ডালিম কুমার

দক্ষিণারঞ্জন মিত্র মজুমদার

এক রাজা, রাজার এক রানি, এক রাজপুত্র। রানির আয়ু একজোড়া পাশার মধ্যে, রাজপুরীর তাল গাছে—এক রাক্ষসী এই কথা জানিত। কিন্তু কিছুতেই রাক্ষসী জো পাইয়া উঠে নাই। একদিন রাজা মৃগয়ায় গিয়াছেন, রাজপুত্র সখা সাথী পাঁচজন লইয়া পাশা খেলিতেছিলেন দেখিয়া, রাক্ষসী, এক ভিখারিনি সাজিয়া রাজপুত্রের কাছে গিয়া পাশাজোড়া চাহিল; রাজপুত্র কী জানেন? হেলায় পাশাজোড়া ভিখারিনিকে দিয়া ফেলিলেন। তিন ফুঁয়ে রাক্ষসী, রানির আয়ু-পাশা, কোন রাজ্যে পাঠাইল কে জানে? রানির ঘরে রানি মূর্ছা গেলেন। রাক্ষসী তাড়াতাড়ি গিয়া রানিকে খাইয়া রানির মূর্তি ধরিয়া বসিয়া রহিল।

রোজ যেমন, আজও রাজা আসিলেন—রোজ যেমন, আজও রানি সেবা যত্ন করিলেন। কেবল রাজপুত্র দেখিলেন, খাবার দিবার সময়, মায়ের জিভের একফোঁটা জল টস করিয়া পড়িল! গা ছমছম! রাজপুত্র আর খাইলেন না; চুপ করিয়া উঠিয়া গেলেন। একথা আর কেহই জানিল না।

ক-বৎসর যায়, রাজার সাত ছেলে হইল। রাজা খুব ধুমধাম করিলেন। কেবল রাজপুত্র দেখিলেন, তাল গাছের আগা দিন দিন শুকায়, তাল গাছে কোন পক্ষী বসে না। রাজপুত্র চুপ করিয়া রহিলেন।

সাত ছেলে বড়ো হইল। রাজা সময়মতো তাহাদের অন্নপ্রাশন, চূড়া, উপনয়ন, সব করাইলেন। তখন রাজপুত্রেরা বলিলেন,—‘এখন আমরা দেশভ্রমণে যাইব।’

রাজা বলিলেন, ‘বড়োকুমার গেল না, তোরা কি করিয়া যাইবি?’ রাজা বড়োকুমারকে খবর দিলেন।

খবর পাইয়াই এক পক্ষীরাজে চড়িয়া বড়োকুমার ভাইদের কাছে গেলেন, ‘কেন রে ভাই! দাদাকে তোরা ভুলিয়া গিয়াছিলি? চলো, এইবার দেশভ্রমণে যাইব। আট ভাই সাজসজ্জা করিয়া চরকটক সঙ্গে রাজপুরী হইতে বাহির হইলেন।

ছাদের উপরে রাক্ষসী-রানি দেখে, বড়ো বিপদ, কুমার তো গেল! আছাড়ি-বিছাড়ি রাক্ষসী ঘরে গিয়া এক কৌটো খুলিল; কৌটোর মধ্যে সুতাশঙ্খ সাপ। রাক্ষসী বলিল,

‘সুতাশঙ্খ সুতাশঙ্খ, শাঁখের আওয়াজ!

কুমারের আয়ু কীসে বল দেখি আজ?’

সুতাশঙ্খ সুতার মতো ছোট্ট—সরু; কিন্তু আওয়াজ তার শঙ্খের মতো! সরু ফণা তুলিয়া শঙ্খের আওয়াজে সুতাশঙ্খ বলিল,

‘তোর আয়ু কীসে রানি, মোর আয়ু কীসে?

ডালিম কুমারের আয়ু ডালিমের বীজে।’

রাক্ষসী বলিল,

‘যাও ওরে সুতাশঙ্খ, বাতাসে করি ভর,

যম-যমুনার রাজ্য-শেষে পাশাবতীর ঘর!

এই লিখন দিও নিয়া পাশাবতীর ঠাঁই,

সাত ছেলের তরে আমার সাত কন্যা চাই।

রিপু অরি যায়, সুতা, চিবিয়ে খাবে তারে,

সতীনের পুত যেন পাশা আনতে নারে।’

লিখন নিয়া, সুতাশঙ্খ, বাতাসে ভর দিয়া গাছের উপর দিয়া দিয়া চলিল! রাক্ষসী, এক ডালিম হাতে, আবার মন্ত্র পড়িল—

‘পক্ষীরাজ, পক্ষীরাজ, উড়ে চলে যা,

পাশাবতীর রাজ্যে গিয়া ঘাস জল খা।’

মন্ত্র পড়িয়া রাক্ষসী তাড়াতাড়ি আসিয়া, রাজপুরীর হাজার সিঁড়ির ধাপে উঠিয়া বলিল, ‘সিঁড়ি, তুমি কার?’

সিঁড়ি বলিল, ‘যে যখন যায়, তার।’

রাক্ষসী বলিল, ‘তবে সিঁড়ি দু-ফাঁক হও, এই ডালিমের বীজ তোমার ফাটলে থাক।’ ডালিমের বীজ হাজার সিঁড়ির ধাপের নীচে জন্মের মতো বন্ধ হইয়া রহিল; রাক্ষসী গিয়া নিশ্চিন্তে দুধ-ধব-ধব শয্যায় শুইয়া ঘুমাইয়া পড়িল।

অমনি, আট রাজপুত্র কোন বনের মধ্যে পড়িয়া ছিলেন, সেইখানে খটাস করিয়া বড়োকুমারের চোখ অন্ধ হইয়া গেল, বড়োকুমার চিৎকার করিয়া উঠিলেন, ‘ভাই রে! বিছার কামড়, গেলাম, গেলাম!!’

সূর্য ডুবিয়া গেল, চারিদিকে ঝড়-বৃষ্টি, অন্ধকার, বনের মধ্যে কিছু দেখা যায় না, শোনা যায় না। বড়োরাজকুমার কোথায় পড়িয়া রহিলেন, চরকটক কোথায় গেল—সাত রাজপুত্রের ঘোড়া ঝড়ের আগে ছুটিয়া চলিল।

রাক্ষসী তো স্বপ্ন দেখে—সুতাশঙ্খ এতক্ষণে যম-যমুনা দেশের ‘সেপার’! ওদিকে সুতাশঙ্খ সারাদিন গাছে গাছে চলিয়া হয়রান; একখানে রাত্রি হইল, কে আর যায়? পরিপাটি রাজার বাগান, বাগানের এক গাছের ফলের মধ্যে ঢুকিয়া, বেশ করিয়া কুন্ডলী মন্ডলি পাকাইয়া, সুতা ঘুমাইয়া রহিল।

রাজকন্যা রোজ সেই গাছের ফল খান। মালি নিত্যকার মতো ফল আনিয়া দিল; রাজকন্যা নিত্যকার মতো ফলটি খাইলেন। ফলের সঙ্গে সুতাশঙ্খ, রাক্ষসীর লিখন, রাজকন্যার পেটে গেল!

লিখন টিখন ওসব কথা রাজপুত্রেরা কী জানে? উড়িয়া, ছুটিয়া, পক্ষীরাজেরা যে কোথা দিয়া কী করিয়া গেল, কেহই জানে না। একখানে গিয়া ভোর হইল; সকলে দেখেন, দাদা নাই! ভাবিলেন পাছে পড়িয়া গিয়াছেন! রাশ আলগা দিয়া সাত ভাই দাদার জন্য পক্ষীরাজ থামাইলেন।

নাঃ, দিন যায়, রাত যায়, দাদার দেখা নাই! তখন, এক ভাই বলিলেন, ‘ঘোড়া যদি আগে গিয়া থাকে!’

‘ঠিক, ঠিক!!’ সকলে পক্ষীরাজ সামনে ছুটাইয়া দিলেন।

মন্ত্র-পড়া পক্ষীরাজ একেবারে পাশাবতীর পুরে গিয়া উপস্থিত! পাশাবতীর পুরে পাশাবতী দুয়ারে নিশান উড়াইয়া, ঘর-কুঠরি সাজাইয়া, সাজিয়া বসিয়া আছে। যে আসিয়া পাশা খেলিয়া হারাইতে পারিবে, আপনি, আপনার ছয় বোন নিয়া তাহাকে বরণ করিবেন। রাজপুত্রদিগকে দেখিয়া পাশাবতী বলিল, ‘কে তোমরা?’

রাজপুত্রেরা বলিলেন, ‘অমুক দেশের রাজপুত্র দেশ ভ্রমণে আসিয়াছি।’

পাশাবতী বলিল, ‘না! দেখিয়া বোধ হয় যক্ষ রক্ষ। তোমরা আমার পণ জান?’

‘জানি না।’

‘আমার পাশার পণ। দানব, যক্ষ রক্ষ হইলে পরখ দেখিয়া নিব; মানুষ হইলে খেলিতে হইবে।

যে দিনে সে মালা পায়,

হারিলে মোদের পেটে যায়।’

রাজপুত্রেরা বলিলেন, ‘পরখ করো।’

পাশাবতী লিখন দেখিতে চাহিল, ‘দানব যক্ষ রক্ষ হইলে লিখন থাকিবে।’

রাজপুত্রেরা বলিলেন, ‘লিখন কীসের? লিখন নাই!’

‘তবে খেলো।’

খেলিয়া রাজপুত্রেরা হারিয়া গেলেন। পাশাবতীরা সাত বোনে সাত রাজপুত্র, পক্ষীরাজ, সব কুচিকুচি করিয়া কাটিয়া হালুম হালুম করিয়া খাইয়া ফেলিল। ফেলিয়া, আবার রূপসি মূর্তি ধরিয়া বসিয়া রহিল। রাক্ষসী-রানি স্বপ্ন দেখে কী, আর তার কপালে হইল কী! রাক্ষসীর মাথায় তখন টনক পড়িয়াছে কি না, কে জানে? যাক!

অন্ধ রাজকুমারকে পিঠে করিয়া পক্ষিরাজ ঝড়-বৃষ্টি অন্ধকারে শূন্যের উপর দিয়া ছুটিতে, ছুটিতে, হাতের রাশ হারাইয়া রাজকুমার কখন কোথায় পড়িয়া গেলেন। পক্ষীরাজ এক পাহাড়ের উপরে পড়িয়া পাথর হইয়া রহিল।

রাজকুমার যেখানে পড়িলেন, সে এক নগর। সেই নগরে রাজপুরীতে সন্ধ্যার পর লক্ষ কাড়া, লক্ষ সানাই, ঢাক ঢোল সব বাজিয়া উঠে, ঘরে ঘরে চূড়ায় চূড়ায় পথে পথে মশাল জ্বলে, নিশান উড়ে, হইহই আনন্দের সাড়া পড়িয়া যায়।

ভোরে সব চুপ! তারপর কেবল কান্নাকাটি, চিৎকার, হাহাকার, বুকে চাপড়, ছুটোছুটি—চোখের জলে দেশ ভাসে, শোকে রাজ্য আচ্ছন্ন হইয়া যায়।

আবার দুপুর বহিয়া গেলে, যখন রাজার হাতি সাজিয়া গুজিয়া বাহির হয়, তখন রাজ্যের লোক নিশ্বাস ছাড়িয়া গিয়া খাওয়া-দাওয়া করে, তাহার পর সমস্ত নগরের লোক পথে পথে সারি দিয়া দাঁড়ায়।

পাট হাতি ছোটে ছোটে, একজনকে ধরিয়া সিংহাসনে তুলিয়া নেয়—অমনি ঢাক-ঢোল বাজাইয়া, শাঁখে ফুঁ দিয়া, সিপাই, সান্ত্রি, মন্ত্রী, অমাত্য সকলে তুলিয়া-নেওয়া মানুষকে লইয়া গিয়া, রাজ্যের রাজা করে। রাজকন্যার সঙ্গে তাঁহার বিবাহ হয়।—আবার আনন্দের হাট বসে।

পরদিন দেখা যায়, রাজকন্যার ঘরে কেবল হাড় গোড়; রাজার চিহ্নও নাই!! এই রকমে কত রাজা হইল, কত রাজা গেল। কিন্তু রাজা না-থাকিলে রাজ্য থাকে না; তাই নিত্য নতুন রাজা চাই। রাজকন্যা জানেন না, কেহই বুঝিতে পারে না, রাজাকে কীসে খায়!

পাটহাতি ছুটিয়াছে। নগরে ‘সার সার’ সোর পড়িয়া গিয়াছে; সকলে চিৎকার করিতেছে, ‘পথ ছাড়ো, পথ ছাড়ো, কাতার দাও।’

রাজকুমারের জ্ঞান হইয়াছে, শব্দ শুনিয়া রাজকুমার উঠিয়া বসিলেন, কীসের পথ, কোথায় আসিয়াছেন, রাজপুত্র কিছুই জানেন না, কিছুই বুঝিতে পারিলেন না; রাজপুত্র থতোমতো খাইয়া রহিলেন।

হাতি কাতারের কাহাকেও ছুঁইল না। হু-হু করিয়া সকল পথ ছাড়াইয়া আসিয়া রাজপুত্রকে তুলিয়া সিংহাসনে বসাইল। রাজ্যের লোক ‘রাজা! রাজা!’ বলিয়া জয়জয়কার দিয়া অন্ধ রাজকুমারকে নিয়া রাজা করিল।

ধুমধাম, অভিষেক, জাঁকজমক, বিচার, আচার, সভা, দরবার—সব শেষে রাত্রি-রাজার দেশে সব ঘুমাইয়াছে। নগরে শহরে সাড়াটি নাই, দুয়ার দরজায় পাহারা নাই—থাকিয়া কী হইবে? কাল যা হইবে সকলেই তো তা জানে, পাহারাদাররা আর পাহারা দেয় না! রাজকন্যা ঘুমে বিভোর!

সেই কালরাত্রে কেবল রাজকুমার জাগিয়া আছেন। ঘর-বার নিঝুম, পৃথিবী-সংসারে টুঁ শব্দ নাই, পোকামাকড় পক্ষীটিও ডাকে না; কাল নিশির কালঘুমে সব যেন ছাইয়া আছে।

ঘরে প্রদীপ দপ দপ, রাজপুত্রের মন ছব ছব, কোনোই সাড়া নাই—কোনোই শব্দ নাই।

হঠাৎ ঘুমের মধ্যে রাজকন্যা চিৎকার করিয়া অজ্ঞান হইলেন; চিড়িক দিয়া ঘরে বিজলি জ্বলিয়া উঠিল, চড়চড় করিয়া দেওয়ালের গা ফাটিয়া গেল; চুর চুর ঝুরঝুর চারিদিকে ঝালর-পাত খসিয়া পড়িতে লাগিল।—রাজপুত্রের সকল গা কাঁটা—শক্ত করিয়া তরোয়ালের মুঠি ধরিয়া হাঁটু গাড়িয়া রাজকুমার বলিলেন, ‘কে?’ রাজপুত্র কিছুই দেখিতে পান না; ঘরে আলো, বিদ্যুতের চমক, রাজকন্যার শরীর কাঠের মতো শক্ত, রাজকন্যার নাকের ভিতর হইতে সরু-মিহি-চুলের মতো সাপ বাহির হইল! সেই চুল দেখিতে দেখিতে সুতা, দড়া, কাছি, তারপর প্রকান্ড অজগর! শঙ্খের মতো আওয়াজে সেই অজগর গর্জিয়া উঠিল।

পুরী থরথর কাঁপে। হাতের তরোয়াল ঝন ঝন, রাজপুত্র হাঁকিলেন—‘জানি না, যে হও তুমি, রক্ষ যক্ষ দানব! যদি রাজপুত্র হই, যদি নিষ্পাপ শরীর হয়, দৃষ্টির আড়ালে তরোয়াল ঘুরাইলাম, এই তরোয়াল তোমাকে ছুঁইবে!’

বলা আর কহা, সুতাশঙ্খ বত্রিশ ফণা ছড়াইয়া বিষদাঁতে আগুন ছুটাইয়া লকলক করিয়া উঠিয়াছে— রাজপুত্রের তরোয়াল ঝ-ঝন-ঝন শব্দে ঘরের ঝাড়বাতি চূর্ণ করিয়া সুতাশঙ্খের বত্রিশ ফণায় গিয়া লাগিল! অমনি রাজপুত্র দেখেন—সাপ! ঘরময় বিদ্যুতের ধাঁধা, চারিদিকে ধোঁয়া! রাজপুত্র শনশন তরোয়াল ঘুরাইয়া বলিলেন, ‘চক্ষু পাইলাম!!!’ তরোয়ালে অজগর সাত খন্ড হইয়া কাটিয়া গেল।

সেই নিশিতে রাক্ষসী-রানির পুরীতে ধ-ধরড়-ধড় শব্দে হাজার সিঁড়ির ধাপ ধসিয়া গেল, রাজকুমারের আয়ু সহস্রডাল সোনার ডালিম গাছ হইয়া গজাইয়া উঠিল। রাজপুরীতে ভূমিকম্প—গুড়গুড় দুড়-দুড় শব্দ! ভয়ে রাক্ষসী ইঁদুর হইয়া ‘চিঁচিঁ’ করিতে করিতে ছুটিয়া পলাইয়া গেল। রানির শরীর আবার মূর্ছা গিয়া পড়িয়া রহিল। রাজ্যে রাজপুরীতে হাহাকার, ‘এসব কী!’

রাত-রাজার রাজ্যে লোক নিত্যকার মতো কাঁদিতে কাঁদিতে আসিয়াছে—দেখে, ধন্য! ধন্য!

যক্ষ হও রক্ষ হও তরোয়াল তোমাকে ছুঁইবে

রাজা! রাজা আজ জীয়ন্ত!!! লোকের আনন্দ ধরে না! দেখে হাজারো ফণা সাত কুচি সাপ মেঝেতে পড়িয়া!! ‘কী সর্বনাশ!’ সকলে বুঝিল, এই সাপে এত দিন এত রাজা খাইয়াছে!—‘সাপকে পোড়াও!’

পোড়াইতে গিয়া, সাপের পেটে লিখন! লিখন রাজার কাছে আসিল। পড়িয়া রাজপুত্র বলিলেন, ‘রাজকন্যা! আর তো আমি থাকিতে পারি না, আমার সাত ভাই বুঝি রাক্ষসের পেটে গিয়াছে! আমি চলিলাম!’ রাজ্যের লোক মনঃক্ষুণ্ণ—শেষে এক রাজা পাইলাম তিনিও কোথাও চলিলেন? রাজা কবে ফিরিবেন—সকলে পথ চাহিয়া রহিল।

ডালিমকুমার যাইতেছেন, যাইতেছেন, এক পাহাড়ে উঠিয়া দেখেন পক্ষীরাজ। ছুঁইতেই আবার প্রাণ পাইয়া পক্ষীরাজ, ‘চিঁহি হি!’ করিয়া উঠিল। রাজপুত্র বলিলেন, ‘পক্ষীরাজ, এইবার চলো।’

যম-যমুনার দেশ—অন্ধকার গায়ে ঠেকে, বাতাসে পাথর উড়ে, রাজপুত্র কিছুই মানিলেন না। ‘ঝড়ের গতি কোন ছার, পক্ষীরাজে আসন যার।’ তির-বজ্রের মতো পক্ষীরাজ ছুটিয়া চলিল।

কতক দূরে গিয়া কড়ির পাহাড়। কড়ির পাহাড়ে পক্ষিরাজের পা চলে না; ছটছট রটারট শব্দ। রাজপুত্র বলিলেন, ‘পক্ষী, থামিও না; ছুটে চলো।’ পক্ষীরাজ তির-বজ্রের গতি সারারাত্রি পায়ের নীচে কড়ির পাহাড় চুর হইয়া গেল!

তার পরেই হাড়ের পাহাড়। হাড়ের পাহাড়ের নীচে কলকল শব্দে রক্ত-নদীর জল তোড়ে ছুটিয়াছে; রক্তের তরঙ্গ, রক্তের ঢেউ। দাঁত বাহির করিয়া মড়ার মুন্ড ‘হি! হি!’’ করিয়া উঠে, হাড়ে হাড়ে কটাকট খটাখট শব্দ, কান পাতা যায় না। রাজপুত্র বলিলেন, ‘পক্ষী, ভয় নাই, চোখ বুজিয়া চলো।’ পায়ের নীচে হাড়ের পাহাড় খট-খট-খটাং, ছর-র-র-র—ছটছট শব্দে তুষ হইয়া গেল। তখন রাত্রি পোহাইল, রাজপুত্র দেখেন, দূরে পাশাবতীর পুর।

পাশাবতীর পুরে ফটকে নিশান; নিশানে লেখা আছে—

‘পাশা খেলিয়া যে হারাইবে, সাত বোনে মালা দিব।’

রাজপুত্র হাঁকিলেন, ‘পাশা খেলিব!’

খেলিতে বসিয়া রাজপুত্র চমকিয়া গেলেন, এ পাশা তো তাঁরি! খেলিতে গিয়া রাজপুত্র হারিয়া গেলেন, দেখেন, এক ইঁদুর পাশা উলটাইয়া দেয়। আনমনা রাজপুত্র বসিয়া ভাবিতে লাগিলেন। পাশাবতী বলিল, ‘রাজপুত্র! পণ ফেলো!’

‘পক্ষীরাজ নাও; কাল আবার খেলিব।’ বলিয়া রাজপুত্র উঠিয়া গেলেন। পাশাবতীরা তখনি পক্ষীরাজকে গরাসে গরাসে খাইয়া ফেলিল।

পরদিন এক গ্রামের মধ্যে গিয়া রাজপুত্র এক বিড়ালের ছানা নিয়া আসিলেন। বলিলেন, ‘এস, আজ খেলিব।’

ইঁদুর আসে আসে, ...পলায়

খেলিতে বসিয়াছেন, আজ ইঁদুর আসে আসে করে, আসে না—কী যেন দেখিয়া পলায়।

রাজপুত্র দান ফেলিলেন—

‘এই হাতে ছিলে পাশা, পুনু এলে হাতে,—

এত দিন ছিলে পাশা কার দুধে-ভাতে?’

আর দান পড়ে। পলক ফেলিতে-না-ফেলিতে পাশাবতী হারিয়া গেল। রাজপুত্র বলিলেন, ‘আমার পক্ষীরাজ দাও।’ রাক্ষসী পক্ষীরাজ দিল।

আবার খেলা। রাক্ষসী আবার হারিল; রাজপুত্র বলিলেন, ‘আমার ঘোড়ার মতো ঘোড়া, আমার মতো রাজপুত্র দাও।’ পাশাবতী এক রাজপুত্র এক ঘোড়া আনিয়া দিল। রাজপুত্র দেখেন, ভাই; ভাই-এর ঘোড়া! রাজপুত্র আবার খেলিলেন। খেলিতে খেলিতে রাজপুত্র সাত ভাই, সাত ভাইয়ের ঘোড়া, পাশাবতীর রাজ-রাজত্ব ঘর পুরী সব জিতিলেন। শেষে বলিলেন ‘এখন কী দিবে? এই পাশা আর ইঁদুর দাও।’ পাশাবতী কি পাশা অমনি দেয়? তখন রাজপুত্র বিড়ালের ছানা ছাড়িয়া দিলেন, বিড়াল গড়গড় করিয়া ইঁদুরকে ধরিয়া ছিঁড়িয়া খাইয়া ফেলিল। ঘরের প্রদীপ নিবিয়া গেল, রাজ-রাজত্ব কোথায় সব? হাতের পাশা হাতে, রাজপুত্র দেখেন—সাত পাশাবতী সাত কেঁচো হইয়া মরিয়া রহিয়াছে!

পাশা বলিল, ‘কুমার, কুমার, ঘরে চলো।’

আট রাজপুত্র আট পক্ষীরাজ হু-হু করিয়া ছুটাইয়া দিলেন। রাজপুরীতে রানি উঠিয়া বসিয়াছেন, ‘কতকাল ঘুমাইয়াছি! আমার কুমার কই?’

‘কুমার কই!—চারিদিকে জয়ঢাক বাজে, পথের ধুলায় অন্ধকার—আট রাজপুত্র আট পক্ষীরাজের সারি দিয়া রাজ্যে ফিরিয়াছেন। কুমার আসিয়া বলিলেন, ‘মা কই, মা কই?’—আট রাজপুত্র রানিকে ঘিরিয়া প্রণাম করিলেন। শূন্য পুরীতে আবার সোনার হাট মিলিল।

‘ভাইদের খোঁজে কবে গিয়াছেন, সবে-জীয়ন্ত এক রাজা আমাদের, আজও ফিরেন না।’ খুঁজিয়া খুঁজিয়া রাত-রাজার দেশের যত লোক আসিয়া দেখিল, ‘আমাদের রাজা এইখানে!’ তখন রাজকন্যা, রাজপাট তুলিয়া সেইখানে নিয়া আসিলেন।

সকল দেখিয়া রাজা অবাক!

পরদিন ভোরবেলা সোনার ডালিম গাছে হাজার ফুল ফুটিয়া উঠিয়াছে; আর, দুপুর বেলা রাজপুরীর তাল গাছটা, কিছুর মধ্যে কিছু না, শিকড় ছিঁড়িয়া দুম করিয়া পড়িয়া, ফাটিয়া চৌচির হইয়া গেল!

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%