ঘুমন্ত পুরী

দক্ষিণারঞ্জন মিত্র মজুমদার

এক দেশের এক রাজপুত্র। রাজপুত্রের রূপে রাজপুরী আলো। রাজপুত্রের গুণের কথা লোকের মুখে ধরে না।

একদিন রাজপুত্রের মনে হইল, দেশভ্রমণে যাইবেন। রাজ্যের লোকের মুখ ভার হইল, রানি আহার-নিদ্রা ছাড়িলেন; কেবল রাজা বলিলেন,—‘আচ্ছা যাক।’

তখন দেশের লোক দলেদলে সাজিল,

রাজা চর-অনুচর দিলেন,

রানি মণি-মাণিক্যের ডালা লইয়া আসিলেন।

রাজপুত্র লোকজন, মণি-মাণিক্য, চর-অনুচর কিছুই সঙ্গে নিলেন না। নতুন পোশাক পরিয়া, নতুন তরোয়াল ঝুলাইয়া, রাজপুত্র দেশভ্রমণে বাহির হইলেন।

যাইতে, যাইতে, যাইতে, যাইতে, কত দেশ, কত পর্বত, কত নদী, কত রাজার রাজ্য ছাড়াইয়া রাজপুত্র এক বনের মধ্যে গিয়া উপস্থিত হইলেন। দেখেন, বনে পাখপাখালির শব্দ নাই, বাঘ-ভালুকের সাড়া নাই। রাজপুত্র চলিতে লাগিলেন।

চলিতে চলিতে, অনেক দূর গিয়া রাজপুত্র দেখেন, বনের মধ্যে এক যে রাজপুরী—রাজপুরীর সীমা। অমন রাজপুরী রাজপুত্র আর কখনো দেখেন নাই। দেখিয়া রাজপুত্র অবাক হইয়া রহিলেন।

রাজপুরীর ফটকের চূড়া আকাশে ঠেকিয়াছে। ফটকের দুয়ার বন জুড়িয়া আছে। কিন্তু ফটকের চূড়ায় বাদ্য বাজে না, ফটকের দুয়ারে দুয়ারি নাই।

রাজপুত্র আস্তে আস্তে রাজপুরীর মধ্যে গেলেন।

রাজপুরীর মধ্যে গিয়া দেখেন, পুরী যে পরিষ্কার, যেন দুধ ধোয়া,—ধব ধব করিতেছে। কিন্তু এমন পুরীর মধ্যে জনমানুষ নাই, কোনো কিছুর সাড়াশব্দ পাওয়া যায় না, পুরী নিভাঁজ, নিঝুম, পাতাটি পড়ে না, কুটোটুকু নড়ে না।

রাজপুত্র আশ্চর্য হইয়া গেলেন।

রাজপুত্র এদিক দেখেন, ওদিক দেখেন, পুরীর চারিদিক দেখিতে লাগিলেন।

একখানে গিয়া রাজপুত্র থমকিয়া গেলেন। দেখেন, মস্ত আঙিনা, আঙিনা জুড়িয়া হাতি, ঘোড়া, সিপাই, লশকর, দুয়ারি, পাহারা, সৈন্য, সামন্ত সব সারি সারি দাঁড়াইয়া রহিয়াছে!

রাজপুত্র হাঁক দিলেন!

কেহ কথা কহিল না,

কেহ তাঁহার দিকে ফিরিয়া দেখিল না।

অবাক হইয়া রাজপুত্র কাছে গিয়া দেখেন, কাতারে কাতারে সিপাই, লশকর, কাতারে কাতারে হাতি ঘোড়া সব পাথরের মূর্তি হইয়া রহিয়াছে। কাহারো চক্ষে পলক পড়ে না; কাহারো গায়ে চুল নড়ে না। রাজপুত্র আশ্চর্য হইয়া দাঁড়াইয়া রহিলেন।

তখন রাজপুত্র পুরীর মধ্যে গেলেন।

এক কুঠরিতে গিয়া দেখেন, কুঠরির মধ্যে কতরকমের ঢাল তরোয়াল, তির ধনুক সব হাজারে হাজারে টাঙানো রহিয়াছে। পাহারাদারেরা পাথরের মূর্তি, সিপাইরা পাথরের মূর্তি। রাজপুত্র আপনার তরোয়াল খুলিয়া আস্তে আস্তে চলিয়া আসিলেন।

আর এক কুঠরিতে গিয়া দেখেন, মস্ত রাজদরবার, রাজদরবারে সোনার প্রদীপে ঘিয়ের বাতি জ্বলজ্বল করিতেছে, চারিদিকে মণিমাণিক্য ঝকঝক করিতেছে। কিন্তু রাজ-সিংহাসনে রাজা পাথরমূর্তি, মন্ত্রীর আসনে মন্ত্রী পাথরমূর্তি, পাত্র মিত্র, ভাট বন্দি, সিপাই লশকর যে যেখানে, সে সেখানে পাথরমূর্তি। কাহারো চক্ষে পলক নাই, কাহারো মুখে কথা নাই। রাজপুত্র দেখেন, রাজার মাথায় রাজছত্র হেলিয়া আছে, দাসীর হাতে চামর ঢুলিয়া আছে, সাড়া নাই, শব্দ নাই, সব ঘুমে নিঝুম। রাজপুত্র মাথা নোয়াইয়া চলিয়া আসিলেন।

আর এক কুঠরিতে গিয়া দেখেন, যেন কত শত প্রদীপ একসঙ্গে জ্বালিতেছে—কত রকমের ধন-রত্ন, কত হিরা, কত মানিক, কত মোতি—কুঠরিতে আর ধরে না। রাজপুত্র কিছু ছুঁইলেন না; দেখিয়া, আর এক কুঠরিতে চলিয়া গেলেন।

সে কুঠরিতে যাইতে-না-যাইতে হাজার হাজার ফুলের গন্ধে রাজপুত্র বিভোর হইয়া উঠিলেন। কোথা হইতে এমন ফুলের গন্ধ আসে? রাজপুত্র কুঠরির মধ্যে গিয়া দেখেন, জল নাই টল নাই, কুঠরির মাঝখানে লাখে লাখে পদ্মফুল ফুটিয়া রহিয়াছে! পদ্মফুলের গন্ধে ঘর ম-ম করিতেছে। রাজপুত্র ধীরে ধীরে ফুলবনের কাছে গেলেন।

ফুলবনের কাছে গিয়া রাজপুত্র দেখেন, ফুলের বনে সোনার খাট, সোনার খাটে হিরার ডাঁট, হিরার ডাঁটে ফুলের মালা দোলানো রহিয়াছে; সেই মালার নীচে, হিরার নালে সোনার পদ্ম, সোনার পদ্মে এক পরমা সুন্দরী রাজকন্যা বিভোরে ঘুমাইতেছেন। ঘুমন্ত রাজকন্যার হাত দেখা যায় না, পা দেখা যায় না, কেবল চাঁদের-কিরণ মুখখানি সোনার পদ্মের সোনার পাপড়ির মধ্যে টুলটুল করিতেছে। রাজপুত্র মোতির ঝালর হিরার ডাঁটে ভর দিয়া, অবাক হইয়া দেখিতে লাগিলেন।

দেখিতে, দেখিতে, দেখিতে, দেখিতে, কত বছর চলিয়া গেল। রাজকন্যার আর ঘুম ভাঙে না, রাজপুত্রের চক্ষে আর পলক পড়ে না। রাজকন্যা অঘোরে ঘুমাইতেছেন, রাজপুত্র বিভোর হইয়া দেখিতেছেন।

হঠাৎ একদিন রাজপুত্র দেখেন, রাজকন্যার শিয়রে এক সোনার কাঠি। রাজপুত্র আস্তে আস্তে সোনার কাঠি তুলিয়া লইলেন।

সোনার কাঠি তুলিয়া লইতেই দেখেন, আর এক দিকে এক রুপার কাঠি। রাজপুত্র আশ্চর্য হইয়া রুপার কাঠিও তুলিয়া লইলেন। দুই কাঠি হাতে লইয়া রাজপুত্র নাড়িয়া চাড়িয়া দেখিতে লাগিলেন।

(চাঁদের-কিরণ মুখখানি সোনার পদ্মেরসোনার পাপড়ির মধ্যে টুলটুল রাজকন্যার আর ঘুম ভাঙে না,

রাজপুত্রের চক্ষে আর পলক পড়ে না।)

দেখিতে দেখিতে, সোনার কাঠিটি কখন টুক করিয়া ঘুমন্ত রাজকন্যার মাথায় ছুঁইয়া গেল! অমনি পদ্মের বন ‘শিউরে’ উঠিল, সোনার খাট নড়িয়া উঠিল, সোনার পাপড়ি ঝরিয়া পড়িল, রাজকন্যার হাত হইল, পা হইল; গায়ের আলস ভাঙিয়া, চোখের পাতা কচলাইয়া ঘুমন্ত রাজকন্যা চমকিয়া উঠিয়া বসিলেন।

আর অমনি রাজপুরীর চারিদিকে পাখি ডাকিয়া উঠিল, দুয়ারে দুয়ারি আসিয়া হাঁক ছাড়িল, উঠোনে হাতি ঘোড়া ডাক ছাড়িল, সিপাই তরোয়াল ঝন ঝন করিয়া উঠিল; রাজদরবারে রাজা জাগিলেন, মন্ত্রী জাগিলেন, পাত্র জাগিলেন—হাজার বচ্ছরের ঘুম হইতে যে যেখানে ছিলেন জাগিয়া উঠিলেন—লোক লশকর, সিপাই পাহারা, সৈন্য সামন্ত, তির-তরোয়াল লইয়া খাড়া হইল।

সকলে অবাক হইয়া গেলেন—রাজপুরীতে কে আসিল!

রাজপুত্র অবাক হইয়া গেলেন,

রাজকন্যা অবাক হইয়া চাহিয়া রহিলেন।

রাজা, মন্ত্রী, জন-পরিজন সকলে আসিয়া দেখেন রাজপুত্র!

রাজকন্যা মাথা নামাইলেন।

রাজপুরীর চারিদিকে ঢাক-ঢোল সানাই-নাকাড়া বাজিয়া উঠিল!

রাজা বলিলেন, ‘তুমি কোন দেশের ভাগ্যবান রাজার রাজপুত্র, আমাদিগকে মরণ-ঘুমের হাত হইতে রক্ষা করিয়াছ!’

জন-পরিজনেরা বলিল, ‘আহা! আপনি কোন দেবতা-রাজার দেব রাজপুত্র—এক দৈত্য রুপার কাঠি ছোঁয়াইয়া আমাদের গমগমা সোনার রাজ্য ঘুম পাড়াইয়া রাখিয়াছিল, আপনি আসিয়া আমাদিগকে জাগাইয়া রক্ষা করিলেন।’

রাজপুত্র মাথা নোয়াইয়া চুপ করিয়া রহিলেন। রাজা বলিলেন, ‘আমার কী আছে, কী দিব? এই রাজকন্যা তোমার হাতে দিলাম, এই রাজত্ব তোমাকে দিলাম!’

চারিদিকে ফুলবৃষ্টি, চারিদিকে চন্দনবৃষ্টি, ফুল ফোটে, খই ছোটে, রাজপুরীর হাজার ঢোলে ‘ডুমডুম’ কাঠি পড়িল।

তখন, শতে শতে বাঁদি দাসী বাটনা বাটে, হাজারে হাজারে ধাই দাসী কুটনো কোটে;

দুয়ারে দুয়ারে মঙ্গল ঘড়া

পাঁচ পল্লব ফুলের তোড়া;

আলপনা বিলিপনা, এয়োর ঝাঁক,

পাট-পিঁড়ি আসন ঘিরে, বেজে ওঠে শাঁখ।

সে কী শোভা! রাজপুরীর চার-চত্বর দলদল ঝলমল! আঙিনায় আঙিনায় হুলুধ্বনি, রাজভান্ডারে ছড়াছড়ি; জন-জনতার হুড়োহুড়ি, এতদিনের ঘুমন্ত রাজপুরী দাপে কাঁপে, আনন্দে তোলপাড়!

তাহার পর, ফুটফুটে চাঁদের আলোয় আগুন-পুরুত সম্মুখে, গুয়াপান, রাজ-রাজত্ব যৌতুক দিয়া, রাজা, পঞ্চরত্ন মুকুট পরাইয়া রাজপুত্রের সঙ্গে রাজকন্যার বিবাহ দিলেন।

চারিদিকে জয়ধ্বনি উঠিল।

এক বছর, দু-বছর, বছরের পর কত বছর গেল, দেশভ্রমণে গিয়াছেন, রাজপুত্র আজও ফিরেন না। কাঁদিয়া কাটিয়া, মাথা খুঁড়িয়া রানি বিছানা নিয়াছেন। ভাবিয়া ভাবিয়া, চোখের জল ফেলিতে ফেলিতে রাজা অন্ধ হইয়াছেন। রাজ্য অন্ধকার, রাজ্যে হাহাকার।

একদিন ভোর হইতে-না-হইতে রাজদুয়ারে ঢাক-ঢোল বাজিয়া উঠিল, হাতি ঘোড়া সিপাই-সান্ত্রির হাঁকে দুয়ার কাঁপিয়া উঠিল!

রানি বলিলেন,—‘কী, কী?’

রাজা বলিলেন,—‘কে, কে?’

রাজ্যের প্রজারা ছুটিয়া আসিল।—রাজপুত্র!

রাজকন্যা বিবাহ করিয়া লইয়া ফিরিয়া আসিয়াছেন!!

কাঁপিতে কাঁপিতে রাজা আসিয়া রাজপুত্রকে বুকে লইলেন! পড়িতে পড়িতে রানি আসিয়া রাজকন্যাকে বরণ করিয়া নিলেন।

প্রজারা আনন্দধ্বনি করিয়া উঠিল।

রাজপুত্র রাজার চোখে সোনার কাঠি ছোঁয়াইলেন, রাজার চোখ ভালো হইল। ছেলেকে পাইয়া, ছেলের বউ দেখিয়া রানির অসুখ সারিয়া গেল।

তখন, রাজপুত্র লইয়া, ঘুমন্তপুরীর রাজকন্যা লইয়া, রাজা-রানি সুখে রাজত্ব করিতে লাগিলেন।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%