দক্ষিণারঞ্জন মিত্র মজুমদার

এক রাজার দুই রানি; তাহার এক রানি যে রাক্ষসী! কিন্তু একথা কেহই জানে না। দুই রানির দুই ছেলে; লক্ষ্মী মানুষ-রানির ছেলে কুসুম আর রাক্ষসী-রানির ছেলে অজিত। অজিত কুসুম দুই ভাই গলাগলি।
রাক্ষসী-রানির মনে কাল, রাক্ষসী-রানির জিভে লাল। রাক্ষসী কি তাহা দেখিতে পারে? কবে সতীনের ছেলের কচি হাড়-মাংসে ঝোল অম্বল রাঁধিয়া খাইবে! তা পেটের দুষ্টু ছেলে সতীন-পুতের সাথ ছাড়ে না। রাগে রাক্ষসীর দাঁতে দাঁতে কড়কড় পাঁচ পরাণ সরসর।
জো না পাইয়া রাক্ষসী ছুতোনাতা খোঁজে, চোখের দৃষ্টি দিয়া সতীনের রক্ত শোষে। দিন দন্ড যাইতে-না-যাইতে লক্ষ্মীরানি শয্যা নিলেন।
তখন ঘোমটার আড়ে জিভ লকলক, আনাচেকানাচে উঁকি!
দুই দিনের দিন লক্ষ্মীরানির কাল হইল। রাজ্য শোকে ভাসিল। কেহ কিচ্ছু বুঝিল না।
অজিতকে ‘সরসর’, কুসুমকে ‘মর মর’,—রাক্ষসী সতীন-পুতকে তিন ছত্রিশ গালি দেয়, আপন পুতকে ঠোনা মারিয়া খেদায়।

জিভ লকলক
দাদাকে নিয়া গিয়া অজিত নিরালায় চোখের জল মুছায়, ‘দাদা, আর থাক, আর আমরা মা-র কাছে যাব না। রাক্ষসী মা-র কাছে আর কেহই যায় না। লোহার প্রাণ অজিত সব সয়; সোনার প্রাণ কুসুম ভাঙিয়া পড়ে। দিনে দিনে কুসুম শুকাইতে লাগিল।
রানি দেখিল,
কী! আপন পেটের পুত্র
সে-ই হইল শত্রু!—
রানির মনের আগুন জ্বলিয়া উঠিল।
এক রাত্রে রাজার হাতিশালে হাতি মরিল, ঘোড়াশালে ঘোড়া মরিল, গোহালে গোরু মরিল; রাজা ফাঁপরে পড়িলেন।
পর রাত্রে রাজার ঘরে ‘কাঁই মাঁই!!’ চমকিয়া রাজা তরোয়াল নিয়া উঠিলেন। সোনার খাটে অজিত-কুসুম ঘুমায়; এক মস্ত রাক্ষস কুসুমকে ধরিয়া আনিল! রাক্ষসের হাতে কুসুম কাঠির পুতুল! রানি ছুটিয়া আসিয়া মাথার চুল ছিঁড়িয়া রাজার গায়ে মারিল,—হাত নড়ে না, পা নড়ে না, রাজা বোকা হইয়া গেলেন।
রাজার চোখের সামনে রাক্ষস কুসুমকে খাইতে লাগিল। রাজা চোখের জলে ভাসিয়া গেলেন, মুছিতে পারিলেন না। রাজার শরীর থরথর কাঁপে, রাজা বসিতে পারিলেন না। রানি খিলখিল করিয়া হাসিয়া উঠিল।

রাক্ষসের হাতে কুসুম কাঠির পুতুল
অজিতের ঘুম ভাঙিল;—
রাত যেন নিশে
মন যেন বিষে,
দাদা কাছে নাই কেন?
অজিত ধড়মড় করিয়া উঠিয়া দেখে, ঘর ছমছম করিতেছে, রানির হাতে বালা-কাঁকন ঝমঝম করিতেছে,—দাদাকে রাক্ষসে খাইতেছে! গায়ের রোমে কাঁটা, চোখের পলক ভাঁটা, অজিত ছুটিয়া গিয়া রাক্ষসের মাথায় এক চড় মারিল। রাক্ষস ‘আঁই আঁই’ করিয়া ঘুরিয়া পড়িয়া এক সোনার ডেলা উগারিয়া পলাইয়া গেল!
রানি দেখিল, পৃথিবী উলটিয়াছে—পেটের ছেলে শত্রু হইয়াছে! রানি মনের আগুনে জ্ঞান-দিশা হারাইয়া আপনার ছেলেকে মুড়মুড় করিয়া চিবাইয়া খাইল! রানির গলা দিয়া এক লোহার ডেলা গড়াইয়া পড়িল।
রানির পা উছল, রানির চোখ ‘উখর’, সোনার ডেলা লোহার ডেলা নিয়া রানি ছাদে উঠিল।
ছাদে রাক্ষসের হাট। একদিকে বলে—
‘হুঁম হুঁম খাম—আঁরো খাঁব।’
আর দিকে বলে,
‘গুম গুম গাঁম—দেঁশে যাঁব।’
রানি বলিল,—
‘গব গব গুম, খম খম খাঃ!
আমি হেঁথা থাকি, তোঁরা দেশে যাঃ!’
রাজপুরীর চূড়া ভাঙিয়া পড়িল, রাজার বুক কাঁপিয়া উঠিল; গাছপাথর মুচড়িয়া, নদীর জল উছলিয়া, রাক্ষসের ঝাঁক দেশে ছুটিল।
ঘরে গিয়া রানির গা জ্বলে, পা জ্বলে; রানি সোয়াস্তি পায় না। বাহিরে গিয়া রানির মন ছনছন, বুক কনকন; রাত আর পোহায় না।
না পারিয়া রানি আরাম-কাঠি জিরাম-কাঠি বাহির করিয়া পোড়াইয়া ফেলিল। তাহার পর, মায়া-মেঘে উঠিয়া, নদীর ধারে এক বাঁশ-বনের তলে সোনার ডেলা, লোহার ডেলা পুঁতিয়া রাখিয়া, রাক্ষসী-রানি, নিশ্চিন্ত হইয়া ফিরিয়া আসিল।
বাঁশের আগে যে কাক ডাকিল, ঝোপের আড়ে যে শিয়াল কাঁদিল, রানি তাহা শুনিতে পাইল না।

দলে দলে লোক পলাইল
পরদিন, রাজ্যে হুলুস্থুল। ঘরে ঘরে মানুষের হাড়, পথে পথে হাড়ের জাঙাল। রাক্ষসে দেশ ছাইয়া গিয়াছে, আর রক্ষা নাই। যখন সকলে শুনিল, রাজপুত্রদিগকেও খাইয়াছে, তখন জীবন্ত মানুষ দলে দলে রাজ্য ছাড়িয়া পলাইয়া গেল।
রাজা বোকা হইয়া রহিলেন; রাজার রাজত্ব রাক্ষসে ছাইয়া গেল।
নদীর ধারে বাঁশের বন হাওয়ায় খেলে, বাতাসে দোলে। এক কৃষাণ সেই বনের বাঁশ কাটিল। বাঁশ চিরিয়া দেখে, দুই বাঁশের মধ্যে বড়ো বড়ো গোল গোল দুই ডিম। সাপের ডিম না, কীসের ডিম।—কৃষাণ ডিম ফেলিয়া দিল।
অমনি, ডিম ভাঙিয়া, লাল নীল ডিম হইতে লাল নীল রাজপুত্র বাহির হইয়া, মুকুট মাথে খোলা তরোয়াল হাতে জোড়া রাজপুত্র শনশন করিয়া রাজ্য ছাড়িয়া চলিয়া গেল।
ডরে কৃষাণ মূর্ছা গেল।
যখন উঠিল, কৃষাণ দেখে, লাল ডিমের খোলস সোনা আর নীল ডিমের খোলস লোহা হইয়া পড়িয়া আছে। তখন লোহা দিয়া কৃষাণ কাস্তে গড়াইল; সোনা দিয়া ছেলের বউ-এর পঁইচে, বাজু বানাইয়া দিল।
চলিয়া চলিয়া, জোড়া রাজপুত্র এক রাজার রাজ্যে আসিলেন। সে রাজ্যে বড়ো খোক্কসের ভয়। রাজা রোজ মন্ত্রী রাখেন, খোক্কসেরা সে মন্ত্রী খাইয়া যায় আর একঘর প্রজা খায়। রাজা নিয়ম করিয়াছেন, যে কোনো জোড়া রাজপুত্র খোক্কস মারিতে পারিবে, জোড়া পরির মতো জোড়া রাজকন্যা আর তাঁহার রাজত্ব তাহারাই পাইবে। কত জোড়া রাজপুত্র আসিয়া খোক্কসের পেটে গেল। কেহই খোক্কস মারিতে পারে না; রাজকন্যাও পায় নাই, রাজ্যও পায় নাই।

জোড়া রাজপুত্র শনশন করিয়া চলিয়া গেল
লালকমল নীলকমল জোড়া রাজপুত্র রাজার কাছে গিয়া বলিলেন, ‘আমরা খোক্কস মারিতে আসিয়াছি!’
রাজার মনে একবার আশা একবার নিরাশা; শেষে বলিলেন, ‘আচ্ছা।’
নীলকমল লালকমল এক কুঠরিতে গিয়া, তরোয়াল খুলিয়া বসিয়া রহিলেন।
রাত্রি কদন্ড হইল, কেহ আসিল না।
রাত্রি আর ক-দন্ড গেল, কেহ আসিল না।
রাত্রি এক প্রহর হইল, তবু কেহ আসিল না।
শেষে, রাত্রি দুপুর হইল; কেহ আর আসে না। দুই ভাইয়ের বড়ো ঘুম পাইল। নীল লালকে বলিলেন,—‘দাদা! আমি ঘুমাই, পরে আমাকে জাগাইয়া তুমি ঘুমাইও।’ বলিয়া, বলিলেন, ‘খোক্কসে যদি নাম জিজ্ঞাসা করে তো, আমার নাম আগে বলিও, তোমার নাম যেন আগে বলিও না।’ বলিয়া নীলকমল ঘুমাইয়া পড়িল।
খুব নিশি রাত্রে দুয়ারে ঘা পড়িল। লালকমল তরোয়ালে ভর দিয়া সজাগ হইয়া বসিলেন।
খোক্কসেরা আসিয়াই, আলোতে ভালো দেখিতে পায় না কি-না? বলিল, ‘আঁলোঁ নিবোঁ।’
লালকমল বলিলেন, ‘না!’
সকলের বড়ো খোক্কস রাগে গঁ গঁ; বলিল—‘বঁটে! ঘরে কেঁ জাঁগে? যত খোক্কসে কিচিমিচি, ‘‘কেঁ জাঁগেঁ, কেঁ জাঁগে?’
লালকমল উত্তর করিলেন,—
‘নীলকমলের আগে লালকমল জাগে
আর জাগে তরোয়াল,
দপ দপ করে ঘিয়ের দীপ জাগে
কার এসেছে কাল?’
নীলকমলের নাম শুনিয়া খোক্কসেরা ভয়ে তিন হাত পিছাইয়া গেল! নীলকমল আর জন্মে রাক্ষসী-রানির পেটে হইয়াছিলেন, তাই তাঁর শরীরে কিনা রাক্ষসের রক্ত! খোক্কসেরা তাহা জানিত। সকলে বলিল, ‘আচ্ছা, নীলকমল কি না পরীক্ষা করো।’
রাক্ষস খোক্কসেরা নানারকম ছলনা-চাতুরী করে; সকলের বড়ো খোক্কসটা সেইসব আরম্ভ করিল। বলিল,—‘তোঁদের নঁখের ডঁগাঁ দেঁখিঁ?’
লাল, নীলের মুকুটটা তরোয়ালের খোঁচা দিয়া বাহির করিয়া দিলেন। সেটা হাতে করিয়া খোক্কসেরা বলাবলি করিতে লাগিল ‘বাঁপঁ রেঁ! যাঁর নঁখেঁর ডঁগাঁ এঁমঁন, না জাঁনিঁ সেঁ কীঁ রেঁ!’
তখন আবার বলিল, ‘দেঁখি তোঁদের থুঁতুঁ কেঁমঁন?’

লালকমল তরোয়ালে প্রদীপের ঘি গরম করিয়া ছিটাইয়া দিলেন। খোক্কসদের লোম পুড়িয়া-গন্ধে ঘর ভরিল; খোক্কসেরা গোঁ গোঁ করিয়া ছুটিয়া পলাইল।
খানিক পর খোক্কসেরা আবার আসিয়া বলিল, ‘তোঁদের জিঁভ দেঁখিবঁ!’
লাল, নীলের তরোয়ালখানা দুয়ারের ফাঁক দিয়া বাড়াইয়া দিলেন। বড়ো খোক্কস দুই হাতে তরোয়াল ধরিয়া, আর সকল খোক্কসকে বলিল, ‘এইবাঁর জিঁভঁ টাঁনিয়াঁ ছিঁড়িবঁ—তোঁরাঁ আঁমাঁকে ধঁরিয়াঁ খুঁব জোঁর টাঁনঁ-নঁ-নঁ।’
সকলে মিলিয়া খুব জোরে টানিল, আর, তরতর ধার নেঙা তরোয়ালে বড়ো খোক্কসের দুই হাত কাটিয়া কালো রক্তের বান ছুটিল! চেঁচাইয়া-মেচাইয়া, সকল খোক্কস ডিঙাইয়া বড়ো খোক্কস পলাইয়া গেল।
অনেকক্ষণ পরে বড়ো খোক্কস আবার কোথা হইতে ছুটিয়া আসিয়া বলিল, ‘কেঁ জাঁগেঁ, কে জাঁগেঁ?’
কতক্ষণ খোক্কস আসে নাই, লালকমলের ঘুম পাইতেছিল; লালকমল ভুলে বলিয়া ফেলিলেন,
‘লালকমল জাগে, আর’—
মুখের কথা মুখে, দুয়ার কবাট ভাঙিয়া সকল খোক্কস লালকমলের উপর আসিয়া পড়িল। ঘিয়ের দীপ উলটিয়া গেল, লালের মাথার মুকুট পড়িয়া গেল; লাল ডাকিলেন ‘ভাই!’

নীলকমল জাগিয়া দেখেন, খোক্কস! গা-মোড়ামুড়ি দিয়া নীল বলিলেন,
‘‘আরামকাঠি জিরামকাঠি, কে জাগিস রে?
দ্যাখ তো দুয়ারে মোর ঘুম ভাঙে কে!’’
নীলকমলের সাড়ায় আ-খোক্কস ছা-খোক্কস সকল খোক্কস আধমরা হইয়া গেল।
নীলকমল উঠিয়া ঘিয়ের দীপ জ্বালিয়া দিয়া সব খোক্কস কাটিয়া ফেলিলেন। সকলের বড়ো খোক্কসটা নীলকমলের হাতে পড়িয়া যেন গিরগিটির ছা!
খোক্কস মারিয়া হাত-মুখ ধুইয়া দুই ভাইয়ে নিশ্চিন্তে ঘুমাইতে লাগিলেন।
পরদিন রাজা গিয়া দেখেন, দুই রাজপুত্রে রক্তজবার ফুল—গলাগলি হইয়া ঘুমাইতেছেন; চারিদিকে মরা খোক্কসের গাদা। দেখিয়া রাজা ধন্যধন্য করিলেন।
রাজার রাজত্ব, জোড়া রাজকন্যা দুই ভাইয়ের হইল!

গিরগিটির ছা
সেই যে রাক্ষসী-রানি? রাজার পুরীতে থানা দিয়া বসিয়াছে তো? আই-রাক্ষস কাই-রাক্ষস তার দুই দূত গিয়া খোক্কসের মরণ-কথার খবর দিল। শুনিয়া রাক্ষসী-রানি হাঁড়িমুখ ভারী করিয়া বুকে তিন চাপড় মারিয়া বলিল, ‘‘আই রে! কাই রে! আমি তো আর নাই রে!
—ছাই পেটের বিষ-বড়ি
সাত জন্ম পরাণের অরি—
ঝাড়ে-বংশে উচ্ছন্ন দিয়া আয়!’’
অমনি আই কাই, দুই সিপাই-এর মূর্তি ধরিয়া, নীলকমল লালকমলের রাজসভায় গিয়া বলিল,—‘বুকে খিল পিঠে খিল, রাক্ষসের মাথার তেল না হইলে তো আমাদের রাজার ব্যারাম সারে না!’
লালকমল নীলকমল কহিলেন,—‘আচ্ছা, তেল আনিয়া দিব।’
নূতন তরোয়ালে ধার দিয়া, দুই ভাই রাক্ষসের দেশের উদ্দেশে চলিলেন।
যাইতে যাইতে, দুই ভাই এক বনের মধ্যে গিয়া উপস্থিত হইলেন। খুব বড়ো এক অশ্বত্থ গাছ, হয়রান হইয়া দুই ভাইয়ে অশ্বত্থের তলায় বসিলেন।
সেই অশ্বত্থ গাছে বেঙ্গমা-বেঙ্গমী পক্ষীর বাসা। বেঙ্গমী বেঙ্গমকে বলিতেছে,—‘আহা, এমন দয়াল কারা, দু—ফোঁটা রক্ত দিয়া আমার বাছাদের চোখ ফুটায়!’

হু-হু করিয়া শূন্যে উড়িল
শুনিয়া, লাল নীল বলিলেন,—‘গাছের উপরে কে কথা কয়?—রক্ত আমরা দিতে পারি।’
বেঙ্গমী ‘আহা আহা’ করিল।
বেঙ্গমা নীচে নামিয়া আসিল।
দুই ভাই আঙুল চিরিয়া রক্ত দিলেন।
রক্ত নিয়া বেঙ্গমা বাসায় গেল; একটু পরে সোঁ সোঁ করিয়া দুই বেঙ্গম-বাচ্চা নামিয়া আসিয়া বলিল,—‘কে তোমরা রাজপুত্র আমাদের চোখ ফুটাইয়াছ? আমরা তোমাদের কী কাজ করিব বলো!’
নীল লাল বলিলেন, ‘আহা, তোমরা বেঁচে থাকো; এখন আমাদের কোনোই কাজ নাই।’
বেঙ্গম-বাচ্চারা বলিল, ‘আচ্ছা, তা তোমরা, যাইবে কোথায় চলো, আমরা পিঠে করিয়া রাখিয়া আসি।’
দেখিতে দেখিতে ডাঙা জাঙাল, নদ-নদী, পাহাড়-পর্বত, মেঘ, আকাশ, চন্দ্র, সূর্য, সকল ছাড়াইয়া, দুই রাজপুত্র পিঠে, বাচ্চারা হু-হু করিয়া শূন্যে উড়িল!
শূন্যে শূন্যে সাত দিন সাত রাত্রি উড়িয়া, আট দিনের দিন বাচ্চারা এক পাহাড়ের উপর নামিল। পাহাড়ের নীচে ময়দান, ময়দান ছাড়াইলেই রাক্ষসের দেশ। নীলকমল গোটাকতক কলাই কুড়াইয়া লালকমলের কোঁচড়ে দিয়া বলিলেন, ‘লোহার কলাই চিবাইতে বলিলে এই কলাই চিবাইও।’
নীল লাল আবার চলিতে লাগিলেন।
দুই ভাই ময়দান পার হইয়া আসিয়াছেন, আর,—
‘হাঁউ! মাউ! কাঁউ!
মনিষ্যির গঁন্ধ পাঁউ!!
ধঁরে ধঁরে খাঁউ!!!’’
—করিতে করিতে পালে পালে ‘অযুতে-নিযুতে’ রাক্ষস ছুটিয়া ছুটিয়া আসিতে লাগিল। নীলকমল চেঁচাইয়া বলিলেন,—‘আয়ি মা! আয়ি মা! আমরাই আসিয়াছি—তোমার নীলকমল, কোলে করিয়া নিয়া যাও!’

আঁমার নীলু আঁমার নীতু
‘বঁটে বঁটে, থাঁম থাঁম!’ বলিয়া রাক্ষসদিগকে থামাইয়া, এই লম্বা লম্বা হাত-পা ছুড়িতে ছুড়িতে, ঝাঁকার জট কাঁপাইতে কাঁপাইতে, হাঁপাইয়া ‘জটবিজটি’ আয়িবুড়ি আসিয়া নীলকমলকে কোলে নিয়া—‘আঁমার নীঁলু! আঁমার নাঁতু!’ বলিয়া আদর করিতে লাগিল। আয়ির গায়ের গন্ধে নীলুর নাড়ি উলটিয়া আসে।
লালকে দেখিয়া আয়িবুড়ি বলিল, ‘ওঁ তোঁর সঁঙ্গে কেঁ র্যাঁ?’
নীল বলিলেন, ‘ও আমার ভাই লো আয়িমা, ভাই!’
বুড়ি বলিল, ‘‘তাঁ কেঁন মঁনিষ্যি মঁনিষ্যি গন্ধ পাঁই?
আঁমার নাঁতু হঁয় তো চিঁবিয়ে খাঁক
নোঁহার কঁলাই।’
বলিয়া বুড়ি ‘হোৎ’ করিয়া নাকের ভিতর হইতে পাঁচ গন্ডা লোহার কলাই বাহির করিয়া লাল-নাতুকে খাইতে দিল।
লাল তো আগেই জানেন; চুপে চুপে লোহার কলাই কোঁচড়ে পুরিয়া, কোঁচড়ের সত্যিকার কলাই কটর কটর করিয়া চিবাইলেন! বুড়ি দেখিল, সত্যি তো, লাল টুকটুক নাতুই তো। বুড়ি তখন গদগদ, দুই নাতু কোলে নিয়া বুলায়, ঢুলায়, কয়—
‘আঁইয়া মাঁইয়া নাঁতুর
লাঁলু নীঁলু কাঁতুর
নাঁতুর বাঁলাই দূরে যাঁ!’
কিন্তু, লালকমলের শরীরে মনুষ্যের গন্ধ!—কোটর চোখ অসগস, জিভ বার বার খসখস, আয়ির মুখের সাত কলস লাল গলিল! তা নাতু? তা কী খাওয়া যায়? বুড়ি কুয়োমুখে নাড়ুটুকু খাইতে খাইতে খাইল না। শেষে নাতু নিয়া আয়ি বাড়ি গেল।
সে কী পুরী!—রাজ্যজোড়া! সেই ‘অছিন অভিন’ পুরী রাক্ষসে রাক্ষসে কিলবিল। যত রাক্ষসে পৃথিবী ছাঁকিয়া জীবজন্তু মারিয়া আনিয়া পুরী ভরিয়া ফেলিয়াছে। লাল নীল, রাক্ষসের কাঁধে চড়িয়া বেড়ান আর দেখেন, গাদায় গাদায় মরা, গাদায় গাদায় জরা! পচায়, গলায়, পুরী দগদগ থকথক থক—গন্ধে বারো ভূত পালায়, দেব-দৈত্য ডরায়। দেখিয়া লাল বলিলেন, ‘ভাই, পৃথিবী তো উজাড় হইল!’
নীল চুপ করিয়া রহিলেন,—‘নাঃ, পৃথিবী আর থাকে না!’ তখন, নিশি রাত্রে, যত নিশাচর রাক্ষস, সাত সমুদ্রের ওই পারে যত রাজ-রাজ্য উজাড় দিতে গিয়াছে; এক কাচ্চা-বাচ্চাও পুরীতে নাই; নীলকমল উঠিয়া, লালকমলকে নিয়া পুরীর দক্ষিণ কুয়োর পাড়ে গেলেন। গিয়া, নীল বলিলেন, ‘দাদা, আমার কাপড়-চোপড় ধরো।’
কাপড় দিয়া নীলু, কুয়োয় নামিয়া এক খড়্গ আর এক সোনার কৌটো তুলিলেন। কৌটো খুলিতেই জীয়নকাঠি মরণকাঠি দুই ভিমরুল ভিমরুলী বাহির হইল।
জীয়নকাঠি রাক্ষসের প্রাণ, আর মরণকাঠি যে, সেই রাক্ষসী-রানির প্রাণ। নীল নিলেন জীয়নকাঠি, লাল নিলেন মরণকাঠি।

জীয়নকাঠি-মরণকাঠি
জীয়নকাঠি মরণকাঠি—ভিমরুল ভিমরুলীর, গায়ে বাতাস লাগিতেই, মাথা কনকন বুক চনচন, রাক্ষসের মাথায় টনক পড়িল; বোকা রাজার দেশে রাক্ষসী-রানি ঘুমের চোখে ঢুলিয়া পড়িল।
মাথায় টনক, বুকে চমক; দীঘল দীঘল পায়ে রাক্ষসেরা নদী পর্বত এড়ায়, ধাইয়া ধাইয়া আসে! দেখিয়া নীলকমল জীয়নকাঠির পা দুইটি ছিঁড়িয়া দিলেন। যত রাক্ষসের দুই পা খসিয়া পড়িল।
দুই হাতে ভর, তবু রাক্ষস ছুটিয়া ছুটিয়া আসে; নীলকমল জীয়নকাঠির আর চার পা ছিঁড়িয়া ফেলিলেন। যত রাক্ষসের হাত খসিয়া পড়িল!
হাত নাই, পা নাই, তবু রাক্ষস—
‘হাঁউ মাউ কাঁউ!
সাঁত শঁত্তুর খাঁউ!!’
—বলিয়া গড়াইয়া গড়াইয়া ছোটে! খড়্গের ধারে ধরিয়া নীলকমল জীয়নকাঠির মাথা কাটিলেন। আর, যত রাক্ষসের মাথা ছুটিয়া পড়িল। আয়িবুড়ির মাথাটা ছিটকাইয়া পড়িয়া নীল লালকেধরে-ধরে গিলে-গিলে!
তখন রাক্ষস-পুরী খাঁ-খাঁ; আর কে থাকে? নীলকমল লালকমল আয়িবুড়ির মাথা নতুন কাপড়ে জড়াইয়া, মরণকাঠি ভীমরুলের সোনার কৌটো নিয়া, ‘বেঙ্গম, বেঙ্গম!’ বলিয়া ডাক দিলেন।
তিন মাস তেরো রাত্রির পর দুই ভাইয়ের পা দেশে পড়িল। দেশের সকলে জয় জয় করিয়া উঠিল!
নীলকমল লালকমল বলিলেন, ‘সিপাইরা কই? ওষুধ নাও।’

ও-মা!
সিপাইরা কি আছে? আই আর কাই তো রাক্ষস ছিল! তারা সেইদিনই মরিয়াছে। নীলকমল লালকমল আপন সিপাই দিয়া বুকে খিল পিঠে খিল রাজার দেশে রাক্ষসের মাথা পাঠাইয়া দিলেন।
‘ও-মা!!’ মাথা দেখিয়াই রানি নিজমূর্তি ধারণ করিল—
‘করম খাম গরম খাম
মুড়মুড়িয়ে হাড্ডি খাম!
হম ধম ধম চিতার আগুন
তবে বুকের জ্বালা যাম!!’
বলিয়া রাক্ষসী-রানি বিকটমূর্তি ধরিয়া ছুটিতে ছুটিতে নীলকমল, লালকমলের রাজ্যে গিয়া উপস্থিত হইল!
বাহির দুয়ারে, ‘খাম! খাম!!’
লাল বলিলেন, ‘থাম থাম!’ লালকমল মরণকাঠি ভিমরুল আনিয়া কৌটো খুলিলেন।
গা ফুলিয়া ঢোল,
চোখের দৃষ্টি ঘোল।
মরণকাঠি দেখিয়া, রাক্ষসী মরিয়া পড়িয়া গেল!
সকলে আসিয়া দেখে, এটা আবার কী! খোক্কসের ঠাকুরমা নাকি? আমাদের রাজ্যে বুঝি নিমন্ত্রণ খাইতে আসিয়াছিল? সকলে ‘হো-হো-হো!!’ করিয়া উঠিল।
জল্লাদেরা আসিয়া মরা রাক্ষসীটাকে ফেলিয়া দিল।
রানি মরিল, আর বোকা রাজার রোগ সারিয়া গেল। ভালো হইয়া, রাজা রাজ্যে রাজ্যে ঢোল দিলেন।
প্রজারা আসিয়া বলিল, ‘হায়! আমাদের সোনার রাজপুত্র অজিত কুসুম কই?’
রাজা নিশ্বাস ছাড়িয়া বলিলেন ‘হায়! অজিত কুসুম কই?’
এমন সময় রাজপুরীর বাহিরে ঢাক-ঢোলের শব্দ! রাজা বলিলেন, ‘দেখো তো, কী।’
গলাগলি দুই রাজপুত্র আসিয়া রাজার পায়ে প্রণাম করিল। রাজা বলিলেন, ‘তোরা কি আমার অজিত কুসুম?’
প্রজারা সকলে বলিল, ‘ইহারাই আমাদের অজিত কুসুম!’
তখন দুই রাজ্য এক হইল; নীলকমল লালকমল ইলাবতী লীলাবতীকে লইয়া, দুই রাজা সুখে কাল কাটাইতে লাগিলেন।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন