শিয়াল পন্ডিত

দক্ষিণারঞ্জন মিত্র মজুমদার

এক যে ছিল শিয়াল,

তার বাপ দিয়েছিল দেয়াল;

তাঁর ছেলে সে, কম বা কীসে?

তারও হল খেয়াল!

ইয়া-ইয়া গোঁফে চাড়া দিয়া, শিয়াল পন্ডিত শটির বনে এক মস্ত পাঠশালা খুলিয়া ফেলিল।

চিঁচিঁ পোকা, ঝিঁঝিঁ পোকা, রামফড়িঙের ছা,

কচ্ছপ, কেন্নো হাজার পা,

কেঁচো, বিছে, গুবরে আরশোলা, ব্যাং

কাঁকড়া,—মাকড়া—এই এই ঠ্যাং!

শিয়াল পন্ডিতের পাঠশালায় এত এত পড়ুয়া।

পড়ুয়াদের পড়ায়

পন্ডিতের সাড়ায়,

শটির বনে দিন-রাত হট্টগোল।

দেখিয়া শুনিয়া এক কুমির ভাবিল, তাই তো! সকলের ছেলেই লেখাপড়া শিখিল, আমার ছেলেরা বোকা হইয়া থাকিবে? কুমির, শিয়াল পন্ডিতের পাঠশালায় সাত ছেলে নিয়া গিয়া হাতেখড়ি দিল।

ছেলেরা আঞ্জি ক খ পড়ে। শিয়াল বলিল—‘কুমির মশাই দেখেন কী—সাতদিন যাইতে-না-যাইতেই আপনার এক এক ছেলে বিদ্যাগজগজ ধনুর্ধর হইয়া উঠিবে।’ মহা খুশি হইয়া কুমির বাড়ি আসিল।

পন্ডিত মহাশয় পড়ান, রোজ একটি করিয়া কুমিরের ছানা দিয়া জল খান। এইরকম করিয়া ছয় দিন গেল।

কুমির ভাবিতেছে কাল তো আমার ছেলেরা বিদ্যাগজগজ ধনুর্ধর হইয়া আসিবে, আজ একবার দেখিয়া আসি। ভাবিয়া কুমিরানিকে বলিল—‘ওগো ইলিশ-খলিশের চচ্চড়ি, রুই-কাতলার গড়গড়ি, চিতল-বোয়ালের মড়মড়ি, সব তৈয়ার করিয়া রাখো, ছেলেরা আসিয়া খাইবে’। বলিয়া কুমির পুরানো চটের থান, ছেঁড়া জালের চাদর, জেলেডিঙির টোপর পরিয়া একগাল শেওলা চিবাইতে চিবাইতে ভুঁড়িতে হাত বুলাইতে বুলাইতে পন্ডিত মহাশয়ের কাছে গিয়া উপস্থিত।—‘পন্ডিতমশাই, পন্ডিতমশাই, দেখি দেখি, ছেলেরা আমার কেমন লেখাপড়া শিখিয়াছে।’

তাড়াতাড়ি উঠিয়া পন্ডিত মহাশয় বলিলেন, ‘আসুন আসুন, বসুন বসুন। হ্যাঁরে গুবরে তামাক দে, আরে ফরিঙে, নস্যির ডিবে নিয়ে আয়।—হ্যাঁরে কুমির-সুন্দরেরা কোথায় গেল রে? বসুন বসুন আমি ডাকিয়া নিয়া আসি।’

গর্তের ভিতরে গিয়া শিয়াল পন্ডিত সেই শেষ একটি ছানাকে উঁচু করিয়া সাতবার দেখাইল। বলিল ‘কুমির মশাই, এত খাটিলাম-খুটিলাম, আর একটুর জন্য কেন খুঁত রাখিবেন? সব ছেলেই বিদ্যাগজগজ হইয়া গিয়াছে আর একদিন থাকিলেই একবারে ধনুর্ধর হইয়া ঘরে যাইতে পারিবে।’

কুমির বলিল, ‘আচ্ছা, আচ্ছা বেশ, তাহাই হইবে।’

বোকা কুমির খুশি হইয়া চলিয়া গেল।

পরদিন শিয়াল পন্ডিত বাকি ছানাটিকে দিয়া সব-শেষ জলযোগ সারিয়া—পাঠশালা পুঠশালা ভাঙিয়া—পলায়ন!

পিট্টান তো পিট্টান—কুমির আসিয়া দেখে পড়ুয়ারা পড়ে না, শিয়াল পন্ডিত ঘরে নাই, শটির বন খালি। কুমির তখন সব বুঝিতে পারিল। গালে চড় মাথায় চাপড়, হাপুস নয়নে কাঁদিয়া, কুমির বলিল আচ্ছা পন্ডিত দাঁড়া—

আর কি কাঁকড়া খাবি না?

আর কি খালে যাবি না?

ওই খালে তো কাঁকড়া খাবি,

দেখি কী করে

মুই কুমিরের হাত এড়াবি।’

কুমির চুপ করিয়া খালের জলে লুকাইয়া রহিল।

ক-দিন যায়; শিয়াল পন্ডিত খালের ওই ধারে ধারে ঘুরে প্রাণান্তেও জলটিতে পা ছোঁয়ায় না। শেষে পেটের জ্বালা বড়ো জ্বালা—তার উপর ওপারের চড়ায় কাঁকড়ারা ছাঁয়ে-পোয়ে দলে দলে দাঁড়া বাহির করিয়া ধিড়িং ধিড়িং নাচে; আর কি সয়? সব ভুলিয়া-টুলিয়া যাক প্রাণ থাক মান—জলে দিলেন ঝাঁপ!

আর কোথা যায়, ছত্রিশ গন্ডা দাঁতে কুমির, পন্ডিতের ঠ্যাংটি ধরিয়া ফেলিল!

জেলেডিঙির টোপর

টানাটানি হুড়োহুড়ি—পন্ডিত এক নলখাগড়ার বনে গিয়া ঠেকিলেন। অমনি এক নলের আগা ভাঙিয়া হাসিয়া পন্ডিত বলিল, হাঃ! ‘কুমিরমশাই এত বোকা তা তো জানিতাম না! কোথায় বা আমার ঠ্যাং, কোথায় বা লাঠি! ধরুন ধরুন, লাঠিটা ছাড়িয়া ঠ্যাংটাই ধরিতেন!’—কুমির ভাবিল—‘অ্যাঁ—লাঠি ধরিয়াছি? ধর ধর ঠ্যাং ছাড়িয়া কুমির লাঠিতে কামড় দিল।

নল ছাড়িয়া দিয়া পন্ডিত তিন লাফে পার! ‘কুমিরমশাই, হুক্কাহুয়া! আবার পাঠশালা খুলিব, ছেলে পাঠাইও।’

আবার দিন যায়; শিয়ালের আর লেজটিতেও কুমির পা দিতে পারে না। শেষে একদিন মনে মনে অনেক যুক্তি বুদ্ধি-টুদ্ধি আঁটিয়া, সটান লেজ, রোদমুখো হাঁ, ঢেঁকি-অবতার হইয়া কুমির খালের চড়ায় হাত-পা ছড়াইয়া একেবারে মরিয়া পড়িয়া রহিল। শিয়াল পন্ডিত সেই পথে যায়। দেখিল—‘বস! কুমির তো মরিয়াছে! যাই শিয়ালনিকে নিমন্ত্রণটা দিয়া আসি।’

লাঠিটা ছাড়িয়া ঠ্যাংটাই ধরিতেন!

কিন্তু পন্ডিতের মনে মনে সন্দ। গোঁফে তিন চাড়া দিয়া দাঁত মুখ চাটিয়া-চুটিয়া বলিতেছে ‘আহা বড়ো সাধুলোক ছিল গো!’ কী হয়েছিল গো! কী করে গেল গো! আচ্ছা লোকটা যে মরিল তার লক্ষণ কী? হুঁ হুঁ—

কান নড়বে পটাপট,

লেজ পড়বে চটাচট

তবে তো মড়া! এ বেটা এখনও তবে মরেনি!’

কুমির ভাবিল কথা বুঝি সত্যি—কান নাই তবু কুমির মাথা ঘুরাইয়া কান নাড়ে, চটচটচট লেজ আছাড়ে।

দূরে ছিল কতকগুলি রাখাল।

ওরে! ওই সে কুমির ডাঙায় এল,

যে ব্যাটা সেদিন বাছুর খেল!

কাস্তে, লাঠি, ইট, পাটকেল ধড়াধ্বড় পড়ে—হইহই রইরই করিয়া আসিয়া রাখালের দল কুমিরের পিছনে লাগিয়া গেল।

শিয়াল পন্ডিত তিন ছুটে চম্পট—

হুক্কাহুয়া, কুমির মশাই!

নমস্কার! এবার পালাই!

অনেক দূরে আসিয়া শিয়াল পন্ডিত এক বেগুনের খেতে ঢুকিলেন।

ক্ষুধায় পেটটি আনচান, মনের সুখে বেগুন খান;

খেতে খেতে হঠাৎ কখন নাকে ফুটল কাঁটা,

‘হ্যাঁচ—হ্যাঁচ—হ্যাঁচ—ফ্যাঁচ—ফ্যাঁচ—ফ্যাঁচ—’

কিছুতেই কিছু না, রক্তে ভেসে গেল গা-টা

শেষে, কাবুজাবু হইয়া শিয়াল নাপিতের বাড়ি গেলেন—

হুঁ হুঁ

‘নরসুন্দর নরের সুন্দর ঘরে আছ হে?

বাইরে একটু এসো রে ভাই নরুনখানা নে।’

নাপিত বড়ো ভালো মানুষ ছিল; নরুন লইয়া আসিয়া বলিল, ‘কে ভাই, শিয়াল পন্ডিত? তাই তো, একী! আহা-হা, নাকটা তো গিয়াছে!’ দু-ফোঁটা চোখের জল ফেলিয়া ফুঁপিয়া ফুঁপিয়া শিয়াল বলিল,—

‘ওই তো দুঃখে কাঁদি রে ভাই, মন কি আমার আছে?

তুমি ছাড়া আর গতি নাই, এলাম তোমার কাছে।’

নাপিত বড়ো দয়াল, মন গলিল; বলিল, ‘বোসো, বসো, কাঁটা খুলিয়া দিতেছি।’

একে হল আর,

শিয়ালের নাক কেটে গেল, কাঁটা করতে বার!

‘উঁয়া উঁয়া! হুঁয়া, হুঁয়া! ক্যাঃ—ক্যাঃ!! ওরে হতভাগা পাজি পাষন্ডে নাপতে! দ্যাখতো দ্যাখতো কী করেছিস। দে ব্যাটা, আগে আমার নাক জুড়িয়া দে, নইলে তোকে দেখাচ্ছি!’

একে হল আর

ভালো মানুষ নাপিত ভয়ে থতোমতো,বলিল, ‘দাদা! বড়ো চুক হইয়া গিয়াছে; মাফ করো ভাই, নইলে গরিব প্রাণে মারা যাই।’

শিয়াল বলিল, ‘আচ্ছা যা; যা হইবার তা তো হইল; তবে, তোর নরুনখানা আমাকে দে, তোকে ছাড়িয়া দিতেছি।’

কী করে? নাপিত শিয়ালকে নরুনখানা দিল। নরুন পাইয়া শিয়াল বলিল, ‘আচ্ছা, তবে আসি।’

শিয়াল এক কুমোরের বাড়ির সামনে দিয়া যায়; দেখিয়া কুমোর বলিল, ‘কে হে বট ভাই, কে যাচ্ছ? মুখে ওটা কী?’

তবে একটি হাঁড়ি দাও

শিয়াল বলিল, ‘কুমোর ভাই না-কি? ও একটা নরুন নিয়া যাচ্ছি।’

কুমোরেরও একটা নরুনের বড়ো দরকার—বলিল, ‘তা ভাই, দেখি, দেখি তোমার নরুনটা কেমন?’

পরখ করিতে করিতে নরুনটা মট করিয়া ভাঙিয়া গেল; কুমোর বলিল, ‘আঃ হাঃ!’

চটিয়া উঠিয়া শিয়াল বলিল, ‘আজ্ঞে কুমোরের পো, সেটি হবে না! ভালো চাও তো আমার নরুনটি জোড়াইয়া দাও!’

সে গাঁয়ে কামার নাই। নিরুপায় হইয়া কুমোর বলিল, ‘এখন কী করি ভাই, মাফ না করিলে যে গরিব মারা যায়!’

শিয়াল বলিল, ‘তবে একটি হাঁড়ি দাও!’

কুমোর একটি হাঁড়ি দিয়া হাঁফ ছাড়িয়া বাঁচিল। হাঁড়ি লইয়া শিয়াল আবার চলিতে লাগিল।

এক বিয়ের বর যায়! বোম পটকা, আতসবাজি ছুড়িতে ছুড়িতে সকলে চলিয়াছে। অন্ধকারে, কে জানে? একটা পটকা ছুটিয়া গিয়া শিয়ালের হাঁড়িতে পড়িল। হাঁড়িটি ফাটিয়া গেল। দুই চোখ ঘুরাইয়া আসিয়া শিয়াল বলিল, ‘কে হে বাপু, বড়ো তুমি বর যাচ্ছ—বাজি পোড়ানোর আর জায়গা পাও নাই? ভালো চাও, আমার হাঁড়িটি দাও!’

বর ভ্যাবাচ্যাকা খাইয়া গেল। সকলে বলিল, ‘মাফ করো ভাই, মাফ করো ভাই, নইলে আমরা সব মারা যাই।’

শিয়াল বলিল, ‘সেটি হবে না। কনেটিকে আগে আমাকে দাও, তারপর তোমরা যেখানে খুশি যাও।’

কী আর করে? বর, কনেটি শিয়ালকে দিল।

কনে পাইয়া শিয়াল সেখান হইতে চলিল।

এক ঢুলির বাড়ি গিয়া শিয়াল বলিল, ‘ঢুলি ভাই, ঢুলি ভাই, তোমরা ক-জন আছ?—আমি বিয়ে করিব, সব ঢোল বায়না করো দেখি। কনেটি তোমার এখানে থাকিল, আমি পুরুতবাড়ি চলিলাম।’

ঢুলি ঢোল বায়না করিতে গেল, শেয়াল পুরুতবাড়ি চলিল। ঢুলিবউ কুটনো কুটিতে বসিয়াছে। কনেটি ঝিমাইতে ঝিমাইতে বঁটির উপরে পড়িয়া গিয়া কাটিয়া দুইখান হইয়া গেল! ভয়ে ঢুলিবউ কনের দুই টুকরো নিয়া খড়ের গাদায় লুকাইয়া রাখিয়া আসিল।

পুরুত নিয়া আসিয়া শিয়াল দেখে, কনে নাই!—‘ভালো চাও তো ঢুলিবউ কনেটি এনে দাও!’’ ভয়ে ঢুলিবউ ঘরে উঠিয়া বলে, ‘ও মা, কী হবে গো!’

শিয়াল বলিল, ‘সে সব কথা থাক, ঢুলির ঢোলটি দাও তো ছাড়িয়া দিচ্ছি।’

ঢুলিবউ ভাবিল,—বাঁচিলাম! তাড়াতাড়ি ঢোলটি আনিয়া দিয়া ঘরে গিয়া দুয়ার দিল।

ঢোল নিয়া গিয়া শিয়াল এক তাল গাছের উপর উঠিয়া বাজায় আর গায়,—

‘তাক ডুমা ডুম ডুম!!!

বেগুন খেতে ফুটল কাঁটা—তাক ডুমা ডুম ডুম!

কাঁটা খুলতে কাটল নাক,

তাক ডুমা ডুম ডুম!

নাকুর বদল নরুন পেলাম,

তাক ডুমা ডুম ডুম!

নরুন দিয়ে হাঁড়ি পেলাম—তাক ডুমা ডুম ডুম!

হাঁড়ির বদল কনে পেলাম—তাক ডুমা ডুম ডুম!

কনে গিয়ে ঢোল পেয়েছি—তাক ডুমা ডুম ডুম!

ডাগুম ডাগুম ডুগ-ডুমা ডুম!!

ডুম ডুমা ডুম ডুম!!

বাঃ !!!

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%