শুভময় মণ্ডল
তাঁর সভামাঝে বসে আছেন দশানন রাবণ। সভাসদজন বসে আছেন তাঁর চারপাশে, নতমুখে।
সারা দুনিয়ায় সে-রাজসভার তুলনা নেই। স্ফটিকে গড়া সভা, রতন-মণিমাণিক্যে ভরা যেন মানস সরোবরের জলে ফুটেছে থইথই পদ্ম। সাদা, লাল, নীল, হলুদ সার সার থামের উপর সোনার ছাদ। ঝালরে ঝুলছে মুক্তো, পদ্মরাগ, হিরে, মরকত। চামর দোলাচ্ছে মেয়ে-প্রহরীরা। এমন প্রাসাদের ধারে-কাছেও আসতে পারবে না ময়দানবের নিজ হাতে গড়া ইন্দ্রপ্রস্থের মণিময় রাজসভা, যা তিনি পান্ডবদের জন্যে বানিয়েছিলেন।
এমন অসামান্য সভামাঝে বসে আছেন রাবণ, পুত্রশোকে বেবাক। নি:শব্দে চোখের জল পড়ে ভিজে যাচ্ছে তাঁর পোশাক। তাঁর সামনে হাত জোড় করে দাঁড়িয়ে আছেন মকরাক্ষ নামে এক দূত। ধুলো আর রক্তে মাখা তাঁর সারা শরীর। রাবণ পুত্র বীরবাহুর সঙ্গে শয়ে শয়ে রাক্ষসযোদ্ধা মরেছিল সে-দিনের যুদ্ধে, তার মধ্যে একমাত্র বেঁচেছিলেন এই মকরাক্ষ। তিনি এসেছিলেন বীরবাহুর মৃত্যুর খবর দিতে। তাঁর মুখেই পুত্রের মৃত্যুসংবাদ শুনে শোকে হতবাক রাবণ। রাজার দুঃখে দুঃখী সকল সভাজন।

অনেকক্ষণ পর আবার সচেতন হয়ে বিষাদের দীর্ঘনিশ্বাস ফেলে রাবণ বললেন, তোর এ-কথা শুনে মনে হচ্ছে যেন রাতের স্বপ্ন দেখছি, ওরে দূত! যার বীরত্বে দেবতারাও কাতর হড়ে পড়েন, সেই ধনুকধারী বীরকে হত্যা করল ভিখারি রাম? হায় রে বীরবাহু, বাবা আমার, কোন পাপে তোকে হারালাম! এ যন্ত্রণা সইব কেমন করে? এই ভয়ানক যুদ্ধে আমার কুল মান আর কে রাখবে? বনের মধ্যে কাঠুরিয়া যেমন একখানা গাছের ডালপালাগুলো আগে ছেঁটে তারপর গাছটাকে কাটে ঠিক তেমন করে এই ভয়ানক শত্রু আমাকে দুর্বল করছে। এ-শত্রুর অস্ত্রে আমি সবংশে নি:শেষ হয়ে যাব! তা যদি না হয়, ভাই কুম্ভকর্ণ কী অকালে মরত আমার দোষে, আর এত রাক্ষসযোদ্ধা! শূর্পণখা রে! কী কুক্ষণে পঞ্চবটি বনে এ কালসাপকে তুই দেখেছিলি! কী কুক্ষণে আগুনের শিখার মতো সীতাকে আমি তুলে আনলাম! সবই তোর জন্যে শূর্পণখা! ইচ্ছে করছে সব ছেড়েছুড়ে বনে চলে যাই! আমার আলোয় ভরা প্রাসাদের দীপগুলো সব যে একে একে নিবে গেল! এ অন্ধকারে কী করতে বাস করব?
মন্ত্রী সারণ হাতজোড় করে বললেন, আপনি ভেঙে পড়বেন না, রাজন। আকাশছোঁয়া পাহাড় যদি ভেঙে পড়ে বজ্রাঘাতে তাতেও কিন্তু পৃথিবী স্থির থাকে। এ পৃথিবীর সবই মায়া, এখানকার সুখ-দুঃখ সবই মায়া।
রাবণ বললেন, আপনি যা বললেন মন্ত্রী, সবই বুঝি, সবই মায়া। তবু হৃদয়ের ধন যদি কেউ ছিঁড়ে নেয়, হৃদয় তো বিকল হবেই। তারপরই রাবণ দূতের দিকে চেয়ে বললেন, বলো, কেমন করে যুদ্ধে পতন হল বীরবাহুর।
রাজাকে প্রণাম করে জোড়হাত হয়ে দূত শুরু করল, কীভাবে বর্ণনা করব বীরবাহুর বীরত্ব! শত্রুদের মাঝে প্রবেশ করলেন ধনুর্দ্ধর বীরবাহু। মেঘের গর্জন শুনেছি, দ্রুত ছুটে-যাওয়া বজ্রপাত দেখেছি, সমুদ্রের উত্তাল ঢেউ দেখেছি, কিন্তু বীরবাহুর সেই হুংকার আর ধনুকের টংকারের মতো কিছু শুনিনি! এখনও সেই হুংকারের কথা মনে পড়লে বুক আমার কাঁপছে! শত্রুদলের মাঝে সৈন্যদের নিয়ে বীরবাহু প্রবেশ করলেন, যেমন হাতিদের দলনেতা হাতির পালকে পথ দেখায়। ধুলোয় ভরে গেল আকাশ, বিদ্যুতের মতো আকাশ ভরে ছুটছে তির। হে লঙ্কার রাজা আপনার ছেলে যে কী দারুণ লড়াই লড়ছিল। তখনই এলেন রামচন্দ্র! এইটুকু বলেই কেঁদে ফেললেন দূত, সভায় হাজির সকলেও কাঁদল নীরবে।
চোখভরা জল নিয়ে আবার বললেন রাবণ, বলো, বলো! শুনি কেমন করে রাম আমার পুত্রকে হত্যা করলে?
দূত বলল, রাজা, আমি কী করেই বা বলব আর আপনিই বা কী করে শুনবেন? আগুনের মতো চোখওয়ালা সিংহ দাঁত কড়মড় করে যেমন ঝাঁপিয়ে পড়ে ষাঁড়ের ঘাড়ের ওপর তেমনই রামচন্দ্র আক্রমণ করলেন বীরবাহুকে! যেন ঝড়ে দুলে উঠল সমুদ্র! আর কী বলব! পূর্বজন্মের দোষে একা বাঁচলাম আমি! হায়, হায়! কেন আমি বীরবাহুর সঙ্গে মরলাম না! আমার কোনো দোষ নেই রাজা! পালিয়ে আসিনি, বুক দেখুন শত্রুর আঘাতে ক্ষতবিক্ষত, পিঠে কোনো অস্ত্রের দাগ পাবেন না!
সাবাস! দূত সাবাস! তোর কথা শুনে কার না লড়াইয়ের ইচ্ছা জাগে! বললেন রাবণ। সভার সকলকে ডেকে বললেন, চলুন যাই দেখি, কেমন করে পড়ে আছে আমার বীরবাহু, দেখে চোখ জুড়াই!
প্রাসাদের ছাদের উপরে উঠলেন রাবণ, চারদিকে চেয়ে দেখলেন তাঁর সোনার লঙ্কা। ফুলবন মাঝে সার সার সোনার ঘর-দুয়ার। হিরের চূড়াওয়ালা মন্দির। রঙিন দোকানে রতনের পশরা। আহা সারা দুনিয়ার সেরা শহর যেন লঙ্কা।
উঁচু প্রাচীর দিয়ে ঘেরা লঙ্কা, প্রাচীর উপরে ভয়ানক সব অস্ত্র নিয়ে পাহারা দিচ্ছে রাক্ষসপ্রহরীরা। নগরের সিংহদ্বারগুলি সব বন্ধ। আর দূরে নগর ঘিরে রয়েছে শত্রুরা। নগরের পূর্বদ্বারে থানা গেড়ে আছে নীল, দক্ষিণদুয়ারে অঙ্গদ, উত্তর দুয়ারে সুগ্রীব আর পশ্চিম দুয়ারে স্বয়ং রামচন্দ্র বসে আছেন লক্ষ্মণ, বিভীষণ, হনুমানকে সঙ্গে নিয়ে, তিনি বিষণ্ণ। সীতাকে হারানোর কারণেই তাঁর বিষণ্ণতা। রাবণ তাকালেন রণক্ষেত্রের দিকে। শকুন, শিয়াল, কুকুরদের ভিড়, মাংস নিয়ে কাড়াকাড়ি, কেউ আপনমনে রক্তস্রোত চাটছে। যোদ্ধাদের মৃতদেহ পড়ে আছে, আর হাতি ও ঘোড়ার শব, ভাঙাচোরা রথ, আর অগণন অস্ত্র। তারই মাঝে অনেক শত্রুকে মৃতশরীরে চেপে-পিষে দিয়ে পড়ে আছে বীরবাহু।
ডুকরে উঠে রাবণ বললেন, যে শয্যায় তুমি শুয়েছ সন্তান আমার, সকল বীরই এমনভাবে মরণ কামনা করে, জন্মভূমি রক্ষার জন্য শত্রুকে নাশ করে এমন শেষশয্যায় শুতে কে ভয় পায়! কিন্তু একী বিধির বিধান, জগৎপিতার খেলা! পুত্রহারা পিতাকে দুঃখ দিয়ে তুমি আনন্দ পাও। হা, বীরবাহু তোকে হারিয়ে বাঁচব কী করে!
দূরে তিনি দেখলেন সমুদ্র, তার মাঝে রামের জন্যে পথ করে ভাসছে পাথরের সারি। যেন রাজপথের প্রশস্ত সেতু। অভিমানে বলে উঠলেন রাবণ, হে সমুদ্র,গলায় কেমন সুন্দর মালা পরেছ। ধিক্কার তোমায় সমুদ্র, এই মালা কি তোমায় মানায়, কী করে কিনল তোমায় রাম, ভাল্লুককে গলায় দড়ি বেঁধে খেলায় বাজিকর, সিংহকে কী বাঁধতে পারে! পাথরের পথ সব ডুবিয়ে দিয়ে নিজের অপবাদ ঘোচাও, নিজের বুকে কলঙ্করেখা রেখো না। ডুবিয়ে মারো আমার শত্রুকে।
আবার রাবণ গিয়ে বসলেন তাঁর সভায় সোনার সিংহাসনে। শোকে মগ্ন নীরব রাজাকে ঘিরে বেবাক সভাসদগণ। কোথা থেকে যেন কান্নার রোল এগিয়ে আসছে, তার সঙ্গে মিশছে নূপুরের আওয়াজ। সঙ্গিনীদের নিয়ে সভায় এলেন চিত্রাঙ্গদা। বীরবাহুর শোকে বিধ্বস্ত। যেন বিহ্বল মা-পাখি যার বাসা থেকে ছানা চুরি করে খেয়ে গেছে কালসাপ! তাঁর উপস্থিতিতে সারা সভাতেই যেন শোকের ঝড় বয়ে গেল। রাবণের পানে চেয়ে তিনি বললেন, আমার তো একটিই রতন ছিল, আমি তা আপনার কাছে গচ্ছিত রেখেছিলাম, গাছের কোটরে মা-পাখি যেমন তার ছানাকে রাখে। কোথায় আমার সে রতন? তুমি তাকে কেমন করে কোথায় রেখেছ রাজা? কোথায় রেখেছ রাজা কাঙালের ধন!
রাবণ উত্তর দিলেন, তুমি আমায় মিথ্যে গক্ষ্মনা দিচ্ছ। গ্রহের দোষে আমি আজ হতভাগ্য, একে একে বীরশূন্য হয়ে যাচ্ছে লঙ্কা, সব ছারখার করে দিচ্ছে রাম, তার অনুরোধে সমুদ্রও পায়ে বেড়ি পরেছে। এক পুত্রশোকে তুমি আকুল, আর আমার বুক যে ফেটে যাচ্ছে শত পুত্রশোকে।
চিত্রাঙ্গদা কেঁদে চলেছেন পুত্রশোকে।
রাবণ আবার বললেন, এমন কান্না কি তোমার শোভা পায়, তুমি যে বীরের মা। তোমার ছেলের বীরত্বে লঙ্কার মুখ উজ্জ্বল হয়েছে, আর তুমি কাঁদছ।
এবার কথা বললেন চিত্রাঙ্গদা, দেশের শত্রুকে যে বিনাশ করে তার জন্ম গৌরবের। ঠিকই, আমি বীর সন্তানের মা, কিন্তু ভাবো, কোথায় তোমার লঙ্কা আর কোথায় আযোধ্যা! রামচন্দ্র কি তোমার সোনার সিংহাসন দখল করতে এসেছে? তাহলে তাকে দেশের শত্রু বলছ কেন ? সাপ তো মাথা নীচু করেই চলে, কিন্তু মারলেই সে তো ফণা তুলবে। লঙ্কায় আগুন জ্বালাল কে, আমায় বলো তো রাজা? তুমি নিজের কর্মফলে লঙ্কার সর্বনাশ করছ, নিজেরও সর্বনাশ করছ।
সঙ্গীদল নিয়ে অন্দরমহলে ফিরে গেলেন চিত্রাঙ্গদা। সিংহাসন ছেড়ে গর্জন করে উঠলেন রাবণ, এতদিনে আমার লঙ্কা বীরশূন্য। কাকে আর যুদ্ধে পাঠাব। নিজেই যাব যুদ্ধে, সবাই তৈয়ার হও। দেখি, কেমন শক্তি রামের! আজ দুনিয়ায় হয় রাম থাকবে, নয়তো রাবণ।
যুদ্ধসাজে বার হল রাক্ষসসৈন্য। বেজে উঠল দুন্দুভি। বার হল হাতিশাল থেকে হাতি, ঘোড়াশাল থেকে ঘোড়া। অজস্র পদাতিক সৈন্য, কী-বা তাদের অস্ত্রের শোভা। বনভূমি জুড়ে আগুন লাগলে যেমন হয়, তেমনই অস্ত্র, বর্মের আলোয় ঝলসে উঠল আকাশ, টলমল করে কেঁপে উঠল লঙ্কা, আর সমুদ্র।
সমুদ্রতলে সোনার পদ্মবনে প্রবালের আসনে বসে মুক্তো দিয়ে চুল বাঁধছিলেন জলদেবী। চমকে উঠলেন তিনি। হঠাৎ কেন সমুদ্র উত্তাল হল? কেন থরথর করে কেঁপে উঠছে তাঁর মুক্তাময় প্রাসাদচূড়া? দুষ্ট ঝড় বুঝি তাঁর টেউগুলির সঙ্গে লড়াই বাধিয়ে দিল?
তাঁর সই মুরলা উত্তর দিলেন, না না, ঝড়ের দোষ দিয়ো না। ঝড় নয়, রামচন্দ্রকে হারিয়ে দিতে ঝড়েরই মতো রাবণ সাজছে রণসাজে!
তখন বারুণী নামের সেই জলদেবী তাঁর সই মুরলাকে পাঠালেন লক্ষ্মীর গৃহে, যিনি লঙ্কায় বাস করছেন। হাতে দিলেন সোনার পদ্ম।
মুরলা প্রবেশ করলেন লঙ্কায় লক্ষ্মীর আবাসে। রত্নময়, ফুলময় অসামান্য সেই গৃহ, সোনার প্রদীপে সুগন্ধি জ্বলছে সারি সারি আলো, তার আলোও ম্লান হয়ে যায় লক্ষ্মী রূপে। গালে হাত দিয়ে পদ্মের আসনে বসে আছেন লক্ষ্মী, মুরলাকে দেখে তাঁর আসার কারণ জিজ্ঞাসা করলেন, জানতে চাইলেন তাঁর সই জলদেবী বারুণী ভালো আছেন কিনা? বারুণীর কুশল সংবাদ দিয়ে মুরলা লঙ্কার সংবাদ জানতে চাইলেন লক্ষ্মীর কাছ থেকে। দিন দিন বেড়ে-যাওয়া লঙ্কার দুর্দশার কথা বললেন লক্ষ্মী, ঘরে ঘরে স্বামীহারা নারী, পুত্রহারা মায়ের কান্না। লক্ষ্মী জানালেন, তিনিও লঙ্কা ছাড়ার কথাই ভাবছেন। দিন-রাত্রি এত নারীর কান্নায় তাঁর বুক ভেঙে যাচ্ছে।
তারপর তাঁরা দু-জনে রাক্ষসকুমারীর রূপ ধারণ করে পথে নামলেন লঙ্কার যুদ্ধপ্রস্তুতি দেখতে। পথের পাশে মন্দিরের দুয়ারে দাঁড়িয়ে দেখলেন, রাজপথ দিয়ে কাতারে কাতারে সেনা লঙ্কা ছেড়ে চলেছে যুদ্ধক্ষেত্রে। রথ চলেছে ঘরঘর করে, ছুটছে হাতি-ঘোড়া। উড়ছে পতাকা। বাজছে যুদ্ধের বাজনা। পথের দু-পাশে সোনার ঘর-গেরস্থালি থেকে রাক্ষস-বউয়েরা মঙ্গলধ্বনি দিয়ে সেনাদের মাথায় ছড়িয়ে দিচ্ছে ফুল।
মুরলা লক্ষ্মীকে জিজ্ঞাসা করলেন, কোন কোন রথী চলেছেন যুদ্ধে? লক্ষ্মী একে একে চিনিয়ে দিলেন, বিরূপাক্ষ, কালনেমি, তালজঙ্ঘা আর প্রমত্তকে। তখনই, মুরলা জিজ্ঞাসা করলেন ইন্দ্রজিৎ মেঘনাদ কোথায়? তাঁকে দেখা যাচ্ছে না কেন লঙ্কায়?
লক্ষ্মী উত্তর দিলেন, মেঘনাদ বোধহয় প্রমোদকাননে। তিনি জানেন না যে, যুদ্ধে বীরবাহু নিহত হয়েছে আজ। হঠাৎ লক্ষ্মী বললেন মুরলাকে, তুমি চলে যাও জলদেবীর আবাসে। তাঁকে বোলো, পাপের কাদায় পূর্ণ হয়েছে সোনার লঙ্কা। খুব শীঘ্রই আমি লঙ্কা ছেড়ে চলে যাব। এখন আমি যাই মেঘনাদের কাছে। তাঁকে লঙ্কায় আনতে হবে। তাতেই যা ঘটার তা ঘটবে।
মেঘনাদের দাই-মা প্রভাষা রাক্ষসীর রূপ ধরে লক্ষ্মী প্রবেশ করলেন মেঘনাদের বাগানবাড়িতে। সোনার থামওয়ালা বারান্দা নিয়ে বাগান ঘেরা সেই সোনার প্রাসাদ। চারদিকে থইথল ফুল, বইছে ঝর্না, গাছে ডাকছে কোকিল। সোনার দুয়ারে পাহারা দিচ্ছে ধনুক হাতে নারী-প্রহরীরা। নানা বাদ্যযন্ত্রে গান বাজছে সেখানে সারাক্ষণ।
দাই-মা (আসলে তিনি লক্ষ্মী)-কে দেখে মেঘনাদ জিজ্ঞাসা করলেন, কেন তিনি এসেছেন, লঙ্কার সকলে ভালো আছে তো!
হাতে লাঠি প্রভাষা রাক্ষসীর বেশধারী লক্ষ্মী জানালেন, লঙ্কার দশা বলবার মতো নয়! বীরবাহুর মৃত্যু হয়েছে, যুদ্ধে নিজে যাবেন বলে তৈয়ার হচ্ছেন রাবণ!
শুনে অবাক হলেন মেঘনাদ। লক্ষ্মী তাঁকে বললেন, রাক্ষসকুলের মান রাখতে তুমি যাও মেঘনাদ, এখনই যাও লঙ্কায়!
গলার ফুল মালা ছিঁড়ে ফেললেন ইন্দ্রজিৎ, নিজেকে ধিক্কার দিয়ে বললেন, শত্রুদল ঘিরে রেখেছে লঙ্কা, আর আমি বসে আছি বাগানবাড়িতে! রথ কই! আনো রথ, এখনই যাব যুদ্ধে, শেষ করব শত্রু।
মেঘরঙা রথে উঠে যাত্রা করবেন মেঘনাদ। তখনই ছুটে এলেন তাঁর বউ প্রমীলা। তাঁকে ফেলে কোথায় যাচ্ছেন ইন্দ্রজিৎ ?
প্রমীলাকে আশ্বাস দিলেন মেঘনাদ, শত্রু শেষ করে তাড়াতাড়ি তিনি ফিরে আসবেন।
আকাশপথে রথে চড়ে দ্রুত রাবণের কাছে হাজির হলেন মেঘনাদ। লঙ্কায় তখন সাজো-সাজো রব। বললেন, বাবা! শুনলাম নাকি আমার বাণে নিহত হওয়ার পরও বেঁচে উঠেছে রামচন্দ্র। কী জানি কী মায়া! আজ অনুমতি দাও, হয় তাদের হত্যা করব, না হয় বেঁধে এনে ফেলব তোমায় পায়ে।
ছেলেকে বুকে বেঁধে মাথায় চুমা দিয়ে রাবণ বললেন, তুমিই শেষ ভরসা! তোমাকে এই কাল যুদ্ধে পাঠাতে মন সাড়া দেয় না। আমার ভাগ্য বড়ো খারাপ! নইলে কেউ শুনেছে জলে পাথর ভাসে, মানুষ মরে বেঁচে ওঠে!
সদম্ভে বলে উঠলেন মেঘনাদ বীর, রামচন্দ্র কী এমন মানুষ যে তুমি তাকে ভয় পাচ্ছ ? আমি থাকতে তোমায় যদি যুদ্ধে যেতে হয়, এ অপবাদ রাখব কোথায়! রামকে দু-বার হারিয়েছি, আর একবার চাই অনুমতি, দেখি আমার হাত থেকে কোন ওষুধে বাঁচে।
রাবণ বললেন, কুম্ভকর্ণকে জাগিয়ে যুদ্ধে পাঠালাম, হায় সেও মরল। দেখো বাজ-পড়া গাছের মতো সে পড়ে আছে সমুদ্রতীরে। ঠিক আছে, তুমি যদি যুদ্ধে যেতে চাও, আগে নিকুম্ভিলা যজ্ঞ শেষ করে তবে যাও। তোমাকেই সেনাপতি পদে বরণ করলাম। সন্ধ্যা হয়ে এল, আজ নয়, কাল যেয়ো রামের সঙ্গে লড়াই করতে।
মেঘনাদের মাথায় রাবণ দিলেন গঙ্গাজল। লঙ্কার আকাশে বাতাসে গান উঠল বেজে—বুঝি শেষ হল দুঃখের রাত। বলো, বলো সবে গলা ছেড়ে, যুদ্ধসাজে সাজছেন ইন্দ্রজিৎ মেঘনাদ। থরথর ভয়ে কেঁপে উঠুক শত্রুশিবির, রামচন্দ্র-বিভীষণ আর দন্ডকবনের প্রাণীরা।
বেজে উঠল রাক্ষসবাদ্য, লঙ্কা তোলপাড় জয়-জয় গর্জনে।

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন