আর গোরখপুরের জঙ্গলের সীমানা ঘেঁষে বেতিয়ার আশেপাশে বাঘ বেশ ভালো সংখ্যায় ঘোরাফেরা করছে তখন। বাঘ শিকার করেছেন জেমস ওই অঞ্চলে।

উত্তর ভাগলপুর আর পূর্ণিয়া তখন বাঘের ঘরবাড়ি বললেই হয়। জঙ্গলে ঢুকলেই তার সঙ্গে মুখোমুখি দেখা হওয়ার সম্ভাবনা ছিল প্রবল। মাঝেমধ্যে দেখাশোনা করতে 'মহারাজ' চলে আসতেন গ্রামের মহল্লায়।

এ ছাড়া দক্ষিণ ভারতে আর বোম্বাইতে প্রচুর বাঘ ছিল তখন। সুন্দরবন তো চিরকালই বেঙ্গল টাইগারের প্রিয় বাসভূমি।

জেমস এখানে একটা দামি পরামর্শ দিয়েছেন। সুন্দরবন প্রসঙ্গ আসতে তিনি বলেছেন যে এই অঞ্চলটায় এবং আর কিছু অঞ্চলে বাঘ শিকারের প্রথা হল পায়ে হেঁটে শিকার করা। জেমস এইভাবে বাঘের খোঁজে যাওয়ার প্রবল বিরোধী। হয় হাতির পিঠে, নেহাত হাতি না পাওয়া গেলে গাছের ওপর মাচান বেঁধে শিকারের পরামর্শ দিয়েছেন তিনি। তাঁর মতে, পৃথিবীর সেরা বন্দুকবাজও বাঘের মতো ধূর্ত, হিংস্র, ফন্দিবাজ আর শক্তিশালী শত্রুর বিরুদ্ধে কোনও যোগ্য প্রতিদ্বন্দ্বী নয়। এভাবে বাঘ শিকার করার বেশ কিছু ঘটনা খুঁজলে পাওয়া যাবে ঠিকই, কিন্তু জেমসের মতে এই পদ্ধতিতে শিকারির প্রাণ খোয়ানোর সম্ভাবনা প্রচুর, ঘটেছেও তাই। প্রতিবছর অনেক ঘটনার খবর নথিবদ্ধ হচ্ছে—আসলে নিজের পরিচিত আর চেনা অরণ্যে বাঘ খুব ভয়ংকর জানোয়ার।

আমরা আবার ফিরে যাব জেমস ইংলিসের জবানিতে—

'অযোধ্যার শালজঙ্গল। আকাশছোঁয়া শাল আর লতাগুল্মের বেড়াজাল পেরিয়ে 'নারকুলের' বন। বাঘের খোঁজে আমার গন্তব্য এখন এই জঙ্গল। সঙ্গী আরও দুজন—আমার প্রিয় বন্ধু 'জেনারেল' আর তুলনায় অল্পবয়সি ফুলারটন। বলে রাখা ভালো যে জেনারেল কোনও সৈন্যবাহিনীর প্রধান সেনাপতি নন, বন্ধুদের দেওয়া আদরের নাম 'জেনারেল'। ওই নামেই তাকে ডাকা হয়, ওই নামেই সে পরিচিত। আমিও জেনারেল বলেই ডাকব এই বিবরণে।

জেনারেল নীলের ব্যাপারী, আমারই মতো। আমাদের দুজনের জমি একেবারে পাশাপাশি, সেখানে নীলচাষ হয়ে থাকে। মাঝখানে, একটা সরু জলের ধারা আমাদের জমির সীমা বেঁধে দিয়েছে। মাঝে নদী, দুপাশে নীলের চাষ। একদিকে আমার, ওদিকে জেনারেল।

নারকুল সোঁদা জমির গাছ, লম্বা ছাতার মতো। ফলে নীচে ছায়া দেয়। হাতি পছন্দ করে খাদ্য হিসাবে এই গাছ, কিন্তু বুনো মোষ, বুনো শুয়োর, নেকড়ে এমনকী বাঘেরও প্রিয় এই নারকুল বন আত্মগোপনের সুবিধা দেয় বলে।

সেবার আমাদের শিকার অভিযানে সাকুল্যে একটা মাত্র হাতি। ফুলারটন জন্তুটাকে জোগাড় করেছে স্থানীয় এক জমিদার 'বাবু'-র কাছ থেকে। সাহেবকে খুশি করতে সে হাতি পাঠিয়েছিল বটে, কিন্তু শিকার দলের দক্ষ হাতি এটা নয়। ফলে ওর হাওদায় স্থানীয় 'বিটার' জনাকয় চাপিয়ে, তাদের হাতে বেশ কয়েকটা 'বোমা' দিয়ে দেওয়া হল। এই 'বোমা'-গুলো পলতেয় আগুন লাগিয়ে ছুঁড়তে হয়। বিকট শব্দ আর প্রচুর ধোঁয়ায় বাঘ কিংবা অন্য জীবজন্তুর পক্ষে চুপচাপ আত্মগোপন করে থাকা খুব কঠিন হয়ে পড়ে। স্থানীয় লোকজন এগুলো তৈরি করে।

হাতি সেই সব 'বোম স্কোয়াড' পিঠে নিয়ে এগোল। আমি, জেনারেল আর ফুলারটন বন্দুক হাতে জঙ্গল ভেঙে এগোলাম পায়ে হেঁটে।

খবর ঠিকই ছিল যে ওই নারকুলের জঙ্গলে বাঘিনী তার বাচ্চা নিয়ে আস্তানা গেড়েছে। বাচ্চাটাও একেবারে দুধের শিশু নয়, বেশ বড়সড় হয়ে উঠেছে।

এ ছাড়া আমাদের সঙ্গে ছিল প্রায় শ'খানেক 'বিটার'। টমটম, কাঁসর-ঘণ্টা, ক্যানেস্তারা সবকিছু নিয়ে।

জঙ্গল ঘিরে বিট শুরু হওয়ার আগে সবাইকে নিজের নিজের জায়গা বেছে নিতে হবে। খাঁড়ির মতো সরু নদীর পাড় ঘেঁষে জায়গা নিল ফুলারটন। যদি বিটারদের চিৎকার চেঁচামেচি আর ঢাক-ঢোল, কাঁসর-ক্যানেস্তারার গগনভেদী আওয়াজে আড়াল ছাড়তে বাধ্য হয়ে বাঘিনী আর বাচ্চা নদী পেরিয়ে অন্য জমিতে চলে যেতে চায়, তাহলে ফুলারটন তার আওতার মধ্যে পেয়ে যাবে ওই দুটোকে। জেনারেলের সঙ্গে যে স্থানীয় শিকারিটি ছিল সে জায়গা নিল ওই বিটার দলটার ঠিক পিছনে। যদি বাঘিনী দলটাকে আক্রমণ করে আর বিটারদের তৈরি মানুষের পাঁচিল ভেঙে বেরিয়ে যেতে চায়, তাহলে সে সামলাবে। আমার গোমস্তা ছেলেটিও পাকা শিকারি। আমি, জেনারেল আর সেই ছেলেটি দাঁড়ালাম জঙ্গলের সামনের দিকে খানিকটা ফাঁকা জায়গা রেখে। জঙ্গল তাড়ুয়াদের তাড়া খেয়ে নারকুলের জঙ্গল থেকে সোজা বেরিয়ে এলে একেবারে আমাদের মুখোমুখি পড়বে বাঘিনী অথবা বাঘের বাচ্চা।

সামনে একটা মোটা গাছের ডাল ভেঙে পড়ে আছে—রাইফেল তার ওপর রেখে গুলি ছুড়লে তাক ভালো হবে। সেভাবে আমি জায়গা বেছেছি। ওরা দুজনও পছন্দমতো জায়গা বেছে নিয়েছে।

এইখানে একটা কথা বলে রাখা ভালো। মাটিতে দাঁড়িয়ে এই বাঘ শিকারের চেষ্টা আমার একেবারেই পছন্দ ছিল না। প্রতিমুহূর্তে আমি 'জোরোক্স'-এর কথা ভাবছিলাম। 'জোরোক্স' আমার প্রিয় হাতি, অভিজ্ঞ ঠান্ডা মাথার জানোয়ার। গোরখপুরে ওর পিঠে সওয়ারি হয়ে অনেক শিকারের স্মৃতি আছে আমার। কখনও বিপদের মুখে পড়েছি বলে মনে হয়নি। এখন এই মাটিতে হেঁটে বাঘ শিকার করার সময় যেটা মনে হচ্ছে। সঙ্গে একটা 'কুকরি' ছিল। সেটা খাপ থেকে খুলে নিয়ে হাতে রাখাই ঠিক বলে মনে হল। যদিও জানি যে বাঘের আক্রমণ সামলাতে ওই 'কুকরি' কতটুকু কাজে লাগতে পারে? তবু মনকে প্রবোধ দেওয়া আর কি? এদেশের জলে-জঙ্গলে বেশ কিছুদিন কাটিয়ে আর বেশ কয়েকবার বাঘের মুখোমুখি হয়ে আমার ওই জন্তুটা সম্পর্কে সম্যক ধারণা তৈরি হয়েছিল।

জেনারেল জোরে হুইসল বাজিয়ে সংকেত পাঠাতেই জঙ্গল ঘিরে 'বিট' শুরু হল। প্রচণ্ড আওয়াজ আর বিটারদের চিৎকার মিলে এক পলকে জঙ্গলের শান্ত পরিবেশ পালটে গেল কোলাহলে। ক্যানেস্তারা, ঢোলের আওয়াজ আর তারস্বরে ওই চেঁচামেচি করতে করতে জঙ্গল-তাড়ুয়ার দল ক্রমে এগোতে লাগল নারকুল ঝোপের ঠিক সেই অংশটার দিকে যেখানে বাঘ আছে বলে আগেই খবর দিয়েছে স্থানীয় মানুষজন।

আমরা বন্দুক তুলে প্রস্তুত হলাম। কিন্তু বাঘের দেখা নেই। বিটারদের হই-হট্টগোলের ফাঁদে পা দিয়ে কিংবা ওই চিৎকার-চেঁচামেচিতে ভয় পেয়ে আড়াল ছেড়ে বেরোবার পাত্র সে নয়। এটা বেশ বোঝা গেল।

উপায় না দেখে এবার হাতির পিঠে বসে থাকা লোকজন আগুন ধরিয়ে বোমা ছুড়তে শুরু করল ওই নারকুল ঝোপের আশেপাশে। প্রচণ্ড 'বোমা' ফাটার আওয়াজে আর ধোঁয়ায় চারদিক ভরে যাওয়ার ফলে এবার বাঘের ধৈর্যের বাঁধ ভাঙল।

প্রচণ্ড গর্জনে কেঁপে উঠল বন। গর্জনের আওয়াজ আর হিংস্রতা ঠিক এতটাই ছিল যে হাতি ভয় পেয়ে লেজ গুটিয়ে পিছনে সরে এল—আগেই বলেছি যে এই হাতি, বাঘ শিকারের দলে জায়গা নেওয়ার জন্য যে পরিমাণ অভিজ্ঞতা আর সাহসের প্রয়োজন, সেই গোত্রের হাতি নয়। ফলে গর্জনের ধাক্কা সে নিতে পারেনি। কিন্তু তার ফল হল মারাত্মক। হাতিকে পালাতে দেখে 'বিটার' দলের লোকজনও ভীষণ ভয় পেয়ে পালাতে শুরু করল। চার-পাঁচজনের ছোট ছোট দল পালিয়ে আসতে লাগল জঙ্গল ছেড়ে ফাঁকা জমিতে।

একজন লোক জোরে দৌড়ে এসে সামনের আর একটা লোকের সঙ্গে ধাক্কা খেল, আর সামনের সেই লোকটা নির্ঘাত ভেবে বসল যে বাঘ তার উপরেই লাফ দিয়ে এসে পড়েছে, দিগ্বিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে সে দৌড়োল দ্বিগুণ জোরে। এইরকম গোলমেলে পরিস্থিতিতেও লোকটার পালানোর ভঙ্গি দেখে আমি বা জেনারেল কেউই ঘটনার গুরুত্ব অনুযায়ী আচরণ করিনি এটাও ঠিক। দুজনেই হো-হো করে হেসে উঠেছি। কিন্তু ফল তাতে খারাপ হল না, উলটে ভালোই হল। হাসির শব্দে লোকটার সম্বিত ফিরে এল। সে থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল। সে বুঝল, বিপদ আর যাই হোক বাঘ অন্তত তার ঘাড়ে এসে পড়েনি। হাঁফ ছেড়ে বাঁচল বলেই মনে হল তাকে দেখে।

এই পর্ব-চুকলো বটে, কিন্তু গভীর হতাশা নিয়েই ফিরলাম আমরা। ফিরল গোটা দল।

তার মধ্যেই আর একটা ঘটনা ঘটে গেল। হাতি একদিকে, গোটা দল চারদিকে ছড়িয়ে গেছে বিপর্যস্ত হয়ে। ফুলারটন বয়সে তরুণ, শুধু বাঘের গর্জনের ভয়ে এতগুলো লোক-লশকর আর অতবড় জন্তুটা রণে ভঙ্গ দিয়ে পালাচ্ছে, এটা সম্ভবত তার সম্মানের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছিল। দৌড়ে হাতির কাছে গিয়ে সে হাওদার ওপর উঠে বসল। হাওদার ওপর থেকে জঙ্গলের অনেকটা দূর পর্যন্ত দেখা যায়, সেখানে বাঘ লুকিয়ে আছে বলে জানা গেছে সেই ঝোপটাও চোখে পড়ে। বাঘের চিহ্নমাত্র চোখে দেখা গেল না বটে, কিন্তু গভীর বিরক্তির চাপা গর্জন ভেসে আসছিল ওইখান থেকে। ওদিকে হাতি তো আর দাঁড়িয়ে নেই, সে ছুটছে পিছনদিকে। বিরক্ত ফুলারটন খানিকটা মরীয়া হয়েই গুলি চালাল ঝোপ লক্ষ্য করে। পরপর দুবার। কোনও প্রত্যুত্তর এল না। বোঝা গেল গুলি লক্ষ্যভেদ করেনি। কিন্তু গুলির শব্দে চমকে উঠে হাতির গতি আরও বেড়ে গেল। ফুলারটন ভাগ্যিস লক্ষ করেছিল, নাহলে তার মৃত্যু ছিল নিশ্চিত। হাতি তার পুরো শক্তিতে দৌড়োচ্ছে। হাওদার উপরে বসে ফুলারটন হঠাৎ খেয়াল করল যে বিদ্যুৎগতিতে একটা মোটা গাছের ডাল তার দিকে ধেয়ে আসছে। একমুহূর্তে কর্তব্য স্থির করে হাওদার দড়ি ধরে হাতির পিঠের একপাশে ঝুলে পড়ল সে, ডাল হাওদা ছুঁয়ে চলে গেল পলকের মধ্যে। সময়ের একটু হেরফের হলে ফুলারটনের মাথা দু-ফাঁক হয়ে যেত মুহূর্তের মধ্যে।

বাঘের সগর্জন তেড়ে আসার শব্দ তখনও ভেসে আসছে বটে, কিন্তু আশ্চর্য, একবারের জন্যও বাঘ তার আড়াল ছেড়ে প্রকাশ্যে আসেনি। এরমধ্যে স্থানীয় লোকজনের কাছে খোঁজ পাওয়া গেছে যে ঝোপে বাঘ নয়, এক বড়সড় বাঘিনী আস্তানা গেড়েছে। আর একা নয়, সঙ্গে তার বাচ্চাও আছে। বাচ্চাটিও দুধের বাচ্চা নয়, বেশ বড়সড় হয়ে উঠেছে। ফলে কার্যত পুরো দুটো বাঘ না হলেও প্রায় দেড়খানা পূর্ণবয়সের বাঘের মুখোমুখি হতে হবে আমাদের। অনেক কেটেছেঁটে তবেই এই বিবরণ পাওয়া গেল। মোটামুটি বিশ্বাসযোগ্য বিবরণ বলা যেতে পারে। পরে অবশ্য দেখেছি যে সম্পূর্ণ সত্যি ছিল এই বর্ণনা। আমাদের দোষ নেই, কারণ প্রায় হাতির চেয়েও বড়, জ্বলন্ত ভাঁটির মতো হাঁ আর সূর্যের চেয়ে তীব্র দুটো চোখের মালিক ওই বাঘিনীর বিবরণও ইতিমধ্যে আমাদের শুনতে হয়েছে। ফলে বর্ণনা-বিবরণে কাটছাঁট না করে উপায় ছিল না।

হতাশ হয়ে ফিরতে কারও ইচ্ছা করে না। আমাদেরও ভালো লাগছিল না। তবে একটা কথা পরিষ্কার হয়ে গিয়েছিল যে নেহাত কপালজোর না থাকলে মাত্র একটা হাতির সাহায্যে কোনও বাঘকে তার আড়াল থেকে টেনে বার করে শিকার করা অসম্ভব। ফেরার পথে তাই গোটা দলটাকে একটু গুছিয়ে নিয়ে দু-চারটে বুনো শুয়োর আর হরিণ-শিকার করা হল। দুপুরের খাওয়ার জন্যও বটে। ঘণ্টা চার পরে তাঁবুতে বনভোজন সেরে আবার একবার চেষ্টা করে দেখব বলে ভাবলাম। এবার 'বিটার' দের দু-গুণ টাকা দিয়ে রাজি করাতে হল।

বিট শুরু হল। কিন্তু ঝোপ থেকে কোনও সাড়াশব্দ নেই। ঢাক-ঢোল, কাঁসর-ঘণ্টা বাজিয়ে চিৎকার করতে করতে 'বিটার' দলটা ঝোপের অনেকটা কাছে পৌঁছে গেল। ঝোপের আড়াল থেকে কোনও প্রতিবাদের শব্দ না আসার ফলে মানুষ এবং হাতি দু-পক্ষই এবার খানিকটা সাহস করে এগোতে শুরু করল। প্রায় ত্রিশ গজের মধ্যে জঙ্গল-তাড়ুয়ার দল পৌঁছে গেছে—ঠিক তখনই জঙ্গল কাঁপিয়ে হুঙ্কার দিল বাঘিনী। হিংস্র, রক্তজলকরা সেই গর্জনের ফল হল আগের মতোই। হাতি ঘুরে পালাল, বিটারদের গোটা দল ছত্রভঙ্গ।

এই হট্টগোলের মাঝখানে আমার সামনে একটা বিরাট বুনো শুয়োর ছুটে এসে পড়ল। আমার 'এক্সপ্রেস' রাইফেল তাকে মাটিতে শুইয়ে দিল, সঙ্গের আর একটা দাঁতাল শূয়োরও বাদ গেল না।

আর ঠিক তখনই জেনারেল চেঁচিয়ে উঠল—'ওই যে, ওই যে বাঘ!'

তাকিয়ে দেখলাম ঝোপের মধ্যে থেকে বেরিয়ে আসছে একটা অল্পবয়সি বাঘ।

বিরক্তি আর রাগ তার চেহারায় স্পষ্ট। ঠোঁটের ফাঁকে মাঝে মাঝে দেখা দিচ্ছে ঝকঝকে দাঁতের সারি, অবরুদ্ধ গলার গর্জনধ্বনি শোনা যাচ্ছে সেইসঙ্গে, লেজ-এর প্রান্ত শক্ত লাঠির মতো নড়াচড়া করছে।

বহুক্ষণের প্রতীক্ষা শেষ হল। জেনারেলের গুলির নিখুঁত লক্ষ্য। একটা ডিগবাজি খেয়ে মাটিতে পড়ে গেল বাঘ। আমরা হাততালি দিয়ে উঠলাম বটে, কিন্তু মন খুলে নয়।

সমস্যা হল, বাঘের কাছে কেউ যেতে রাজি নয়। না মানুষ, না হাতি। এক পা এগোলেই ভয়ংকর হিংস্র গর্জনে তাড়া করে আসছে বাঘিনী। কিন্তু জন্তুটা অসম্ভব ধূর্ত। এমনকী সন্তান মারা যাওয়ার পরও ঝোপের আড়াল ছাড়ল না রাগে জ্ঞানশূন্য হয়ে। ফলে তখনই আর মৃত বাঘশাবকের দেহ সংগ্রহ করা হল না। ফিরতে হল আমাদের।

দুদিন বাদে অনেক কষ্টে পাঁচটা হাতি জোগাড় করে আবার ওই নারকুলের বনে বাঘিনীর খোঁজে পৌঁছোলাম আমরা। সাহসী আর অভিজ্ঞ হাতি ছাড়া এই বাঘিনীকে ঝোপের বাইরে বের করা যাবে না, এ ব্যাপারে আমরা তখন নিশ্চিত। আর সে কাজও এক-আধটা হাতি দিয়ে হবে না।

কিন্তু ঠিক এই সময়ে হাতি পাওয়া খুব কঠিন হয়ে পড়েছিল। কারণ প্রিন্স অব ওয়েলস তখন নেপালে শিকারে ব্যস্ত। আমাদের বর্তমান আস্তানা থেকে সামান্য দূরত্বে তাঁর শিকারের জন্য তাঁবু ফেলা হয়েছে। সে এক এলাহি বন্দোবস্ত আর তাঁকে খুশি করার জন্য এই অঞ্চলের সমস্ত রাজা, জমিদার কি সম্পন্ন ব্যবসায়ীদের সেরা হাতিগুলোকে পাঠানো হয়েছে তাঁর সেই শিকারের আয়োজনে।

আর একটা বড় ব্যাপারও ছিল। শিকারের পর প্রিন্স অব ওয়েলস যাবেন দিল্লি দরবার করতে। সেখানেও যোগ দিতে রওনা হয়ে গেছে দলে দলে সুসজ্জিত হাতি। চারদিকে সাজো-সাজো রব। ফলে ওই পাঁচটা হাতি জোগাড় করতে অনেক কাঠ-খড় পোড়াতে হয়েছে বই কী!

বিস্তারিত করে লাভ নেই, দুদিন পরে হাতি আর দলবল নিয়ে অকুস্থলে পৌঁছে বাঘটার মৃতদেহ উদ্ধার করা হল।

উজ্জ্বল, অপূর্ব দেহচর্মের মালিক বাঘটার দৈর্ঘ্য—ছ'ফুট তিন ইঞ্চি! কিন্তু বাঘিনীর দেখা মিলল না। অনেক খোঁজখুজির পর নিশ্চিত হওয়া গেল যে বাঘিনী আর এই অঞ্চলে নেই, সে এলাকা ছেড়ে দিয়ে চলে গেছে। ফলে আরও কিছু বুনো শুয়োর, হরিণ, একটা কুমির আর একটা নীলগাই শিকার করে আমাদের সন্তুষ্ট হতে হল। তবে, বাঘিনীর খোঁজে তন্নতন্ন করে জঙ্গল ঘেঁটে বুঝলাম যে আগের দিন আমাদের চোখের আড়ালে বেশ কয়েকবার বাঘিনী 'বিটার' এমনকী 'শিকারি'-দের ধারেকাছে চলে এসেছিল। একা পেলে আক্রমণ করতে দ্বিধা করত না, আমাদের ভাগ্য ভালো যে সদলবলে থাকার কারণেই বোধ করি তার আক্রমণের হাত থেকে রক্ষা পেয়ে গেছি। অথচ গোটা ঘটনা ঘটে গেছে আমাদের তথাকথিত 'সতর্ক' দৃষ্টির আড়ালে, কিছুই বুঝতে পারেনি কেউ।

তখন থেকে আমি হাওদা বা মাচায় বসে শিকার করা পছন্দ করি। অন্তত বাঘ শিকার।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%