শুভময় মণ্ডল
সূর্য গেল অস্তাচলে। বাসায় ফিরছে পাখিরা, হাম্বা হাম্বা আওয়াজে গোরুরা ছুটছে ঘরের দিকে, ফুটে উঠল কুমুদ, আঁধার আকাশ ভরে তারার হাসি, দুনিয়ার বুকে ঘুম নেমে এল ক্রমে।
স্বর্গের সিংহাসনে বসে আছেন ইন্দ্র। সেখানে হঠাৎ লক্ষ্মীর আবির্ভাব। তাঁকে দেখে দেবরাজ ইন্দ্র বলে উঠলেন, মা, কোন পুণ্যের ফলে আজ তুমি আমার সভায়!
লক্ষ্মী বললেন, এতদিন ছিলাম লঙ্কায় রাবণগৃহে। পুজো করে সে রেখেছিল আমায়। শোনো, নিজের পাপে সে মজেছে। তবু যতদিন সে বাঁচে তার কাছেই আমায় থাকতে হবে। তুমি নিশ্চয়ই জানো, তার ছেলে মেঘনাদের কথা। লঙ্কার একমাত্র বীর সেই আছে বেঁচে। আর সব মরেছে যুদ্ধে। তাকেই রাবণ আবার সেনাপতি পদে বরণ করেছে। সে যদি কাল নিকুম্ভিলা যজ্ঞ সাঙ্গ করে রামচন্দ্রকে আক্রমণ করে রামচন্দ্রের সামনে বড়ো বিপদ। মেঘনাদকে হারাবার মতো দুনিয়ায় কেউ নেই, কী করে রামচন্দ্রকে বাঁচাবে এখনই ভাবো!
ইন্দ্র বললেন, আমিও মেঘনাদকে ভয় পাই। এই বিপদে মহাদেব ছাড়া কে রক্ষা করবে! যদি অনুমতি দেন তাহলে এখনই যাই কৈলাসে।

লক্ষ্মী বললেন, এখনই যাও! যদি মহাদেবকে না পাও, গৌরীকে খুলে বোলো সব কথা।
ইন্দ্র আকাশপথে দেবযানে যাত্রা করলেন কৈলাসের দিকে। তাঁর রানি শচীকেও নিলেন সঙ্গে।
রথ থেকে নেমে পায়ে হেঁটে দু-জনে প্রবেশ করলেন কৈলাস পর্বতের চূড়ায় শিবের আবাসে। সেখানে গৌরী বসে আছেন সোনার সিংহাসনে। চামর দোলাচ্ছেন বিজয়া আর রাজছত্র ধরে আছেন জয়া।
দু-জনে কেন এসেছেন কৈলাসে, জানতে চাইলেন গৌরী।
ইন্দ্র বললেন, মা তুমি তো সবই জানো। তারপর লক্ষ্মী এসে যা যা বলেছেন সবই জানালেন গৌরীকে। সব জানানোর পর বললেন, এখন রামচন্দ্র রক্ষা পাবে কী করে? তুমি যদি দয়া না করো, তাহলে কালই তো ইন্দ্রজিতের হাতে রামচন্দ্র নিহত হবে।
গৌরী জানিয়ে দিলেন, শিব খুবই স্নেহ করেন রাবণকে। রাবণের মন্দ আমার হাত দিয়ে কী করে হবে ? শিব ধ্যানমগ্ন, তাই লঙ্কার দুর্গতি।
ইন্দ্র এবং ইন্দ্রের স্ত্রী শচী দু-জনেই তখন রামচন্দ্রের পক্ষ নেবার জন্যে গৌরীকে অনুরোধ করলেন। ইন্দ্রের যুক্তি ছিল এই যে, রাবণ দরিদ্র রামচন্দ্রের একমাত্র ধন সীতাকে হরণ করেছে। তা ছাড়া শিবের বলে বলীয়ান হয়ে সে অন্য দেবতাদের তুচ্ছ জ্ঞান করে। যে পরের ধন চুরি করে তাকে কী করে দয়া করেন দেবী গৌরী!
শচীও বললেন, সীতার দুঃখের কথা। অশোকবনে বন্দি সীতা কত দুঃখ পাচ্ছেন। দেবী গৌরী যদি শাস্তি না দেন, তাহলে কে শাস্তি দেবে রাবণের মতো পাষন্ডকে!
গৌরী হেসে বললেন, ইন্দ্র ও শচী দু-জনেই লঙ্কার বিনাশ চাইছেন, কিন্তু এ-কাজ তাঁর দ্বারা সম্ভব নয়, স্বয়ং শিব রক্ষা করেন রাক্ষসকুল। শিব ছাড়া কারও সাধ্য নেই ইন্দ্র ও শচীর বাসনা পূর্ণ করা। কিন্তু তিনি এখন ধ্যানমগ্ন দুর্গমস্থানে। তাঁর কাছে পৌঁছোনো অসাধ্য।
ইন্দ্র পুনর্বার আবেদন করলেন রামচন্দ্রকে বাঁচাবার জন্য।
ঠিক এমন সময় হঠাৎ বেজে উঠল শাঁখ-ঘন্টা, নড়ে উঠল দেবীর সোনার সিংহাসন। বোঝা গেল কেউ দেবী দুর্গাকে অকালে পূজা করছে। বিজয়া জানালেন, নীল পদ্ম দিয়ে রামচন্দ্র পূজা করছে দেবী দুর্গাকে।
সোনার আসন ছেড়ে উঠলেন দুর্গা। বললেন, তিনি যাবেন শিবের কাছে। বিজয়াকে দিলেন ইন্দ্র ও তার স্ত্রীকে আপ্যায়ন ও সেবার দায়িত্ব।
দুর্গা পৌঁছোলেন যেখানে শিব ধ্যানমগ্ন। ধ্যান ভাঙালেন তাঁর। শিব আনন্দ পেলেন দুর্গার আগমনে। বললেন, তিনি জানেন কেন দুর্গা তাঁর কাছে এসেছেন। তিনি এও জানেন, কেন ইন্দ্র ও তাঁর স্ত্রী এসেছেন কৈলাসে, কেনই-বা রাম অকালে দেবী দুর্গাকে পূজা করছে। তিনি জানালেন, রাবণ তাঁর পরমভক্ত, কিন্তু সে তো নিজের পাপেই মজেছে। তারপর নির্দেশ দিলেন, ইন্দ্র যেন তখনই মায়াদেবীর কাছে চলে যায়। মায়ার আশীর্বাদেই লক্ষ্মণ হত্যা করবে মেঘনাদকে।
দুর্গার কাছ থেকে নির্দেশ পেয়ে ইন্দ্র পৌঁছোলেন দেবী মায়ায় গৃহে। দেবীকে জানালেন শিবের এই নির্দেশ যে মায়ার আশীর্বাদে লক্ষ্মণ হত্যা করবে মেঘনাদকে। দেবী মায়া এখন বলে দিন কোন কৌশলে লক্ষ্মণ হত্যা করবে মেঘনাদকে।
মায়া দেখালেন ভয়ানক সব অস্ত্র, যা দিয়ে দেবসেনাপতি কার্তিক হত্যা করেছিল দানবদের। সেসব অস্ত্র পাঠাতে হবে লক্ষ্মণের কাছে। কিন্তু এমন কেউ নেই যে ন্যায়যুদ্ধে ইন্দ্রজিৎ মেঘনাদকে হারাতে পারে। মায়া তখনই সিদ্ধান্ত নিলেন যে তিনি নিজে যাবেন লঙ্কায়, রক্ষা করবেন লক্ষ্মণকে। কালই নিহত হবেন ইন্দ্রজিৎ। লঙ্কায় পঙ্কজ রবি যাবে অস্তাচলে।
সেইসব ভয়নাক অস্ত্র ইন্দ্র পাঠালেন রামচন্দ্রের শিবিরে চিত্ররথ নামের একজন বীরের হাত দিয়ে।
চিত্ররথকে নির্দেশ দিলেন, তিনি যেন রামচন্দ্রকে বলেন সকল দেবতা তাঁর প্রতি প্রসন্ন। প্রসন্ন স্বয়ং পার্বতী। সুতরাং আর ভয় কী তাঁর! যদি ছেলে মেঘনাদ মরে বাপ রাবণ অবশ্যই মরবে।
তিনি চিত্ররথকে দিলেন নিজের রথ। বললেন, চিত্ররথকে রাক্ষসকুল দেখতে পেলে বিপদ হতে পারে। তাঁর নির্দেশে আকাশ ঢাকা থাকবে কালো মেঘে, বইবে দুরন্ত ঝড়, নাচবে বিদ্যুৎ, জগৎ জুড়ে গর্জন করবে বজ্র।
ইন্দ্র তখনই ডাক দিলেন, হে বায়ুদের রাজা ঝড়, কারাগার থেকে বায়ুকুল ছেড়ে দাও। সকল মেঘদলকে সঙ্গে নাও। সমুদ্রের সঙ্গে ঝোড়ো বাতাসকে লড়িয়ে দাও।
তখনই সে কী ভয়ানক প্রলয়! যেন শেকল ভেঙে লাফ দিয়ে পড়ছে সিংহ, তেমনই ঝড়ের দাপট। সমুদ্র যেন ভেঙে ফেলছে জাঙাল। ঢেউ উঠছে পাহাড়ের মতো। আকাশ ফালাফালা করে হাসছে বিদ্যুৎ, কড়মড় করছে বাজ। থরথর করে কাঁপছে পৃথিবী, মহা ঝড়ের মধ্যে বৃষ্টি, যেন ডুবিয়ে দেবে দুনিয়া।
রাক্ষসদল এই প্রকৃতির তান্ডব দেখে পালাল ঘরে। তখনই অস্ত্রসম্ভার নিয়ে চিত্ররথ পৌঁছোলেন রামচন্দ্রের শিবিরে।
রামচন্দ্র তাঁকে ঘাসের আসনে বসালেন। বললেন, আমি ভিখারি, আপনার মতো দেবকে বসতে দেবার মতো সোনার আসন কোথায় পাব!
নিজের পরিচয় দিলেন চিত্ররথ। ইন্দ্রের নির্দেশ মতো বললেন সকল কথা। জানিয়ে দিলেন, পরের দিনের সকালে স্বয়ং মায়াদেবী জানিয়ে দেবেন কী কৌশলে লক্ষ্মণ মেঘনাদকে বধ করবে।
আনন্দসাগরে ভাসলেন রামচন্দ্র। প্রকাশ করলেন কৃতজ্ঞতা। রামচন্দ্রকে আশীর্বাদ করে ইন্দ্রের রথে চড়ে চিত্ররথ রওনা হলেন স্বর্গের দিকে।
হঠাৎ শান্ত হয়ে গেল সমুদ্র। আকাশে আবার তারাদল নিয়ে চাঁদের হাসি। আবার যেন হেসে উঠল সোনার লঙ্কাপুরী, রাতের ফুল উঠল ফুটে। যুদ্ধক্ষেত্রে আবার পাল পাল ছুটে এল মরা মানুষের মাংস ছিঁড়ে খাওয়া শিয়াল-শকুন-পিশাচ। বেরিয়ে এল অস্ত্র হাতে রাক্ষস সেনাদল।

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন