পিয়ালী ঘোষ
— কীরে পার্থ আজ বাড়ি যেতে হবে তো? দাঁড়া, ডাক্তারবাবুর সাথে কথা বলে আসছি তোর কাছে।
আবেগজড়িত কণ্ঠে রিমি কথাগুলো বলে পার্থর মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়। পার্থর দুর্বল হাসিটা দেখে, ডাক্তারের কাছে সবকিছু বিস্তারিতভাবে জেনে নিয়ে, ওকে তাড়াতাড়ি ডিসচার্জ করিয়ে হাসপাতাল থেকে নিয়ে যেতে চায় রিমি।
— ডাক্তারবাবু, আসতে পারি?
— হ্যাঁ হ্যাঁ, আসুন। আজ পার্থকে ডিসচার্জ করে দিচ্ছি, বলেন ডাক্তার সুব্রত রায়, বিখ্যাত সার্জন ও অ্যাক্সিডেন্টাল ট্রমা ডিপার্টমেন্টের হেড, অল ইন্ডিয়া ইনস্টিটিউট অফ মেডিকেল সাইন্সেস, দিল্লি। “কিন্তু যাওয়ার আগে একটু আমাদের কিছু গাইডলাইন্স দেওয়া আছে সেগুলো কীভাবে মেনে চলবেন একটু আমার জুনিয়রের থেকে বুঝে নেবেন।”
— ঠিক আছে। অস্ফুট স্বরে বলে রিমি। তারপর ধীর পায়ে এগিয়ে যায় জুনিয়র ডাক্তারের কেবিনের দিকে। কথা বলে, বিল আর ডিসচার্জ ফর্মালিটিজ পুরো করে রিমি পার্থকে আস্তে আস্তে বাঁ হাতটা ধরে ধরে হুইল চেয়ারে করে গাড়ির দরজা খুলে পিছনের সীটে বসায় আর নিজে পার্থর বাম পাশে বসে, ওর মুখটা নিজের দিকে ঘুরিয়ে নিয়ে ড্রাইভারকে গাড়ি চালাতে বলে।
সারাটা রাস্তা অনর্গল বকবক করে চলে রিমি পার্থর সঙ্গে, যাতে পার্থ শুধু ওর দিকেই তাকিয়ে থাকে। বাড়ির দুষ্টু মেনি, ফুলের নতুন চারাগাছগুলো, এমনকী পার্থর নিজের কামরাটা অবধি রিমি নিজের হাতে কীভাবে যত্ন করে সাজিয়েছে থেকে শুরু করে, ওর প্রিয় খাবার নিজের হাতে রান্না করে এসেছে বাড়িতে গিয়ে পার্থকে খাওয়াবে বলে, সেটাও রিমি জানায়। পার্থও হাসিমুখে সব অক্লান্তভাবে শুনে যেতে থাকে, আনন্দগুলো হাঁ করে রিমির মুখের দিকে তাকিয়ে কল্পনা করতে থাকে।
গাড়ি বাড়ির দরজায় পৌঁছতেই রিমি দরজা খুলে বামদিক থেকে টুক করে নেমে পড়ে আর পার্থর হাত ধরে ওই দরজা দিয়েই নামিয়ে দেয়। পার্থ বাম দিকে কলোনির গার্ডেনগুলো দেখতে থাকে। দিনের শেষের ম্লান আলোয় যতটুকু বুকভরে বাইরের হাওয়ার গন্ধ নেওয়া যায়, একসঙ্গেই যেন নিয়ে নিতে চায় পার্থ। আস্তে আস্তে ওর মুখটা বামে গেটের দিকে ঘুরিয়ে জড়িয়ে ধরে নিয়ে যায় রিমি, আর বামদিকের দরজা দিয়ে সোজা পার্থর আর রিমির শোয়ার ঘরে এনে ওকে বসিয়ে দেয় বামে রাখা আরামকেদারাতে। বলে, “এখানে বস আমি জামা কাপড় চেঞ্জ করে দিচ্ছি।” জামা কাপড় চেঞ্জ করিয়ে রিমি খেতে দেয় পার্থকে। খাবার গরম করে নিয়েই এসেছিল সাথে। ছোট টেবিলটা খাটের বামদিক থেকে তুলে পেতে দেয় আর বাম হাতে খাইয়ে দিতে থাকে পার্থকে। খাবার শেষে পার্থর ওষুধগুলো ওর বাম হাতে দিয়ে, ওর মুখটা বাম হাতে মুছিয়ে দিয়ে, ওর সঙ্গে এসে রিমি বাম পাশে বসে।
পার্থ জিজ্ঞেস করে, “তুমি খাবে না?” রিমি বলে, “আমি পরে খাব। আগে তুই ঘুমো।” কিছুক্ষণের মধ্যেই ওষুধের প্রভাবে পার্থ ঘুমিয়ে পড়তেই, রিমি আস্তে করে ওকে চাদর চাপা দিয়ে, খাবার ঘরে গিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বসে। সামনে এখনও বড় লড়াই আসন্ন। কতদিন… কতক্ষণ পারবে এভাবে লড়তে, ও নিজেও জানে না... কিন্তু হার মেনে নেবে না...
পার্থ আর রিমি বিয়ের পর হানিমুনে কাশ্মীর গিয়েছিল। ফেরবার পথে, জম্মু অবধি গাড়ি বুক করিয়ে নিয়েছিল ওরা, কারণ, ওখানে এক রাত্রি থেকে, পরের দিন রাজধানী ধরে দিল্লি ফিরবে। রাস্তায় গাড়ির ড্রাইভার গান চালিয়ে, জোরে গাড়ি চালাচ্ছিল। বহুবার বারণ করা সত্ত্বেও সে শোনেনি, বৃষ্টি ভেজা পাহাড়ি রাস্তায় তাড়াহুড়ো করে ঘুরতে গিয়ে গাড়ি খাদে পড়ে যায়। রিমির আজও মনে আছে সেই ভয়ঙ্কর দিনটার কথা। কতক্ষণ ওরা সেভাবে পড়েছিল জানে না। যখন পিছন থেকে স্থানীয় লোকেরা এসে ওদের অনেক কষ্ট করে উদ্ধার করে, তখন রিমি অজ্ঞান আর পার্থর মুখ গাড়ি ডান পাশে কাত হয়ে পড়ার ফলে ডান দিকে সম্পূর্ণ ভাবে চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে গিয়েছে।
প্রায় তিন মাস হাসপাতালে থেকে, ডাক্তারদের অসীম ধৈর্য্য ও পরিশ্রমের ফলে এবং রিমির কঠিনতম সাধনা ও সেবায় আজ পার্থ সুস্থ। কিন্তু সম্পূর্ণরূপে নয়। ভগবানের দয়ায় ডান পাশে পার্থর চোখ, কান দুটোই অক্ষত আছে। কিন্তু ডাক্তার বলেছেন সব কিছু ওষুধ দিয়ে হয় না। সেবার সঙ্গে ভালোবাসা, পরিচিত পরিবেশ সবই লাগে। তাই আজ ডিসচার্জ করিয়ে রিমি পার্থকে নিজের কাছে, বাড়িতে নিয়ে আসে। বাড়ি এসে পার্থ যে খুশি হয়েছে তা আজ বিকেলেই রিমি বুঝেছে।
পার্থ আর রিমি ছোট থেকেই একই শিশু সদনে বড় হয়েছে। দুজনেরই বাবা-মা নেই, তাই নিজেদের পায়ে দাঁড়িয়েই বিয়ে করবার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল ওরা। রিমি তাই ভীষণভাবে আঁকড়ে ধরেছে পার্থকে, ওকে বাঁচাতেই হবে, যেন যমে-মানুষে টানাটানি। অবশেষে জিতে গিয়েছে রিমি, কিন্তু এরপরের পরীক্ষাটা পাশ করতে হবেই হবে। রিমি পারবে, পারতেই হবে। এখন শুধু অপেক্ষা... ভাবতে ভাবতেই মানসিকভাবে প্রচণ্ড ক্লান্ত রিমি, খাবার টেবিলের ডান দিকে খাবার চেয়ারের উপরেই শরীরটা এলিয়ে দেয়...
— রিমি, কই তুমি রিমি? এত অন্ধকার কেন? কোথায় তুমি? ফ্যাসফ্যাসে, ধরা গলায় পার্থ বলে ওঠে, এই ঘরের দরজাটা কোথায় গেল? দেওয়াল ধরে, হাতড়ে-হাতড়ে রিমিকে খুঁজতে শুরু করে পার্থ— দরজাটা বাম দিকে থাকার কথা ছিল কিন্তু নেই কেন? দেখি... এই তো, এই তো... ডান দিকে? তাহলে যে দরজাটা... আচ্ছা, রিমি কই? সাড়া দিচ্ছে না কেন?
— উউফফফ, ডানদিকে কী অন্ধকার, গভীর অন্ধকার, আমার ঘাড় ঘুরছে না কেন ডানদিকে? কিছু দেখা যাচ্ছে না কেন? ও রিমি... ভয় করছে তো আমার, রিমি, ওহ, এই তো এখানে আলো জ্বলছে, তাও কী হালকা, কী এটা ডানদিকে নরম পশমের মতন? ওঃ একটা চেয়ার... কিন্তু ডানদিকে কেন? ডানদিকে কেউ জিনিস রাখে নাকি? একদম পছন্দ না আমার, রিমি তো সেটা জানে, তাহলে ডানদিকে চেয়ারটা রাখবে কেন? ডানদিকটা কী ভয়ঙ্কর... যেন জীবনের সব গভীর অতলে ডুবে গিয়েছে ওই ডানদিকেই... দেখতেও তো পাচ্ছি না ঘাড় ঘুরিয়ে, ঘাড়টা যেন কেউ আটকে রেখে দিয়েছে। কী ঘেন্না হচ্ছে! না না ঘেন্না নয়, ভয় ভীষণ ভয়, কী দমবন্ধকর অস্বস্তি! ডানদিকটা মিশমিশ করছে অন্ধকারে… ওইদিকটাতে রাখতে বারণ করেছি তো সব কিছু। নার্সটা কথা শোনে না একদম... বামদিকটা এত পরিষ্কার, পরিচ্ছন্ন, দিনের আলোর মতন উজ্জ্বল। কী সুন্দর গোছানো হাসপাতালের বামদিকটা। কেন যে নার্স বামদিকে সব কিছু রাখে না? নার্স নিজেই বা কোথায় গেল? পার্থ আপন মনেই কথাগুলো বিড়বিড় করে নীচু আওয়াজে বলে চলে।
চকিতে আবার ডানদিকে ঘাড়টা ঘোরাতে চেষ্টা করল পার্থ। ঘাড় ঘুরল না।
— বেশ হয়েছে ডানদিকে ঘোরেনি আমার ঘাড়টা। ওদিকটা অন্ধকারের রাজ্য। দেখবই না। এই তো বাম দিকে বড় সোফাটা রয়েছে। বসে পড়ি? খুব ভয় করছে, ভাল্লাগছে না… কিছুইইইই ভাল্লাগছে না... ডানদিকটা ভালো লাগছে না। কতবার বলেছি নার্সকে সব বামদিকেতে রেখো, নার্স হাসপাতালটা এরকম করে সাজালো কেন? হঠাৎ করে সব বামদিকগুলো চেনা আর ডানদিকগুলো অচেনা অচেনা... কাল ডাক্তারবাবুকে বলতে হবে। বলতে হবে রিমিকে দিয়ে পুরো জায়গাটা সাজাতে... হাসপাতালে সব আগের মতন চাই, নার্সের দ্বারা হবে না।
এই তো সামনেই ফলের ট্রে, পার্থ ছুরিটা তুলে নিল। বামদিকের দেওয়ালে ছুরি দিয়ে খুঁড়ে খুঁড়ে দরজা তৈরি করতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে পার্থ। কিছুক্ষণ পর ক্লান্ত, কমজোর দেহটা নিয়ে মাটিতে বসে পড়ে সে।
— ডান পাশে কী যেন একটা শব্দ হলো না? ঘাড় ডানদিকে ঘুরছে না তাই চোখের কোণ দিয়ে দেখতে চেষ্টা করে পার্থ। ও বাবা, কী একটি যেন এগিয়ে আসছে, হামাগুড়ি দিয়ে, কী যেন বলছে, ডানদিকে থেকে কী যেন বলছে, কানে হাজারটা ঝিঁ-ঝিঁ ডেকে উঠছে। পোকার মতন হাজারটা ভয়, অস্বস্তি কিলবিল করছে ডানদিকে। ভীষণ ভয় করছে, নার্স… নার্স, ডাক্তারবাবু… ও ডাক্তারবাবু, রিমি কই গেলে রিমি? ডানদিকটা কেন যে আছে… ডান কানে কেউ কিছু বলছে... কিন্তু শুনতে চাই না ওই কানটা দিয়ে... নার্স... নার্স আমাকে বাঁচাও, রিমি আমাকে বাঁচাও রিমি... ডানদিকে ওটা কী ফটফট আওয়াজ হচ্ছে? কী গরম লাগছে, উফফ ডানদিকে পাখাটাও নেই... আলো নেই, কিছু নেই। জল চাই আমার জল... কী করি? আমি কী করি? কী জঘন্য হয় এই ডানদিক, অচেনা, নোংরা, ভয়, অন্ধকার আর লুকানো উদ্ভট প্রাণীরা থাকে... অন্ধকারে একটা অদ্ভুত কিছু এগিয়ে আসছে... কাছে এসে গেছে... খুউউব কাছে... খুউউউউব কাছে, তার গরম নিঃশ্বাস যেন কানের উপর আগুনের হল্কার মতন জ্বালিয়ে দিচ্ছে।
মরিয়া হয়ে ছুরিটা চালিয়ে দেয় পার্থ। একবার, দুবার, তিনবার, বার বার অজস্রবার। আঃ আঃ... আআআ... ডান কানের মধ্যে অজস্র ঝিঁ-ঝিঁ পোকা ডেকে ওঠে। ঘষটাতে ঘষটাতে পার্থ ঘরের বামদিকে গিয়ে লুকিয়ে পড়ে বড় সোফাটার গায়ে, টেবিলে ক্লান্ত মাথাটা রেখে দেয়।
— কেউ দেখতে পাবে না কেউ আসবে না এদিকে। আর ভয় নেই, শান্তি, শান্তি... কাল নার্সকে বলব আলোর দিকটা ভালো, আর বামদিকেই আলো থাকে। বামদিকেই থাকতে হয়… কিন্তু সেই অদ্ভুত প্রাণীটা এগিয়ে আসছে যে ডানদিক থেকেই। পার্থ আর থামতে পারে না... ছুরিটা দিয়ে আঘাতের পর আঘাত হানতে থাকে নিজের ডানদিকে, ডান হাত, কাঁধে, ঘাড়ের কাছে। আঃ আঃ... আআআ...
মর্মান্তিক চিৎকারে চারিদিক ছারখার হয়ে যায়।
পাড়াপড়শিরা দৌড়ে আসে, পুলিশে খবর দেয়। ক্রমশঃ গোটা পাড়া জানতে পারে এবং ভেঙে পড়ে রিমিদের বাড়ির চারিধারে। জানলা দিয়ে উঁকিঝুঁকি মেরে এমন অবিশ্বাস্য দৃশ্য দেখে শিউরে ওঠে পড়শিরা। পুলিশ এসে এরকম নারকীয় দৃশ্য দেখে স্তম্ভিত। ক্ষতবিক্ষত দুটি দেহ পড়ে আছে ঘরের মেঝেতে, পাখার হাওয়ায় চতুর্দিকে উড়ে বেড়াচ্ছে ছেঁড়া ছেঁড়া কাগজের টুকরোগুলো। সামনেই টেবিলের উপর মাথা রেখে পড়ে আছে পার্থ। অস্বাভাবিক রক্তক্ষরণের চিহ্ন তার শরীরের ডানদিকে, সর্বত্র। তার একটু দূরেই ডানপাশেই পড়ে আছে রিমি নামে একটি দেহ, প্রাণ নেই, চোখ-মুখ-ঠোঁটটা ফালাফালা হয়ে গিয়েছে, চোখের মণিগুলো বেরিয়ে ঝুলে আছে আর মুখের কোনো চিহ্ন নেই। পুলিশ তাড়াতাড়ি মৃতদেহটা চাপা দিয়ে দেয়। সিনিয়র পুলিশ ইন্সপেক্টরের হাতে তখন টেবিলে পড়ে থাকা ফাইল, যাতে এখন মাত্র একটি পাতা লেগে, যাতে লেখা আছে :
পেশেন্টের নাম পার্থ মিত্র, ডিসচার্জ সামারির কিয়দংশ, যেখানে ফ্লোরেসেন্ট গোলাপি দিয়ে আলাদা করে চিহ্নিত করা আছে—
The patient is showing extreme signs of Dextrophobia— A form of obsessive—compulsive disorder, where in some people can’t stand to have objects at the right side of their body. The patient needs to be handled with extreme care. Specific conditions can lead to extreme results— অর্থাৎ, এমন একটি উদ্বেগজনিত ব্যাধি, যাতে রোগী মানসিক বিকারে আক্রান্ত হয়ে ডান দিকে রাখা কোনো জিনিস সহ্য করতে পারেন না। রোগীকে অতিশয় সাবধানে ও যত্নে রাখতে হবে। নির্দিষ্ট কারণগুলি ভয়ঙ্কর পরিণতির দিকে নিয়ে যেতে পারে।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন