শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়
মিনিট দুই সজোরে হাত ছুড়িবার পর ঠান্ডা জল গা-সওয়া হইয়া গেলে গৌরী দেখিল, সাঁতার কাটিবার প্রয়োজন নাই, নদীর স্রোত তাহাদের সেই দীপান্বিত গবাক্ষের দিকেই টানিয়া লইয়া চলিয়াছে। দুইজনে তখন কেবলমাত্র গা ভাসাইয়া স্রোতের টানে ভাসিয়া চলিল।
জল হইতে সম্মুখস্থ ক্ষুদ্র আলোকবিন্দু ছাড়া আর কিছুই দেখা যায় না; চারিদিকে কেবল নক্ষত্রালোক খচিত মসীকৃষ্ণ জলরাশি। গৌরী ও রুদ্ররূপ যতই দুর্গের নিকটবর্তী হইতে লাগিল, জলের কল্লোলধ্বনি ততই বাড়িয়া চলিল; মগ্ন পাথরের সংঘাতে একটানা স্রোত ফুলিয়া ফাঁপিয়া এলোমেলোভাবে ছড়াইয়া পড়িতে লাগিল। গৌরী দেখিল, তাহারা আর সিধা সেই গবাক্ষর দিকে যাইতেছে না, বাধাপ্রাপ্ত জলধারা তাহাদের ভিন্নমুখে টানিয়া লইয়া চলিয়াছে। গৌরী প্রাণপণে সাঁতার কাটিয়া নিজের গতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করিল, কিন্তু কিছুক্ষণ চেষ্টা করিবার পর দেখিল বৃথা চেষ্টা, দুর্বার জলস্রোতে ইচ্ছামতো চলা অসম্ভব। নিরুপায়ভাবেই দুইজনে ভাসিয়া চলিল।
ক্রমশ দুর্গের বিশাল ছায়ার তলে তাহারা আসিয়া পৌঁছিল। এখানে নক্ষত্রের ক্ষীণ দীপ্তিও অন্ধ হইয়া গিয়াছে— চোখের দৃষ্টি জমাট অন্ধকারের মধ্যে কোথাও আশ্রয় খুঁজিয়া পায় না। গবাক্ষের আলোটিও বামদিকের আলোড়িত তমিস্রায় কখন ডুবিয়া গিয়াছে।
দুর্গের প্রাচীর আর কতদূরে তাহাও অনুমান করা অসম্ভব। গৌরীর ভয় হইতে লাগিল, এইবার বুঝি তাহারা সবেগে দুর্গের পাষাণগাত্রে গিয়া আছড়াইয়া পড়িবে। সে মৃদুস্বরে একবার রুদ্ররূপকে ডাকিল; রুদ্ররূপ তাহার দুইহাত অন্তরে তরঙ্গের সহিত যুদ্ধ করিতেছিল— ক্ষীণকণ্ঠে জবাব দিল।
গৌরী বলিল— ‘হুশিয়ার! সামনেই দুর্গ, জখম হয়ো না।’
রুদ্ররূপ বলিল— ‘না। আপনি সাবধান।’
অন্ধকারে গৌরী হাসিল। দুইজনেই দুইজনকে সাবধান করিয়া দিল বটে কিন্তু সত্যই দুর্গের গায়ে সবেগে নিক্ষিপ্ত হইলে কীভাবে আত্মরক্ষা করিবে কেহই ভাবিয়া পাইল না। বিক্ষুব্ধ জলরাশির বুকে তৃণখণ্ড! তাহাদের ইচ্ছার শক্তি কতটুকু?
গৌরীর মনে হইল, আজিকার এই নিঃসহায়ভাবে ভাসিয়া-চলা তাহার জীবনের একটা বৃহত্তর সত্যের প্রতীক। দৈবী খেয়ালের দুর্নিবার টানে সে তো অনেকদিন হইতেই ক্ষুদ্র তৃণখণ্ডের মতো ভাসিয়া চলিয়াছে। পাষাণ প্রাকারে নিক্ষিপ্ত হইয়া এতদিন চূর্ণ হইয়া যায় নাই কেন, ইহাই আশ্চর্য। কে জানে, হয়তো আজিকার জন্যই নিয়তি অপেক্ষা করিয়া ছিল— তাহার লক্ষ্যহীন ভাসিয়া-চলাকে পরিসমাপ্তির উপকূলে পৌঁছাইয়া দিবে। কিন্তু কোথায় সে উপকূল? বৈতরণীর এপারে, না ওপারে?
একটা প্রকাণ্ড ঢেউ এই সময় গৌরীকে বিপর্যস্ত নিমজ্জিত করিয়া তাহার উপর দিয়া বহিয়া গেল। ক্ষণেকের জন্য একটা মগ্ন পাথরের পিচ্ছিল অঙ্গ তাহাকে স্পর্শ করিল; তারপর জলের উপর মাথা জাগাইয়া সে দেখিল— স্রোতের এলোমেলো গতি আর নাই, অপেক্ষাকৃত শান্ত জলের মন্থর একটা ঘূর্ণির মধ্যে সে ধীরে ধীরে পাক খাইতেছে। সম্ভবত জলমগ্ন পাথরগুলা এইখানে এমন একটা সুদৃঢ় প্রাচীর রচনা করিয়াছে যাহাতে স্রোতের প্রবল গতি ব্যাহত হইয়া যায়; ওই বড় ঢেউটা গৌরীকে সেই মজ্জিত প্রাচীরের পরপারে আনিয়া দিল। ঘূর্ণির চক্রে আবর্তমান তাহার দেহটা দুর্গের দেয়ালে গিয়া ঠেকিল।
এখানেও ডুব জল, মসৃণ দুর্গ-গাত্রে কোথাও অবলম্বন নাই; তবু এই শৈবাল-পিচ্ছিল দেয়ালে হাত রাখিয়া গৌরীর মনে হইল, সে একটা আশ্রয় পাইয়াছে। ক্ষণকাল জিরাইয়া লইয়া সে মৃদুকণ্ঠে ডাকিল— ‘রুদ্ররূপ, কোথায় তুমি?’
রুদ্ররূপ জবাব দিল— ‘এই যে, দেয়ালে এসে ঠেকেছি! আপনি?’
‘আমিও। এসো, বাঁদিকে জানালাটা আছে, সেইদিকে যাওয়া যাক। দেয়াল ধরে ধরে এসো।’
‘আচ্ছা।’
তখন পৃথিবীর আদিম পঙ্ক-শয্যার উপর অন্ধ মহীলতার মতো দুইজনে কেবল স্পর্শানুভূতির সাহায্যে ধীরে ধীরে অগ্রসর হইল। দশ মিনিট, পনেরো মিনিট এমনিভাবে কাটিয়া গেল; কিন্তু জানালার দেখা নাই। গৌরীর আশঙ্কা হইল হয়তো তাহারা কখন অজ্ঞাতে জানালার নীচে দিয়া চলিয়া আসিয়াছে, জানিতে পারে নাই।
সে পিছু ফিরিয়া রুদ্ররূপকে সম্বোধন করিতে যাইতেছিল, এমন সময় ঠিক মাথার উপর একটা অত্যন্ত পরিচিত কণ্ঠের আওয়াজ শুনিয়া চমকিয়া উঠিল, কিন্তু কিছুই দেখিতে পাইল না। জানালার আলো দূর হইতে দেখা যায়, কিন্তু নীচে হইতে তাহা অদৃশ্য। গৌরী ঊর্বে হাত বাড়াইয়া অনুভব করিয়া দেখিতে লাগিল; জানালার কিনারা হাতে ঠেকিল— জল হইতে দুই-আড়াই হাত মাত্র ঊর্ধ্বে।
আবার জানালার ভিতর হইতে পরিচিত কণ্ঠস্বর আসিল— ‘বেইমান, তুই তবে আমাকে মেরে ফ্যাল, আমি বেঁচে থাকতে চাই না।’
গৌরী নিজের গলার স্বর চিনিতে পারিল; কোথাও এতটুকু তফাত নাই। তাহার বুকের ভিতরটা কেমন যেন আনচান করিয়া উঠিল; মনে হইল সে নিজেই ওই কারাকূপে আবদ্ধ হইয়া মৃত্যু কামনা করিতেছে।
এবার দ্বিতীয় কণ্ঠস্বর শুনা গেল; কসাইয়ের ছুরির মতো তীক্ষ্ণ নিষ্ঠুর কোমলতার বাষ্প পর্যন্ত কোথাও নাই— ‘ব্যস্ত হয়ে না; দরকার হয়নি বলেই এতদিন মারিনি, তোমার প্রতি মমতাবশত নয়। কিন্তু আর দেরি নেই, আজই যাহোক একটা হবে।’
কিছুক্ষণ নিস্তব্ধ। তারপর আবার শঙ্কর সিং কথা কহিল। এবার তাহার স্বর অত্যন্ত কাতর, মিনতি-বিগলিত— ‘উদিত, আমার প্রতি কি তোমার এতটুকু দয়া হয় না? আমায় ছেড়ে দাও ভাই। আমি রাজ্য চাই না, আমায় শুধু ছেড়ে দাও—
‘আর তা হয় না। তোমার বন্ধু ধনঞ্জয় সর্দার সব মাটি করে দিয়েছে।’
‘কিন্তু আমি তো তোমার কোনও ক্ষতি করিনি। আমি তো তোমাকে সিংহাসন ছেড়ে দিচ্ছি।’
‘এখন তোমার সিংহাসন ছাড়া না-ছাড়া সমান। ঝিন্দের গদিতে একটা বাঙালি কুত্তা বসে সর্দারি করছে। শয়তানের বাচ্চা মরেও মরে না। সে যদি মরত তা হলে তোমার ফুরসত হয়ে যেত। যাক, আজকের কাজে যদি সিদ্ধ হই তখন তোমার কথা ভেবে দেখব। এখন ঘুমোও।’
গৌরী গবাক্ষের কানায় আঙুল রাখিয়া বাহুর সাহায্যে ধীরে ধীরে নিজেকে তুলিয়া ঘরের মধ্যে উঁকি মারিল। পাথর কুঁদিয়া বাহির করা অপরিসর একটি প্রকোষ্ঠ— মোমবাতির আলোয় অল্পমাত্র আলোকিত। গবাক্ষের ঠিক বিপরীত দিকে লোহার ভারী দরজা বন্ধ রহিয়াছে। দেয়ালে সংলগ্ন একটা লম্বা বেদির মতো আসন, বোধহয় ইহাই বন্দীর শয্যা। এই বেদির উপর গালে হাত দিয়া উদিত বসিয়া আছে, তাহার কোলের উপর একটা খোলা তলোয়ার। আর উদিতের অদূরে দাঁড়াইয়া তাহার পানে করুণনেত্রে চাহিয়া আছে— শঙ্কর সিং। পরিধানে কেবল একটি হাফ-প্যান্ট, ঊর্ধ্বাঙ্গ উন্মুক্ত, কয়েদির সাজ। তাহার মুখে দুর্দশা ও দৈহিক গ্লানির ছাপ পড়িয়া গিয়াছে। চোখের কোণ হইতে গভীর কালির আঁচড় ক্ষতরেখার মতো গণ্ডের মাঝখান পর্যন্ত পৌঁছিয়াছে; অধরোষ্ঠের দুই প্রান্ত নত হইয়া ক্লিষ্ট অসন্তোষ প্রকাশ করিতেছে; বাহু ও কণ্ঠের পেশি ঈষৎ শীর্ণ। তবু, অবস্থার নিদারুণ প্রভেদ সত্ত্বেও, গৌরীর সহিত তাহার সর্বাঙ্গীণ সাদৃশ্য অদ্ভুত। গৌরী সম্মোহিতের মতো শঙ্কর সিংয়ের পানে তাকাইয়া রহিল।
উদিত ভ্রূকুটি করিয়া চিন্তা করিতেছিল, শঙ্কর সিংয়ের দীর্ঘশ্বাস মিশ্রিত হাস্য শুনিয়া মুখ তুলিয়া চাহিল। শঙ্কর সিং স্খলিতস্বরে বলিল— ‘ঘুম! ঘুম আমার আসে না।’
‘ঘুম না আসে— মদ খাও।’ বিরক্ত তাচ্ছিল্যভরে ঘরের কোণের দিকে অঙ্গুলি নির্দেশ করিয়া উদিত উঠিয়া দাঁড়াইল। বদ্ধ কক্ষে বাতাসের অভাব বোধহয় তাহাকে পীড়া দিতেছিল, সে জানালার দিকে অগ্রসর হইল।
গৌরী নিঃশব্দে নিজেকে জলের মধ্যে নামাইয়া দিয়া জানালা ছাড়িয়া দিল। আর এখানে থাকা নিরাপদ নয়, হাতড়াইতে হাতড়াইতে সে ফিরিয়া চলিল।
রুদ্ররূপের গায়ে তাহার হাত ঠেকিল। তাহার কানের কাছে মুখ লইয়া গিয়া সে বলিল— ‘ফিরে চলো।’
জানালা হইতে পঁচিশ গজ গিয়া তাহারা থামিল।
রুদ্ররূপ জিজ্ঞাসা করিল— ‘কী দেখলেন?’
গৌরী বলিল— ‘শঙ্কর সিং আর উদিত। উদিত পাহারা দিচ্ছে।’ কিছুক্ষণ চুপ করিয়া থাকিয়া বলিল— ‘আজ রাত্রেই ওরা একটা কিছু করবে।’
‘কী করবে?’
‘জানি না। হয়তো—’
গতরাত্রে ময়ূরবাহনের প্রচ্ছন্ন ইঙ্গিতের কথা তাহার স্মরণ হইল। কী করিতে চায় উহারা? কোন দিক দিয়া আক্রমণ করিবে? কস্তুরীর বিরুদ্ধে কি কোনও মতলব আঁটিতেছে? কিন্তু তাহাতে উহাদের লাভ কী? তাহাতে ঝিন্দের সিংহাসন তো সুলভ হইবে না।
কিস্তার দক্ষিণ কূলে কৃষ্ণার বিবাহোৎসবের দীপগুলি এক ঝাঁক খদ্যোতের মতো মিটমিট করিতেছে; দক্ষিণ কূল অন্ধকার। গৌরী ভাবিল— আর এখানে থাকিয়া লাভ নাই, শঙ্কর সিংয়ের সহিত কথা কহিবার সুযোগ হইবে না; স্বয়ং উদিত তাহাকে পাহারা দিতেছে। সম্ভবত উদিত আর ময়ূরবাহন পালা করিয়া পাহারা দিয়া থাকে। দুর্গে অন্য যাহারা আছে, তাহারা হয়তো বন্দীর পরিচয় জানে না; কিংবা জানিলেও উদিত তাহাদের বিশ্বাস করিয়া রাজার পাহারায় রাখে না। দুর্গে আর কাহারা আছে? দুই-চারিজন অনুগত ভৃত্য, আর দুই-চারিজন রাজদ্রোহী বন্ধু! আশ্চর্য! এই মুষ্টিমেয় লোক লইয়া উদিত একটা রাজ্যের সমস্ত শক্তিকে তাচ্ছিল্যভরে ব্যর্থ করিয়া দিতেছে।
এইসব অফলপ্রসূ চিন্তা ত্যাগ করিয়া গৌরী ফিরিবার উপক্রম করিতেছে, হঠাৎ নিকটেই জাঁতা ঘোরানোর মতো গড় গড় শব্দে সে থামিয়া গেল। পরক্ষণেই একটা ভৌতিক হাসির শব্দ যেন দুর্গের পাথর ভেদ করিয়া তাহার কানে ভাসিয়া আসিল; গৌরীর সর্বাঙ্গের স্নায়ু-পেশি সহসা শক্ত হইয়া উঠিল।
ময়ূরবাহনের হাসি! তবে সে মরে নাই!
কিন্তু হাসির শব্দটা আসিল কোথা হইতে?
সতর্কভাবে একবার এদিক ওদিক চাহিতেই গৌরী ক্ষিপ্রহস্তে রুদ্ররূপকে টানিয়া দুর্গের দেয়ালের গায়ে একেবারে সাঁটিয়া গেল। মাত্র পাঁচ-ছয় হাত দক্ষিণে দুর্গের গাত্রে পীতবর্ণ আলোকের একটি চতুষ্কোণ দেখা দিয়াছে।
জাঁতার মতো গড় গড় শব্দ করিয়া এই চতুষ্কোণ প্রস্থে বাড়িতে লাগিল। প্রায় আট ফুট উচ্চ ও ছয় ফুট চওড়া একটি দ্বার ধীরে ধীরে কর্কশ অসমতল দেয়ালে আত্মপ্রকাশ করিল।
গুপ্তদ্বার! এই পথেই গতরাত্রে ময়ূরবাহন দুর্গে ফিরিয়াছিল! গোরী ও রুদ্ররূপ নিশ্বাস রোধ করিয়া দেখিতে লাগিল।
কয়েকজন লোকের অস্পষ্ট কথার শব্দ গুপ্তদ্বারের অভ্যন্তর হইতে ভাসিয়া আসিল। যেন তাহারা একটা ভারী জিনিস বহন করিয়া আনিতেছে। ক্রমে একটি ক্ষুদ্র ডিঙির অগ্রভাগ দ্বারমুখে বাহির হইয়া আসিল।
‘আস্তে! হুঁশিয়ার!’ ময়ূরবাহনের গলা।
নৌকা ছপাত করিয়া জলে পড়িল। ময়ূরবাহন দড়ি ধরিয়াছিল, টানিয়া নৌকা দ্বারের মুখে লইয়া আসিল।
‘স্বরূপদাস, তুমি মোটা মানুষ, আগে নৌকায় নামো।’— একজন স্থূলকায় লোক সন্তর্পণে নৌকায় নামিল— ‘দাঁড় ধরো।’
‘এবার তুমি।’ আর একজন নৌকায় নামিল।
তখন দড়ি নৌকার মধ্যে ফেলিয়া দিয়া ময়ূরবাহন লঘুপদে নৌকায় লাফাইয়া পড়িল। নৌকা টলমল করিয়া উঠিল; ময়ূরবাহন হাসিল— সেই বিজয়ী বেপরোয়া হাসি। গুপ্তদ্বারের দিকে ফিরিয়া বলিল— ‘দরজা খোলা থাক, আর তুমি লণ্ঠন নিয়ে এইখানে বসে থাকো— নইলে ফেরবার সময় দরজা খুঁজে পাব না। কখন ফিরব ঠিক নেই, হয়তো রাত কাবার হয়ে যেতে পারে। হুঁশিয়ার থেকো।’
দ্বারের ভিতর হইতে উত্তর আসিল— ‘জো হুকুম।’
ময়ূরবাহন বলিল— ‘দাঁড় চালাও।’
ক্ষুদ্র তরী তিনজন আরোহী লইয়া পলকের মধ্যে অন্তর্হিত হইয়া গেল। গৌরী চক্ষের সমস্ত শক্তি প্রয়োগ করিয়া দেখিবার চেষ্টা করিল— নৌকাটা কোন দিকে যাইতেছে, কিন্তু কিছুই নির্ধারণ করিতে পারিল না। আকাশ ও জলের ঘন তমিস্রার মধ্যে নৌকা যেন মিশিয়া নিশ্চিহ্ন হইয়া গেল।
পাঁচ মিনিট নিঃশব্দে কাটিল।
তারপর গৌরী রুদ্ররূপের মাথাটা নিজের মুখের কাছে টানিয়া আনিয়া চুপি চুপি বলিল— ‘রুদ্ররূপ, তুমি তাঁবুতে ফিরে যাও।’
রুদ্ররূপ সচকিতে বলিল— ‘আর আপনি?’
‘আমি এই পথে দুর্গে ঢুকব।’
‘কিন্তু—’
গৌরী সাঁড়াশির মতো আঙুল দিয়া রুদ্ররূপের কাঁধ চাপিয়া ধরিয়া বলিল— ‘আমার হুকুম, দ্বিরুক্তি কোরো না। এমন সুযোগ আর আসবে না। তুমি তাঁবুতে ফিরে গেলে ধনঞ্জয় আর বিশজন সিপাহী নিয়ে দুর্গের পুলের মুখে লুকিয়ে থাকবে। আমি দুর্গের ভিতর ঢুকছি, যেমন করে পারি দুর্গের সিং-দরজা খুলে দেব। বুঝেছ?’
‘বুঝেছি।’ রুদ্ররূপের স্বর আজ্ঞাবাহী সৈনিকের মতো ভাবহীন।
‘গুপ্তদ্বারে একটা মাত্র লোক আছে, সে আমাকে আটকাতে পারবে না। তারপর দুর্গের ভিতরকার অবস্থা বুঝে যেমন হয় করব। উদিত রাজাকে পাহারা দিচ্ছে, ময়ূরবাহন নেই— দুর্গে হয়তো কয়েকজন চাকর-বাকর মাত্র আছে। এই সুযোগ। ময়ূরবাহন ফেরবার আগেই কার্যোদ্ধার করতে হবে। তুমি যাও, আর দেরি কোরো না।’
‘জো হুকুম’— রুদ্ররূপ সাঁতার দিবার উপক্রম করিল।
গৌরী আস্তে আস্তে তাহাকে ছাড়িয়া দিয়া বলিল— ‘স্রোত ঠেলে যেতে পারবে না, বরং স্রোতে গা ভাসিয়ে দাও— দুর্গ পেরিয়ে কিনারায় উঠতে পারবে।’
রুদ্ররূপ নিঃশব্দে চলিয়া গেল। এতক্ষণ দিকব্যাপী অন্ধকারের মধ্যে তবু একজন অদৃশ্য সহচর ছিল, এখন সে-ও গেল। গৌরী একা!
ছোরাটা সে কোমর হইতে হাতে লইল। তারপর অতি সাবধানে গুপ্তদ্বারের দিকে অগ্রসর হইল।
জল হইতে এক হাত উচ্চে গুপ্তদ্বার। গৌরী কোণ হইতে সরীসৃপের মতো মাথা তুলিয়া ভিতরে দৃষ্টি প্রেরণ করিল। সম্মুখেই একটা লণ্ঠন জ্বলিতেছে, তাহার ওপারে কী আছে দেখা যায় না। ক্রমে দৃষ্টি অভ্যস্ত হইলে গৌরী দেখিল— সুড়ঙ্গের মতো গুপ্তদ্বার ভিতরের দিকে চলিয়া গিয়াছে— অস্পষ্ট অন্ধকার; হয়তো অপর প্রান্তে দুর্গের উপরে উঠিবার সোপান আছে।
চক্ষু আলোকে আরও অভ্যস্ত হইলে গৌরী দেখিতে পাইল, লণ্ঠনের দুই-তিন হাত পিছনে একটা লোক দেয়ালে ঠেস দিয়া বসিয়া আছে। তাহার মুখ দেখা যাইতেছে না, একটা হাত কপালের উপর ন্যস্ত; বোধহয় একাকী বসিয়া চিন্তা করিতেছে, কিংবা তন্দ্রাচ্ছন্ন হইয়া পড়িয়াছে। সুড়ঙ্গের মধ্যে আর কেহ নাই।
গৌরী একবার চক্ষু মুদিয়া নিজেকে সুস্থ ও সংযত করিয়া লইল। তারপর দ্বারের কানায় ভর দিয়া জল হইতে উঠিয়া সিক্তদেহে দ্বারমুখে দাঁড়াইল।
উপবিষ্ট লোকটা অব্যক্ত শব্দ করিয়া ধড়মড় করিয়া উঠিয়া দাঁড়াইল। গৌরী ছোরা তুলিয়া এক লাফে তাহার সম্মুখীন হইল।
‘মহারাজ!’
গৌরীর উদ্যত ছোরা অর্ধপথে রুখিয়া গেল। কণ্ঠস্বর পরিচিত।
গৌরী লণ্ঠনের আলোকে লোকটার ত্রাসবিস্ময়-বিকৃত মুখের পানে চাহিল। মুখখানা চেনা-চেনা। কোথায় তাহাকে দেখিয়াছে?
তারপর সহসা স্মৃতির দ্বার উদঘাটিত হইয়া গেল। গৌরীর হাতের ছোরা মাটিতে পড়িয়া গেল। সে বিপুল আবেগে তাহাকে দুই হাতে আলিঙ্গন করিয়া ধরিয়া প্রায় চিৎকার করিয়া উঠিল— ‘প্রহ্লাদ!’
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন