পিয়ালী ঘোষ
শরীর থেকে, সোনালী আভা ঠিকরে বেরোচ্ছে, সারা ঘরময় কাঁচা সোনালী রংয়ের হলুদ আলো ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ছে। প্রতিটা রোমকূপ থেকে ঘন, সোনালী, পশমের ন্যায় লোমগুলো চেপে বসছে শরীরের জায়গায়-জায়গায়। একটানা, একভাবে, ভারী আওয়াজে মন্ত্রোচ্চারণ সারা ঘরের দেওয়ালে দেওয়ালে ধাক্কা খেয়ে ফিরে-ফিরে আসছে। যেন কোনো দুর্বার, অদম্য শক্তিকে কেউ শুধু মন্ত্রের জোরে বন্ধনে আষ্টেপৃষ্টে বেঁধে ফেলতে চাইছে…
*****************
— লাল রংয়ের আসনে, ঘরের দক্ষিণদিকে মুখ করে বসে, রক্ত চন্দনের ফোঁটা লাগিয়ে, প্রথমে বীজমন্ত্র বলতে হবে ১০০০ বার। সাথে প্রণাম মন্ত্র। সর্বশেষে নৃসিংহ অষ্টোত্তর শতনাম জপতে হবে। এইভাবে ৪০ দিনে ৫ লক্ষ বার এই জপ সম্পূর্ণ করলে ‘নৃসিংহ সর্বসিদ্ধিপ্রাপ্তি’ হবে তুমি। রোজ ঘিয়ের প্রদীপ জ্বালিয়ে, ২টো লাড্ডু, ২টো লবঙ্গ, ২টো মিঠে পান এবং একটি নারিকেল, প্রসাদস্বরূপ নৃসিংহ দেবতাকে অর্পণ করতে হবে। এই বিলক্ষণ মন্ত্রটি সঠিকরূপে জপ করতে পারলে সকল তন্ত্র-মন্ত্রের বাধা, ভূত-পিশাচের ভয়, অকালমৃত্যু ভয় বা দুরারোগ্য ব্যাধি থেকে মুক্তি পাওয়া যাবে।
— কী বলো ভাই, এই মন্ত্রের এত গুণ?
— হ্যাঁ, গুণ যেমন আছে, কোনো ব্যতিক্রম হলে, মহাবিপদও হতে পারে। উনি যদি একবার কুপিত হন, তোমার উপর নিজের ক্রোধ প্রকাশ করলে কিন্তু মুশকিল। কিছুভাবেই মুক্তি নেই। এটা ভালো করে বুঝে নিয়ে মন দিয়ে এগিয়ে যাও ভায়া... আমি নিজে কখনও চেষ্টা করিনি, কিন্তু কয়েকজনকে করতে শুনেছি এই শক্ত পুজো...
বাসে বাড়ি ফিরতে ফিরতে, দুজন লোকের মধ্যে হওয়া “নৃসিংহদেব বা নরসিংহ দেব”-এর পুজোর বিধির কথা চুপচাপ শুনছিল অজয়। মনে মনে দৃঢ়বদ্ধ হচ্ছিল তত। যেভাবেই হোক নৃসিংহ দেবের আরাধনা করে, সর্বশক্তিমান হয়ে ওঠার প্রবল ইচ্ছেটা দমন করতে পারছিল না। একবার চেষ্টা করে দেখলে হয়। মনে মনে সেই লোকগুলোর কথা বার বার নাড়াচাড়া করতে করতে, সেইদিনই বাজারে গিয়ে নৃসিংহ দেবের পাঁচালী কিনে আনে অজয়।
*****************
— আর যদি ভুল হয়ে যায় কোথাও, ইচ্ছাকৃত নয়, কিন্তু মানুষ তো, উচ্চারণ বা মন্ত্রের ভুল তো হতেই পারে, কী হবে তাহলে?
— পাঁচালির শেষে মন্ত্র আছে ওঁকে শান্ত করার জন্য। তখন সেটা পড়তে হবে। কিন্তু ঠিক কোন ধরনের বা কীরকম পরিণাম হবে ভুল মন্ত্রের, সেটা আমি জানি না... বুঝে শুনে করো ভাই, এসব জিনিস সহজ নয়...
অজয় শেষবারের মতো ওই লোকগুলোর কথা ঝালিয়ে নিল মনে মনে…
*****************
সহজ নয়, এই কথাটা জেনেই অজয় এগিয়ে যায়। একা থাকে, কেউ বারণ করবার বা বাধা দেওয়ার মতো মানুষ নেই। তা ছাড়া প্রমোশনটাও আটকে আছে আজ ৪ বছর হল। কিছু তো একটা উপায় করতেই হবে। যা থাকে কপালে, এই ভেবে, অফিস থেকে ১ মাসের ছুটি ম্যানেজ করে অজয়। বাকিটা না হয় টেনে নেবে সে। তারপর চলতে থাকে বদ্ধ বেডরুমের মধ্যে, নিরন্তর সাধনা। প্রথমে দেখে দেখে পড়তে আর বলতে বলতে বেশ কিছুটা আয়ত্ত করা গেল। পাঁচ দিনের মাথায় পুরোটা মুখস্থ করে নিয়ে বিধিস্বরূপ পুজো শুরু করল সে।
তাড়াতাড়ি ফল পাওয়ার আশায়, অজয় রোজ একবার করে পুজো করার বদলে দিনে দু’বার করে বিধিবৎ পুজো করতে থাকে। ধীরে-ধীরে দুর্নিবার ইচ্ছাশক্তিকে জয় করে নেওয়ার প্রবল ইচ্ছেতে আর সর্বশক্তিমান হয়ে ওঠার অদম্য লোভেই, মন্ত্রোচ্চারণের দিকে অন্যমনস্কতা বাড়তে থাকে তার। ক্রমশঃ সে বিধিবৎ পুজো করার কথা ভুলে যেতে থাকে। মিষ্টি বাসি হয়ে পচে যায়, রোজ আর নতুন মিষ্টি কেনা হয় না। অধিকাংশ সময় অধৈর্য হয়ে অর্পণ করার ফল কিনতে যেতে তার বাধে। সব ভুলে তার শুধু ওই একটাই লক্ষ্য থাকে, ৪০ দিনে ৫ লক্ষবার মন্ত্র জপ করতে হবে।
নিরন্তর তার ঘর থেকে শোনা যায়—
ওঁ উগ্রং বীরং মহাবিষ্ণু জ্বলন্তম সর্বত মুখম
নৃসিংহ ভীষনংভদ্রা মত্যুরমৃত্যু নমামমহ্য আহোম।।
ওঁ নমস্তে নরসিংহায় প্রহ্লাদহ্লাদ দায়িনে,
হিরণ্যকশিপোর্বক্ষ শিলাটঙ্ক নখালয়ে ইতো নৃসিংহ পরতো
নৃসিংহ যতো যতো যামি ততো।।
নৃসিংহ বহির্নৃসিংহ হৃদয়ে নৃসিংহ নৃসিংহমাদিং শরনং প্রপদ্যে।
তব করকমল বরেনখ মদ্ভুতশৃঙ্গং দলিত হিরণ্যকশিপু তনুভৃঙ্গম
কেশব ধৃত নরহরি রূপ জয় জগদীশ হরে।
তারপর অষ্টোত্তর শতনাম।
খিদে-তেষ্টা ভুলে গিয়ে, তার শুধু একটাই ধ্যানজ্ঞান— ৫ লক্ষবার মন্ত্র উচ্চারণ শেষ করতে হবে।
*****************
ঘরের মেঝেতে ভরে গেছে ছোট-ছোট পোকা আর অসংখ্য পিঁপড়ে। আঙুলের ডগায়-ডগায় ব্যথা, “আহঃ কষ্ট হচ্ছে, কষ্ট হচ্ছে”… থামলে চলবে না... অজয় মন্ত্রপাঠ করেই চলে ব্যথা চেপে রেখে। একদিন অচিরেই হাতের নখগুলো চামড়া ভেদ করে ধারালো ফলার মতন বেরিয়ে আসে। হাতের চামড়া থেকে ঝরতে থাকে ফোঁটা-ফোঁটা রক্ত। “আঃ আহঃ”— অসহ্য ব্যথায় চিৎকার করে ওঠে অজয়। তবুও হাল ছাড়ে না।
খুব কষ্ট হচ্ছে, জ্বলে পুড়ে যাচ্ছে সারা শরীর, আঙুলে-আঙুলে ব্যথা করছে, জিভ আড়ষ্ট, শুকিয়ে আসছে... নিঃশ্বাস নিতে গেলে অদ্ভুতভাবে নাক কেমন জ্বালা করছে...
ঠিক তখনই পায়ের নখের তীক্ষ্ণ শলাকা বিঁধে যায় পায়ের গোছের মধ্যে। ব্যথায়, মন্ত্র ভুলে চেঁচিয়ে ওঠে অজয়। কিন্তু সে দমে যাওয়ার পাত্র নয়। তাকে লক্ষ্যে স্থির থাকতে হবে। কষ্ট সহ্য করে এগিয়ে যেতে হবেই। এই ভেবে—
পুনরায় শুরু করে মন্ত্রোচ্চারণ—
নৃসিংহ বহির্নৃসিংহ হৃদয়ে নৃসিংহ নৃসিংহমাদিং শরনং প্রপদ্যে।
তব করকমল বরেনখ মদ্ভুতশৃঙ্গং দলিত হিরণ্যকশিপু তনুভৃঙ্গম
কেশব ধৃত নরহরি রূপ জয় জগদীশ হরে।
ওঁ নমস্তে নরসিংহায় প্রহ্লাদহ্লাদ দায়িনে,
হিরণ্যকশিপোর্বক্ষ শিলাটঙ্ক নখালয়ে ইতো নৃসিংহ পরতো
নৃসিংহ যতো যতো যামি ততো।।
নৃসিংহ বহির্নৃসিংহ হৃদয়ে নৃসিংহ নৃসিংহমাদিং শরনং প্রপদ্যে।
তব করকমল বরেনখ মদ্ভুতশৃঙ্গং দলিত হিরণ্যকশিপু তনুভৃঙ্গম
কেশব ধৃত নরহরি রূপ জয় জগদীশ হরে।
*****************
বাইশ দিনের মাথায়, ক্রূদ্ধ গর্জনে ভরে যায় ঘর... হুংকারে হুংকারে ঘর ভরে ওঠে। কাছাকাছি কোনো বাড়ি না থাকায় কোনো আওয়াজই কারোর কানে পৌঁছায় না তেমন। হুংকার সরে গিয়ে সাথে সাথেই হঠাৎ তীব্র আর্তনাদ হয় মানুষের আওয়াজে। ব্যাথায় মরিয়া হয়ে, তীব্র যন্ত্রনা সহ্য না করতে পেরে কেউ চেঁচিয়ে উঠেছে। অসহ্য ব্যথা সহ্য না করতে পেরে এই প্রথম চোখ খুলে ভালো করে তাকায় অজয়। নিজের হাতের দিকে আর পায়ের দিকে তাকিয়ে ভয়ে তার গলা দিয়ে তীব্র আর্তনাদ বেরিয়ে আসে। প্রায় তিরিশ দিনের শেষে, এই প্রথম, অনেক কষ্টে, প্রচণ্ড যন্ত্রণা সহ্য করে, অজয় ঘরের দরজা খুলে পাশের ঘরে আয়নার সামনে দাঁড়ায়।
স্তম্ভিত, ভীত, হতবাক অজয় চিৎকার করে ওঠে, না না চিৎকার নয়, চাপা হতাশ গর্জন ছাড়া কিছুই বের হয় না ওর গলা থেকে। আয়নায় এটা কে? কে এটা? দু-হাতে আর পায়ে বেরিয়ে এসেছে ধারালো নখের সারি আর শুকিয়ে যাওয়া রক্তের ধারা, গায়ে চাপ চাপ সোনালী-খয়েরি লোমে ভরা, মাথায় খাপছাড়া সোনালী-কালো কেশর মুখের চোয়াল লম্বাটে আর নাকের নীচে সারি-সারি, কালো-কালো, ছোট-ছোট ফুটো। আয়নায় যে অজয়ের দিকে অদ্ভুতভাবে চেয়ে আছে, আজ সে অজয় নয়, একটি অর্ধ-মনুষ্যরূপী নরসিংহ।
— না না এ হতে পারে না। কী করে এমন হল? কী করে? কিছুতেই বুঝতে পারে না অজয়। চিৎকার করে বলে ওঠে অজয় কিন্তু তার আওয়াজে একটি ভয়ঙ্কর সিংহের গর্জন ছাড়া কিছুই বেরোয় না। দৌড়ে পুজোর ঘরে গিয়ে পাঁচালী খুলে ধরতে চেষ্টা করে। অনেক কষ্টে শেষের পৃষ্ঠায় পৌঁছাতে পারে। শান্ত করতে হবে নৃসিংহ দেবকে। ভুল হয়ে গিয়েছে... বড় ভুল, ক্ষমা চাইতে হবে। প্রায়শ্চিত্ত করতে হবে তাকে। পাঁচালী খুলে মন্ত্রটা জোরে-জোরে পড়তে শুরু করে।
কিন্তু এ কী? আওয়াজ কই? চাপা গর্জন ছাড়া কিছুই তো বেরোচ্ছে না। আবার চেষ্টা করতে হবে। আবার... বার বার... কিন্তু নাহ, আওয়াজ নেই, ভাষা নেই... মনে মনে মন্ত্রোচ্চারণ করতে গিয়ে দেখল তার গলা দিয়ে ঘড়ঘড় শব্দ ছাড়া আর কিছুই বার হচ্ছে না। আয়নার সামনে গিয়ে আস্তে আস্তে জিভটা বের করে দেখল অজয়। গোলাপী আর কাঁটা-কাঁটা এত লম্বা জিভ।
এই প্রথম ভীষণ একটা অনিশ্চয়তার ভয় গ্রাস করে অজয়কে। এ কোন জাঁতাকলে পড়ে গিয়েছে সে? হাউ হাউ করে কাঁদতে থাকে অজয়। সে বুঝতে পারে তুষ্ট না করতে পারলে, নৃসিংহ দেবের অভিশাপের থেকে তার মুক্তি নেই। বারংবার অজয় মনে মনে ক্ষমা চাইতে থাকে। একবার মনে আসে বাইরে বেরিয়ে কাউকে ডাকবে কিনা। কিন্তু পরক্ষণেই বুঝতে পারে যে তাকে দেখামাত্রই বাইরে সাংঘাতিক প্রতিক্রিয়া হবে।
এদিকে বেশ কিছুদিন না খাবার কারণে খিদেও পেয়েছে। রান্নাঘরে দৌড়ে যায় অজয়। কী ভাগ্যিস চাল-ডাল রয়েছে, রান্না বসিয়ে দেবে। কিন্তু এ কী? বহু চেষ্টাতেও চালের কৌটোর ঢাকনা খুলতে বিফল হল, থাবা হাতে অজয়। হতাশ অজয়ের চোখ আলু-পেয়াঁজ এর ঝুড়িতে আটকে যায়, যাক, আলুই সেদ্ধ করে খাবে। বালতির জলে সসপ্যান ডুবিয়ে জল তুলে আনল অনেক চেষ্টায়, গ্যাসে সসপ্যান বসিয়ে, কোনোমতে মুখ দিয়ে লাইটারটা চেপে ধরে আগুন ধরাতে গিয়েই ভয় পিছিয়ে এল সে। আগুনে ভয়... ভীষণ ভয়... না না আগুন জ্বালানো যাবে না, কিছুতেই না, ও বাবা... কী করবে, কী করবে সে? নিজেই আশ্চর্য্য হয়ে গেলো অজয়, আগুনে সে ভয় পায়?
একবার করে দৌড়ে দরজার দিকে যায়, একবার করে বিফল আস্ফালনে হাত উপরে তুলে দেয়। ক্রমাগত মনে মনে “ক্ষমা করে দাও প্রভু, আমার ভুল হয়ে গিয়েছে” বলতে থাকে, নয়তো খালি পেটের মোচড় থেকে নিজেকে কীভাবে মুক্ত করবে ভাবতে থাকে।
কিন্তু তার শরীরের পরিবর্তন থামে না।
উপসংহার
নির্জীব, দুর্বল, ধুঁকতে থাকা অজয়, নাকি লেজবেষ্টিত, অর্ধ নরসিংহরূপী এক আজব প্রাণী, মেঝেতে শুয়ে-শুয়ে একটু জলের আশায় জিভ দিয়ে শুকনো মেঝেটা বারবার চাটে। চারিদিকে অসংখ্য পোকা আর আরশোলা-ইঁদুরে ঘরটা ভরে গিয়েছে। কখনও তারা এই প্রাণীটিকে খুবলে খাওয়ার চেষ্টা করে, কখনও তার লেজের তাড়া খেয়ে আশে-পাশে থেকে দেখতে থাকে। হয়তো তারা বুঝতে পারে এই প্রাণীটি লেজ উঠিয়ে তাড়াবার শেষ ক্ষমতাটুকুনও হারিয়ে ফেলেছে... অজয় শুধু কাতর চোখে চেয়ে থাকে... দিন থেকে রাত হয়, রাত থেকে ভোর... অজয় আর অজয় নেই, নৃসিংহ দেবের প্রকোপে সে আজ একটি অর্ধমৃতপ্রায়, অদ্ভুত, কিম্ভুতকিমাকার প্রাণীরূপে পরিণত— নরসিংহ...
*****************
প্রায় এক মাসের উপর কোনো খবর না পেয়ে, অফিসের লোক খোঁজ নিতে আসে। অজয়ের বাড়ি অতিকষ্টে খুঁজে বের করে। বারংবার ডেকে ডেকে সাড়া না পেয়ে পুলিশে খবর দেয় লোকটি। আশে-পাশের এলাকার লোকজন জড়ো হতে শুরু করে। চাপা গুঞ্জন, পুলিশের গাড়ির সাইরেনে ভরে যায় চারধার। পুলিশ এসে একটি অর্ধ-কঙ্কালসার, গলে-পচে যাওয়া, অদ্ভুত প্রাণীর শরীর উদ্ধার করে নিয়ে যায়... হতবাক, চমকে ওঠা স্থানীয় জনতার গুঞ্জনের আড়ালে বাড়িটি সীল করে দেওয়া হয়।
এখনও তদন্ত চলছে...
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন