ভিমরুলের অনুতাপ

শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়

রানির সহিত গৌরীর দৈবক্রমে সাক্ষাৎ ঘটিয়া যাইবার পর হইতে গৌরী ও ধনঞ্জয়ের মাঝখানে ভিতরে ভিতরে একটা দূরত্বের সৃষ্টি হইয়াছিল। পূর্বের বাধাহীন ঘনিষ্ঠ বন্ধুত্ব হ্রাস পাইয়াছিল অথচ ঠিক মনোমালিন্যও বলা চলে না। কিন্তু গৌরী যখন ঝড়োয়ায় গিয়া থাকিবার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করিল, তখন আবার অজ্ঞাতসারেই এই দূরত্ব ঘুচিয়া গিয়া পূর্বের সৌহার্দ্য ও বিশ্বাস ফিরিয়া আসিল। গৌরী মাঝের এই দুই দিন অন্তরের মধ্যে যেন একটু অবলম্বনহীন ও অসহায় বোধ করিতেছিল, এখন আবার সে মনে বল পাইল। একযোগে কাজ করিতে গিয়া সহকারীর প্রতি শ্রদ্ধা ও বিশ্বাসের অভাব যে মানুষকে কীরূপ বিকল করিয়া ফেলে তাহা প্রত্যক্ষ করিয়া ও তাহার কুফল চিন্তা করিয়া দু’জনেই সন্ত্রস্ত হইয়া উঠিয়াছিলেন। বিশ্বাস ও বন্ধুত্ব পুনঃপ্রাপ্ত হইয়া উভয়েই আরামের নিশ্বাস ফেলিয়া বাঁচিলেন।

ঝিন্দে আসিয়া গৌরী আর একটি অনুগত ও অকৃত্রিম বন্ধু লাভ করিয়াছিল— সে রুদ্ররূপ। বয়স দুইজনেরই প্রায় সমান, অবস্থাগতিকে সাহচর্যও প্রায় অবিচ্ছেদ্য হইয়া পড়িয়াছিল— তাই পদ ও মর্যাদার আকাশ পাতাল প্রভেদ সত্ত্বেও দুইজনে পরস্পরের খুব কাছে আসিয়া পড়িয়াছিল। গৌরী যে সত্যই রাজা নয় ইহা রুদ্ররূপ জানিত— সেজন্য তাহার ব্যবহার ও বাহ্য আদব-কায়দায় তিলমাত্র ত্রুটি হয় নাই— কিন্তু তবু মানুষ-গৌরীর প্রতিই সে বিশেষভাবে আকৃষ্ট হইয়া পড়িয়াছিল। শঙ্কর সিং-এর প্রতি তার মনোভাব কীরূপ ছিল তাহা বলা কঠিন; সম্ভবত শঙ্কর সিংকে মানুষ হিসাবে সে কোনওদিন দেখে নাই— রাজা বা রাজপুত্র ভাবিয়া তাহার প্রতি কর্তব্য করিয়া নিশ্চিন্ত ছিল। কিন্তু গৌরীর প্রতি তাহার আনুরক্তি এই রাজভক্তিরও অতিরিক্ত একটা ব্যক্তিগত প্রীতির রূপ ধরিয়া দেখা দিয়াছিল। শঙ্কর সিং-এর জন্যও রুদ্ররূপ নিঃসংকোচে প্রাণ দিতে পারিত, কিন্তু গৌরীর জন্য প্রাণ দিতে পারিত আনন্দের সঙ্গে— কেবলমাত্র কর্তব্যের অনুরোধে নয়।

সম্পূর্ণরূপে সুস্থ হইয়া উঠিবার পর গৌরী প্রাসাদের বাহির হইবার জন্য ছটফট করিতে লাগিল। অবশ্য প্রাসাদে নিষ্কর্মার মতো তাহাকে বসিয়া থাকিতে হইত না, সর্বদাই কোনও-না-কোনও কাজ লাগিয়া থাকিত। প্রত্যহ সকালে দরবারে গিয়া বসিতে হইত, সেখানে নানাবিধ কাজ, মন্ত্রণা ও দেশের বহু গণ্যমান্য লোকের সঙ্গে সাক্ষাৎ ও আলাপ করাও দৈনন্দিন কর্তব্যের মধ্যে দাঁড়াইয়াছিল। তথাপি সর্বপ্রকারে ব্যাপৃত থাকিয়াও তাহার মনে হইত, যেন তাহার গতিবিধির চারিপাশে একটা অদৃশ্য দেওয়াল তাহাকে ঘিরিয়া আবদ্ধ করিয়া রাখিয়াছে। ধনঞ্জয়ের কাছে নগর ভ্রমণের কথা উত্থাপন করিলে তিনি মাথা নাড়িয়া বলিতেন— ‘এখন নয়, আরও দু’দিন যাক।’ বস্তুত নগরভ্রমণে বাহির হওয়া যে সর্বাংশে নিরাপদ নয় তাহা গৌরীও বুঝিত। দেশে অভিষেকের উৎসব এখনও শেষ হয় নাই, এই সময় গোলমালের মধ্যে একটা দুর্ঘটনা ঘটিয়া যাওয়া বিচিত্র নয়। কিন্তু তবু সে স্বাধীনভাবে নিজের ইচ্ছামতো ঘুরিয়া বেড়াইবার জন্য অস্থির হইয়া উঠিয়াছিল।

এদিকে শঙ্কর সিং-এর কোনও সংবাদই পাওয়া যাইতেছিল না। শক্তিগড়ের দিকে যাহারা তল্লাশ করিতে গিয়াছিল তাহারা একে একে ফিরিয়া আসিয়া জানাইয়াছে যে, শক্তিগড়ের অর্ধক্রোশের মধ্যে কাহারও যাইবার উপায় নাই— দুর্গ ঘিরিয়া থানা বসিয়া গিয়াছে। সেই গণ্ডির ভিতর কেহ পদার্পণ করিবার চেষ্টা করিলেই অশেষভাবে লাঞ্ছিত হইয়া বিতাড়িত হইতেছে। দুর্গের আশেপাশে যে-সকল গ্রাম আছে সেখানেও অনুসন্ধান করিয়া কোনও ফল পাওয়া যায় নাই; গ্রামবাসীরা উদিতের প্রজা ও ভক্ত, কিছু জানিলেও বাহিরের লোকের কাছে প্রকাশ করে না, উপরন্তু কৌতূহলী জিজ্ঞাসুকে গালাগালি ও মার-ধর করিয়া দূর করিয়া দেয়। একজন দুঃসাহসিক গুপ্তচর নৌকায় করিয়া কিস্তার দিক হইতে দুর্গ পর্যবেক্ষণ করিতে গিয়াছিল— উদিত তাহাকে ধরিয়া আনিয়া স্বহস্তে এমন নির্দয় প্রহার করিয়াছে যে লোকটা আধমরা হইয়া কোনও মতে ফিরিয়া আসিয়াছে। অতঃপর আর কেহ ও অঞ্চলে যাইতে রাজি নয়।

এইরূপে শঙ্কর সিং-এর অনুসন্ধান কার্য চারিদিকে বাধাপ্রাপ্ত হইয়া একপ্রকার নিশ্চল হইয়া আছে।

অভিষেকের দিন পাঁচ-ছয় পরে একদিন অপরাহ্নে গৌরী ও রুদ্ররূপ প্রাসাদ সংলগ্ন ব্যায়ামগৃহে অসি-ক্রীড়া করিতেছিল। ধনঞ্জয় অদূরে দাঁড়াইয়া দেখিতেছিলেন ও বিচারকের কার্য করিতেছিলেন।

দেশি তলোয়ার খেলা। দীর্ঘ ও ঈষদ্বক্র তরবারির ফলায় সূক্ষ্ম কাপড় জড়ানো, খেলোয়াড় দু’জনের মুখ ও গ্রীবাদেশ লোহার মুখোশে ঢাকা। খেলার ঝোঁকে দুইজনেই বেশ উত্তেজিত হইয়া উঠিয়াছে— মুখোশের জালের ভিতর দিয়া তাহাদের চক্ষু জ্বলিতেছে। দুইটি তলোয়ারই বন বন করিয়া ঘুরিতেছে। কদাচিৎ অস্ত্রে অস্ত্রে লাগিয়া ঝনৎকার উঠিতেছে, কখনও একের তরবারি অন্যের দেহ লঘুভাবে স্পর্শ করিতেছে। ধনঞ্জয় মাঝে মাঝে বলিয়া উঠিতেছেন— সাবাস! চোট! জখম! ইত্যাদি।

ক্রমে রুদ্ররূপের অসিচালনায় ঈযৎ ক্লান্তি ও শিথিলতার লক্ষণ দেখা দিল; সে গৌরীর আক্রমণ প্রতিরোধ করিতে না পারিয়া পিছু হটিতে আরম্ভ করিল। তারপর হঠাৎ গৌরী তাহার ঘূর্ণিত অসিকে পাশ কাটাইয়া বিদ্যুদ্বেগে তাহার

মস্তকে আঘাত করিল, শিরস্ত্রাণের উপর ঝনাৎ করিয়া শব্দ হইল। ধনঞ্জয় বলিয়া উঠিলেন— ‘ফতে!’

দুইজন যোদ্ধাই তরবারি নামাইয়া দাঁড়াইল। গৌরী মুখোশ খুলিয়া ঘর্মাক্ত মুখ মুছিতে মুছিতে সহাস্যে বলিল— ‘সর্দার, এবার তুমি এসো।’

ধনঞ্জয় নিঃশব্দে তরবারি রুদ্ররূপের হাত হইতে লইয়া গৌরীর সম্মুখে দাঁড়াইলেন; তরবারির মুঠ একবার কপালে ছোঁয়াইয়া বলিলেন— ‘আসুন!’

‘মুখোশ পরবে না?’

‘দরকার নেই।’

অসি চালনায় ধনঞ্জয়ের খ্যাতি গৌরী জানিত, সে সাবধানে নিজের দেহ যথাসাধ্য সুরক্ষিত করিয়া আক্রমণে অগ্রসর হইল। ধনঞ্জয় শুধু অসিখানা নিজের দেহের সম্মুখে ধরিয়া স্থিরভাবে দাঁড়াইয়া রহিলেন। ডাহিনের দিকে একটা ফাঁক লক্ষ করিয়া গৌরী সেইদিকে তলোয়ার চালাইল, ধনঞ্জয় অবহেলাভরে তাহা সরাইয়া দিলেন। আবার গৌরী বাঁদিকে আক্রমণ করিল, কিন্তু কবজির একটা অলস সঞ্চালন দ্বারা ধনঞ্জয় সে আঘাত নিজ তরবারির উপর গ্রহণ করিলেন। তাঁহার ভাব দেখিয়া মনে হইতে লাগিল, তিনি যেন চিন্তায় নিমগ্ন থাকিয়া অন্যমনস্কভাবে বাঁ হাত দিয়া একটা বিরক্তিকর মাছি তাড়াইতেছেন।

ধনঞ্জয় যতই স্থির ও অবিচলিত হইয়া রহিলেন— গৌরী ততই অসহিষ্ণু হইয়া উঠিতে লাগিল। শেষে আর সে ধৈর্য ধারণ করিতে না পারিয়া এক পা পিছু হটিয়া চিতাবাঘের মতো ধনঞ্জয়ের ঘাড়ের উপর লাফাইয়া পড়িল। তাঁহার মাথার উপর তলোয়ারের কোপ বসাইতে গিয়া দেখিল ধনঞ্জয় সেখানে নাই। ধনঞ্জয় কোথায় তাহা নির্ণয় করিবার পূর্বেই সে নিজের দক্ষিণ হস্তের মুঠিতে একটা বেদনা অনুভব করিল ও পরক্ষণেই দেখিল তলোয়ারখানা তাহার অবশ হস্ত হইতে পড়িয়া যাইতেছে।

ধনঞ্জয় ভূমি হইতে তলোয়ার তুলিয়া গৌরীকে প্রত্যর্পণ করিয়া হাসিমুখে বলিলেন— ‘ফতে।’

মুখোশ খুলিয়া গৌরী কিছুক্ষণ নির্বাকভাবে চাহিয়া থাকিয়া বলিল— ‘কী হল বলো দেখি?’

‘কিছু না, আপনি হেরে গেলেন।’

গৌরী মুখের একটা বিমর্ষ অথচ সকৌতুক ভঙ্গি করিয়া বলিল— ‘তা তো দেখতেই পাচ্ছি; কিন্তু হারালে কী করে?’

‘একটা খুব ছোট্ট প্যাঁচ আছে— আপনি সেটা জানেন না।’

‘আমার গোয়ালিয়রের ওস্তাদ তা হলে ফাঁকি দিয়েছে বলো!’— একটা চেয়ারের পিঠে কাশ্মীরি শালের ঢিলা চোগা রাখা ছিল, গৌরী সেটা গায়ে দিতে লাগিল, ধনঞ্জয় তরবারি রাখিয়া তাহাকে সাহায্য করিলেন।

এইসময় ব্যায়ামগৃহের খোলা দ্বারের কাছে একজন শান্ত্রী আসিয়া দাঁড়াইল। রুদ্ররূপ বলিল— ‘কী চাও?’

শান্ত্রী কহিল— ‘ঝড়োয়া থেকে একজন ঘোড়সওয়ার এসেছে— মহারাজের দর্শন চায়।’

ধনঞ্জয় জিজ্ঞাসা করিলেন— ‘কী জন্যে দর্শন চায় কিছু বলেছে?’

শান্ত্রী বলিল— ‘না, সে কিছু বলতে চায় না।’

ধনঞ্জয় বলিলেন— ‘রুদ্ররূপ, দেখো কী ব্যাপার।’

কিয়ৎকাল পরে রুদ্ররূপ ফিরিয়া আসিয়া জানাইল যে দর্শনপ্রার্থীর নাম সুবাদার বিজয়লাল— রাজার সঙ্গে গোপনীয় কথা আছে, ইহা ছাড়া আর কিছু বলিতেছে না।

ধনঞ্জয় গৌরীকে জিজ্ঞাসা করিলেন— ‘আপনি একে চেনেন নাকি?’

গৌরী মাথা নাড়িয়া বলিল— ‘না।’

ধনঞ্জয় ভ্রূকুটি করিয়া চিন্তা করিলেন, শেষে বলিলেন– ‘আচ্ছা, তাকে এইখানেই নিয়ে এসো।’

ঝড়োয়ার দরবার হইতে প্রেরিত দূতও হইতে পারে, আবার না হইতেও পারে; এই ভাবিয়া ধনঞ্জয় ঘরের কোণের এক মেহগনির আলমারি খুলিয়া একটি রিভলভার তুলিয়া লইয়া তাহাতে টোটা ভরিতে লাগিলেন। আলমারিতে ছোরাছুরি, পিস্তল ইত্যাদি নানাবিধ অস্ত্র সাজানো ছিল।

গৌরী বিস্মিত হইয়া জিজ্ঞাসা করিল— ‘ও কী হচ্ছে সর্দার?’

‘বলা তো যায় না— হয়তো—’ বলিয়া সর্দার একটা জানালার ধারে গিয়া দাঁড়াইলেন।

সৈনিক বেশধারী দীর্ঘকায় যুবক রুদ্ররূপের সঙ্গে প্রবেশ করিয়া সম্মুখে চেয়ারে উপবিষ্ট রাজাকে দেখিয়া স্যালুট করিয়া দাঁড়াইল।

গৌরী জিজ্ঞাসা করিল— ‘কে তুমি? কী চাও?’

যুবক একবার ঘরের চারিদিকে দৃষ্টিপাত করিল, দেখিল অদূরে জানালার পাশে ধনঞ্জয় একটা রিভলবার লইয়া অন্যমনস্কভাবে নাড়াচাড়া করিতেছেন, পিছনে দ্বারের কাছে রুদ্ররূপ নিশ্চল হইয়া দাঁড়াইয়া আছে। সে বলিল— ‘মহারাজের সঙ্গে আমার গোপনে কিছু কথা আছে।’

গৌরী ঈষৎ অপ্রসন্নমুখে বলিল— ‘তা আগেই শুনেছি। তোমাকে কখনও দেখেছি বলে মনে হয় না। আমার সঙ্গে তোমার কী গোপনীয় কথা থাকতে পারে?’

যুবক একটু ইতস্তত করিল, একবার ধনঞ্জয়ের দিকে দৃষ্টি ফিরাইল, তারপর মৃদুকণ্ঠে কহিল ‘আমি ভিমরুলের দূত।’

ভ্রূ কুঞ্চিত করিয়া গৌরী তাহার দিকে চাহিল— ‘ভিমরুলের দূত? ও! কৃষ্ণা—?’

যুবক গম্ভীরভাবে মস্তক অবনত করিল।

গৌরী তখন প্রফুল্লমুখে বলিল— ‘কৃষ্ণা— ভিমরুলের দূত!— একথা আগে বলোনি কেন? তা— ভিমরুলের কী সমাচার?’

যুবক মুখ ফিরাইয়া নীরবে ধনঞ্জয়ের দিকে চাহিল।

গৌরী সহাস্যে বলিল— ‘সর্দার, তুমি যেতে পারো। সুবাদারের সঙ্গে আমার কিছু কথা আছে।— না, কোনও ভয় নেই— সুবাদার পরিচিত লোকের দূত।’

অনিচ্ছাভরে রিভলবার রাখিয়া ধনঞ্জয় ঘর হইতে বাহির হইয়া গেলেন; তাঁহার মুখ দেখিয়া বোধ হইল তিনি অপ্রসন্ন হইয়া উঠিয়াছেন।

গৌরী রুদ্ররূপকে বলিল— ‘তুমি ঘরের বাইরে পাহারায় থাকো— কেউ না আসে।’

রুদ্ররূপ নিষ্ক্রান্ত হইয়া গেলে গৌরী উৎসুকভাবে জিজ্ঞাসা করিল— ‘কৃষ্ণার কী খবর?’

যুবক উত্তর না দিয়া পাগড়ির ভিতর হইতে একটি পত্র বাহির করিয়া গৌরীর হাতে দিল। গৌরী পড়িল, তাহাতে লেখা আছে—

‘স্বস্তি শ্রীদেবপাদ মহারাজের চরণে কৃষ্ণাবাঈয়ের শত শত প্রণাম। এই পত্রের বাহক সুবাদার বিজয়লাল ঝড়োয়া রাজবংশের এবং সেই সঙ্গে আমার একজন বিশ্বস্ত ও অনুগত কর্মচারী। তাহাকে সকল বিষয়ে বিশ্বাস করিতে পারেন।

‘আপনি সেদিন আমার উপর রাগ করিয়া আমাকে শাস্তি দিবেন বলিয়াছিলেন। শাস্তির ভয়ে আমি অতিশয় অনুতপ্ত হইয়াছি— স্থির করিয়াছি আজ রাত্রেই প্রায়শ্চিত্ত করিব। আপনাকে উপস্থিত থাকিতে হইবে।

‘আজ রাত্রি দশটার সময় কিস্তার পুল যেখানে ঝড়োয়ার রাজ্যে আসিয়া শেষ হইয়াছে, সেইখানে বিজয়লাল উপস্থিত থাকিবে। আপনি আসিবেন। ছদ্মবেশে আসিতে হইবে, যাহাতে কেহ আপনাকে চিনিতে না পারে। একজন বিশ্বাসী পার্শ্বচর সঙ্গে লইতে পারেন। বিজয়লাল আপনাকে যথাস্থানে লইয়া আসিবে। ইতি— আপনার চরণাশ্রিতা কৃষ্ণা।’

চিঠি মুড়িতে মুড়িতে গৌরী মুখ তুলিল, কৌতুক-তরল কণ্ঠে জিজ্ঞাসা করিল— ‘কৃষ্ণা তোমার কে?’— বিজয়লাল নীরবে ঘাড় হেঁট করিয়া রহিল— ‘ও বুঝেছি, তুমি কৃষ্ণার ভাবী সৌহর!— কিন্তু কৃষ্ণা হঠাৎ এত অনুতপ্ত হয়ে উঠল কেন তা তো বুঝতে পারছি না।’ পত্ৰখানা চোগার পকেটে রাখিয়া বলিল— ‘হ্যাঁ— আমি যাব। যথাসময়ে তুমি হাজির থেকো।’

‘যে আজ্ঞা মহারাজ!’ বলিয়া বিজয়লাল অভিবাদন করিয়া প্রস্থানোদ্যত হইল। গৌরী আবার বলিয়া উঠিল— ‘কিন্তু আসল কথাটা কী বলো তো? এ নিমন্ত্রণের ভিতর একটা গূঢ় রহস্য আছে বুঝতে পারছি। সেটা কী?’

বিজয়লাল বলিল— ‘তা জানি না মহারাজ।’

বিজয়লাল গম্ভীর প্রকৃতির লোক, অত্যন্ত অল্পভাষী। তাহার শ্যামবর্ণ দৃঢ় মুখের দিকে চাহিয়া তাহার মনের কথা কিছুই বুঝা যায় না। তবু গৌরী যদি ভাল করিয়া লক্ষ করিত তাহা হইলে দেখিতে পাইত— বিজয়লালের ফৌজি গোঁফের আড়ালে অল্প একটু হাসি দেখা দিয়াই মিলাইয়া গেল।

বিজয়লাল প্রস্থান করিলে গৌরী চিঠিখানা পকেট হইতে বাহির করিয়া নাড়াচাড়া করিতে করিতে অনেকক্ষণ বসিয়া রহিল। মনের অগোচরে পাপ নাই বটে কিন্তু আশা আকাঙ্ক্ষা প্রবৃত্তি ও কর্তব্যবুদ্ধি মিলিয়া মানুষের মনে এমন একটা অবস্থা সৃষ্টি হয়— যখন সে মনকে চোখ ঠারিতেছে কিনা নিজেই বুঝিতে পারে না। তাই কৌতূহল ও আগ্রহ যতই গৌরীর মনে প্রবল হইয়া উঠিতে লাগিল ততই সে মনকে বুঝাইতে লাগিল যে, ইহা কেবল একটা মজাদার অ্যাডভেনচারের জন্য আগ্রহ, বহুদিন রাজপ্রাসাদের মধ্যে আবদ্ধ থাকিবার পর মুক্তির আশাই তাহাকে উদগ্রীব করিয়া তুলিয়াছে। নচেৎ কৃষ্ণার সহিত সাক্ষাৎ করিবার আর কোনও আকর্ষণই থাকিতে পারে না।

অন্তরের গূঢ়তম প্রদেশে কৃষ্ণার এই অনুতাপের মর্ম যে সে অভ্রান্তভাবে বুঝিয়াছে, একথা যদি তাহার জাগ্রত মনের সম্মুখে প্রকট হইয়া উঠিত তাহা হইলে বোধহয় সে এই নিমন্ত্রণ রক্ষা করিতে সক্ষম হইত না। অথচ পরিহাস এই যে, ধনঞ্জয় সকল কথা শুনিয়া নিশ্চয় এ প্রস্তাবে বাধা দিবেন, ইহা অনুমান করিয়া সে আগে হইতেই মনে মনে বিদ্রোহী হইয়া উঠিল।

তাই ধনঞ্জয় যখন আসিয়া জিজ্ঞাসা করিলেন— ‘ব্যাপার কী? দূত কীসের?’ তখন গৌরী চিঠিখানা সন্তর্পণে পকেটে রাখিয়া দিয়া তাচ্ছিল্যভরে বলিল— ‘কিছু না। আজ রাত্রে একবার নগর ভ্রমণে বার হব। সঙ্গে কেবল রুদ্ররূপ থাকবে।’

বিস্মিত ধনঞ্জয় বলিলেন— ‘সে কী! হঠাৎ এরকম—’

গৌরী বলিল— ‘হঠাৎই স্থির করেছি।’

ধনঞ্জয় বলিলেন— ‘কিন্তু রাত্রে অরক্ষিত অবস্থায় যাওয়া তো হতে পারে না।’

গৌরী একটু ঝাঁঝালো সুরে বলিল— ‘নিশ্চয়ই হতে পারে, যখন আমি স্থির করেছি।’

ধনঞ্জয় কিছুক্ষণ আকুঞ্চিত চক্ষে গৌরীকে নিরীক্ষণ করিয়া ধীরে ধীরে বলিলেন— ‘কিন্তু এরকম স্থির করার কারণ জানতে পারি কি?’

‘না।’ গৌরী উঠিয়া দাঁড়াইল, একটু থামিয়া বলিল— ‘ভয়ের কোনও কারণ নেই। আমরা ছদ্মবেশে থাকব, কেউ চিনতে পারবে না।’

‘কিন্তু ঝড়োয়ায় যাওয়া কি আপনার উচিত হচ্ছে?’

গৌরীর মুখ সহসা আরক্ত হইয়া উঠিল, কিন্তু সে সংযত স্বরেই বলিল— ‘উচিত কিনা সেকথা আমি কারুর সঙ্গে আলোচনা করতে চাই না। আমি ঝিন্দের বন্দী নই— আপাতত ঝিন্দের রাজা।’

ধনঞ্জয় আবার কী একটা বলিতে গেলেন, কিন্তু তৎপূর্বেই গৌরী ঘর হইতে নিষ্ক্রান্ত হইয়া গেল।

শূন্য ঘরে ধনঞ্জয় কিছুক্ষণ দাঁড়াইয়া রহিলেন; তারপর অস্ফুটস্বরে বকিতে বকিতে গৌরীর অনুসরণ করিলেন।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%