অশোকবন

শুভময় মণ্ডল

সেই রাতে সারা লঙ্কা ভাসছে আনন্দে। বাজনা বাজছে ঘরে ঘরে। দুয়ারে দুয়ারে ঝোলে ফুলমালা, ছাদে উড়ছে ধ্বজা, জানালায় জ্বলছে দীপ। রাজপথে জনস্রোত, রাশি রাশি উড়ছে ফুল। যেন নগর জুড়ে মহোৎসব। সেই রাতে লঙ্কায় আনন্দে ঘুম নেই কারো চোখে, কারণ তার আশা রাত পোহাতেই আগামীকাল মেঘনাদ হত্যা করবে রামকে, লক্ষ্মণকে। সিংহ যেমন হাঁক পেড়ে শিয়াল তাড়ায় তেমনই সমুদ্র অবধি তাড়িয়ে নিয়ে যাবে শত্রুদের। বেঁধে আনবে বিভীষণকে।

আনন্দে ভেসে-যাওয়া লঙ্কায় শুধু অশোকবনে একা সীতা শোকে আকুল। যে চেড়িরা সীতাকে ঘিরে পাহারা দেয় তারাও আজ উৎসবে মেতে উঠতে ছেড়ে গেছে সীতাকে, বাঘিনি যেমন আধমরা হরিণকে ফেলে রেখে বিনা ভাবনায় বনে ঘুরে বেড়ায়। একাকিনী সীতার কাছে এলেন সরমা, বিভীষণের স্ত্রী। দুরন্ত চেড়িরা আজ রাতে উৎসবে মত্ত হয়ে নেচে বেড়াচ্ছে, সেই কথা জেনে তিনি চলে এসেছেন সীতার কাছে, কৌটোয় এনেছেন সিঁদুর। পরিয়ে দেবেন সীতার কপালে।

যতনে সরমা সীতার কপালে পরিয়ে দিলেন সিঁদুর। বললেন, সীতার দেহে গহনা নেই কেন? রাবণ কি সেগুলিও হরণ করল? সিঁদুরে পরিয়ে দিয়ে সরমা প্রণাম করলেন সীতাকে।

সীতা বললেন, না সরমা, রাবণকে দোষ দিয়ো না। আমিই নিজেই সব অলংকার একে একে ছড়িয়ে দিয়েছি পথে যখন রাবণ আমায় হরণ করলেন। যাতে সেই অলংকার চিহ্ন ধরে রামচন্দ্র বুঝতে পারেন যে আমায় হরণ করে নিয়ে আসা হয়েছে লঙ্কায়।

এই ঘটনার সূত্র ধরেই সরমা সীতার কাছে শুনতে চাইলেন তাঁর জীবনের কাহিনি। কেন রামচন্দ্র বনে এলেন? কী করেই বা রাবণ তাঁকে চুরি করে আনল লঙ্কায়?

সীতা তাঁকে সব বললেন। পঞ্চবটী বনে কেমন সুখে ছিলেন তিনি রামের পাশে, সঙ্গে দেওর লক্ষ্মণ। সে-বনের প্রাকৃতিক শোভা, সে-বনে লাভ করা সুখের কথা ভাবলে পূর্বে রাজগৃহে পাওয়া সুখও তুচ্ছ হয়ে যায়। ঘুম ভাঙত পাখির ডাকে, দুয়ারে এসে নেচে যেত ময়ূর-ময়ূরী, কুটুম্বের মতো দুয়ারে আসত আরও কত প্রাণী। ফুলের সাজে সাজতেন তিনি, তখন রামচন্দ্র তাঁকে ডাকতেন বনদেবী বলে। সেইসব সুখের দিন মনে করে কেঁদে ফেললেন সীতা। চোখের জলেই বলে গেলেন পঞ্চবটী বনের সেই মধুময় দিনগুলির কথা। কোকিলের সঙ্গে গাইতেন, হরিণের সঙ্গে নাচতেন। দেখতেন নদীর জলে রাতের আকাশে তারার শোভা।

সরমা বললেন, সীতার কথা শুনে রাজঘর ছেড়ে বনে চলে যেতে সাধ হয়। কিন্তু ভাববার কথা হল এই, সীতা নিজেই জগতের আনন্দ, তিনি যেখানে যান সেখানেই ছড়িয়ে পড়ে আনন্দ, যেমন সূর্য উঠলে আলোয় ভেসে যায় অন্ধকার বনস্থলী। তারপর সরমা জানতে চাইলেন সীতা হরণের কাহিনি।

শূর্পণখার হাজির হওয়ায় শেষ হয়ে গেল সুখদিন। মারীচের চাতুরিতে রাবণ হরণ করলেন সীতাকে। সীতা সবিস্তারে বলে চললেন সেই সোনার হরিণের কথা, রাবণের চালাকি আর নিষ্ঠুরতার কথা, পুষ্পক রথে চাপিয়ে তাঁকে লুঠ করে আনার কথা। বলতে বলতে কখনো বা অজ্ঞান হয়ে ঢলে পড়লেন সরমার কোলে। লঙ্কায় এই বিজন দেশে সীতা দুঃখের জ্বালায় কেঁদে ডেকেছেন পৃথিবীকে, মা বসুমতী যেন দু-ভাগ হয়ে যান, তাঁর বুকের মাঝে সীতাকে গ্রহণ করেন। পৃথিবী কী করে সহ্য করছেন তাঁর কন্যার জ্বালা!

তখন মা বসুন্ধরা সীতাকে স্বপ্নে দেখা দিয়ে বললেন, ভাগ্যের ইচ্ছাতেই রাবণ সীতাকে হরণ করেছে। সেই পাপেই সবংশে সে মরবে। রাবণের বিনাশের জন্যেই তো সীতার জন্ম। যে মুহূর্তে রাবণ তোকে ছুঁয়েছে, তখনই জানলাম আমার প্রতি ভাগ্য সুপ্রসন্ন এতদিনে। রাবণের পাপের ভার আর আমি বইতে পারছিলাম না। তোকে আশীর্বাদ করি, তুই মায়ের জ্বালা দূর করলি, তোকে ছোঁয়ার পাপেই রাবণ মরবে ঝাড়ে-বংশে।

সীতা বলে চললেন তাঁর সেই স্বপ্নের কথা, সেই স্বপ্নেই তিনি দেখলেন, রামচন্দ্রের যুদ্ধপ্রস্তুতি, কীভাবে সমুদ্রকে বেঁধে তিনি লঙ্কায় পৌঁছোচ্ছেন। দেখলেন কীভাবে রামচন্দ্র সমগ্র লঙ্কা লণ্ডভণ্ড করে রাবণকে শাস্তি দিচ্ছেন। কুম্ভকর্ণের মতো বীরেরা নিহত হচ্ছে একে একে। সীতা লঙ্কার দুঃখেও কেঁদেছেন। তিনি মাটির কন্যা, মা-পৃথিবীকে ডেকে বলেছেন, লঙ্কার দুঃখেও তাঁর বুক ফেটে যাচ্ছে।

মা-বসুধা তাঁকে বলেছেন যা দেখছ, সত্যই দেখছ, আরও শাস্তি পাবে লঙ্কা। সেই স্বপনেই তিনি দেখলেন, রাবণও যুদ্ধে নিহত হয়েছেন। তাঁর সামনে দাঁড়িয়ে আছেন রামচন্দ্র, খানিক দূরে, যেন উদিত হচ্ছেন সোনার বরণ সূর্যদেব। তিনি পাগলের মতো ছুটে গেলেন তাঁর পা-দুখানি ধরবার আশায়। তখনই স্বপন গেল ভেঙে। চারদিকে যেন ঘন অন্ধকার, দীপ-নেভা অন্ধকার যেন ঘিরে ধরছে সীতাকে।

এত কথা বলতে বলতে সরমার গলা জড়িয়ে ধরে কাঁদলেন সীতা। সরমাও কাঁদলেন। তারপর চোখের জল মুছে সরমা বললেন, বিধির বিধান কেউ খন্ডন করতে পারে না। তোমার মা-পৃথিবী তোমায় যা বলেছেন সব ফলবে। তোমাকে চুরি করার পাপেই সবংশে মরবেন রাবণ। ফল তো ফলতে শুরু করেছে। এমন বীরের দেশ লঙ্কায় আর বীর কে বেঁচে আছে! সমুদ্রের তীরে সমস্ত রণভূমি জুড়ে মানুষের লাশ ছিঁড়ে-খাওয়া জন্তুদের উল্লাস। লঙ্কার ঘরে ঘরে বিধবা নারী আর সন্তানহারা মায়ের কান্না। তোমার দুঃখের রাত শীঘ্রই শেষ হবে। সেদিন যেন তোমার এই সই সরমাকে ভুলো না।

সীতা বললেন, সরমার মতো শুভাকাঙ্ক্ষী তাঁর আর কে আছে। লঙ্কায় তিনিই তো সীতার একমাত্র আশ্রয়। দরিদ্র যেমন তার একমাত্র রতনকণাকে ভোলে না, তিনিও সরমাকে কোনোদিন ভুলতে পারবেন না।

সীতার পায়ে প্রণাম করে বিদায় নিলেন সরমা। বললেন, তোমাকে ছেড়ে যেতে মন চায় না, কিন্তু আমার স্বামী রামচন্দ্রের অনুগত। রাবণ যদি জানতে পারে আমি তোমার কাছে এসে কথা বলি, বিপদ হবে।

সীতা বললেন, হ্যাঁ, তাড়াতাড়ি চলে যাও। মনে হচ্ছে চেড়ীদের পায়ের শব্দ শুনতে পাচ্ছি, ওরা বোধহয় ফিরে আসছে।

আতঙ্কে দ্রুত পায়ে চলে গেলেন সরমা। অশোকবনে একাকী সীতা, যেন একটিমাত্র ফুল জেগে আছে বনে।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%