শীত বসন্ত

দক্ষিণারঞ্জন মিত্র মজুমদার

এক রাজার দুই রানি, সুয়োরানি আর দুয়োরানি। সুয়োরানি যে, নুনটুকু ঊন হইতেই নখের আগায় আঁচড় কাটিয়া, ঘর-কন্নায় ভাগ বাঁটিয়া সতীনকে একপাশ করিয়া দেয়। দুঃখে দুয়োরানির দিন কাটে।

সুয়োরানির ছেলেপিলে হয় না। দুয়োরানির দুই ছেলে, শীত আর বসন্ত। আহা, ছেলে নিয়া দুয়োরানির যে যন্ত্রণা! রাজার রাজপুত্র, সৎ-মায়ের গঞ্জনা খাইতে খাইতে দিন যায়।

একদিন নদীর ঘাটে স্নান করিতে গিয়া সুয়োরানি দুয়োরানিকে ডাকিয়া বলিল, ‘আয় তো, তোর মাথায় ক্ষার-খৈল দিয়া দি।’ ক্ষার-খৈল দিতে দিতে সুয়োরানি চুপ করিয়া দুয়োরানির মাথায় এক ওষুধের বড়ি টিপিয়া দিল। দুঃখিনী দুয়োরানি টিয়া হইয়া ‘টি টি’ করিতে করিতে উড়িয়া গেল।

বাড়ি আসিয়া সুয়োরানি বলিল, ‘দুয়োরানি তো জলে ডুবিয়া মরিয়াছে।’

রাজা তাহাই বিশ্বাস করিলেন।

রাজপুরীর লক্ষ্মী গেল, রাজপুরী আঁধার হইল; মা-হারা শীত-বসন্তের দুঃখের সীমা রহিল না।

টিয়া হইয়া দুঃখিনী দুয়োরানি উড়িতে উড়িতে আর-এক রাজার রাজ্যে গিয়া পড়িলেন। রাজা দেখেন, সোনার টিয়া। রাজার এক টুকটুকে মেয়ে, সেই মেয়ে বলিল, ‘বাবা, আমি সোনার টিয়া নিব।’

টিয়া-দুয়োরানি রাজকন্যার কাছে সোনার পিঞ্জরে রহিলেন।

রণমূর্তি সৎ-মা তাহাদিগকে গালিমন্দ দিয়া খেদাইয়া দিল

দিন যায়, বছর যায়, সুয়োরানির তিন ছেলে হইল। ও মা! এক-এক ছেলে যে, বাঁশের পাতা-পাট-কাঠি, ফুঁ দিলে উড়ে, ছুঁইতে গেলে মরে! সুয়োরানি কাঁদিয়া কাটিয়া রাজ্য ভাসাইল।

পাট-কাঠি তিন ছেলে নিয়া সুয়োরানি গুমরে গুমরে আগুনে পুড়িয়া ঘর করে। মন-ভরা জ্বালা, পেট-ভরা হিংসা,—আপনার ছেলেদের থালে পাঁচ পরমান্ন অষ্টরন্ধন, ঘিয়ে চপ চপ পঞ্চব্যঞ্জন সাজাইয়া দেন; শীত বসন্তের পাতে আলুন আতেল কড়কড়া ভাত সড়সড়া চাল শাকের উপর ছাইয়ের তাল ফেলিয়া দিয়া চলিয়া যান।

সতীন তো ‘উরী পুরী দক্ষিণ-দুরী’—সতীনের ছেলে দুইটা যে, নাদুস নুদুস আর তাঁহার তিন ছেলে পাট-কাঠি! হিংসায় রানির মুখে অন্ন রুচে না, নিশিতে নিদ্রা হয় না।

রানি তে-পথের ধুলা এলাইয়া, তিন কোণের কুটা জ্বালাইয়া, বাসি উননের ছাই দিয়া, ভাঙা কুলায় করিয়া সতীনের ছেলের নামে ভাসাইয়া দিল।

কিছুতেই কিছু হইল না।

শেষে, একদিন শীত বসন্ত পাঠশালায় গিয়াছে; কিছুই জানে না, শোনে না, বাড়িতে আসিতেই রণমূর্তি সৎ-মা তাহাদিগকে গালি-মন্দ দিয়া খেদাইয়া দিল!

তাহার পর রানি, বাঁশ-পাতা ছেলে তিনটাকে আছাড় মারিয়া থুইয়া, উথাল-পাথাল করিয়া এ জিনিস ভাঙে ও জিনিস ছুরে; আপন মাথার চুল ছিঁড়ে, গায়ের আভরণ ছুড়িয়া মারে।

দাসী, বাঁদি, গিয়া রাজাকে খবর দিল।

সুয়োরানির ডরে

থর থর থর করে—

রাজা আসিয়া বলিলেন, ‘এ কি!’

রানি বলিল, ‘কী! সতীনের ছেলে, সেই আমাকে গালমন্দ দিল! শীত বসন্তের রক্ত নহিলে আমি নাইব না!’

অমনি রাজা জল্লাদকে ডাকিয়া আজ্ঞা দিলেন, ‘শীত বসন্তকে কাটিয়া রানিকে রক্ত আনিয়া দাও।’

শীত বসন্তের চোখের জল কে দেখে! জল্লাদ শীত বসন্তকে বাঁধিয়া নিয়া গেল।

এক বনের মধ্যে আনিয়া, জল্লাদ, শীত বসন্তের রাজপোশাক খুলিয়া, বাকল পরাইয়া দিল।

শীত বলিলেন, ‘ভাই, কপালে এই ছিল!’

বসন্ত বলিলেন, ‘দাদা, আমরা কোথায় যাব?’’

কাঁদিতে কাঁদিতে শীত বলিলেন,’ ‘ভাই, চল, এতদিন পরে আমরা মায়ের কাছে যাব।’

খড়্গ নামাইয়া রাখিয়া দুই রাজপুত্রের বাঁধন খুলিয়া দিয়া, ছলছল চোখে জল্লাদ বলিল, ‘রাজপুত্র! রাজার আজ্ঞা, কী করিব—কোলে কাঁখে করিয়া মানুষ করিয়াছি, সেই সোনার অঙ্গে আজ কি-না খড়্গ ছোঁয়াইতে হইবে!—আমি তা পারিব না রাজপুত্র!—আমার কপালে যা থাকে থাকুক, এই বাকল চাদর পরিয়া বনের পথে চলিয়া যাও, কেহ আর রাজপুত্র বলিয়া চিনিতে পারিবে না।’

বলিয়া, শীত বসন্তকে পথ দেখাইয়া দিয়া, দুইটা শিয়াল কুকুর কাটিয়া, জল্লাদ, রক্ত নিয়া রানিকে দিল।

রানি সেই রক্ত দিয়া স্নান করিলেন; খিল খিল করিয়া হাসিয়া, আপনার তিন ছেলে কোলে, পাঁচ পাত সাজাইয়া খাইতে বসিলেন।

শীত বসন্ত দুই ভাই চলেন, চলেন, বন আর ফুরায় না। শেষে, দুই ভাইয়ে এক গাছের তলায় বসিলেন।

বসন্ত বলিলেন, ‘‘দাদা, বড়ো তৃষ্ণা পাইয়াছে, জল কোথায় পাই?’’

শীত বলিলেন, ‘‘ভাই, এত পথ আসিলাম, জল তো কোথাও দেখিলাম না! আচ্ছা, তুমি বোসো, আমি জল দেখিয়া আসি।’’

বসন্ত বসিয়া রহিল, শীত জল আনিতে গেলেন।

যাইতে, যাইতে, অনেক দূরে গিয়া, শীত বনের মধ্যে এক সরোবর দেখিতে পাইলেন। জলের তৃষ্ণায় বসন্ত না-জানি কেমন করিতেছে, কিন্তু কীসে করিয়া জল নিবেন? তখন, গায়ের যে চাদর, সেই চাদর খুলিয়া শীত সরোবরে নামিলেন।

সেই দেশের যে রাজা মারা গিয়াছেন। রাজার ছেলে নাই, পুত্র নাই, রাজসিংহাসন খালি পড়িয়া আছে। রাজ্যের লোকজনে শ্বেত রাজহাতির পিঠে পাটসিংহাসন উঠাইয়া দিয়া হাতি ছাড়িয়া দিল। হাতি যাহার কপালে রাজটিকা দেখিবে, তাহাকেই রাজসিংহাসনে উঠাইয়া নিয়া আসিবে, সে-ই রাজ্যের রাজা হইবে।

রাজসিংহাসন পিঠে শ্বেত রাজহাতি, পৃথিবী ঘুরিয়া কাহারো কপালে রাজটিকা দেখিল না। শেষে ছুটিতে ছুটিতে যে বনে শীত বসন্ত, সেই বনে আসিয়া দেখে, এক রাজপুত্র গায়ের চাদর ভিজাইয়া সরোবরে জল নিতেছে। রাজপুত্রের কপালে রাজটিকা! দেখিয়া, শ্বেত রাজহাতি অমনি শুঁড় বাড়াইয়া শীতকে ধরিয়া সিংহাসনে তুলিয়া নিল।

