শুভময় মণ্ডল
রাত্রি নেমেছে। বাগানবাড়িতে তো ইন্দ্রজিৎ মেঘনাদ ফেরেননি। ভীষণ দুশ্চিন্তায় কাতর তাঁর বউ প্রমীলা। জলভরা চোখে অস্থির হয়ে ঘর-বার করছেন। কখনও ছাদে উঠে তাকিয়ে থাকছেন লঙ্কার দিকে। আঁচলে চোখ মুছছেন বারবার। থেমে গেছে সব বাজনা। সই বাসন্তীকে বলছেন, ইন্দ্রজিৎ এখনই আসছি বলে সেই যে চলে গেলেন, কী কাজে তাঁর এত দেরি হচ্ছে!
তাঁকে সান্ত্বনা দিলেন বাসন্তী। বললেন, মেঘনাদের শরীর দুর্ভেদ্য। দেবতা-মানুষ কারোরই কোনো অস্ত্র আঘাত করতে পারে না তাঁকে। সুতরাং প্রমীলার চিন্তা কী ? রামচন্দ্রকে হত্যা করে বীর মেঘনাদ শীঘ্রই ফিরে আসবেন।
বাসন্তী সই প্রমীলাকে পরামর্শ দিলেন, ফুল তুলে মালা গাঁথবার জন্য। চিকন করে মালা গাঁথা-থাকলে প্রমীলা পরিয়ে দিতে পারবেন মেঘনাদ ফিরে এলে তাঁর গলায়।
আঁচলভরে তাঁরা তুলতে লাগলেন ফুল। বনে তখন জোনাকির মণিমালা। ফুলে ফুলে শিশিরের মতো ঝরে পড়ল প্রমীলার চোখের জল। মালা তো গাঁথা হল চিকন করে, কিন্তু মালা পরানো হবে যাঁর গলায়, সেই মেঘনাদ ফিরলেন কই? তখনই প্রমীলা বলে উঠলেন, চলো আমরা সবাই লঙ্কাপুরে যাই, যেখানে গেছেন ইন্দ্রজিৎ।
বাসন্তী বললেন, লঙ্কায় যাবে কী করে! রামচন্দ্রের সেনাদল তো চারদিক দিয়ে ঘিরে রেখেছে লঙ্কা। লক্ষ লক্ষ শত্রুসেনা ভয়ংকর অস্ত্র হাতে টহল দিয়ে ফিরছে।
ক্ষোভে ফুঁসে উঠলেন দানবকন্যা প্রমীলা। বললেন, বাসন্তী তুই বলছিস কী! পর্বত ছেড়ে নদী যখন সমুদ্রের দিকে যায়, তার গতি কেউ রুখতে পারে! আমি দানবের মেয়ে, রাক্ষসকুলের বউ। আমার শ্বশুর রাবণ আর স্বামী মেঘনাদ, আমি কী ভিখারি রামচন্দ্রকে ভয় পাই!
প্রমীলা সিদ্ধান্ত নিলেন, নিজের বাহুবলেই তিনি লঙ্কায় ঢুকবেন। দেখা যাক কী করে আটকায় রামচন্দ্র!
নারী সৈন্যদল সেজে উঠল প্রমীলার নির্দেশে। ঝনঝন করে বাজছে তাদের অস্ত্রশস্ত্র, টঙ্কার উঠছে তাদের ধনুকে, সেইসঙ্গে বোল উঠছে তাদের নূপুরে-চুড়িতে। ঘোড়ায় চড়ে চলেছে একশত চেড়ী। রাগে লজ্জাভয় সব ঝেড়ে ফেলে প্রমীলা নিজেও সাজলেন দুর্দান্ত রণসাজে। বুকে বেঁধেছেন কবচ, কোমরে দুলছে মণিমাণিক্যের খাপে খরশান তলোয়ার, হাতে দীর্ঘ বল্লম—যেন মহিষাসুরকে বধ করতে চলেছেন দেবী দুর্গা।
প্রমীলা হাঁক পাড়লেন তাঁর যোদ্ধা-সইদের উদ্দেশ্যে, শোন তোরা, লঙ্কায় প্রবেশ করব ইন্দ্রজিতের কাছে পৌঁছোবার জন্যে। দেখব কত বড়ো বীর রামচন্দ্র! রাম-লক্ষ্মণদের সঙ্গে যুদ্ধ করেই প্রবেশ করব লঙ্কায়। বিভীষণকে বেঁধে নিয়ে ভরে দেব কারাগারে। নইলে যুদ্ধে মরব, যা থাকে কপালে।
স্বামীর খোঁজে চলেছেন প্রমীলা, রাতের আঁধারে যেন আগুনের শিখা। প্রমীলাসহ যোদ্ধাদল হাজির হল পশ্চিম দুয়ারের দিকে। বেজে উঠল একসঙ্গে একশো শাঁখ, একশো ধনুকে পড়ল টঙ্কার। ভয়ে কেঁপে উঠল সবাই। বাসায় কেঁপে উঠল রাতের পাখি, বনের পশুরা। সেখানে পাহারায় হনুমান। পথ আগলে দাঁড়ালেন তিনি।

প্রমীলার যোদ্ধা-সই, নাম তাঁর নৃমুন্ডমালিনী, তিনি বলে উঠলেন, তোর সঙ্গে যুদ্ধ করব কী ? তুই ক্ষুদ্র জীব, বর্বর। শিয়ালের সঙ্গে সিংহী লড়াই করে নাকি! ডেকে আন তোর প্রভু রামকে। বল গিয়ে তাঁরে, ইন্দ্রজিৎ পত্নী প্রমীলা লড়াই করে প্রবেশ করবে লঙ্কায়।
প্রমীলাকে দেখে হনুমান বাকহারা। এমন রূপ তিনি দেখেছেন নাকি! সাগরপার হয়ে লঙ্কায় ঢুকে পড়ে অনেক নারী তিনি দেখেছেন, কিন্তু পৃথিবীতে এ-রূপের তুলনা কোথায়? মনে মনে বললেন, ধন্য বীর মেঘনাদ, যাঁর পাশে থাকে এমন বিদ্যুতের মতো নারী। মুখে তিনি বললেন, তোমাদের আবেদন কী বলো? তোমরা নারী, তোমাদের সঙ্গে তো আমাদের প্রভু রামচন্দ্রের কোনো বিরোধ নেই। তোমরা কী চাও বলো, জানাব রামচন্দ্রকে।
প্রমীলা তখন হনুমানের সঙ্গে তাঁর দূত সেই নৃমুন্ডমালিনীকেই পাঠালেন।
শিবিরে বসে আছেন রামচন্দ্র। সামনে লক্ষ্মণ, পাশে বিভীষণ, এবং অন্যান্য বীরেরা। দীপের আলোয় রামচন্দ্র দেখছিলেন আশ্চর্য সেইসব দেবঅস্ত্র যা চিত্ররথ দিয়ে গেলেন কিছুক্ষণ আগে। প্রবেশ করলেন হনুমানের সঙ্গে প্রমীলার দূতী নৃমুন্ডমালিনী। নিজের পরিচয় দিয়ে সে বললে, নারী যোদ্ধাদের নিয়ে প্রমীলা যাবেন লঙ্কায়। হয় তাঁর সঙ্গে যুদ্ধ করুন রামচন্দ্র, নয়তো পথ ছেড়ে দিন। যে-কোনো যুদ্ধে আমরা ভয় পাই না।
রামচন্দ্র বললেন, আমি অকারণে কারও সঙ্গে বিবাদ করি না। রাবণ আমার শত্রু। তোমরা নারীরা কেন আমার শত্রু হবে। নির্ভয়ে লঙ্কায় যাও। প্রমীলার পতিভক্তিতে আমি মুগ্ধ। আমি আজ ধনহীন ভিখারি, তোমাদের কী দিতে পারি! আশীর্বাদ করি, সুখে থাকো!
হনুমানকে পথ ছেড়ে দিতে বললেন রামচন্দ্র। তারপর বিভীষণকে বললেন, চলো বন্ধু শিবিরের বাইরে যাই, দেখি তোমার ভাইয়ের পুত্রবধূকে।
বাইরে এলেন রামচন্দ্র। নারী বাহিনীর মাঝে দেখলেন প্রমীলাকে। যেন একঝাঁক তারার মাঝে পূর্ণশশী। যেন সিংহের পিঠে দেবী দুর্গা।
রামচন্দ্র বললেন, একী দেখলাম! এ যে রাতের স্বপন মনে হয়।
বিভীষণ বললেন, স্বপ্ন নয়। কালনেমি দৈত্যের মেয়ে প্রমীলা এমনই রূপময়ী, এমনই শক্তিবতী।
রামচন্দ্র বললেন, মেঘনাদ সত্যিই বীরদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ, সিংহের মতো। কিন্তু সিংহের সঙ্গে সিংহীও যে এসে মিলল। আমাদের মতো হরিণের পালকে রক্ষা করবে কে ? এখন উপায় কী ? তোমার দাদা রাবণ কালসাপের মতো, আর তার বিষদাঁত মেঘনাদ। এই বিষদাঁত যদি ভাঙতে পারি, তবে রাবণও মরবে। নইলে সাগরে পথ বেঁধে লঙ্কায় তো মিথ্যে আসা!
লক্ষ্মণ রামের পায়ে মাথা ছুঁইয়ে বললেন, রাক্ষসে আর ভয় পাব কেন? আপনার সহায় তো স্বয়ং দেবরাজ। অধর্মের জয় হতে পারে না। আগামীকালই আমার হাতে মরবে মেঘনাদ। রাবণের পাপে মরবে তার ছেলে। চিত্ররথ তো বলে গেলেন, লঙ্কার পঙ্কজ-রবি যাবে অস্তাচলে। তবে আর ভাবছেন কেন?
রামচন্দ্র নির্দেশ দিলেন লক্ষ্মণ আর বিভীষণকে বিভিন্ন দুয়ারে পাহারা ঠিকঠাক আছে কিনা দেখবার জন্যে। বীরবাহুর সঙ্গে লড়াইয়ের পর সে রাতে সবাই বড়ো ক্লান্ত।
প্রমীলা তাঁর নারীবাহিনী নিয়ে লঙ্কার সোনার দুয়ারে পৌঁছোতেই রাক্ষসরা আক্রমণ করল অস্ত্র তুলে।
নৃমুন্ডমালিনী, প্রমীলার সেই দূতী বলল চিৎকার করে, অন্ধকারে কাদের দিকে অস্ত্র হানছিস? দেখ চেয়ে, আমরা রাক্ষসকুলের নারী, তোদের দুশমন নই।
অমনি হুড়কা খুলে দুয়ারি দুয়ার দিল হাট করে। প্রমীলা লঙ্কায় প্রবেশ করলেন। সেই রাতেই লঙ্কা আনন্দে জয়ধ্বনি দিল। নারীরা বার হয়ে এসে হুলুধ্বনি তুলল, বৃষ্টির মতো ছুড়ে দিল ফুল। প্রমীলা প্রবেশ করলেন ইন্দ্রজিৎ মেঘনাদের গৃহে। দু-জনে কথা হল কত। যুদ্ধের সাজ খুলে ফেললেন প্রমীলা। ঘরের মনোহর সাজ-পোশাক পরে দু-জনে সোনার আসনে বসলেন পাশাপাশি।
কৈলাসে বসে পার্বতী দেখছিলেন সব। সই বিজয়াকেও দেখালেন, যোদ্ধার সাজে প্রমীলা তাঁর বাহিনী নিয়ে ঢুকছেন লঙ্কায়। পৃথিবীতে এমন রূপ কার আছে?
বিজয়া বললেন সেই একই কথা, প্রমীলা যেমন রূপময়ী তেমনই শক্তিবতী। তাঁকে স্নেহও করেন পার্বতী। কিন্তু এখন কী হবে? পার্বতী কী করে কথা রাখবেন। লক্ষ্মণকে জেতাবেন কী করে? একা মেঘনাদ পৃথিবী জয় করতে পারে। তার উপর তার সঙ্গে এসে যোগ দিলেন প্রমীলা, বাতাসের সঙ্গে এসে মিশেছে আগুনের শিখা! লক্ষ্মণ কী করে জিতবে?
পার্বতী জানালেন, প্রমীলার সব তেজ কাল আমি হরণ করব। লক্ষ্মণ অবশ্যই হত্যা করবে মেঘনাদকে। স্বামীর সঙ্গে প্রমীলাও চলে আসবে কৈলাসে। আমরা তাদের খুশি রাখব।
নিজের ঘরে চলে গেলেন পার্বতী। সারা কৈলাসে নেমে এল ঘুম। আর পৃথিবীতে রুপোর আভা ছড়িয়ে চাঁদ উঠল আকাশ জুড়ে।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন