মনিহারীর দোকান

শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়

গৌরীর একটু ধোঁকা লাগিল। প্রহ্লাদচন্দ্র দত্ত! বাঙালি নাকি? প্রহ্লাদ নামটা বাঙালির মধ্যে খুব চলিত নয়— কিন্তু প্রহ্লাদচন্দ্র! ভারতবর্ষের অন্য কোনও জাতি তো নামের মধ্যস্থলে ‘চন্দ্র’ ব্যবহার করে না। শুধু প্রহ্লাদ দত্ত হইলে অন্য জাতি হওয়া সম্ভব ছিল। গৌরী উত্তেজিত হইয়া উঠিল— বাঙালির সন্তান এই সুদূর বিদেশে আসিয়া ব্যবসা ফাঁদিয়া বসিয়াছে!

রুদ্ররূপ সুগন্ধি মশলাদার পান আনিয়া হাতে দিতেই গৌরী জিজ্ঞাসা করিল— ‘রুদ্ররূপ, ওই দোকানের সাইনবোর্ড দেখছ? কোন দেশের লোক আন্দাজ করতে পারো?’

রুদ্ররূপ বলিল— ‘না। পাঞ্জাবি হতে পারে।’

গৌরী বলিল— ‘উঁহু বোধহয় বাঙালি। এসো দেখা যাক।’

রাস্তা পার হইয়া উভয়ে দোকানে প্রবেশ করিল। দোকানের ভিতরটি বেশ সুপরিসর— গোটা চারেক ডে-লাইট ল্যাম্প মাথার উপর জ্বলিতেছে। দূরে ঘরের পিছন দিকে দোকানদারের গদি।

দোকানে প্রবেশ করিয়া প্রথমে গৌরী কাহাকেও দেখিতে পাইল না। তারপর দেখিল, গদির বিছানার উপর মুখোমুখি বসিয়া দুইজন লোক নিম্নস্বরে কথা কহিতেছে— ‘তুমি না গেলে চলবে না, আমাকে এখনই ফিরতে হবে, সকালে স্টেশনে হাজির থাকা চাই।’ ‘না, আজ আমি পারব না, আমার অনেক কাজ!’— এক পক্ষের অনিচ্ছা ও অন্য পক্ষের সাগ্রহ উপরোধ, অস্পষ্টভাবে গৌরী শুনিতে পাইল।

রুদ্ররূপ একবার তাহাদের দিকে চাহিয়াই চোখ ফিরাইয়া লইল, মৃদুস্বরে বলিল— ‘পেছন ফিরে দাঁড়ান, চিনতে পারবে।’

দুইজনে পিছন ফিরিয়া জানালার পণ্য দেখিতে লাগিল। গৌরী জিজ্ঞাসা করিল— ‘কে ওরা?’

‘একজন ঝিন্দের স্টেশনমাস্টার স্বরূপদাস— অন্যটি বোধহয় দোকানদার। চলুন, এখানে আর থেকে কাজ নেই।’

‘একটু দাঁড়াও।’

মিনিট পাঁচেক পরে স্টেশনমাস্টার অসন্তুষ্টভাবে বকিতে বকিতে চলিয়া গেল। তাহার কয়েকটা অসংলগ্ন কথা গৌরীর কানে পৌঁছিল— ‘এই রাত্রে শক্তিগড় যাওয়া... কাল সকালেই আবার স্টেশন...’

শক্তিগড় শুনিয়া গৌরী কান খাড়া করিয়াছিল, কিন্তু আর কিছু শুনিতে পাইল না।

এতক্ষণে দোকানদারের হুঁশ হইল যে, দুইজন গ্রাহক দোকানে আসিয়াছে। সে উঠিয়া আসিয়া জিজ্ঞাসা করিল— ‘ক্যাঁ চ্যহিয়ে বাবুসাব?’

পশ্চিমি ধরনে কাপড় ও ছিটের চুড়িদার পাঞ্জাবি পরা দোকানদারকে দেখিয়া বা তাহার কথা শুনিয়া কাহার সাধ্য আন্দাজ করে যে সে পুরাপুরি খোট্টা নয়! গৌরী তাহার সম্মুখীন হইল; তাহার আপাদমস্তক নিরীক্ষণ করিয়া বাংলা ভাষায় বলিল— ‘তুমি বাঙালি?’

লোকটি প্রথমে একটু ভ্যাবাচাকা খাইয়া গেল, তারপর তীক্ষ্ণদৃষ্টিতে গৌরীর মুখের দিকে চাহিয়াই সভয়ে দুই পা পিছাইয়া গিয়া আভূমি অবনত হইয়া অভিবাদন করিল। চক্ষু বিস্ফারিত করিয়া দুইবার ঢোক গিলিয়া বলিল— ‘হ্যাঁ, আমি বাঙালি। মহারাজ— আপনি— আপনি—’

‘চুপ!’ গৌরী ঠোঁটের উপর আঙুল রাখিল— ‘তুমি কতদিন এখানে আছ?’

হাতজোড় করিয়া প্রহ্লাদ বলিল— ‘আজ্ঞে, প্রায় পনেরো বছর। এখানেই বসবাস করছি।’

গৌরী জিজ্ঞাসা করিল— ‘তুমি কায়স্থ? বাড়ি কোন জেলায়?’

প্রহ্লাদ বলিল— ‘আজ্ঞে কায়স্থ, বাড়ি বীরভূম জেলায়। কিন্তু পনেরো বছর দেশের মুখ দেখিনি। মাঝে মাঝে যেতে বড় ইচ্ছে করে, কিন্তু কারবার ফেলে যেতে পারি না।’

‘দেশে তোমার আত্মীয়স্বজন কেউ নেই!’

‘আজ্ঞে না। দূর সম্পর্কের খুড়ো জ্যাঠা যারা ছিল তারা বোধহয় এতদিন মরে হেজে গেছে। আমি এই দেশেই বিবাহাদি করেছি।’

বাংলাদেশের কায়স্থ সন্তান ঝিন্দে আসিয়া কীভাবে বিবাহাদি করিয়া ফেলিল, গৌরী ঠিক বুঝিল না; কিন্তু প্রহ্লাদ লোকটিকে তাহার মনে মনে বেশ পছন্দ হইল। সে যে অত্যন্ত চতুর লোক এই সামান্য কথাবার্তাতেই তাহা সে বুঝিতে পারিয়াছিল। গৌরী বলিল— ‘বেশ বেশ, খুব খুশি হলাম। আমাকে যখন চিনতে পেরেছ তখন বলি, আমি অপ্রকাশ্যভাবে নগর পরিদর্শন করতে বেরিয়েছি, একথা জানাজানি হয় আমার ইচ্ছা নয়। তুমি হুঁশিয়ার লোক, তোমাকে বেশি বলবার দরকার নেই।— এখন তোমার দোকানে উপহার দেবার মতো ভাল জিনিস কী আছে দেখাও।’

‘যে-আজ্ঞে মহা—শয়!’ প্রহ্লাদ ভালমানুষের মতো একটু বিনীত হাস্য করিয়া বলিল— ‘আপনি এত সুন্দর বাংলা বলেন যে আশ্চর্য হতে হয়। বাঙালি ছাড়া এরকম বাংলা বলতে আমি আর কাউকে শুনিনি।’

তাহার মুখের উপর দৃষ্টি স্থাপিত করিয়া গৌরী বলিল— ‘তাই নাকি? তবে কি তোমার মনে হয় আমি বাঙালি?’

‘না না— সে কী কথা মহারাজ! আমি বলছিলাম—’

‘আমি অনেকদিন বাংলাদেশে ছিলাম, তাই ভাল বাংলা বলতে পারি— বুঝলে?’

প্রহ্লাদ তাড়াতাড়ি সম্মতি-জ্ঞাপক ঘাড় নাড়িল; তারপর স্বয়ং অগ্রগামী হইয়া দোকানের বহুবিধ শৌখিন ও মহার্ঘ্য পণ্যসম্ভার দেখাইতে লাগিল।

গজদন্ত ও সোনারূপার কারুশিল্পের জন্য ঝিন্দ প্রসিদ্ধ; অধিকন্তু অন্যান্য দেশ-বিদেশের বাহারে শিল্পও আছে। গৌরী পছন্দ করিয়া কয়েকটি জিনিস কিনিল। কিনিবার প্রয়োজন ছিল বলিয়া নয়, স্বদেশবাসী দোকানদারের প্রতি মমতাবশত প্রায় পাঁচ-সাত শত টাকার জিনিস খরিদ হইয়া গেল। গৌরী মনে মনে স্থির করিল খেলনাগুলি সে চম্পাকে উপহার দিবে।

একটি বৈদ্যুতিক টর্চ গৌরীর ভারী পছন্দ হইল। হাতির দাঁতের একটি ভুট্টা— প্রায় নয় ইঞ্চি লম্বা— তাহার ভিতরটা ফাঁপা, সেল পুরিবার ব্যবস্থা আছে; সম্মুখে কাচ বসানো। ভুট্টার গায়ে একটি মাত্র লাল দানা আছে, সেটি টিপিলেই বিদ্যুৎ বাতি জ্বলিয়া উঠে।

টর্চটি হাতে লইয়া গৌরী বলিল— ‘এটা আমি সঙ্গে নিলাম। বাকিগুলো প্রাসাদে পাঠিয়ে দিয়ো— কাল দাম পাবে।’

আহ্লাদিত প্রহ্লাদ করজোড়ে বলিল— ‘জো হুকুম।’

দোকান হইতে বাহির হইয়া দুইজনে নীরবে দক্ষিণমুখে চলিল। এই পথই ঋজু রেখায় গিয়া কিস্তার পুলের উপর দিয়া ঝড়োয়ায় পৌঁছিয়াছে।

ক্রমে দোকানপাট শেষ হইয়া পথ জনবিরল হইতে আরম্ভ করিল। দুইপাশে আর ঘনসন্নিবিষ্ট বাড়ি নাই— মাঝে মাঝে তরুবীথি; তরুবীথির পশ্চাতে ক্কচিৎ দুই একখানা বড় বড় বাড়ি। অধিকাংশই ফাঁকা মাঠ।

ঝিন্দের পথে আলোকের ব্যবস্থা ভাল নয়, বিদ্যুৎ এখনও সেখানে প্রবেশ লাভ করে নাই। দূরে দূরে এক একটা কেরোসিন ল্যাম্পের স্তম্ভ; তাহা হইতে যে ক্ষীণ আলোক বিকীর্ণ হইতেছে পথ চলার পক্ষে তাহা যথেষ্ট নয়। নবক্রীত টর্চটা মাঝে মাঝে জ্বালিয়া গৌরী চলিতে লাগিল।

মাইলখানেক পথ এইভাবে চলিবার পর একটা প্রকাণ্ড কম্পাউন্ডের লোহার রেলিং রাস্তার ধার দিয়া বহু দূর পর্যন্ত গিয়াছে দেখিয়া গৌরী টর্চের আলো ফেলিয়া ভিতরটা দেখিবার চেষ্টা করিল। বিশেষ কিছু দেখা গেল না, কেবল একটা অন্ধকার-দর্শন বাড়ির আকার অস্পষ্টভাবে চোখে পড়িল। রুদ্ররূপ বলিল— ‘এটা উদিতের বাগানবাড়ি।’

আরও কিছুদূর যাইবার পর বাগানবাড়ির উঁচু পাথরের সিং-দরজা চোখে পড়িল। তাহারা সিং-দরজার প্রায় সম্মুখীন হইয়াছে, এমন সময় দ্রুত অশ্বক্ষুরধ্বনির সঙ্গে সঙ্গে একটা ফিটন গাড়ি কম্পাউন্ডের ভিতর হইতে বাহির হইয়া আসিল। রাস্তায় পড়িয়াই গাড়ি বিদ্যুদ্বেগে উত্তরদিকে মোড় লইল, গৌরী ও রুদ্ররূপ লাফাইয়া সরিয়া না গেলে গাড়িখানা তাহাদের ঘাড়ের উপর আসিয়া পড়িত। গৌরী গাড়ির পথ হইতে সরিয়া গিয়াই গাড়ির উপর টর্চের আলো ফেলিল। নিমেষের জন্য একটা পরিচিত মুখ সেই আলোতে দেখা গেল; তারপর জুড়ি-ঘোড়ার গাড়ি তিরবেগে অন্ধকার পথে অদৃশ্য হইয়া গেল।

গৌরী পিছন ফিরিয়া ক্রমশ ক্ষীয়মাণ চক্ৰধ্বনির দিকে দৃষ্টি প্রেরণ করিয়া কহিল— ‘স্টেশনমাস্টার স্বরূপদাস। শক্তিগড়ে যাবার জন্যে ভারী তাড়া দেখছি।’ একটু ভাবিয়া জিজ্ঞাসা করিল— ‘গাড়িখানা উদিতের— না?’

রুদ্ররূপ বলিল— ‘হ্যাঁ। এইখানেই উদিত সিংহের আস্তাবল।’

গৌরী কতকটা নিজমনেই বলিল— ‘উদিতকে কী খবর দিতে গেল কে জানে। জরুরি খবর নিশ্চয়।’

একটা এলোমেলো ঠান্ডা হাওয়া বহিতেছিল। গৌরী আবার চলিতে আরম্ভ করিয়াছে এমন সময় উদিতের ফটকের ভিতর হইতে একখণ্ড কাগজ বাতাসে ওলট-পালট খাইতে খাইতে তাহার প্রায় পায়ের কাছে আসিয়া পড়িল। টর্চের আলো ফেলিয়া গৌরী দেখিল— একটা টেলিগ্রাম— কৌতূহলবশে তুলিয়া লইয়া পড়িল, তাহাতে লেখা রহিয়াছে—

স্বরূপদাস— স্টেশনমাস্টার ঝিন্দ

সন্ধান পাইয়াছি, গৌরীশঙ্কর রায় বাঙালি জমিদার চেহারা অবিকল—

কিষণলাল

টেলিগ্রামখানা মুড়িয়া গৌরী পকেটে রাখিল। একটা নিশ্বাস ফেলিয়া বলিল— ‘যাক, জানতে পেরেছে তা হলে। এইজন্যে এত তাড়া।’

পথে আর বিশেষ কোনও কথা হইল না। রুদ্ররূপ দুই-একটা প্রশ্ন করিল বটে কিন্তু গৌরী নিজের চিন্তায় নিমগ্ন হইয়া রহিল, উত্তর দিল না। একসময় বলিল— ‘প্রহ্লাদও তা হলে ওদের দলে।’

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%