(শ্বেত রাজহাতি)

হাতি শুঁড় বাড়াইয়া শীতকে ধরিয়া

সিংহাসনে তুলিয়া নিল

‘‘ভাই বসন্ত, ভাই বসন্ত’’ করিয়া শীত কত কাঁদিলেন। হাতি কি তাহা মানে? বন-জঙ্গল ভাঙিয়া, পাট-হাতি শীতকে পিঠে করিয়া ছুটিয়া গেল।

জল আনিতে গেল, দাদা আর ফিরে না। বসন্ত উঠিয়া সকল বন খুঁজিয়া, ‘‘দাদা, দাদা’’ বলিয়া ডাকিয়া খুন হইল। দাদাকে যে হাতিতে নিয়াছে বসন্ত তো তাহা জানে না; বসন্ত কাঁদিয়া কাঁদিয়া সারা হইল। শেষে, দিন গেল, বিকাল গেল, সন্ধ্যা গেল, রাত্রি হইল; তৃষ্ণায় ক্ষুধায় অস্থির হইয়া, দাদাকে হারাইয়া কাঁদিয়া কাঁদিয়া বসন্ত এক গাছের তলায় ধুলা-মাটিতে শুইয়া ঘুমাইয়া পড়িল।

দুঃখিনী মায়ের বুকের মানিক ছাই-পাঁশে গড়াগড়ি গেল!

খুব ভোরে, এক মুনি, জপ-তপ করিবেন, জল আনিতে সরোবরে যাইতে দেখেন, কোন এক পরম সুন্দর রাজপুত্র গাছের তলায় ধুলা-মাটিতে পড়িয়া আছে। দেখিয়া, মুনি বসন্তকে বুকে করিয়া তুলিয়া নিয়া গেলেন।

শ্বেত রাজহাতির পিঠে শীত তো সেই নাই-রাজার রাজ্যে গেলেন! যাইতেই, রাজ্যের যত লোক আসিয়া মাটিতে মাথা ছোঁয়াইল, মন্ত্রী, অমাত্য, সিপাইসান্ত্রিরা সকলে আসিয়া মাথা নোয়াইল; নোয়াইয়া, সকলে রাজসিংহাসনে তুলিয়া নিয়া শীতকে রাজা করিল।

প্রাণের ভাই বসন্ত, সেই বসন্ত-বা কোথায়, শীত-বা কোথায়! দুঃখিনী মায়ের দুই মানিক বোঁটা ছিঁড়িয়া দুইখানে পড়িল।

রাজা হইয়া শীত, ধন-রত্ন, মণি-মাণিক্য, হাতি-ঘোড়া, সিপাই-লশকর লইয়া রাজত্ব করিতে লাগিলেন। আজ এ রাজাকে হারাইয়া দিয়া তাহার রাজ্য নেন, কাল ও-রাজাকে হারাইয়া দিয়া তাহার রাজ্য আনেন, আজ মৃগয়া করেন, কাল দিগ্বিজয়ে যান, এই রকমে দিন যায়।

মুনির কাছে আসিয়া বসন্ত, গাছের ফল খায়, সরোবরের জলে নায়, দায়, থাকে। মুনি চারিপাশে আগুন করিয়া বসিয়া থাকেন, কতদিন কাঠকুটা ফুরাইয়া যায়,—বসন্তের পরনে বাকল, হাতে নড়ি, বনে বনে ঘুরিয়া কাঠকুটা কুড়াইয়া, মুনির জন্য বহিয়া আনে। তাহার পর বসন্ত বনের ফুল তুলিয়া মুনির কুটির সাজায় আর সারাদিন ভরিয়া ফুলের মধু খায়।

কাঠকুটা বহিয়া আনে

তাহার পর, সন্ধ্যা হইতে-না-হইতে বনের পাখি সব একখানে হয়, আপন-আপন বাসায় যায়, বসন্ত মুনির পাশে বসিয়া কত শাস্ত্রের কথা, কত মন্ত্রের কথা এইসব শোনে। এই ভাবে দিন যায়।

রাজসিংহাসনে শীত আপন রাজ্য লইয়া, বনের বসন্ত আপন বন লইয়া থাকে;—দিনে দিনে পলে পলে কাহারো কথা কাহারো মনে থাকিল না।

তিন রাত যাইতে-না-যাইতে সুয়োরানির পাপে রাজার সিংহাসন কাঁপিয়া উঠিল; দিন যাইতে-না-যাইতে রাজার রাজ্য গেল, রাজপাট গেল। সকল হারাইয়া, খোয়াইয়া, রাজা আর সুয়োরানির মুখ দেখিলেন না; রাজা বনবাসে গেলেন।

সুয়োরানির যে, সাজা! ছেলে তিনটি সঙ্গে, এক নেকড়া পরনে এক নেকড়া গায়ে, এ দুয়ারে যায় ‘দূর, দূর!’ ও দুয়ারে যায় ‘ছেই, ছেই!!’ তিন ছেলে নিয়া সুয়োরানি চক্ষের জলে ভাসিয়া পথে পথে ঘুরিতে লাগিলেন।

ঘুরিতে ঘুরিতে সুয়োরানি সমুদ্রের কিনারে গেলেন। আর সাত সমুদ্রের ঢেউ আসিয়া চক্ষের পলকে সুয়োরানির তিন ছেলেকে ভাসাইয়া নিয়া গেল! সুয়োরানি কাঁদিয়া আকাশ ফাটাইল; বুকে চাপড়, কপালে চাপড় দিয়া শোকে দুঃখে পাগল হইয়া, মাথায় পাষাণ মারিয়া সুয়োরানি সকল জ্বালা এড়াইল। সুয়োরানির জন্য পিঁপড়াটিও কাঁদিল না, কুটাটুকুও নড়িল না;—সাত সমুদ্রের জল সাত দিনের পথে সরিয়া গেল। কোথায়-বা সুয়োরানি, কোথায়-বা তিন ছেলে—কোথাও কিছুই রহিল না।

সেই যে সোনার টিয়া—সেই যে রাজার মেয়ে; সেই রাজকন্যার যে স্বয়ংবর। কত ধন, কত দৌলত, কত কী লইয়া কত দেশের কত রাজপুত্র আসিয়াছেন সভা করিয়া সকলে বসিয়া আছেন, এখনও রাজকন্যার বার নাই।

রূপবতী রাজকন্যা আপন ঘরে সিঁথিপাটি কাটিয়া, আলতা কাজল পরিয়া, সোনার টিয়াকে ডাকিয়া জিজ্ঞাসা করিলেন,

‘সোনার টিয়া, বল তো আমার আর কী চাই?’

টিয়া বলিল,

সোনার টিয়া, বল তো আমার আর কী চাই?

‘সাজতো ভালো কন্যা, যদি সোনার নূপুর পাই!’

রাজকন্যা কৌটো খুলিয়া সোনার নূপুর বাহির করিয়া পায়ে দিলেন। সোনার নূপুর রাজকন্যার পায়ে রুনুঝুনু করিয়া বাজিয়া উঠিল! রাজকন্যা বলিলেন,

‘সোনার টিয়া, বল তো আমার আর কী চাই?’

টিয়া বলিল,

‘সাজতো ভালো কন্যা, যদি ময়ূরপেখম পাই!’

রাজকন্যা পেটরা আনিয়া ময়ূরপেখম শাড়ি খুলিয়া পরিলেন। শাড়ির রঙে ঘর উজল, শাড়ির শোভায় রাজকন্যার মন উতল। মুখখানা ভার করিয়া টিয়া বলিল,

‘রাজকন্যা, রাজকন্যা, কীসের গরব কর;

শতেক নহর হিরার হার গলায় না পর!’

রাজকন্যা শতেক নহর হিরার হার গলায় দিলেন। শতেক নহরে শতেক হিরা ঝকঝক করিয়া উঠিল!

টিয়া বলিল,

‘শতেক নহর ছাই!

নাকে ফুল     কানে দুল,

সিঁথির মানিক চাই।’

রাজকন্যা নাকে মোতির ফুলের নোলক পরিলেন; সিঁথিতে মণি-মাণিক্যের সিঁথি পরিলেন।

তখন রাজকন্যার টিয়া বলিল,—

‘রাজকন্যা রূপবতী নাম থুয়েছে মায়।

গজমোতি হত শোভা ষোলো-কলায়।

না আনিল গজমোতি, কেমন এল বর?

রাজকন্যা রূপবতীর ছাইয়ের স্বয়ংবর!’

শুনিয়া, রূপবতী রাজকন্যা গায়ের আভরণ, পায়ের নূপুর, ময়ূরপেখম, কানের দুল ছুড়িয়া, ছিঁড়িয়া, মাটিতে লুটাইয়া পড়িলেন। কীসের স্বয়ংবর, কীসের কী!

রাজপুত্রদের সভায় খবর গেল, রাজকন্যা রূপবতী স্বয়ংবর করিবেন না; রাজকন্যার পণ, যে রাজপুত্র গজমোতি আনিয়া দিতে পারিবেন, রাজকন্যা তাঁহার হইবেন—না পারিলে রাজকন্যার নফর হইয়া থাকিতে হইবে।

সকল রাজপুত্র গজমোতির সন্ধানে বাহির হইলেন।

কত রাজ্যের কত হাতি আসিল, কত হাতির মাথা কাটা গেল—যে-সে হাতিতে কি গজমোতি থাকে? গজমোতি পাওয়া গেল না।

রাজপুত্রেরা শুনিলেন,

সমুদ্রের কিনারে হাতি,

তাহার মাথায় গজমোতি।

সকল রাজপুত্রে মিলিয়া সমুদ্রের ধারে গেলেন।

সমুদ্রের ধারে যাইতে-না-যাইতেই একপাল হাতি আসিয়া অনেক রাজপুত্রকে মারিয়া ফেলিল, অনেক রাজপুত্রের হাত গেল, পা গেল। গজমোতি কি মানুষে আনিতে পারে? রাজপুত্রেরা পলাইয়া আসিলেন।

আসিয়া, রাজপুত্রেরা কী করেন, রূপবতী রাজকন্যার নফর হইয়া রহিলেন।

কথা শীতরাজার কানে গেল। শীত বলিলেন, ‘কী! রাজকন্যার এত তেজ, রাজপুত্রদিগকে নফর করিয়া রাখে! রাজকন্যার রাজ্য আটক করো।’

রাজকন্যা শীতরাজার হাতে আটক হইয়া রহিলেন।

আজ যায় কাল যায়, বসন্ত মুনির বনে থাকেন। পৃথিবীর খবর বসন্তের কাছে যায় না, বসন্তের খবর পৃথিবী পায় না।

মুনির পাতার কুঁড়ে; পাতার কুঁড়েতে এক শুক আর এক শারি থাকে।

একদিন শুক কয়,

‘শারি, শারি! বড়ো শীত!’

শারি বলে,—

‘গায়ের বসন টেনে দিস!’

শুক বলে,

‘বসন গেল ছিঁড়ে, শীত গেল দূর,

কোনখানে, শারি, ন-দী-র কূল?’

শারি উত্তর করিল,

‘দুধ-মুকুটে’ ধবল পাহাড় ক্ষীর-সাগরের পাড়ে,

গজমোতির রাঙা আলো ঝরঝরিয়ে পড়ে।

আলোর তলে পদ্মপাতে খেলে দুধের জল,

হাজার হাজার ফুটে আছে সোনার কমল।।’

শুক কহিল,

‘সেই সোনার কমল, সেই গজমোতি

কে আনবে তুলে কে পাবে রূপবতী!’

শুনিয়া বসন্ত বলিলেন,

‘শুক-শারি     মেসো মাসি

কি বলছিস বল,

আমি আনব গজমোতি

সোনার কমল।’

শুক-শারি বলিল,—‘আহা বাছা, পারিবি?’

বসন্ত বলিলেন, ‘পারিব না তো কী!’

শুক বলিল,— ‘তবে, মুনির কাছে গিয়া ত্রিশূলটা চা!’

শারি বলিল,— ‘শিমুল গাছে কাপড়চোপড় আছে,

মুকুট আছে, তাই নিয়া যা।’

বসন্ত মুনির কাছে গেল। গিয়া বলিল,—‘বাবা, আমি গজমোতি আর সোনার কমল আনিব, ত্রিশূলটা দাও।’

মুনি ত্রিশূল দিলেন।

মুনির পায়ে প্রণাম করিয়া, ত্রিশূল হাতে বসন্ত শিমুল গাছের কাছে গেলেন। গিয়া দেখেন, শিমুল গাছে কাপড়চোপড়, শিমুল গাছে রাজমুকুট। বসন্ত বলিলেন,—‘হে বৃক্ষ, যদি সত্যিকারের বৃক্ষ হও, তো, তোমার কাপড়-চোপড় আর তোমার রাজমুকুট আমাকে দাও।’

বৃক্ষ বসন্তকে কাপড়চোপড় আর রাজমুকুট দিল। বসন্ত বাকল ছাড়িয়া কাপড়চোপড় পরিলেন; রাজমুকুট মাথায় দিলেন। দিয়া বসন্ত, ক্ষীরসাগরের উদ্দেশে চলিতে লাগিলেন।

যাইতে, যাইতে, যাইতে, বসন্ত কত পর্বত, কত বন, কত দেশ-বিদেশ ছাড়াইয়া বারো বছর তেরো দিনে ‘দুধ-মুকুটে’ ধবল পাহাড়ের কাছে গিয়া পৌঁছিলেন। ধবল পাহাড়ের মাথায় দুধের সরথক থক, ধবল পাহাড়ের গায়ে দুধের ঝরনা ঝরঝর; বসন্ত সেই পাহাড়ে উঠিলেন।

উঠিয়া দেখিলেন, ধবল পাহাড়ের নীচে ক্ষীরের সাগর—

ক্ষীরসাগরে ক্ষীরের ঢেউ ঢল ঢল করে—

লক্ষ হাজার পদ্মফুল ফুটে আছে থরে।

ঢেউ থই থই সোনার কমল, তারি মাঝে কী?

দুধেরবরন হাতির মাথে—গজমোতি!

বসন্ত দেখিলেন, চারিদিকে পদ্মফুল, পদ্মফুলের মধ্যে দুধবরন হাতি দুধের জল ছিটাইয়া খেলা করিতেছে—সেই হাতির মাথায় গজমোতি।—সোনার মতন, মণির মতন, হিরার মতন গজমোতির জ্বলজ্বলে আলো ঝর ঝর করিয়া পড়িতেছে। গজমোতির আলোতে ক্ষীরসাগরে হাজার চাঁদের মেলা, পদ্মের বনে পাতে-পাতে সোনার কিরণ খেলা। দেখিয়া, বসন্ত অবাক হইয়া দাঁড়াইয়া রহিলেন।

তখন, বসন্ত, কাপড়চোপড় কষিয়া, হাতের ত্রিশূল আঁটিয়া, ধবল পাহাড়ের উপর হইতে ঝাঁপ দিয়া গজমোতির উপরে পড়িলেন।

অমনি ক্ষীরসাগর শুকাইয়া গেল, পদ্মের বন লুকাইয়া গেল; দুধবরণ হাতি এক সোনার পদ্ম হইয়া জিজ্ঞাসা করিল,—

গজমোতি

‘কোন দেশের রাজপুত্র কোন দেশে ঘর?’

বসন্ত বলিলেন,

‘বনে বনে বাস, আমি মুনির কোঙর।’

পদ্ম বলিল, ‘মাথে রাখো গজমোতি, সোনার কমল বুকে,

রাজকন্যা রূপবতী ঘর করুক সুখে।’

বসন্ত সোনার পদ্ম তুলিয়া বুকে রাখিলেন, গজমোতি তুলিয়া মাথায় রাখিলেন। রাখিয়া ক্ষীরসাগরের বালুর উপর দিয়া বসন্ত দেশে চলিলেন।

অমনি ক্ষীরসাগরের বালুর তলে কাহারা বলিয়া উঠিল, ‘ভাই, ভাই! আমাদিগকে নিয়া যাও।’

বসন্ত ত্রিশূল দিয়া বালু খুঁড়িয়া দেখেন, তিন যে সোনার মাছ! তিন সোনার মাছ লইয়া বসন্ত চলিতে লাগিলেন।

বসন্ত যেখান দিয়া যান, গজমোতির আলোতে দেশ উজল হইয়া উঠে। লোকেরা বলে, ‘দেখো, দেখো, দেবতা যায়!’

বসন্ত চলিতে লাগিলেন।

১০

শীতরাজা মৃগয়ায় বাহির হইয়াছেন। সকল রাজ্যের বন খুঁজিয়া, একটা হরিণ যে, তাহাও পাওয়া গেল না। শীত সৈন্য-সামন্তের হাতে ঘোড়া দিয়া এক গাছতলায় আসিয়া বসিলেন।

গাছতলায় বসিতেই শীতের গায়ে কাঁটা দিল। শীত দেখিলেন, এই তো সেই গাছ! এই গাছের তলায় জল্লাদের কাছ হইতে বনবাসী দুই ভাই আসিয়া বসিয়াছিলেন, ভাই বসন্ত জল চাহিয়াছিল, শীত জল আনিতে গিয়াছিলেন। সব কথা শীতের মনে হইল; রাজমুকুট ফেলিয়া দিয়া, খাপ তরোয়াল ছুড়িয়া দিয়া, শীত, ‘ভাই বসন্ত! ভাই বসন্ত!’ করিয়া ধুলায় লুটাইয়া কাঁদিতে লাগিলেন!

সৈন্য-সামন্তেরা দেখিয়া অবাক! তাহারা দোল চৌদোল আনিয়া রাজাকে তুলিয়া রাজ্যে লইয়া গেল।

১১

গজমোতির আলোতে দেশ উজল করিতে করিতে বসন্ত রূপবতী রাজকন্যার দেশে আসিলেন।

রাজ্যের লোক ছুটিয়া আসিল, ‘দেখো, দেখো, কে আসিয়াছেন!’

রাজা মোদের ভাই

‘মায়ের অপরাধ ভুলিয়া যান’

বসন্ত বলিলেন, ‘আমি বসন্ত, ‘গজমোতি’ আনিয়াছি।’

রাজ্যের লোক কাঁদিয়া বলিল, ‘এক দেশের শীতরাজা রাজকন্যাকে আটক করিয়া রাখিয়াছেন।’

শুনিয়া, বসন্ত শীতরাজার রাজ্যে গিয়া, তিন সোনার মাছ রাজাকে পাঠাইয়া দিয়া বলিলেন—‘রূপবতী রাজকন্যার রাজ্যের দুয়ার খুলিয়া দিতে আজ্ঞা হউক!’

সকলে বলিলেন, ‘দেবতা, গজমোতি আনিয়াছেন। তা, রাজা আমাদের ভাইয়ের শোকে পাগল; সাত দিন সাত রাত্রি না গেলে তো দুয়ার খুলিবে না।’ ত্রিশূল হাতে, গজমোতি মাথায় বসন্ত, দুয়ার আলো করিয়া সাত দিন সাত রাত্রি বসিয়া রহিলেন!

আট দিনের দিন রাজা একটু ভালো হইয়াছেন, দাসী গিয়া সোনার মাছ কুটিতে বসিল। অমনি মাছেরা বলিল,—

‘আঁশে ছাই, চোখে ছাই,

কেটো না কেটো না মাসি, রাজা মোদের ভাই।’

দাসী ভয়ে বঁটি-মটি ফেলিয়া, রাজার কাছে গিয়া খবর দিল।

রাজা বলিলেন, ‘কই কই! সোনার মাছ কই?

সোনার মাছ যে এনেছে সে মানুষ কই?’

রাজা সোনার মাছ নিয়া পড়িতে পড়িতে ছুটিয়া বসন্তের কাছে গেলেন।

দেখিয়া বসন্ত বলিলেন, ‘দাদা!’

শীত বলিলেন, ‘ভাই!’

হাত হইতে সোনার মাছ পড়িয়া গেল; শীত, বসন্তের গলা ধরিয়া কাঁদিতে লাগিলেন। দুই ভায়ের চোখের জল দরদর করিয়া বহিয়া গেল।

শীত বলিলেন, ‘ভাই, সুয়ো-মার জন্যে দুই ভাইয়ের এতকাল ছাড়াছাড়ি।’

তিন সোনার মাছ তিন রাজপুত্র হইয়া, শীত বসন্তের পায়ে প্রণাম করিয়া বলিল, ‘দাদা, আমরাই অভাগী সুয়োরানির তিন ছেলে; আমাদের মুখ চাহিয়া মায়ের অপরাধ ভুলিয়া যান।’

শীত বসন্ত, তিন ভাইকে বুকে লইয়া বলিলেন, ‘সে কী ভাই, তোরা এমন হইয়া ছিলি! সুয়ো-মা কেমন, বাবা কেমন?’

তিন ভাই বলিল, ‘সে কথা আর কী বলিব, বাবা বনবাসে, মা মরিয়া গিয়াছেন; তিন ভাই ক্ষীর-সমুদ্রের তলে সোনার মাছ হইয়া ছিলাম।’

শুনিয়া শীত, বসন্তের বুক ফাটিল; চোখের জলে ভাসিতে ভাসিতে গলাগলি পাঁচ ভাই রাজপুরী গেলেন।

১২

রাজকন্যার সোনার টিয়া পিঞ্জরে ঘোরে, ঘোরে, আর কেবলি কয়—

‘দুঃখিনীর ধন

সাত সমুদ্র ছেঁচে এনেছে মানিক রতন!’

রাজকন্যা বলিলেন,

‘দুয়োরানি দুয়োরানি হইলেন’

‘কী হয়েছে, কী হয়েছে, আমার সোনার টিয়া!’

টিয়া বলিল, ‘যাদু আমার এল, কন্যা, গজমোতি নিয়া!’

সত্য-সত্যই; দাসী আসিয়া খবর দিল, শীতরাজার ভাই রাজপুত্র যে, গজমোতি আনিয়াছেন!

শুনিয়া রাজকন্যা রূপবতী হাসিয়া টিয়ার ঠোঁটে চুমু খাইলেন।

রাজকন্যা বলিলেন, ‘দাসী লো দাসী, কপিলা গাইয়ের দুধ আন,

কাঁচা হলুদ বাটিয়া আন; আমার সোনার টিয়াকে নাওয়াইয়া দিব!’

দাসীরা দুধ-হলুদ আনিয়া দিল। রাজকন্যা সোনা-রুপার পিঁড়ি, পাট কাপড়ের গামছা নিয়া, টিয়াকে স্নান করাইতে বসিলেন।

হলুদ দিয়া নাওয়াইতে নাওয়াইতে রাজকন্যার আঙুলে লাগিয়া টিয়ার মাথার ওষুধ-বড়ি খসিয়া পড়িল। অমনি চারিদিক আলো হইল, টিয়ার অঙ্গ ছাড়িয়া দুয়োরানি দুয়োরানি হইলেন। মানুষ হইয়া দুয়োরানি রাজকন্যাকে বুকে সাপটিয়া বলিলেন, ‘রূপবতী মা আমার! তোরই জন্যে আবার জীবন পাইলাম।’ থতোমতো খাইয়া রাজকন্যা রানির কোলে মাথা গুঁজিলেন।

রাজকন্যা বলিলেন, ‘মা, আমার বড়ো ভয় করে, তুমি পরি না দেবতা, এতদিন টিয়া হইয়া আমার কাছে ছিলে?’

রানি বলিলেন, ‘রাজকন্যা, শীত আমার ছেলে, গজমোতি যে আনিয়াছে, সেই বসন্ত আমার ছেলে।’

শুনিয়া রাজকন্যা মাথা নামাইল।

১৩

পরদিন রূপবতী রাজকন্যা শীতরাজাকে বলিয়া পাঠাইলেন, ‘দুয়ার খুলিয়া দিন, গজমোতি যিনি আনিয়াছেন তাঁহাকে গিয়া বরণ করিব।’

রাজা দুয়ার খুলিয়া দিলেন।

বাদ্য-ভান্ড করিয়া রূপবতী রাজকন্যার পঞ্চ চৌদোলা শীতরাজার রাজ্যে পৌঁছিল।

শীতরাজার রাজদুয়ারে ডঙ্কা বাজিল, রাজপুরীতে নিশান উড়িল, রূপবতী রাজকন্যা বসন্তকে বরণ করিলেন।

শীত বলিলেন, ‘ভাই, আমি তোমাকে পাইয়াছি, রাজ্য নিয়া কী করিব? রাজ্য তোমাকে দিলাম।’ রাজপোশাক পরিয়া সোনার থালে গজমোতি রাখিয়া বসন্ত, শীত, সকলে রাজসভায় বসিলেন।

রাজকন্যার চৌদোলা রাজসভায় আসিল। চৌদোলায় রং-বেরঙের আঁকন, ময়ূরপাখার ঢাকন। ঢাকন খুলিতেই সকলে দেখে ভিতরে এক যে স্বর্গের দেবী, রাজকন্যা রূপবতীকে কোলে করিয়া বসিয়া আছেন!

রমরমা সভা চুপ করিয়া গেল!

স্বর্গের দেবীর চোখে জল ছলছল; রাজকন্যাকে চুমু খাইয়া চোখের জলে ভাসিয়া স্বর্গের দেবী ডাকিলেন, ‘আমার শীত বসন্ত কই রে!’

রাজসিংহাসন ফেলিয়া শীত উঠিয়া দেখেন, মা! বসন্ত উঠিয়া দেখেন, মা! সুয়োরানির ছেলেরা দেখেন, এই তাঁহাদের দুয়ো-মা! সকলে পড়িতে পড়িতে ছুটিয়া আসিলেন।

তখন রাজপুরীর সকলে একদিকে চোখের জল মোছে, আর-একদিকে পুরী জুড়িয়া বাদ্য বাজে।

শীত বসন্ত বলিলেন, ‘আহা, এ সময় বাবা আসিতেন, সুয়ো-মা থাকিতেন!’

সুয়ো-মা মরিয়া গিয়াছে, সুয়ো-মা আর আসিল না; সকল শুনিয়া বনবাস ছাড়িয়া রাজা আসিয়া শীত বসন্তকে বুকে লইলেন।

তখন রাজার রাজ্য ফিরিয়া আসিল, সকল রাজ্য এক হইল, পুরী আলো করিয়া রাজকন্যার গলার গজমোতি ঝলমল করিয়া জ্বলিতে লাগিল। দুঃখিনী দুয়োরানির দুঃখ ঘুচিল। রাজা, দুয়োরানি, শীত, বসন্ত, সুয়োরানির তিন ছেলে, রূপবতী রাজকন্যা—সকলে সুখে দিন কাটাইতে লাগিলেন।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%