প্রক্সি

পিয়ালী ঘোষ

কানুকে সবাই ‘প্রক্সি’ নামেই ডাকত স্কুল থেকে কলেজ অবধি। তার কারণ, অন্যদের মতন কানু ক্লাস কামাই করত না, নিয়ম করে নোট্‌স নিত এবং ক্লাসে কেউ থাক বা না থাক, তার রোল নম্বরটা সে বলে যেত কানুর কাছে। যে-কোনো শিক্ষক এসে হাজিরা নেওয়ার ডাক দিলেই কানু তার হয়ে এমনভাবে ‘প্রক্সি’ দিয়ে হাজিরা দিত, যে কারোর অনুপস্থিতি আজ অবধি লাল কালির দাগ পায়নি। কানু নিজে পড়াশুনাতে খুব ভালো ছিল, কিন্তু ওর প্রক্সি দেওয়ার কায়দার জন্য ছোট থেকেই ছাত্রদের মাঝে কানু বিখ্যাত হয়ে গিয়েছিল। পরবর্তীকালে, কলেজেও একই কারণে সবার নয়নের মণি ছিল সে। এতটা নিখুঁত, নিপুণ প্রক্সি, কেউই দিতে পারত না। পড়াশুনায় ভালো ছিল বলে অনেক শিক্ষকরা জানা সত্ত্বেও, কানুকে দোষ দেননি কখনও, শুধু একটু-আধটু বকা দিয়ে ছেড়ে দিয়েছেন।

কালের চাকা ঘোরে, সেদিনকার কানু আজ ষাট; নাতি নাতনি নিয়ে সংসারের গাড়ি চালাচ্ছে। প্রচুর ডিগ্রি থাকা সত্ত্বেও কানু স্বেচ্ছায় নিজের গ্রামেরই স্কুলে শিক্ষক এবং সকল ছাত্রের প্রিয়। এখন আর কানুকে প্রক্সি দেওয়ার জন্য কেউ অনুরোধ করে না। পুরোনো বন্ধুরা কোথায় যে হারিয়ে গিয়েছে কানুর জানা নেই। তাদের কথা মনে হলেও এখন কে কোথায় আছে কানু জানেন না। হঠাৎ একদিন স্কুলের পিওন কানুর নামে একটি চিঠি স্টাফ রুমের টেবিলে রেখে যায়। কানু খুলে দেখে, তার কলেজের সহপাঠী রাজুল এত বছর পর লিখেছে, “ভাই কানু, অনেক বছর হল কোনো যোগাযোগ নেই। সেদিন হঠাৎ সিতেশের সাথে একটা মলে দেখা হল। পুরোনো কথা বলতে গিয়ে তোর কথা উঠতেই সিতেশ বলল তুই নাকি এখন আমাদের স্কুলেই পড়াচ্ছিস? কতবছর হয়ে গেল তোর আর সিতেশের সাথে আড্ডা দেওয়া হয়নি। স্কুল, গ্রাম সব মনে পড়লেও, অফিস থেকে ছুটি পাই না বলে যাওয়া হয়ে ওঠে না। আগামী রবিবার তোর জন্মদিন, আমার মনে আছে। আমি আর সিতেশ একসাথে তোর কাছে যাব মনস্থির করেছি। অনেকদিন পর স্মৃতি রোমন্থন করা যাবে আর গ্রামের জল বাতাসের সাথে তোর জন্মদিনের ভুরি ভোজটাও সারা যাবে কী বল? দেখা হচ্ছে তাহলে।” কানুর মনটা আনন্দে ভরে উঠল। কত কী মনে পড়ে গেল। কানু সেদিন তাড়াতাড়ি ছুটি নিয়ে বাড়ি গেল।

বাড়ি ফিরে নিজের স্ত্রীকে একথা বলতেই সেও বলে ওঠে, “তাহলে এবার হয়ে যাক তোমার জন্মদিনের উৎসব?” অধীর আনন্দে কানু ছেলেমানুষের মতন হাততালি দিয়ে উঠল।

দেখতে দেখতে রবিবার এসে গেল আর কানুর বাড়িতে অনেক বছর পর তিন বন্ধুর পুনর্মিলন হল। তিনজনে গলা জড়িয়ে ধরে ছোটবেলার মতন নেচে, গেয়ে হৈচৈ করতে লাগলেন। সারা বাড়িতে আনন্দ উৎসবের হাওয়া বইতে লাগল। কানুর ছেলের বউরা জমিয়ে রান্না করল আর সব্বাই খাওয়া দাওয়া করে প্রচুর আড্ডা দিল। বিকেলবেলা বন্ধুদের নিয়ে স্কুলে গেল কানু। পুরোনো স্মৃতি রোমন্থন হল, নিজেদের ক্লাস, বেঞ্চ সব দেখা হলে প্রক্সির কথা উঠতেই হাসতে হাসতে তিন বন্ধু একে অপরকে নিয়ে মস্করায় ডুবে গেল। কেমন করে সায়েন্সের স্যার সীতেশকে ‘সিথীশ’, কানুকে ‘খানু’ আর রাজুলকে ‘রাজুন’ বলে ডাকতেন সেই নিয়ে বিস্তর হাসাহাসি হল। রাজুল আর সীতেশ অনেকদিন পর গ্রামের সবুজে, স্কুলের বেঞ্চে, নিজেদের ছেলেবেলা খুঁজে আনন্দ করতে লাগল। সেই কোন যুবা বয়সে ওরা গ্রাম ছেড়ে দিয়েছিল আজ পুকুরের ধার, ধানের খেত, ইত্যাদি দেখে শিশুর মতন প্রাণ ভরে শ্বাস নিল।

গ্রাম-গঞ্জে রাত তাড়াতাড়ি নেমে আসে। তাই গল্প আড্ডা সেরে তিন বন্ধু একই রুমে রাত ১২টায় ঘুমিয়ে পড়ল এবং তখনই তৃপ্ত-ঘুমে আচ্ছন্ন হয়ে পড়ল তিনজনেই।

রাত তখন তিনটে। ঘরের জানলার বাইরে, অমাবস্যার নিকষ অন্ধকারে, অনেক পুরোনো চেনা আওয়াজে ডাক শোনা গেল— “সিথীশ, সিথীশ”...

ঘুমে অচৈতন্যপ্রায় কানু অভ্যাসবশত, অনেক বছর পর বলে উঠল “হাজির...” বাইরে থেকে খুকখুক কাশির সাথে জবাব এল, “চলে আয়, তোকে নিতে এলাম...”

হতভম্ব ‘প্রক্সি’ কানু, অবাক হয়ে বিছানায় শোয়া কানুর দিকে কিছুক্ষণ চেয়ে আস্তে আস্তে জানলা দিয়ে বেরিয়ে হাওয়ায় মিশে গেল...

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%