শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়
রাত্রি শেষ হইয়া আসিতেছিল।
কৃষ্ণার বিবাহ হইয়া গিয়াছে। কস্তুরী শ্রান্তদেহে দ্বিতলে নিজের শয্যাকক্ষে প্রবেশ করিয়া ভিতর হইতে দ্বার বন্ধ করিয়া দিয়াছিল। ঘরে তৈলের বাতি জ্বলিতেছে, তাহার স্নিগ্ধ আলোকে কস্তুরী একবার চারিদিকে চাহিল। বহুমূল্য আভরণে সজ্জিত কক্ষ, মধ্যস্থলে একটি মখমলে মোড়া পালঙ্ক। নিশ্বাস ফেলিয়া কস্তুরী ভাবিল, আর কৃষ্ণা তাহার শয়নসঙ্গিনী হইবে না।
ক্লান্তিতে শরীর ভরিয়া গিয়াছে, তবু শয্যা আশ্রয় করিতে মন চাহিল না। কস্তুরী ধীরে ধীরে জানালার সম্মুখে গিয়া দাঁড়াইল। আজ কৃষ্ণার বিবাহের প্রত্যেকটি ঘটনা তাহার মনকে আন্দোলিত করিয়াছে; সে আন্দোলন এখনও থামে নাই।
জানালার বাহিরে হৈমন্তী রাত্রির দেহও যেন ধীরে ধীরে হিম হইয়া আসিতেছে। উদ্যানে দুই-চারিটা আলো দূরে দূরে জ্বলিতেছে; গাছের শাখা-প্রশাখার ভিতর দিয়া একটা অপরিস্ফুট প্রভা অন্ধকারকে তরল করিয়া দিয়াছে। উদ্যানের পরেই দ্রুতবহমানা কিস্তা; ক্লান্তি নাই, সুপ্তি নাই, অধীর আগ্রহে প্রপাতের মুখে ছুটিয়া চলিয়াছে।
কস্তুরী কিস্তার পরপারে অগাধ অন্ধকারের মধ্যে দৃষ্টি প্রেরণ করিল। ওইখানে কোথাও এক তাঁবুর মধ্যে তিনি ঘুমাইতেছেন! কেন তিনি একবার আসিলেন না? আসিলে কাজের খুব বেশি ক্ষতি হইত কি?
আবার একটা নিশ্বাস ফেলিয়া কস্তুরী ঘরের দিকে ফিরিতেছিল, জানালার নীচে একটা শব্দ শুনিয়া চকিতে নীচের দিকে তাকাইল। যেন চাপা গলায় কে কথা কহিল।
নীচে অন্ধকার; মনে হইল একটা লোক সেখানে দাঁড়াইয়া আছে। তাহার পাগড়ির জরির উপর ক্ষণেকের জন্য আলো প্রতিফলিত হইল।
‘রানিজি!’
কণ্ঠস্বর অতি নিম্ন, কিন্তু সম্বোধনটা স্পষ্ট কস্তুরীর কানে আসিল। সে গলা বাড়াইয়া বিস্মিতস্বরে বলিল— ‘কে?’
নীচ হইতে উত্তর আসিল— ‘আমি রুদ্ররূপ।’
রুদ্ররূপ! কস্তুরীর মনে পড়িল, কৃষ্ণার মুখে শুনিয়াছে, রুদ্ররূপ মহারাজের পার্শ্বচর। ‘কী চাও?’ তাহার গলা একটু কঁপিয়া গেল।
পূর্ববৎ চাপা গলায় আওয়াজ আসিল— ‘রানিজি, মহারাজ এসেছেন, ঘাটে দাঁড়িয়ে আছেন— আপনার সঙ্গে একবার দেখা করতে চান।’
কস্তুরী জানালা হইতে একটু সরিয়া গিয়া দুই হাতে বুক চাপিয়া কিছুক্ষণ দাঁড়াইয়া রহিল। তিনি আসিয়াছেন! কিন্তু এই শেষ রাত্রে কেন? নির্জনে দেখা করিতে চান বলিয়াই কি আজ বিবাহ-বাসরে আসেন নাই?
সে আবার জানালা দিয়া মুখ বাড়াইল।
পুনশ্চ স্বর শুনিতে পাইল— ‘রানিজি, দোষ নেবেন না। মহারাজ আপনার সঙ্গে দেখা করেই চলে যাবেন। বড় জরুরি ব্যাপারে তাঁকে কালই চলে যেতে হবে, তাই একবার—’
কিছুক্ষণ নীরব। তারপর—
‘আচ্ছা, আমি যাচ্ছি। তুমি দাঁড়াও।’ কস্তুরীর কথাগুলি শিউলি ফুলের মতো অন্ধকারে ঝরিয়া পড়িল।
ঘরের মধ্যস্থলে দাঁড়াইয়া সে একবার ভাবিল, কাহাকেও সঙ্গে লইবে? কিন্তু কৃষ্ণা ছাড়া আর তো কাহাকেও সঙ্গে লওয়া যায় না। অথচ কৃষ্ণাকে এখন ডাকা সম্ভব নয়— কিন্তু প্রয়োজন কী? সে একাই যাইবে।
ওড়না গায়ে জড়াইয়া সে নিঃশব্দে দ্বার খুলিল। কেহ কোথাও নাই; বৃহৎ প্রাসাদের অপরাংশে সকলে তখনও আমোদে মগ্ন। যে-কয়জন দাসী রানির পরিচর্যায় নিযুক্ত ছিল, রানি শয়নকক্ষে প্রবেশ করিবার পর তাহারাও চলিয়া গিয়াছে। লঘু পদে কস্তুরী নীচে নামিয়া গেল।
সেই লোকটি জানালার নীচে অপেক্ষা করিতেছিল, একবার ভাল করিয়া তাহাকে দেখিয়া লইয়া আভূমি অবনত হইয়া অভিবাদন করিল। কস্তুরীও তাহার মুখ অস্পষ্ট দেখিতে পাইল। এই রুদ্ররূপ! সে রুদ্ররূপকে পূর্বে দেখে নাই।
পুরুষ সসম্মানে কহিল— ‘এইদিকে রানিজি, এইদিকে—’
তাহার অনুসরণ করিয়া কম্প্রবক্ষে কস্তুরী ঘাটের দিকে চলিল।
রাত্রি শেষ হইয়া আসিতেছে।
গৌরী আর প্রহ্লাদ মুখোমুখি বসিয়া, তাহাদের মধ্যস্থলে, লণ্ঠন। গৌরী স্থিরভাবে বসিয়া আছে বটে, কিন্তু তাহার নিষ্কম্প দেহটা দেখিয়া মনে হইতেছে যেন একটা অনলস্তম্ভ নির্ধূম শিখায় জ্বলিতেছে— যে-কোনও মুহূর্তে বারুদের স্তূপের মতো প্রচণ্ড উন্মত্ততায় বিস্ফুরিত হইয়া চারিদিকে দাবানল ছড়াইয়া দিবে।
কস্তুরী! এই নরকের ক্লেদাক্ত সরীসৃপগুলো কস্তুরীকে বলপূর্বক হরণ করিয়া আনিবার অভিসন্ধি করিয়াছে। প্রহ্লাদের মুখে এই কথা শুনিবার পর ইহাদের গগনস্পর্শী ধৃষ্টতা গৌরীর মনটাকে ক্ষণকালের জন্য অসাড় করিয়া দিয়াছিল; প্রথমটা সে বিশ্বাস করিতে পারে নাই। কিন্তু সত্যই ইহা তো অসম্ভব নয়। উদিত মরিয়া হইয়া উঠিয়াছে। ভাইকে অন্ধকূপে আবদ্ধ করিয়া যে সিংহাসন গ্রাস করিবার চেষ্টা করে, তাহার অসাধ্য কী আছে? ঝিন্দের সিংহাসন পাইবার আশা হারাইয়া সে অবশেষে ঝড়োয়ার সিংহাসন দখল করিবার জন্য এই ক্রূর মতলব বাহির করিয়াছে। কস্তুরীকে বলপূর্বক বিবাহ করিবে; হিন্দুর বিবাহ, একবার সম্পাদিত হইলে আর নড়চড় হয় না— তখন ঝড়োয়া রাজ্যের উপর উদিতের দাবি কে অস্বীকার করিবে? Factum Valet... কী নৃশংস স্বার্থপরতা! কী পৈশাচিক ক্রূরবুদ্ধি! এই ষড়যন্ত্রের ইঙ্গিত ময়ূরবাহন তাহাকে দিয়াছিল।
প্রহ্লাদ কুণ্ঠিতস্বরে মৌনভঙ্গ করিল— ‘ময়ূরবাহনের ফিরতে এখনও বোধহয় দেরি আছে। ইতিমধ্যে রাজাকে—’
গৌরী অগ্নিগর্ভ চোখ তুলিল; কথা কহিল না। প্রহ্লাদ দেখিল, চোখের মধ্যে সর্বগ্রাসী একটি চিন্তাই প্রতিফলিত হইতেছে। রাজার স্থান সেখানে নাই, বোধকরি জগতের আর কিছুরই স্থান নাই।
প্রহ্লাদ একটু নীরব থাকিয়া আবার বলিল— ‘ওদিকে দুর্গের সামনে আপনার সিপাহীরা এতক্ষণ নিশ্চয় পৌঁছে গেছে— দুর্গের সিং-দরজা খুলে দেবার চেষ্টা করলে হত না? দু’জন শান্ত্রী পাহারায় আছে, আমি তাদের ভুলিয়ে ওখান থেকে সরিয়ে দিতে পারি। আপনার লোকেরা একবার ঢুকে পড়লে—’
‘না, ওসব পরে হবে।’
আবার দীর্ঘকাল উভয়ে নীরব। লণ্ঠনের আলোক-শিখা কঁপিয়া কাঁপিয়া উঠিতেছে; রাত্রিশেষের শীতল বাতাস জোরে বহিতে আরম্ভ করিয়াছে।
সহসা প্রহ্লাদ বিদ্যুৎস্পৃষ্টের মতো চমকিয়া দাঁড়াইয়া উঠিল; চাপা উত্তেজনায় বলিল— ‘ওরা আসছে— দাঁড়ের শব্দ পেয়েছি। আপনি এখন আলোর কাছ থেকে সরে যান। যেমন যেমন ঠিক হয়েছে তেমনি করবেন, যথাসময়ে আমি সংকেত করব—’।
গৌরীও চকিতে উঠিয়া দাঁড়াইল। ভূপতিত ছোরাটা তাহার পায়ে ঠেকিল, সেটা ক্ষিপ্রহস্তে তুলিয়া লইয়া সে সুড়ঙ্গের অভ্যন্তরের দিকে অন্ধকারে অন্তর্হিত হইয়া গেল। প্রহ্লাদ লণ্ঠন লইয়া গুপ্তদ্বারের মুখের কাছে দাঁড়াইল।
দাঁড়ের মৃদু ছপ ছপ শব্দ, তারপর ময়ূরবাহনের হাসি শোনা গেল। নৌকার মুখ আসিয়া দ্বারের নীচে ঠেকিল।
‘প্রহ্লাদ, দড়িটা ধরো।’
ময়ূরবাহন লাফাইয়া প্রহ্লাদের পাশে দাঁড়াইল, নৌকার দিকে ফিরিয়া বলিল— ‘এইবার রানিজিকে তুলে দাও। হুঁশিয়ার স্বরূপদাস, সবসুদ্ধ জলে পড়ে যেয়ো না। আস্তে রানিজি— চঞ্চল হবেন না, কোনও ভয় নেই, আমরা আপনার অনুগত ভৃত্য— হা হা হা—’
ওড়না দিয়া মুখ ও সর্বাঙ্গ দড়ির মতো করিয়া বাঁধা একটি বিদ্রোহী নারীমূর্তি ধরাধরি করিয়া নৌকা হইতে নামানো হইল। প্রহ্লাদ ও ময়ূরবাহন দেহটিকে সুড়ঙ্গের মধ্যে আনিয়া একপাশে শোয়াইয়া দিল। তারপর ময়ূরবাহন জলের দিকে ফিরিয়া বলিল— ‘স্বরূপদাস, এবার তোমরা নেমে এসো। ডিঙি ভেতরে তুলতে হবে।’
স্বরূপদাস নৌকা হইতে কাতরস্বরে বলিল— ‘দাঁড় দুটো জলে পড়ে গিয়ে কোথাও ভেসে গেছে খুঁজে পাচ্ছি না।’
ময়ূরবাহন হাসিয়া উঠিয়া বলিল— ‘তা যাক; আপাতত আর দাঁড়ের দরকার নেই।— প্রহ্লাদ, তুমি আর আমি এবার রানিজিকে—’
তাহার কথা শেষ হইতে পাইল না। অকস্মাৎ পূর্ব-নিরূপিত সমস্ত সংকল্প উপেক্ষা করিয়া প্রহ্লাদের সংকেতের অপেক্ষা না করিয়াই দুরন্ত ঝড়ের মতো গৌরী অন্ধকারের ভিতর হইতে তাহাদের মাঝখানে আসিয়া পড়িল। কস্তুরীর ঠিক পাশে প্রহ্লাদ দাঁড়াইয়া ছিল, গৌরীর প্রথম ধাক্কাটা তাহাকেই গিয়া লাগিল। প্রহ্লাদ টাউরি খাইয়া ময়ূরবাহনের গায়ে পড়িল। ময়ূরবাহন আচমকা ঠেলা খাইয়া ঘুরপাক খাইতে খাইতে লণ্ঠনটা ডিঙাইয়া জলের কিনারা পর্যন্ত গিয়া কোনওমতে নিজেকে সামলাইয়া লইল। তারপর ক্রুদ্ধ বিস্ময়ে ফিরিয়াই নিমেষমধ্যে যেন পাথরে পরিণত হইয়া গেল।
দৃশ্যটা নাটকীয় বটে। মেঝের উপর পীতাভ লণ্ঠন জ্বলিতেছে; তাহার অনতিদূরে প্রহ্লাদ ভূমি হইতে উঠিবার উদ্যোগ করিয়া নতজানু অবস্থাতেই ময়ূরবাহনের দিকে নিষ্পলক তাকাইয়া আছে; আর তাহার পশ্চাতে ভুলুণ্ঠিত নারী দেহের দুইদিকে পা রাখিয়া একটা নগ্নকায় দৈত্য দাঁড়াইয়া আছে। তাহার দুই চক্ষে জ্বলন্ত অঙ্গার, হাতে একটা ঝকঝকে বাঁকা ছোরা।
ময়ূরবাহনের চক্ষু ক্রমশ কুঞ্চিত হইয়া আলোকের দুইটি বিন্দুতে পরিণত হইল। তারপর সে হাসিল; কোমর হইতে বিদ্যুদ্বেগে অসি বাহির হইয়া আসিল—
‘আরে! বাংগালি নটুয়া! তুই এখানে?’
ময়ূরবাহনের হাসিতে পৈশাচিক উল্লাস ফুটিয়া উঠিল। সে তরবারি হস্তে একপদ অগ্রসর হইল।
‘বাঘের গুহায় গলা বাড়িয়েছিস! হা হা হা— বাংগালি নটুয়া! আজ তোকে কে রক্ষা করবে?’
প্রহ্লাদ ভয়ার্ত চোখে তাহার দীর্ঘ তরবারির দিকে চাহিয়া রহিল। গৌরীর হাতে কেবল ছোরা, অন্য অস্ত্র নাই।
পিছন হইতে স্বরূপদাসের করুণ স্বর আসিল— ‘দড়ি ছেড়ে দিলেন কেন? নৌকা যে ভেসে যাচ্ছে।’
কেহ কর্ণপাত করিল না; ময়ূরবাহন গৌরীর দিকে আর এক পদ অগ্রসর হইল।
প্রহ্লাদ সহসা নতজানু অবস্থা হইতে লাফাইয়া উঠিয়া বিকৃতস্বরে চিৎকার করিয়া উঠিল— ‘মহারাজ, পালান—’
ময়ূরবাহনের সাপের মতো চোখ প্রহ্লাদের দিকে ফিরিল— ‘তুই বেইমানি করেছিস! তোকেই আগে শেষ করি।’
প্রহ্লাদ তখনও ময়ূরবাহনের তরবারির নাগালের মধ্যে ছিল না, ময়ূরবাহন আর এক পা আগে আসিয়া তরবারি তুলিল।
প্রহ্লাদের কানের পাশ দিয়া সাঁই করিয়া একটা শব্দ হইল; একটা আলোর রেখা যেন তাহার পিছন হইতে ছুটিয়া গিয়া ময়ূরবাহনের পঞ্জরের নীচে গাঁথিয়া গেল।
ডান হাতে উখিত তরবারি, ময়ূরবাহন নিশ্চলভাবে কিছুক্ষণ দাঁড়াইয়া রহিল; তাহার অধরের রক্তিম হাসি ধীরে ধীরে ফ্যাকাশে হইয়া গেল। তারপর উত্থিত তরবারিটা ঝন ঝন শব্দে পাথরের মেঝেয় পড়িল।
ময়ূরবাহন কিন্তু পড়িল না। একটা অর্ধচক্রাকৃতি পাক খাইয়া সে নিজেকে খাড়া করিয়া রাখিল। আমূলবিদ্ধ ছোরার মুঠ ধরিয়া সেটাকে নিজের দেহ হইতে টানিয়া বাহির করিবার নিষ্ফল চেষ্টা করিল। তাহার মুখ বুকের উপর নত হইয়া পড়িল, চোখে কাচের মতো একটা দৃষ্টিহীন স্বচ্ছতার আবরণ পড়িয়া গেল। স্খলিত পদে গুহ্যদ্বারের কিনারা পর্যন্ত গিয়া যেন অসীম বলে সে নিজেকে রক্ষা করিবার চেষ্টা করিল, কিন্তু পারিল না; মাতালের মতো দুইবার টলিয়া হঠাৎ কাত হইয়া জলের মধ্যে পড়িয়া গেল।
প্রহ্লাদ এতক্ষণ জড়ের মতো অনড় হইয়া দাঁড়াইয়া ছিল, এখন সচেতন হইয়া ব্যগ্র বিস্ফারিত নেত্রে গৌরীর পানে তাকাইল। গৌরী তেমনি দাঁড়াইয়া আছে, শুধু তাহার হাতে ছোরা নাই।
প্রহ্লাদ ছুটিয়া জলের কিনারায় গিয়া উঁকি মারিল। ময়ূরবাহনের দেহ সেখানে নাই— হয়তো ডুবিয়া গিয়াছে। দাঁড়হীন নৌকাও দুইজন আরোহী লইয়া কোথায় ভাসিয়া গিয়াছে। স্থূলকায় স্টেশনমাস্টার স্বরূপদাস সাঁতার জানে না— অন্য লোকটাও—
‘প্রহ্লাদ, আলো নাও— পথ দেখিয়ে ভিতরে নিয়ে চলো।’
প্রহ্লাদ ফিরিয়া দেখিল, গৌরী কস্তুরীকে দুই হাতে বুকের কাছে তুলিয়া লইয়াছে।
রাত্রি শেষ হইতে আর বিলম্ব নাই।
দুর্গের উপরিভাগে একটি কক্ষ। বোধহয় অস্ত্রাগার; চারিদিকের দেয়ালে সেকালের প্রাচীন অস্ত্র— ঢাল, তলোয়ার, বল্লম ইত্যাদি সজ্জিত রহিয়াছে। এতদ্ব্যতীত ঘরটি নিরাভরণ।
এই ঘরের দ্বারের কাছে সেই লণ্ঠন আলো বিকীর্ণ করিতেছে; আর ঘরের মধ্যস্থলে গৌরী ও কস্তুরী দাঁড়াইয়া আছে।
আলোর পীতাভ অস্পষ্টতায় দুইজনকে পৃথকভাবে দেখা যাইতেছে না। কস্তুরীর দুই বাহু গৌরীর কণ্ঠে দৃঢ়বদ্ধ, মুখখানি ক্লান্ত মুদিত কুমুদের মতো তাহার নগ্ন বক্ষে নামিয়া পড়িয়াছে। গৌরীর বাহুও এমনভাবে কস্তুরীকে বেষ্টন করিয়া আছে যেন সে-বন্ধন ইহজীবনে আর খুলিবে না।
দুইজনেই নীরব; কেবল গৌরী মাঝে মাঝে অস্পষ্ট ক্ষুধিত স্বরে বলিতেছে— ‘কস্তুরী-কস্তুরী-কস্তুরী—’
কস্তুরী সাড়া দিতেছে না। সে কি মূৰ্ছিতা? অথবা নিজের দুরবগাহ অনুভূতির অতলে ডুবিয়া গিয়াছে।
‘রানি!’ গৌরী তাহার কানের কাছে মুখ লইয়া গিয়া ডাকিল।
এবার কস্তুরী চোখ খুলিল। ধীরে ধীরে গৌরীর মুখের কাছে মুখ তুলিয়া ধরা-ধরা অস্ফুট স্বরে বলিল— ‘রাজা!’
গৌরী মর্মছেঁড়া হাসি হাসিল— ‘রাজা নয়। সব তো বলেছি কস্তুরী, আমি নগণ্য বিদেশি। এবার ছেড়ে দাও, কর্তব্য শেষ করে চলে যাই।’
কস্তুরীর বাহু দুইটি ক্রমশ শিথিল হইয়া গৌরীর কণ্ঠ হইতে খসিয়া পড়িল। সে একটু সরিয়া দাঁড়াইল, কিন্তু তেমনি ধীর অচঞ্চল স্বরে বলিল— ‘চলে যাবে?’
‘তা ছাড়া আর তো পথ নেই কস্তুরী। তুমি ঝিন্দের বাগদত্তা রানি—’
‘বেশ— যাও। আমারও কিস্তা আছে।’
‘না না না, ও-কথা নয় কস্তুরী। আমি মরি ক্ষতি নেই— কিন্তু তুমি—’
‘আমি ঝিন্দের রানি হবার জন্যে বেঁচে থাকব!’ অতি ক্ষীণ হাসি কস্তুরীর অধরপ্রান্তে দেখা দিয়াই মিলাইয়া গেল— ‘তুমি যাও, তোমার কর্তব্য করো গিয়ে, আমার কর্তব্য আমি জানি।’
‘কস্তুরী, ভালবাসার কাছে আমাদের প্রাণ তুচ্ছ, সে আমি জানি। কিন্তু ইচ্ছে করে মরবে কেন? যদি বেঁচে থাকি— দূর থেকে দু’জন দু’জনকে ভালবাসব। হলেই বা তুমি ঝিন্দের রানি, তোমার ভালবাসা তো চিরদিন আমার থাকবে—’
‘রাজা, তোমাকে যদি না পাই, আমার কিস্তা আছে।’
এই অচঞ্চল উত্তাপহীন দৃঢ়তার সম্মুখে গৌরীর সমস্ত যুক্তি ভাসিয়া গেল; সে যে মিথ্যা যুক্তি দিয়া নিজেকেই ঠকাইবার চেষ্টা করিতেছে, তাহাও বুঝিতে পারিল। একটা গভীর দীর্ঘশ্বাস ফেলিয়া বলিল— ‘বেশ, তাই ভাল। আমি চললাম, রাত শেষ হয়ে গেছে, তুমি এখানেই থাকো। যদি রাজাকে উদ্ধার করেও বেঁচে থাকি, তোমার কাছে ফিরে আসব। আর— যদি না ফিরি, তখন যা-ইচ্ছে কোরো।’
কস্তুরী দুই বাহু বাড়াইয়া গৌরীর মুখের পানে চাহিল। আয়ত চোখ দুইটিতে ভালবাসা টলটল করিতেছে; লজ্জা নাই, নিজের মনের নিবিড়তম বাসনা গোপন করিয়া তিলমাত্র খর্ব করিবার চেষ্টা নাই। যে মৃত্যুর কিনারায় আসিয়া দাঁড়াইয়াছে, সে লজ্জা করিবে কাহাকে?
দুঃসহ যন্ত্রণার আর্তস্বর গৌরীর কণ্ঠ পর্যন্ত ঠেলিয়া উঠিল। দুরন্ত আবেগে কস্তুরীর দেহ নিজ বাহুমধ্যে একবার নিষ্পেষিত করিয়া সে ছুটিয়া ঘর হইতে বাহির হইয়া গেল।
‘প্রহ্লাদ, একটা অস্ত্র আমাকে দাও।’
প্রহ্লাদ তলোয়ার দিল। সেটা হাতে লইয়া গৌরী হঠাৎ হাসিল, বলিল— ‘চলো, এবার উদিতের সঙ্গে দেখা করি; বাংগালি কুত্তার ওপর তার বড় রাগ। প্রহ্লাদ, এই তলোয়ার দিয়ে ঝিন্দের সমস্ত মানুষকে হত্যা করা যায় না? তুমি— আমি— উদিত— ধনঞ্জয়— রুদ্ররূপ— শত্রু-মিত্র কেউ বেঁচে থাকবে না!’
প্রহ্লাদ ভিতরের ব্যাপার বুঝিতে আরম্ভ করিয়াছিল, চুপ করিয়া রহিল। গৌরী বলিল— ‘রাজার কোত-ঘরের পথ দেখিয়ে নিয়ে চলো।’
লণ্ঠন হস্তে প্রহ্লাদ আগে আগে চলিল। কয়েক প্রস্থ অপরিসর সিঁড়ি নামিয়া তাহারা অবশেষে এক গোলকধাঁধার মতো স্থানে উপস্থিত হইল; সুড়ঙ্গের মতো একটা বদ্ধ সংকীর্ণ গলি বাঁকা হইয়া কোথায় চলিয়া গিয়াছে, তাহার একপাশে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র লোহার দরজা। গৌরী বুঝিল, এগুলি দুর্গের প্রাচীন কারা-কক্ষ। ইহাদেরই গবাক্ষ বাহির হইতে দেখা যায়।
এই গলির একটা বাঁকের মুখে এক বদ্ধ দরজার সম্মুখে প্রহ্লাদ দাঁড়াইল; গৌরীকে একটা চোখের ইঙ্গিত জানাইয়া আস্তে আস্তে কবাটে টোকা মারিল।
ভিতর হইতে শব্দ আসিল— ‘কে?’
‘আমি প্রহ্লাদ। দরজা খুলুন, ময়ূরবাহন ফিরেছেন।’
দরজার জিঞ্জির খোলার শব্দ হইতে লাগিল। গৌরী প্রহ্লাদের কানে কানে বলিল— ‘তুমি যাও— দুর্গের সিং-দরজা খোলার ব্যবস্থা করো।’
প্রহ্লাদ আলো লইয়া দ্রুত অদৃশ্য হইয়া গেল।
উদিত দরজা খুলিয়া দেখিল, গলিতে অন্ধকার। কক্ষের ভিতরে ক্ষীণ আলোকে তাহার চেহারার রেখা দেখা গেল।
দরজার উপর দাঁড়াইয়া উদিত বলিল— ‘প্রহ্লাদ, এ কী! আলো আনোনি কেন? ময়ূরবাহন ফিরেছে? রানিকে এনেছে?’
সে দরজার বাহিরে আসিয়া দাঁড়াইল— ‘প্রহ্লাদ, তুমি কোথায়? রানিকে এনেছে ময়ূরবাহন?’ তাহার কণ্ঠস্বরে একটা জঘন্য লুব্ধতা প্রকাশ পাইল।
গৌরী তাহার দুই হাত দূরে দাঁড়াইয়াছিল, দাঁতে দাঁত চাপিয়া তলোয়ারখানা উদিতের বুকের মধ্যে প্রবেশ করাইয়া দিল। উদিতের কণ্ঠ হইতে একটা বিস্ময়সূচক শব্দ বাহির হইল। আর সে কথা কহিল না, নিঃশব্দে দরজার সম্মুখে পড়িয়া গেল।
গৌরী তাহার মৃতদেহ লঙঘন করিয়া কক্ষে প্রবেশ করিল।
শঙ্কর সিং মলিন শয্যায় উঠিয়া বসিয়াছিল— ধীরে ধীরে দাঁড়াইল। মোমবাতির আলোয় দুইজনে পরস্পর মুখের পানে চাহিল। শঙ্কর সিংয়ের দেহটাও উদিতের দেহের মতোই নশ্বর, শুধু তলোয়ারের একটা আঘাতের ওয়াস্তা।
তারপর অদ্ভুত হাসিয়া গৌরী বলিল— ‘শঙ্কর সিং, তোমাকে উদ্ধার করতে এসেছি।’
রাত্রি আর নাই; পূর্বাকাশে ঊষা ঝলমল করিতেছে।
দুর্গপ্রাকারের পাশে দাঁড়াইয়া দুই শঙ্কর সিং অরুণায়মান কিস্তার পানে তাকাইয়া আছে। প্রাকারের কোলে কোলে তখনও রাত্রির নষ্টাবশেষ অন্ধকার জমা হইয়া আছে।
পাশাপাশি দুই শঙ্কর সিং— চেহারা ও বেশভূষায় কোনও প্রভেদ নাই। দুইজনেই বক্ষ বাহুবদ্ধ করিয়া চিন্তা করিতেছে।
একজন ভাবিতেছে— ফুরাইয়া আসিল আমার ঝিন্দের খেলা। ওই দুর্গের দ্বার খুলিল। ধনঞ্জয় আসিতেছে— আর দেরি নাই।
আর একজন ভাবিতেছে— কী ভাবিতেছে সে নিজেই জানে না। বোধকরি সুসংলগ্ন চিন্তা করিবার শক্তিও তাহার নাই।
প্রাকার-ক্রোড়ের অন্ধকারে কী একটা নড়িল। কেহ লক্ষ করিল না। উভয়ের দৃষ্টি দূর-বিন্যস্ত!
ধনঞ্জয় ও রুদ্ররূপ দুর্গে প্রবেশ করিয়াছে। পাথরের অঙ্গনে তাহাদের জুতার কঠিন শব্দ শুনা যাইতেছে। প্রহ্লাদের গলার আওয়াজ ভাসিয়া আসিল; সে পথ নির্দেশ করিয়া লইয়া আসিতেছে।
আবার অন্ধকার প্রাকারের ছায়ায় কী নড়িল। দুই শঙ্কর সিং নিশ্চল হইয়া দাঁড়াইয়া আছে। পিছনে অস্পষ্ট শব্দ শুনিয়া দুইজনেই ফিরিল।
একটি নারীমূর্তি তাহাদের অদূরে আসিয়া দাঁড়াইয়াছে ! কস্তুরী! দুই শঙ্কর সিং তেমনি দাঁড়াইয়া রহিল।
সহসা পাংশু নারীমূর্তি অস্ফুট চিৎকার করিয়া তাহাদের কী বলিতে চাহিল। কিন্তু বলিবার পূর্বেই প্রকারের ছায়াশ্রয় হইতে একটি মূর্তি বাহির হইয়া আসিল। মূর্তিটা টলিতেছে, সর্বাঙ্গ দিয়া জল ঝরিয়া পড়িতেছে, হাতে ছোরা।
ছোরা একজন শঙ্কর সিংয়ের বুকে বিঁধিল— আমূল বিঁধিয়া গেল। শুধু সোনার কাজকরা মুঠ ঊষালোকে ঝিকমিক করিতে লাগিল।
নিয়তির করাঙ্কচিহ্নিত ছোরা। এতদিনে বুঝি তাহার কাজ শেষ হইল।
আততায়ী ও আহত একসঙ্গে পড়িয়া গেল। শঙ্কর সিং নিশ্চল; মরণাহত ময়ূরবাহনের শেষ নিশ্বাস-বায়ুর সঙ্গে একটা অস্ফুট হাসির শব্দ বাহির হইয়া আসিল।
বিজয়ী বেপরোয়া বিদ্রোহী ময়ূরবাহন।
ধনঞ্জয় ও রুদ্ররূপ মুক্ত তরবারি হস্তে প্রবেশ করিল।
একজন শঙ্কর সিং তখনও স্থাণুর মতো দাঁড়াইয়া আছে; আর তাহার অদূরে একটি পাংশু নারীমূর্তি ধীরে ধীরে সংজ্ঞা হারাইয়া মাটিতে লুটাইয়া পড়িবার উপক্রম করিতেছে।
ধনঞ্জয় ক্ষিপ্রদৃষ্টিতে একবার সমস্ত দৃশ্যটা দেখিয়া লইলেন। তারপর কর্কশ কণ্ঠে হুকুম দিলেন— ‘রুদ্ররূপ, এখানে আর কাউকে আসতে দিয়ো না।’
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন