পিয়ালী ঘোষ
পর্ব (১)
ডক্টর নীল সামন্ত
হাঁসফাঁস লাগছে, দম বন্ধ হয়ে আসছে... চোখ দুটো ঠেলে কোটোর থেকে বেরিয়ে আসছে... আঃ আঃ আঃ... স্টেথোস্কোপের কর্ডটা চেপে বসছে গলার উপর, আস্তে আস্তে পেঁচিয়ে যাচ্ছে... ইয়ারপিস্গুলো কানের ফুটোর উপরে শক্ত করে চেপে বসছে। কানের পর্দা ফেটে যাওয়ার জোগাড়। ডক্টর নীল সামন্ত আর পারছেন না... ছটফট করছেন... ফাঁসটা শক্ত হয়ে চেপে বসেছে। নিঃশ্বাসের শেষ দমটা জোর করে টেনে নিয়েই কাশতে-কাশতে ডাক্তার নীল সামন্ত নিজের ক্লিনিকের চেয়ারে উঠে বসলেন। বিস্ফারিত চোখে চারিদিক দেখে হাঁপিয়ে কাশতে থাকলেন। হাতড়ে-হাতড়ে পাশ থেকে ইনহেলারটা নিয়ে দু’বার পাফ নিলেন... ভাবলেন, এ যাত্রা বোধ হয় পার পাওয়া গেল।
নাঃ, ঘুমোলে চলবে না... কিছুতেই না। কিন্তু কতদিন এভাবে না ঘুমিয়ে কাটানো যায়? হসপিটালে ডিউটি আছে, প্রাইভেট ক্লিনিক আছে, এভাবে চলতে থাকলে কাজকর্ম লাটে উঠবে যে। দিনে নয়, রাতে নয়... আজ ৫ দিন হয়ে গেল ডক্টর সামন্ত চোখ বন্ধ করতে পারেননি... ঘুমোলেই তিনি মারাত্মকভাবে এই ঘটনার সম্মুখীন হচ্ছেন। বারংবার চোখে জলের ঝাপ্টা দিতে থাকেন, খিদে-তেষ্টা তাঁর সব প্রায় শেষ... নিজে ডাক্তার হয়েও, কোনো প্রতিকার করতে পারেন না নিজের সমস্যার। নিজের হাসপাতালে, মানসিক বিভাগে সিনিয়র ডাক্তারদের সাথে কনসালটেশন করিয়েও ফল হচ্ছে না... নাহ, ডাক্তার নীল সামন্ত কিছুতেই ঘুমোতে পারছেন না। আতঙ্কিত নীল সামন্তর মনে পড়ল তাদের কথা।
সঞ্জিত মিত্র
সঞ্জিত আজ টিভি চালিয়ে বসে আছে। বিগত ৫ রাত্রি ঘুম এলেই টিভি চালিয়ে বসতে হচ্ছে। নিজেকে জাগিয়ে রাখার প্রচেষ্টায়। পরশুদিন তো টিভি দেখতে দেখতেই ঘুমিয়ে পড়েছিল সঞ্জিত। আর তখনই ঘটনাটা ঘটল। স্পষ্ট বুঝতে পারল সঞ্জিত, সে তলিয়ে যাচ্ছে, গভীর থেকে গভীরে, অতল-গাঢ় অন্ধকারে। কোথায় যেন পড়ে যাচ্ছে সে। চোখ খুলতে চাইছে, পারছে না। সঞ্জিত অন্ধকারের সমুদ্রে সাঁতার কেটে বেরোতে গিয়েও, কেন উপরে উঠতে পারছে না সেটা অনুভব করেই যতবার উপর দিকে উঠতে চাইছে, একটি নিকষ-কালো অন্ধকার যেন তাকে গ্রাস করছে। ডুবে যাচ্ছে, নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে যাচ্ছে, আর কোনো উপায় নেই। কতক্ষণ এভাবে ছিল সঞ্জিত নিজেই জানে না। হঠাৎ টিভিতে জোর বিজ্ঞাপনের আওয়াজ তাকে সেই আচ্ছন্নতা থেকে ফিরিয়ে আনল যেন। সে চমকে উঠে বসল। এক ঝটকায় ঘোর কেটে গেল। ইশশ, জামাটা ঘামে ভিজে গিয়েছে। তবে কি আজও একই ব্যাপার হবে? না ঘুমোলেও তো শরীর চলবে না। উঠে পড়ল সঞ্জিত। চোখে মুখে জলের ঝাপ্টা দিয়ে এসে, বারান্দায় চেয়ার নিয়ে এক পেগ হুইস্কি নিয়ে বসল গ্লোবাল ফার্মার ম্যানেজার সঞ্জিত মিত্র। আজকেও নিজেকে জাগিয়ে রাখার প্রবল তাগিদে হঠাৎই মনে পড়ল তাদের কথা...
সৌরিনী মুখার্জি
সৌরিনী ওরফে রিনির আজ বারবার মনে হচ্ছে ওদের কাউকে একজনকে একটা কল করে নিলে ভালো হয়। একটু আগেই স্টিয়ারিং হুইলে ঢুলে পড়েছিল রিনি, রেড লাইটে গাড়ি নিয়ে অপেক্ষা করতে। আসে পাশের গাড়িগুলো জোরে হর্ন না বাজালে হয়তো চমকে গিয়ে জেগে উঠতে পারত না রিনি আর আজ দুর্ঘটনা ঘটে যেতই। এই নিয়ে পরপর ৪ রাত্রি খুব ঝুঁকি নিয়েই বাড়ি ফিরেছে সে। আগামী দিনগুলোও তার এমনটাই যাবে রিনি খুব ভালো বুঝতে পারছে। একটি শপিং মলের মালিকের সেক্রেটারি রিনি ওরফে সৌরিনী মুখার্জি। অনেক কষ্টে ৭ বছরে নিজেকে এত বড় পজিশনে নিয়ে এসে রিনির কোনোদিন মনে হয়নি অতীত হাতছানিও দিতে পারে। খিদে-তেষ্টা আর পাচ্ছে না। সিগারেট আর কড়া কফি খেয়ে কোনোমতেই নিজেকে জাগিয়ে রেখেছে এ কদিন। গা-টা গুলিয়ে উঠল রিনির। দৌড়ে বাথরুমে গিয়ে হড়-হড় করে বমি করে ফেলল সে। আজ পঞ্চম রাত্রি, আর না, এবার ওদের কল করতেই হবে। নম্বরগুলো ডায়রি হাতড়ে-হাতড়ে খুঁজতে বসল রিনি।
অ্যাডভোকেট অভিকর্ষ সেনগুপ্ত
কেসটা তাহলে এবার অ্যাডভোকেট অভিকর্ষ সেনগুপ্ত জিতেই গেলেন। মনে নিজের বুদ্ধির তারিফ করলেন তিনি। দু’বছর ধরে জমি সংক্রান্ত মামলায় আজ রায়পুরের গাঙ্গুলিদের জিতিয়েই দিলেন উনি। এই প্রথম কোনো এত বড় মামলা উনি জিতলেন।
না, না ভুল হল।
আবার প্রায় ৭ বছর পর কোনো মামলায় জিতলেন উনি। মাঝে তো কেস লড়া ছেড়েই দিয়েছিলেন অ্যাডভোকেট এ. সেনগুপ্ত। কোনো নতুন কেস এলেও নিতেন না। যাক, আজ বাড়ি গিয়ে নিশ্চিন্তে ঘুমোতে পারবেন। বড্ড জ্বালাচ্ছিল শরিকের এই মামলা। শেষে বড় গাঙ্গুলিদের থেকে মোটা টাকা নিয়ে কেসটা রফা করিয়ে ছাড়লেন। আজ বড় গাঙ্গুলির খুড়তুতো ভাইয়ের স্ত্রীর থেকে জমিটার দখলদারি গাঙ্গুলিদের বড় ভাইয়ের দখলে দিতে পেরে যারপরনাই আনন্দিত অ্যাডভোকেট এ. সেনগুপ্ত। বহু মিথ্যে বলে নিরীহ, নির্দোষ বিধবা ছোট গাঙ্গুলির স্ত্রীকে হারিয়ে দিলেন উনি। নীরব বিধবার অশ্রুজলও ওঁকে টলাতে পারেনি। ওঁকে মোটা টাকার লোভ দেখিয়ে গাঙ্গুলিরা তার খুড়তুতো ভাইয়ের বিধবা স্ত্রী ও তার ছেলেকে উৎখাত করিয়ে শান্তি পেল যেন।
যদিও এখন আর অ্যাডভোকেট সেনগুপ্তকে মোটা টাকার পরিবর্তে অন্যায়ভাবে কেস জেতা বিচলিত করে না, যেমনটা আগে তাকে করত। বাড়ি গিয়ে ব্রীফকেসটা খুলে দেখবেন টাকাগুলো আর একটা পেগ। ব্যস... শুধুমাত্র কেসে জিতলেই এখন একটা পেগ খাবেন ভেবেই রেখেছেন অ্যাডভোকেট এ. সেনগুপ্ত।
শুধু গত ৪ রাত্রি কেন জানি না ঘুমটা হচ্ছে না। ওই কারণেই আজ মাথাটা কেমন ভার লাগছে। গাড়ির রিয়ার ভিউ আয়নাটায় কী যেন দেখা যাচ্ছে না? ওহ, কোর্টের বিল্ডিংটা। চমকে গিয়ে সাথে ব্রেক কষলেন অ্যাডভোকেট এ. সেনগুপ্ত। সে কী? এতক্ষণ ড্রাইভ করছেন তাও এখানেই রয়েছেন কী করে? ঘড়ির দিকে তাকালেন উনি। হ্যাঁ, ঘড়ি তো বলছে দুপুর ৩টে বাজে। আর ওঁর কেস তো সেই ১২টায় রফা হয়ে গিয়েছে। তারপর উনি এতক্ষণ গাড়ি চালিয়ে বাড়ি যাচ্ছিলেন, তাহলে আবার কোর্টে কী করে? হতভম্ব সেনগুপ্ত এক্সেলারেটরে আবার চাপ দিলেন। এবার মন দিয়ে রাস্তায় চোখ রেখে চালাতে লাগলেন।
সন্ধে ৭টা, অ্যাডভোকেট এ. সেনগুপ্তর গাড়ি পঞ্চমবার হাই কোর্টের চত্বরে এসে দাঁড়াল। ভয়ে, আতঙ্কে গত ৪দিনের ঘুম ততক্ষণে ওঁর চোখ থেকে উড়ে গিয়েছে। ফোনটা বাজছে মনে হচ্ছে না? হাতড়ে-হাতড়ে গাড়ির ড্যাশবোর্ড থেকে ফোনটা বের করতেই চেনা নাম ও নাম্বার দেখে আবার সেই ভয় আর আতঙ্ক তাকে ধীরে ধীরে গ্রাস করতে থাকে...
শ্বেতা
আজ বহুদিন পরে অনেকটা জোর করেই, শ্বেতা শপিংয়ে বেরিয়েছিল। কদিন ভালো করে ঘুম হচ্ছে না। ঘুমোলেই সেই অস্বস্তিকর, দমবন্ধ একটা ভাব, সারা শরীরকে যেন অবশ করে ফেলছে। গত পাঁচদিন ভালো করে ঘুমায়নি শ্বেতা। চোখ দুটি বন্ধ করতেই পারছে না। ফলে শরীর খারাপ হয়ে যাচ্ছে, ঘুমের ওষুধ খেয়ে ঘুম এলেও জোর করে চোখটা খুলে রাখতে হচ্ছে। এতে আরও কষ্ট বাড়ছে। কলকাতা থেকে সেই সুদূর মুম্বাইয়ের একটি কলেজে প্রফেসরের চাকরি করতে এসেছে শ্বেতা, বাড়ির অমতেই। এখন ফিরে গেলে নিজের কাছেই হেরে যাবে সে। রুমমেট রুনা ওকে নিয়ে চিন্তিত, কিছুতেই শ্বেতাকে রিলিফ দিতে পারছে না। তাই আজ ওকে জোর করে নিজের সাথে শপিংয়ে এনেছে, যদি শরীরটা একটু ভালো লাগে, এই ভেবে। দিনের শেষে পরিশ্রান্ত শ্বেতা ও রুনা ঘরে ফিরে এক কাপ গরম দুধ নিয়ে বসে। বাইরে থেকে ডিনার করেই ফিরেছে ওরা। ক্লান্তির শেষে গরম দুধের প্রভাবে শ্বেতা ঘুমিয়ে পড়ে।
খবর
খবরের কাগজের হেডলাইনে চোখ আটকে যায় একে-একে ডক্টর নীল সামন্ত, ম্যানেজার সঞ্জিত মিত্র, সেক্রেটারী সৌরিনী মুখার্জি এবং অ্যাডভোকেট অভিকর্ষ সেনগুপ্তর। মুম্বাইয়ের একটি নামীদামী কলেজের প্রফেসর, শ্বেতা রায়, অদ্ভুত অবস্থায় মারা গিয়েছেন। ওঁর রুমমেট ঘটনার আকস্মিকতায় শুধু বলতে পেরেছে যে সে কিছুই টের পায়নি। সকালে নিজের বান্ধবীর ঘরের দরজা ধাক্কা দিয়ে, সাড়া না পেয়ে, পাশের ফ্ল্যাটের মিসেস খারেকে নিয়ে এসে, ফ্ল্যাটের সেক্রেটারীকে ডাকিয়ে, দরজা ভেঙে, শ্বেতার বডি খাটের উপর পড়ে থাকতে দেখে। তিনজনেই শ্বেতার অবস্থা দেখে দারুণ ভয় পেয়ে যায় এবং পুলিশ ডাকে। পোস্টমর্টেমের প্রাথমিক রিপোর্টে ডাক্তার জানিয়েছেন শ্বেতার চোখ দুটি ভয়ঙ্করভাবে খোলা আর বিস্ফারিত থাকা সত্ত্বেও শ্বেতা কিন্তু গভীর ঘুমে ঘুমাচ্ছিল। ঘুমের মধ্যেই কিছু একটা দেখে, শ্বেতা আতঙ্কে হৃদক্রিয়া বন্ধ হয়ে মারা গিয়েছে। এসি চলা সত্ত্বেও ওর পুরো শরীর ঘামে জবজবে ভিজেছিল।
ঘটনাটা পড়তে-পড়তেই একে অপরকে ফোন করে ওরা ৪জন যে যার মতন করে। আজ ৫ দিন ওরা জেগে, ঘুমোতে পারছে না। কিছু একটা করতে হবেই। পরেরদিনই ওরা ফ্লাইট ও গাড়ি করে ৭ বছর পর ‘হিঞ্জলা’ টাউনশিপে এসে পৌঁছায়... মনে স্মৃতির ভীড়, কিছু ভালো, কিছু ভুলের, কিছু আনন্দের, তবে বেশির ভাগটাই কিছু অজানা আশঙ্কার, অজানা এক হেস্তনেস্তর। অনেকদিন পর রিনি আর সঞ্জিত মুখোমুখি হয়েছে। স্কুল-কলেজ সব এখানেই, শ্বেতা, সঞ্জিত ও রিনির। আজ শ্বেতা ওদের মাঝে নেই। নেই এই টাউনশিপে ওদের বাড়িগুলো। টাউনশিপ আজ অন্যরকম চেহারা নিয়েছে। অনেক উন্নতি হয়েছে। ওরা দু’চোখ ভরে এই টাউনশিপের চেনা দিনগুলি খুঁজতে থাকে।
পর্ব (২)
হিঞ্জলা
সুন্দর সবুজ পাহাড়গুলোর মাঝে গড়ে উঠেছে বসতি। মাঝে শেয়ালের ডাক, প্যাঁচার কর্কশ কণ্ঠ ছাড়াও রাত্রে হায়েনার হাসি শোনা যায়। ‘হিঞ্জলা’ ওডিশার কেন্দ্রাপাড়া ডিস্ট্রিক্টের অংশ। সাথে লাগোয়া একটি পিকনিক স্পট আছে, যেখানে মাঝে মাঝে পরিবার সহ হিঞ্জলার স্থানীয় লোকেরা পিকনিক করতে যায়। অনেক দূরে একটিই ভালো স্কুল আর একটিই কলেজ আছে। যাতে পড়াশুনা ভালো করে করতে পারে, তাই অধিকাংশ ছেলে-মেয়েরা স্কুল আর কলেজের লাগোয়া হোস্টেলে থাকে। তাই মেরিট বেস্ড লিমিটেড সীট। সবাই সহজে সুযোগ পায় না। তাই এখানে সব সময়ে প্রতিযোগিতা লেগেই থাকে কে সীট পাবে। তার জন্যে বরাবর পড়াশুনায় ভালো রিনি আর সঞ্জিত স্কুলের টপ স্কোরারদের মধ্যে শামিল। প্রতি পেরেন্ট-টিচার মিটিঙে প্রশংসায় পঞ্চমুখ শিক্ষকদের মাঝে ওদের দুজনের গর্বিত বাবা-মায়েরা উজ্জ্বল মুখে বসে থাকেন। এদের দুজনের তৃতীয় সাথী, যে তৃতীয় স্থান অধিকার করে প্রতিবার, সে হল শ্বেতা। ছোট থেকেই ওরা এই স্কুলেই পড়াশুনা করেছে। এদের তিনজনের বন্ধুত্ব যেমন অটুট তেমন অন্য পড়ুয়াদের জন্য ঈর্ষার কারণও। এত বছরে এদের তিনজনকে নিজেদের স্থান থেকে কেউ সরাতে পারেনি। শুধু পড়াশোনা নয়, শ্বেতা দারুণ আঁকতেও পারে। স্কুলে এক ডাকে ‘ত্রয়ী’ বললেই এদের সব্বাই চিনতে পারে।
নীরা অ্যাঞ্জেলা গোমেজ
এই বিখ্যাত ত্রয়ীদের টেক্কা দিতেই বোধহয় স্কুলে নীরা অ্যাঞ্জেলা গোমেজের পদার্পণ। অ্যাঙলো ইন্ডিয়ান মেয়েটি সাধারণত চুপচাপ থাকে, কারোর সঙ্গে কথা বলে না। নিজের পড়াশোনা বা এক্সট্রা কারিকুলার নিয়েই থাকে নিজের মধ্যে। যেহেতু সোজাসুজি ইলেভেনে ভর্তি হয়েছে, তাই কারোর সাথেই তেমন পরিচয় হয়নি। কিন্তু কিছুদিনের মধ্যেই সারা স্কুলে নীরার পড়াশুনা, নাচ-গান এবং আঁকার প্রশংসায় শিক্ষক এবং পড়ুয়াদের চাপা মন্তব্য ও গুঞ্জন শোনা যেতে লাগল। নীরা এক কথায় ‘অল রাউন্ডার’। নাচে, গানে, আঁকায় আর লেখাপড়ায় নীরার নাগাল ত্রয়ীদের কেউই পেল না। সাথে নীরা দারুণ দাবা খেলতে পারে। একে একে শ্বেতা, সঞ্জিত আর রিনিকে পিছনে ফেলে এগিয়ে গেল নীরা। ক্লাস ইলেভেনের বেস্ট ছাত্রী হয়ে উঠল নীরা। শ্বেতা, রিনি আর সঞ্জিত ক্লাসের প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় থেকে প্রথম ১০জনের মধ্যে স্থান পেতে লাগল। সব শিক্ষকদের মুখে এখন নীরার আলোচনা। স্কুলে কোনো ইভেন্ট হলেই নীরার খোঁজ পড়ে। সঞ্জিতের নাম দাবা খেলায় স্কুলে চ্যাম্পিয়ন্সদের মধ্যে ধরা হত। নীরা এসে অনেক কম সময়ে সঞ্জিতকে চ্যাম্পিয়নশিপেও হারিয়ে দিল। সঞ্জিত এই হার কিছুতেই মেনে নিতে পারল না। রাগ আর হিংসেতে হাতের মুঠিটা জোরে নিজের রুমের দেওয়ালে ঠুকতে লাগল।
নীরার বাবা চাকরির সূত্রে হিঞ্জলা এসেছেন। এসেই নীরার জন্য উনি হোস্টেলে অ্যাপলাই করেই রেখে ছিলেন। যেহেতু মিড্-সেশন, তাই নীরা শেয়ারে রুম পেল রিনির সাথে, কারণ বাকি সব রুমগুলো আগের থেকেই শেয়ারিংয়ে ছিল।
হিংসে
নীরার উপর রিনি আর শ্বেতার হিংসে ফার্স্ট টার্মের ফলাফল থেকেই শুরু হয়ে যায়। বাইরে বুঝতে না দিলেও, ভিতরে নীরার নোটস লুকিয়ে টুকে নেওয়া, ওর সাথে গল্প করতে করতে খাতায় ইচ্ছে করে হাতের গেলাস থেকে জল ফেলে দেওয়া, ওদের প্রায়ই এইসব ভুল হতে লাগল। নীরা সন্দেহ করলেও ঠিকঠাক বুঝতে পারত না। হাফ ইয়ার্লির ফলাফল শ্বেতা, সঞ্জিত আর রিনিকে যখন এবারও প্রথম ১০ জনের মধ্যেই নিয়ে এল, ওরা তখন প্রমাদ গুনল। শুধু লেখাপড়াতেই নয়, নীরা যখন ওদের এক্সট্রা কারিকুলারেও পিছনে ফেলে এগিয়ে গেল, তখন ওদের হিংসে, আর রাগ চরম পর্যায়ে পৌঁছাল।
একদিন নীরাকে সঞ্জিত জিজ্ঞেস করেই ফেলল, “নীরা, তুই কী করে এত সব বিষয়তেই ভালো নম্বর আনিস বল তো? আমরাও তো তোর সমান খাটি, তাতেও নম্বর পাই না আমরা। এত কিছু কী করে পারিস বল তো?”
নীরা ব্যাপারটার গুরুত্ব বুঝতে না পেরে ওর সাথে মজা করবার ছলে গম্ভীরভাবে বলে, “আমি পরীক্ষার আগে টানা পাঁচ দিন জেগে থাকি। শুয়ে পড়ি, কিন্তু ঘুমাই না। জেগে থেকে সারা রাত আমি গোপন একটি মন্ত্র আউড়ে যাই। এতে আমার সবকিছু জয় করবার শক্তি আসে।”
সঞ্জিত বলে, “গোপন মন্ত্র? সে আবার কী?”
নীরার পরিষ্কার উত্তর, “আমাদের চার্চের ফাদারের দেওয়া মন্ত্র এটা। জীবনের সব ক্ষেত্রেই জিতে যাওয়ার রাস্তা পরিষ্কার করে দেয়।”
সঞ্জিত প্রথমটা বিশ্বাস করে না, বলে, “সত্যি?”
নীরা বলে, “সত্যি রে। শুয়ে শুয়ে আমি চোখ খুলে রাখি তাই কেউ জানতে পারে না, কারণ এটাই নিয়ম এই মন্ত্রটার। চোখ খুলে পাঁচ রাত সারাক্ষণ মন্ত্রটা আউড়ে যেতে হয়। প্রথম রাতে মন্ত্রটা বলবার আগে ‘নিঘুমনামা মন্ত্র’ জপতে হয় চোখ খুলে এক ঘণ্টা। এতে ঘুম আর পায় না আগামী চার দিন। তারপর সারা রাত ধরে একটা গোপন মন্ত্র আছে সেটা জপলে অল রাউন্ডার হওয়া থেকে কেউ আটকাতে পারবে না।” সঞ্জিত বহুবার জিজ্ঞেস করেও নীরার থেকে গোপন মন্ত্রের হদিশ পায় না।
সঞ্জিত শ্বেতা আর রিনিকে নীরার সাথে হওয়া পুরো কথোপকথন বলে। নীরার মন্ত্র ওকে সব বিষয়ে অলরাউন্ডার বানাতে পারে, এটা বলবার পর রিনি আর শ্বেতার চোখ গোলগোল হয়ে যায়। নীরা নাকি মন্ত্র জপে পাঁচ দিন পর অদ্ভুত শক্তি অধিকারী হয়ে ওঠে? তার ব্রেন সাংঘাতিক অ্যাক্টিভ হয়ে ওঠে আর সে পড়াশুনা, এক্সট্রা কারিকুলার, যতটুকুই করে, সবটা এই মন্ত্রের জোরে সফল হয়ে যায়? নাকি মন্ত্রের জোরেই হয় সব বাজি জেতা সেটাও জানতে হবে।
প্রথমটা রিনি আর শ্বেতার বিশ্বাস হয়নি কথাটা। ওরা একে একে নিজেদের মতন করে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে নীরার থেকে কথাটার সত্যতা জানতে চায়। নীরা ওদেরকেও বলে প্রতি অমাবস্যায় সে এই মন্ত্রটা এভাবেই জপে। তারপর সে যে কাজেই হাত দেয় তাতেই সাফল্য লাভ করে। নীরা আরও বলে, “এই মন্ত্রটা তাই শুধু যে কোনো পরীক্ষার আগেই জপ করি। ছোটোখাটো কারণে এই মন্ত্র উচ্চারণ করলে ক্ষতি হয়।” রিনি আর শ্বেতা সাথে সাথে সেই গোপন মন্ত্রের কথা জানতে চায় নীরার থেকে, কিন্তু বিফল হয়। নীরা একটা ইঙ্গিতপূর্ণ হাসি দিয়ে চুপ করে যায়। এতে ওদের দু’জনের গা জ্বলে গেলেও ওদের তখনকার মতো থেমে যেতেই হয়।
পিকনিক
ওরা দিন গোনে পরের অমাবস্যার। দু’সপ্তাহ পরেই শীতের শুরু। হিঞ্জলায় হালকা কুয়াশা, শীত অল্প অল্প জানান দিচ্ছে। শীতের ছুটি শুরুর আগের দিনই অমাবস্যা। আগের থেকেই প্ল্যান করে নিল রিনি আর শ্বেতা। নীরাকে রাজি করিয়ে সাথে নিয়ে বেরিয়ে পড়ল ওরা। হোস্টেলের পিছনে পাহাড়টা দেখতে যাবে; শীতের ছুটিতে বাড়ি যাওয়ার আগে ওরা সবাই মিলে পিকনিক করতে যাবে। নীরা দোনামোনা করে রাজি হয়। ওরা তিনজন বান্ধবী সকাল সকাল কিছু শুকনো খাবার প্যাক করে নিয়ে বেরিয়ে পড়ে।
সঞ্জিতকে মাঝপথে জয়েন করতে দেখে ওরা সবাই একটু অবাক হয়। সঞ্জিতের কোনোমতেই আসবার কথা ছিল না। ওদিকে সঞ্জিত ওদের স্কুলে খুঁজতে জানতে পারে, ওরা তিনজনে মিলে বেরিয়েছে, হিঞ্জলা পাহাড়ের দিকে যাবে বলছিল। সেদিন সবার অফ ডে, কারণ সবাই নিজের জিনিসপত্র গুছিয়ে বাড়ি যাবে দিন পনেরোর ছুটিতে। সঞ্জিত হোস্টেলের ক্যান্টিন থেকে ডিমের তরকারি আর রুটি কিনে তাড়াতাড়ি পাহাড়ের দিকে রওনা দিল। মাঝপথে ওদের সাথে দেখা হয় সঞ্জিতের। পথে যদিও সঞ্জিতকে দেখে অবাক হয় ওরা তিনজনে, কিন্তু ওদের সাথে দেখা আর ডিম আর রুটির কথা শুনে তো ওরা আনন্দে হৈ-হৈ করে উঠল। সারাদিন মজা করে কেটে যায়। প্রচুর গান গাওয়া, খেলাধুলো করা, আর একসাথে হৈচৈ করতে করতে বেলা গড়িয়ে যায়, ওরা কেউ ঘুণাক্ষরেও নিজেদের মনে কী চলছে বুঝতে দেয় না নীরাকে।
ওরা সূর্য পাটে যাওয়ার আগেই রওনা দেয় হোস্টেলের দিকে। নীরা আর শ্বেতা আগে এগিয়ে যায় আর পিছনে সঞ্জিত আর রিনি গল্প করতে করতে আসতে থাকে। নীরা আর শ্বেতা ঘাড় ঘুরিয়ে দেখে রিনিকে সঞ্জিত কী যেন বোঝাচ্ছে। রিনি গম্ভীরভাবে মাথা নাড়ছে। হোস্টেল আজ প্রায় ফাঁকা। বেশিরভাগ ছাত্ররা সবাই ছুটিতে বাড়ির দিকে রওনা দিয়েছে। এক-আধজন যারা রয়ে গিয়েছে তারা নিজেদের জিনিসপত্র গোছাচ্ছে পরেরদিন বাড়ি যাবে বলে। কিছু স্টুডেন্ট আবার এই ফাঁকা হোস্টেলের ঘরেই ছুটি কাটাতে পছন্দ করে। তখন হোস্টেলের ওয়ার্ডেনের আদেশ অনুযায়ী হোস্টেলে সেই ছাত্ররা নিজেদের মতন পড়াশুনা করে, পরীক্ষার তৈরি করে। হোস্টেলের চৌকিদারের বউ তখন রান্নার ভার নেয়।
হোস্টেলের পিছন দিয়ে ছাদে ওঠবার সিঁড়িটার দিকে তাই আজ আর কারোর নজর নেই। ওরা চারজন ওই সিঁড়ি দিয়ে উঠে যায় হোস্টেলের ছাদে। নীরা আপত্তি করেছিল যে দেরি হয়ে যাচ্ছে, জিনিস গুছিয়ে পরের দিন বাড়ি যেতে হবে। কিন্তু নীরার ওজর আপত্তি টেকে না। রিনি জোর করে এবং বলে যে আবার সেই ১৫দিন পরে দেখা হবে তাই যতটুকুন আনন্দ করে নেওয়া যায় তা এই আড্ডাতেই হবে। সন্ধে হয়। ওরা ছাদে দাঁড়িয়ে পুরো হিঞ্জলার হোস্টেলের আশেপাশের আধো অন্ধকার দৃশ্য মন দিয়ে দেখতে থাকে। দেখতে দেখতে ছাদে ওরা সবাই জল খাচ্ছিল। এতটা হেঁটে এসে ওদের তেষ্টা পেয়ে গিয়েছে। নীরাকে সঞ্জিত জলের এক্সট্রা বোতলটা এগিয়ে দেয়। জলে আগের থেকে মিশিয়ে রাখা ঘুমের ওষুধের প্রভাবে নীরা পাঁচ মিনিটের মধ্যেই ঘুমে ঢুলে পড়ে।
পর্ব (৩)
শেষ মিথ্যা
— “ওরে, তোরা আমায় ছেড়ে দে। শোন্, আমি মজা করেছি রে। এসব সত্যি নয়। মানুষ কখনও এরকমভাবে ৫দিন না ঘুমিয়ে থাকতে পারে? তোরা নিজেরাই বল না। আমি সত্যি এরকম কোনো মন্ত্র জানি না রে।”
ঘুম ভেঙেই নিজেকে হাত-পা বাঁধা অবস্থায় পায় নীরা। নিজের মনের সব সন্দেহগুলো যে সত্যি, সেটা নীরা বুঝতে পেরে বারবার বলতে থাকে, “আমরা তো বন্ধু, বল? আমি তোদের সব নোটস দিয়ে দেব। আমি তোদের পড়িয়ে দেব। আমি তো তোদের সাথে মজা করেছি রে। বিশ্বাস কর, এতটুকুন সত্যি নেই।”
সঞ্জিত দাঁতে দাঁত চেপে বলে, “তাহলেও বা কী করা যাবে? তোকে তো ছেড়ে দিলেই এখন গিয়ে সবাইকে বলে দিবি। সেটা হচ্ছে না বাবু। আর ন্যাকামি রেখে মন্ত্রটা বলবি কি না বল। নাহলে এখানেই পচে মর। তুই মরলে আমরা তিনজন শান্তি পাই। আবার বলে পড়িয়ে দেব? তুই যখন পড়াতিস না তখন আমরা ভালো রেজাল্ট করেছি, বুঝলি?”
রিনিও পাশে দাঁড়িয়ে বলে, “বেশ হয়েছে। রাক্ষুসী এতদিনের রেপুটেশন আমাদের খেয়ে ফেলছিল। এবার থাক এখানে পড়ে।”
শ্বেতা ঘটনার আকস্মিকতায় হতভম্ব হয়ে গেলেও, ওদের বাকি প্ল্যানে হাত মেলায়, অনেকদিনের বন্ধুত্ব যে। সঞ্জিত আলাদা করে ওদের দুজনকে ডেকে নিয়ে গিয়ে বলে, “ভুলেও ওকে আজ খেতে দিবি না। আমরা পালা করে জেগে থাকব। ওকে ঘুমাতে দিবি না কিছুতেই। মুখের কাপড়টা শুধু জল দেওয়ার সময় খুলবি। টয়লেটও ওইখানেই করবে, শুয়ে শুয়ে। ভেবে দেখ, মন্ত্র পড়ে এতদিন আমাদের টেক্কা দিয়ে এসেছে! ওর তো চরম শাস্তি হওয়া উচিত।”
নীরা চোখ দিয়ে কাতর আকুতি জানাতে থাকে। ওর চোখ থেকে টপ-টপ করে জল গড়াতে থাকে। ওরা কেউ নীরার কথা শোনে না। নীরাকে ওরা হোস্টেলের ট্যাঙ্কের নীচে ফাঁকা জায়গাটায় ঢুকিয়ে দেয়। শান্ত শিষ্ট নীরা, আসন্ন আতঙ্কে শিহরিত হয়ে অজ্ঞান হয়ে যায়। ফাঁকা হোস্টেলের ছাদে নীরার গোঙানির আওয়াজ কেউ শুনতে পায় না। সঞ্জিত, শ্বেতা আর রিনি পালা করে এসে নীরাকে জাগিয়ে রাখার দায়িত্বটা নিল। নীরার ঘুম এলেই মুখে জলের ঝাপ্টা দিয়ে আর চড়-চাপড় মারতেও বাকি রাখল না। ওরা নীরাকে শুধু জল ছাড়া আর কোনো খাবার খেতে দেয়নি। পরেরদিন রিনি শ্বেতার বাড়িতে আর শ্বেতা রিনির বাড়িতে ফোন করে জানায়, যে একে অপরের বাড়িতে থাকবে আর পড়াশুনা করবে। আগেও ওরা এরকম করেছে বলে, কারোর বাড়িতেই সন্দেহ হয় না। কিন্তু ওরা হোস্টেলেই থেকে যায়। আর সঞ্জিত নিজেদের হিঞ্জলা গেস্ট হাউজটায় চলে যায়। জ্ঞান ফিরলে, রাত্রিবেলায় নীরা শীতে কেঁপে অস্থির হয়ে যায়। একটা চাদর বা গায়ে ঢাকা দেওয়ার শালের জন্য মিনতি করতে থাকে ওদের কাছে। ওরা একদম পাত্তা দেয় না। সারা রাত নীরা ঠান্ডায় জমে যেতে থাকে।
জুভেনাইল ক্রাইম
নীরা একটু মুখটা খোলা পেলেই প্রথমে আকুতি, তারপর চিৎকার করে ‘বাঁচাও’ বলার বিফল চেষ্টা করে, বারবার করে বলত, “তোরা বিশ্বাস কর, আমি কোনো মন্ত্র জানি না। আমার ঘুম পেয়েছে, আমায় ঘুমাতে দে, আমি বাড়ি যাব। আমি কাউকে কিছু বলব না প্রমিস করছি।”
রিনি এসে চুলের মুঠি ধরে টেনে কখনও নীরাকে ঝাঁকানি দেয় তো কখনও অকথা-কুকথা শোনায়—“জানোয়ার, বদ মেয়ে কোথাকার, আমাদের মাঝে এসে আমাদের পড়াশুনা সব বৃথা করে দিলি? আবার বলে প্রমিস করছি... তোকে বিশ্বাস নেই আমাদের একটুকুও... আমরা কোথায় নামকরা ছাত্র ছিলাম, মন্ত্র পড়ে, চিটিং করে, আমাদের নাম ধুলোয় মিলিয়ে দিলি? আজ তোকে ছাড়ব না। বল কোন মন্ত্র জানিস বল... বলতেই হবে।” ঠান্ডায় নীরার কাঁপুনি দিয়ে জ্বর আসে দ্বিতীয় দিন। নীরা ভুলভাল বকতে থাকে। কখনও জ্ঞানে বা কখনও ঘোরের মধ্যে দিয়ে।
ওদিকে নীরার বাবা পরপর চারদিন কলেজে এসে শ্বেতা আর রিনির রুম তালাবন্ধ দেখেছেন। শ্বেতা আর রিনি দিনের বেলা হোস্টেলের মধ্যে শ্বেতার রুমে গিয়ে বসে থাকত আর সঞ্জিত ওদের লক করে চলে যেত ছাদে। এই কারণেই চারদিন লাগাতার হোস্টেলে এসেও শ্বেতা আর রিনিকে হোস্টেলের কোথাও দেখতে পাননি নীরার বাবা অর্ণব ফ্রান্সিস গোমেজ। বিকেলে এসে ওদের তালা খুলে খাবার এনে দিত সঞ্জিত। খাবার খেয়ে শ্বেতা আর রিনি পিছনের সিঁড়ি দিয়ে ছাদে চলে যেত এবং নীরাকে পাহারা দিতো। সাথে চলত চড়-চাপড়, পা দিয়ে লাথি মারা। ওরা বারংবার বলত, “মন্ত্রটা এখনও ভালোয়-ভালোয় বলে দে নীরা, খামোখা জেদ করে আছিস। আমরা তোকে ছেড়ে দেব।” নীরা অসহায়ের মতন তাকিয়ে থাকত ওদের দিকে। কান্নাকাটি করত। ওয়ার্ডেন বা অথোরিটিরা সবাই ছুটিতে থাকার কারণে বেড়াতে গিয়েছেন বলে নীরার বাবার পক্ষে যোগাযোগ সম্ভব হচ্ছিল না। হোস্টেলে মোবাইল রাখার নিয়ম নেই, তাই ওদের কারোর কাছেই মোবাইল ছিল না।
সঞ্জিতের বাবা বিশাল বড়লোক। তাই সঞ্জিতের টাকার অভাব ছিল না। মাসের শুরুতে বাবার থেকে বেশ কিছু টাকা পকেট মানি পেত এবং সেটা নিজের কাছে লুকিয়ে রেখে দিত। সে চৌকিদারকে টাকা খাইয়ে নীরার বাবাকে মিথ্যে বলতে বলতো। অর্ণব বাবু যখনই চৌকিদারকে নীরার কথা জিজ্ঞেস করতেন, সে তাই একই উত্তর দিত, “আপকি বেটি কো হাম নেহি দেখা হ্যায় বাবু। ঘর চলি গই হোগি।”
ওরা তিন দিন তিন রাত্রি নীরাকে না খেতে দিল, না দিল ঘুমাতে। নীরার গায়ে তখন পচে যাওয়া নোংরা মল-মূত্রের গন্ধে ভর্তি, মাছি ভ্যান ভ্যান করে দিনের বেলায়। ওরা কেউ পাশে দাঁড়াতে পারে না। তাও ওকে এক সেকেন্ডের জন্যেও চোখ বন্ধ করতে দেয় না। নীরার আওয়াজ ক্ষীণ থেকে ক্ষীণতর হয়ে এসেছে। খালি পেটে বমি হওয়াও বন্ধ হয়ে গিয়েছে। ধীরে ধীরে নীরার কালশিটেগুলো আর নানা ক্ষত সব ঘা হয়ে যেতে থাকে। হাত বাঁধা অবস্থায় থাকে বলে রক্ত চলাচল হয় না তাতে। মুখে কাপড় গোঁজার জন্য সারাদিন গলা শুকনো হয়ে থাকে। ওর অবস্থা দেখে শ্বেতা রিনি আর সঞ্জিতকে বলে যে নীরা হয়তো মন্ত্রটা জানে না। আর এভাবে ওকে ধরে রাখাটা ঠিক হচ্ছে না। রিনিও ভালো বুঝতে পারে যে ওরা নিজেদের হিংসে চরিতার্থ করতে গিয়ে সাংঘাতিক একটা অপরাধ করে ফেলেছে, তার থেকে আর ফিরে যাওয়ার পথ নেই।
সঞ্জিত বলে আরও একটা দিন তো, পঞ্চম দিনে ছেড়েই দেবে নীরাকে ওরা। সঞ্জিতের চরম হিংসে, অপমান আর ইগোর কারণে বাকি দুজনের ক্ষতি হতে পারে, এই কথাটা শ্বেতা রিনিকেও বলেছে কয়েকবার কিন্তু রিনি শুনতে চায়নি। সঞ্জিত বলেছে মিথ্যেবাদীদের শাস্তি হওয়া উচিত। ওরা শুধু প্রতারিতই হয়নি, নীরা ওদের নিয়ে মস্করা করে ওদের ভয়ঙ্কর ছোট করেছে, যার শাস্তি ওকে পেতেই হতো। নীরার চোখ লাল টকটকে হয়ে উঠেছে, এখন মুখে কাপড়টাও গুঁজতে লাগে না। ওর আওয়াজ নেই বললেই হয়। কিন্তু তাও চোখ দুটো বার বার বন্ধ হতে চায়। গায়ে ধুম জ্বর, চোখ দুটো টকটকে লাল, না ঘুমিয়ে আর অত্যাচারের কারণে নীরার মাথার ঠিক নেই। চিৎকার করার শক্তি নেই। নীরা একটা জড়পদার্থের মতো হয়ে গিয়েছে যেন। কিন্তু তা সত্ত্বেও সঞ্জিত কোনোভাবেই নীরাকে ক্ষমা করতে নারাজ।
চতুর্থ রাতে যখন, চোখ খোলা রাখতে আগের থেকে কিনে আনা ‘পেপার স্প্রে’ নীরার চোখে স্প্রে করল সঞ্জিত, তখন নীরা বোধ হয় শেষ চিৎকার করেছিল। হাত বাঁধা থাকার জন্য, নীরা চোখের জ্বালায় বেশ কয়েকবার ছটফট করে উঠে, স্থির হয়ে যায়। শ্বেতা মুখ ফিরিয়ে নিলেও, রিনি আর সঞ্জিত হাসে শুধু নীরার দিকে তাকিয়ে। কিন্তু নীরাকে চোখে জলের ঝাপটাও দেয় না। চারদিন টানা জেগে থাকা, না খেতে পাওয়া নীরা, অত কষ্ট আর সহ্য না করতে পেরে সেই রাত্রেই মারা যায়। হোস্টেলের চারতলার ছাদে, ট্যাঙ্কের নীচে, পড়ে থাকে নীরার নিথর দেহ।
এরপর ওরা এক এক করে সমস্ত প্রমাণ সরিয়ে ফেলে। নীরার হাতের আর পায়ের দড়িগুলো খুলে দিয়ে, নিজেরা নিজেদের রুমে ঢুকে ফ্রেশ হয় আর নিজেদের ব্যাগগুলো নিয়ে একসাথে যে যার বাড়ির দিকে রওনা দেয়। সঞ্জিত নিজের বাড়ি যাওয়ার আগে প্রমাণের সব জিনিসগুলো একটা প্যাকেটে ভরে আর হিঞ্জলা পাহাড়ের দিকে হাঁটা দেয়। যাতে পুলিশ কিছু খুঁজে না পায় তাই পাহাড়ের গায়ের জঙ্গলের কাছাকাছি ওই প্যাকেটটা ফেলে দেয়।
পর্ব (৪)
অনুসন্ধান
পাঁচ দিনেই নীরার দুর্গন্ধযুক্ত শরীর পচে যেতে শুরু করল আর চিল-শকুনের চিৎকারে হোস্টেলের যে কয়জন ছাত্র পড়াশুনার জন্য রয়ে গিয়েছিল, তারাও ভয় পেয়ে গেল। তাদের মধ্যেই একজন কী হয়েছে দেখতে ছাদে গেল। ছাদের দরজা বাইরে থেকে তালা দেওয়া থাকে যেমন, তেমনই বন্ধ ছিল। কিন্তু গা গুলিয়ে ওঠা একটা গন্ধ পেয়ে, ছেলেটা দৌড়ে এসে চৌকিদারকে স্কুল অথোরিটিদের কল করতে বলে।
ওদিকে, তৃতীয় দিনও মেয়ের খোঁজ না পেয়ে নীরার বাবা পুলিশ থানায় গিয়ে রিপোর্ট লিখিয়েছিলেন। লোকাল পুলিশও গড়িমসি করছিল, “এসে যাবে মেয়ে, আরও কয়েকটা দিন দেখুন”, এই বলে। হঠাৎ করে হিঞ্জলার হোস্টেলের অথোরিটিদের থেকে কল পেয়ে দৌড়ে গেলেন হিঞ্জলার একটি মাত্র থানার ওসি, ও তার সাব-ইন্সপেক্টর। বন্ধ তালার সামনে ততক্ষণে ছাত্র, চৌকিদার আর লোকাল লোকেদের ভীড় বাড়তে শুরু হয়ে গিয়েছে। যদিও বাইরে থেকেই গন্ধটা প্রবল ছিল, তাও, দরজার তালা খুলে ঢুকতেই উৎকট গন্ধে প্রায় বমি উঠে এল থানার ওসি ও আশপাশে সকলের। ওসি সঙ্গে সঙ্গে বড় থানায় ফোন করলেন আর ফরেনসিক ও এক্সট্রা পুলিশবল নিয়ে আসতে বললেন। এক ঘণ্টার মধ্যেই কেন্দ্রাপাড়া থানা থেকে পুলিশ ও ফরেনসিক দুইই এসে পৌঁছাল। নীরার বডিটা অচিরেই ট্যাঙ্কের তলায় পাওয়া গেল। বডির অবস্থা দেখে ওদের সবারই গা শিউরে উঠল।
শ্বেতা ও রিনি
শ্বেতা আর রিনি সেদিন যে যার বাড়ি পৌঁছাল। বাড়ি ঢুকতেই শ্বেতাকে ওর মা প্রতিবারের মতন জিজ্ঞেস করলেন, “কী রে কেমন পড়া তৈরি হল তোদের? ওর বাড়িতে কী খেলি রে?” শ্বেতা কোনো উত্তর না দিয়ে ঘরের দরজা দুম করে বন্ধ করে থম হয়ে বিছানায় বসে পড়ে। ও ভেবে পায় না ও যা করে এল, সেটা সত্যি ও করেছে এতদিন ধরে। শাস্তির চাইতেও বড় ওর বিবেকে আঘাত লাগল। ও বালিশে মুখ গুঁজে অনেকদিনকার জমা কান্না হাউ হাউ করে কাঁদতে শুরু করল। অনেক পরে ডাকাডাকিতে উঠে বাথরুমে গিয়ে হাত মুখ ধুয়ে বাবা-মায়ের সাথে খেতে বসে। এক-দু গ্রাস খেয়েই শ্বেতা বাথরুমে গিয়ে হুড়-হুড় করে বমি করে দিল। ওর মা চিন্তিত হয়ে জিজ্ঞেস করেন, “কী হয়েছে রে? কিছু বলছিস না কেন? শরীর খারাপ নাকি? ওষুধ দেব? কতক্ষণ হয়ে গেল এসেছিস, কোনো কথার জবাব দিচ্ছিস না কেন?” শ্বেতা কোনো জবাব না দিয়ে নিজের ঘরে ঢুকে শুয়ে পড়ল। শ্বেতার মা মেয়ের কাণ্ডকারখানা কিছুই বুঝে উঠতে পারলেন না। ভাবলেন, হয়তো রিনির সাথে ঝগড়া হয়েছে তাই এরকম করছে শ্বেতা।
ওদিকে রিনি বাড়িতে গিয়ে হৈহৈ করে উঠল। সে নাকি শ্বেতাদের বাড়িতে দারুণ সময় কাটিয়েছে, অনেক পড়াশুনা করেছে, আরও কত কী বলল। ওর মায়ের একটু অবাক লাগল এই কারণে, যে মেয়ে ১০টা প্রশ্ন করলে একটা জবাব দেয়, আজ নিজের থেকেই কী করে এত কথা বলছে। সন্দেহটা মনেই রেখে দেন উনি। শুধু রিনির বাবাকে ওর এই অস্বাভাবিক আচরণের কথা বলেন। রিনির বাবা আমুদে মানুষ, এত সিরিয়াস হতে পারেন না। তাই ওর মাকে বলেন, “ধুর পাত্তা দিও না। এটা তো ভালো লক্ষণ, এতদিন তো কথা জিজ্ঞেস করলে উত্তর দেয় না এই কমপ্লেন করতে তুমি।” রিনির মায়ের মন থেকে তবুও খটকাটা যায় না। উনি রিনিকে ভালো করে জানেন, কিছু উদ্বেগ চাপা দিতে হলেই, রিনি হঠাৎ অনেক অদরকারি কথা বলে।
সনাক্তকরণ
ফরেনসিক এসে এভিডেন্স কালেকশানে জুটে গেল। লোকাল পুলিশ হোস্টেল থেকে হিঞ্জলা পাহাড়ের গায় অবধি অনেকগুলো জায়গা চষে ফেলে। তারপর পাওয়া গেল সেই প্রমাণ লোপাটের প্যাকেটটা, যা সঞ্জিত তাড়াহুড়োয় ওখানেই ফেলে এসেছিল “কেউ দেখতে পাবে না এখানে”, ভেবে। নীরার হাত বাঁধার দড়ি, সঞ্জিতের রুমাল যেটা নীরার মুখে গোঁজা ছিল এবং শ্বেতার আর রিনির খাতার পাতা দুটো, যাতে মন্ত্র লিখে নেবে ভেবেছিল ওরা। যে জলের বোতল থেকে নীরা জল খেয়ে ঘুমে ঢুলে পড়েছিল, সেই বোতলটাও ওই প্যাকেটেই পাওয়া গেল। যতই হোক, স্কুলের ছাত্র তো, অত পোক্ত বুদ্ধি নয় বলেই এত সহজে ধরা পড়ল এই ছোট-ছোট ভুলের জন্য। এবার শুধু বাকি জিজ্ঞাসাবাদ ও সনাক্তকরণ।
নীরার বডি পোস্ট-মর্টেমের জন্য চলে গেল। ওর বাবা শক পেয়ে ধপ করে সিঁড়িতে বসে পড়তেই, প্রিন্সিপাল ও বাকি ছাত্ররা ওঁকে ধরে নীচে নিয়ে গেল। উনি হতভম্ব হয়ে কথা বলার শক্তি হারিয়ে ফেললেন। ভেবেই পেলেন না, তার মতন সাদামাটা মানুষের, কে, কোন কারণে এত বড় ক্ষতি করল। অনেক পরে একটু সুস্থ বোধ করতে, ওঁকে নিজের গাড়ি করে প্রিন্সিপাল ওঁর বাড়িতে পৌঁছে দিলেন। নীরার মা শুকনো মুখে আগের থেকেই গেটে দাঁড়িয়ে ছিলেন। ওই অবস্থায় নীরার বাবাকে দেখে প্রচণ্ড ঘাবড়ে গিয়ে বলে উঠলেন, “কী গো কী হল তোমার? নীরা কই? আজ পাঁচদিন ধরে নীরার খোঁজে যাচ্ছ, ওকে আজকেও না নিয়ে ফিরে এলে? কেমন বাবা তুমি? নিজের মেয়ের খোঁজও করতে পারো না?” আশেপাশের লোকেরা ততক্ষণে উঁকিঝুঁকি মারতে শুরু করে দিয়েছে।
প্রিন্সিপাল ব্যাপারটার গুরুত্ব বুঝে আগে নীরার বাবাকে ঘরের ভিতর নিয়ে গেলেন। নীরার বাবার ফ্যালফ্যালে দৃষ্টি দেখে উনি ভেবে পাচ্ছিলেন না কী করবেন আর কীভাবে খবরটা দেবেন নীরার মাকে। দুজনেরই যেন বোধশক্তি লোপ পেয়েছে। ঠিক ওই সময়েই, একজন সাব ইন্সপেক্টর নিজের মোটরসাইকেল করে নীরাদের বাড়ি এসে, দরজা খোলা দেখে, ভিতরে এসে, নীরার খবরটা প্রথম ওর মাকে জানালেন।
প্রচণ্ড শকে আর অবিশ্বাসে নীরার মা চেঁচিয়ে উঠে বললেন, “কী যা তা বলছেন? আমার মেয়েকে খুঁজে দিতে পারছেন না আর এখন বলছেন মারা গিয়েছে?” তারপর নীরার স্কুলের প্রিন্সিপালকে দেখে বললেন, “আপনি তো প্রিন্সিপাল, আপনিই বলুন না এঁকে, যে নীরা কোথায় আছে?” প্রিন্সিপাল মাথা নামিয়ে বললেন, “উনি যথার্থই বলেছেন আপনাকে মিসেস গোমেজ, নীরা আর আমাদের মাঝে নেই। ও পাঁচদিন হল মারা গিয়েছে।” নীরার মা চিৎকার করে অজ্ঞান হয়ে গেলেন আর সেই চিৎকারেই নীরার বাবা যেন সম্বিৎ ফিরে পেলেন।
জিজ্ঞাসাবাদ
প্রাথমিক প্রশ্ন-উত্তরে চৌকিদারের উপর সন্দেহ হতেই, কেন্দ্রাপাড়ার বড় পুলিশ অফিসার তাকে তুলে নিয়ে চলে গেলেন লোকাল থানায় জিজ্ঞাসাবাদ করবেন বলে। ক্রমে-ক্রমে জিজ্ঞাসাবাদ আর অল্প চাপ দিতেই চৌকিদার ভয়ের চোটে সবই প্রায় বলে দেয়। কেন্দ্রাপাড়ার ইন্সপেক্টর জীপ আর লেডি কনস্টেবল নিয়ে বেরিয়ে পড়লেন শ্বেতা আর রিনির বাড়ির উদ্দেশে। হতভম্ব বাবা-মায়েদের সামনে দিয়ে শ্বেতা আর রিনিকে লেডি কনস্টেবলরা তুলে জীপে ভরল। ছোট কলোনি, তাও লোকের ভীড় বাড়তেই থাকল। লোকেরা ঘটনার আকস্মিকতায় রিনি আর শ্বেতার বাবা-মায়েদের মতোই হতভম্ব হয়ে গেল। শ্বেতার আর রিনির বাবা-মায়েরা খুবই ভালো এবং তাদের সন্তান এরকম কাজ করতে পারে না, সেটা সবাই বলাবলি করতে করতে আরও দুটি পরিবার হতভম্ব হয়ে বসেছিল। তারাও ভেবে পাচ্ছিল না তাদের সন্তান খুন করার মতন জঘন্য অপরাধ করতে পারে। রিনির মা খালি বলে যাচ্ছিলেন, যে উনি বুঝছিলেন যে মেয়ের কিছু হয়েছে। আর শ্বেতার মা পাথরের পুতুলের মতন বসে ভাবছিলেন। এই শ্বেতাই ওঁর মেয়ে কি না। ওদিকে শ্বেতা পাগলের মতন আচরণ করছিল। উনি কী করে সামলাবেন মেয়েকে কিছুতেই ভেবে পাচ্ছিলেন না।
রিনি আর শ্বেতাকে আলাদা রুমে নিয়ে গিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু হল। সব চাইতে আগে ভাঙল শ্বেতা। ওর সারা গা জ্বরে পুড়ে যাচ্ছে, কখনও কাঁদছে, কখনও বলছে যে ও কিছু করেইনি; কাঁদতে-কাঁদতে শ্বেতা অজ্ঞান হয়ে গেল। ওকে পুলিশ স্টেশন থেকে লোকাল হাসপাতালে ভর্তি করা হল। রিনি তখনও মুখ খোলেনি। ওর বিশ্বাস, সঞ্জিত ওদের তিনজনকেই ঠিক এই পরিস্থিতির থেকে বের করে নিয়ে যাবে। চৌকিদার আর শ্বেতার জবানবন্দিতে এবার সঞ্জিতের খোঁজ করতে লাগল পুলিশ। বেশি দেরি লাগল না, পুলিশ সঞ্জিতকে ওর বাড়ি থেকেই অ্যারেস্ট করল। সঞ্জিতের বাবা বহু চেষ্টা করেও রুখতে পারলেন না। উনি সাথে সাথে নিজের অফিসের উকিলকে ফোন করলেন এবং তৈরি হতে বললেন।
উকিল অভিকর্ষ সেনগুপ্ত
ঠান্ডা মাথায় সঞ্জিতের বাবা, সমরজিৎ মিত্র, নিজের গাড়ি করে, নিজের অফিসের উকিলকে নিয়ে এক জায়গায় পৌঁছালেন। টিমটিমে আলোর একটা ঘরে, বহু ফাইলের গাদার মধ্যে গেলাস হাতে যে বসে আছে, সে ওঁর উকিলের অ্যাসিস্টেন্ট ও জুনিয়র, উকিল অভিকর্ষ সেনগুপ্ত। লোকটি যেমন ধুরন্ধর, চতুর তেমনই তুখোড় বুদ্ধির অধিকারী। সমরজিতের কোম্পানির বহু সমস্যার সমাধান আগে চতুরতার সাথে অভিকর্ষ নানা উপায় বের করে সল্ভ করতে সাহায্য করেছেন। ঘরের নোংরা পরিবেশেও বসতে দ্বিধা করলেন না মিস্টার মিত্র, সঞ্জিতের বাবা।
ছেলেকে ছাড়াতে হবে এবং নির্দোষ প্রমাণ করতে হবে, এই দুটো শর্ত দিলেন মিস্টার মিত্র, উকিল সেনগুপ্তকে। পরিবর্তে, উনি উকিল সেনগুপ্তকে ওড়িশাতে তার নিজস্ব প্রাইভেট চেম্বার আর ওড়িশা হাই কোর্টের দুটি কেস লড়তে সুযোগ করে দেবেন বললেন। অভিকর্ষ মুখ তুলে দেখলেন, হাসি দিলেন, বললেন, “হয়ে যাবে।”
(অন্তিম পর্ব)
ডাক্তার নীল সামন্ত
বডি ব্যাগে নীরার নিথর দেহটা পোস্ট-মর্টেমের জন্য টেবিলে রাখা রয়েছে। ডাক্তার সামন্ত এসে জিপটা খুলেই আতঙ্কে শিহরিত হয়ে গেলেন। অজান্তেই ওঁর মুখ থেকে বেরিয়ে এল, “ওহ মাই গড”। দুর্গন্ধে নাড়িভুঁড়ি উঠে আসবার জোগাড়। মাস্ক পরেও গন্ধ নেওয়া যাচ্ছে না। আস্তে আস্তে বডিটাকে ব্যাগ থেকে বের করে ভালো করে পরিষ্কার করতে শুরু করলেন উনি। পরিষ্কার করছেন আর ভাবছেন, “ইশশ, চোখ দুটোর কী অবস্থা হয়েছে, লাল আর বীভৎসভাবে খোলা।” বডি পরিষ্কার হয়ে গেলে উনি দেখলেন চোখ দুটো যেন ওঁর দিকেই স্থিরভাবে তাকিয়ে আছে। এক মিনিটও ওঁকে চোখের আড়াল হতে দিচ্ছে না। যেন ওঁর পুরো কাজটাকেই পর্যবেক্ষণ করছে। ক্রমে ওঁর অস্বস্তি এমনভাবে বেড়ে গেল, যে উনি নীরার চোখের পাতা বন্ধ করতে তৎপর হলেন। যতবার বন্ধ করতে চেষ্টা করেন, চোখ দুটো খোলাই থেকে যায়। উনি বিরক্ত হয়ে নিজের কাজে মন দিলেন। তাড়াতাড়ি পোস্ট-মোর্টেমটা করে রিপোর্ট দিতে হবে। চাপ আছে উপর থেকে। ওঁর আর ভালো লাগে না। রিসার্চ করতে যেতে চেয়েছিলেন বিদেশে আর আজ কী করতে হচ্ছে। ভাগ্যের ফের এমনই যে ফরেনসিকসে এসে লাশ কাটতে হচ্ছে। নীরার বডি থেকে কিছু জরুরি তথ্য নোট করতে করতে রাত হয়ে গেল ডক্টর সামন্তর। আগামীকাল এসে বাকিটা করবেন ভেবে, বাড়ির পথে রওনা দিলেন।
গাড়ি পার্কিংয়ে ঢোকাতেই, ওঁর বাড়ির চৌকিদার জানাল দুজন বাবু রাত ৯টা থেকে এখনও বসে আছেন। জরুরি দরকার বলছেন। ডক্টর সামন্তর বিরক্ত লাগে, এই এত রাতে কে আবার দেখা করতে এল, কে জানে। ঘরে ঢুকতেই দুজন ভদ্রলোক নিজেদের পরিচয় দিলেন।
প্রথমজন উকিল অভিকর্ষ সেনগুপ্ত আর দ্বিতীয়জন মিস্টার সমরজিৎ মিত্র। বিশেষ দরকারে এঁরা হিঞ্জলা থেকে এসেছেন। ডক্টর সামন্তকে নীরার পুরো ঘটনা বিস্তারিত জানালেন উকিল অভিকর্ষ সেনগুপ্ত। ডক্টর সামন্ত একটু অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, “কীভাবে আপনাদের সাহায্য করতে পারব এই ব্যাপারে, ঠিক বুঝতে পারছি না।” সেনগুপ্ত হেঁ-হেঁ করে বললেন, “দেখুন, ছেলেটাকে আর তার দুই বান্ধবীকে বাঁচাতে হবে। পোস্ট-মর্টেম আর রিপোর্ট, দুই-ই আপনার হাতে। বুঝতেই তো পারছেন কী বলতে চাইছি।” সামন্ত ভয়ঙ্কর রেগে বললেন, “বেরিয়ে যান, এখুনি এখান থেকে চলে যান, নাহলে আপনাদের বিরুদ্ধে আমি কোর্টে জবানবন্দি দেব।”
সমরজিৎ মিত্র চোখের সামনে একটি ব্ল্যাঙ্ক চেক সাইন করে টেবিলে রাখলেন। বললেন, “ডক্টর, শুনেছি আপনি রিসার্চ করতে চাইতেন বরাবর? আপনার বিদেশে থেকে সেটা পুরো করবার ইচ্ছে ছিল?” ডক্টর সামন্ত হাঁ করে চেয়ে রইলেন। সমরজিৎ মিত্র, “শুধু টাকার অঙ্কটা বসিয়ে নেবেন”, এই বলে সেনগুপ্তকে নিয়ে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেলেন।
কেস ও রায়
যথাসময়ে কোর্টে কেস উঠল। ছাত্রদের আর শ্বেতার জবাবন্দিকেও, উকিল অভিকর্ষ সেনগুপ্ত নস্যাৎ করে দিলেন। ডক্টর সামন্তর টেস্টিমনি আর পোস্ট-মর্টেমের রিপোর্ট অনুসারে চৌকিদারকে নীরার ধর্ষণের চার্জে অ্যারেস্ট করা হল। শ্বেতা সেটা দেখে ফেলেছিল তাই মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেছে, ও স্টেবল নয়, তাই ওর কথা কোনো সুস্থ মানুষের কথা নয়, প্রমাণিত করে দিলেন উকিল অভিকর্ষ সেনগুপ্ত।
চৌকিদারেরই সব চাইতে বেশি সুযোগ ছিল, এবং ও সঞ্জিতের রুমাল, ইত্যাদি চুরি করেছিল এটা ওকে দিয়ে মোটা টাকার বিনিময়ে কবুল করিয়ে দিলেন উকিল সেনগুপ্ত। চৌকিদার নিজেই যে অপরাধটা করেছে সেটা ও অকপটেই স্বীকার করল। চূড়ান্ত রায়ে ধর্ষণ এবং খুনের অপরাধে যাবজ্জীবন কারাবাস হল চৌকিদারের। কোনোমতেই যাতে ওর ‘বেইল’ না হয় সেটাই দাবি করলেন সেনগুপ্ত।
জীবনের ছন্দ
শ্বেতাকে ট্রিটমেন্টের জন্য ভালো মনস্তত্ববিদের কাছে একমাস অন্য একটি শহরে, স্যানেটারিয়ামে রাখা হল। কোর্টের অর্ডারে ওকে কাউন্সেলিং শুরু করানো হল। সঞ্জিতকে ওর বাবা ব্যাঙ্গালোরের এক স্কুলে প্রচুর টাকা খরচ করে ভর্তি করে দিলেন। রিনিকে নিয়ে ওর বাবা-মা জলপাইগুড়িতে চলে গেলেন। সেখানে রিনিকে কাউন্সেলিং করানোর সাথে সাথে কনভেন্টে ভর্তি করে দিলেন ওর বাবা। উকিল অভিকর্ষ সেনগুপ্ত নিজের চেম্বারে নতুন কেসের আশায় নতুনভাবে শুরু করলেন। এখন আর সেই টিমটিমে বাতিযুক্ত ঘর নেই, যেখানে গাদা গাদা ফাইলে ভরা থাকত। এখন উকিল সেনগুপ্ত নিজের গোছানো অফিসে বসেন, সেখানে ওঁর সেক্রেটারী সব ফাইলগুলি সুন্দরভাবে ক্যাবিনেটে ঢুকিয়ে রাখে।
ডক্টর সামন্ত বিদেশে গিয়ে রিসার্চ শুরু করলেন আর নিজের অপূর্ণ ইচ্ছা পূর্ণ করতে নানা এক্সপেরিমেন্টের মাঝে নিজেকে হারিয়ে ফেললেন। পড়াশোনা শেষ করে সঞ্জিত নিজের বাবার অনেকগুলো কোম্পানির একটিতে এইচ আর ম্যানেজার হল। যদিও কোম্পানির অধিকাংশ কাজ সঞ্জিতই দেখে। রিনি পড়াশুনা শেষ করে কোম্পানি সেক্রেটারী হয়ে এখন অন্য জায়গায় চাকরি করে। এক মাস নয় প্রায় এক বছর থেরাপির পর শ্বেতা পড়াশুনা শেষ করতে তৎপর হল আর বাড়ির অমতে মুম্বাই চলে গিয়ে ওখানে কলেজে প্রফেসর হল।
গোমেজ পরিবার
নীরার পার্থিব শরীরটা নীরার বাবাকে সপে দেওয়া হয়েছিল। শেষ জানা গিয়েছিল, নীরার বাবা ওখানেই রয়ে গিয়েছেন। মেয়ের বডি নিয়ে সেই যে চলে গেলেন, আর কারোর সাথে যোগাযোগ রাখলেন না। ভলান্টারি রিটায়ারমেন্ট নিয়ে বাড়িতেই থাকেন, কারণ নীরার মায়ের বোধবুদ্ধি লোপ পেয়েছে। কিছুই বুঝতে পারেন না। নীরার জামাকাপড়ের স্তূপের সামনে থম মেরে বসে থাকেন দিনের পর দিন। ডাকলে সাড়া দেন না, রান্না-খাওয়া কিছুই করতে পারেন না। সবই নীরার বাবাকে করতে হয়। আর নীরার মায়ের সব খেয়াল ওঁকেই রাখতে হয়। আরও একটা আশ্চর্য জিনিস হল, নীরার বাবাকে নীরার বডিটা দিয়ে দেওয়ার পর ওটার ফিউনারেল কিছুতেই হল না। বডিটাই বা কোথায় গেল সেটাও কেউ জানে না। পুরো গোমেজ পরিবার রাতারাতি কেমন যেন অন্ধকারে ডুবে গেল।
ওঁর বেশি পয়সা ছিল না, তাই সব জেনেবুঝেও ওঁকে চুপ করেই থাকতে হয়, কোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে চ্যালেঞ্জ জানাতে পারেন না। চূড়ান্ত রায়ের দিন কিন্তু নীরার মা নীরার বাবাকে শেষ কয়েকটি কথা বলেছিলেন, “ওরা আসবে দেখো, ওদের ফিরতে হবেই। হয়তো ওরা কোর্টের বিচারে শাস্তি পায়নি, কিন্তু ওদেরও সেইদিন আসবে যা ওদের তাড়িয়ে নিয়ে আসবে এখানে।” বলেই সেই যে চুপ করেছিলেন, আর কোনোদিন মুখ খোলেননি। তবে উনি নীরার বিছানায় বা ঘরে কাউকে যেতে দিতেন না। নিজেই থাকতেন ওখানে।
বর্তমানে
কিন্তু মিস্টার গোমেজ আজ সকাল থেকেই নীরার মায়ের মুখে স্মিত হাসিটি অনেকদিন পর দেখে অবাক হলেন। ওঁর স্ত্রী নিজের থেকেই বললেন, “তুমি এত নোংরা জামা পরে আছো কেন? যাও, বাড়িতে লোক আসবে, ভালো করে তৈরি হও।” এবং কথা বলা এখানেই শেষ হল না ওঁর। উনি নিজের মনে বলেই চললেন, “ইশশ, নীরা বিছানাটা কী নোংরা করে রেখেছিস রে… নে আমি জামাকাপড়গুলো পাট করে দিচ্ছি, বিছানাটা গুছিয়ে দিচ্ছি, তুই আর নোংরা করিস না। বাড়িতে লোক আসছে কী বলবে বল তো? এত বড় মেয়ে ঘর গুছোতে পারে না?” নীরার বাবা এত বছর পরে ওঁর স্ত্রীকে একসাথে এত কথা বলতে দেখে হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে রইলেন। উনি ভেবে পেলেন না কোন লোক আসবে। কাদের আসবার কথা বলছে নীরার মা।
ওরা চারজন
আজ সাতটা বছর ওদের মধ্যে কোনো যোগাযোগ ছিল না। শুধু এই গত কয়েকদিন ঘুম না হওয়া আর শ্বেতার মৃত্যু ওদের চারজনকে প্রচণ্ড আতঙ্কের দিকে ঠেলে দিয়েছিল। ওরা বুঝতে পারছিল, শ্বেতার মতন ওদের পরিণতিও এক হবে যদি ওরা এখনও তাড়াতাড়ি কোনো ব্যবস্থা না করে। পরিস্থিতি ওদের একে অপরের সাথে যোগাযোগ করতে বাধ্য করেছিল। তাই আজ হিঞ্জলাতে ওরা সবাই একসাথে হয়েছে, সবারই প্রচণ্ড ঘুম পাচ্ছে, কারণ তারা গত পাঁচ দিন ধরে চোখের পাতা এক করতে পারেনি। ওরা সবাই একে অপরকে দেখে খুশি হওয়ার বদলে চমকে ওঠে। কী চেহারা হয়েছে এ কদিনে সবার। চোখ কোটরে বসে গিয়েছে। ঘুম না হওয়ার কারণে চোখ টকটকে লাল আর বার বার চোখে বন্ধ হয়ে এলেও, কীসের আতঙ্কে ঘুমোতে পারছে না।
রিনি আর সঞ্জিত পায় পায় এগিয়ে যায় সেখানে যেখানে কখনও সঞ্জিত, শ্বেতা, নীরা আর রিনিদের বাড়ি ছিল। নিজেদের বাড়ির গলিগুলো ছাড়িয়ে রাস্তা পার করে রাস্তার শেষে ওদের পিছনে-পিছনে ডাক্তার সামন্ত ও উকিল সেনগুপ্তও একই পথে এগিয়ে যেতে থাকেন। বাড়িগুলো অচেনা। টাউনশিপের চেহারা বদলে গিয়েছে। শুধু গলির শেষের বাড়িটা জীর্ণ অবস্থায় নিজের অস্তিত্বের জানান দিচ্ছে। বাড়িটায় কত বছর রং হয়নি। বাগান আগাছায় ভরে উঠেছে। প্রাণহীন নিস্তব্ধতা বিরাজমান। কী নোংরা, অদ্ভুত গুমোট একটা পরিবেশ চারিধারে। সন্ধে হয়। ডাক্তার সামন্ত আস্তে করে ভাঙা কাঠের গেটটা খুললেন। গেটটাও যেন বিরক্ত হয়ে প্রচুর আওয়াজের সাথে খুলতে নারাজ হয়। বহুদিন কেউ আসে না বোঝাই যায়। কে জানে বাড়ির ভিতরের লোকগুলো নিজেদের নিত্যকারের প্রয়োজনের জিনিসগুলো কীভাবে আনে? আদৌ কি বাড়িতে কেউ আছে? আশ্চর্য, আলো জ্বলছে না কেন? কেউ কি তাহলে নেই? এইসব সাত-পাঁচ কথা ওদের চারজনের মনেই উঁকি দিয়ে যায়।
ভয় কাটাতে ওরা একে অপরের হাত ধরে। গেটের ভিতরে গিয়ে মোবাইলের আলোয় দরজায় টোকা দেয়। এক একটা মুহূর্ত তখন ওদের কাছে এক একটা যুগ বলে মনে হয়। প্রায় দশ মিনিট পর ছোট একটা মোমবাতি হাতে একজন জীর্ণ, শীর্ণ, হেবি পাওয়ারের চশমা পরা বৃদ্ধ একজন মানুষ দরজা খোলেন। ওরা চারজন ওঁকে দেখে মনে যতটা না ধাক্কা খায়, উনিও ওদেরকে এত বছর পর চিনতে পেরে ততধিক হতবাক হয়ে যান। আর একটু হলেই ওঁর হাত থেকে মোমবাতিটা পড়েই যাচ্ছিল। অতিকষ্টে সামলে নিয়ে খানিকটা নিজের মনেই বললেন, “তো…ম…রা? নীরার মা বলছিল বটে কেউ আসবে, কিন্তু ওর কথার তো কোনো মানে হয় না, তাই বুঝতে পারিনি। যাক গে, এসো এসো…”
ওরা অন্ধকারে, কিছু ভালো করে দেখতে পাচ্ছিল না। নীরার বাবা, মিস্টার গোমেজ, মোমবাতিটা টেবিলের উপর রাখতেই ঘরের নোংরা, ধুলোমাখা, ঝুলে ভরা মলিনতা চোখে পড়ল ওদের। কতদিন বাড়িতে রং হয়নি, পরিষ্কার করা হয় না। জায়গায় জায়গায় ঝুল জমে আছে। সোফার উপরের কাপড়টা সাংঘাতিক ময়লা। ওদের গা ঘিন ঘিন করে ওঠে।
রিনি জিজ্ঞেস করল, “আঙ্কেল, আলো নেই?”
নীরার বাবা মাথা নেড়ে বললেন, “না, নীরার মা পছন্দ করে না। তাই আলো কাটিয়ে দিয়েছি। তোমাদের কোথায় যে বসতে দিই।”
সঞ্জিতের গলার কাছে কীসের যেন একটা চাপ হয়েছে, কিছুতেই কথা বলতে পারছে না। রিনির পা দুটো যেন লোহার মতন ভারী, ডাক্তার সামন্তর হাত দুটো থর থর করে কেঁপেই চলেছে। উকিল সেনগুপ্ত অজানা কিছুর একটা আশঙ্কায় সঞ্জিতের হাতটা কিছুতেই ছাড়তে পারছেন না, ওঁর মুখে সবসময়ের লেগে থাকা তাচ্ছিল্যের হাসিটা, কোথায় যেন মিলিয়ে গিয়েছে। চারিদিকের হাওয়া যেন ভারী আর গুমোট হয়ে উঠেছে। তবুও ওরা যেন কীসের একটা হেস্তনেস্তর নেশায় সেই অজানা, অদ্ভুত পরিবেশ থেকে বেরিয়ে আসতে পারছে না। ওদের আজ জানতেই হবে ওরা কেন ঘুমোতে পারছে না হঠাৎ এত বছর পর।
সঞ্জিত অনেক কষ্টে, জোর করে গলা খাঁকারি দিয়ে বলে ওঠে, “না না কিছু চাই না। অনেক বছর পর এসেছি আমরা, তাই মনে হল দেখা করে যাই। কিন্তু আন্টি আলো পছন্দ করেন না কেন?”
মিস্টার গোমেজ বললেন, “ওই যবে থেকে নীরা বাড়ি ফিরেছে, তবে থেকেই তো ওর মা নীরা ঘুমোবে বলে আলো কাটিয়ে দিতে বলল। মেয়েটা যে অনেকদিন ঘুমোয়নি, নিশ্চিন্তে ঘুমোতে পারবে তাই।”
উপসংহার
ওরা চারজনেই একসাথে চমকে উঠে বলে, “ফিরেছে? ফিরেছে মানে কী?”
“যেদিন কেসের চূড়ান্ত রায় বেরোল, ওইদিনকেই নীরাকে আমি বাড়ি ফিউনারেলের জন্য নিয়ে এলাম। কিন্তু ফিউনারেল হল না। কিছুতেই নীরার চোখ বন্ধ হল না।” মিস্টার গোমেজ আনমনে বলে চললেন, “Closed eyes at death is associated with peacefulness and restfulness, and opened eyes with discomfort or even fear” নীরার মা তো নীরাকে জড়িয়ে ধরে বলল, ‘ঘুমিয়ে পড় মা, এই তো আমরা বাড়িতে এসে গিয়েছি, আর কেউ তোকে ঘুমোনো থেকে আটকাতে পারবে না। কিন্তু নীরা কিছুতেই ঘুমাল না। দুই দিন পরে নীরা বুঝল ও আমাদের কাছে আছে, তারপরে ঘুমাল, আসলে ওর ভয় কাটতে সময় লেগেছিল তো।”
ডাক্তার সামন্ত আর থাকতে না পেরে চিৎকার করে বললেন, “হোয়াট? বাট হাউ ইজ দিস পসিবল? যখন আমি পোস্ট মর্টেম করছিলাম, তখন ওর রাইগর মর্টিস অলরেডি সেট করে গিয়েছিল, চোখের পাতা দুটো বন্ধই করা যাচ্ছিল না। সি ওয়াজ অলরেডি ডেড ফর দ্য লাস্ট টুয়েন্টি ফোর আওয়ার্স।”
মিস্টার গোমেজ একটি ছোট হাসি দিলেন।
ওরা আতঙ্কের চরম সীমায় পৌঁছে গিয়েছে তখন। ঘরের হাওয়াতে পচা একটা গন্ধ ছড়িয়ে পড়ছে আস্তে আস্তে। গন্ধটা বহু পুরোনো আর ওদের ভীষণ চেনা। সাময়িক নিস্তব্ধতা ভেঙে রিনি বলে ওঠে, “চলো আমরা বাইরে যাব। আর থাকব না এখানে।”
“আন্টির সাথে দেখা না করেই চলে যাবে? এভাবে তো যেতে পারবে না। নীরার মা খুব কষ্ট পাবেন। এসো।” বলে মিস্টার গোমেজ ওদের পাশের রুমের দিকে আসতে ইশারা করেন।
ওরা সবাই যাব না যাব না করেও কেমন যেন মন্ত্রমুগ্ধের মতন নীরার বাবার পিছন-পিছন পাশের ঘরের দিকে এগিয়ে যায়। গন্ধটা আরও সাংঘাতিকভাবে ছড়িয়ে পড়ছে। ওদের গা গুলিয়ে উঠেছে। সাত বছরের পুরোনো স্মৃতি রিনির আর সঞ্জিতের চোখের সামনে ভেসে উঠছে।
মিস্টার গোমেজ মোমবাতি হাতে ঘরের দরজাটা খুলতেই ওদের গা গোলানো বেড়ে গেল। নোংরা গন্ধ, জামা কাপড়ের স্তূপ, আর স্তূপের পাশে একজন মহিলা বসে আছেন মেঝেতে। তার উশকো-খুশকো চুল, মুখে হাসি। মহিলা যে নীরার মা, সেটা বুঝতে ওদের কষ্ট হয় না। উনি স্নান করেননি কতদিন যেন। কী নোংরা শাড়িটা। কিন্তু আশ্চর্য, উনি এই পচা দুর্গন্ধটার মধ্যে কী করে বসে আছেন কে জানে।
মোমবাতির ক্ষীণ আলোয় দেখা যাচ্ছে বিছানাতে লেপ চাপা দেওয়া কেউ পাশ ফিরে ঘুমোচ্ছে। ঘরটা কত বছর যে পরিষ্কার করা হয়নি তা ওই ক্ষীণ আলোতেও বোঝা যাচ্ছে। গা গোলানো গন্ধটা এতই প্রবল যে ওরা তাড়াতাড়ি নাকে রুমাল চাপা দেয়। ওদের চোখে তখন আতঙ্ক। ওরা নিজেদের ভয় কিছুতেই চাপা দিয়ে রাখতে পারছে না। বিছানায় লেপ চাপা দেওয়া অবয়বটা হঠাৎ পাশ ফিরল। তার মুখ দেখে ওরা চেঁচিয়ে উঠল— “নীইইইই রাআআ”।
নীরার চোখ দুটো বন্ধ, মাথাতে ঘন চুল, গালে হাত, ঠিক যেমন ওকে ওরা স্কুলে দেখেছিল। ওর বয়স একটুকুও বাড়েনি। পুরোপুরি ওদের দিকে ফিরতেই ওরা বিস্ফারিত চোখে দেখল, নীরার ছেঁড়া-ছেঁড়া লেপের ভিতর দিয়ে ওর শরীরের নীচের অংশটা দেখা যাচ্ছে। একটা কঙ্কাল।
“শশশশহহহ… নীরা ঘুমোচ্ছে...”, বলে ওঠেন নীরার মা, “তোমরা কখন ঘুমোবে? হুম?” বলেই নীরার মা টেনে-টেনে জোরে-জোরে হাসতে থাকেন।
নীরার চোখ দুটো তখনই দপ করে খুলে যায়। চোখ দুটো টকটকে লাল, দৃষ্টি স্থির। ওর ঠোঁটের গোড়ায় একটা অদ্ভুত এক পৈশাচিক নিষ্ঠুর হাসি...
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন