নির্বেদ রায়
বাঘকে বিশ্বাস নেই।
বহু বছরের অভিজ্ঞতায় এই সারকথা বুঝেছিলেন জেমস ইংলিস।
উনিশ শতকের ভারতবর্ষ—
ঠিকঠাক বলতে গেলে ১৮৬৬ সালে ভারতে আসেন জেমস। জন্ম স্কটল্যান্ডের সম্পন্ন গ্রাম এডজেল-এর ধর্মযাজকের পরিবারে কিন্তু স্কুল-কলেজ আর বিশ্ববিদ্যালয়ের গণ্ডি পেরোতে না পেরোতেই ঘর ছেড়ে বেরিয়ে পড়লেন তিনি। মাত্র উনিশ বছর বয়সে এসে পৌঁছলেন নিউজিল্যান্ডের বন্দর শহর টিমারুতে—প্রশান্ত মহাসমুদ্রের পাড়ে। ১৮৪৫ সালের ২৪ নভেম্বর জন্ম-তারিখ হলে জেমস নিউজিল্যান্ড পৌঁছেচেন ১৮৬৪ কি ১৮৬৫ নাগাদ—পশ্চিমপাড় জুড়ে ওই টিহমারু বা টিমারু গ্রামের কাছাকাছি সোনার খোঁজে ছুটছে তখন ভাগ্যান্বেষীর দল। কিশোর জেমস সেই দুর্নিবার অ্যাডভেঞ্চারের টান এড়াতে পারেননি স্বাভাবিকভাবেই। যোগ দেন সেই 'গোল্ডরাশ'-এর অভিযানে।
তার মাত্র বছরখানেকের মধ্যেই ভারতে আসেন জেমস ইংলিস। ভাই আলেকজান্ডার তখন কলকাতার প্রতিষ্ঠিত চা-ব্যবসায়ী। তাঁর ডাকেই কলকাতা আসেন জেমস ১৮৬৬ সালে।
কিন্তু ঝকঝকে বাণিজ্যকেন্দ্র ও ব্রিটিশ ভারতের রাজধানী কলকাতা পছন্দ হল না জেমসের, তিনি গিয়ে ঘাঁটি গাড়লেন বিহারের কুশীনগরে। কুশীনগরের নাম দেওয়া হয়েছে গঙ্গার শাখানদী কুশীনদ থেকেই—যে কুশী ভাগ করেছে ভাগলপুর আর পূর্ণিয়া দুই জেলাকে।
কুশীনদীর দুই তীর জুড়ে তখন অরণ্য বেশ গভীর, সেখানে হাতিঘাসের বা অ্যালিফেন্ট গ্রাসের মাথা-ছোঁয়া দুর্ভেদ্য জঙ্গলে ঘুরে বেড়ায় প্রচুর সম্বর হরিণ, প্রায় ঘোড়ার মতো আকারের; আর সুন্দর চিতল হরিণের দল। হরিণ বংশের আরও সদস্য হগ-ডিয়ার কি সোয়াম্প-ডিয়ারের দেখা মেলে মাঝেমধ্যেই। ঘুরে বেড়ায় মেঘের মতো কালো প্রকাণ্ড বুনো মোষ আর দুর্দান্ত দাঁতাল বুনো শুয়োর। দুই ভয়ংকর তৃণভোজী ছাড়া তখন এই অঞ্চলে ঘুরে বেড়ায় বিপুলবপু গণ্ডার।
ভোর আর সন্ধ্যার আকাশ জুড়ে উড়ে বেড়াত অসংখ্য রংবেরঙের পাখির ঝাঁক, সমস্ত নদীর পাড় আর বন ভরে উঠত তাদের রং-এর উজ্জ্বল ছটায় আর কলকাকলিতে।
ঝোপঝাড়ের আড়ালে আড়ালে হানা দিয়ে ফিরত হায়না আর নেকড়ের দল। আর ছিল বনের রাজা—বাঘ।
উনিশ শতকের কুশীনগর এককথায় শিকারির স্বর্গ। জেমস ইংলিসের মতো তরুণ, বেপরোয়া মন এখানে তীব্র আকর্ষণ বোধ করবে তাতে আর আশ্চর্যের কি?
গত ছ-সাত বছরে 'নীলবিদ্রোহের' আগুন কমে এসেছে; বিহারে এসে নীলের ব্যবসাতেই যোগ দিলেন জেমস।
প্রতি বছর মার্চ মাসে উঁচু জমি আর সমতলে নীলচাষের বীজ বুনে ফেলার কাজ আর তদারকির কাজ যখন শেষ হয়ে যায়, সাহেবদের বাংলোর ছাত তখন পরিষ্কার করার কাজও শুরু হয়। ঝাড়পোঁছ শুরু হলে ধুলো-ময়লায় যেমন ঘর অন্ধকার হয়ে যায়, তেমনি কড়িবরগার ফাঁকে লুকিয়ে থাকা যাবতীয় পোকামাকড়, বিছে, গিরগিটি এমনকী সাপও ওই ধুলোবালির সঙ্গে ছিটকে পড়তে থাকে ঘরের মধ্যে।
তখন তাঁবুর সরঞ্জাম নিয়ে আর বন্দুকগুলোকে পরিষ্কার করে সাহেবরা লোকজন নিয়ে বেরিয়ে পড়ে শিকারের খোঁজে। দেশীয় রাজা বা জমিদারের কাছ থেকে চেয়ে পাঠানো হয় হাতি—বিরাট আয়োজন করে শুরু হয় শিকারের অভিযান। মাসখানেক ধরে চলে এই শিকারিজীবন।
লোকলশকর, বন্দুক-রাইফেল আর হাতির দল নিয়ে শিকারের মধ্যে উত্তেজনা বা রোমাঞ্চ সবই আছে বটে, কিন্তু শিকারির প্রাণের ভয় তুলনায় কম—কিন্তু বাঘের ক্ষেত্রে এ নিয়মকানুন খাটে না। খাটাতে গেলে বিপদ আছে—অভিজ্ঞতায় এই সোজা কথাটা বুঝেছিলেন জেমস ইংলিস। জীবনে আর কোনোদিন সে ভুল করেননি তিনি।
খবরটা প্রথমে আসে প্রতাপগঞ্জ গ্রাম থেকে। কুশীনদীর দক্ষিণপাড়ে ওই গ্রাম। মানুষজন খুব গরিব। ফলে থাকার আস্তানাগুলো শক্তপোক্ত নয়। গ্রামটা নীলচাষের এলাকার মধ্যেই পড়ে, ফলে সাহেবরা এখানে কোনও উৎপাত সহ্য করতে রাজি নন। চাষের যেন ক্ষতি না হয়; তা সে যত বড় আর হিংস্র মানুষখেকো বাঘ হোক না কেন! আতঙ্কে মানুষ পালাতে শুরু করলে মুশকিল। ফলে যতটা না শিকারের টানে তার চেয়ে বেশি ব্যবসার ক্ষতি সামলাতে হাতির দল আর লোকজন এগোলো ওই গ্রামের দিকে।
নৌকোয় করে নদী পেরিয়ে আর হাতির পিঠে চেপে গ্রামে পৌঁছাতে সময় লাগল। হতশ্রী চেহারা গ্রামের। মানুষগুলো আতঙ্কে দিশাহারা, কী করবে বুঝে উঠতে পারছে না—থাকবে না গ্রাম ছেড়ে পালাবে সেটাই সমস্যা। জেমস নিজের চোখে এর আগে দেখেছেন মানুষখেকো বাঘের অত্যাচারে গ্রামকে শ্মশান হয়ে যেতে, চাষের উর্বর জমি জঙ্গলে পরিণত হতে; দেখেছেন নরখাদকের অত্যাচারে অতিষ্ঠ মানুষ লাঠি-সোঁটা নিয়ে জীবন বিপন্ন করে ঝাঁপিয়ে পড়ে কীভাবে বাঘকে আহত করেছে, তাড়িয়ে ছেড়েছে এলাকা থেকে। কিন্তু তার ফলে বিপদ কাটেনি। লাঠি কি পাথরের আঘাতে বাঘ আহত হয়েছে, কিন্তু মরেনি। কয়েকদিন পরে আবার ওই এলাকায় ফিরে এসেছে আরও ধূর্ত, আরও দুঃসাহসী, আরও ভয়ংকর হয়ে।
এইখানে আমরা মনে রাখব যে, উনিশ শতকের ভারতবর্ষে শিকার মানে সবসময় বিনোদন নয়, উপনিবেশ শাসন আর ব্যবসা-বাণিজ্যের সুবিধা দেখার খাতিরেও মাঝেমধ্যেই 'সাহেব'-দের শিকারে বেরোতে হয়েছে বাধ্য হয়ে। প্রতাপগঞ্জের ঘটনা সেই গোত্রের।
সাহেবরা সব এসেছে। গরিব গ্রাম সামান্য গুড় আর মিষ্টি দিয়েই অতিথিদের আদর জানাল। আর একটা করে টাকা নিয়ে এসেছে গ্রামের সব কর্তারা। নজরানা। সাহেব ওই টাকা নেবেন না, শুধু হাত ছুঁইয়ে দিলেই তারা খুশি। যদিও আড়ালে গিয়ে সাহেবের দেশি চাকর-বাকররা অনেকেই ওই টাকা আর ফিরিয়ে নিয়ে যেতে দেয় না গরিব মানুষদের। তবে এখন ঠিক সময় নয় এসব করার। কারণ, জো সাহেব এর মধ্যেই গোটা দলটাকে থামতে বলেছেন।

সব হাতিগুলোকে এক জায়গায় এনে মিটিং-এর ব্যবস্থা করলেন জো। জরুরি সভা। সাহেবরা হাতি থেকে নামবেন, তাঁবু খাটানো হবে, চেয়ার-টেবিল পাতা হবে, তামাক-চা আসবে, তারপর তো সভা শুরু হবে—এইরকম গা-এলানো সভা নয়; জো পরিস্থিতির গুরুত্ব বুঝেই জরুরি ভিত্তিতে ব্যবস্থা করেছেন। ডেকে আনা হল গ্রামের মোড়লকেও তৎক্ষণাৎ।
সাহেবদের এত তড়িঘড়ি দেখে বোধহয় মাথা গুলিয়ে গেছিল লোকটার, এমনিতেও বোকাসোকা লোক বলেই মনে হয়—নরখাদকের ব্যাপারে শিকারিদের প্রশ্নের সব উলটোপালটা উত্তর দিয়ে আরও গুলিয়ে দিল পুরো ব্যাপারটাকে। হতাশ হয়ে পড়ছেন জো, জেমস আর অন্য সবাই—প্রায় হাল ছেড়ে দেওয়ার মতো অবস্থা যখন; রাগে বিরক্তিতে ধমকের গলা চড়ছে আর ভয়ে সিঁটিয়ে মোড়ল লোকটা ততই এলোপাথাড়ি বকে চলেছে—সব কথাই সেই প্রলাপের মধ্যে আছে, শুধু বাঘের কথা ছাড়া। ঠিক এই সময় এগিয়ে এল বড়সড় চেহারার একটা জোয়ান ছেলে। গ্রামের চৌকিদার। সাহেবরা তাকে ডাকেনি, তাই সে এতক্ষণ কিছুটা দূরে আর পাঁচজনের ভিড়ে দাঁড়িয়ে ছিল, এখন বেগতিক দেখেই এগিয়ে এসেছে।
—'ক'দিন আগে বাঘ একটা ঘেসেড়াকে তুলে নিয়ে গেছে হুজুর; আমি জানি বাঘ কোথায় লুকিয়ে আছে, আপনাদের নিয়ে যেতে পারব।' চৌকিদার যুবক প্রত্যয়ী।
একেবারে কাজের কথা। এই সোজাসাপটা পথনির্দেশটুকু খুঁজছিলেন সাহেবরা, সঙ্গে সঙ্গে ছেলেটিকে হাতির পিঠে তুলে নিয়ে দ্রুত দলটা এগোল বাঘের খোঁজে। যে যার বন্দুক ভালোভাবে পরীক্ষা করে নিয়ে, বোতল খুলে জল খেয়ে নিলেন। হাতির দল ততক্ষণে গ্রামটাকে গোল করে ঘুরে এগিয়েছে চাষের জমির দিকে, ওপথে খানিকটা এগোলেই জঙ্গল। চৌকিদারের দেখানো পথ ধরেই এগোচ্ছে গোটা দল।
পথ চলতে চলতে খেয়াল করছেন শিকারিরা—বেশ কিছু জায়গায় ধানজমিকে ঢেকে দিয়ে এগিয়ে এসেছে জঙ্গল, গোয়ালঘর পড়ে আছে ভাঙাচোরা হয়ে, জনশূন্য মুদির দোকানে জিনিসপত্র নেই বললেই চলে, এমনকী শিশুগুলোর চোখে যেন বিস্ফারিত আতঙ্কের ছায়া, জনপদ নয়, যেন শ্মশানভূমি। জেমস জানেন এ চিহ্নগুলো। নরখাদক হানা দেওয়ার চিহ্ন!
ধানজমি পেরিয়ে ডানদিকে জঙ্গল শুরু হয়েছে। কিন্তু চৌকিদার সেদিকে গেল না। তার নির্দেশ মেনে দলটা বরং এগোল একটা বড় মাঠের মতো ঘাসজমির দিকে। জেমস খেয়াল করে দেখলেন যে, এই ঘাসজমির মধ্যে বাঘ তো দূরের কথা, একটা শুয়োরের পক্ষে লুকিয়ে থাকাও সম্ভব নয়। জো সাহেবও সেই মতোই চৌকিদারটিকে ডেকে বললেন, জায়গা চিনতে বোধহয় তার ভুল হচ্ছে।
উত্তরে ঘাসজমির মধ্যে একটা বড়সড় ঝোপের দিকে আঙুল দেখিয়ে চৌকিদার যুবক বলল, 'হুজুর, ওইখানে বাঘটা আছে।'
ওই ঝোপের ঠিক পাশ দিয়ে একটা নালা চলে গেছে, সেখানে জল প্রায় নেই বললেই চলে। সেই খাঁড়ির কাছে এসে হাতিগুলো থমকে যেতে শুরু করল। শুঁড় গুটিয়ে তুলে নিল মাথার ওপর। মাহুত অঙ্কুশ মেরে এগোতে বললেও, অস্বস্তি আর আপত্তি প্রকাশ করতে লাগল বিরাট হাতিগুলো। জেমসের মাহুত ফিসফিস করে বলল, 'হজুর, বাঘ! এখানেই আছে।'
হাতির দল দু-পা এগোচ্ছে, আবার দু-পা পিছিয়ে আসছে। দুলতে শুরু করেছে। অভিজ্ঞ মাহুত জানে হাতির এই আচরণ। বাঘের সামনে এসে গেলে হাতি এমনই করে থাকে। সাহেবরাও যে জানেন না এমন নয়, কিন্তু সামনের পাতলা ঝোপে যেখানে বেড়াল লুকিয়ে থাকলেও চোখে পড়ার কথা, সেখানে একটা অতবড় মানুষখেকো বাঘ দিব্যি চোখের আড়ালে লুকিয়ে আছে, একথা ঠিক বিশ্বাস করে ওঠা কঠিন হচ্ছিল তাদের পক্ষে।
কিন্তু বুনো জন্তুর অনুভূতি সভ্য মানুষের চোখকানের চেয়ে অনেক প্রখর, অনেক নিশ্চিত। বেশিক্ষণ অপেক্ষা করতে হল না।
শুকনো নালার সামনে পাতলা ঝোপঝাড়ের খুব কাছাকাছি পৌঁছে একটা হাতি তীক্ষ্ন চিৎকার করে উঠল—আর হঠাৎ যেন মাটি ফুঁড়ে ভোজবাজির মতো লাফিয়ে উঠে পড়ল বাঘ। বিরাট বাঘ, কিন্তু গায়ে-গতরে বেশ রোগাই মনে হল! তবে অনেকটা লম্বা বাঘ।
সাহেবরা নিজের চোখকেই বিশ্বাস করে উঠতে পারছিলেন না। খানিকটা হতভম্ব হয়ে গিয়ে বন্দুক তুলতে কিছুটা দেরি হল। যদিও তার ফলে বড় কিছু ক্ষতি হয়নি।
বাঘ কোনও দিকে না তাকিয়ে নিতান্ত অনিচ্ছার সঙ্গেই হই-হট্টগোল ছেড়ে অন্যদিকে হাঁটতে শুরু করেছে। নেহাত দুপুরের কি রাতের খাবার-দাবার সেরে যেন একটু অলস ভ্রমণে বেরোনো। গতি মৃদু, অলস, মন্থর।
কিন্তু অলস হলেও বাঘ বলে কথা, তার ওপর নরখাদক। যদিও প্রকাণ্ড অস্থিসার দেহ, গায়ের লোম উঠে গেছে—এক কুৎসিত মানুষখেকো। আর সময় নষ্ট করা ঠিক হবে না। পর পর গর্জে উঠল রাইফেল—প্রথমে জো তারপর জেমস আর অন্য সাহেবদের।
বাঘটা পড়ল আর মরল। থাবা দিয়ে মাটি আঁচড়াল না, প্রকাণ্ড লাফ দিয়ে গর্জন করল না, এমনকী একটু ছটফট পর্যন্ত করল না—এ যেন ছাগল শিকার হল।
'ধুর, একটা বাজে শিকার।' প্যাট সাহেব বন্দুক নামিয়ে বললেন।
'এটা বাঘ, না কুত্তা?' জো-র মন্তব্য। যদিও তাঁর বন্দুকের গুলি ওই 'কুত্তা'-টাকেও ছুঁয়ে যায়নি, তবু তিনি আরেকটু এগিয়েই বললেন, চামড়াটাও তো ঘরে রাখা যাবে না, লোম উঠে 'চট' বেরিয়ে পড়েছে।' বাকি সাহেবরাও বাঘের বাপান্ত করতে শুরু করল।
হাতির দল ততক্ষণে ঘিরে ফেলেছে মাটিতে লম্বা হয়ে পড়ে থাকা বাঘটাকে। স্বস্তি ফিরেছে গ্রামের মানুষের। কাল থেকে আবার হাটের পথে নির্ভয়ে যেতে-আসতে পারবে মেয়ের দল, সন্ধে হলেই দরজায় খিল দিতে হবে না সব ঘরে, অন্ধকারের সঙ্গে সঙ্গে নেমে আসবে না আর ভয়ংকর আতঙ্ক সমস্ত জনবসতি জুড়ে—মূর্তিমান অভিশাপ ওই মানুষখেকো আজ মরেছে। শিকারির দলও নিশ্চিন্ত।
প্যাট প্রথম নামলেন হাতির পিঠ থেকে। তাঁর মাহুতকে বললেন হাতিটাকে মরা বাঘটার সামনে নিয়ে আসতে। কারণ, হাতিটা তাকে দিয়েছিলেন স্থানীয় এক করদ রাজ্যের রাজা। একেবারে নতুন কেনা হাতি। শিকারের দলে সামিল হওয়ার কোনও অভিজ্ঞতা জন্তুটার ছিল না। তাই হাতির ভয় কাটানোর জন্য মাহুতকে ওই নির্দেশ দিয়েছিলেন প্যাট। বাঘের চেহারা আর গন্ধের সঙ্গে হাতিটা যাতে অভ্যস্ত হয়ে ওঠে। কিন্তু হাতি তার জন্মগত শিক্ষায় জেনেছে যে এই ডোরাকাটা জন্তুটা খুব সুবিধের বস্তু নয়, একে এড়িয়ে যাওয়াই মঙ্গল। তাই মাহুত কি প্যাট চাইলেও সে খুব আপত্তি নিয়েই এগোচ্ছিল। প্রায় বাঘের দেহের উপরে ঝুঁকে পড়ে সাহেব হাতিটাকে আস্তে আস্তে এগিয়ে আনতে বলছিলেন। হাতিটার সাহস যোগাতে। অন্যান্য সাহেবদের মধ্যে কেউ কেউ তামাক ধরিয়ে ধোঁয়া ছাড়তে শুরু করেছেন ততক্ষণে।
হঠাৎ চিৎকার করে পিছিয়ে এলেন প্যাট, 'সর্বনাশ। এটা তো বেঁচে আছে দেখছি...সাবধান! সাবধান সবাই!' প্রাণের ভয়ে পালাতে গিয়েই তিনি গাছের শিকড় অথবা ঝোপঝাড়ে পা আটকে পিছনে উলটে পড়লেন।
ঠিক তখনই জ্বলন্ত চোখ দুটো মেলে তাকালো 'মরা বাঘ'। হাঁ করে শ্বাস নিতে চেষ্টা করল একবার। মুখগহ্বর জুড়ে বেরিয়ে এল রক্ত আর ফেনা মাখা ভয়ংকর দাঁতের সারি, শরীরের সব শক্তি জড়ো করে বাঘ গড়িয়ে চলে এল হাতির পায়ের কাছে। ছুরির মতো নখ দিয়ে চেপে ধরে, ভীষণ জোরে কামড় বসিয়ে দিল হাতির পায়ে। মরণ-কামড়। বাঘের শ্ব-দন্ত চারটে আমুল ঢুকে গেল হাতির পায়ে। অসহ্য যন্ত্রণায় তীব্র চিৎকার করে উঠল হাতি, আতঙ্কে আশেপাশের হাতিগুলোও চিৎকার করতে লাগল প্রাণপণে। চারদিকে ছুটোছুটি আর চেঁচামেচিতে বিশৃঙ্খল হয়ে পড়ল গোটা দল।
আক্রান্ত হাতির মাহুত তখন নিজের দুটো পা তুলে ফেলেছে হাতির মাথার উপরে, পাছে বাঘ এবার তাকে ধরে সেই ভয়ে—আর তার ঊর্ধ্বতন চোদ্দোপুরুষ ও যত দেবদেবীর নাম মনে পড়ে তাদের উদ্দেশ্যে তারস্বরে প্রার্থনা জানিয়ে চলেছে তার জীবনরক্ষার জন্য। হাতির তীব্র ও করুণ আর্তনাদ ছাপিয়ে শোনা যাচ্ছিল তার প্রার্থনা।
মরণ-কামড়ই দিয়েছিল বাঘ। তারপরই তার দেহ নিথর হয়ে গেল।
কিন্তু কামড়টা হয়েছিল মোক্ষম। ক্ষত মুছিয়ে হাতির পায়ে ওষুধ লাগানো হল বটে, কিন্তু গ্যাংগ্রিন রোখা গেল না। ক্ষতস্থান বিষিয়ে উঠল। তিনদিনের মাথায় হাতি মারা গেল।
সাহেবরা প্রত্যেকে তিনশো টাকা করে দিয়ে হাতির মালিককে দাম মিটিয়ে দিলেন। তাঁদের শিকারের প্রয়োজন মেটাতে অন্য লোক খেসারত দিক, এটা তাঁদের সম্মানের পক্ষে ঠিক নয়। তাই, একরকম জোর করেই ক্ষতিপূরণ দিয়ে দিলেন তাঁরা।
ভারতে বিশেষ করে বিহারের উত্তরভাগে ও নেপাল সীমান্তে দীর্ঘদিন নীলকর সাহেব হিসাবে ব্যবসা-বাণিজ্য করেছেন জেমস ইংলিস। পরে চা-এর ব্যবসায় মন দিয়েছিলেন অস্ট্রেলিয়ায় গিয়ে। সে দেশে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি হিসাবে মন্ত্রিত্ব সামলেছেন তিনি। বিচিত্র তাঁর জীবন। ঐতিহাসিকের দপ্তরে গুরুত্বপূর্ণ তাঁর লেখাপত্র।
তবু শিকারের অনেক অভিজ্ঞতার মধ্যে এই অধ্যায়টুকু ভোলেননি জেমস। যার সারকথা হল—'বাঘকে বিশ্বাস নেই, এমনকী সেটা ''মরা বাঘ'' হলেও সাবধান!'

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন