পিয়ালী ঘোষ
— “ও বাবু, এইবার চলে আয় না... আর কতদিন ভুলে থাকবি?”
রঞ্জন প্রতিদিন সেই একই আওয়াজ শুনতে পায়। একা, ভীড়ে, রঞ্জন খালি শুনতে পায়, কেউ ওকে ক্রমাগত ডাকছে। ভয়ে ঘুমাতে পারে না। চোখ দুটো টকটকে লাল হয়ে গেছে। সারাক্ষণ আতঙ্কে থাকে রঞ্জন। এই তো সেদিন, রাস্তায় একটা গাড়ি চাপা পড়তে পড়তে বেঁচে গেল। নিজের দোষ, তাই ‘সরি’ বলে হাত জুড়ল, ড্রাইভারকে। আশ্চর্য ড্রাইভারের ভ্রূক্ষেপ নেই, পাত্তা না দিয়েই চলে গেল, যেন দেখতেই পায়নি রঞ্জনকে। মাঝে মাঝে অবাক লাগে, খিদেটাও কেমন মরে গেছে, কী যেন একটা তাড়িয়ে নিয়ে চলেছে রঞ্জনকে ক্রমাগত। ও নিজেই জানে না... স্নান, খাওয়া, রান্না করা ওর কিছুই ভালো লাগে না।
সবে দুদিন হল, রঞ্জন দেখল ঘরের ভিতর চারজন মুশকো কালো লোক ঘুরে বেড়াচ্ছে… ভয়ে রঞ্জনের গলা দিয়ে আওয়াজ বেরোচ্ছিল না… কী যেন খুঁজছিল ওরা। কী ভাগ্যিস রঞ্জন ভালো মতন লুকিয়ে ছিল... তাই তো ওরা দেখতে পায়নি... এসব যে কী হচ্ছে হঠাৎ করে ওর জীবনে, ও বুঝতে পারে না।
রঞ্জন উঠে রান্নাঘরের দিকে গেল, কতদিন রান্নাই করা হয়নি, খিদেটাও তেমন হয় না, আজ কেমন খেতে ইচ্ছে হচ্ছে, রান্নাঘরটা কী নোংরা হয়ে পড়ে আছে, বাড়িটাও ঝাঁট দেওয়া হয়নি। মা যে কেন চলে গেল ওকে ছেড়ে… চোখে জল এল... ও তো বাড়ির কাজ কোনোদিন করেনি। বাবা মারা যাওয়ার পর থেকে ওর মা-ই সব কাজ করে দিয়েছে। ওকে খালি বলেছে পড়াশুনা করতে, যাতে ও জীবনে ভালোভাবে দাঁড়াতে পারে। চুলটাও যে কতদিন কাটা হয়নি… রঞ্জন উঠে পড়ল। ভাত বসিয়ে দেবে চাট্টি না হয়। চালের বাক্স থেকে চাল বের করে ধুয়ে নিয়ে ভাত বসাবার জন্য লাইটারটা ধরাতেই গ্যাস দাউ-দাউ করে জ্বলে উঠল। রঞ্জন চেঁচিয়ে পিছিয়ে এল। আগুন!... ওরে বাবা রে... দাউ দাউ করে জ্বলছে চারিদিক… হঠাৎ রঞ্জনের চোখের সামনে যেন পর্দা সরে গেল... ও ভয়ে, আতঙ্কে চেঁচিয়ে উঠল।
ওর সারা শরীর কেঁপে উঠল থর-থর করে... পাড়াপড়শিরা দৌড়ে এল রঞ্জনের বাড়ি... এসে আগুন নেভাতে চেষ্টা করল। সবাই ‘রঞ্জন রঞ্জন কোথায় তুই?’ বলে ডাকাডাকি করছিল...
অতিকষ্টে রঞ্জন উঠে দাঁড়াল। সোফার পিছন থেকে টলতে টলতে এসে সবার সামনে বলল সে কীরকম ভয় পেয়ে গেছিল... তাই গ্যাসের সিলিন্ডারটা বার্স্ট করতেই ও সোফার পিছনে ছিটকে এসে পড়ে... কিন্তু আশ্চর্য, নিবারণদা, আশীষ কাকু, কেউ যেন ওর বলা কথা শুনতেই পায়নি, তখনও মিনা কাকি রঞ্জন রঞ্জন বলে ডেকে চলেছে... রঞ্জন গলা ঝেড়ে জোরে বলে, “আমি এখানে এএএএএ...”
হঠাৎ, পাশের বাড়ির বাবলিটা চেঁচিয়ে ওঠে, “এই তো রঞ্জনদা, সোফার পিছনে। ইশশ, কী বাজে অবস্থা হয়েছে, কী বাজে গন্ধ…” সব্বাই ওইদিকে দৌড়ায়। রঞ্জন বেশ অবাক হয়েই দৌড়ে যায় দেখতে লোকেরা কাকে রঞ্জন বলে ডাকছে... সবার সাথে সেও সোফার পিছনে দাঁড়ানো বাবলিকে বলে, “এই তো আমি…” সবাই তখন নাক চাপা দিয়েছে, কেউ কেউ দুর্গন্ধে বমি করে ফেলেছে। পুলিশকে কে যে কল দিল রঞ্জন জানে না… সব্বাই আতঙ্কে, বিস্ফারিত নেত্রে তাকিয়ে আছে সোফার পিছনে... সবার প্রশ্ন চাপা স্বরে শোনা যাচ্ছে, “তাহলে, আগুনটা কে জ্বালাল?” পুলিশ সব কিছু ভালো করে দেখে জানাল, “এক সপ্তাহ আগেই এই আগুন লাগে... এবং রঞ্জনের বডিটা গত এক সপ্তাহ ধরেই পড়ে আছে , তাই এই অবস্থা…” সবাই অবাক, যে এত বড় ব্লাস্ট হয়েছে তাও কেউ টের পায়নি এক সপ্তাহ আগে, অথচ আজকে ওরা যে আগুন দেখে দৌড়ে এল, সেটা আদৌ জ্বালানোই হয়নি...
রঞ্জনের চোখের সামনে দিয়ে স্ট্রেচারে করে রঞ্জনেরই পুড়ে যাওয়া, কালো, আধপচা দেহটা তুলে নিয়ে গেল পুলিশ। তখন রঞ্জনের কানে আবার সেই চেনা আওয়াজ ধাক্কা খেয়ে ফিরে ফিরে আসতে লাগল— “ও বাবু, এইবার চলে আয় না... আর কতদিন ভুলে থাকবি?” আওয়াজটা দূর থেকে এলেও রঞ্জন পিছন ফিরে হঠাৎ নিজের মাকে দেখতে পেল... আর তখনই ও বুঝল, ওকে যেতে হবে… অনেকটা পথ... ও কিছু না বুঝতে পেরে বৃথাই সময় নষ্ট করেছে এতদিন।
কোথায় যেন রঞ্জন পড়েছিল, অনেক সময় মৃত ব্যক্তি বুঝতে পারে না, যে সে মারা গেছে, তাই জীবন্ত আচরণ করতে থাকে, যতক্ষণ না সে অনুভব করে, সে পৃথিবী ছেড়ে যেতে পারে না...
নাহ, এবার ওকে যেতেই হবে, আর ও মায়ায় আটকে থাকবে না। মা ডাকছে...
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন