প্রেতপুরী

শুভময় মণ্ডল

অন্ধকার নামছে। রাজ কাজ সাঙ্গ করার পর রাজা যেমন অন্দরমহলে এসে খুলে রাখেন তাঁর মুকুট, তেমনই অস্তাচলের আঁধারে সূর্যদেব খুলে রাখলেন তাঁর আলোর রতন ভরা শিরোভূষণ। অন্ধকার আকাশে ফুটে উঠল তারাদল।

যুদ্ধক্ষেত্রে সেই রাতে শয়ে শয়ে জ্বলে উঠল আগুনকুন্ড।

যেখানে পড়ে আছেন লক্ষ্মণ, সেখানেই মাটিতে শুয়ে শোকে অচেতন রামচন্দ্র। তাঁর চোখের জল আর ভাইয়ের রক্তে ভিজে যাচ্ছে মাটি। বিষণ্ণ হয়ে বসে আছেন হনুমান, সুগ্রীব, অঙ্গদ, নল, নীল, কুমুদ, শরভ, সুমালী, সুবাহু প্রমুখ সেনাপতি আর যত রঘুসৈন্য।

জ্ঞান ফিরে পেয়ে রামচন্দ্র কেঁদে বলে চললেন, রাজ্যপাট ছেড়ে যখন বনবাসে চলে আসতে হয়েছিল, লক্ষ্মণ সারা রাত জেগে তুমিই আমায় পাহারা দিতে। এই রাক্ষসদেশে আমি যখন বিপদের মাঝে ডুবে আছি, আমায় ভুলে হে বীর তুমি মাটিতে শুয়ে বিশ্রাম নিচ্ছ। কে আমায় রক্ষা করবে? তুমি আমায় ভুলে গেলে কী করে! কী করে ভুললে তুমি সীতাকে। তুমি যে তাঁকে মায়ের মতো সেবা করতে। তিনি তো তোমায় মনে করে লঙ্কার কারাগারে দিনরাত কেঁদে চলেছেন। তাকে চুরি করে বেঁধে রেখেছে রাবণ। চোরকে শাস্তি না দিয়ে তুমি যুদ্ধ ছেড়ে চলে গেলে!

তোমায় না নিয়ে আমি ফিরব কী করে, কী উত্তর দেব আমি যখন তোমার কথা জিজ্ঞাসা করবেন সুমিত্রা মা আমার? কী বলে বোঝাব ঊর্মিলা বধূরে? আমার প্রতি তো কোনোদিন বিমুখ হওনি, আমারই জন্যে রাজ্যসুখ ছেড়ে চলে এসেছিলে, আজ যখন চোখের জলে তোমায় এত ডাকছি, আমার দিকে একবার চোখ মেলে চাইছ না কেন ভাই! সারাজীবন দেবতাদের পূজা করলুম, তার এই ফল? হে রাত্রি, তুমি তো দগ্ধ ফুলকে সতেজ করো, শিশিরের জলে তুমি আমার ভাইকে বাঁচাও, বাঁচাও আমার ভাইকে, আমি ভিখারি রাম, শুধু এইটুকু ভিক্ষা চাই।

কৈলাসে রামের দুঃখে কাতর হয়ে চোখের জল ফেলছেন পার্বতী। সে অশ্রুজল সকালের শিশিরের মতো ঝরে পড়ছে মহাদেবের পায়ে। পার্বতীর দুঃখের কারণ জিজ্ঞাসা করলেন মহাদেব। পার্বতী জানালেন, লক্ষ্মণের শোকে কাঁদছেন রামচন্দ্র। তিনি অতি লজ্জিত কারণ রামচন্দ্র তাঁর ভক্ত, তাঁকে পূজা করেন।

হেসে মহাদেব বললেন, এ সামান্য বিষয়, এর জন্য তুমি এত দুঃখ পাচ্ছ! রামচন্দ্রকে মায়ার সঙ্গে যমালয়ে পাঠিয়ে দাও, আমার আর্শীবাদে রামচন্দ্র সশরীরেই যমালয়ের প্রেতপুরীতে পৌঁছোতে পারবে, সেখানেই তাঁর বাবা দশরথ বলে দেবেন কীভাবে লক্ষ্মণকে জীবন ফিরিয়ে দেওয়া যাবে। মায়ার হাতে দাও আমার ত্রিশূল, আগুনের স্তম্ভের মতো এই ত্রিশূল পথ দেখাবে প্রেতপুরীর অন্ধকারে।

কৈলাসে মায়াকে ডেকে আনলেন পার্বতী। পৌঁছোতে বললেন লঙ্কার যুদ্ধক্ষেত্রে রামচন্দ্রের কাছে। মহাদেবের কথামতো নির্দেশ দিলেন মায়াকে।

মায়া রামচন্দ্রের কাছে এসে নামলেন, তাঁর কানে কানে বললেন, চোখ মোছো, তোমার প্রাণের ভাই আবার বেঁচে উঠবে। স্নান করে এসো সমুদ্রে, চলো আমার সঙ্গে যমালয়ে। শিবের আশীর্বাদে সেখানে তুমি সশরীরে পৌঁছোতে পারবে। তোমার বাবা দশরথ বলে দেবেন, কীভাবে লক্ষ্মণ জীবন ফিরে পাবে। চলো তাড়াতাড়ি, সুড়ঙ্গ পথ তৈরি করব আমি, নির্ভয়ে সেখানে প্রবেশ করো। সেনাপতিদের নির্দেশ দাও, তাঁরা লক্ষ্মণকে রক্ষা করুক এই সময়।

মায়ার নির্দেশ পালন করলেন রামচন্দ্র। স্নান করলেন সমুদ্রে, নির্দেশ দিলেন সেনাপতিদের, প্রবেশ করলেন সুড়ঙ্গে। চললেন অন্ধকারে, পথ দেখিয়ে আগে আগে চলেছেন দেবী মায়া।

কতক্ষণ পরে রামচন্দ্র শুনলেন ঢেউয়ের শব্দ, হাজার হাজার সমুদ্র রাগে গরগর করছে যেন। কাছেই ভীষণ এক এলাকা অনন্ত অন্ধকারে ঢাকা। সেই শহরের চারদিক ঘিরে ভয়ানক শব্দে বইছে বৈতরণী নদী, সেই নদীতে উথলে উঠছে আগুনের ঢেউ, ঢেউয়ের উপর থোক থোক ধোঁয়া। দেখলে আতঙ্ক জাগে মনে। সে আকাশে সূর্য ওঠে না কোনোদিন, ওঠে না চাঁদ কিংবা তারা। মাঝে মাঝে শুধু আগুন উগরে আকাশময় ঘুরে বেড়ায় বজ্র বিদ্যুৎ।

অবাক হয়ে রামচন্দ্র দেখলেন সেই ভীষণ নদীর উপর আশ্চর্য এক সেতু। সেই সেতু কখনো দাউদাউ আগুনের, গরগর করে উগরে দিচ্ছে ধোঁয়া, কখনো যেন সে আশ্চর্য সুন্দর, সোনায় তৈরি। সব সময় সেই সেতুর পানে ছুটে চলছে লক্ষ কোটি প্রাণী,—তারা হাহাকার করছে কেউ, কেউ বা উল্লাসে হইহই।

রামচন্দ্র জিজ্ঞাসা করলেন দেবী মায়াকে, দয়া করে বলুন সারাক্ষণ ওই সেতু নানা রকম রূপ ধরছে কেন? আগুন দেখলে যেমন পতঙ্গ ছুটে যায় ঠিক তেমনই অসংখ্য প্রাণী কেন ছুটে চলেছে ওই সেতুর দিকে?

উত্তর দিলেন মায়াদেবী, মানুষের কর্মফল অনুযায়ী ওই সেতুর অমন নানা রূপ। যারা পাপী তাদের জন্যে এই সেতু আগুনের, ধোঁয়ায় ভরা। কিন্তু যাঁরা পুণ্যবাণ তাঁরা যখন পার হবেন এই সেতু তাঁদের জন্যে তখনই সুন্দর, চওড়া, সোনায় মোড়া যেন স্বর্গের পথ। যাদের ছুটে আসতে দেখছ তারা অগণন আত্মা, মর্ত্যে তারা মারা গেছে, এখন কর্মফল ভোগ করতে যমালয়ে আসছে। যারা পুণ্যবাণ, ধার্মিক তারা সেতুপথ ধরে উত্তর, পশ্চিম ও পূর্বদ্বার দিয়ে প্রবেশ করে, আর যারা পাপী তাদের মহাকষ্টে সাঁতরিয়ে পার হতে হয় নদী, আর উত্তপ্ত জলে, যেন ফুটন্ত তেল, তাদের ফেলে ভয়ানক যন্ত্রণা দেয় যমদূত। চলো আমার সঙ্গে, মানুষের চোখ যা কোনোদিন দেখেনি তা-ই তুমি দেখবে, এখনই, নিজের চোখে।

যমপুরীতে মায়ার সঙ্গে এগিয়ে চলেছেন রামচন্দ্র। হঠাৎ পথ আগলে দাঁড়াল বিরাট, বিকট চেহারার যমদূত। ভয়ানক স্বরে জিজ্ঞাসা করল পরিচয়, জানতে চাইল কীভাবে তারা সশরীরে যমপুরীতে প্রবেশ করল, তখনই উত্তর চাই, নইলে এক মূহূর্তে লাঠির ঘায়ে মৃত্যু।

দেবী মায়া মৃদু হেসে দেখালেন শিবের ত্রিশূল। অমনি যমদূত হাত জোড় করে প্রণাম জানিয়ে পথ ছেড়ে দিল।

বৈতরণী নদী পার হয়ে যমপুরীর লোহার তোরণের সামনে এসে দাঁড়ালেন তাঁরা। রামচন্দ্র দেখলেন আগুনের কুন্ড চক্রের মতো ঘুরছে রাশি রাশি। তোরণে আগুনের অক্ষরে লেখা—এই পথ দিয়ে পাপীরা চির দুঃখ ভোগ করতে দুঃখের দেশে প্রবেশ করে। যে তুমি প্রবেশ করছ, সকল কামনা-বাসনা-ইচ্ছা ত্যাগ করে এই দেশে প্রবেশ করো।

তারপর ভয়ানক সব দৃশ্য। প্রথমে জ্বর-রোগ, কখনো ঠাণ্ডায় কাঁপছে কখনো পুড়ে যাচ্ছে তাপে। পিত্ত, শ্লেষ্মা, বায়ু-র আক্রমণে অজ্ঞান হয়ে যাচ্ছে ক্ষণে ক্ষণে। তারই পাশে বসে পেটুক, বিশাল ভুঁড়ি, সব খেয়ে বমি করছে অহরহ, সেই বমন আবার খাচ্ছে দু-হাতে। এমন সব অসহ্য দৃশ্য। হাঁপানি যক্ষ্মাসহ ভয়ানক সব রোগের দৃশ্য। উন্মাদ রোগী কখনো নাচছে, কখনো গাইছে হাততালি দিয়ে। কখনো তার বিকট অদ্ভুত বসন-ভূষণ, কখনো সে পুরো বস্ত্রহীন উদোম। কখনো ধারালো অস্ত্রে নিজের গলা কাটছে, অথবা বিষ খাচ্ছে, অথবা গলায় দড়ি দিয়ে জলে ডুবে মরছে। কখনো ভাতের সঙ্গে মলমূত্র মেখে হাপুস হুপুস খেয়ে চলেছে।

রামচন্দ্র দেখলেন ক্রোধকে—আগুন রথে বসে আছে সে, হাতে রক্তমাখা তরবারি, গলায় মানুষের মুন্ডমালা, সামনেও মৃতদেহরাশি। দেখলেন হত্যাকে—দু-হাতে খাঁড়া সবসময় যেন গলা কাটতে উদ্যত। দেখলেন আত্মহত্যাকে—গাছে গলায় দড়ি দিয়ে ঝুলছে, বেরিয়ে পড়েছে জিব, ঠিকরে উঠে আসছে চোখ।

মায়াদেবী রামচন্দ্রকে দেখাচ্ছেন যমপুরীর দক্ষিণ দুয়ার, যেখানে চৌরাশি নরক কুন্ড।

দেখতে দেখতে এগিয়ে চলেছেন তারা। এ শহর চির-অন্ধকার, চারদিকে নিরন্তর আর্তনাদ, সবসময় কাঁপছে পায়ের তলার মাটি, মেঘ উগরে দিচ্ছে আগুন, বাতাস বইছে দুর্গন্ধময়। যেন লক্ষ লক্ষ মড়া পুড়েই চলেছে শ্মশানে।

রামচন্দ্র দেখলেন এক মহাহ্রদ। সেখানে জলের বদলে তরল আগুন। সে আগুনে ভাসছে লক্ষ কোটি প্রাণী। তারা হাহাকার করছে, অনুতাপ করছে। যমদূত তাদের মাথায় মারছে দন্ড, তাদের কুরে খাচ্ছে কৃমি, মাংসাশী পাখি এসে ছিঁড়ে যাচ্ছে তাদের নাড়িভুঁড়ি।

দেবী মায়া রামচন্দ্রকে জানালেন, ওই আগুনভরা হ্রদের নাম রৌরব। যে অন্যের ধন দখল করে তাকে বাস করতে হবে ওই হ্রদে চিরকাল। বিচারের দায়িত্ব যাঁর তিনি যদি অবিচার করেন, তারও ঠাঁই হবে ওই হ্রদে, যেখানে আগুন কখনো নেবে না, যন্ত্রণা কখনো শেষ হয় না। চলো এগিয়ে, তোমায় দেখাব কুম্ভীপাক, যেখানে যমদূত গরম তেলে ভাজে পাপীদের, শুনতে পাচ্ছ আর্তনাদ। আমি মায়াবলে তোমার নাক বন্ধ করেছি, নইলে দূর্গন্ধে এক মুহূর্তও দাঁড়াতে পারতে না এখানে। অথবা চলো যাই সেই অন্ধকূপের দিকে যেখানে পাপীরা বন্দি থাকে চিরকাল।

সঙ্গে সঙ্গে হাতজোড় করে রামচন্দ্র দেবী মায়াকে বললেন, ক্ষমা করো দেবি, মানুষের অসহ্য যাতনার এমন সব দৃশ্য আর দেখলে এখনই মরে যাব আমি। যদি মানুষকে শেষে এই যন্ত্রণা ভোগ করতে হয়, তাহলে পৃথিবীতে জন্মাতে কে চায়, বলুন।

রামচন্দ্র আরো বললেন, মানুষ বড়ো অসহায়, সব পাপ-কলঙ্ককে কি সে দূরে রাখতে পারে!

মায়া উত্তর দিলেন, পৃথিবীতে সব বিষেরই ওষুধ আছে হে রাজা! সেই ওষুধ যদি কেউ অবহেলা করে তাকে বাঁচাবে কে? যে মানুষ তার কাজের জায়গায় পাপের সঙ্গে নিত্য লড়াই করে, তার কোনো ভয় নেই।

তারপরই মায়া বললেন এইসব শাস্তির জায়গা যদি রামচন্দ্র দেখতে না চান, তাহলে অন্য পথেই যাওয়া যাক।

অনেক দূর হাঁটার পর রামচন্দ্র প্রবেশ করলেন ঘন এক বনে। সে বন শব্দহীন, অন্তহীন। যেখানে পাখি ডাকে না, বাতাস বয় না, ফুল ফোটে না। কোথাও কোথাও গাছপালা ভেদ করে আলো আসছে বটে, কিন্তু সে আলো বড়ো ম্লান, ফ্যাকাশে, যেন রোগগ্রস্ত মানুষের হাসি।

লক্ষ লক্ষ প্রাণী হঠাৎ কোথা থেকে এসে রামচন্দ্রকে ঘিরে ধরল। কেউ কেউ জিজ্ঞাসা করল, তুমি কে? এখানে সশরীরে এলে কী করে? তুমি একটু কথা কও, শুনে আমাদের প্রাণ জুড়োক। যেদিন যমদূত প্রাণটা ছিনিয়ে নিয়ে এখানে এনে ফেলল সেদিন থেকে মানুষের জিব থেকে জন্ম নেওয়া কোনো কথা শুনিনি আমরা। সেদিন থেকে মানুষের আওয়াজ থেকে বঞ্চিত আমরা। কথা বলো বাবা, আমাদের কান জুড়োক।

নিজের পরিচয় দিলেন রামচন্দ্র, জানালেন তাঁর বাপ-মায়ের নাম, বংশপরিচয়।

ঘিরে-ধরা প্রেতেদের মধ্যে হঠাৎ একজন বলে উঠল, তোমায় আমি চিনি হে রাজা। পঞ্চবটী বনে তোমারই তিরে আমার প্রাণ গিয়েছিল।

চমকে উঠে রামচন্দ্র দেখলেন, কথাটা বলল মারীচ। এখন সে দেহহীন প্রেত। তুমি এখানে কোন পাপে? জিজ্ঞাসা করলেন রামচন্দ্র।

মারীচ উত্তর দিল, আমার দুর্ভোগের কারণ রাবণ। তার কাজ হাসিল করতে গিয়েই আমি তোমায় ঠকিয়েছি।

সেখানেই হঠাৎ চলে এল খর আর দূষণ নামের দুই রাক্ষসের প্রেত। কিন্তু রামচন্দ্রকে দেখামাত্রই তারা রাগে-দুঃখে ছিটকে গেল দূরে।

হঠাৎ ভীষণ গর্জনে কেঁপে উঠল। আর গর্জন শোনামাত্রই দূরদাড় উড়ে পালাল সব ভূত, যেন বয়ে গেল পাতা-খসানো ঝড়।

মায়া তখন রামচন্দ্রকে জানিয়ে দিলেন। এই বনের নানা খোপে গর্তে এই প্রেতদঙ্গলের বাস। কখনো কখনো উঠে এসে এরা হু হু করে কাঁদে। ওই, চেয়ে দেখো, যমদূত ভয়ানক রাগে তাড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছে ওদের।

রামচন্দ্র দেখলেন যমদূতের তাড়ায় দুড়দাড় ঝড়ের মতো উড়ে পালাচ্ছে প্রেতের দল। দেখে চোখে জল এল রামচন্দ্রের।

প্রেতিনীদেরও দেখালেন মায়াদেবী। ওই সব প্রেতিনীরা পৃথিবীতে গহনাগাটি সাজপোশাকেই মজে ছিল। যমালয়ে তাদের দুর্ভোগের অন্ত নেই। যমদূতীরা তাদের তাড়িয়ে নিয়ে বেড়াচ্ছে। সেই যমদূতীদের চেহারা বড়ো ভয়ানক আর কদাকার—চুলের সঙ্গে ফোঁসফোঁস করে দুলছে সাপ, তলোয়ারের মতো নখ, টকটকে লাল দুই ঠোঁট, নাক দিয়ে ধকধক করে বার হচ্ছে আগুন। নাক আর চোখ দিয়ে বার-হওয়া আগুন মিলে মিশে সে এক ভীষণ দৃশ্য।

এত কিছু দেখছেন বটে কিন্তু রামচন্দ্রের মন পড়ে রয়েছে তাঁর ভাইয়ের কাছে। তিনি দেবী মায়াকে বললেন, আপনার দয়ায় এই যমালয়ে কত যে আশ্চর্য জিনিস দেখলাম, তার ইয়ত্তা নেই, কিন্তু ঋষির মতো সেই রাজা দশরথ কোথায়, তাঁর কাছ থেকে জেনে নেব কিশোর লক্ষ্মণের প্রাণ বাঁচানোর উপায়! দেবী আমায় দয়া করে সেখানে নিয়ে চলুন।

দেবী মায়া হেসে বললেন, রামচন্দ্র এই পুরী অসীম! তার অতি সামান্য অংশই আমি তোমায় দেখিয়েছি। আমরা দু-জনে যদি বারো বছর ধরে টানা ঘুরি তাও প্রেতমহলের পুরোটা দেখা হয়ে উঠবে না। দেবী জানিয়ে দিলেন, পূর্বদিকে সবাই সুখে বাস করে। সেখানে বাগান ঘেরা অসামান্য ঘর-দুয়ার, জলে ফুটেছে পদ্ম, গান গাইছে পাখি, সব সময় বইছে বসন্তের বাতাস। আপনি আপনি বাজছে নানারকম বাদ্যবাজনা, দারুন সব খাবার-পানীয়ের ঢালাও যোগান, অঢেল দুধ আর ফল।

পূর্বদিকে না গিয়ে তাঁরা দ্রুত চললেন উত্তরে, সেদিকে গেলেই তাদের উদ্দেশ্য পূরণ হবে।

শ্রীরামচন্দ্র দেখলেন, শয়ে শয়ে পাহাড়। সে-সব পাহাড়ে কোনো সবুজ নেই, যেন দেবতাদের রাগে পুড়ে খাক হয়ে গেছে। কোনো কোনো পাহাড়ের চূড়ায় রাশি রাশি বরফ, আবার কোনো কোনো পাহাড় সারাক্ষণ উগরে দিচ্ছে আগুন, সেই আগুনে গলে বয়ে যায় পাথরের ঢেউ, আকাশ ছেয়ে যাচ্ছে ছাইয়ে, চারদিকে হাহাকার। দেখলেন, শয়ে শয়ে মরভূমি, গরম বাতাসে সারাক্ষণ ফুঁসে উঠছে বালির ঝড়। দেখলেন বিশাল এক দিঘি, যেন দরিয়ার মতো অকূল, সেখানে কোথাও পাহাড়ের মতো ঢেউ উঠছে, কোথাও জল পচছে বদ্ধ হয়ে, পচা জলে ডেকে চলেছে ভয়ানক চেহারার ব্যাঙ। কোথাও বিষ জ্বলছে ধকধক করে। এই অসহ্য পরিবেশে ঘুরে মরতে হয় পাপীদের, কোথাও ভয়ানক শীত আবার কোথাও দাউদাউ আগুন। কামড়াচ্ছে পোকামাকড়। সাপ ও বিছে। যাতনার বিরাম নেই। এখানে কে দাঁড়ায়! দ্রুত পায়ে মায়া ও রামচন্দ্র পার হয়ে গেলেন উত্তর দুয়ার।

এসব পার হয়ে শোনা গেল কাছেই কোথাও মিঠে বাজনার শব্দ। দেখা গেল সোনার ঘর-দুয়ার-প্রাসাদ, সোনার ফুলে ভরা গাছপালা নিয়ে বাগান। দেবী জানিয়ে দিলেন ওই এলাকায় বসবাস করেন সেই সব বীরেরা মুখোমুখি লড়াইয়ে যাঁরা মৃত্যুবরণ করেছেন।

রামচন্দ্র দেখলেন সে বড়ো মনোরম জায়গা। অলংকারে মোড়া ঘোড়ারা লাফিয়ে বেড়াচ্ছে, ডাক পাড়ছে হাতি। তলোয়ারের খেলা খেলছে কেউ, অথবা মল্লযুদ্ধের খেলা। উড়ছে পতাকা, ফুলের আসনে বসে সোনার বীণায় বীরগাথা গাইছেন কবিরা। সেই গান শুনে হুংকার দিচ্ছেন বীরেরা, তাদের উপর কারা ছড়িয়ে দিচ্ছে পারিজাত ফুলরাশি। সুগন্ধে ভরে উঠেছে চারদিক।

মায়াদেবী সেখানেই দেখিয়ে দিলেন মহিষাসুরকে, শুম্ভ-নিশুম্ভ, সুন্দ-উপসুন্দ প্রমুখ দৈত্যকে। এঁরা সকলে যুদ্ধে মৃত্যুবরণ করে এখন সুখে বাস করছেন। রামচন্দ্র তখনই জিজ্ঞাসা করলেন, এখানে ইন্দ্রজিৎ সহ রাক্ষসবীরদের দেখছেন না কেন, যাঁরা যুদ্ধে নিহত হয়েছেন।

মায়া জানিয়ে দিলেন মৃত্যুর পর কারও যদি সৎকার না হয় সে ওই আনন্দময় ঠাঁইয়ে পৌঁছুতে পারে না। আত্মীয়স্বজন যদি যতনে সৎকার না করে তবে মৃতের প্রেত ঘুরে বেড়াবে দেশময়।

হঠাৎ মায়া দেখালেন, একজন বীর হেঁটে আসছেন।

মায়া বললেন, আমি একটু আড়ালে সরে দাঁড়াই। তুমি ওঁর সঙ্গে কথা বলো।

রামচন্দ্র দেখলেন তাঁর সামনে কিষ্কিন্ধ্যার একদা রাজা বালী।

বালী রামচন্দ্রকে বললেন, সশরীরে তুমি আজ এখানে কেন! সুগ্রীবকে তুষ্ট করতে তুমি অন্যায় যুদ্ধে আমায় হত্যা করেছিলে। ঠিক আছে, ভয় পেয়োনা তুমি। এখানে আমরা রাগ, হিংসা কিছুই পুষে রাখি না।

একটু লজ্জাই পেলেন রামচন্দ্র।

হাসিমুখে বালি রামচন্দ্রকে বললেন, ওই যে দেখছ দূরে বাগান, যেখানে গাছে গাছে সোনার ফুল-ফল, চলো ওখানে আমার সঙ্গে। ওখানেই বাস করেন তোমার বাবার বন্ধু জটায়ু। তোমার স্ত্রীকে রাবণের হাত থেকে রক্ষা করার জন্যে তিনি প্রাণ দিয়েছিলেন। তোমায় দেখলে ভারী খুশি হবেন তিনি।

রামচন্দ্রের দেখা হল জটায়ুর সঙ্গে। জটায়ু তো মহাখুশি। রামকে বললেন, তোমায় দেখে আমার চোখ জুড়িয়ে গেল। তুমি বাবা-মায়ের সুসন্তান, দেবতারাও ভালোবাসেন তোমায়, তাই তুমি সশরীরে এখানে পৌঁছোতে পেরেছ।

তারপরেই জটায়ু জিজ্ঞাসা করলেন যুদ্ধের খবর, রাবণের উপর তো তাঁর মহারাগ, রাবণের হাতে মরেছিলেন তিনি, ফলে তিনি জানতে চাইলেন, রামের সঙ্গে যুদ্ধে রাবণ কি পড়েছে!

রাম উত্তর দিলেন, আপনাদের আশীর্বাদে বহু রাক্ষসবীরকেই তুমুল লড়াইয়ে হত্যা করতে পেরেছি। রাক্ষসশহর লঙ্কায় রাবণ এখন একা। তারই তিরে প্রাণ গেছে ভাই লক্ষ্মণের। তারপরই শিবের আদেশে এখানে এসেছি। আপনি দয়া করে বলুন আপনার বন্ধু আমার বাবা এখন কোথায়?

জটায়ু জানালেন, রাজ-ঋষি দশরথ বাস করছেন পশ্চিম দুয়ারে অন্য রাজ-ঋষিদের সঙ্গে। আমার সেখানে যেতে কোনো বাধা নেই। চলো তোমার সঙ্গে যাব।

এবার যাত্রা জটায়ুর সঙ্গে। ভারী সুন্দর সে যাত্রাপথ। সোনার অট্টালিকা, ফুলময় বাগান ও দিঘি, সেখানে আনন্দে খেলে চলেছে কত প্রাণী! আর মনোরম নদী, সে-নদীর জলে জন্মায় মণিমুক্তা, স্বচ্ছ জলের তলায় দেখা যায় সবুজ আর ফুলে ভরা তলভূমি।

তাঁরা পৌঁছোলেন সেই পশ্চিমদ্বারে। সেখানে হীরায় নির্মিত গুহাসব, জটায়ু দেখিয়ে দিলেন এক সোনার বৃক্ষ, মরকতে গড়া তার পত্ররাজি, তারই তলায় বসে আছেন রাজা দিলীপ সঙ্গে তাঁর স্ত্রী সুদক্ষিণা।

রামচন্দ্রকে সশরীরে সেখানে দেখে ভারী আনন্দ পেলেন রাজা দিলীপ আর তাঁর স্ত্রী। রামচন্দ্র তাঁর পরিচয় দিলেন, জানালেন তাঁর বাবা-মা, ভাইদের নামও।

রাজা দিলীপই দেখিয়ে দিলেন দূরে এক সোনার পাহাড়, তারই কাছাকাছি বৈতরণী নদীতীরে অক্ষয় বট, সেখানেই বাস করছেন রামচন্দ্রের বাবা দশরথ, এখনও তিনি রামচন্দ্রের জন্যে দুঃখে কাতর।

জটায়ুকে বিদায় দিয়ে রামচন্দ্র এগিয়ে গেলেন সেই অক্ষয় বটের দিকে, সঙ্গে অবশ্যই আছেন দেবী মায়া, তিনি আছেন আকাশপথে।

ছেলেকে আসতে দেখেই দশরথ বাড়িয়ে দিলেন দুই হাত, বুক ভিজে গেল চোখের জলে, বলে উঠলেন, শিবের আদেশে এই দুর্গম দেশে আসতে পেরেছিস, তোকে দেখে আমার চোখ যে জুড়িয়ে গেল বাছা। ওরে, তোর জন্যে যে কত দুঃখ পেয়েছি, তোরই দুঃখে আমার প্রাণ গেল অকালে। তুমি চিরকাল ধর্মকেই সামনে রেখেছ, তাই তো এমন ঘটল। তাই তো কৈকেয়ী মত্ত হস্তিনীর মতো আমার আশালতা দলে পিষে দিতে পারল।

দশরথ কাঁদলেন অঝোরে।

তখনই রামচন্দ্র বললেন, আমি আজ ঘোর বিপদে, তুমি ছাড়া কে আমায় বিপদ থেকে বাঁচাবে। এখানে আছ তুমি, তোমার তো অজানা কিছুই নেই, কত বড়ো বিপদের মধ্যে আমি আছি। ভয়ানক যুদ্ধে ভাই লক্ষ্মণের প্রাণ গেছে। তাকে ফিরে না পেলে, চাঁদ-সূর্যের পৃথিবীতে আর ফিরব না। এখনই, এখানে তোমার পায়ের তলায় প্রাণ বিসর্জন দেব। দশরথও ছেলের দুঃখে দুঃখী। বললেন, লক্ষ্মণের প্রাণ ফিরে আসবে, তার দেহে এখনও প্রাণ আছে, ভাঙা কারাগারেও যেমন আটকে পড়ে কয়েদি, তেমনই এখনও লক্ষ্মণের দেহ ছেড়ে এখনও প্রাণ বেরিয়ে যেতে পারেনি।

দশরথ বলে দিলেন উপায়, সুগন্ধমাদন পাহাড়, তারই চূড়ায় ফলে মহৌষধ। হনুমানকে পাঠানো হোক সেখানে। গতিতে তিনি সবার আগে, সুতরাং তিনিই এনে দেবেন লক্ষ্মণের প্রাণ-বাঁচানোর জন্য সেই মহা ওষুধ। সেদিনই যমরাজ দশরথকে বলে দিয়েছেন এই উপায়।

তারপরই ভবিষ্যৎবাণী করলেন দশরথ, যুদ্ধে রামেরই জয় হবে। রামেরই তিরে প্রাণ যাবে রাবণের। অযোধ্যার রাজগৃহে আবার ফিরে আসবেন সীতা। কিন্তু —

কিন্তু সুখভোগ রামচন্দ্রের ভাগ্যে নেই, ধূপদানে ধূপ যেমন পুড়েই সুগন্ধ বিতরণ করে তেমন অনেক দুঃখ-কষ্ট সহ্যের মধ্য দিয়েই সারা ভারতজুড়ে ছড়িয়ে পড়বে রামচন্দ্রের খ্যাতি।

আবার নির্দেশ দিলেন দশরথ, পৃথিবীতে এখন মাঝরাত। এখনই যেন রামচন্দ্র লঙ্কায় সেই যুদ্ধক্ষেত্রে ফিরে যান। দ্রুত পাঠিয়ে দেন হনুমানকে। লক্ষ্মণের প্রাণ বাঁচানোর জন্য রাত থাকতে থাকতেই আনতে হবে ওষুধ।

দশরথ পুত্র রামচন্দ্রকে আশীর্বাদ করলেন। কিন্তু ছেলে যখনই বাবার পা ছুঁয়ে প্রণাম করতে গেল, তখনই দশরথ বললেন, পৃথিবীর সেই শরীর আর নেই। তুমি যা দেখছ সে তো শরীরের ছায়া মাত্র। যেমন আয়নায় অথবা জলে দেখা যায় মানুষের শরীর-ছায়া। কী করে ছোঁবে তুমি পা! যাও দ্রুত ফিরে যাও লঙ্কায়!

ফিরে চললেন রামচন্দ্র। সঙ্গে দেবী মায়া। পৌঁছোলেন যেখানে পড়ে আছেন লক্ষ্মণ। তাঁর দেহ ঘিরে জেগে আছেন বীরেরা।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%