পিয়ালী ঘোষ
— মা ও মা, আমরা কেন পেট্স রাখতে পারি না মা? আমার সব ফ্রেন্ডসদের বাড়িতে হয় বার্ডস, না হয় ডগ্স বা ক্যাট্স আছে। কেউ কেউ তো খরগোশও পুষেছে। ও মা, মা, শোনো না...
— না না ওসব ঘর নোংরা করা প্রাণী আমি পুষতে দেব না।
রোজ একবার করে ঐশানিকে নিজের মেয়ের এই আবদারটা নাকচ করতে হয়। ঐশানির পশুপাখিতে এলার্জি আর রিমিতার কোনো ভাইবোন আর হবে না তা রিমিতার বাবা স্পষ্টই বলে দিয়েছেন। একটা মেয়ের ঝক্কি পোহাতেই উনি নাজেহাল। কিন্তু একা একা মেয়েটা সারাদিন পাগল হয়ে যায়। স্কুল থেকে ফিরেই হোমওয়ার্ক, তারপর আঁকার ক্লাস আর তাইকোয়ান্ডো ক্লাসে যায় মেয়েটা। কিন্তু বেশিরভাগ সময়টাই একা থাকে। মায়ের সাথে বকবক করে সময় কাটায়। বাড়ির কাজ সামলে ঐশানিও বেশি সময় দিতে পারেন না। রিমিতার বাবা একটা বেসরকারি ফার্মে কর্মরত তাই মেয়েকে সময় দেওয়া ওঁর পক্ষেও সম্ভব নয়। ওদিকে দিন দিন মেয়ের বায়নাক্কা বেড়ে চলছে, তার একটি নিজের পোষা বন্ধু চাই। অনেক ভেবেচিন্তে ঐশানি একটি বুদ্ধি করে।
হঠাৎ সেদিন স্কুল থেকে ফিরে রিমিতা রোজকার মতো জুতো খুলে ঘরে জামা বদলাতে গিয়ে দেখে একটি খুব সুন্দর ছোট্ট চারাগাছ তার পড়ার টেবিলের উপর টবে রাখা। তার নীচে একটা ছোট কাগজে লেখা— “আগামীকাল তোর জন্মদিন, নে তোকে তোর খেলার সাথী, মনের সব কথা বলার বন্ধু দিলাম। এটাই তোর মাম্মার উপহার এবার তোর জন্য।” চমক কাটিয়ে, আনন্দে আত্মহারা হয়ে, জামাকাপড় না বদলিয়েই রান্নাঘরে গিয়ে নিজের মাকে জড়িয়ে ধরে রিমিতা। ঐশানি মনে মনে হাসেন, যাক মেয়ের তাহলে গিফ্ট পছন্দ হয়েছে। মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে জিজ্ঞেস করেন, “কীরে কী নাম রাখবি তোর ছোট্ট বন্ধুর?” রিমিতা চোখ বুজে আনন্দে বলে ওঠে, “গুড়িগুড়ি”।
সেই থেকেই গুড়িগুড়ি রিমিতার সারাদিনের সাথী হয়ে উঠল। মায়ের কথা অনুযায়ী রিমিতা তাকে আদর করে, সকালে জল দিয়ে রোজ স্কুল যায় আর বলে যায়, “একদম মন খারাপ করবি না। স্কুল শেষ হলেই আমি এক ছুট্টে তোর কাছে, বুঝলি?” গুড়িগুড়িও যথাসাধ্য নিজের ছোট্ট ডালপালা নেড়ে যেন বলে, “টাটা, সাবধানে যেও।” সেদিন রিমিতার বাবা হেসে ওর মাকে বললেন, “যাক মেয়েকে ঠান্ডা করা গেছে তাহলে?” ঐশানিও হাসেন। এখন আর রিমিতাকে স্নান খাওয়ার কথা, পড়াশুনার কথা, বা আঁকা ইত্যাদি মনে করিয়ে দিতে হয় না। কতক্ষণে কাজ আর ক্লাস শেষ করে সে গুড়িগুড়িকে সারাদিনের কথা শোনাবে তাতেই ব্যস্ত থাকে। গুড়িগুড়ির যত্ন করা, তাকে মাথার কাছের টেবিলটায় নিয়ে শোয়া আর ঘুম না এলে তার সাথে বকবক করে যাওয়া, এই ছিল রিমিতার কাজ।
দুটিতে একসাথে বড় হয়ে উঠতে লাগল। রিমিতা পড়াশুনায় বরাবর ভালো। গুড়িগুড়িকে পেয়ে পড়াশোনায় আরও ভালো হয়ে উঠেছে রিমিতা। তাই রেজাল্ট হাতে বাড়িতে ঢুকেই আগে গুড়িগুড়িকে রিপোর্ট কার্ড দেখানো, বৃষ্টির দিনে একসাথে গুড়িগুড়িকে নিয়ে ভিজতে যাওয়া আর ক্লাসে আজ কার সাথে ভাব হল বা কার সাথে আড়ি, কোন ম্যাডাম বকল আর কে প্রশংসা করল, সব গল্প বলে যেত রিমিতা আর গুড়িগুড়িও মন দিয়ে সোজা হয়ে শুনত আর মাঝে মাঝেই রিমিতা যেই জিজ্ঞেস করত, “তুই বুঝছিস তো?” হাওয়া ছাড়াই গুড়িগুড়ির ডালপালা নড়ে উঠে ওকে বুঝিয়ে দিত যে, ও বুঝেছে।
সময়ের সঙ্গে গুড়িগুড়িকে আর ঘরে রাখা সম্ভব হল না। রিমিতা অনেক বুঝিয়ে সুঝিয়ে নিজের ঘরের জানলার পাশের খালি জমিতে গুড়িগুড়িকে পুঁতে দিল। গুড়িগুড়ির একটা ডাল রিমিতার জানলার শিকের ভিতর যেন হাত বাড়িয়ে দিয়ে বলতে চাইল, “আমি আছি তোর পাশে।” প্রতিবছর গুড়িগুড়ির ডালে সুন্দর লাল গোলাপী ফুল হতে লাগল। মাঝে মাঝে রিমিতা গাছটাকে ঝাঁকানি দিয়ে ফুলগুলো নিজের গায়ে ঝরে পড়তে দিত আর খিলখিল করে হেসে উঠত। গুড়িগুড়িও ডালপালা নেড়ে খুশির প্রকাশ করত। এইভাবেই দুজনে একসঙ্গে বেড়ে উঠতে লাগল। গুড়িগুড়ির প্রতি রিমিতার ভালোবাসা দেখে ওর বাবা গুড়িগুড়ির একটা ডালে দোলনা টাঙিয়ে দিল রিমিতার জন্য। রিমিতা সময় পেলেই ওটাতে বসে দোল খেত আর গুড়িগুড়িকে কীসব যে বলে যেত আর খিলখিল করে হাসত সেটা ওর বাবা-মা বুঝতে পারতেন না। কিন্তু নিজের মেয়েকে খুশি দেখে খুব খুশি হতেন ওঁরা দুজনে।
সময় থেমে থাকে না; রিমিতা এখন বড় হয়েছে। আজ রিমিতার বিয়ে। চিরতরে এই বাড়ি ছেড়ে যেতে হবে আর গুড়িগুড়িকে রেখে যেতে হবে, এই ভেবে রিমিতা সকাল থেকে আত্মীয়দের দৃষ্টি বাঁচিয়ে গুড়িগুড়ির কাছে এসে বসে কাঁদছিল। গুড়িগুড়ির একটা পাতাও নড়ছিল না, যেন বন্ধুর পাশে আর থাকতে পারবে না বুঝতে পারছিল।
হঠাৎ পাঁচিলের বাইরে থেকে অনির্বান ডাকল, রিমিতার হবু, রিমিতার ভালোবাসা। আনন্দে আর লজ্জায় রাঙা রিমিতা তাকে পাঁচিল টপকে ভিতরে আসতে বলল। রিমিতা গুড়িগুড়ির সঙ্গে অনির্বাণের পরিচয় করিয়ে দিল। গুড়িগুড়ির একটা ডাল ঝুঁকে অনির্বাণের দিকে যেন হাত বাড়িয়ে দিল। রিমিতা অনির্বাণকে বলল, “কেউ যদি জানতে পারে তুমি এসেছ, লজ্জার সীমা থাকবে না। তবে আমি তোমার জন্য একটা বিশেষ উপহার কিনে রেখেছি। একটু দাঁড়াও লুকিয়ে নিয়ে আসি।” অনির্বাণ বলে, “আরে ফুলশয্যার দিন দিও।” রিমিতা না শুনেই এক দৌড়ে ঘরে চলে গেল। গিফ্ট নিয়ে ফিরে এসে দেখল অনির্বাণ চলে গিয়েছে। রিমিতা মনঃক্ষুন্ন হয়ে, রাগ চেপে অনির্বাণকে ফোন মেলালো। অনির্বাণের ফোনের রিংটা যেন খুব কাছ থেকেই শুনতে পাওয়া গেল।
থম হয়ে বসে থাকা রিমিতা কিছুতেই অনুধাবন করতে পারছিল না যে অনির্বাণের এই দশা কীভাবে হল। বিয়েবাড়ি এখন ক্রাইম সীন। বোধশক্তি হারিয়ে বসে আছে রিমিতা, ঐশানি অজ্ঞান হয়ে পড়ে আছেন আর রিমিতার বাবা কিংকর্তব্যবিমূঢ হয়ে পুলিশদের প্রশ্নবাণের উত্তর দিতে চেষ্টা করছেন। মাটিতে পড়ে আছে অনির্বাণের থেঁতলে যাওয়া লাশ। আর রক্ত লাগা গুড়িগুড়ির একটা মোটা ডাল। অনির্বাণের মা, শক পেয়ে হাসপাতালে ভর্তি আর ওর বাবা পুলিশকে কিছু বলার মতন অবস্থায় নেই। আর রিমিতা? শোকে পাগলপ্রায় হয়ে নিজের বিছানায় অজ্ঞান হয়ে পড়ে আছে।
একবছর কেটে গেছে রিমিতার ভালোবাসার সাথীটিকে হারিয়ে। অনেক বুঝিয়ে শুনিয়ে রিমিতার বাবা-মা ওর অন্যত্র বিয়ের ব্যবস্থা করেছেন। এইবার রিমিতা আর তার হবু বরকে দেখতেও চায়নি। ওর আর কোনো ইচ্ছেই ছিল না বিয়ে করার। কিন্তু বাবা-মায়ের খুশির জন্য করতে হচ্ছে। বিয়ের দিন, বাড়িতে সাজো সাজো রব। যদিও বেশি জাঁকজমক করেননি রিমিতার বাবা। বিয়ের সাজে সেজে রিমিতা গুড়িগুড়িকে বিদায় জানাতে গেল। নিজের ঘরের জানলাটা খুলে দিয়ে রিমিতা জিজ্ঞেস করল, “কেমন দেখাচ্ছে আমাকে বল তো?” গুড়িগুড়ির একটাও ডালপালা নড়ল না। রিমিতা আবার জিজ্ঞেস করল, “এইবার সব ঠিক হবে বল? অনেক সাহস করে এগিয়েছি রে, তুই আশীর্বাদ করিস।” ঐশানি ঘরে ঢুকেই মেয়েকে দেখে বলেন, “কী সুন্দর দেখাচ্ছে তোকে। আয় মা।” পায়ে পায়ে রিমিতা ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। ওর মা ‘লজ্জাবস্ত্র’ নিতে আলমারির দিকে এগিয়ে গেলেন। রিমিতার বাবা কন্যাদান করতে গিয়ে ঐশানিকে দেখতে না পেয়ে বাড়ির কাজের লোকটিকে ঐশানিকে খুঁজতে পাঠালেন। হঠাৎ বিয়েবাড়ির সকল আওয়াজকে স্তব্ধ করে দিয়ে কাজের লোকের ভয় মেশানো চিৎকার ভেসে এল, “বাবু, তাড়াতাড়ি আসেন, মা... মা...” রিমিতা, ওর বাবা সমেত আত্মীয়স্বজন সবাই এক দৌড়ে রিমিতার ঘরের দিকে গিয়ে বীভৎস এক দৃশ্যের সামনে ভয়ে হতবাক হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন। ঐশানির গলায় জড়ানো একটি প্যাঁচালো গাছের ডাল। ওঁর জিভটা বেরিয়ে এসেছে আর ঠেলে বেরিয়ে আসা চোখের মধ্যে বিভীষিকার দৃষ্টি। একটু দূরে কাজের লোকটি অজ্ঞান হয়ে পড়ে আছে। এই দৃশ্য রিমিতা আর বরদাস্ত করতে পারল না, অজ্ঞান হয়ে গিয়ে, চিরতরে চুপ হয়ে গেল। রিমিতার বাবা শোকে, আর ঘটনার আকস্মিকতায় সাথে সাথেই বেহুঁশ হয়ে পড়লেন।
উপসংহার
অন্ধকারে, গুড়িগুড়ির গাছের ডালে বাঁধা দোলনায় অবিরাম দুলছে যে মেয়েটি, সে রিমিতা। না, রিমিতার আর বিয়ে হয়নি। ওর আত্মীয়রা ওকে নিয়ে যেতে চাইলে ও যেতে চায়নি। ও আর কারোর মৃত্যুর কারণ হতে চায়নি। ও একা একাই দোল খায় সেই ডালটায় যেটাতে ওর জন্য কোনোদিন দোলনা টাঙ্গিয়ে দেওয়া হয়েছিল। অবিরাম বকবক করতে থাকা রিমিতা আজ নিশ্চুপ। খেতে যাওয়ার, স্নান করার বা গান শোনার সময় নেই, পড়াশুনা কিছুই আর রিমিতা বোঝে না। রিমিতার বাবার এক দূর সম্পর্কের বোন ওর দেখাশোনা করেন। তিনিই ওকে স্নান-খাওয়া করিয়ে দেন। বাড়িটা আজ অন্ধকার কাঠামো নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে।
গুড়িগুড়ি আজও ফুল দেয়। গুড়িগুড়ি আজও ডালপালা নাড়িয়ে রিমিতাকে বলে, “আছি, আমি তোর পাশেই আছি।” শূন্যদৃষ্টিতে রিমিতা কোথায় যেন তাকিয়ে থাকে, হয়তো বা কিছু খোঁজে, কিছু বোঝে, কিছু ভাবে। হয়তো বা...
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন