শুভময় মণ্ডল
সকাল হল। লঙ্কা ঘিরে বিকট গর্জন উঠল—জয় রাম।
সোনার সিংহাসন ছেড়ে মেঝেতেই বসে ছিলেন রাবণ। সেখানে পৌঁছল সেই গর্জনের আওয়াজ সমুদ্র-ঢেউয়ের শব্দের মতো। অবাক হলেন রাবণ। মন্ত্রী সারণকে জিজ্ঞাসা করলেন, দুশমনেরা হঠাৎ গর্জন করে উঠল কেন? গতকাল সারারাত তো শোকে মনমরা ছিল, এখন হঠাৎ গর্জিয়ে উঠল কেন! লক্ষ্মণ কী প্রাণ ফিরে পেল! এও সম্ভব! হয়তো দেবতারা ওদের পক্ষ নিয়ে তাও করলেন। অবিরাম স্রোতের মধ্যে সমুদ্রে সেতুও বাঁধল রাম, তারই কৌশলে পাথরও ভাসল জলে। যে যুদ্ধে দু-বার মরে গিয়েও বেঁচে ওঠে, তার আর অসাধ্য কী? দেখো, দেখো সারণ, কী ঘটল খোঁজ নাও।
সারণ উত্তর দিলেন। হাতজোড় করে গলায় একরাশ হতাশা নিয়ে বললেন, রাতেই গন্ধমাদন থেকে ওষুধ এনে লক্ষ্মণকে বাঁচানো হয়েছে। সংসারে দেবতাদের খেলা কে বোঝে! প্রাণ ফিরে পেয়েছেন লক্ষ্মণ, তাই গর্জন করছে দুশমনদল। শীতের শেষে সাপ যেমন দ্বিগুণ শক্তি ফিরে পায়, তেমনই বীরদর্পে গর্জন করছেন লক্ষ্মণ, গর্জন করছে সুগ্রীব সমেত দক্ষিণভারতের যত বীর।

হতাশায় দীর্ঘনিশ্বাস ফেললেন রাবণ, বিধির বিধান কেউ খন্ডাতে পারে না। যে দুশমনকে যুদ্ধে হত্যা করলুম সে আবার বেঁচে উঠল!
সারণকে ডেকেই তিনি বলেন উঠলেন, আমার ভাগ্যের দোষ, নইলে যম একবার কাউকে ধরলে কী আর ছাড়ে! বৃথা কাঁদব না। অমন জবরদস্ত ভাই কুম্ভকর্ণ মারা গেল, যে ছেলে ইন্দ্রকে হারিয়ে দিয়েছিল সেও চলে গেল! আমার বংশগৌরব এবার ডুবতে বসেছে, কোনো ভুল নেই! বাঁচতে সাধ নেই আর, কী হবে বেঁচে! আর কি ফিরে পাব ভাই আর ছেলে!
তখনই সিদ্ধান্ত নিলেন রাবণ, সারণকে নির্দেশ দিলেন, যাও সারণ রামচন্দ্র শিবিরে। তাঁকে বোলো, তাঁর কাছে রাবণ ভিক্ষা চাইছে, সাতদিন যুদ্ধ বন্ধ থাক। এই সাতদিনে আমি পুত্রের সৎকার করতে চাই। সারণ, তাঁকে বোলো, তিনি বীর, তাঁর বীরত্বে লঙ্কা আজ বীরশূন্য, বীরধর্ম যেন তিনি পালন করেন। কী শুভক্ষণে তিনি অস্ত্র ধরে যুদ্ধ শুরু করেছিলেন। তিনি জয়ী আর আমি ঘোর বিপদে। এটুকু ভিক্ষা যেন তিনি আমায় দেন।
রামের উদ্দেশ্যে যাত্রা করলেন সারণ।
শিবিরে বসে আছেন রামচন্দ্র। যেন ভাসছেন আনন্দ-সাগরে। সামনেই লক্ষ্মণ, যেন বসন্তে সপ্রাণ বৃক্ষ, আকাশে পূর্ণিমার পূর্ণ চাঁদ অথবা রাত শেষে ডাগর হয়ে ফোটা পদ্ম। ডানদিকে বিভীষণসহ আর যত সেনাপতি।
রামচন্দ্র খবর পেলেন তাঁর সাক্ষাৎ প্রার্থনা করছেন রাবণের দূত। তিনি নির্দেশ দিলেন, দূতকে যেন সাদরেই তাঁর কাছে আনা হয়।
রামচন্দ্রকে যথাযথ নমস্কার জানিয়ে সারণ জানালেন রাবণের আবেদন। ঠিক যেমন করে যে-কথা বলেছিলেন রাবণ, সারণ সবটুকু বললেন রামচন্দ্রকে।
রামচন্দ্র উত্তর দিলেন, সারণ তোমার প্রভু রাবণ আমার পরম শত্রু। তবু আপনাকে বলি, আমি তাঁর দুঃখে দুঃখী। সূর্যকে রাহুগ্রাসে দেখলে কার না দুঃখ হয়। বিপদে আপন-পর সকলেই আমার কাছে সমান।
তিনি সারণকে বললেন, আপনি লঙ্কায় ফিরে যান। রাবণকে বলবেন, সাতদিন আমরা অস্ত্র স্পর্শ করব না।
রামচন্দ্রের প্রতি নরম হয়ে সারণ বললেন, রামচন্দ্র আপনি মানুষের মধ্যে শ্রেষ্ঠ। বিদ্যা, বুদ্ধি, শক্তিতে আপনার তুলনা নেই। আপনার যোগ্য কাজই করলেন আপনি। আপনি মানুষের মধ্যে শ্রেষ্ঠ। রাবণ শ্রেষ্ঠ রাক্ষসদের মধ্যে। আমার আক্ষেপ ক্ষমা করবেন হে বীর, কী কুক্ষণে আপনারা দুই শ্রেষ্ঠ ব্যক্তি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়লেন! সবই বিধির বিধান। তারই মায়ায় রাম আর রাবণ পরস্পরের শত্রু হয়ে লড়াই করছে।
যুদ্ধবিরতির প্রস্তাবে রামের সম্মতির খবর সারণ পৌঁছে দিলেন শোকার্ত রাবণের কাছে। শুরু হল যুদ্ধবিরতি, যে-যার শিবিরে বিরাম পেলেন যোদ্ধারা।
অশোকবনে বসে আছেন দুঃখিনী সীতা। সেখানে এলেন রাক্ষসকুলের নারী বিভীষণের স্ত্রী সরমা। সীতাকে প্রণাম করে সরমা বসলেন তাঁর পায়ের কাছে। সীতা সরমাকে জিজ্ঞাসা করলেন, সই গত দু-দিন লঙ্কায় হাহাকার শুনছি কেন? গতকাল সারাদিন যুদ্ধক্ষেত্র থেকে গর্জন ভেসে এল। আকাশে দেখলাম আগুনের শিখার মতো তির ছুটে যাচ্ছে। সন্ধ্যা হল যখন, শুনি জয়ধ্বনি উচ্চারণ করতে করতে রাক্ষসসৈন্যরা শহর লঙ্কায় ফিরে আসছে। সরমা, যুদ্ধে কে জিতছে, কে হারছে, আমায় বলো!
সীতা আরো জানালেন, যুদ্ধের খবরাখবর জানবার জন্যে তাঁর মন আকুল হয়ে আছে। কিন্তু তিনি কাকে জিজ্ঞাসা করবেন! তাঁকে পাহারা দেয় যে চেড়ীরা, তাদের জিজ্ঞাসা করলে কোনো উত্তরই দেয় না। উলটে ত্রিজটা নামে বিকট দেখতে যে চেড়ী, সে তো গত রাতে সীতাকে মেরেই ফেলতে এসেছিল। লাল টকটকে চোখ, রাগে অন্ধ হয়ে সে খোলা তলোয়ার হাতে কাটতে এসেছিল সীতাকে। অন্য চেড়ীরা তাকে আটকে দিয়েছিল, তাই বেঁচে আছেন সীতা! সে কথা ভাবলে তখনও বুক কাঁপছে সীতার।
সরমা জানালেন যুদ্ধের সব খবর। বললেন, সীতার ভাগ্য ভালোর দিকে। যুদ্ধে নিহত হয়েছেন মেঘনাদ। সেই শোকে দু-দিন ধরে হাহাকার করেছে লঙ্কা। আকুল হয়ে কাঁদছেন রানী মন্দোদরী। কাঁদছেন লঙ্কার নারীরা। দুঃখে হতাশায় ভেঙে পড়েছে লঙ্কার যোদ্ধারা। সীতারই ভাগ্যে লক্ষ্মণ যুদ্ধে হত্যা করেছেন মেঘনাদকে, যে কাজ দেবতাদেরও অসাধ্য।
সীতা ধন্যবাদ দিলেন সরমাকে, এই লঙ্কা নগরে তাঁর কাছ থেকেই তো সীতা দুটো ভালো কথা শুনতে পান! গুণগান করলেন লক্ষ্মণের। আশায় উন্মুখ হলেন, এতদিনে বুঝি তাঁর বন্দিদশা ঘুচতে চলেছে। এখন লঙ্কায় রাবণ একা। কী ঘটে, তার অপেক্ষায় আকুল হয়ে আছেন তিনি, আর কত দুঃখ আছে কপালে তাঁর।
তখনই সীতা আবার বললেন সরমাকে, শোনো! হাহাকারের শব্দ যেন ক্রমশ বেড়ে উঠছে।
সরমা জানালেন, সমুদ্রের তীরে রাবণ নিয়ে চলেছেন তাঁর মৃত ছেলেকে, সৎকারের জন্য। সাতদিন যুদ্ধবিরতি। রাবণের আবেদনে সাড়া দিয়েছেন রামচন্দ্র, তিনি পরম দয়াবান। এই সাতদিন দু-পক্ষের কেউ অস্ত্র ছোঁবে না। স্বামীর চিতায় প্রাণ বিসর্জন দেবেন দৈত্যকুলের মেয়ে প্রমীলা।
প্রমীলার কথা ভেবে চোখে জল এল সরমার। কাঁদলেন তিনি।
সীতা তো সবসময়েই পরের দুঃখে কাতর হন। চোখভরা জল নিয়ে তিনি বললেন, সরমা সই, কী কুক্ষণে জন্মেছিলাম আমি। যে ঘরে যাই সেখানেই সুখের প্রদীপ নিভে যায়। সীতা স্মরণ করলেন অযোধ্যার কথা, তাঁর অমন স্বামী আর দেওর বনবাসী হল, দুঃখে প্রাণ গেল শ্বশুর দশরথের। তাঁকেই রক্ষা করতে গিয়ে মরেছিলেন জটায়ু। কী গভীর খেদে সীতা বলে চলেছেন এতসব কথা, আর দেখো, এখানেও তো আমারই কারণে ইন্দ্রকে জয় করা মেঘনাদের মরণ হল। রাক্ষসদের আরও কত বীরের মরণ হল সে কী গুনে শেষ করা যাবে! মরণ হবে প্রমীলার, বসন্তের শুরুতে শুকিয়ে যাবে এমন ফুল আমারই কারণে।
তোমার দোষ! বলো কী তুমি! বিস্ময়ে বলে উঠলেন সরমা। কে তোমায় চুরি করে এনেছিল এখানে! এই রাক্ষসদের দেশে কে ছিঁড়ে এনেছিল রামচন্দ্রের হৃদয় পদ্ম! নিজের দোষে ডুবতে চলেছেন লঙ্কার রাজা। তোমার দোষ কোথায়!
দুই নারী অশোকবনে বসে কাঁদছেন।
লঙ্কার পশ্চিম দুয়ার খুলে গেল। বেরিয়ে এল লক্ষ রাক্ষস, হাতে সোনার দন্ড, তাতে উড়ছে পতাকা। সবার আগে দুন্দুভি, আওয়াজ উঠছে গম্ভীর। তারপর পদাতিক ও অন্যান্য রথীরা। সকলে চলেছে সমুদ্রতীরে, সবার চোখে জল।
যোদ্ধার বেশে নগর লঙ্কা থেকে বার হয়ে এল প্রমীলার দাসীরা। যেমন তাদের রূপ তেমন তাদের শক্তি। শোকে সবার মুখ চাঁদহীন রাতের মতো কালো। তারা কাঁদছে। কেউবা হাহাকার করে, কেউ নীরবে। তাদের চোখের জলে ভিজে যাচ্ছে পোশাক, ঘোড়া আর মাটি। কেউবা রাগী চোখে তাকিয়ে দেখছে রামচন্দ্রের সেনাদের দিকে। জালে আটকে পড়া বাঘিনি যেমন তাকিয়ে থাকে ব্যাধদের দিকে।
স্বামীর শবের পাশে সোনার পালকিতে চলেছেন সুন্দরী প্রমীলা। কপালে সিঁদুর, গলায় ফুলমালা, সারা শরীরে আরও কত অলংকার! যে দোলাচ্ছে চামর তার চোখে জলের ধারা। চোখে জল নিয়েই রাক্ষসনারীরা ছড়িয়ে দিচ্ছে ফুল।
মুখে কোনো কথা নেই প্রমীলার। যেন তাঁর প্রাণ ইতিমধ্যেই স্বামীর কাছে পৌঁছে গেছে।
কাতারে কাতারে সঙ্গে চলেছে রাক্ষসসৈন্য। হাতে খোলা তলোয়ার। খোলা তলোয়ারে রোদ ঝলসায়, ঝলসে দেয় চোখ। বেদজ্ঞরা চলেছেন বেদমন্ত্র উচ্চারণ করতে করতে। সোনার থালায় রাক্ষসবধূরা বয়ে নিয়ে চলেছেন নানা অলংকার, বস্ত্র, চন্দন, কুঙ্কুম, কেশর, কস্তুরী আর ফুল, সোনার কলসে গঙ্গাজল। সোনার পিলসুজে সোনার দীপ। বাজছে নানা বাদ্য—ঢাক, ঢোল, কাঁসি, কড়কড়া, মৃদঙ্গ, করতাল। জলভরা চোখে রাক্ষসবধূরা বাজাচ্ছেন শাঁখ, দিচ্ছেন হুলুধ্বনি। ঘোর শোকের দিনে বাজছে মঙ্গলধ্বনি।
পায়ে হেঁটে বার হয়ে আসছেন রাক্ষসরাজা রাবণ। পরেছেন শুদ্ধবস্ত্র, উত্তরীয়। নির্বাক তিনি, যেমন নির্বাক তাঁর চারদিক ঘিরে মন্ত্রী আর সচিববর্গ। তাদেরই পিছনে কাঁদতে কাঁদতে ছুটে বার হয়ে আসছেন লঙ্কার যত মানুষ — নারী, পুরুষ, শিশু ও বৃদ্ধ।
রামচন্দ্র আদেশ দিলেন অঙ্গদকে, হাজার বীর নিয়ে তুমি যাও সমুদ্রতীরে। মনে রেখো একদা তোমার বাবা যুদ্ধ না করে ভদ্রতার সঙ্গেই ফিরিয়ে দিয়েছিলেন রাবণকে। আজ তুমি যাও, রাক্ষসরাজের প্রতি সৌজন্য জানিয়ে এসো। রাক্ষসরাজের দুঃখ আমার বুকেও বড়ো বাজছে। লক্ষ্মণকে পাঠাব না, তাঁকে দেখলে হয়তো রাগই জন্মাবে রাবণের বুকে।
হাজার বীর সঙ্গে নিয়ে সমুদ্রের দিকে এগিয়ে গেলেন কিষ্কিন্ধ্যার যুবরাজ অঙ্গদ। আকাশপথে এসে দাঁড়ালেন যত দেবতারা — শচীসহ দেবরাজ ইন্দ্র, কার্তিক, পবনদেব, যম, চন্দ্র, অশ্বিনীকুমার দুই ভাই। এল যক্ষ, গন্ধর্ব, কিন্নর-কিন্নরী, অপ্সরা যত। এসে দাঁড়ালেন দেবর্ষি নারদ।
সমুদ্রতীরে সাজানো হল চিতা। চন্দনকাঠের চিতায় ঢালা হল ঘি। গঙ্গাজলে ধোয়া হল মেঘনাদের মৃতদেহ, পট্টবস্ত্র পরানো হল তাঁকে, শুইয়ে দেওয়া হল চিতার ওপর।
স্নান করে উঠে এসে সুন্দরী প্রমীলা সকলকে বিলিয়ে দিলেন যত অলংকার, প্রণাম করলেন গুরুজনদের। তাঁর সখীদের বললেন, এতদিনে পৃথিবীতে আমার দিন শেষ হল। দৈত্যদেশে ফিরে আমার বাবাকে বলিস সব কথা।
তিনি ডাকলেন, বাসন্তী! বাসন্তী, আমার মাকে বলিস...

বলতে, বলতেই কান্নায় ডুবে গেল তাঁর স্বর। হাহাকার করে কেঁদে উঠল প্রমীলাকে ঘিরে যত নারী।
দ্রুত শোক সামলিয়ে নিয়ে প্রমীলা বলে উঠলেন, বাসন্তী, মাকে বলিস, তাঁর মেয়ের কপালে যা লেখা ছিল তাই ঘটেছে। যাঁর হাতে বাবা-মা আমায় তুলে দিয়েছিলেন আমি তাঁর সাথেই চললাম। আর কী বলব বল, এইটুকু শুধু ভিক্ষা চাই, আমায় কোনোদিন ভুলিস নে তোরা!
চিতায় উঠে স্বামীর পায়ের কাছে বসলেন প্রমীলা সুন্দরী। মাথায় ফুলের মালা, মুখে আনন্দের আভা, যেন বসেছেন ফুলের আসনে।
বেজে উঠল রাক্ষসবাদ্য, উচ্চস্বরে বেদমন্ত্র উচ্চারিত হল। হুলুধ্বনি দিল রাক্ষসনারীরা, তারই সঙ্গে মিশে গেল হাহাকার। ফুলের বৃষ্টি হল চারদিক থেকে। নানা অলংকার, ফুল, বস্ত্র, চন্দন, কুঙ্কুম, কেশর, কস্তুরী সাজিয়ে দেওয়া হল চিতায়। নানা পশুকে তিরবিদ্ধ করে হত্যা করে তাদের গায়ে ঘি মাখিয়ে যত্ন করে সাজিয়ে দেওয়া হল চিতার চারদিকে।
এগিয়ে এলেন রাবণ। বলে উঠলেন, মেঘনাদ, আশা ছিল তোমারই সামনে শেষবার চোখ বুজতে পারব। তোমারই হাতে রাজ্যভার তুলে দিয়ে চলে যাব পরপারের দিকে মহাযাত্রায়। কিন্তু ভাগ্যের খেলা কী করে বুঝব ; আমার সুখ ভেঙে দিল সে! মেঘনাদ, আশা ছিল, তোমায় দেখব রাজ সিংহাসনে, দেখে আমার চোখ জুড়িয়ে যাবে, সিংহাসনে তোমার বাঁদিকে বসে আছেন রাক্ষসকুলের লক্ষ্মী আমার বধূমাতা। সব শেষ! পূর্বজন্মে কত পাপের ফলে আজ তোমাদের দেখতে হল চিতার আসনে। রাক্ষসদের সকল গৌরব চিরকালের মতো শেষ হয়ে গেল। এতকাল ধরে এত যত্ন করে শিবকে পূজা করলাম এই ফল পেতে? কী করে ফিরব, ওরে আমায় কেউ বলে দিতে পারিস, কী করে ফিরব শূন্য লঙ্কায়। ওরে মেঘনাদ, কে বলে দেবে আমায়, কি বলে তোমার মাকে সান্ত্বনা দেব! তিনি যখন আমায় জিজ্ঞাসা করবেন, আমার ছেলে আর বৌমা কোথায়? ওগো, তাদের তুমি সমুদ্রতীরে রেখে এলে কেন, কোন সুখে রেখে এলে সেখানে, কী উত্তর দেব? কি বলে বুঝাব তাঁকে? কি বলে বুঝাব। হায় মেঘনাদ, বাবা আমার, তুমি তো যুদ্ধে চিরজয়ী! হায় রাক্ষসকুললক্ষ্মী, কোন পাপে আমার কপালে এমন যন্ত্রণা লেখা ছিল!
কৈলাসে অধীর হয়ে উঠলেন মহাদেব। নড়ে উঠল তাঁর জটা। গর্জন করে উঠল সাপেরা। ধকধক করে জ্বলে উঠল কপালের আগুন। প্রবল ঢেউ উঠল মাথার জটায় বাঁধা তিন নদীতে। থরথর করে কেঁপে উঠল কৈলাস পর্বত। আতঙ্কে ছড়িয়ে পড়ল সারা পৃথিবীতে।
সামনে এলেন পার্বতী। হাতজোড় করে বললেন, রেগে আছ কেন প্রভু! ভাগ্যের লিখনেই তো মেঘনাদ যুদ্ধে নিহত হয়েছেন। রামের তো কোনো দোষ নেই। তাঁর ওপর যদি অবিচার কর, তাহলে আমায় ভস্ম করো! এই মতো বলেই শিবের পা-দুখানা জড়িয়ে ধরলেন পার্বতী।
পার্বতীকে তুলে ধরে শিব বললেন, রাক্ষসরাজের দুঃখে আমার বুক ভেঙে যাচ্ছে! তুমি জানো পার্বতী, রাবণকে আমি কত ভালোবাসি। তবু তোমারই অনুরোধে আমি ক্ষমা করে দেব রামচন্দ্র আর লক্ষ্মণকে।
তারপর বিষণ্ণ মহাদেব ডাকলেন আগুন-দেবতাকে, বলে উঠলেন, হে আগুন, তোমারই ছোঁয়ায় শুচি হয় পবিত্র হয় সব। যাও তুমি, তোমারই পরশে দেবলোকে পৌঁছে যাক রাক্ষসদম্পতি প্রমীলা ও মেঘনাদ।
বজ্র হয়ে আগুন নামলেন মাটিতে। জ্বলে উঠল চিতা। সকলে চমকে উঠে অবাক হয়ে দেখল আগুনের রথে সোনার আসনে বসে আছেন মেঘনাদ, বামে প্রমীলা সুন্দরী।
আকাশের দিকে উড়ান দিল আগুনের রথ। ফুলসারিতে বৃষ্টি এল আকাশ ছেয়ে।
দুধ ঢেলে নিবিয়ে দেওয়া হল চিতার আগুন। রাক্ষস-নাগরিকযত পরম যতনে কুড়িয়ে ভস্মরাশি, বিসর্জন দিলেন সমুদ্রে। গঙ্গার জলে ধুয়ে দেওয়া হল দাহস্থল। তারপর এক লক্ষ রাক্ষসশিল্পী মিলে চিতার ওপরে সোনার ইট দিয়ে নির্মাণ করল মঠ। যার চূড়া ছুঁয়েছে আকাশ।
সমুদ্রে স্নান করে রাক্ষসেরা ফিরে চলল লঙ্কার দিকে। সকলের চোখে জল। যেন দশমীর দিনে প্রতিমা বিসর্জন দিয়ে মানুষ ফিরছে ঘরে।
তারপর সাত দিন-রাত লঙ্কা কাঁদল মেঘনাদ-প্রমীলার শোকে।

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন