রিভলভিং চেয়ার

পিয়ালী ঘোষ

প্রসাদবাবুর একটি রিভলভিং চেয়ারের ভীষণ শখ। বেশ সুন্দর, একটি লাল রংয়ের চেয়ার হবে। গোল গোল ঘুরবে। ভাবতেই ওঁর মুখে সবসময় একটা মুচকি হাসি খেলে যায়। যদিও ওঁর বাড়িতে এমন কোনো জায়গায়ই নেই যেখানে সেই রিভলভিং চেয়ারটির দরকার, তাও উনি ভাবেন যে জীবনে সবসময় সবাইয়ের কথা ভেবে নিজের ইচ্ছেগুলোর কোনো মূল্যই দেওয়া হয়নি, তাই এবার মনঃস্থির করে একটি সেকেন্ড হ্যান্ড রিভলভিং চেয়ার ওএলএক্স থেকে কিনেই ফেললেন। যে লোকটি বেচে দিল চেয়ারটা, তার চোখমুখ দেখে অদ্ভুত লাগলেও, পাত্তা দিলেন না প্রসাদবাবু। একটু রং চটে যাওয়া লাল রংয়ের চেয়ারটি যখন ডেলিভারি হল, সারা পাড়ায় সবার চাপা মন্তব্য ও হাসি ছাড়াও চাপা গুঞ্জনের রেশ কানে তুললেন না প্রসাদবাবু।

বাড়িতে ঢুকতেই একপ্রস্থ মুখঝামটার সম্মুখীন হলেন। স্ত্রী বললেন, “বুড়ো বয়সে ভীমরতি ধরেছে। দু’দিনও বসবে না আর রাখবে কোথায় শুনি?” প্রসাদবাবু উত্তর না দিয়ে সোজা দোতলায় পড়ার টেবিলটার পাশে গিয়ে চেয়ারটা রেখে দিলেন। স্ত্রী এক কাপ চা নিয়ে গজগজ করতে করতে এসে ঠুকে টেবিলে নামিয়ে দিয়ে চলে গেলেন।

ঘরের দরজাটা বন্ধ করে, তাড়াতাড়ি চেয়ারটাকে টেনে নিয়ে, ছোট্ট একটা লাফ দিয়ে, শিশুদের মতন উঠে বসলেন প্রসাদবাবু আর সাথে সাথেই চেয়ারটা একটু ঘুরে গেল। উনি হেসে ফেললেন আর আবার মাটিতে একটা পা দিয়ে চেয়ারটা ঠেলে দিলেন। গোল গোল করে ঘুরতে ঘুরতে, হাসতে লাগলেন আর যেন ছেলেবেলা উপভোগ করতে লাগলেন। চাকাগুলোকে পরীক্ষা করার জন্য, চেয়ারটাকে একটু আগের দিকে ঠেলে দিলেন প্রসাদবাবু। চেয়ারটা এগিয়ে গেল। শিশুর মতন উৎফুল্লিত প্রসাদবাবুর আত্মতৃপ্তি দেখার মতন হল। একবার করে পাক দিয়ে ঘোরেন আর একবার করে পা দিয়ে ঠেলে এগিয়ে বা পিছিয়ে দেন চেয়ারটা। রাত্রে নীচে গিয়ে খেয়ে, বিছানায় নাসিকাগর্জন সমেত পরিতৃপ্তির ঘুম দিলেন। সকালে ঘুম থেকে উঠেও প্রসাদবাবু ওইদিকে তাকিয়ে একটু হাসলেন আর চা খেতে খেতে খুশি মনে চেয়ারটার দিকে তাকিয়ে রইলেন। ওঁর অনেকদিন একটি সাধ পূর্ণ হয়েছে বলে কথা।

চেয়ারটা ওঁর ওই দোতলায় বেমানান হলেও, শেষে অফিস যাওয়ার আগে আর অফিস থেকে ফিরে এসেই রিভলভিং চেয়ারটা ওঁর নিত্যসঙ্গী হয়ে উঠল। সকালের চা-জলখাবার, বিকেলের মুড়ি, বৃষ্টির দিনে গান শোনা বা বই পড়ার একমাত্র সঙ্গী হয়ে দাঁড়াল ওই চেয়ারটা। গিন্নির ঘনঘন মুখ ঝামটাতেও কাজ হল না। স্নান, নৈশভোজন আর ছুটির দিন মধ্যাহ্নভোজন ছাড়া প্রসাদবাবু নীচে নামতেন না। স্ত্রী, কাজের লোক পাড়াপড়শী সবার সাথেই কথা বলা বন্ধ হয়ে গেল। যখন তখন পাক দিয়ে ঘুরে ঘুরে শিশুর মতন হাততালি দিতে লাগলেন। ওঁর খিলখিল করে হাসি আর বাৎসল্যতার মাত্রা দিনের পর দিন ছাড়াতে থাকল। সারা পাড়ায় সবাই বলাবলি করতে লাগল প্রসাদবাবুর বাড়ি থেকে শিশুদের মতন হাততালি আর হাসির আওয়াজ শোনা যায়। ওঁর বাড়ির কাজের বউটিকেও লোকে জেরা করতে ছাড়ল না। প্রসাদগিন্নি খুবই অপ্রস্তুত হলেন। প্রসাদবাবুকে বললেন সেই কথা। কিন্তু উনি কিছুই বললেন না দেখে, প্রসাদগিন্নি নিজেই গজ গজ করতে করতে চলে গেলেন।

ক্রমে প্রসাদবাবুর ব্যবহার দেখে গিন্নি ভয় পেয়ে বটগাছের নীচে বটুক তান্ত্রিকের তাবিজ এনে পরালেও, তাতে বিশেষ কাজ দিল না। চেয়ারটির প্রতি ওঁর প্রীতি একটুকুও কমল না। একদিন যখন প্রসাদবাবু অফিসে, ঘরে চুপিসাড়ে ঢুকলেন প্রসাদবাবুর স্ত্রী ও বটুক তান্ত্রিক। ঝাড়-ফুঁক, তন্ত্র-মন্ত্র সব হল। সন্ধ্যাবেলা প্রসাদবাবু ঘরে ঢুকেই চেয়ারে সুতো বাঁধা দেখে স্ত্রীকে ডেকে জিজ্ঞেস করতেই একপ্রস্থ মুখঝামটা খেলেন। কিন্তু আখেরে সেই চেয়ার কিন্তু ওঁর দখলের বাইরে গেল না। পূর্ববৎ একই নিয়মে চলতে লাগল প্রসাদবাবুর চেয়ারপ্রীতি। কোনো ওজর আপত্তি, চোখের জল, মাথার দিব্বি ওঁকে টলাতে পারল না।

হাল ছেড়ে দিয়ে গিন্নি নিজের কাজে মন দিলেন। পরের মাসে প্রসাদবাবু রিটায়ার করলেন। এবার দিনের ২৪ ঘণ্টার সঙ্গী হয়ে দাঁড়াল সেই লাল রিভলভিং চেয়ার। অফিস না থাকায়, প্রসাদবাবু ওই চেয়ারটিতে সম্পূর্ণরূপে মন দিলেন। ঝাড়া, মোছা, পরিষ্কার করা সব নিজেই করতেন। কাউকে হাত দিতে দিতেন না। চেয়ারটার প্রতি যে প্রসাদবাবুর কী এমন ভালোবাসা, তা ওঁর স্ত্রী কিছুতেই বুঝে উঠতে পারলেন না। গিন্নি প্রমাদ গুনলেন।

এক গভীর রাত্রে প্রসাদবাবু চেয়ারের চারধারে ছোট ছোট শিশুদের দেখতে পেলেন, যারা ওঁর চেয়ারে চড়ছে আর নামছে, পাক দিচ্ছে আর হেসে গড়িয়ে পড়ছে। উনি আশ্চর্য হয়ে দেখতে থাকলেন, এই শিশুদের খেলা। বেমালুম ভুলে গেলেন এই শিশুর দল এল কোথা থেকে। আনন্দে বিভোর হয়ে উনি এই শিশুর দল এর খেলা দেখতে লাগলেন। ধীরে ধীরে দুটি শিশু এসে ওঁর হাত ধরল আর চেয়ারে এনে বসিয়ে দিল। খিলখিল করে হেসে উঠল তারা আর প্রসাদবাবু আনন্দে হাততালি দিয়ে উঠলেন। প্রায় এক ঘণ্টা ধরে উনি এই দুটি শিশুর সাথে খেলে, ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়লেন।

তারপরেই পর পর দুটি মাস ধরে প্রসাদবাবু ছোট শিশুর মতন আচরণ করতে লাগলেন। স্নান-খাওয়া এমনকী মলত্যাগ নিজের বিছানাতেই সারতে লাগলেন। এই সব নোংরা পরিষ্কার করতে হচ্ছিল প্রসাদগিন্নিকে। নিজের স্বামীর এই আচরণ দেখে উনি চিন্তাভাবনায় ঘুমোতে পারতেন না। ওঁকে বারবার মনে করাবার চেষ্টা করে প্রসাদগিন্নি বিফল হয়ে হাল ছেড়ে দিলেন। বিদেশে থাকা মেয়েকে বললেন তার বাবাকে বোঝাতে। মেয়ে ভিডিও কল করে বাবাকে দেখে ঘাবড়ে গেল। বাবাকে এরকম শিশুর মতন আচরণ করতে দেখে অনেক বকল, বোঝাল কিন্তু প্রসাদবাবু কিছুই বললেন না শুধু ফ্যাল ফ্যাল করে মেয়ের দিকে চেয়ে রইলেন। যেদিন প্রসাদবাবু কথা বলা ভুলে গেলেন, শিশুর মতন দৃষ্টি দিয়ে গিন্নির দিকে চাইতে শুরু করলেন, সেইদিন আর প্রসাদগিন্নির ধৈর্যের বাঁধ রইল না। উনি চেয়ারটাকে, “আপদ, কালকেই তোকে বিদায় করব”, বলে রিভলভিং চেয়ারটাকে শাসিয়ে গেলেন।

যথারীতি, ওইদিন রাত্রে প্রসাদবাবুর খিলখিল হাসি আর হাততালির আওয়াজ শেষ শোনা গিয়েছিল বলে পুলিশকে প্রসাদগিন্নি দাবি করেন। ওঁর জামাকাপড় সমেত, প্রসাদবাবু বেমালুম উবে গিয়েছিলেন, অন্ধকারে। পুলিশ কোনো কুলকিনারা করতে পারল না এবং ভৌতিক ব্যাপার শুনে হেসে উড়িয়ে দিয়ে বলল, “দেখুন ওসব ভূতপ্রেত জানি না, আপনার রাগের কারণে কোথাও চলে গিয়েছেন হয়তো, দু’দিন পর ঠিক ফিরবেন।”

যদি উনি ফিরে আসেন এই আশায় প্রসাদগিন্নি নিজের জীবনের শেষ বয়স অবধি চেয়ারটা প্রসাদবাবুর দোতলার ঘরেই রেখে দিয়েছিলেন। রোজ রাত্রে ঘরে ঢুকে দেখতেন যে চেয়ারটা ঘুরছে, আর চারপাশে সাদা সাদা ধোঁয়ার মতন কী একটা যেন পাক খাচ্ছে। সাহস করে চেয়ারটায় নিজে বসেননি কোনোদিন। অবশেষে কাজের লোককে সাথে নিয়ে চেয়ারটা মিউনিসিপ্যালিটির কুড়াদানে গিয়ে ফেলে দিয়ে আসেন প্রসাদগিন্নি।

— এই চেয়ারটা কত পড়বে ভাই?

— মাত্র ১২০০ টাকা দাদাবাবু।

— আমি বুড়ো মানুষ এত টাকা দিতে পারব না। আগামী মাসে রিটায়ার করব। ছেলেপুলে নেই। অনেকদিনকার শখ একটা লাল রিভলভিং চেয়ারের। ৭০০ টাকায় দিলে নিতে পারি।

— নিয়ে যান দাদাবাবু, নিয়ে যান... মুচকি হেসে বলে দোকানদার।

আনন্দে গদগদ হয়ে রিক্সায় তোলেন আনন্দবাবু, একটু রং চটে যাওয়া লাল রিভলভিং চেয়ারটা... আহা, অনেকদিনের শখ ছিল... শিশুর মতন খুশিতে হাততালি দিয়ে উঠলেন সদ্য কেনা রিভলভিং চেয়ারের মালিক আনন্দবাবু...

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%