মেঘনাদবধ

শুভময় মণ্ডল

সেই বনভূমি ছেড়ে লক্ষ্মণ দ্রুত ফিরে চললেন রামের শিবিরে। যেখানে রামচন্দ্র বসে আছে সেখানে পৌঁছোলেন কতক্ষণ পর। রামের পায়ে প্রণাম করে, বিভীষণকে নমস্কার জানিয়ে, বলে চললেন সেই বনভূমিতে যা যা ঘটেছে সকল কথা! জানালেন দেবী মায়া তাঁকে নির্দেশ দিয়েছেন বিভীষণের সঙ্গে লঙ্কায় ঢুকে নিকুম্ভিলা যজ্ঞঘরে প্রবেশ করতে। কেউ দেখতে পাবে না তাঁদের। মায়া দেবী তাঁদের অদৃশ্য করে রাখবেন।

লক্ষ্মণ রামচন্দ্রকে বললেন, এখন তোমার ইচ্ছা কী বলো রাজা! আদেশ দাও, মেঘনাদকে শেষ করে আসি, দেরি সয় না।

রামচন্দ্র বললেন, তোকে আমি সাপের গর্তে পাঠাব কী করে ? দরকার নেই সীতা উদ্ধার করে। বৃথা সমুদ্র বেঁধে লঙ্কায় এলাম এত বীর সঙ্গে করে। এত লোককে হত্যা করলাম। বাবা, মা, রাজা, আত্মীয়জন সব হারিয়ে বনে এসেছিলাম। সীতাকে হারালাম তারপর। এরপর এখন আর আছে কী আমার! কিচ্ছু দরকার নেই। চল ভাই আবার বনে ফিরে যাই। কী কুক্ষণে লঙ্কায় এসেছিলাম!

লক্ষ্মণ বীরের মতো বলে উঠলেন, আপনি আজ এত ভয় পাচ্ছেন কেন ? আমাদের পক্ষে সকল দেবতা, সহায় পার্বতী। তাকিয়ে দেখুন দেবতাদের ক্রোধ কালো মেঘের মতো ঢেকে দিচ্ছে সোনার লঙ্কা, আর আপনার শিবিরে দেখুন যেন দেবতাদের হাসির আলো! আমায় শুধু আদেশ দিন, দেবঅস্ত্র ধারণ করে রাক্ষসদের ঘরে ঢুকে ওদের হত্যা করে আসব। আপনি জ্ঞানী মানুষ, তাহলে দেবতাদের যা ইচ্ছা তা অবহেলা করছেন কেন ? মঙ্গলঘট কেউ কি পা দিয়ে ভাঙে!

বিভীষণ বললেন, লক্ষ্মণ যা বলেছেন খাঁটি কথা। ঠিকই মেঘনাদ যমদূতের মতো বীর। কিন্তু আজ তাকে ভয় পাবার কোনো কারণ নেই। স্বপ্ন দেখলাম, আমার মাথার কাছে বসে লঙ্কার রাজলক্ষ্মী। বললেন, বিভীষণ! তোর ভাই রাবণ পাপে মত্ত, এই পাপসংসারে কী করে বাস করব! আমি শুধু তোর প্রতি প্রসন্ন, লঙ্কার রাজপদে অভিষেক হবে তোর। আগামীকাল লক্ষ্মণ হত্যা করবে মেঘনাদ, তুমি তাকে সাহায্য করো! ঘুম ভাঙতেই দেখি, স্বর্গের সৌরভে যেন ভরে উঠছে শিবির। সব শুনলেন তো রামচন্দ্র। এখন আদেশ দাও লক্ষ্মণকে সঙ্গে নিয়ে নিকুম্ভিলা যজ্ঞাগারে যাই। তোমার কামনা পূর্ণ হবে।

জলভরা চোখে রামচন্দ্র বললেন, পুরানো কথা মনে পড়লে মন কেঁদে ওঠে, কী করে ভাইকে পাঠাব যুদ্ধে! যেদিন অযোধ্যা ছেড়ে বনে আসছি, সবার সব অনুরোধ ঠেলে সরিয়ে দিয়ে লক্ষ্মণ ছায়ার মতো আমার সঙ্গে চলে এসেছিল যৌবনের সব সুখ জলাঞ্জলি দিয়ে। কেঁদেছিল ঊর্মিলা বউমা, কেঁদে বলেছিলেন সুমিত্রা-মা, লক্ষ্মণ তাঁর একমাত্র ধন, আমি যেন তাকে যতনে রাখি। তুমি বলো বিভীষণ। আমাদের সঙ্গে তো এত বীর আছে, সবাইকে নিয়ে যার সঙ্গে এঁটে উঠতে পারিনি, সেই মেঘনাদের সঙ্গে লক্ষ্মণ একা কী করে লড়াই করবে! দরকার নেই সীতা উদ্ধার করে। মিথ্যা আশায় সমুদ্র পার হয়ে এখানে এলাম।

হঠাৎ আকাশ থেকে সরস্বতী রামচন্দ্রকে বললেন, দেবতাদের কথায় সন্দেহ করা উচিত হচ্ছে না। বললেন, তুমি দেবতাদের প্রিয়, তাহলে দেবতাদের আদেশ কেন অবহেলা করছ? তাকিয়ে দেখো একবার শূন্যে।

আকাশপানে তাকালেন রামচন্দ্র, অবাক বিস্ময়ে দেখলেন আকাশপটে সাপের সঙ্গে ময়ূরের লড়াই। সাপের হিসহিস শব্দের সঙ্গে মিশছে ময়ূরের ডাক। দু-জনের মাঝখানে জ্বলছে বিষের আগুন। অনেকক্ষণ পর ঘোর যুদ্ধের শেষে নিষ্প্রাণ ময়ূরের শরীর লুটিয়ে পড়ল। গর্জন করে উঠল ভয়ানক সাপ।

বিভীষণ রামচন্দ্রকে বললেন, নিজের চোখে সব দেখলেন তো! এ নেহাত ছায়াবাজি নয়। যা ঘটবে তারই লক্ষণ ফুটে উঠল আকাশে। আজই লক্ষ্মণ হত্যা করবে মেঘনাদকে।

শিবিরে প্রবেশ করলেন রামচন্দ্র। নিজের হাতে যুদ্ধসাজে সাজালেন লক্ষ্মণকে। বুকের উপর তারায় ভরা কবচ, ঝুলছে ঝকঝকে তলোয়ার পিঠে বাঁধা উজ্জ্বল ফলক, বাঁ হাতে দেবতাদের দেওয়া ধনুক, আর মাথায় মুকুট যেন সূর্যের আলোয় গড়া। দেব অস্ত্রে সজ্জিত লক্ষ্মণের সে কি রূপ, যেন মাঝ-দুপুরের সূর্য!

রণসাজে সজ্জিত লক্ষ্মণ বেরিয়ে এলেন। ফুলের বাদল ঝরল তাঁর মাথায়। সঙ্গে বিভীষণ। জয়-জয়াকার ধ্বনি উঠল আকাশ-পাতাল-পৃথিবী জুড়ে। আকাশপানে চেয়ে রামচন্দ্র প্রার্থনা করলেন, দেবী দুর্গা যেন ভিখারি রাঘবকে ভুলে না যান। ধর্ম রক্ষার জন্যই তো এ-লড়াই। এ-লড়াইয়ে তিনি যেন তাঁর প্রাণের চেয়ে প্রিয় ভাই লক্ষ্মণকে রক্ষা করেন। তিনি বিভীষণকে বললেন, তাঁরা যেন সাবধানে যাত্রা করেন। ভিখারি রামের একমাত্র ধন আজ বিভীষণের হাতে। রামের জীবন-মরণ আজ তাঁরই হাতে।

রামচন্দ্রের কোনো ভয় নেই। লক্ষ্মণ আজ মেঘনাদকে হত্যা করবেই, বিভীষণ আশ্বাস দিলেন। রামচন্দ্রকে প্রণাম করে যাত্রা করলেন লক্ষ্মণ, সঙ্গে বিভীষণ।

লক্ষ্মণ এবং বিভীষণ এগিয়ে চলেছেন, কেউ তাদের আর দেখতে পাচ্ছে না, তাঁরা চলেছেন অদৃশ্য হয়ে। যেমন ঝোপের আড়াল ধরে বাঘ এগোয় হরিণকে নজরে রেখে, যেমন জলে নেমে স্নান-করা মানুষকে দূর থেকে দেখে জলের তলা দিয়ে এগোয় কুমির, এগিয়ে চলেছেন বিভীষণকে সঙ্গে নিয়ে লক্ষ্মণ।

সারা লঙ্কা শহর দেখতে দেখতে চলেছেন লক্ষ্মণ, শয়ে শয়ে সোনার ঘরবাড়ি, মন্দির, দোকান, উদ্যান। আর অস্ত্রশালা এবং মণিরত্ন বসানো নাট্যশালা। বিভীষণকে বললেন, ধন্য আপনার দাদা রাবণ, দুর্দান্ত একখানা শহর গড়েছেন বটে। এ-নগরের তুলনা কোথায়।

সকাল শুরুর নানা কাজে ব্যস্ত নগর। জলে ফুটেছে পদ্ম। দেখা যায় যুদ্ধ প্রস্তুতির নানা চিহ্নও। মন্দিরে মন্দিরে পূজা-অর্চনায় উৎসবের আবহাওয়া এই সকালে। যেন বাংলার ঘরে ঘরে দোল-উৎসবের আয়োজন। তারই মাঝে নানা নগরবাসীর নানা কথা। কেউ বলছে, চলো! চলো, তাড়াতাড়ি পাঁচিলে উঠি, আজ যুবরাজের যুদ্ধ দেখে চোখ জুড়িয়ে যাবে।

কেউ বলছে, ধুস, পাঁচিলে উঠে কী হবে! পাঁচিলে উঠতে উঠতেই যুদ্ধ কাবার হয়ে যাবে। এক মুহূর্তে যুবরাজ রাম-লক্ষ্মণকে খুন করে ফেলবে। বিভীষণকে বেঁধে এনে ফেলবে রাজসভায়। চলো বরং রাজসভার দিকে যাই!

কত কী দেখতে দেখতে, কত কী শুনতে শুনতে লক্ষ্মণ আর বিভীষণ এগোচ্ছেন মায়ার বলে অদৃশ্য হয়ে। আর হাসছেন মনে মনে। সামনে দেখা যাচ্ছে নিকুম্ভিলা যজ্ঞাগার।

কুশের আসনে বসে ইন্দ্রজিৎ পূজা করছেন দেবতাকে। পরনে পূজার কাপড় এবং উত্তরীয়। কপালে চন্দনের ফোঁটা, গলায় ফুলের মালা। দীপের আলোয়, ধূপের ধোঁয়ায় ভরা সেই ঘর। গণ্ডারের চামড়ায় তৈরি কোশাকোশিতে ভরা গঙ্গার জল, চারিদিকে রাশি রাশি ফুল আর তারই মাঝে সোনার ঘণ্টা, সোনার থালায়, নানা সোনার পাত্রে কত যে উপহার! ধ্যানে মগ্ন মেঘনাদ।

যেমন করে বাঘ ঢুকে পড়ে গোয়ালঘরে, তেমনই, ঠিক তেমন করে লক্ষ্মণ ঢুকলেন যজ্ঞঘরে। পায়ের চাপে কাঁপল মন্দির, খাপে তলোয়ার, তূণীরে তিরগুলি ঝনঝন করে উঠল।

চমকে উঠে চোখ খুললেন ইন্দ্রজিৎ। সামনে দাঁড়িয়ে আছেন একজন যোদ্ধা, দুপুরের চোখ-ঝলসানো সূর্য যেন। গড় হয়ে প্রণাম করে হাতজোড় করে মেঘনাদ বললেন, কী শুভক্ষণে আজ তোমার পূজা করেছি বিভাবসু, তুমি নিজে এসেছ আমাদের ঘরে। কিন্তু আশ্চর্য, তুমি আমাদের শত্রু লক্ষ্মণের রূপ ধরে কেন এলে? একী খেলা তোমার!

আবার তাঁর সামনে এসে দাঁড়ানো সেই বীরের পায়ে প্রণাম করলেন মেঘনাদ।

না না, আমি বিভাবসু নই। আমি রঘুবংশের লক্ষ্মণ, এসেছি তোমায় খুন করতে। এসো শুরু করো লড়াই, বললেন লক্ষ্মণ।

এতদিন কোনো মুহূর্তে কখনো ভয় পাননি মেঘনাদ। ভয় কাকে বলে তিনি জানতেনই না, আজ প্রথম তাঁর মনে ঢুকল ভয়। লক্ষ্মণের দিকে তাকালেন, পথের মাঝে ফণা তোলা বিষধর সাপ দেখলে যেমন ভয়ে থমকে যায় পথিক। যেন সূর্যকে গিলে ফেলে সব আঁধার করে দিল রাহু।

অবাক মেঘনাদ! বললেন, সত্যিই তুমি লক্ষ্মণ। তাহলে তুমি এখানে এলে কী করে। সব দরওয়াজায় পাহারা, পাঁচিলের উপর ঘুরে ঘুরে পাহারা দিচ্ছে শয়ে শয়ে রাক্ষস। সব এড়িয়ে তুমি কী করে এখানে চলে এলে! এদের তুমি ভোলালে কী করে, কী করে ফাঁকি দিলে? একা মানুষ কে আছে এত শত রাক্ষসের সঙ্গে যুদ্ধ করে এখানে চলে আসবে? হে অগ্নিদেব, কেন আমার সঙ্গে ছলনা করছ? তাকিয়ে দেখো, দরজা বন্ধ। লক্ষ্মণ তো আর নিরাকার নন যে বন্ধ দরজা সত্ত্বেও এখানে ঢুকে পড়বেন। হে দেব, আমার সঙ্গে ছলনা কোরো না! বর দাও, আমি যেন রামচন্দ্রকে খুন করে লঙ্কার ভয় দূর করতে পারি। বেঁধে আনতে পারি বিভীষণকে! শোনো, ওই শোনো, যুদ্ধের বাজনা বাজছে, আমার যদি দেরি হয় রাক্ষসসেনাদের মনোবল ভেঙে পড়বে!

তাকিয়ে দেখো, আমি তোর দুশমন। যার আয়ু ফুরিয়ে এসেছে মাটি কেটে সাপ উঠে তাকে কামড়ায়। খুব অহংকার তোর! দেবতাদেরও অবজ্ঞা করিস! এতদিনে আমার হাতে তোর মরণ, আয়, লড়বি আয়। বলেই তলোয়ার বার করলেন লক্ষ্মণ।

ইন্দ্রজিৎ বললেন, সত্যিই যদি তুমি লক্ষ্মণ হও, লড়াইয়ের সাধ তোমার অবশ্য মেটাব। আমি তো লড়াইয়ে পিছোবার মতো কেউ নই। তার আগে তুমি আমাদের আতিথেয়তা গ্রহণ করো। যদিও তুমি আমাদের শত্রু, তবু এসেছ এখানে যখন আমাদের অতিথি তো বটে। আগে আমায় যুদ্ধের সাজ পরে নিতে দাও। যে নিরস্ত্র তাকে আঘাত করা তো বীরের উচিত নয়।

লক্ষ্মণ উত্তর দিলেন, ফাঁদে পড়া বাঘকে পেলে শিকারি তাকে ছেড়ে দেয় নাকি! ঠিক সেইভাবে এখনই তোকে শেষ করব। রাক্ষসবংশে তোর জন্ম, বীরের কী করা উচিত, বা না-উচিত, সে-সব তোর বেলায় খাটে না। যে-কোনো ভাবে শত্রুকে শেষ করতে হবে।

ওরে নির্লজ্জ লক্ষ্মণ, তুই বীরদের কলঙ্ক। তোর নাম শুনলে লোকে কানে আঙুল দেবে। চোরের মতো তুই এখানে এসেছিস। চোরের মারই খাবি। গরুড়ের বাসায় সাপ ঢুকে পড়লে সেই সাপ তার গর্তে ফিরতে পারে নাকি! কে তোকে এখানে আনল, কে-এ-এ? বলেই ভয়ংকর আওয়াজ করে কোশা তুলে ছুড়ে মারলেন লক্ষ্মণের মাথা লক্ষ্য করে।

এই মারের ঘায়ে লুটিয়ে পড়লেন লক্ষ্মণ। ঝড়ে যেমন গাছ পড়ে, তার শরীরের দেব অস্ত্রগুলি ঝনঝন করে উঠল। বয়ে গেল রক্তের ধারা। ছুটে এলেন ইন্দ্রজিৎ, লক্ষ্মণের তলোয়ার যা দেবতাদের দেওয়া, তা আঁকড়ে ধরলেন। তুলতে পারলেন না। ধনুক ধরে টানলেন প্রাণপণে, সে ধনুক লক্ষ্মণের হাতেই থেকে গেল, হাতি যেমন শুঁড়ে জড়িয়ে পাহাড় টানে, ব্যর্থ হয়, তেমনই লক্ষ্মণের তূণ ধরে টানলেন ইন্দ্রজিৎ। সবই তো মায়ার খেলা। নিষ্ফল হয়ে দরজার দিকে তাকালেন হতাশ মেঘনাদ। চমকে উঠে দেখলেন সেখানে শূল হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন বিভীষণ।

দুঃখে ভেঙে পড়ে মেঘনাদ বললেন, এতক্ষণে বুঝলাম কেমন করে লক্ষ্মণ এসে ঢুকল এখানে। কাকা, তোমার উচিত হয়েছে এই কাজ! তুমি নিকষার সন্তান, তোমার সহোদর ভাই রাবণ, কুম্ভকর্ণ, তুমি নিজের বাড়িতে চোর ডেকে এনেছ? না, তোমায় গালমন্দ করব না। তুমি গুরুজন, দরজা ছেড়ে দাও, অস্ত্রের ভান্ডারে যাব। যমের বাড়ি পাঠাব আজ রামের ভাইকে।

বিভীষণ বললেন, বৃথা অনুরোধ কোরো না। আমি রামচন্দ্রের দাস। তোমার অনুরোধে তাঁর বিপক্ষে কাজ করব কী করে!

কাতর হয়ে মেঘনাদ বললেন, কাকা, তোমার কথায় আমার মরতে ইচ্ছে করছে। তুমি রামচন্দ্রের দাস, ও-কথা মুখে আনলে কী করে! তুমি ভুলে গেলে কোন বংশে তোমার জন্ম, হরিণদের রাজা কী কখনো শিয়ালকে বন্ধু বলে। তুমি তো দেখলে, কতখানি নীচ প্রবৃত্তি লক্ষ্মণের, অস্ত্রহীন যোদ্ধাকে সে লড়তে ডাকে, এই কী যুদ্ধের নিয়ম। লঙ্কার দুধের শিশুও তো হাসবে এ-কথা শুনে। পথ ছেড়ে দাও, অস্ত্রাগারে গিয়ে এখনই ফিরে আসব। দেখব, কোন দেববলে বলীয়ান হয়ে লক্ষ্মণ আমার সঙ্গে যুদ্ধের সাহস পায়। যজ্ঞঘরে চোরের মতো ঢুকে পড়ল, ফুলে ঢুকল পোকা। এ-অনাচার সহ্য করব কী করে। তুমিও বা সইছ কী করে!

মাথা নীচু করে মুখখানা মলিন করেই উত্তর দিলেন বিভীষণ, আমায় বৃথা গঞ্জনা দিয়ো না। রাবণ নিজের পাপে নিজে মজেছেন, লঙ্কাকেও ডুবিয়েছেন। পাপে পূর্ণ হয়েছে লঙ্কা। রামচন্দ্রের কাছে গিয়েছি সেই কারণে, অন্যের দোষে আমি ভুগব কেন?

এবার রেগে উঠলেন ইন্দ্রজিৎ। বললেন, তুমি ধার্মিক সকলেই জানে, কিন্তু নিজের বংশ, কুল, আত্মীয়দের ছেড়ে-যাওয়া কোন ধর্ম? শাস্ত্রে বলে গুণবান পরের থেকে গুণহীন আপন ভালো! না, তোমায় বৃথা দোষ দেব না, তুমি যাদের সঙ্গে রয়েছ তাদের সঙ্গদোষে বর্বরতা ছাড়া আর কীইবা শিখবে?

এমন সময় মায়া দেবীর যত্নে জ্ঞান ফিরে পেলেন লক্ষ্মণ। ধনুকে টঙ্কার দিয়ে একটার পর একটা তিরে বিঁধে ফেলতে লাগলেন মেঘনাদকে। রক্তে ভেসে গেল যজ্ঞঘর। ব্যথার অধীর হয়ে মেঘনাদ শাঁখ ঘণ্টা উপহারের থালা, হাতের কাছে যা পেলেন আঁকড়ে ধরলেন, ছুঁড়ে মারলেন লক্ষ্মণের দিকে। মা যেমন শিশুর শরীর থেকে মশা তাড়ায় দু-হাতে, দেবী মায়া ঠিক তেমন করে সব ঠেলে দিলেন দূরে, লক্ষ্মণের শরীরকে ছুঁতেই পারল না সে-সব। মেঘনাদ ছুটে গেলেন লক্ষ্মণের দিকে। কিন্তু তখনই দেখলেন দেবতারাই ঘিরে আছেন লক্ষ্মণকে। দীর্ঘনিশ্বাস ফেলে ব্যর্থ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকলেন মেঘনাদ।

তখন ধনুক ছেড়ে খাপ থেকে তলোয়ার বার করলেন লক্ষ্মণ। তলোয়ারের কোপে রক্তমাখা মেঘনাদ লুটিয়ে পড়লেন মাটিতে। কেঁপে উঠল পৃথিবী, দুলে উঠল সমুদ্র, হাহাকারে ভরে গেল দুনিয়া, ভয়ে কেঁপে উঠল জীবকুল। সভায় বসে আছেন রাবণ, তাঁর মাথার সোনার মুকুট হঠাৎ পড়ল খসে, প্রমীলার ডান চোখ নেচে উঠল, তার নিজের হাতেই অসাবধানে কপালের সিঁদুর গেল মুছে, হঠাৎ অজ্ঞান হলেন মন্দোদরী, মায়েদের কোলে শিশুরা কেঁদে উঠল আতঙ্কে।

অন্যায় যুদ্ধে মরতে চলেছেন মেঘনাদ, কঠিন স্বরে বললেন, লক্ষ্মণ! তুই যোদ্ধাদের কলঙ্ক। তোকে শত ধিক! রাবণের ছেলে আমি, মরণকে কী ভয় পাই! তবে তোর হাতে যে মরলাম, এই চিরদুঃখ যে মনে থেকে গেল। দৈত্যকুল আর ইন্দ্রকে জয় করলাম, সে কী তোর হাতে মরতে! এ-খবর যখন আমার বাবা রাবণ জানবেন, তখন কে তোকে রক্ষা করবে! কেউ পারবে না তোকে বাঁচাতে! জলে স্থলে যেখানেই যাস, রাবণের রোষ থেকে কেউ তোকে বাঁচাতে পারবে না। তোর এ কলঙ্ক কোনোদিন মুছবে না।

তারপর মেঘনাদ স্মরণ করলেন তাঁর বাবা-মায়ের চরণ। মনে পড়ল প্রমীলার কথা, বড়ো অধীর হয়ে উঠল মন। চোখ দিয়ে জল পড়ল। মেঘনাদের রক্ত আর চোখের জলের ধারায় ভিজে গেল পৃথিবী। লঙ্কার পঙ্কজ রবি গেল অস্তাচলে। তাঁর দেহ পড়ে রইল যজ্ঞঘরে।

হঠাৎ ডুকরে কেঁদে উঠলেন বিভীষণ, একী মেঘনাদ! তুমি এমনভাবে পড়ে আছ কেন? রাবণ দেখলে কী বলবেন, কী বলবেন রানি মন্দোদরী, তুমি এমন শয়ানে শুয়েছ। কী বলবেন প্রমীলা সুন্দরী, তোমার ঠাকুরমা নিকষা? ওঠো বাছা, দেখো আমি তোমার কাকা বিভীষণ, আমি ডাকছি! সাড়া দিচ্ছ না কেন! চলো, আমি তোমায় খুলে দেব অস্ত্রাগার! সাজো বীরসাজে! ওঠো বাছা, দুপুরে কী সূর্য ডুবে যায়! শোনো, ওই শোনো, হাতি আর ঘোড়ার ডাক, রাক্ষসসৈন্য সাজছে যুদ্ধে, দুয়ারে দুশমন, জাগো বাছা!

বিভীষণের কান্না দেখে লক্ষ্মণ বললেন, শোক সংবরণ করুন বিভীষণ! লাভ কী শোকে, বিধির ইচ্ছায় আমি এই যোদ্ধাকে হত্যা করলাম, আপনার কী অপরাধ! চলুন, দ্রুত শিবিরে ফিরি! রামচন্দ্র নিশ্চয় চিন্তায় আছেন।

দু-জনে দ্রুত বেরিয়ে এলেন। দ্রুত, দ্রুততর বেগে ফিরে চললেন কাজ সেরে, যেমন বাঘিনির অবর্তমানে তাঁর বাচ্চাদের মেরে দৌড়ে পালায় ব্যাধ, যদি বাঘিনি ফিরে এসে সহসা ধরে! লক্ষ্মণ-বিভীষণ দু-জনেই মায়ার আশীর্বাদে অদৃশ্য হয়ে পার হয়ে যাচ্ছেন শহর লঙ্কা।

শিবিরে পৌঁছে রামচন্দ্রকে প্রণাম করে লক্ষ্মণ খবর দিলেন যে তিনি সফল হয়েছেন, মেঘনাদ নিহত।

লক্ষ্মণকে জড়িয়ে ধরে তাঁর মাথায় চুমা দিয়ে রামচন্দ্র বললেন, লক্ষ্মণের জন্যই তিনি সীতাকে ফেরত পাবেন। জন্মভূমি অযোধ্যা ধন্য, সুমিত্রা-মা ধন্য, পিতা দশরথ ধন্য আর লক্ষ্মণের দাদা হয়ে রামচন্দ্রও ধন্য। তারপরই রামচন্দ্র লক্ষ্মণকে পরামর্শ দিলেন, যে দেবতারা তাঁকে শক্তি দিয়েছেন তাঁদের পূজা করতে। মানুষ নিজের বলে সবসময় দুর্বল, দেবতাদের বলেই বলীয়ান। রামচন্দ্র কৃতজ্ঞতা জানালেন বিভীষণকে।

জয়ধ্বনি উঠল রামচন্দ্রের নামে। সেই জয়ধ্বনিতে চমকে উঠল নগর লঙ্কা।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%