সাত ভাই চম্পা

দক্ষিণারঞ্জন মিত্র মজুমদার

এক রাজার সাত রানি। দেমাকে, বড়োরানিদের মাটিতে পা পড়ে না। ছোটোরানি খুব শান্ত। এজন্য রাজা ছোটোরানিকে সকলের চাইতে বেশি ভালোবাসিতেন।

কিন্তু, অনেকদিন পর্যন্ত রাজার ছেলে-মেয়ে হয় না। এত বড়ো রাজ্য, কে ভোগ করিবে? রাজা মনের দুঃখে থাকেন।

এইরূপে দিন যায়। কতকদিন পরে, ছোটোরানির ছেলে হইবে। রাজার মনে আনন্দ ধরে না। পাইক-পেয়াদা ডাকিয়া রাজা, রাজ্যে ঘোষণা করিয়া দিলেন, ‘রাজা রাজভান্ডার খুলিয়া দিয়াছেন, মিঠাইমন্ডা মণি-মানিক যে যত পার, আসিয়া নিয়া যাও।’

বড়োরানিরা হিংসায় জ্বলিয়া মরিতে লাগিল।

রাজা আপনার কোমরে, ছোটোরানির কোমরে, এক সোনার শিকল বাঁধিয়া দিয়া বলিলেন, ‘যখন ছেলে হইবে, এই শিকলে নাড়া দিও, আমি আসিয়া ছেলে দেখিব!’ বলিয়া রাজা রাজদরবারে গেলেন।

ছোটোরানির ছেলে হইবে, আঁতুড়ঘরে কে যাইবে? বড়োরানিরা বলিলেন, ‘আহা, ছোটোরানির ছেলে হইবে, তা অন্য লোক দিব কেন? আমরাই যাইব।’

বড়োরানিরা আঁতুড়ঘরে গিয়াই শিকলে নাড়া দিলেন। অমনি রাজসভা ভাঙিয়া, ঢাক-ঢোলের বাদ্য দিয়া, মণি-মানিক হাতে ঠাকুর-পুরুত সাথে, রাজা আসিয়া দেখেন, কিছুই না!

রাজা ফিরিয়া গেলেন।

রাজা সভায় বসিতে-না-বসিতেই আবার শিকলে নাড়া পড়িল।

রাজা আবার ছুটিয়া গেলেন। গিয়া দেখেন, এবারও কিছুই না! মনের কষ্টে রাজা রাগ করিয়া বলিলেন, ‘ছেলে না হইতে আবার শিকল নাড়া দিলে, আমি সব রানিকে কাটিয়া ফেলিব।’ বলিয়া, রাজা চলিয়া গেলেন।

একে একে ছোটোরানির সাতটি ছেলে একটি মেয়ে হইল। আহা, ছেলে-মেয়েগুলি যে—চাঁদের পুতুল—ফুলের কলি! আঁকুপাঁকু করিয়া হাত নাড়ে, পা নাড়ে—আঁতুড়ঘর আলো হইয়া গেল।

ছোটোরানি আস্তে আস্তে বলিলেন, ‘দিদি, কী ছেলে হইল একবার দেখাইলি না!’

বড়োরানিরা ছোটোরানির মুখের কাছে রঙ্গভঙ্গি করিয়া হাত নাড়িয়া, নথ নাড়িয়া, বলিয়া উঠিল, ‘‘ছেলে না হাতি হইয়াছে,—ওঁর আবার ছেলে হইবে!—কটা ইঁদুর আর কটা কাঁকড়া হইয়াছে।’

শুনিয়া ছোটোরানি অজ্ঞান হইয়া পড়িয়া রহিলেন।

নিষ্ঠুর বড়োরানিরা আর শিকলে নাড়া দিল না। চুপি চুপি হাঁড়ি-সরা আনিয়া, ছেলে-মেয়েগুলিকে তাহাতে পুরিয়া, পাঁশগাদায় পুঁতিয়া ফেলিয়া আসিল। আসিয়া তাহার পর শিকল ধরিয়া টান দিল।

রাজা আবার ঢাক-ঢোলের বাদ্য দিয়া, মণি-মানিক হাতে ঠাকুর-পুরুত সাথে আসিলেন; বড়োরানিরা হাত মুছিয়া, মুখ মুছিয়া, তাড়াতাড়ি করিয়া কতকগুলি ব্যাঙের ছানা ইঁদুরের ছানা আনিয়া দেখাইল।

দেখিয়া রাজা রাগে আগুন হইয়া ছোটোরানিকে রাজপুরীর বাহির করিয়া দিলেন।

বড়োরানিদের মুখে আর হাসি ধরে না; পায়ের মলের বাজনা থামে না। সুখের কাঁটা দূর হইল; রাজপুরীতে আগুন দিয়া, ঝগড়া-কোন্দল সৃষ্টি করিয়া ছয় রানিতে মনের সুখে ঘরকন্না করিতে লাগিলেন।

পোড়াকপালী ছোটোরানির দুঃখে গাছ-পাথর ফাটে, নদী-নালা শুকায়, ছোটোরানি ঘুঁটেকুড়ানি দাসী হইয়া, পথে পথে ঘুরিতে লাগিলেন।

এমনি করিয়া দিন যায়। রাজার মনে সুখ নাই, রাজার রাজ্যে সুখ নাই, রাজপুরী খাঁ-খাঁ করে, রাজার বাগানে ফুল ফোটে না, রাজার পূজা হয় না।

একদিন, মালি আসিয়া বলিল, ‘মহারাজ, নিত্যপূজার ফুল পাই না, আজ যে পাঁশগাদার উপরে, সাত চাঁপা এক পারুল গাছে, টুলটুলে সাত চাঁপা আর এক পারুল ফুটিয়া রহিয়াছে।’

রাজা বলিলেন, ‘তবে সেই ফুল আনো, পূজা করিব।’

মালি ফুল আনিতে গেল।

মালিকে দেখিয়া পারুল গাছে পারুলফুল চাঁপাফুলদিগকে ডাকিয়া বলিল,—‘সাত ভাই চম্পা জাগো রে!’

অমনি সাত চাঁপা নড়িয়া উঠিয়া সাড়া দিল,—

‘কেন বোন পারুল ডাকো রে?’

পারুল বলিল, ‘রাজার মালি এসেছে,

পূজার ফুল দিবে কি না দিবে?’

সাত চাঁপা তুরতুর করিয়া উপরে উঠিয়া গিয়া ঘাড় নাড়িয়া বলিতে লাগিল,

‘না দিব না দিব ফুল, উঠিব শতেক দূর

আগে আসুক রাজা, তবে দিব ফুল!’

দেখিয়া শুনিয়া মালি অবাক হইয়া গেল। ফুলের সাজি ফেলিয়া দৌড়িয়া গিয়া সে রাজার কাছে খবর দিল।

আশ্চর্য হইয়া, রাজা রাজসভার সকলে সেইখানে আসিলেন।

রাজা আসিয়া ফুল তুলিতে গেলেন, অমনি পারুলফুল চাঁপাফুলদিগকে ডাকিয়া বলিল,—

‘সাত ভাই চম্পা জাগো রে!’

চাঁপারা উত্তর দিল, ‘কেন বোন পারুল ডাকো রে?’

পারুল বলিল, ‘রাজা আপনি এসেছেন,

ফুল দিবে কি না দিবে?’

চাঁপারা বলিল, ‘না দিব, না দিব ফুল, উঠিব শতেক দূর,

আগে আসুক রাজার বড়ো রানি,

তবে দিব ফুল।’

বলিয়া, চাঁপাফুলেরা আরও উঁচুতে উঠিল।

রাজা বড়োরানিকে ডাকাইলেন। বড়োরানি, মল বাজাইতে বাজাইতে আসিয়া ফুল তুলিতে গেল। চাঁপাফুলেরা বলিল,

‘না দিব, না দিব ফুল, উঠিব শতেক দূর,

আগে আসুক রাজার মেজোরানি, তবে দিব ফুল।’

তাহার পর মেজোরানি আসিলেন, সেজোরানি আসিলেন, ন-রানি আসিলেন, কনে-রানি আসিলেন, কেহই ফুল পাইলেন না। ফুলেরা গিয়া আকাশে তারার মতো ফুটিয়া রহিল।

রাজা গালে হাত দিয়া মাটিতে বসিয়া পড়িলেন।

শেষে দুয়োরানি আসিলেন; তখন ফুলেরা বলিল,

‘না দিব, না দিব ফুল, উঠিব শতেক দূর,

যদি আসে রাজার ঘুঁটে-কুড়ানি দাসী, তবে দিব ফুল।’

তখন খোঁজ-খোঁজ পড়িয়া গেল। রাজা চৌদোলা পাঠাইয়া দিলেন। পাইক-বেহারা চৌদোলা লইয়া মাঠে গিয়া ঘুঁটেকুড়ানি দাসী ছোটোরানিকে লইয়া আসিল।

ছোটোরানির হাতে পায়ে গোবর, পরনে ছেঁড়া কাপড়, তাই লইয়া তিনি ফুল তুলিতে গেলেন। অমনি সুরসুর করিয়া চাঁপারা আকাশ হইতে নামিয়া আসিল, পারুলফুলটি গিয়া তাঁদের সঙ্গে মিশিল; ফুলের মধ্য হইতে সুন্দর সুন্দর চাঁদের মতো সাত রাজপুত্র এক রাজকন্যা ‘মা, মা’ বলিয়া ডাকিয়া, ঝুপ ঝুপ করিয়া ঘুঁটেকুড়ানি দাসী, ছোটোরানির কোলে-কাঁখে ঝাঁপাইয়া পড়িল।

সকলে অবাক! রাজার চোখ দিয়া ঝরঝর করিয়া জল গড়াইয়া গেল। বড়োরানিরা ভয়ে কাঁপিতে লাগিল।

রাজা তখনি বড়োরানিদিগে হেঁটে, কাঁটা উপরে কাঁটা দিয়া পুঁতিয়া ফেলিতে আজ্ঞা দিয়া, সাত-রাজপুত্র, পারুল-মেয়ে আর ছোটোরানিকে লইয়া রাজপুরীতে গেলেন।

রাজপুরীতে জয়ডঙ্কা বাজিয়া উঠিল।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%