ফ্লোর নম্বর– ২

পিয়ালী ঘোষ

অল্প ভাড়ায় খুব দারুণ একটা বাড়ি পেয়ে গেছে শ্রেয়া। অফিসের গেস্ট হাউজটা ছেড়ে দিতে হবে বলে শ্রেয়া হন্যে হয়ে একটা থাকার জায়গা খুঁজছিল। কারোর সঙ্গে শেয়ারে ঘর নেওয়ার ইচ্ছেটাও ছিল না। দৈবক্রমে বাজারে সনাতন বাবুর সঙ্গে দেখা। উনিই বললেন ওঁর একটি ফ্লোর খালি পড়ে আছে, এই বাজার থেকে ২ কিলোমিটার হেঁটে গেলেই হবে। এক দেখায় ছিমছাম একটা ঘর, কিচেন আর টয়লেট মিলিয়ে এই ওয়ান-রুম সেটটা দারুণ পছন্দসই। জানলায় পর্দা লাগানো, আর গিজার আছে। দেখে খুব ভালো লাগল শ্রেয়ার। আবার বাড়িটির নীচে সুন্দর পাঁচিল ঘেরা বাগান আছে যাতে বেশ কিছু ফুলগাছ লাগানো। ফুলগাছ শ্রেয়ার খুব প্রিয়।

সেদিনই সনাতন বাবুর সঙ্গে গিয়ে বাড়ি অগ্রিম টাকা দিয়ে বুক করে আসে শ্রেয়া। দু’দিন পর এক সন্ধ্যায় সনাতন বাবুর সাথে এসে নিজের বিছানা আর সুটকেস নিয়ে বাড়ির পজেশন নিয়ে নেয়। ঘরটা পরিষ্কার করে গুছিয়ে নিয়ে নিজের মতন করে সাজাতে থাকে শ্রেয়া। যতদিন না বাসন কেনা হচ্ছে ততদিন অফিসেই খাবে আর রাত্রের খাবারটা ফেরবার পথে কিনে আনবে, এই ভালো। আপাতত মাটিতে মাদুর পেতে শতরঞ্চির উপর শুতে হল ডিনার সেরে।

বই পড়াটা তার বরাবরের অভ্যাস। কখন ঘুমিয়ে পড়েছিল শ্রেয়া মনে নেই। মাঝরাতে কেমন যেন দম বন্ধ হয়ে যাচ্ছে মনে হল আর সাথে ঘামে চপচপে ভিজে যাওয়া জামা, ঘরের ভিতর গুমোট ভাবটা চেপে বসছে ধীরে ধীরে। “বোধহয় কারেন্ট চলে গিয়েছে”, শ্রেয়া উঠে বসে কোনোরকমে ভাবল, “ওহ, জানলা খোলা হয়নি।” কোনোমতে মাথার গোড়া থেকে টর্চ নিয়ে উঠে দাঁড়াতেই টর্চের আলোটা পাখার দিকে যেতে শ্রেয়া অবাক হল, “আশ্চর্য, কারেন্ট তো রয়েছে। তাহলে এরকম মনে হল কেন?” শ্রেয়া বিশেষ গা করল না। পরিশ্রমের কারণে ক্লান্ত শ্রেয়া, একটু জল খেয়ে আবার ঘুমিয়ে পড়ল।


পরের দিন, শপিং করতে ব্যস্ত ছিল শ্রেয়া, তাই বাড়িটার কথা অত ভাবেনি। গতরাত্রে একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি হওয়ায় শ্রেয়া সকালে ঠিক করল পর্দাগুলো কেচে, আজ রাতে জানলা খুলে শোবার চেষ্টা করবে। মনে হতেই, শ্রেয়া পর্দাগুলো টেনে সরিয়ে দিল। এ কী? এ তো দেওয়াল। পর্দার পিছনে জানলা নেই? কী করে হতে পারে? শ্রেয়া দৌড়ে রান্নাঘরে ঢুকে আতঙ্কে চিৎকার করে উঠল। ও এই দু দিনে কেন দেখতে পায়নি যে রান্নাঘরেও জানলা নেই? বাথরুমে ঢুকেও একটা ছোট ভেন্টিলেটার ছাড়া কিছু দেখেনি শ্রেয়া। দৌড়ে গেল বাথরুমে। কমোডের উপরে চড়ে, আতঙ্কে ঘামে ভিজে যাওয়া শ্রেয়া ভেন্টিলেটারে হাত রাখে। এ কী? ভেন্টিলেটারের বাইরে আলো দেখা যাচ্ছে না কেন? অথচ ও তো সনাতন বাবুর সঙ্গে এসেছিল যখন, তখন বাইরে থেকে ছোট একটা বারান্দা দেখেছিল, তাহলে সেটা কোন ফ্লোরে?

এবার রীতিমতো ভয় পেয়েছে শ্রেয়া। তাড়াতাড়ি নিজের ব্যাগ গুছোতে থাকে সে, এখুনি বেরিয়ে যাবে এখান থেকে। ঘরের দেয়ালগুলো যেন ততক্ষণে ওকে ঘিরে ধরেছে। আর একটুকুও জায়গা বাকি নেই যাতে নিজেকে ভালো করে দাঁড় করাতে পারে শ্রেয়া। কোনোমতে নিজের সুটকেসটা নিয়ে বাইরে বেরোতে গিয়ে মরচে ধরা দরজাটা কিছুতেই খুলতে পারে না ও। কিন্তু দরজাটায় মরচে ধরলো কখন? লাথি, ধাক্কা দেওয়া, আঁচড়ে-কামড়েও, রক্তাক্ত হাতে যখন শ্রেয়া অজ্ঞান হয়ে মাটিতে পড়ে যায়, তখন সনাতন বাবু বাজারের প্রায়ান্ধকার গলিতে দাঁড়িয়ে ইন্দ্রর সঙ্গে কথা বলছিলেন। ওঁর নাকি একটি ওয়ান রুম সেট আছে এবং ইন্দ্র ওঁর সঙ্গেই আজ গিয়ে দেখে আসতে পারে। ইন্দ্র ঠিকানাটা নিয়ে রাখে এবং সনাতন বাবুকে বলে, “আমি কালকেই আপনাকে ফোন করে আপনার সাথেই বাড়িটা দেখতে যাব। এখন একটু ব্যস্ত আছি।”

দম বন্ধ হয়ে চোখ দুটো ঠেলে বেরিয়ে আসছে শ্রেয়ার। জ্ঞান ফিরলেও, নিশ্ছিদ্র অন্ধকার যেন গ্রাস করছে তাকে ধীরে ধীরে। আতঙ্কে জোর করে শ্রেয়া উঠে দাঁড়ায়। ঘরের দেয়ালগুলো যেন আর এক তিল ও জায়গা ছাড়েনি শ্রেয়ার জন্য। আজ দেয়ালগুলোর অভিপ্রায় যেন এগিয়ে এসে শ্রেয়াকে মেরে ফেলা। শেষ শক্তি সঞ্চয় করে দরজার নীচে শ্রেয়া জোরে জোরে ধাক্কা দিতে থাকে। একনাগাড়ে, যতক্ষণ পারে, শ্রেয়া ধাক্কা দেয়।

ইন্দ্রর অভ্যাস, নিজেই একা গিয়ে নতুন জায়গা ঘুরে দেখা। কী মনে হতে ইন্দ্র ভাবল ঠিকানাটা যখন আছেই দেখে আসি বাড়িটা। অ্যাপার্টমেন্টের কাছে পৌঁছে ইন্দ্র দেখল পুরোনো তিন ফ্লোরের বিল্ডিং। সনাতন বাবুর তো দ্বিতীয় ফ্লোর। আশ্চর্য বাইরে থেকে দেখা যাচ্ছে না কেন? সিঁড়ি দিয়ে আস্তে-আস্তে চড়তে থাকে ইন্দ্র। ফ্ল্যাট নম্বর — ২। পর পর চারবার উপর নীচে করল ইন্দ্র। একতলা আছে — ফ্ল্যাট নম্বর ১, তিনতলা আছে — ফ্ল্যাট নম্বর ৩। কিন্তু ২ নম্বর ফ্ল্যাট তো নেই! আশ্চর্য্য, দ্বিতীয় ফ্লোরই নেই। নীচে নেমে ভালো করে দেখল ইন্দ্র। না তো, নেই, সত্যিই নেই। একতলাতে জিজ্ঞেস করবে ভেবে বেল দিতে গিয়েই ঘেন্নায় হাতটা সরিয়ে নিল, মাকড়সার জালে ভর্তি। যেহেতু দিনের আলো ছিল, ভালো করে দেখল ইন্দ্র, সিঁড়িটা নোংরায় ভরা, যেন অনেকদিন পরিষ্কার করা হয়নি। তিনতলায় উঠে গিয়ে দেখল দরজা আছে কিন্তু বিশাল একটা মরচে ধরা তালা ঝুলছে। বহুদিন ধরে কেউ বসবাস করে না বোঝাই যায়।

নাহ, মাঝখানে কোনো ফ্লোরই নেই, অথচ সনাতন বাবু যে বললেন ওঁর ২ নম্বর ফ্লোর? তাহলে কি ইন্দ্র ভুল শুনল? আর যদি সেই ফ্লোরটা আছে তাহলে তার অস্তিত্ব বাইরে থেকে বোঝা যাচ্ছে না কেন?

হঠাৎ ওকে চমকে দিয়ে একটা গুম-গুম শব্দ এক নাগাড়ে হয়ে যেতে থাকে। দোতলা আর একতলার মাঝে কোনো একটা জায়গায় কেউ ক্রমাগত আওয়াজটা করে চলেছে। ইন্দ্র পালাতে গিয়েও পালাতে পারল না। ভয় লাগলেও ইন্দ্র কান খাড়া করে শোনে। আওয়াজটার কাছে কান লাগিয়ে শুনল, কেউ যেন ধাক্কা দিচ্ছে। ইন্দ্র,“যা থাকে কপালে”, এই ভেবে একছুটে নীচে গেল আর একটু আগেই বাগানে পড়ে থাকা যে নোংরা শাবলটা দেখেছিল, সেটা তুলে এনে ওই আওয়াজটা লক্ষ্য করে চালিয়ে দিল। প্রাণপণ শক্তি দিয়ে শাবল দিয়ে খুঁড়তে থাকল ইন্দ্র।

একটু পরেই ভয়ে পিছিয়ে গেল ইন্দ্র। রক্তাক্ত একটা হাত সবে করা গর্তটা থেকে বেরিয়ে এল, সাথে দম আটকে যাওয়া কাশির আওয়াজ। কেউ যেন বুকভরে নিঃশ্বাস নিতে চাইছে কিন্তু পারছে না। ঘাবড়ে গেলেও তাড়াতাড়ি হাত চালাল ইন্দ্র। গর্তটা একটু বড় হতেই হাত ঢুকিয়ে টেনে আনল মৃতপ্রায় শ্রেয়ার শরীর। প্রায় সাথে সাথেই জুড়ে গেল দেওয়াল, বন্ধ হয়ে গেল ফোকর, হতাশ এক আক্রোশে বাড়িটা গুমরে উঠতে লাগল। গোঁ-গোঁ আওয়াজে সিঁড়িতে কান পাতা দায় হয়ে উঠল। এক মিনিটও আর সময় নষ্ট না করে শ্রেয়াকে পাঁজাকোলা করে তুলে নিয়ে রাস্তায় দৌড়োতে দৌড়োতে একটা রিক্সা পেয়ে গেল ইন্দ্র। রিক্সাওয়ালার চেষ্টাতেই কাছাকাছি একটি নার্সিং হোমে, শ্রেয়াকে ভর্তি করিয়ে পুলিশের কাছে জবানবন্দি দিল ইন্দ্র।

— বেঁচে গেছেন মশাই, আপনার সাহস আছে মাইরি। নইলে ওই বাড়িতে একা গিয়েছেন? পুলিশের উক্তিতে ইন্দ্র অবাক হয়।

— তা বাবু, আইপনার সাহস আসে আজ্ঞে, ওই বাড়ি থিক্যা কেডাই বাইঁচা ফিরে আসে নাই বটেক, রিক্সাওয়ালা বলে।

— ও বাড়ি অভিশপ্ত। সনাতন বাবু একা ছেলেপুলে দেখলেই সশরীরে দেখা দেন। কত প্রাণ যে হারিয়ে গিয়েছে ও বাড়িতে, কী বলি। ম্যাডামের ভাগ্য ভালো যে আপনি ওঁকে বাঁচাতে পেরেছেন। পুলিশের হাবিলদার বুঝিয়ে বলে ইন্দ্রকে।

— একটু বুঝিয়ে বলবেন কী ব্যাপার? আমি তো কিছুই জানি না, এই তো চাকরির সূত্রে গতকাল এসেছি এখানে। একটু নিরিবিলি বাড়ি খুঁজছিলাম। ইন্দ্র জিজ্ঞেস করে।

— ওই বাড়িতে কোনোকালে ৩টি ফ্লোর তৈরি করা হয়, মানে একটি লুকানো অর্থাৎ হিডেন ফ্লোর ছিল, যা বাইরে থেকে দেখা যেত না। পুরো তিনটি তলার মালিক ছিলেন সনাতন বাবু। শুধু একটি দরজা বই মাঝের ফ্লোরটিতে জানলা, বারান্দা ছিল না। ভাড়া দেওয়ার জন্য সিঙ্গেল কাউকে খুঁজছিলেন উনি। কোনো খামতি থেকে যাওয়ায়, এই ফ্লোরটি একদিন সনাতন বাবু থাকাকালীন হুড়মুড়িয়ে ওঁর ঘাড়ে এসে বসে। উনি মারা যান এবং মৃত্যুর পরে ওঁর শরীরটাও খুঁজে পাওয়া যায় না। সেই থেকে ওঁকে প্রায়ই বাজারে অনেকেই দেখতে পেয়েছে। এভাবে প্রচুর কম বয়সী ছেলেমেয়েদের সঙ্গে উনি দরদাম করে ভাড়ায় নিয়ে আসেন। ওঁর সঙ্গে এলে সব কিছুই ঠিক দেখতে পাবেন, কিন্তু এই যেমন আপনি আলাদা এলেন, তখনই চোখে ধরা পড়ে বাড়ির রহস্য। বাড়িটা পুলিশ বারংবার সীল করে দেওয়া সত্ত্বেও কীভাবে যেন সীল থাকে না। পুলিশ ইন্সপেক্টর জানান ইন্দ্রকে। ইন্দ্র অবিশ্বাস্য দৃষ্টিতে ফ্যাল-ফ্যাল করে চেয়ে থাকে।


ইন্দ্র মনঃস্থির করে চাকরিটা আর নেবে না এবং পরেরদিন নিজের বাড়ি রওনা দেয়। শ্রেয়ার বাবা-মা আতঙ্কগ্রস্ত, ক্ষত-বিক্ষত মেয়েকে নিয়ে সন্ধ্যাবেলায় রওনা দিলেন যখন, বাজারে তখন ভীড় আর সনাতন বাবু যথারীতি নতুন ভাড়াটিয়ার সঙ্গে দরদাম করছেন, ওঁর ফ্লোর নম্বর ২ যে খালি আছে...

অধ্যায় ১ / ৯
সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%