দক্ষিণারঞ্জন মিত্র মজুমদার

এক তাঁতি, তার দুই স্ত্রী। দুই তাঁতিবউ-এর দুই মেয়ে,—সুখু আর দুখু। তাঁতি, বড়ো স্ত্রী আর বড়ো মেয়ে সুখুকে বেশি বেশি আদর করে। বড়ো স্ত্রী বড়ো মেয়ে ঘর-সংসারের কুটোটুকু ছিঁড়িয়া দুইখানা করে না; কেবল বসিয়া বসিয়া খায়। দুখু আর তার মা সুতো কাটে, ঘর নিকোয়; দিনান্তে চারটি চারটি ভাত পায়, আর, সকলের গঞ্জনা সয়।
একদিন তাঁতি মরিয়া গেল। অমনি বড়ো তাঁতিবউ তাঁতির কড়িপাতি যা ছিল সব লুকাইয়া ফেলিয়া, আপন মেয়ে নিয়া, দুখু আর দুখুর মাকে ভিন্ন করিয়া দিল।
সুখুর মা আজ হাটের বড়োমাছের মুড়োটা আনে, কাল হাটের বড়ো লাউটা আনে; রাঁধে, বাড়ে, সতীন, সতীনের মেয়েকে দেখাইয়া দেখাইয়া খায়।
দুখুর মা আর দুখুর দিনে রাত্রে সুতো কাটিয়া কোনোদিন একখানা গামছা, কোনোদিন একখানা ঠেঁটি, এই হয়। তাই বেচিয়া একবুড়ি পায়, দেড়বুড়ি পায়, তাই দিয়া মায়ে-ঝিয়ে চারিটি অন্ন পেটে দেয়।
একদিন, সুতোনাতা ইঁদুর কাটে, তুলোটুকু নেতিয়ে যায়, দুখুর মা, সুতো গোছা এলাইয়া দিয়া, তুলা ডালা রোদে দিয়া, ক্ষারকাপড়খান নিয়া ঘাটে গিয়াছে। দুখু তুলো আগলাইয়া বসিয়া আছে। এমন সময় এক দমকা বাতাস আসিয়া দুখুর তুলোগুলা উড়াইয়া নিয়া গেল! একটু তুলোও দুখু ফিরাইতে পারিল না; শেষে দুখু কাঁদিয়া ফেলিল!
তখন বাতাস বলিল, ‘দুখু, কাঁদিস নে, আমার সঙ্গে আয়, তোকে তুলো দেবো।’ দুখু কাঁদিতে কাঁদিতে বাতাসের পিছু পিছু গেল।
যাইতে যাইতে পথে এক গাই দুখুকে ডাকে, ‘দুখু, কোথা যাচ্ছ—আমার গোয়ালটা কাড়িয়া দিয়া যাবে?’ দুখু, চোখের জল মুছিয়া, গাইয়ের গোয়াল কাড়িল, খড় জল দিল; দিয়া আবার বাতাসের পিছু চলিল।
খানিক দূরে যাইতেই এক কলাগাছ বলিল, ‘দুখু, কোথা যাচ্ছ আমায় বড়ো লতাপাতায় ঘিরিয়াছে, এগুলিকে টেনে দিয়ে যাবে?’ দুখু একটু থামিয়া কলা গাছের লতাপাতা ছিঁড়িয়া দিল।
আবার খানিক দূর যাইতে, এক শেওড়া গাছ ডাকিল, ‘দুখু, কোথায় যাচ্ছ—আমার গুঁড়িটায় বড়ো জঞ্জাল, ঝাঁট দিয়া যাবে?’ দুখু শেওড়ার গুঁড়ি ঝাট দিল, তলার পাতাকুটো কুড়াইয়া ফেলিল। সব ফিটফাট করিয়া দিয়া, আবার দুখু বাতাসের সঙ্গে চলিল।
একটু দূরেই এক ঘোড়া বলিল, ‘দুখু, দুখু, কোথায় যাচ্ছ—আমাকে চার গোছা ঘাস দিয়া যাবে?’ দুখু ঘোড়ার ঘাস দিল। তারপর চলিতে চলিতে দুখু বাতাসের সঙ্গে কোথায় দিয়া কোথায় দিয়া এক ধবধবে বাড়িতে গিয়া উপস্থিত!
বাড়িতে আর কেউ নাই; ফিটফাট ঘরদোর, ঝকঝক আঙিনা, কেবল দাওয়ার উপরে এক বুড়ি বসিয়া বসিয়া সুতো কাটিতেছে, সেই সুতোয় চক্ষের পলকে পলকে জোড়ায় জোড়ায় শাড়ি হইতেছে!
বুড়ি আর কেউ না, চাঁদের মা বুড়ি! বাতাস বলিল, ‘দুখু, বুড়ির কাছে গিয়া তুলা চাও, পাবে’। দুখু গিয়া বুড়ির পায়ে ঢিপ করিয়া প্রণাম করিল, বলিল। ‘দ্যাখ তো আয়িমা, বাতাস আমার সবগুলো তুলো নিয়া আসিয়াছে, মা আমায় বকবে আয়িমা, আমার তুলোগুলো দিয়ে দাও।’
চুলগুলো যেন দুধের ফেনা, চাঁদের আলো; সেই চুল সরাইয়া চোখ তুলিয়া চাঁদের মা বুড়ি দেখে ছোট্টখাট্ট মেয়েটি—চিনি হেন মিষ্টি-মধুর বুলি। বুড়ি বলিল, ‘আহা! সোনার চাঁদ বেঁচে থাকো। ও ঘরে গামছা আছে, ও ঘরে কাপড় আছে, ও ঘরে তেল আছে, ওই পুকুরে গিয়া দুটো ডুব দিয়ে এসো; এসে ও ঘরে গিয়া আগে চাট্টি খাও, তারপরে তুলো দেব এখন।’
ঘরে গিয়া দুখু, কত কত ভালো ভালো গামছা কাপড় দেখে, তা সব ঠেলিয়া ফেলিয়া, যা তা ছেঁড়া নাতা গামছা কাপড় নিয়া, যেমন-তেমন একটু তেল মাথায় ছোঁয়াইয়া, এক চিমটি ক্ষার খৈল নিয়া নাইতে গেল।
ক্ষার খৈলটুকু মাখিয়া জলে নামিয়া দুখু ডুব দিল। ডুব দিতেই এক ডুবে দুখুর সৌন্দর্য উথলে পড়ে! সেকী রূপ! অত রূপ দেবকন্যারও নাই! দুখু তা জানিতেও পারিল না। আর এক ডুবে দুখুর গয়না, গায়ে ধরে না, পায়ে ধরে না। সোনাঢাকা অঙ্গ নিয়া আস্তে আস্তে উঠিয়া আসিয়া দুখু খাবার ঘরে গেল।
খাবার ঘরে কত জিনিস, দুখু কী জানে? জন্মেও অত সব দেখে নাই! এক কোণে বসিয়া দুখু চারিটি পান্তা খাইয়া আসিল। চাঁদের মা বুড়ি বলিল, ‘আমার সোনার বাছা এসেছিস! ওই ঘরে যা, পেঁটরায় তুলো আছে, নাও গে!’
দুখু গিয়া দেখিল, পেঁটরার উপর পেঁটরা—ছোটো, বড়ো, কত রকমের! দুখু এক পাশের ছোট্ট এতটুকু এক খেলনা-পেঁটরা নিয়া বুড়ির কাছে দিল। বুড়ি বলিল, ‘আমার মানিক ধন! আমার কাছে কেন, এখন মার কাছে যাও, এই পেঁটরায় তুলো দিয়াছি।’ বুড়ির পায়ের ধুলা নিয়া পেঁটরা কাঁখে, রূপে, গয়নায়, পথ-ঘাট আলো করিয়া দুখু বাড়ি চলিল।
পথে ঘোড়া বলিল, ‘দুখু, এসো এসো, আর কী দিব, এই নাও।’ ঘোড়া খুব তেজি এক পক্ষীরাজ বাচ্চা দিল।
শেওড়া গাছ বলিল, ‘দুখু, দুখু, এসো এসো, আর কী দিব, এই নাও।’ শেওড়া গাছ একঘড়া মোহর দিল।
কলা গাছ বলিল, ‘দুখু, দুখু, এসো এসো, আর কী দিব, এই নাও!’’ কলা গাছ মস্ত একছড়া সোনার কলা দিল।

দুখু
গাই বলিল, ‘দুখু, দুখু, এসো এসো, আর কী দিব, এই নাও।’ গাই এক কপিলা-লক্ষণ বকনা দিল। ঘোড়ার বাচ্চার পিঠে ঘড়া, ছড়া তুলিয়া, বকনা নিয়া দুখু বাড়ি আসিল।
‘দুখু, দুখু, ও পোড়ারমুখি তুলো নিয়া কোথায় গেলি?’ ডাকিয়া, ডুকিয়া, আনাচকানাচ, খানা জঙ্গল খুঁজিয়া, মেয়ে না পাইয়া দুখুর মা অস্থির—দুখুর মা ছুটিয়া আসিল, ‘ও-মা, মা আমার, এতক্ষণ তুই কোথায় ছিলি?’ আসিয়া দেখে, ‘‘ও মা! একী, অন্ধের নড়ি দুঃখিনীর মেয়ে এসব তুই কোথায় পেলি!’ মা গিয়া দুখুকে বুকে নিল।
মাকে দুখু সব কথা বলিল; শুনিয়া দুখুর মা মনের আনন্দে দুখুকে নিয়া সুখুর মা-র কাছে গেল, ‘দিদি, দিদি, ও সুখু, সুখু, আমাদের দুঃখ ঘুচেছে; চাঁদের মা বুড়ি দুখুকে এইসব দিয়াছে। সুখু কতক নাও, দুখুর কতক থাক।’
চোখ টানিয়া মুখ বাঁকাইয়া তিন ঝাকনা ভিরকুট্টি, সুখুর মা বলিল, ‘বালাই! পরের কড়ির ভাগ-বাঁটরি তার কপালে খ্যাংরা মারি! তেমন পোদ্দারি সুখুর মা করে না! ছাই-নাতা আগর-বাগর তোরাই নিয়া ধুইয়া খা।’ মনে মনে সুখুর মা বিড়বিড়—‘শত্তুরের কপালে আগুন,—কেন আমার সুখু কি জলে ভাসা মেয়ে? দরদ দেখে মরে যাই! কপালে থাকে তো, সুখু আমার কালই আপনি ইন্দ্রের ঐশ্বর্য লুটে আনবে।’ মুখ খাইয়া দুখু দুখুর মা ফিরিয়া আসিল।
রাত্রে পেঁটরা খুলিতেই দুখুর রাজপুত্র-বর বাহির হইল। রাজপুত্র-বর ঘোড়ায় চড়িয়া বেড়ায়, কপিলার দুধে আঁচায়,—দুখু, দুখুর মার ঘর-কুঁড়ে আলো হইয়া গেল।
রা নাই, শব্দ নাই, সুখুর মা সামনের দুয়ারে খিল দিয়াছে। পরদিন সুখুর মা পিছন দুয়ারে তুলো রোদে দিয়া ‘পিসপিস, ফিসফিস’, সুখুকে বসাইয়া ক্ষার কাপড়ে পুঁটলি বাঁধিয়া ঘাটে গেল।
কতক্ষণ পর বাতাস আসিয়া সুখুর তুলো উড়াইয়া নেয়, কুটিকুটি সুখু, বাতাসের পিছু পিছু ছুটিল!
সেই গাই ডাকিল, ‘সুখু, কোথা যাচ্ছ, শুনে যাও।’ সুখু ফিরিয়াও দেখিল না। কলা গাছ, শেওড়া গাছ, ঘোড়া সকলেই ডাকিল, সুখু কাহারও কথা কানে তুলিল না। সুখু আরও রাগিয়া গিয়া গালি পাড়ে, ‘উঁ! আমি যাব চাঁদের মা বুড়ির বাড়ি, তোমাদের কথা শুনতে বসি!’
বাতাসের সাথে সাথে সুখু চাঁদের মা বুড়ির বাড়ি গেল। গিয়াই, ও বুড়ি, বুড়ি, বসে বসে কী কচ্ছিস? আমায় আগে সব জিনিস দিয়ে নে, তার পর সুতো কাটিস। হুঁ! উনুনমুখি দুখু, তাকেই আবার এত সব দিয়েছেন!’ বলিয়া, সুখু, বুড়ির চরকা-মরকা টানিয়া ভাঙে আর কী!
চাঁদের মা বুড়ি অবাক!—‘রাখ রাখ’ ওমা! এতটুকু মেয়ে তার কাঠ কাঠ কথা, উড়ুনচন্ডে কান্ড! বুড়ি চুপ করিয়া রহিল; তারপর বলিল, ‘আচ্ছা নেয়ে খেয়ে নে, তারপর সব পাবি।’
বলতে সয় না, সুখু দুড়দাড় করিয়া এঘর থেকে সব্বার ভালো গামছা খানা, ওঘর থেকে সব্বার ভালো শাড়িখানা, সুবাস তেলের হাঁড়ি, চন্দনের বাটি যত কিছু নিয়া ঘাটে গেল।
সাতবার করিয়া তেল মাখে, সাতবার করিয়া মাথা ঘষে, ফিরিয়া ফিরিয়া চায়, সাতবার করিয়া আরশি ধরিয়া মুখ দেখে, তবু সুখুর মনের মতো হয় না। তিন প্রহর ধরিয়া এইরকম করিয়া শেষে সুখু জলে নামিল।
এক ডুবে সৌন্দর্য! এক ডুবে গহনা!! আঃ!!! আর সুখুকে পায় কে? সুখু এদিকে চায়, সুখু ওদিকে চায়, ‘যত যত ডুব দিব, না জানি আরও কী পাব!’

সুখুর রূপ
‘আঁই-আঁই আঁই!!!’ তিন ডুব দিয়া উঠিয়া সুখু দেখে, গা-ভরা আঁচিল, ঘা পাঁচড়া—এ-ই নখ, শণের গোছা চুল—কত কদর্য সুখুর কপালে! ‘ওঁ মাঁ, মাঁ গোঁ! কীঁ হঁল গোঁ’ কাঁদিতে কাঁদিতে সুখু বুড়ির কাছে গেল।
দেখিয়া বুড়ি বলল, ‘আহা আহা ছাইকপালি, তিন ডুব দিয়াছিলি বুঝি? যা, কাঁদিসনে যা; বেলা বয়ে গেছে, খেয়ে দেয়ে নে!’ বুড়িকে গালি পাড়িতে পাড়িতে সুখু, খাবার ঘরে গিয়া পায়েস পিঠা ভালো ভালো সব খাবার খাবলে খাবলে খাইয়া ছড়াইয়া হাত মুখ ধুইয়া আসিল, ‘আচ্ছা বুঁড়ি, মাঁর কাঁছে আঁগে যাঁই! দেঁ তুঁই পেঁটরা দিবি কীঁ না দেঁ।’
বুড়ি পেঁটরার ঘর দেখাইয়া দিল। য-ত বড়ো পারিল, এ-ই মস্ত এক পেঁটরা মাথায় করিয়া সুখু বিড় বিড় করিয়া বুড়ির চোদ্দ বুড়ির মুন্ডু খাইতে খাইতে রূপে দিক চমকাইয়া বাড়ি চলিল!
সুখুর রূপ দেখিয়া শিয়াল পালায়, পথের মানুষ মূর্ছা যায়। পথে ঘোড়া এক লাথি মারিল; সুখু করে—‘আঁই আঁই!’ শেওড়া গাছের এক ডাল মটাস করিয়া ভাঙিয়া পড়িল, সুখু করে—‘মঁলাম! মঁলাম!’ কলা গাছের এক কাঁদি কলা ছিঁড়িয়া পিঠে পড়িল; ‘সুখু বলে—‘গেঁলাম! গেঁলাম!’ শিং বাঁকা করিয়া, গাই তাড়া করিল, ছুটিতে ছুটিতে হাঁপাইয়া আসিয়া সুখু বাড়িতে উঠিল।
দুয়ারে আলপনা দিয়া, ঘট পল্লব নিয়া জোড়া পিড়ি সাজাইয়া সুখুর মা বসিয়াছিল। বারে বারে পথ চায়,—
সুখুকে দেখিয়া, সুখুর মা,
‘ও মা! মা!! ও মা গো, কী হবে গো!
কোথায় যাব গো!’
চোখের তারা কপালে, আছাড় খাইয়া পড়িয়া সুখুর মা মূর্ছা গেল।
উঠিয়া সুখুর মা বলে, ‘হোক হোক অভাগী, পেঁটরা নিয়ে ঘরে তোল; দ্যাখ আগে, বর এলে সব ভালো হইবে!’
দুইজনে পেঁটরা নিয়া ঘরে তুলিল।
রাত্রে পেঁটরা খুলিয়া সুখুর বর বাহির হইল! সুখু বলে, ‘মা, পা কেন কনকন?’
মা বলিল, ‘মল পর।’
সুখু—‘মা, গা কেন ছনছন?’
মা—‘মা, গয়না পর।’
তারপর সুখুর হাত কটকট, গলা ঘড়ঘড়, মাথা কচকচ কত করিল, সুখু হার পরিল, নথ নোলক, সিঁথি পরিয়া-টরিয়া সুখু চুপ করিল। মনের আনন্দে সুখুর মা ঘুমাইতে গেল।
পরদিন সুখু আর দোর খোলে না—‘কেন লো, কত বেলা, উঠবি না?’
নাঃ, নাওয়ার খাওয়ার বেলা হইল, সুখু উঠে না। সুখুর মা গিয়া কপাট খুলিল।—‘ও মা রে মা!’ সুখু নাই, সুখুর চিহ্ন নাই—ঘরের মেঝেতে হাড়গোড়, অজগরের খোলস!—অজগরে সুখুকে খাইয়া গিয়াছে!!
চেলাকাঠ মাথায় মারিয়া সুখুর মা মরিয়া গেল।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন