শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়
ঝিন্দ রাজপ্রাসাদের সদর ও অন্দরের মধ্যবর্তী বিশাল কক্ষটির কেন্দ্রস্থলে আবলুশের টেবিলের সম্মুখে বসিয়া ঝিন্দের রাজা শঙ্কর সিং পত্র লিখিতেছেন।
চারিদিকের খোলা জানালার বাহিরে রৌদ্র-প্রফুল্ল প্রভাত; কয়েকদিন আগে প্রবল ঝড়-বৃষ্টি হইয়া গিয়া আকাশ পালিশ-করা ইস্পাতের মতো ঝকঝক করিতেছে; কোথাও এতটুকু মলিনতার চিহ্ন নাই।
শঙ্কর সিং পত্র লিখিতেছেন বটে, কিন্তু নিবিষ্টমনে পত্ৰ শেষ করিবার অবকাশ পাইতেছেন না। ঘরের দ্বারে রুদ্ররূপ পাহারায় আছে এবং প্রাসাদের সদরে স্বয়ং ধনঞ্জয় বাঘের মতো থাবা পাতিয়া বসিয়া আছেন; তবুও রাজদর্শনপ্রার্থী সম্ভ্রান্ত জনগণের স্রোত ঠেকাইয়া রাখা যাইতেছে না। ডাক্তার গঙ্গানাথের দোহাই পর্যন্ত কেহ মানিতেছে না। শক্তিগড় দুর্গে রাজার প্রতি হিংসুক উদিতের আক্রমণ ও রাজার অসাধারণ বাহুবলে উদিত, ময়ূরবাহন প্রভৃতির মৃত্যুর কথা রাষ্ট্র হইয়া গিয়াছে। উদিত যে রাজাকে দুর্গে নিমন্ত্রণ করিয়া লইয়া গিয়া বিশ্বাসঘাতকতাপূর্বক তাঁহাকে হত্যা করিবার চেষ্টা করিয়াছিল, একথা কাহারও অবিদিত নাই। মন্ত্রী বজ্ৰপাণি ভার্গব ও সর্দার ধনঞ্জয় এই শোচনীয় ভ্রাতৃবিরোধের কাহিনী গোপন করিতে চাহিয়াছিলেন, কিন্তু তাঁহাদের চেষ্টা ব্যর্থ হইয়াছে। সত্য কথা চাপিয়া রাখা যায় না, প্রকাশ হইয়া পড়িবেই। তাই গত কয়েকদিন ধরিয়া দেশের গণ্যমান্য ব্যক্তিগণ ক্রমাগত রাজাকে অভিনন্দন জানাইয়া যাইতেছেন।
তাঁহাদের শুভাগমনের ফাঁকে ফাঁকে পত্র-লিখন চলিতেছে—
—যার হাতে চিঠি পাঠালাম, তার নাম প্রহ্লাদচন্দ্র দত্ত। সে বাঙালি, যদিও তার ভাষা শুনলে সে বিষয়ে সন্দেহ জন্মাতে পারে। কিন্তু ভাষা যাই হোক, প্রহ্লাদ খাঁটি বাঙালি। গত কয়েকদিন ধরে আমি কেবলই ভাবছি, প্রহ্লাদ যদি বাঙালি না হত? অনেককে বলতে শুনেছি, বাঙালির ভায়ে ভায়ে মিল নেই, যেখানে দুটি বাঙালি সেখানেই ঝগড়া। মিথ্যে কথা। বিদেশে বাঙালির মতো বাঙালির বন্ধু আর নেই। যদি সন্দেহ হয়, প্রহ্লাদকে স্মরণ কোরো।
রুদ্ররূপ দ্বারের পরদা ফাঁক করিয়া জানাইল, ঝড়োয়ার বিজয়লালকে সঙ্গে লইয়া ধনঞ্জয় আসিতেছেন। শঙ্কর সিং অসমাপ্ত পত্র সরাইয়া রাখিলেন।
বিজয়লাল মিলিটারি স্যালুট করিয়া একখানি পত্র রাজার হাতে দিল। ঝড়োয়ার মন্ত্রিমণ্ডলের পক্ষ হইতে রাজকীয় লেফাফাদুরস্ত পত্র— দেওয়ান লিখিয়াছেন। অভিনন্দন ও শুভেচ্ছা জ্ঞাপন করা হইয়াছে।
পত্রে চোখ বুলাইয়া শঙ্কর সিং বিজয়লালের দিকে দৃষ্টি তুলিলেন; গম্ভীরমুখে জিজ্ঞাসা করিলেন— ‘রানি কস্তুরীবাঈ ভাল আছেন?’
‘আছেন মহারাজ!’
মহারাজের গম্ভীর মুখের এক কোণে একটু হাসি দেখা দিল— ‘আর— কৃষ্ণাবাঈ? তিনি ভাল আছেন?’
বিজয়লাল অবিচলিত মুখে কেবল একবার মাথা ঝুঁকাইল।
রাজা ধনঞ্জয়ের দিকে ফিরিয়া বলিলেন— ‘সর্দার, সুবাদার বিজয়লালকে আমি আমার খাস পার্শ্বচর নিযুক্ত করিতে চাই। এ বিষয়ে ঝড়োয়ার দরবারের সঙ্গে যে লেখাপড়া করা দরকার, তা আজই যেন করা হয়।’
‘জো হুকুম মহারাজ!’
রাজা মস্তকের একটি সংকেতে উভয়কে বিদায় দিলেন।
— তোমার পায়ে পড়ি অচলবউদি, দেরি কোরো না। যত শিগগির পারো দাদাকে নিয়ে চলে এসো। তোমাদের জন্য যে কী ভয়ংকর মন কেমন করছে তা বলতে পারি না। যদি সম্ভব হত, আমি ছুটে গিয়ে তোমাদের কাছে পড়তাম। কিন্তু এ রাজ্য ছেড়ে বার হবার উপায় নেই, হয়তো ইহজীবনে ছাড়া পাব না। আমি তো ঝিন্দের রাজা নই, ঝিন্দের বন্দী—
রুদ্ররূপের ফ্যাকাশে মুখ ক্ষণকালের জন্য পরদার ফাঁকে দেখা গেল— ‘ত্রিবিক্রম সিং আসছেন।’
কিছুক্ষণ ত্রিবিক্রমের সঙ্গে অভিনন্দনের অভিনয় চলিল। তারপর শঙ্কর সিং সহসা গম্ভীর হইয়া বলিলেন— ‘ত্রিবিক্রম সিং, আমি আপনার মেয়ে চম্পা দেঈর জন্য পাত্র স্থির করেছি।’
ত্রিবিক্রম ঈষৎ চমকিত হইয়া মামুলি ধন্যবাদ জ্ঞাপন করিলেন; তারপর দুইবার কাশিয়া পাত্রের নাম-ধাম জানিতে চাহিলেন।
শঙ্কর সিং কহিলেন— ‘ভারী সৎ পাত্র— আমার দেহরক্ষী রুদ্ররূপ। চম্পাও তাকে পছন্দ করে।’
ত্রিবিক্রম মনে মনে অতিশয় বিব্রত হইয়া উঠিয়াছেন, তাঁহার মুখ দেখিয়াই বুঝা গেল। তিনি গলার মধ্যে নানাপ্রকার শব্দ করিতে লাগিলেন।
শঙ্কর সিং যেন লক্ষ করেন নাই এমনিভাবে বলিলেন— ‘ময়ূরবাহন মরেছে— তার কেউ ওয়ারিশ নেই। আমি স্থির করেছি ময়ূরবাহনের জায়গির রুদ্ররূপকে বকশিস দেব।’
ত্রিবিক্রমের মুখের মেঘ কাটিয়া গেল। তিনি সবিনয়ে রাজার স্তুতিবাচন করিয়া জানাইলেন যে, রাজার অভিরুচির বিরুদ্ধে তাঁহার কোনও কথাই বলিবার ছিল না এবং কোনও কালেই থাকিতে পারে না।
আরও কিছুক্ষণ সদালাপের পর তিনি বিদায় লইলেন।
—রাজকার্যে ভয়ানক ব্যস্ত আছি। ঘটকালি করছি। এইমাত্র একটি বিয়ে ঠিক করে ফেললাম। পাত্র ও পাত্রী পরস্পরকে গভীরভাবে ভালবাসে, কিন্তু মেয়ের বাপ বেঁকে বসেছিল। যাহোক, অনেক কষ্টে তাকে রাজি করেছি। প্রণয়ী-যুগলের মিলনে বাধা আর নেই।
বউদি, বাড়ি ছেড়ে আসবার সময় তোমাকে বলেছিলাম মনে আছে? যে, তুমি যা চাও— অর্থাৎ বউ— তাই এবার একটা ধরে নিয়ে আসব? একটি বউ জোগাড় হয়েছে। আমাদের বংশে বেমানান হবে না; তোমারও বোধহয় পছন্দ হবে। কিন্তু তুমি তাকে বরণ করে ঘরে না তুললে যে কিছুই হবে না বউদি! তুমি এসো এসো এসো। তোমরা না এলে কিছু ভাল লাগছে না। তার নাম কস্তুরী। নামটি ভাল, নয়? মানুষটিকে বোধহয় আরও ভাল লাগবে। সে একটা দেশের রাজকন্যা; কিন্তু আগে থাকতে কিছু বলব না। যদি চিঠিতেই কৌতূহল মিটে যায়, তা হলে হয়তো তুমি আসবে না।
এত্তালা না দিয়াই চম্পা প্রবেশ করিল।
রাজা নুখ তুলিয়া চাহিলেন— ‘কী চম্পা দেঈ?’
চম্পা রাজার পাশে দাঁড়াইয়া অনুযোগের স্বরে বলিল— ‘আজকাল কিছু না খেয়েই দরবার করতে চলে আসছেন? আপনাকে নিয়ে আমি কী করি বলুন তো?’
‘খাওয়া হয়নি! তাই তো, ভুলে গিয়েছিলাম।’
‘আপনি ভুলে যান, কিন্তু আমাকে যে ছটফট করে বেড়াতে হয়। রুদ্ররূপেরও কি একটু আক্কেল নেই, মনে করিয়ে দিতে পারে না?’
‘হাঁ, ভাল কথা। চম্পা, তোমার বাবা এসেছিলেন; রুদ্ররূপকে তুমি বিয়ে করতে চাও শুনে তিনি খুব খুশি হয়ে মত দিয়ে গেছেন।’
চম্পার মুখ রাঙা হইয়া উঠিল, সে ঘাড় বাঁকাইয়া কী একটা কথা বলিতে যাইতেছিল, থামিয়া গিয়া হাত নাড়িয়া যেন কথাটাকে দূরে সরাইয়া দিয়া বলিল— ‘ওসব বাজে কথা শোনবার আমার সময় নেই। আপনার জন্য কী নিয়ে আসব বলুন। দুটো আনারসের মোরব্বা আর একপাত্র গরম শরবত—’
রাজা চিঠিতে মনোনিবেশ করিয়া বলিলেন— ‘দরকার নেই।’
চম্পা বলিল— ‘তা হলে এক বাটি গরম দুধ—’
‘বিরক্ত কোরো না চম্পা, আমি এখন ভারী জরুরি চিঠি লিখছি।’
‘কিন্তু কিছু তো খাওয়া দরকার। একেবারে—’
রাজা হাঁকিলেন— ‘রুদ্ররূপ!’
রুদ্ররূপ শঙ্কিত মুখে প্রবেশ করিল।
চম্পার প্রতি কঠোর দৃষ্টিপাত করিয়া রাজা হুকুম করিলেন— ‘তুমি চম্পা দেঈর হাত ধরো।’
রুদ্ররূপ কিছুক্ষণ হতভম্ব হইয়া রহিল, তারপর ফঁসির আসামির মতো মুখের ভাব করিয়া চম্পার একটি হাত ধরিল।
রাজা বলিলেন— ‘বেশ শক্ত করে ধরেছ? আচ্ছা, এবার ওকে নিয়ে যাও।’
ক্ষীণকণ্ঠে রুদ্ররূপ বলিল— ‘কোথায় নিয়ে যাব?’
‘তোমার বাড়িতে। না না, এখন থাক, সেটা বিয়ের পরে হবে। আপাতত তুমি ওকে ওর মহালে নিয়ে যাও। সেখানে ওকে আটকে রাখবে, যতক্ষণ তোমার কথা না শোনে ওর হাত ছাড়বে না— যাও।’
কড়া হুকুম দিয়া রাজা পুনরায় চিঠিতে মন দিলেন। চম্পা ও রুদ্ররূপ আরক্তমুখে কিছুক্ষণ দাঁড়াইয়া রহিল, তারপর আড়চোখে পরস্পরের পানে চাহিল। দুইজনেরই ঠোঁটের কূলে কূলে হাসি ভরিয়া উঠিল। রাজা তখন চিঠিতে নিমগ্ন হইয়া গিয়াছেন; পা টিপিয়া টিপিয়া উভয়ে দ্বারের দিকে চলিল।
পরদার ওপারে গিয়াই চম্পা সজোরে হাত ছাড়াইয়া লইল, তারপর রুদ্ররূপের বুকে একটা আচমকা কিল মারিয়া হাসিতে হাসিতে ছুটিয়া পলাইল।
—ঝিন্দের মহারাজ শঙ্কর সিং বিদেশিদের খুব খাতির করেন। তোমরা এলে রাজপ্রাসাদেই অতিথি সৎকারের ব্যবস্থা হবে। তা ছাড়া রাজকীয় প্রকাণ্ড জাদুঘরের ভার নেবার জন্য একজন পণ্ডিত লোকের দরকার; দাদা ছাড়া আর তো যোগ্য লোক দেখি না।
এত কথা লেখবার আছে যে কিছুই লেখা হচ্ছে না। তোমরা কবে আসবে?
দাদাকে বোলো, তাঁর দেওয়া ছোরাটা কিস্তার জলে ভেসে গেছে; ছোরার ন্যায্য অধিকারী সেটা বুকে করে নিয়ে গেছে। দুঃখ করবার কিছু নেই।
ভাল কথা, গৌরীশঙ্কর রায় নামক একজন বাঙালি যুবক ঝিন্দে বেড়াতে এসেছিল, সম্প্রতি তার মৃত্যু হয়েছে।
কবে আসবে? প্রণাম নিয়ো। ইতি—
দেবপাদ শ্ৰীমন্মহারাজ
শঙ্কর সিং
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন