শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়
রাত্রি আন্দাজ সাড়ে আটটার সময় সাধারণ ঝিন্দি সৈনিকের বেশ পরিধান করিয়া গৌরী ও রুদ্ররূপ বাহির হইবার জন্য প্রস্তুত হইল। যে কক্ষটায় সাজসজ্জা হইতেছিল সেটা রাজার সিঙার-ঘর— অর্থাৎ ড্রেসিং রুম। চম্পা দেঈ ও ধনঞ্জয় উপস্থিত ছিলেন।
মাথার উপর প্রকাণ্ড জরিদার রেশমি পাগড়ি বাঁধিয়া গৌরী আয়নার সম্মুখীন হইয়া দেখিল, এ বেশে সহসা কেহ তাহাকে চিনিতে পারিবে না। চম্পা ও ধনঞ্জয়ের দিকে ফিরিয়া সহাস্যে জিজ্ঞাসা করিল— ‘কেমন দেখাচ্ছে?’
ধনঞ্জয় গলার মধ্যে কেবল একটা শব্দ করিলেন; চম্পা সপ্রশংস নেত্রে চাহিয়া বলিল— ‘ভারী সুন্দর দেখাচ্ছে। আপনি যদি ভিখিরির সাজপোশাক পরেন, তবু আপনাকে রাজার মতোই দেখায়।’
গৌরী মুখের একটু ভঙ্গিমা করিয়া বলিল— ‘তা বটে। বনেদি রাজা কিনা।—এখন চললাম। তুমি কিন্তু লক্ষ্মী মেয়েটির মতো ঘুমিয়ে পড়ো গিয়ে— আমার জন্য জেগে থেকো না। যদি জেগে থাকো, কাল সকালেই তোমাকে বাপের কাছে পাঠিয়ে দেব।’
এতবড় শাসনবাক্যে ভীত হইয়া চম্পা ক্ষীণস্বরে বলিল— ‘আচ্ছা।’
চম্পাকে জব্দ করিবার একটা অস্ত্র পাওয়া গিয়াছে বুঝিয়া গৌরী মনে মনে হৃষ্ট হইয়া উঠিল। ধনঞ্জয় বিরস গম্ভীরমুখে বলিলেন— ‘আপনি ফিরে না-আসা পর্যন্ত আমাকে কিন্তু জেগে থাকতে হবে।’
অপরাহ্নে ধনঞ্জয়ের প্রতি রূঢ়তায় গৌরী মনে মনে একটু অনুতপ্ত হইয়াছিল, বলিল— ‘তা বেশ তো সর্দার। কিন্তু বেশিক্ষণ জাগতে হবে না, আমরা শিগগির ফিরব।’
প্রাসাদের পাশের একটি ছোট ফটক দিয়া দুইজনে পদব্রজে বাহির হইল। ফটকের শান্ত্রী রুদ্ররূপের গলা শুনিয়াই পথ ছাড়িয়া দিল, তাহার সঙ্গীটি কে তাহা ভাল করিয়া দেখিল না।
প্রাসাদের প্রাচীর-বেষ্টনী পার হইয়া উভয়ে সিংগড়ের কেন্দ্রস্থলে— যেখানে প্রকৃত নগর— সেইদিকে যাত্রা করিল।
নগরে তখনও রাজ-অভিষেকের উৎসব সম্পূর্ণ শেষ হয় নাই, এখনও গৃহে গৃহে দীপালি জ্বলিতেছে, দোকানে দোকানে পতাকা মালা ইত্যাদি দুলিতেছে, তবু আনন্দের প্রথম উদ্দীপনা যে অনেকটা ক্লান্ত হইয়া পড়িয়াছে তাহাতে সন্দেহ নাই। ছোট্ট রাজ্য হইলেও রাজধানীটি বেশ বড় এবং সমৃদ্ধ। শহরের যেটি প্রধান বাজার, তাহাতে বহু লোকের ব্যস্ত গমনাগমন ও যানবাহনের অবিশ্রাম গতায়াত বাণিজ্যলক্ষ্মীর কৃপাদৃষ্টির ইঙ্গিত করিতেছে। অপেক্ষাকৃত সংকীর্ণ রাস্তার দুই ধারে উচ্চ তিন-চার-তলা ইমারত। কলিকাতার বড়বাজারের সংকুচিত সংস্করণ বলিয়া মনে হয়।
উৎসুক চক্ষে চারিদিকে দেখিতে দেখিতে গৌরী নিজের বর্তমান অবস্থার কথা প্রায় ভুলিয়া গিয়াছিল। সে যে গৌরীশঙ্কর রায়— এখানে আসিবার পর হইতে এই কথাটা একপ্রকার চাপা পড়িয়া গিয়াছিল; অভিনয় করিতে করিতে অভিনেতাটির মনেও একটু আত্মবিস্মৃতি জন্মিয়াছিল। কিন্তু এখন সে আবার নিজের চোখ দিয়া দেখিতে দেখিতে এই নূতনত্বের রস আস্বাদন করিতে করিতে চলিল। যেন বহুদিন পরে নিজের হারানো সত্তাকে ফিরিয়া পাইল।
শহরের জনাকীর্ণ রাস্তায় তাহাদের মতো বেশধারী বহু ফৌজি সিপাহী ও নায়ক হাবিলদার প্রভৃতি ক্ষুদ্র সেনানী ঘুরিয়া বেড়াইতেছিল। উপরন্তু এই রাজ্যাভিষেক পর্ব উপলক্ষে জঙ্গি ইউনিফর্ম পরা একটা ফ্যাশান হইয়া দাঁড়াইয়াছিল— তাই গৌরী ও রুদ্ররূপ কাহারও বিশেষ মনোযোগ আকর্ষণ করিল না।
বাজারের চৌমাথায় এক পানওয়ালির দোকানে খুশবুদার পান কিনিবার জন্য গৌরী দাঁড়াইল। দোকানের সম্মুখে বেশ ভিড় ছিল— কারণ এ দোকানের পান শুধু বিখ্যাত নয়, পানওয়ালিও রূপসী ও নবযৌবনা। রুদ্ররূপ পান কিনিবার জন্য ভিড়ের মধ্যে ঢুকিল।
বাহিরে দাঁড়াইয়া অলসভাবে এদিক ওদিক চাহিতে চাহিতে হঠাৎ গৌরীর নজরে পড়িল, অনতিদূর রাস্তায় অপর পারে একটা মনিহারীর দোকান। দোকানটি বেশ বড়, কাচ-ঢাকা জানালায় বিলাতি প্রথায় বহুবিধ মূল্যবান ও চিত্তাকর্ষক পণ্য সাজানো রহিয়াছে এবং প্রবেশদ্বারের মাথার উপর বড় বড় সোনালি অক্ষরে সাইন-বোর্ড লেখা রহিয়াছে—
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন