লক্ষ্মণবধ

শুভময় মণ্ডল

পৃথিবীর পানে মুখ তুলে তাকাল সকালের সূর্য। উল্লাসে হেসে উঠল ফুলসাজে ভরা পৃথিবী। সুন্দর শব্দের ঢেউ উঠল কাননে। ফুটে উঠল জলে পদ্ম আর মাটিতে সূর্যমুখী।

সকালে তাঁর নিজের ঘরে প্রমীলা। রাতের শিশিরে যেমন করে নিজেকে ধুয়ে নেয় ফুল, তেমন করে সুগন্ধ জলে স্নান করেছেন তিনি, স্নানের পরে বেঁধেছেন বেণি, কালো চুলো পরেছেন মুক্তার মালা, যেন শরতের চাঁদের ফালি ঘন বনের মাথায়। হাতে বালা, গলায় সোনার হার।

অবাক হয়ে তিনি তাঁর সই প্রমীলাকে জিজ্ঞাসা করলেন, গহনাগুলো পরতে পারছি না কেন? দূরে লঙ্কাপুরীতে কেন কান্নার, হাহাকারের শব্দ শুনছি। ডান চোখ নাচছে কেন? এমন করে কেঁদে উঠতে চাইছে কেন প্রাণ! কী জানি, কী বিপদে পড়ব আজ। যজ্ঞাগারে রয়েছেন আমার স্বামী। যাও বাসন্তী, দাঁড় করাও তাঁকে, বোলো তাঁর পা দুটি ধরে, আমি বলেছি এমন কুদিনে তিনি যেন যুদ্ধে না যান!

উত্তরে বাসন্তী বললেন, শোনো হাহাকার যেন ক্রমে বেড়ে উঠছে। কী করে বলি বলতো, কেন লঙ্কার মানুষ এমন কাঁদছে। চল তাড়াতাড়ি, মন্দিরে, যেখানে দেবী মন্দোদরী মহাদেবের পূজা করছেন। রাজপথে যুদ্ধে মত্ত মানুষজন, রথ, হাতি, ঘোড়ার ব্যস্ত চলাচল। পৌঁছব কী করে সেই যজ্ঞঘরে যেখানে যুদ্ধের জন্যে সাজছেন তোমার স্বামী!

ওদিকে কৈলাসে ইন্দ্রজিতের মৃত্যু নিয়ে কথা বলছেন মহাদেব আর পার্বতী। ইন্দ্রজিতের মৃত্যুতে মহাদেব খুবই দুঃখ পেয়েছেন, কারণ ইন্দ্রজিতের বাবা রাবণ তো তাঁর চিরদিনের ভক্ত। মহাদেব পার্বতীকে বললেন যে, পার্বতীরই ইচ্ছা-অনুযায়ী লক্ষ্মণের জয় হয়েছে, এবার তো রাবণের দিকটাও তাঁকে দেখতে হয়।

তখনই মহাদেব ডেকে পাঠালেন বীরভদ্রকে। তাঁকে বললেন, উমার কৃপায় মায়ার আশ্রয়ে লক্ষ্মণ নিকুম্ভিলা যজ্ঞঘরে প্রবেশ করে ইন্দ্রজিৎকে হত্যা করেছে। রাবণকে এ সংবাদ দেবে কে? তুমিই যাও, রাক্ষসদূতের বেশ ধারণ করে সোনার লঙ্কায় হাজির হও, রাবণকে খবর দাও, তাঁকে রুদ্রতেজে দৃপ্ত করো।

আকাশপথে চলার পর লঙ্কায় নামলেন বীরভদ্র। যজ্ঞঘরে ঢুকলেন, দেখলেন পড়ে আছেন ইন্দ্রজিৎ, যেন বনের মাটিতে ঝড়ে পড়ে আছে পলাশ। বীরভদ্রের দু-চোখ জলে ভরে গেল।

রাজসভায় সোনার সিংহাসনে বসে আছেন রাবণ, এবার সেখানে দূতের বেশে নামলেন বীরভদ্র। জোড় হাত, চোখে জল। রাবণ জিজ্ঞাসা করলেন, মুখ মলিন করে দূত চুপ করে দাঁড়িয়ে আছে কেন। দূত তো আর মানব রামের ভৃত্য নয়, তাহলে তার মুখখানা মলিন কেন? লঙ্কার পঙ্কজরবি ইন্দ্রজিৎ যুদ্ধের জন্যে তৈয়ার হচ্ছেন, এমন দিনে কী আর খারাপ খবর থাকতে পারে! আর যদি যুদ্ধে রামের নিহত হবার খবর থাকে, তবে সে-কথা বলুক দূত, রাবণ তাকে পুরস্কার দেবেন!

ছদ্মবেশী দূত বললেন, আমি সামান্য মানুষ, কী করে অমঙ্গলের খবর দেব, আমাকে আগে অভয় দিন মহারাজ!

রাবণ বললেন, তোমার কোনো ভয় নেই দূত, বলো খবর, ভালোমন্দ যা ঘটে সে তো বিধির বিধান।

রাক্ষসের বেশধারী দেব বীরভদ্র এবার বলে উঠলেন, যুদ্ধে নিহত হয়েছেন রাক্ষসকুলের গর্ব মেঘনাদ!

সিংহাসন থেকে নীচে আছাড় খেয়ে পড়লেন রাবণ, যেমন ঘন বনের মাঝে ব্যাধের তির বিঁধে বিকট চিৎকারে মাটিতে আছড়ে পড়ে হরিণদের দলপতি। হায় হায় করে সকলে ঘিরে ধরলেন রাবণকে, কেউ ঠাণ্ডা জল আনল, কেউ দিল বাতাস।

দূতবেশী বীরভদ্রই রাবণের শরীরে সঞ্চার করলেন তেজ, আগুনের ছোঁয়ায় যেমন তেতে ওঠে বারুদ, তেমনই উঠে বসে হুকুম দিলেন রাবণ, তাড়াতাড়ি বলো দূত, চিরকাল যিনি যুদ্ধে জিতেছেন সেই ইন্দ্রজিৎকে কে হত্যা করল? তাড়াতাড়ি বলো।

ছদ্মবেশে লক্ষ্মণ নিকুম্ভিলা যজ্ঞঘরে প্রবেশ করে অন্যায় যুদ্ধে মেঘনাদকে হত্যা করেছেন। দেখলাম মন্দিরে পড়ে আছেন তিনি, যেন বনের মাটিতে ঝড়ে ঝরে-পড়া সুন্দর পলাশ, উত্তর দিলেন দূত। বললেন, রাবণ তুমি বীরদের মধ্যে সেরা, বীরত্বের মধ্য দিয়ে শোক ভোলো। রাক্ষসনারীরা চোখের জলে পৃথিবী ভিজিয়ে দেবে, আর তুমি, তোমার ছেলেকে যে খুন করেছে তাকে যুদ্ধে নিহত করে রাজ্যের জনগণকে খুশি করো। একথা বলেই হঠাৎ অদৃশ্য হলেন দেবদূত বীরভদ্র। শুধু রয়ে গেল মহাদেবের দীর্ঘ জটা আর ত্রিশূলছায়া। শিবের পরমভক্ত রাবণ বুঝলেন তাঁর আরাধ্য দেবতারই নির্দেশ এসে পৌঁছেছে তাঁর কাছে।

প্রবল তেজে রাবণ বলে উঠলেন, সোনার লঙ্কায় যত সৈন্য আছো, তৈয়ার হও। যুদ্ধের মাতনেই এই ভীষণ জ্বালা ভুলব, যদি আদৌ ভোলা যায় এই ভীষণ জ্বালা।

সভাস্থলেই বেজে উঠল দুন্দুভি, শিঙা। বেরিয়ে এল বীর যোদ্ধারা, হাতি, ঘোড়া, রথ, পতাকায় সে-এক ভীষণ কান্ড, যেন প্রলয়। বেজে উঠল রাক্ষসবাদ্য চৌদিকে—ভেরি, তুরি, দুন্দুভি, দামামা। শেল, শক্তি, জাটি, তোমর, ভোমর, শূল, মুষল, মুদগর, পট্টিশ, নারাচ, কৌন্ত—নানা অস্ত্রের সে কি ভয়ানক শোভা, যেন কেঁপে উঠছে দুনিয়া, উথলে উঠছে সমুদ্র।

নিজের শিবিরে বসে চমকে উঠলেন রাম, বললেন বন্ধু বিভীষণকে, দেখো, যেন ঘোর ভূমিকম্পে কেঁপে উঠছে লঙ্কা। যেন উঠে-আসা ধোঁয়ায় ঢেকে যাচ্ছে সূর্য, যেন জ্বলে উঠছে ভয়ঙ্কর আগুন, ঢেউয়ের শব্দ শোনো, সমুদ্র যেন উথলে উঠে ডুবিয়ে দেবে পৃথিবীকে।

ফ্যাকাশে মুখে উত্তর দিলেন বিভীষণ, কী বলব! ভূমিকম্পে নয়, লঙ্কা কাঁপছে রাক্ষসসেনাদের পায়ে পায়ে। আগুন নয়, যা দেখছেন তা হল অস্ত্র আর বর্মের ঝলকানি, সমুদ্রের ঢেউয়ের শব্দ নয়, ওই আওয়াজ রাক্ষসসেনাদের গর্জন। পুত্রের শোকে এবার যুদ্ধের জন্যে তৈয়ার হচ্ছেন রাবণ! ভাবুন, এই সংকটে লক্ষ্মণ আর অন্যান্য বীরকে কেমন করে রক্ষা করবেন!

রামচন্দ্র বিভীষণকে নির্দেশ দিলেন সকল সেনাপতিকে ডাকবার জন্যে। শিঙা ফুঁকলেন বিভীষণ, সমবেত হলেন রামচন্দ্র শিবিরের সকল সেনাপতি। সেই যুদ্ধমন্ত্রণাসভায় সকল বীরকে আহ্বান করে রামচন্দ্র বললেন, ছেলের শোকে আকুল রাবণ যুদ্ধের প্রস্তুতি নিচ্ছেন, তোমরা সকলে তৈয়ার হও। লঙ্কায় আর একজন মাত্র বীর জীবিত আছে, আজ তাকেই শেষ করো। তোমাদেরই কৃতিত্বে সমুদ্রে সেতু বাঁধা গেছে। হত্যা করা গেছে কুম্ভকর্ণকে, লক্ষ্মণ হত্যা করলেন মেঘনাদকে যে দেবতা দৈত্য মানুষ সকলেরই আতঙ্ক। আমার স্ত্রী আজ রাবণের কারাগারে। হে দক্ষিণ ভারতের বীরগণ, তোমরাই আমায় এই বিপদ থেকে রক্ষা করতে পারো! যখন থামলেন রামচন্দ্র, তাঁর চোখে জল।

সাড়া দিলেন সুগ্রীব। বললেন, মরব না হয় রাবণকে মারব। আপনারই কৃপায় রাজ্যসুখ ভোগ করছি। রাক্ষসরা তৈরি হোক, আমরা লড়াইয়ে ভয় পাই না।

ওদিকে দেবরাজ ইন্দ্রও রামকে সাহায্য করার জন্য দেবসৈন্য প্রস্তুত রেখেছেন। তিনি অবশ্য নিশ্চিত, রাবণপুত্র ছাড়া রাবণকে তেমন ভয় পাবার কিছু নেই।

যুদ্ধের মাতনে মত্ত রাবণ মহাব্যস্ত প্রস্তুতিতে। যুদ্ধের বাজনা বাজছে, ধ্বজা উড়ছে আকাশে, গর্জন করছে সেনাদল। এমন সভাস্থলে এলেন রানি মন্দোদরী, যে মা-পাখি ফিরে এসে দেখে বাসায় তার ছানারা আর নেই, সেই পাখি-মায়েরই মতো বিধ্বস্ত তিনি, পিছনে সখীদল, আছড়ে পড়লেন রাবণের পায়ে।

তাঁকে তুলে ধরে, দুঃখভরা গলায় বলে উঠলেন রাবণ, রানি আমাদের দু-জনের প্রতি ভাগ্য অতি নির্মম। তবু যে বেঁচে আছি এখনও সে কেবল আমাদের ছেলের মৃত্যুর শোধ তুলতে। তুমি ফিরে যাও শূন্য ঘরে, আমি চলেছি লড়াইয়ে, কেন আমাকে আটকাও। কাঁদবার সময় চিরদিন পাব। রাজ্যপাট সব ফেলে দু-জনে নিরালায় বসে ছেলেটার কথা ভাবব সারাক্ষণ। ফিরে যাও, আমার রাগের আগুন তোমার চোখের জলে নিবিয়ে দিয়ো না মন্দোদরি! হায়, বনের সেরা গাছটা পড়ে গেল, আকাশের চাঁদ চিরকালের মতো গেল রাহুর কবলে।

সখীরা মন্দোদরীকে নিয়ে গেল অন্দরে। বাইরে এলেন রাক্ষসরাজ রাবণ, রাক্ষস সৈন্যদের উদ্দেশ্যে হাঁক পাড়লেন, হে বীরগণ, শোনো সবে, দেবতা-দৈত্য-মানুষ সকলকে যিনি জয় করেছিলেন, সেই মেঘনাদ আজ মৃত। যজ্ঞঘরে চোরের মতো প্রবেশ করে লক্ষ্মণ তাকে হত্যা করেছে, তখন মেঘনাদ ছিলেন নিরস্ত্র। বিদেশে-বিভুঁইয়ে আত্মীয়স্বজন ছাড়া যে মানুষ মরে সে যেমন মনোকষ্ট পায়, তেমনই মনে বড়ো কষ্ট পেয়ে মরেছে সে। আমার সব ছারখার হয়ে গেল! কিন্তু না, কাঁদব না আমি, কেঁদে কী হবে? এতদিন তোমাদের সকলকে সন্তানের মতো পালন করেছি। লড়াইয়ে চলো, কপট যোদ্ধা লক্ষ্মণকে হত্যা করব, যদি না পারি, আর ফিরব না লঙ্কায়—এই শপথ। চলো, তাঁকে স্মরণ করে লড়াইয়ে চলো।

রাগে-দুঃখে গর্জন করে উঠল রাক্ষসসৈন্য। তাদের চোখে জল।

সেই ভীষণ আওয়াজ শুনে রামচন্দ্রের সেনাদলও গর্জন করে উঠল গম্ভীর আওয়াজে। স্বর্গে গর্জন করে উঠলেন দেবরাজ ইন্দ্র। রাগে গরগর করে উঠলেন রামচন্দ্র, লক্ষ্মণ আর রামচন্দ্র-শিবিরের যত সেনাপতি। ভয়ংকর গর্জন উঠল—জয় রাম।

সারা আকাশ জুড়ে বিদ্যুতের ঝলক আর বজ্রের আওয়াজ। সূর্য ঢেকে গেল ঘোর আঁধারে। ঝড় উঠল প্রবল, বনে দাউদাউ জ্বলে উঠল দাবানল। গ্রাম-শহর ভেসে গেল বন্যায়, ভূমিকম্পে ভেঙে পড়ল বাড়িঘর, গাছপালা। কী ভয়ানক প্রলয়, ডুকরে উঠে মরে গেল কত জীব!

কী ভীষণ ভয় পেয়ে কাঁদতে কাঁদতে পৃথিবী ছুটল স্বর্গের দিকে। সোনার আসনে বসে আছেন নারায়ণ, তাঁকে প্রণাম করে পৃথিবী জানাল তাঁর বিপদের কথা—রাবণ প্রতিজ্ঞা করেছেন লক্ষ্মণকে হত্যা করে তবে তিনি ক্ষান্ত হবেন। ইন্দ্র প্রতিজ্ঞা করেছেন লক্ষ্মণকে তিনি রক্ষা করবেন। যুদ্ধে উন্মত্ত রামচন্দ্রও গর্জন করছেন। এখনই শুরু হবে ভয়ানক যুদ্ধ, তিনপক্ষের এই যুদ্ধের যন্ত্রণা পৃথিবী সইবে কী করে!

নীচে সোনার লঙ্কার দিকে তাকালেন নারায়ণ। দেখলেন রাক্ষসসৈন্য প্রবল গর্জনে যুদ্ধে চলেছে। লঙ্কার বাইরে রঘুসৈন্য, যেন ঝড়ের দোলায় সমুদ্রের ঢেউ। দেবদলও চলেছেন যুদ্ধে যোগ দিতে। আর পৃথিবী জুড়ে প্রলয়ের আতঙ্ক, চারদিকে ছুটোছুটি করছে মানুষজন, বাচ্চা বুকে নিয়ে কেঁদে উঠছে মায়েরা।

নারায়ণ বললেন, সত্যিই পৃথিবীর পক্ষে বড়ো বিপদ, স্বয়ং শিব শক্তি দিয়েছেন রাবণকে। এখন শিবের কাছে যাওয়া ছাড়া উপায় কি?

পৃথিবী তবু নারায়ণকেই জানালেন আবেদন, তিনিই রক্ষা করুন পৃথিবীকে। শিব বড়ো রাগী। নারায়ণ দয়ার সমুদ্র, পৃথিবীকে তিনি না বাঁচলে কে বাঁচাবে?

পৃথিবীকে আশ্বাস দিলেন নারায়ণ, দেবতাকুলের শক্তি তিনি হরণ করবেন, দেবতারা লক্ষ্মণকে রক্ষা করতে পারবে না। রাক্ষসদের পক্ষে রয়েছেন মহাদেব। তিনি গড়ুরকে নির্দেশ দিলেন, সেই মহাপাখি যেন দেবতাদের তেজ হরণ করে। যুদ্ধে নামল তিনপক্ষ—রাক্ষস, রাঘবপক্ষ আর রামচন্দ্রকে বাঁচাবার জন্য দেবতারা।

শিবিরে হাজির হয়ে স্বয়ং ইন্দ্র আশ্বাস দিলেন রামচন্দ্রকে—তিনিই জয়ী হবেন। রামচন্দ্র মাটিতে শুয়ে প্রণাম করলেন দেবরাজকে।

দেবতা রাক্ষস মানুষ—সকলকে জড়িয়ে শুরু হল যুদ্ধ। বেজে উঠল শাঁখ, ধনুকের টঙ্কারে কানে তালা লাগে, আকাশ ছেয়ে গেল তির রাশিতে। রণভূমি জুড়ে রাক্ষস-মানুষ আর হাতি-ঘোড়ার মৃতদেহ। রক্তে ভেসে যাচ্ছে মাটি। সৈন্যদের অসামান্য অবস্থানে রেখে ফাঁদ পাতছেন ইন্দ্র—তৈরি হচ্ছে অপূর্ব ব্যূহ।

পুষ্পকরথে যুদ্ধে এলেন রাবণ। তাঁকে দেখে আবার হুংকার দিল রাক্ষসসৈন্য। সারথিকে বললেন রাবণ, চেয়ে দেখো আজ কিন্তু রঘুসৈন্য একা লড়ছে না, তাদের মাঝে রয়েছে দেবসৈন্যরা, ধোয়ার কুন্ডলীর আড়ালে যেমন থাকে আগুন। ইন্দ্রজিৎ নিহত হয়েছে খবর পেয়ে লঙ্কায় হাজির হয়েছে দেবরাজ ইন্দ্র। চলো, চালাও রথ, যেখানে ইন্দ্র সেখানেই চলো!

ছুটে চলল রাবণের রথ। সামনে থেকে ছুটে পালাল সবাই। অসম্ভব তিরন্দাজিতে তিনি সব ব্যূহ ভেদ করলেন। তাঁর পথ রোধ করলেন কার্তিক। জোড়হাতে তাঁকে প্রণাম করে রাবণ বললেন, আমি তোমার বাবা-মাকে নিত্য পূজা করি। তুমি কেন আমার শত্রুদের সঙ্গে? কেন তাঁদের পক্ষে তুমি? তুমি বীর, আমার ছেলেকে অন্যায় যুদ্ধে হত্যা করেছে লক্ষ্মণ। তাকে মারব, পথ ছেড়ে দাও।

কার্তিক বললেন, দেবরাজ ইন্দ্রের আদেশ, লক্ষ্মণকে রক্ষা করব আমি। আসুন লড়াই হোক, আপনার ইচ্ছা পূর্ণ করতে পারছি না।

ভয়ংকর সব বাণে রাবণ বিদ্ধ করছেন কার্তিককে। পার্বতী বললেন তাঁর সখী বিজয়াকে, নীচে চেয়ে দেখ লঙ্কার দিকে, তীক্ষ্ণ সব তিরে রাবণ বিঁধছেন কুমার কার্তিককে। আকাশে চেয়ে দেখ, গড়ুর দেবতাদের শক্তি হরণ করছে। আহা বাছার কোমল শরীর রক্তে ভেসে যাচ্ছে। তুই যা, ছেলেকে থামতে বল। আজ রাবণকে রোখা যাবে না, স্বয়ং মহাদেব তাঁকে শক্তি দিয়েছেন।

বিজয়া কার্তিককে সব বলে-কয়ে ফিরিয়ে আনলেন।

এগিয়ে চলেছেন দুর্দান্ত রাবণ। এবার সামনে স্বয়ং ইন্দ্র। তাঁকে দেখে ভয়ংকর গর্বে রাবণ বলে উঠলেন, যার ভয়ে তুমি কাঁপতে সেই মেঘনাদ তোমারই কৌশলে অন্যায় যুদ্ধে নিহত হয়েছে। তাই আজ আসতে পেরেছ লঙ্কাপুরে, নির্লজ্জ। তুমি নেহাত অমর, নইলে শত্রুকে যেমন শেষ করি, তেমনই নিকেশ করতাম তোমায়। তুমি লক্ষ্মণকে বাঁচাতে পারবে না, এ আমার শপথ।

রথ থেকে গদা হাতে লাফ দিয়ে নামলেন রাবণ, তখনই বজ্র নিক্ষেপ করতে চাইলেন ইন্দ্র। বজ্রের তেজ হরণ করে নিল গড়ুর। ইন্দ্রের বাহন ঐরাবতের মাথায় গদা দিয়ে ভয়ানক আঘাত করলেন রাবণ। সে আঘাতে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল হাতি। আবার রথে গিয়ে উঠলেন রাবণ। পথ ছেড়ে দিতে বাধ্য হলেন ইন্দ্র।

এবার যুদ্ধে এলেন রামচন্দ্র।

রাবণ বলে উঠলেন, আজ তোমাকে চাই না রামচন্দ্র। এ পৃথিবীতে আর একদিন তুমি বেঁচে থাক নিরাপদে। তোমার ভাই, কোথায় সেই ছল-চাতুরি করা যোদ্ধা। তাকেই খুন করব। দূরে লক্ষ্মণকে দেখে রথ হাঁকিয়ে ছুটে চললেন রাবণ।

যুদ্ধে এলেন হনুমান। তাঁকে শক্তি দিলেন তাঁর বাবা পবনদেব। তাঁকেও হারিয়ে দিলেন রাবণ।

যুদ্ধ বাধল সুগ্রীবের সঙ্গে। যুদ্ধের আগে তিক্ত কথা-কাটাকাটি। হেরে গিয়ে পালালেন সুগ্রীবও। রাবণের সামনে থেকে রঘুসৈন্য ভয়ে পালাচ্ছে। এবার সামনে লক্ষ্মণ। হুংকার দিলেন রাবণ। পালটা হুংকার নির্ভয় লক্ষ্মণের। প্রবল রাগে বলে উঠলেন রাবণ, এবার পেয়েছি তোকে লক্ষ্মণ! কই, কোথায় ইন্দ্র ? কোথায় কার্তিক? তোর দাদা রাম কোথায়? রাজা সুগ্রীব? কে তোকে রক্ষা করবে? এই শেষ সময়ে, স্মরণ কর মা সুমিত্রা আর স্ত্রী ঊর্মিলাকে। কী কুক্ষণে তুই সাগর পার হয়েছিলি, রাক্ষসঘরে চোরের মতো প্রবেশ করে তুই আমার ছেলেকে খুন করেছিস! তোর মাংস আমি মাংস-খাওয়া জানোয়ার দিয়ে খাওয়াব।

পালটা উত্তর দিলেন লক্ষ্মণ, আমার ক্ষত্রিয়কুলে জন্ম, যমকেও ভয় পাই না, তোমায় ভয় পাব কেন? ছেলের শোকে তুমি আকুল, যা পার করো। এখনই তোমার শোকের জ্বালা জুড়িয়ে দেব, ছেলে যেখানে তোমায় সেইখানে পাঠিয়ে দিয়ে।

দারুণ যুদ্ধ বাধল দুই বীরে। লক্ষ্মণের বীরত্বে অবাক হলেন রাবণ, প্রশংসাই করলেন লক্ষ্মণের, সাবাস বীর, যেমন ভেবেছিলাম তার থেকে বেশি শক্তি তোর, কিন্তু আজ আমার হাতে তোর রক্ষা নেই।

ছেলেকে স্মরণ করে রাবণ হানলেন মহাশক্তি অস্ত্র। আকাশে বজ্রের গর্জন। ভয়ে কেঁপে উঠলেন দেবতা ও মানব। তারা খসে পড়ার মতো মাটিতে পড়লেন লক্ষ্মণ। ঝনঝন করে বেজে উঠল তাঁর রক্ত-ভেজা অস্ত্রশস্ত্র।

ঘন বনে হরিণকে তিরে বিঁধে ফেলার পর তার দিকে যেমন ছুটে যায় ব্যাধ, তেমনই রথ ছেড়ে লক্ষ্মণের মৃতদেহ দখল করতে ছুটলেন রাবণ। চারদিকে হাহাকার উঠল। দেবতা-মানুষ সকল সৈন্য ঘিরে রাখলেন লক্ষ্মণকে।

কৈলাসে মহাদেবের পায়ে পড়লেন পার্বতী। বললেন, রাক্ষসরাজ যুদ্ধে লক্ষ্মণকে হত্যা করল। ধুলোয় পড়ে আছে লক্ষ্মণ। প্রভু, তোমার ভক্ত রাক্ষসরাজকে তুষ্ট করেছ, ইন্দ্রের গর্ব ভেঙেছ, কিন্তু ভিক্ষা চাই এখন, লক্ষ্মণের দেহকে রক্ষা করো।

রাবণকে থামাবার জন্য মহাদেব বীরভদ্রকে নির্দেশ দিলেন। তৎক্ষণাৎ বীরভদ্র রাবণের কানে গিয়ে বললেন, সোনার লঙ্কায় ফিরে যাও রাক্ষসরাজ। যুদ্ধে শত্রু নিকেশ হয়েছে, আর কী চাই!

সিংহের গর্জন করতে করতে রথে ফিরে গেলেন রাবণ।

বেজে উঠল রাক্ষসবাদ্য। শহরে ফিরে গেল গায়ে রক্তমাখা রাক্ষসসৈন্য। রাক্ষসদের বিজয়গান বাজছে।

যুদ্ধে পরাজিত দেবরাজ মনের কষ্টে ফিরে গেলেন স্বর্গে।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%