শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়
পরদিন প্রভাতে শক্তিগড় যাত্রার কথা রাজসংসারে প্রচারিত হইল। চম্পা পূর্বাহ্নে কিছু জানিত না, সংবাদ পাইয়া তাহার ভারী অভিমান হইল। যাত্রার আয়োজন সব ঠিকঠাক হইয়া গিয়াছে, আজই যাওয়া হইবে— অথচ সে কিছু জানে না! মুখ ভার করিয়া সে রাজার মহলের দিকে চলিল।
দ্বারের সম্মুখে রুদ্ররূপ দাঁড়াইয়া আছে; তাহাকে দেখিয়া চম্পা ভ্রূভঙ্গি করিয়া বলিল— ‘রাজা আজ শক্তিগড়ে যাচ্ছেন, তুমি আগে থেকে জানতে?’
উদাসভাবে ঊর্ধ্বদিকে তাকাইয়া রুদ্ররূপ বলিল— ‘জানতাম।’
‘তবে আমাকে বলনি কেন?’
বক্ষ বাহুবদ্ধ করিয়া রুদ্ররূপ জবাব দিল— ‘দরকার মনে করিনি।’
চম্পা রাগিয়া গিয়া বলিল— ‘দরকার মনে করনি! তোমার কি কোনওদিন বুদ্ধি হবে না? এখন আমি এত কম সময়ের মধ্যে তৈরি হয়ে নেব কী করে বলো দেখি!’
রুদ্ররূপ বিস্ময়ে ভ্রূ তুলিয়া বলিল— ‘তুমি তৈরি হবে কী জন্যে?’
অধীরস্বরে চম্পা বলিল— ‘বোকা কোথাকার! রাজার সঙ্গে আমাকে যেতে হবে না?’
রুদ্ররূপ যেন স্তম্ভিতভাবে বলিল— ‘রাজার সঙ্গে তুমি যাবে? সে আবার কী!’
‘পথ ছাড়ো। তোমার সঙ্গে আমি বকতে পারি না।’
রুদ্ররূপ রাজার ঘরের দরজা আগলাইয়া দাঁড়াইয়া বলিল— ‘চম্পা, রাজার সঙ্গে তোমার যাওয়া হতে পারে না।’
চম্পা অবাক হইয়া গেল। কিছুক্ষণ রুদ্ররূপের মুখের পানে তাকাইয়া বলিল— ‘তার মানে? রাজা কি কোনও হুকুম জারি করেছেন?’
‘না। কিন্তু তোমার যাওয়া চলবে না।’
‘কেন চলবে না শুনি?’
‘রাজা যে-কাজে যাচ্ছেন সে-কাজে অনেক বিপদের সম্ভাবনা।’
‘বিপদের সম্ভাবনা! রাজা তো বেড়াতে যাচ্ছেন। আর, বিপদের সম্ভাবনা যদি থাকে, তবে তো আমি যাবই। আমি না গেলে তাঁর পরিচর্যা করবে কে?’
‘চম্পা, জিদ কোরো না, আমরা বড় ভয়ংকর কাজে যাচ্ছি। মেয়েমানুষ সঙ্গে থাকলে সব ভেস্তে যাবে। তোমার যাওয়া কিছুতেই হতে পারে না।’
‘তোমার হুকুম নাকি?’
‘হ্যাঁ, আমার হুকুম।’
‘তোমার হুকুম আমি মানি না। তুমি আমার মালিক নও।’ বলিয়া চম্পা সগর্বে রুদ্ররূপকে সরাইয়া ভিতরে প্রবেশের উপক্রম করিল।
‘চম্পা দেঈ!’
চম্পা চমকিয়া মুখ তুলিল। এমন দৃঢ় এত কঠিন স্বর রুদ্ররূপের সে কখনও শুনে নাই। দুইজনে কিছুক্ষণ পরস্পরের পানে চাহিয়া রহিল; তারপর আস্তে আস্তে চম্পার চোখ নত হইয়া পড়িল। ঠোঁট দুইটি ফুলিতে লাগিল, রুদ্ধ রোদনের কণ্ঠে সে বলিল— ‘আমি তা হলে যেতে পাব না?’
রুদ্ররূপের কণ্ঠস্বরও কোমল হইল; সে বলিল— ‘না, এবার নয়। এবার লক্ষ্মী মেয়ের মতো ঘরে থাকো। আমরা শীঘ্রই ফিরে আসব।’
চম্পা হেঁটমুখে দাঁড়াইয়া রহিল। হঠাৎ একমুহূর্তে অবস্থার সম্পূর্ণ পরিবর্তন হইয়া গিয়াছে। কোন ইন্দ্রজালে এমন হইল? এতদিন চম্পা রুদ্ররূপকে নাকে দড়ি দিয়া ঘুরাইয়াছে— আর আজ—
বশীভূতা চম্পা একবার জল-ভরা চোখ দুইটি রুদ্ররূপের মুখের পানে তুলিল। দর্প তেজ খরশান কথা— আর কিছু নাই! বোধ হয় এতদিনে চম্পা প্রথম নারীত্ব লাভ করিল।
স্খলিত অঞ্চল মাটিতে লুটাইতে লুটাইতে সে ফিরিয়া গেল। যতক্ষণ দেখা গেল, স্বত্বাধিকারী প্রভুর মতো রুদ্ররূপ তাহার দিকে তাকাইয়া রহিল।
সিংগড় হইতে যে প্রাচীন পথ সিধা তিরের মতো শক্তিগড়ের দিকে চলিয়া গিয়াছে, কিস্তা নদীটি চপলগতি সঙ্গীর মতো প্রায় সর্বদাই তার পাশে পাশে চলিয়াছে। কখনও মোড় ফিরিয়া ঈষৎ দূরে চলিয়া গিয়াছে, আবার বাঁকিয়া পথের ঠিক পাশে আসিয়া উপস্থিত হইয়াছে। বেলা দ্বিপ্রহরে সেই পথ দিয়া গৌরী তাহার সওয়ারের দল লইয়া চলিয়াছিল। সবসুদ্ধ পঞ্চাশজন সওয়ার আগে পিছে চলিয়াছে, মধ্যে গৌরী, সর্দার ধনঞ্জয় ও রুদ্ররূপ। সওয়ারদের কোমরে তরবারি, হাতে বর্শা। রুদ্ররূপের কোমরে তরবারি আছে; কিন্তু বর্শা নাই। ধনঞ্জয়ের কটিবন্ধে সর্দারের ভারী পিস্তল। গৌরী প্রায় নিরস্ত্র, তাহার কোমরে কেবল সেই সোনার মুঠযুক্ত ছোরাটি রহিয়াছে, ঝিন্দে আসার প্রাক্কালে শিবশঙ্কর যেটি তাহাকে দিয়াছিলেন। ঘোড়াগুলি মন্থর কদম চালে চলিয়াছে। দ্রুত যাইবার কোনও প্রয়োজন নাই; এই চালে চলিলে ঘণ্টা চারেকের মধ্যে শক্তিগড়ে পৌঁছানো যাইবে। একদল ভৃত্য তাম্বু ও অন্যান্য অবশ্য ব্যবহার্য দ্রব্যাদি লইয়া সকালেই যাত্রা করিয়াছে; তাহারা বাসস্থানাদি নির্মাণ করিয়া প্রস্তুত থাকিবে।
হেমন্তের মাধ্যন্দিন সূর্য তেমন প্রখর নয়। মাঝে মাঝে পথের পাশে বৃদ্ধ শাখাপত্রবহুল পাহাড়ি বৃক্ষ একটু ছায়ারও ব্যবস্থা করিয়াছে। তা ছাড়া কিস্তার জলস্পৃষ্ট বাতাস ভারী মোলায়েম ও স্নিগ্ধ। গৌরী এদিকে একবারও আসে নাই, এতদিন একপ্রকার রাজপ্রাসাদেই অন্তরিন ছিল। এই মুক্ত দৃশ্যের ভিতর দিয়া যাইতে যাইতে তাহার মনে পড়িল সেইদিনের কথা— যেদিন সে প্রথম ঝিন্দ স্টেশনে নামিয়া অশ্বপৃষ্ঠে সিংগড়ের পথ ধরিয়াছিল।
বর্তমান দৃশ্যটা ঠিক তাহার অনুরূপ না হইলেও স্মৃতি-জাগানিয়া বটে! পথ ঋজু, কিন্তু সর্বদা সমতল নয়, সাগরের ঢেউয়ের মতো তরঙ্গায়িত হইয়া গিয়াছে। বামপার্শ্বের বিস্তীর্ণ ভূখণ্ড কঙ্করপূর্ণ ও অমসৃণ। এখানে ওখানে দুই-চারিটি কঠিন-প্রাণ পাহাড়ি গাছের গুল্ম। দক্ষিণে বিসর্পিলগতি কিস্তা। সর্বশেষে সমস্ত পার্বত্য দৃশ্যটিকে ঘিরিয়া বলয়াকৃতি নীল পাহাড়ের রেখা।
ঘোড়ার পিঠে বসিয়া গৌরী কেমন যেন স্বপ্নাবিষ্ট হইয়া পড়িয়াছিল। প্রস্তরময় পথের উপর ঘোড়ার ক্ষুরের সমবেত শব্দ, জিনের চামড়ার মশমশ শব্দ, ঘোড়ার মুখে জিঞ্জিরের ঝিনঝিন শব্দ মিলিয়া একটি ছন্দের সৃষ্টি করিয়াছে— সেই ছন্দের তালে তালে গৌরীর মনটাও কোথায় উধাও হইয়া গিয়াছিল। বিশেষ কোনও চিন্তা মনের মধ্যে থাকে না অথচ অতি সূক্ষ্ম একটা লূতাতন্তু মস্তিষ্কের মধ্যে বিচিত্র আকৃতির ভঙ্গুর জাল বুনিতে থাকে— তাহার মানসিক অবস্থাটা সেইরূপ।
সর্দার ধনঞ্জয়ের কণ্ঠস্বরে তাহার দিবাস্বপ্নের জাল ছিঁড়িয়া গেল। সে মুখ ফিরাইয়া দেখিল, রুদ্ররূপ কখন পিছাইয়া গিয়াছে— কেবল ধনঞ্জয় তাহার পাশে রহিয়াছেন।
ধনঞ্জয় ভ্রূর উপর করতল রাখিয়া সম্মুখ দিকে দৃষ্টি প্রসারিত করিয়া দিলেন; তারপর মৃদুস্বরে কতকটা আত্মগতভাবে বলিলেন— ‘আজ আমাদের অভিযান দেওয়ান কালীশঙ্করের কথা মনে করিয়ে দিচ্ছে। কী আশ্চর্য যোগাযোগ! দেড়শো বছর আগে কে ভেবেছিল যে ঝিন্দ রাজ্যের নাট্যশালায় তাঁর বংশধরেরাই একদিন প্রধান অভিনেতা হয়ে দাঁড়াবে? আশ্চর্য !’
গৌরী বলিল— ‘এবার তোমার হেঁয়ালি ছেড়ে আসল গল্পটা আগাগোড়া বলতে হবে সর্দার। আমাকে কেবল ভ্যাবাচাকা খাইয়ে চুপ করে যাবে— সে হবে না। নাও, এখন তো তোমার কোনও কাজ নেই, এইবার কালীশঙ্করের কেচ্ছা আরম্ভ করো।’
ধনঞ্জয় একটু হাসিলেন; বলিলেন— ‘বলছি। বলবার উপযুক্ত সময় উপস্থিত হয়েছে; কারণ যে-কাজে আমরা চলেছি, তার ফলাফল যে কী হবে তা ভগবানই জানেন। হয়তো শেষ পর্যন্ত—’
‘শেষ পর্যন্ত তোমার গল্প শোনবার জন্য আমি বেঁচে না থাকতে পারি?’
‘কিংবা গল্প বলবার জন্য আমি বেঁচে না থাকতে পারি। সবই সম্ভব। হয়তো আমরা দু’জনেই বেঁচে থাকব, অথচ এ গল্প আর বলা চলবে না। তার চেয়ে এই বেলা সেরে রাখা ভাল।’
গৌরী একটু ভাবিয়া বলিল— ‘আমি এ গল্প শুনলে যদি কারুর অনিষ্টের সম্ভাবনা থাকে, তা হলে বলবার দরকার কী?’
ধনঞ্জয় গম্ভীরভাবে বলিলেন— ‘আপনার পূর্বপুরুষ কালীশঙ্কর সম্বন্ধে একটা রহস্যের ইঙ্গিত দিয়ে আমি আপনাকে এখানে নিয়ে এসেছি; এমন কাজে আপনাকে ব্রতী করেছি যাতে জীবননাশের সম্ভাবনা। সুতরাং আমার কাছে আপনার একটা কৈফিয়ত প্রাপ্য। সে কৈফিয়ত যদি আমি না দিই, আপনি ভাবতে পারেন যে আমি আপনাকে ঠকিয়ে নিজের কাজ হাসিল করেছি।’
‘বেশ, তা হলে বলো।’
‘আমি যে গল্প বলব তাতে শুধু এই কথাই প্রমাণ হবে যে আপনি এ পর্যন্ত অধিকার-বহির্ভূত কোনও কাজ করেননি এবং শেষ পর্যন্ত যদি—’
‘ওকথা অনেকবারই শুনেছি। এবার গল্প আরম্ভ করো।’
ধনঞ্জয় বলিতে আরম্ভ করিলেন। গতিশীল সওয়ার দলের অশ্বক্ষুরধ্বনির ভিতর হইতে তাঁহার অনুচ্চ কণ্ঠস্বর গৌরীর কানে আসিতে লাগিল। সে সম্মুখ দিকে তাকাইয়া শুনিতে লাগিল।
‘গল্প আরম্ভ করবার আগে এ কাহিনী আমি কী করে জানতে পারলাম তা বলা দরকার। রাজপরিবারের এই গূঢ় কাহিনী জনসাধারণের জানবার কথা নয়; বোধহয় বর্তমানে আমি ছাড়া আর কেউ জানে না। শুধু দেওয়ান বজ্ৰপাণি জানেন, তাঁকে আমি বলেছি।
‘জাতিতে বৈশ্য হলেও আমরা পুরুষানুক্রমে রাজার পার্শ্বচর ও দেহরক্ষী— একথা বোধহয় আগে শুনেছেন। দেড়শো বছর আগে আমার ঊর্ধ্বতন পঞ্চম পুরুষ এই পদ প্রথম পেয়েছিলেন। তাঁর নাম ছিল শেঠ চন্দ্রকান্ত। তিনি কী করে তদানীন্তন মহারাজ ধূর্জটি সিংহের অনুগ্রহভাজন হয়ে ক্রমে তাঁর বন্ধু ও পার্শ্বচর হয়ে উঠেছিলেন সে কাহিনী এখানে অবান্তর। এইটুকু বললেই যথেষ্ট হবে যে তিনি ধূর্জটি সিংহের দক্ষিণহস্তস্বরূপ ছিলেন।
‘কিন্তু রাজার পার্শ্বচর হয়েও চন্দ্রকান্ত বেনিয়া স্বভাব ছাড়তে পারেননি। সে সময় বেনিয়া ছাড়া অন্য জাতের মধ্যে লেখাপড়ার রেওয়াজ ছিল না; হিসাব-কিতাব লেখার জন্য বেনিয়াদের লেখাপড়া শিখতে হত। চন্দ্রকান্ত হিসাব তো লিখতেনই, তার ওপর আর একটা জিনিস লিখতেন যা আজকের দিনে অমূল্য বলে পরিগণিত হতে পারে। সেটি হচ্ছে তদানীন্তন রাজ-দরবারের দৈনন্দিন রোজ-নামচা। রাজ-সংসারের খুঁটিনাটি, রাজ-অন্তঃপুরের জনশ্রুতি, দরবারের কেচ্ছা— সবই তাঁর গোপন দপ্তরে স্থান পেত। জীবনের শেষ পনেরো-কুড়ি বছর তিনি নিয়মিত এই কার্যটি করেছিলেন।
‘যা হোক, চন্দ্রকান্ত একদিন বৃদ্ধ বয়সে দেহরক্ষা করলেন। তাঁর দপ্তর অন্যান্য হিসাবের খাতার সঙ্গে রক্ষা করা হল। চন্দ্ৰকান্তের পর থেকে আমাদের বংশে লেখাপড়ার চর্চা কমে গিয়েছিল। যাদের রাজার পাশে থেকে অস্ত্র চালাতে হবে তাদের আবার বিদ্যাশিক্ষার দরকার কী? কাজেই গত চার পুরুষের মধ্যে চন্দ্ৰকান্তের দপ্তর কেউ খুলে পড়লে না।
‘আমিই প্রথম এই দপ্তর উদ্ধার করি। তখন আমার বয়েস কম, কৌতূহল বেশি— চন্দ্ৰকান্তের রোজ-নামচা পড়তে আরম্ভ করলাম। পড়তে পড়তে মনে হল একটা উপন্যাস পড়ছি। সেই দপ্তরে দেওয়ান কালীশঙ্করের জীবনকাহিনী জ্বলজ্বল করে ফুটে ওঠে। মনে হয়, চন্দ্রকান্ত যে কাহিনী লিখে গেছেন তার প্রধান নায়কই যেন কালীশঙ্কর।
‘আর একটা জিনিস সেই দপ্তরের সঙ্গে পেয়েছিলাম। আপনি জানেন, হাতির দাঁতের ফলকের উপর ছবি আঁকার জন্য ঝিন্দ চিরদিন বিখ্যাত। এখন প্রতিকৃতি আঁকার শিল্প লোপ পেয়ে গেছে, কিন্তু সে সময় মোগল যুগের শেষ দিকে এই শিল্পের খুব প্রচার ছিল। চন্দ্ৰকান্তের দপ্তরের সঙ্গে একতাড়া ছবি আঁকার ফলকও পেয়েছিলাম। ফলকের পিছনে চিত্রার্পিত ব্যক্তির নাম লেখা ছিল। সে সময়ের অনেক বড় বড় লোকের ছবি ছিল। রাজা ধূর্জটি সিংয়ের ছবি ছিল। কালীশঙ্করের ছবিও ছিল।
‘তাই, কালীশঙ্করের চেহারা আমার জানা ছিল এবং সেইজন্যই আপনাদের বাড়িতে তাঁর তৈলচিত্র দেখেই আমি বুঝতে পারি যে এ কালীশঙ্কর ছাড়া আর কেউ নয়। সেই তীক্ষ্ণ চোখ, সেই খড়্গের মতো নাক একবার যে দেখেছে সে কখনও ভুলবে না।
‘এতক্ষণে আমার কৈফিয়ত শেষ হল। এবার গল্পটা শুনুন। গল্পটা রোজ-নামচার দেড় হাজার পাতার মধ্যে ছড়ানো আছে; আমি যথাসম্ভব সংকুচিত করে বলছি।’
ধনঞ্জয় কিছুক্ষণ চুপ করিয়া বোধ করি গল্পটা মনে মনে গুছাইয়া লইলেন; তারপর আবার বলিতে আরম্ভ করিলেন—
‘দপ্তরের দ্বিতীয় বছরে কালীশঙ্করের নাম প্রথম পাওয়া যায়। প্রথমে দেখি, রাজসভায় একজন বাঙালি লড়াক্ এসেছে; রাজাকে অনেক রকম অদ্ভুত অস্ত্রকৌশল দেখিয়ে মুগ্ধ করেছে। তারপর দেখি কালীশঙ্কর রাজ-ভ্রাতাদের অস্ত্রগুরু নিযুক্ত হয়েছেন। রাজা তখন বয়সে তরুণ, বংশধর জন্মগ্রহণ করেনি।
‘ক্রমে তিন মাস যেতে না যেতেই দেখতে পাই কালীশঙ্কর রাজসভার প্রধান ওমরা হয়ে দাঁড়িয়েছেন। কী শিকারে, কী মন্ত্রণায়, কী বিলাস-ব্যসনে কালীশঙ্কর না হলে রাজার একদণ্ডও চলে না।
‘কালীশঙ্করকে চন্দ্রকান্ত প্রথমে একটু ঈর্ষার চক্ষে দেখতেন, কিন্তু ক্রমে তিনিও কালীশঙ্করের সম্মোহন শক্তিতে বশীভূত হয়ে পড়লেন। দ্বিতীয় বৎসরের শেষাশেষি দেখি, চন্দ্রকান্ত তাঁর দপ্তরে ‘ভাই কালীশঙ্কর’ লিখতে আরম্ভ করেছেন। তাঁরা দু’জনে যেমন রাজার ডান হাত বাঁ হাত, তেমনি পরস্পর প্রাণপ্রতিম বন্ধু হয়ে উঠেছেন— কেউ কারুর কাছ থেকে কোনও কথা গোপন করেন না।
‘চতুর্থ বর্ষে রাজ্যের সাবেক মন্ত্রী মারা গেলেন। এইবার কালীশঙ্করের চরম উন্নতি হল— রাজা তাঁকে মন্ত্রী নিযুক্ত করলেন। রায় দেওয়ান কালীশঙ্কর রাজ্যের কর্ণধার হয়ে উঠলেন! একজন বিদেশির এই উন্নতিতে অনেকের চোখ টাটাল বটে কিন্তু কার্যদক্ষতায় কূটবুদ্ধিতে রায় দেওয়ানের সমকক্ষ কেউ ছিল না— তাই কেউ উচ্চবাচ্য করতে পারল না। চন্দ্রকান্ত অবশ্য খুব খুশি হলেন। দু’জনের মধ্যে বন্ধুত্ব এত প্রগাঢ় হয়ে উঠেছিল যে একজন অন্য জনের পরামর্শ না নিয়ে কোনও কাজ করতেন না।
‘তারপর আরও দু’বছর কেটে গেল। এই সময়ে কালীশঙ্করের শ্রেষ্ঠ কীর্তি— ঝিন্দের সঙ্গে ইংরাজ-সরকারের মিত্রতা-মূলক সন্ধি। তিনি এমন সুকৌশলে রাজার মর্যাদা রেখে এই কাজ সুসম্পন্ন করলেন যে, রাজা রাজ্যের বাহ্য ও আভ্যন্তরীণ সমস্ত শাসন পালনের ভার তাঁর হাতে তুলে দিয়ে নিশ্চিন্ত আনন্দে দিন যাপন করতে লাগলেন। এইভাবে রাজ্য সুশৃঙ্খলায় চলতে লাগল, কোথাও কোনও গণ্ডগোল নেই। কেবল একটি বিষয়ে রাজা এবং প্রজারা একটু নিরানন্দ— পঁয়ত্রিশ বছর বয়স পর্যন্ত রাজার বংশধর জন্মগ্রহণ করল না। রাজার তিন রানি— তিনজনেই নিঃসন্তান।
‘রাজা হোম যজ্ঞ দৈবকার্য অনেক করলেন; কিন্তু কিছুতেই কোনও ফল হল না। হতাশ হয়ে রাজা শেষে মহাপণ্ডিত রাজগুরুর শরণাপন্ন হলেন। রাজগুরু অনেক চিন্তার পর বললেন— ‘একটিমাত্র উপায় আছে।’
এই পর্যন্ত বলিয়া ধনঞ্জয় থামিলেন।
গৌরী সাগ্রহে বলিল, ‘তারপর—?’
আরও কিছুক্ষণ নীরব থাকিয়া ধনঞ্জয় বলিলেন, ‘প্রাচীনকালে নিয়োগ-প্রথা বলে একটা জিনিস ছিল জানেন?’
স্তম্ভিত হইয়া গৌরী বলিল, ‘জানি—’
ধনঞ্জয় বলিতে লাগিলেন, ‘ঝিন্দে পোষ্যপুত্র গ্রহণের বিধি নেই, কিন্তু অবস্থা বিশেষে নিয়োগ-প্রথা আবহমানকাল থেকে চলে আসছে। রাজবংশেই প্রায় দুশো বছর আগে ওই রকম ব্যাপার করতে হয়েছিল। গুরু নজির দেখিয়ে রাজাকে সেই পথ অবলম্বন করতে উপদেশ দিলেন।
‘ব্যাপারটা বোধ হয় এবার বুঝতে পেরেছেন?’
অস্ফুট স্বরে গৌরী বলিল, ‘কালীশঙ্কর—?’
ধনঞ্জয় ঘাড় নাড়িলেন— ‘প্রকাশ্যে এক মহা পুত্রেষ্টি যজ্ঞের আয়োজন হল, কিন্তু ভেতরে ভেতরে... যজ্ঞ টিকা পরলেন রায় দেওয়ান কালীশঙ্কর। রাজা, রাজগুরু আর স্বয়ং কালীশঙ্কর ছাড়া একথা আর কেউ জানল না। এমনকী রানি পর্যন্ত না। সেকালে অনেক রকম ওষুধ ছিল—
‘যাহোক, যথাসময়ে পাটরানি পদুমা দেবী এক কুমার প্রসব করলেন। রাজ্যে মহা সমারোহ পড়ে গেল; দেশ দেশান্তর থেকে অভিনন্দন এল। রাজা ধূর্জটি সিং কিন্তু উৎসবে যোগ দিতে পারলেন না; তিনি রাজপ্রাসাদে নিজেকে আবদ্ধ করে রাখলেন।
‘ক্রমে যতই দিন যেতে লাগল, রাজার মুখ ততই অন্ধকার হতে লাগল। একটা অসূয়ামিশ্রিত অবসাদের ভাব তাঁর প্রসন্ন চিত্তকে গ্রাস করে নিলে। সর্বদাই ভ্রূকুটি করে থাকেন; সভায় হাসি মশকরার প্রসঙ্গ উঠলে ক্রুদ্ধ সন্দিগ্ধ হয়ে ওঠেন।
‘রাজকুমারের বয়স বাড়তে লাগল। কিন্তু রাজা কুমারকে স্পর্শ করেন না— ঘৃণাভরে তাকে নিজের সুমুখ থেকে সরিয়ে দেন। ওদিকে কালীশঙ্করের সঙ্গে তাঁর সম্বন্ধ এমন হয়ে দাঁড়াল যে সাধারণের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে লাগল। আগে মুহূর্তের জন্য কেউ কাউকে ছেড়ে থাকতে পারতেন না, এখন কেবল রাজকার্য ব্যপদেশে দেখা হয়। যে দু’-চারটে কথা হয় তাও রাজকীয়-ব্যাপার সংক্রান্ত। বয়স্যের সম্পর্ক ক্রমে লুপ্ত হয়ে গেল।
‘এইভাবে দিন কাটতে লাগল। রাজকুমার হরগৌরী সিং বড় হয়ে উঠতে লাগলেন। কুমারের বয়স যখন পাঁচ বছর তখন থেকে রাজসভায় কানাঘুষা আরম্ভ হল। কুমার যতই বড় হচ্ছেন, কালীশঙ্করের সঙ্গে তাঁর চেহারার সাদৃশ্য ততই স্পষ্ট হয়ে উঠছে। সকলেই তা লক্ষ করলে। আড়ালে ইশারা ইঙ্গিত চোখ ঠারাঠারি চলতে লাগল।
‘রাজা তখন মদ ধরেছেন, অষ্টপ্রহর মদে ডুবে থাকেন, সভায় যখন আসেন তখন চারিদিকে কিছুই লক্ষ করেন না; সভাসদরা নানাভাবে তাঁকে প্রসন্ন করবার চেষ্টা করে, তিনি তাদের কথা শুনতে পান না; ভ্রূকুটি-ভয়াল মুখে বসে থাকেন।
‘আরও কয়েক বছর কেটে গেল। রাজা থেকেও নেই, তাই সভাসদদের স্পর্ধা ক্রমে বেড়ে গিয়েছিল। কুমারের যখন আট বছর বয়স তখন এক কাণ্ড হল। একজন নির্বোধ ওমরা রাজার সুমুখেই কুমারের চেহারা নিয়ে একটা বাঁকা ইঙ্গিত করলে, বললে, ‘কুমারের চেহারা যেমন দেওয়ান কালীশঙ্করের মতো, আশা করা যায়, বুদ্ধিতেও তিনি তেমনই প্রখর হবেন।’ রাজা অন্য সময় কিছুই শুনতে পান না, কিন্তু এ কথাগুলো তাঁর কানে গেল; এতদিনের রুদ্ধ গ্লানি অগ্ন্যুৎপাতের মতো বেরিয়ে এল। তিনি সিংহাসন থেকে লাফিয়ে গিয়ে সেই ওমরার চুলের মুঠি ধরলেন, তারপর তলোয়ারের এক কোপে তার মাথা কেটে নিলেন।
‘হুলস্থুল কাণ্ড! এই সময় কালীশঙ্কর দ্রুতপদে বাইরে থেকে এসে রাজার হাত ধরে বললেন, ‘মহারাজ, ক্ষান্ত হোন।’
‘রাজা ধূর্জটি সিং কষায়িত চোখ কালীশঙ্করের দিকে ফেরালেন; তাঁর মুখ দেখে মনে হল, কালীশঙ্করকেও বুঝি তিনি হত্যা করবেন। কিন্তু কালীশঙ্করের চোখের দৃষ্টিতে কী সম্মোহন শক্তি ছিল জানি না, রাজা তাঁর গায়ে অস্ত্র তুলতে পারলেন না। শুধু রক্তে-রাঙা তলোয়ারখানা দ্বারের দিকে দেখিয়ে বললেন, ‘যাও।’
‘কালীশঙ্কর সভা থেকে ফিরে এলেন। সেই রাত্রে চন্দ্ৰকান্তের সঙ্গে গোপনে তাঁর মন্ত্রণা হল। কালীশঙ্কর কুশাগ্ৰধী লোক ছিলেন, অনেক আগে থেকেই তিনি এই দুর্যোগের দিন প্রতীক্ষা করছিলেন— তাই নিজের আজীবন সঞ্চিত টাকাকড়ি সব রাজ্যের বাইরে সরিয়ে ফেলেছিলেন। চন্দ্রকান্ত বললেন, কালীশঙ্করের পক্ষে আর এ রাজ্যে থাকা নিরাপদ নয়; রাজা নিজে তাঁকে হত্যা করতে পারেননি বটে, কিন্তু হত্যা করবার জন্য গুপ্তঘাতক নিযুক্ত হয়েছে— এ খবর তিনি পেয়েছেন। দুই বন্ধু সেই রাত্রে শেষ আলিঙ্গন করে নিলেন।
‘পরদিন কালীশঙ্কর নিরুদ্দেশ হলেন। পনেরো বছর পরে ঝিন্দের রঙ্গমঞ্চে তাঁর অভিনয়ের উপর যবনিকা পড়ে গেল।
‘এর পরের যা ইতিহাস, তা আপনার বংশের ইতিহাস। আমার চেয়ে আপনিই তা বেশি জানেন।’
ধনঞ্জয় নীরব হইলেন। তাঁহার দৃষ্টি একবার গৌরীর কোমরের ছোরাটার উপর গিয়া পড়িল।
একাগ্রভাবে শুনিতে শুনিতে গৌরীর চিবুক বুকের উপর নামিয়া পড়িয়াছিল। সে এইবার মুখ তুলিল; তাহার মুখে একটা অদ্ভুত হাসি খেলিয়া গেল। সম্মুখে প্রায় দুই মাইল দূরে তখন শক্তিগড়ের পাষাণ চূড়া দেখা দিয়াছে, সেইদিকে তাকাইয়া সে যেন অন্যমনস্কভাবে বলিল— ‘অর্থাৎ শঙ্কর সিং, উদিত আর আমি— আমরা সকলেই কালীশঙ্করের বংশধর, জ্ঞাতি ভাই। চমৎকার!’
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন