স্মৃতিটুকু থাক

পল্লবী সেনগুপ্ত

— “এই শুনছ… এই…” প্রবীরকে হালকা ধাক্কা দিল অস্মি। প্রবীরের খুব একটা হেলদোল হল না। পাশ ফিরে কোলবালিশটা আরও খানিক জড়িয়ে ঘুম জড়ানো গলাতেই বিরক্তি মাখিয়ে বলল, “উঁ! কী হয়েছে কী? কেন ডাকাডাকি করছ?”

প্রবীরের নিরাসক্তি একটু দমিয়ে দিল অস্মিকে। তবুও হাসি মুখে আদুরে গলায় ও বলল, “এই, ঘুরতে এসে কি এভাবে তুমি ঘুমাবে নাকি? চলো না একটু সমুদ্রের পাড় থেকে ঘুরে আসি। পড়ন্ত বিকেলে সাগর পাড়ের সূর্য ডোবা দেখি। লালচে আকাশটা দেখব দু-চোখ ভরে।”

— “উফ! কাব্যি কোরো না তো। ঘুরতে এসে কোথায় বিশ্রাম নেব, তা না উনি ফালতু হ্যাজিয়ে যাচ্ছেন। সারাবছর সেলস-এর টার্গেট আর অফিসের প্রেশার নিয়ে তো নাজেহাল। এই তিনটে দিন তো একটু শান্তি পেতে দাও।”

এবার বিছানার কাছ থেকে সরে এল অস্মি। প্রবীর খুব বিরক্ত হয়েছে এবং সেটাই হয়তো স্বাভাবিক। একটা প্রাইভেট কোম্পানিতে চাকরি করে প্রবীর। সেলস-এ আছে ও। উদয়াস্ত খাটুনি, কাজের চাপ, টার্গেটের প্রেশার, বসের ঝাড় সব সহ্য করতে হয় ওকে। তাই এমত অবস্থায় মাত্র তিন দিনের জন্য দীঘায় বেড়াতে এসে মানুষটা তো একটু আরাম চাইতেই পারে। এতে দোষের তো কিছু নেই।

প্রবীর ঘুমাচ্ছে। পাশে ওদের চোদ্দ বছরের ছেলে প্রমিত। বাপ-ছেলেতে বেশ পটে। মাঝখান থেকে অস্মিই কেমন যেন বাড়তি হয়ে যাচ্ছে দিন দিন ওদের কাছে।

গুটি গুটি পায়ে ঘরের লাগোয়া ব্যালকনিতে গিয়ে দাঁড়াল অস্মি। সমুদ্রের উথাল পাথাল রূপ দেখা যাচ্ছে এখান থেকে। ছোটবেলা থেকেই সমুদ্র বড্ড টানে ওকে। কতবার ইচ্ছে করেছে সদ্য ফোটা নরম পাপড়ির মতো গোলাপি ভোরকে ছুঁয়ে দেখতে সমুদ্রের পাড়ে দাঁড়িয়ে। সে সব এখন ভাবলেও হাসি পায়। ছেলের পড়া, বরের অফিস, সংসারের সব দায়দায়িত্ব সামলাতে সামলাতে এখন কোথায় বলে বেশি বাপের বাড়িই যাওয়া হয় না, আর সেখানে কিনা সমুদ্রের স্বপ্ন দেখার শখ!

এই আসাটাও হতো না। নেহাতই প্রবীররে নিজেরই একটা ব্রেক দরকার ছিল রোজকার স্ট্রেস ভরা জীবন থেকে, তাই আসা হল তিনদিনের জন্য দীঘা।

হঠাৎ কি একটা মনে হতেই গায়ে হালকা চাদর জড়িয়ে নিল অস্মি। ড্রেসিং টেবিলের ওপর রাখা রয়েছে দু-একটা প্রসাধনী দ্রব্য, যেমন পাউডার, ফাউনডেশান, লিপস্টিক, কাজল। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের দিকে একবার ভালো করে তাকাল ও। মাত্র তেত্রিশ বছর বয়সেই যেন বড় বেশি বুড়ি হয়ে গেছে। মাথায় বেশ কয়েকগাছি পাকা চুল, স্থূলকায় শরীর। আর তার ওপর আজকাল মেক আপের পাট তো প্রায় তুলেই দিয়েছে অস্মি।

আসলে সাজগোজ করতে আজকাল আর মনই চায় না। কেনই বা চাইবে? কে দেখে অস্মির দিকে একটা মুহূর্ত নষ্ট করে? না কেউ দেখে না। তাহলে কেনই বা সাজা?

প্রবীরের তো কোনো সময়ই নেই ওর দিকে তাকাবার মতো। এই তো মাস কয়েক আগেই পিসতুতো ননদের বিয়েতে যাবে বলে বেশ সুন্দর করে চুলে ছাঁট দিয়ে ফেসিয়াল করে একটা মেক ওভার মতো করেছিল অস্মি। বিয়ের দিন সন্ধ্যাবেলা গোলাপি ঢাকাই জামদানি পড়ে অনেক আশা নিয়ে জিজ্ঞাসা করেছিল, “এই, কেমন লাগছে গো আমায়?”

প্রবীর ওর দিকে না তাকিয়েই আনমনে উত্তর দিয়েছিল, “কেমন আবার! যেমন তুমি দেখতে তেমনই লাগছে” — পলকে কেমন যেন নিভে গেছিল ও। তারপর থেকে প্রবীরের থেকে নিজের সম্বন্ধে কিছু শোনার বাসনা পুরোপুরি ত্যাগ করেছে। তাই আজকাল আর সাজতেও ভালো লাগে না, নতুন শাড়ি কিনতেও ইচ্ছে করে না। যন্ত্রের মতো চলছে রুটিন মাফিক জীবন। নিজেকে কেমন যেন গুরুত্বহীন, প্রয়োজনহীন একটা অতিরিক্ত আসবাবের মতো লাগে আজকাল। নিজের দিকে তাকাতে বা নিজের জন্য দু-দণ্ড সময় খরচ করতে ইচ্ছাই করে না।

কিন্তু তাই বলে মাত্র তিনটে দিনের জন্য সমুদ্রে বেড়াতে এসে হোটেলে বন্দি হয়ে থাকতে কিছুতেই রাজি নয় অস্মি। তাই গায়ে পাতলা চাদরটা জড়িয়ে নিঃশব্দে বেরিয়ে পড়ল ও হোটেল রুমের চার দেওয়াল ছেড়ে সমুদ্রের ডাকে সাড়া দিতে।

*********

হু হু করে ঢেউ ভাঙছে সমুদ্রের। আর আকাশে এক মুঠো লাল আবির ছড়িয়ে আজকের মতো ঘরে ফেরার প্রস্তুতি নিচ্ছে সূর্যটা। একটা অদ্ভুত মাদকতা মেশানো হাওয়া এসে ছুঁয়ে দিচ্ছে বারবার অস্মির তেত্রিশ বছরের শরীরটাকে।

সমুদ্রের আশেপাশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে বহু মানুষ। কিছু জন পরিবারের সঙ্গে, আবার কিছু কম বয়সি ছেলেমেয়েরা এসেছে বন্ধুদের গ্রুপ নিয়ে। সবাই নিজেদের মতো হা হা হি হি-তে মত্ত। শক্ত বোলডারের উপর দাঁড়িয়ে চারদিকের মানুষগুলোর দিকে আলগোছে চোখ বোলাচ্ছিল অস্মি। হঠাৎ ধুকপুক করে উঠল হৃদপিণ্ডটা। একজন মানুষ একটু দূর থেকে একদৃষ্টে তাকিয়ে রয়েছে ওর দিকে। চোখ কচলে আবার একবার তাকাল অস্মি। না, ভুল দেখছে না ও। মাথাটা কেমন যেন টলছে। নিজের চোখ সরাতে পারছে না এবার ও নিজেও।

লোকটা আস্তে আস্তে এবার এগিয়ে আসছে এই দিকে নিজের দলটা ছেড়ে। মনে হয় কয়েকজন বন্ধু বান্ধব নিয়ে এসেছে সে। ও অস্মির দিকেই আসছে কি? বুকটা তির তির করে কাঁপছে যে।

হ্যাঁ ঠিক তাই। অস্মির সামনে এসেই থামল লোকটা। অল্প হাসল ওর চোখে চোখ রেখেই। সেই হাসি, সেই চলার ভঙ্গি।

— “কেমন আছ অস্মি? আর তুমি এখানে একা যে?” — কোনো ভণিতা না করেই সোজাসুজি প্রশ্ন করল লোকটা। অবশ্য ভণিতা করা কবেই বা তার ধাতে ছিল?

— “না মানে আমি… মানে আমি হাজবেন্ডের সঙ্গেই এসেছি। কিন্তু ও বিশ্রাম করছে এখন হোটেলে।” — কোনোমতে বলল অস্মি। সব শব্দ হঠাৎ যেন বিদ্রোহ করছে।

— “বিশ্রাম করছেন উনি? তোমায় এভাবে একা ফেলে?”

— “না, মানে ও এসব সমুদ্র-টমুদ্র নিয়ে অত আদিখ্যেতা পছন্দ করে না” — বলতে না চেয়েও বলেই ফেলল অস্মি।

— “ও”, ছোট করে বলল সে। তারপর চুপ দুজনেই। কেউই যেন কোনো কথা খুঁজে পাচ্ছে না আর।

— “তুমি কেমন আছ? বউকে নিয়ে বেড়াতে এসেছ বুঝি?” — অস্মিই কথা খুঁজে নিল আবার।

— “নাহ ! বউ নিয়ে না। আসলে আমার মা-বাবা-ভাই-বোন-বউ-প্রেমিকা সব কিছুই আমি একাই। চাকরি-বাকরি আর করা হল না। গান নিয়ে পাগলামি করেই চলছে জীবন। গান করি, গান শেখাই এই ব্যস! আর আমার মতো দু-পয়সার গানের মাস্টারকে কোন বাপই বা মেয়ে দেবে বলো। আমি এসেছি একটা গানের দলের সঙ্গে। একটা খুব ছোট খাটো শো আছে আমাদের। মাচা শো বলতে পারো। দীঘাতেই হবে। পরশু দিন আছে অনুষ্ঠানটা” — বলেই হাসল বিষণ্ণভাবে সে।

— “ও আচ্ছা। আমি তাহলে আজ চলি” — কাঁপা গলায় বলল অস্মি।

— “এতদিন মানে এত বছর পর আবার যে কোনোদিন তোমায় সামনে দেখতে পাব সত্যি ভাবিনি জানো। কিন্তু তুমি এমন বদলে গেলে কী করে অস্মি? কোথায় হারিয়ে গেছে তোমার চোখের সেই টলটলে দীঘির মতো স্বচ্ছ ভাষা? গাল এমন তোবড়ানো কেন? আর কপালে কোনো টিপ নেই যে! টিপ ছাড়া সত্যি আজও বেমানান লাগে তোমায় একই রকম। চোখে কাজল অবধি পরোনি! তুমি ভালো আছ তো?”

হঠাৎ বুকের কাছটা কেমন যেন মুচড়ে উঠল অস্মির।

— “টিপ আর কাজল ছাড়া তোকে একটুও ভালো লাগে না জানিস কি? কেমন যেন মনে হয় রঙচটা অসম্পূর্ণ প্রতিমা” — বহু বছর আগে একটা স্বপ্ন স্বপ্ন বিকেলে অস্মির আঙুল ছুঁয়ে এই কথাগুলোই ওকে বলেছিল ওর প্রেমিক। কিন্তু সে সব তো এখন ওর কাছে ঝাপসা স্মৃতি প্রায়। মাঝে মাঝে মনে হয় সত্যি এমন কিছু ঘটেছিল কি কোনোদিন, নাকি সবটাই ছিল স্বপ্ন কল্পনা?

এখন তো অস্মি শুধুই একটা নিয়মানুবর্তী যন্ত্র, যার কোনো আবেগ থাকা বারণ। কিন্তু এই মানুষটার চোখে বহু যুগ পর আবার যেন নিজেকে আবেগ অনুভূতি সম্পন্ন একজন রক্ত মাংসের মানুষ হিসাবে দেখতে পাচ্ছে অস্মি।

— “না ওসব আর আমার লাগে না। কে দেখবে আমায়? কার আছে অত সময়?” — কান্না চাপার সবটুকু সচেতন চেষ্টাকে সঙ্গে নিয়েই বলল অস্মি।

— “গান ছাড়িস নি তো?” — আবার বলল সে। সব সংযম কি হারিয়ে ফেলল নাকি সে? তুমি থেকে আবার তুইতে চলে গেল কেন? উফফ! কেন হল এই দেখাটা? সে সংযম হারাতে পারে, কিন্তু অস্মি তো পারে না। ও যে একজনের স্ত্রী, একজনের মা। কিন্তু শেষ কয়েকটা মুহূর্ত জুড়ে অস্মির ঘুমিয়ে পড়া আবেগগুলোও হঠাৎ আবার যে জেগে উঠছে একটু একটু করে। তারা যেন চিৎকার করে বলতে চাইছে কারোর মা বউ হবার আগে তুমি যে একজন মানুষ। সম্পূর্ণ আলাদা আবেগ, অনুভূতি সম্পন্ন রক্ত মাংসের মানুষ।

— “আমি আসছি। আমায় হোটেলে ফিরতে হবে এবার” — গলা শক্ত করে বলতে চাইল অস্মি।

— “কাল একবার আসবি ভোরে? বরকে নিয়েই আয়। আমরা আসছি সবাই কাল এখানে ভোর ভোর। সূর্যোদয় দেখব।”

কোনো উত্তর দিল না অস্মি। শুধু হন হন করে পা চালিয়ে এগিয়ে গেল নিজের হোটেলের দিকে।

সূর্য উঠে রোদ ছড়িয়ে দিল সমুদ্রের উপরের আকাশ আর তার চারপাশের সবটুকু জায়গা জুড়ে। সানরাইজ দেখতে আসা লোকজনের দল হই হই করছে পুরো চত্বরটা ঘিরে। সুজয়ও এসেছিল আজ সঙ্গী-সাথীদের উৎসাহে এই সূর্যোদয়ের শোভা দেখতেই। কিন্তু ওর চোখ দুটো এক মুহূর্তেও উদীয়মান সূর্যকে খোঁজেনি। মন আর চোখ বারবার খুঁজছিল অন্য একটা মুখ। বারবার মনে হচ্ছিল যদি একটিবার অন্তত সে আসে!

কেন যেন মনটা বারবার বলছিল সে আসবে। ঠিক একবার আসবে সে, অন্তত আধ মিনিটের জন্য হলেও আসবে। যতটা সময়ই পেরিয়ে যাক না কেন, যাই ঘটে যাক না কেন আজও হয়তো সে উপেক্ষা করতে পারবে না তার সুজয়দার ডাক।

কিন্তু পরমুহূর্তেই মস্তিষ্ক বলেছে এসব কি ভুলভাল প্রত্যাশা তোমার সুজয়? সে আজ একজনের ঘরনি, প্রাপ্তমনস্ক একজন নারী। সে নিশ্চয়ই ষোড়শী কিশোরীর মতো একযুগ আগে জীবন থেকে মুছে যাওয়া প্রেমিকের ডাকে সাড়া দিতে সাতসকালে ছুটে আসবে না। না তো সেটা সমীচীন আর না তো সম্ভব। আর এতই যদি সুজয়ের মূল্য থাকত তার কাছে তাহলে কি সে এভাবে চুপি চুপি পালিয়ে যেত নিজের ভালোবাসার মানুষের জীবন থেকে একদিন হঠাৎ করে কিছু না জানিয়ে!

সম্পর্কটা শুরু হবার পর থেকে হয়তো বড়জোর ছয়-সাত বার দেখা করেছিল ওরা। কিন্তু সেই ছয়-সাত বারের স্মৃতিই যেন আতর হয়ে লেগে রয়েছে সুজয়ের হৃদয়ের সবটুকু প্রাচীর জুড়ে। প্রতিবারই যখন অস্মি আসত সুজয়ের কাছে, তখনই ওর মনে হতো যেন পৃথিবীটা হঠাৎ থমকে গেছে। চেনা কাকের কর্কশ ডাকটাও যেন কি ভীষণ মিষ্টি লাগছে, অতি সাধারণ বিকালটাও যেন বড্ড মায়াময় লাগছে।

অস্মি যখন গলা ছেড়ে গান গাইত বড় ঝিলটার ধারে বসে শুধু সুজয়কে শোনাবার জন্য তখন ওর মনে হতো যদি এই মুহূর্তটাকে মুঠোর মধ্যে বন্দি করে সারাজীবনের জন্য কয়েদ করে রাখা যেত তাহলে না জানি কি ভালোই হতো। অস্মি প্রতিবার যখন চলে যেত কেমন একটা অচেনা কষ্টে যেন ছেয়ে যেত সুজয়ের বুকটা আর ও বারবার বলত, “আর একটু থাক না রে অস্মি। এত তাড়া কীসের তোর?” — আর প্রতিবারই সে বলত, “না সুজয়দা তা হবার নয়। বাড়িতে মিথ্যা বলে এসেছি দেখা করতে, ধরা পড়ে গলে সাংঘাতিক কাণ্ড হয়ে যাবে।”

— “আবার আসবি তো? আমায় ভুলে যাবি না তো?” — প্রতিবার অস্মি চলে যাবার সময় বোকার মতো বলেই ফেলত সুজয়।

সে মিষ্টি হেসে বেণি দুলিয়ে বলত, “কক্ষনো না। কোনোদিনও না।”

তবুও সেই অস্মিই একদিন হারিয়ে গেছিল। সুজয় জানতেও পারেনি। তখন মোবাইল ফোনের তো এত চল ছিল না। তাই সুজয় চেয়েও পৌঁছতে পারেনি তার ভালোবাসার মানুষটার কাছে। শুধু একদিন খবর পেয়েছিল বিয়ে হয়ে গেছে অস্মির। সুজয়কে ভুলে, ওর ভালোবাসাকে ভুলে চিরতরে পর হয়ে গেছে সে। সুজয় ওকে আজ অবধি ভুলতে না পারলেও সে সেদিন অবলীলায় ভুলে গেছিল ওকে। প্রথমে খুব রাগ হয়েছিল, কিন্তু না, তার ওপরে রাগ করেও বেশিদিন থাকাও হয়নি ওর।

খানিকটা দলছুট হয়েই এলোপাথাড়ি স্মৃতির জাল বুনতে বুনতে এগোচ্ছিল সুজয়। হঠাৎ থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল। সামনে দু-হাত দূরত্বের মধ্যে অস্মি। বিষণ্ণ প্রতিমার মতো করে হাঁটছে, যেন মনটা পড়ে রয়েছে এই জগত থেকে অনেক দূরে।

— “অস্মি … অস্মি …” সুজয়ই এগিয়ে গেল। একটু থতমত খেয়ে দাঁড়িয়ে পড়েছে সে-ও।

— “কিরে এলি না? সূর্যোদয় দেখতে?” — অল্প হেসে জিজ্ঞাসা করল সুজয়।

— “না। ভালো লাগছিল না” — ছোট জবাব দিল অস্মি। কেমন যেন লাগছে ওকে। চোখ দুটো ভীষণ ক্লান্ত আর ফ্যাকাশে। নেই কাজলের ছিটেফোঁটাও। গাল তুবড়ে গেছে। কপালের উপর ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা চুলের গোছার মধ্যে থেকেই দৃশ্যমান বেশ কয়েকটা রুপোলি রেখা।

— “অস্মি তুই নিজের এমন হাল করেছিস কেন রে? নিজের কি একটুও খেয়াল রাখিস না? তোকে এভাবে দেখতে যে আমার একদম ভালো লাগছে না।”

— “কেন? খারাপ কী আছে? আমার মতো একটা আধবুড়ি মহিলা আর কীভাবে থাকবে?”

এবার একটু গলা নীচু করল সুজয়, “তুই আধবুড়ি কিনা জানি না। কিন্তু তোকে এভাবে দেখতে আমার ভালো লাগছে না। আমার মনের ক্যানভাসে আজও তোর সেই উজ্জ্বল মুখের ছবিটাই আঁকা আছে। দীপ্তিময় কাজল সাজানো চোখ, শ্যাম্পু করা ফুরফুরে চুল, টোলপড়া হালকা গোলাপি আভা দেওয়া গাল। ছোটখাটো মঞ্চের ফাংশানে গান করতে ওঠার আগে আজও একবার চোখ বুজে মনে করে নিই তোর সেই স্নিগ্ধ হাসিটা। কেমন যেন একটা বিশ্বাস তৈরি হয়ে গেছে ও মুখ একবার স্মরণ করে নিলে সুরটা বেশি সতেজ হবে। আজও যেন একটা প্রেরণা খুঁজে পাই তোর স্মৃতি থেকে। মনে হয়েছিল তোকে আবার কোনোদিন দেখলে নিশ্চয়ই সেইভাবেই দেখব। কিন্তু এটা ভাবিনি। তোর এই শ্রীহীন দশা দেখে আমার সত্যি বড্ড কষ্ট হচ্ছে। তোর কর্তা কি তোকে মোটে শাসন করেন না? শুধু আদর দেন?” — চোয়াল ফাঁক করার অল্প চেষ্টা করল সুজয়।

— “না উনি খুব ব্যস্ত। আমায় আদর বা শাসন কোনোটা দেবারই তার সময় নেই।”

— “আর তুই? তুই কী করিস সারাদিন? গানটা ছাড়িসনি তো?”

— “আমি সংসার নিয়েই ব্যস্ত থাকি। গান-টান করার অত সময় কোথায় আমার? আমার কাছের মানুষগুলোকে কীভাবে ভালো রাখব এই নিয়ে ভাবতে ভাবতেই ফুরিয়ে যায় আমার গোটা দিনটা। নিজেকে নিয়ে আলাদা করে চিন্তা করার কোনো অবকাশই নেই আমার।”

— “কাছের মানুষদের জন্য সময় দেওয়াটা ভীষণ ভালো অস্মি। কিন্তু বাকিদের সময় দিতে দিতে বা সকলের কথা ভাবতে ভাবতে হয়তো তুই এটা ভাবতেই ভুলে গেছিস যে তুই নিজেও একজন আলাদা মানুষ। তোর নিজের সঙ্গে নিজেরও একটা সম্পর্ক আছে যেটা কোনোদিন অস্বীকার করা যায় না। আর সেই সম্পর্ককে উপেক্ষা করে কেউ ভালো থাকতে পারে না। যেমন তুইও ভালো নেই। যে গান একদিন তোর প্রাণ ছিল সেই গানকে নিজের থেকে সরিয়ে দিয়ে বেঁচে আছিস কীভাবে তুই? নিজেকে খারাপ রেখে, নিজের কথা একটুও চিন্তা না করে কি অন্যদেরও মন খুশিতে রাখতে পারছিস তুই নাকি শুধুই একরাশ বদ্ধ কর্তব্য ছুঁড়ে দিচ্ছিস তাদের দিকে? ভেবে দেখিস তো।”

কথা শেষ করেই সুজয় দেখল অস্মি একদৃষ্টে বড় অদ্ভুত ভাবে তাকিয়ে রয়েছে ওর দিকে। তবে কি ও কিছু মনে করল? সুজয় কি একটু বেশিই বলে ফেলেছে আবেগপ্রবণ হয়ে?

কয়েক মুহূর্ত হবে। তারপরেই চোখ সরিয়ে নিল অস্মি। একটু গলা গম্ভীর করে বলল, “আমি আসছি আজ”।

হনহন করে পা চালিয়ে চলে যাচ্ছে অস্মি। কিন্তু সুজয়ের মন এখনও মানছে না। মেয়েটা ভালো নেই। আস্তে আস্তে অস্মি মিলিয়ে যাচ্ছে সুজয়ের দৃষ্টি সীমার বাইরে।

— “গানটা ছাড়িস না প্লিজ”, চিৎকার করে বলল সুজয়।

অস্মি দাঁড়াল না। কথাটা শুনতে পেল কিনা কে জানে!

— “এই, ওই ছেলেটা কে রে?” — তনুকাকে হালকা খোঁচা মেরে জিজ্ঞাসা করল অস্মি।

— “কোন ছেলেটা?”

— “আরে ওই যে ফর্সা মতো, চশমা চোখে… নতুন ভর্তি হয়েছে আমাদের গানের স্কুলে। কি দারুণ নজরুল গীতি গায় রে ছেলেটা। আর সেদিন যখন কিশোর কুমারের নয়ন সরসি কেন ভরেছে জলে গাইছিল আমি তো পুরো মুগ্ধ হয়ে গেছিলাম।”

— “হুম দেখেছি। তুই তো হাঁ করে সুজয়দার দিকে তাকিয়েছিলি, মনে হচ্ছিল এই বুঝি মুখের ভেতর মশা ঢুকে যাবে” — বন্ধুকে হালকা চাপড় মেরে হি হি করে হেসে উঠল তনুকা।

— “ওর নাম সুজয় বুঝি?”

— “হ্যাঁ, সুজয় দাস। আমার দাদারা চেনে ওকে। ওর বাবা নেই। মা একটা দোকানে কাজ করে। খুব গরিবের ছেলে। ভীষণ ভালো গানের গলা। আর গায়ও দারুণ। তেমনি শান্তশিষ্ট।”

— “সত্যি বড় ভালো গায় সুজয়দা। আমার তো দারুণ লেগেছে। মনে হচ্ছিল এমন গান শুনতে শুনতে সারা জীবন কাটিয়ে দেওয়া যায়। আমায় আলাপ করিয়ে দিস তো তনুকা।”

সুজয়ের গান শুনে যে মুগ্ধতার জন্ম হয়েছিল তা আস্তে আস্তে পূর্বরাগের জন্ম দিয়েছিল অস্মির মনে আজ থেকে বছর পনেরো আগে। আলাপ হবার পর টুকটাক কথা বার্তাও হচ্ছিল। কিন্তু অস্মির মন চাইছিল অন্য কিছু। সুজয়ের ভালোবাসা।

সুযোগও এসে গেছিল। একটা নৃত্যনাট্য আয়োজন হল গানের স্কুল থেকে পঁচিশে বৈশাখের সময়। কবিগুরুর শাপমোচন। অস্মির গলায় রাখা হল কমলিকার সব গান, আর সুজয়ের গলায় অরুনেশ্বরের গানগুলো। সেই সময় টানা রিহার্সাল করতে করতে আস্তে আস্তে বন্ধুত্ব বাড়ছিল ওদের। তারপর একদিন সন্ধ্যায় হঠাৎ লোডশেডিং হয়ে গেছিল রিহার্সালের সময়।

গরমের সন্ধ্যায় হাসফাঁস করতে করতে ঘর ছেড়ে বাইরে বেরিয়ে গেছিল সবাই। আবছা মোমের আলো ভরা ঘরটায় শুধু একা বসেছিল অস্মি। আর তার ঠিক উলটো দিকেই সুজয়। মোমের আলোর মায়াবী মাদকতা, পাশের গাছ থেকে ভেসে আসা জুঁই ফুলের গন্ধ কেমন যেন ধীরে ধীরে আছন্ন করে দিচ্ছিল অস্মিকে। হঠাৎ করে বলে উঠেছিল ও, “সুজয়দা একটা কথা বলব?”

— “হুম। বল না…”

— “সুজয়দা আমার খুব ভালো লাগে তোমায়। মানে… মানে ভালোবাসি বলতে পারো। অনেক চেষ্টা করেছিলাম, কিন্তু কিছুতেই আটকাতে পারলাম না নিজেকে তোমায় ভালোবাসা থেকে। ভালোবাসবে আমায়?”

দু’সেকেন্ড নীরব ছিল সুজয়। ওর চোখে ঝিকমিক করছিল একটা অপার্থিব মুগ্ধতা। ধীরে ধীরে শুধু বলেছিল, “কিন্তু তোর আর আমার যে অনেক পার্থক্য সেটা জানিস তো? আমি যে বামন। তাই চাঁদ ধরার স্বপ্ন আমি কী করে দেখব বল?”

সুজয়ের চোখের মুগ্ধতা, ভালোবাসার অনুচ্চারিত ভাষা সেদিন কেমন যেন পাগল পাগল করে দিচ্ছিল অস্মিকে। দু-চোখ বুজে ফেলে ও শুধু বলেছিল,

“আমি অত কিছু জানি না। জানতে চাইও না। আমি শুধু জানি তোমাকে না দেখে, তোমাকে না ভেবে আমার কিচ্ছু ভালো লাগে না।”

হ্যাঁ প্রেমপর্বটা তারপর শুরু হয়েই গেছিল ওদের। অস্মি খুব রক্ষণশীল ব্রাহ্মণ পরিবারের মেয়ে। তাই প্রেমিকের সঙ্গে ঘন ঘন দেখা করার মতো সুযোগ বা সাহস কোনোটাই ওর ছিল না। গানের স্কুলের বাইরে খুব জোর চার-পাঁচ বার দেখা হয়েছিল ওদের। প্রতিবারই সুজয়ের চোখে নিজের জন্য একটা অপার মুগ্ধতা দেখেতে পেত অস্মি। আর সুজয়ের মধ্যে ছিল অস্মিকে আঁকড়ে রাখার একটা প্রবল প্রবণতা। অস্মিই আস্তে আস্তে হয়ে উঠছিল ওর অন্যতম অনুপ্রেরণা।

কিন্তু বিধি বাম। সুজয়ের সঙ্গে ঝিল পাড়ে বসে কাটানো একটা বিকেলের খবর হঠাৎ পৌঁছে গেল ওর বাড়িতে। আঠারো বছরের মেয়েটার গায়েও সেদিন হাত তুলতে ছাড়েননি ওর বাবা। পরের দিনই তড়িঘড়ি ওকে পাঠিয়ে দেওয়া হল মুর্শিদাবাদের মাসির বাড়ি। অস্মির সমস্ত প্রতিরোধ সেদিন উড়ে গেছিল ফুৎকারে। তারপর মাত্র কুড়ি দিনের মাথায় কীভাবে যে ওর বিয়ে হয়ে গেল বাবার বন্ধুর ছেলের সঙ্গে মুর্শিদাবাদ থেকেই সেটা যেন আজও ঠাহর করে উঠতে পারেনি অস্মি। একটিবারও সুজয়ের সঙ্গে কোনো যোগাযোগ করে উঠতে পারেনি ও। শুধু মনে মনে দগ্ধে মরেছে প্রতি রাতে। বহুবার মনে হয়েছে নিশ্চয় সবটা জানার পর ঘেন্না করবে সুজয় ওকে।

তারপর কেটে গেছে অনেক অনেক সময়। কালের প্রভাবে অস্মির মানসপট থেকে ফিকে হতে থেকেছে সুজয়ের স্মৃতি। কিন্তু হঠাৎ করে দীর্ঘ সময় পরে আবার এভাবে যে তার সঙ্গে দেখা হয়ে যাবে সেটা যে স্বপ্নেও ভাবতে পারেনি ও। এখনও ওকে মনে রেখেছে সে! যে দু-চোখে অস্মির জন্য শুধুই ঘেন্না থাকার কথা ছিল, সে দু-চোখে আজও অস্মির জন্য অনেকটা সম্মান আর অনুরাগ কী করে থাকতে পারে!

অনেকদিনের পরে আজ আবার আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে অনেকক্ষণ নিরীক্ষণ করল অস্মি। ঘড়ি বলছে এখন ভোর ছ’টা। প্রবীর ঘুমোচ্ছে অকাতরে, আর পাশে ছেলেও। বহুদিন পর আবার চোখে কাজল লাগাল আজ ও। মাসকারা দিল, আইলাইনারও। ঠোঁটেও লিপস্টিক দিল সামান্য। আর কপালে ছোট্ট টিপ। কতকাল পর আবার প্রসাধনের ছোঁয়া পেল অস্মির রঙচটা শরীরটা, সঙ্গে মনটাও। নিজেকে আয়নায় দেখে নিজেরই বেশ ভালো লাগছে আজ ওর।

ধীর পায়ে হোটেলরুম ছেড়ে সমুদ্র পাড়ে বেরিয়ে এল অস্মি। হাঁটছে ধীর পায়ে। ওর চোখ ইতিউতি খুঁজছে একজনকে। আর মন বারবার বলছে হে ভগবান যেন একটিবার হলেও আজ দেখা পাই তার।

জীবনে নিজের চাওয়াগুলো বেশিরভাগ সময়ই সত্যি না হলেও আজ ওর ডাকটা বোধহয় শুনতে পেলেন ওর ইষ্টদেব। কয়েক পা এগোতেই দেখা মিলল সুজয়ের। সমুদ্রপারের একটা ছোট চায়ের দোকান থেকে চা খেয়ে বেরোচ্ছে সুজয়।

— “সুজয়দা…” নিজে থেকেই ডাকল অস্মি।

থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল সুজয়। শুনতে পেয়েছে ডাকটা। ওর চোখে চোখ পড়ল সুজয়ের। একটা অদ্ভুত মুগ্ধতা আজ নিজের জন্য অস্মি দেখতে পাচ্ছে সুজয়ের চোখে সেই পুরোনো দিনের মতো। বুকের মধ্যে ওর ঝরনা বইছে কুলকুল।

— “অস্মি! এই তো কত ভালো লাগছে আজ। সবসময় এভাবেই সুন্দর করে নিজেকে সাজিয়ে গুছিয়ে রাখবি” — ম্লান হেসে বলল সুজয়।

— “আমরা আজ চলে যাচ্ছি সুজয়দা। তোমার ফাংশান দেখা আর হল না। আবার তোমার গান শোনা হল না।”

— “ও আচ্ছা, ভালো থাকিস” — ছোট করে বলল সুজয়। পলকে মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেছে ওর।

— “হ্যাঁ আবার নতুন করে ভালো থাকতে ইচ্ছা করছে আমার। প্রবীর আর সংসারে বাকি মানুষদের চোখে নিজেকে অপ্রয়োজনীয় আর বিরক্তির কারণ হিসাবে দেখতে দেখতে আমি নিজেকেই কেমন যেন ঘৃণা করতে শুরু করেছিলাম। নিজের প্রতি সবটুকু ভালোবাসা মরে যাচ্ছিল একটু একটু করে। কিন্তু তোমার সঙ্গে আবার নতুন করে দেখা হওয়াটা অনেক কিছু বদলে দিল আমার। তোমার চোখে নিজের জন্য আবার সম্মান দেখতে পেয়ে নিজের মূল্যটা আবার যেন বুঝতে পারলাম। তুমি ঠিক বলেছ নিজের সঙ্গে নিজের সম্পর্ককে উপেক্ষা করে ভালো থাকা যায় না। তাই আমি আবার নিজের কথা ভাবব এবার থেকে। কারোর জন্য না হলেও শুধু নিজের আয়নার জন্য নিজেকে সাজিয়ে রাখব আমি। নিজের ভালোলাগার গান থেকে আর দূরে সরে থাকব না। নতুন করে খুঁজে নেব সুর তাল। আমার ফ্ল্যাটের মহিলারা আমায় অনুরোধ করেছিল অনেকবার, সব বাচ্চাদের নিয়ে আসছে বাইশে শ্রাবণে কিছু অনুষ্ঠান করাতে। আমি করাব সেটা। ছোটদের নিয়ে করাব চণ্ডালিকা। কবিগুরুর হাত ধরেই আবার আমি জুড়ে নেব আমার সঙ্গে সুরের ছিঁড়ে যাওয়া সম্পর্কটা।”

— “বাহ খুব ভালো। তুই খুব ভালো থাক এটাই তো চাই।”

— “কিন্তু শুধু আমি একা ভালো থাকলে তো হবে না। নিজের সঙ্গে নিজের সম্পর্কটা ভুলে গিয়ে তুমি নিজেও তো খারাপ থাকার পথ বেছে নিয়েছ। এটাও যে পাপ সুজয়দা। আজ এক্ষুনি এই সমুদ্রকে সাক্ষী রেখে তোমায় আমাকে কথা দিতে হবে তুমিও ভালো থাকবে। বিয়ে করে সংসারী হবে।”

— “না রে তা হয় না…” কথাটা বলতেই সুজয়ের মনের মধ্যে ভেসে উঠল একটা নাম। শ্যামলী। ওদের পাশের ছোট এক কামরার ঘুপচি বাড়িটায় ভাড়া এসেছে নতুন। অভাব অনটনে বড় হওয়া নিরীহ মুখের মেয়েটা মাঝে মাঝেই সেলাই শিখতে আসে সুজয়ের মায়ের কাছে। মায়ের বড় সাধ ওকে ছেলের বউ করার।

— “কথা দাও সুজয়দা। না হলে আমিও কিন্তু বিবর্ণ প্রতিমার সাজ আর ছাড়তে পারব না এই বলে দিলাম” — আবার সেই আগের মতো জেদ করছে অস্মি। বহু বছর আগের মতো।

— “আচ্ছা বেশ। তাই হবে। কিন্তু আমরা কেন এভাবে আলাদা হয়ে গেলাম অস্মি? কেন এক হতে পারলাম না? আমি গরিব বলে?” — বহু বছর ধরে হৃদয় তোলপাড় করা প্রশ্নটা করেই ফেলল এবার সুজয়।

চোখ নামিয়ে নিল অস্মি। আস্তে আস্তে বলল, “আমাদের সম্পর্কটা বাড়ি থেকে জেনে গিয়ে একদিনের মধ্যেই অনেক দূরে পাঠিয়ে দিয়েছিল আমায়। তারপর আমি কিছু বুঝে ওঠার আগেই কীভাবে যেন দু-সপ্তাহের মধ্যে গাঁটছড়া বাঁধা হল আমার আর প্রবীরের। অনেক চেষ্টা করেও সেদিন যোগাযোগ করে উঠতে পারিনি তোমায়। তারপর বহু রাত কেঁদেছি। শুধু ভেবে গেছি কেন এমন হল আমার সঙ্গে! কিন্তু জানো সুজয়দা, আজ মনে হচ্ছে যা হয়েছে তা হয়তো ভালোই হয়েছে। কে বলতে পারে তোমার সঙ্গে আমার বিয়ে হলে সংসারের রোজনামচার ঘেরাটোপে আস্তে আস্তে একদিন আমি হয়তো তোমার কাছেও হয়ে উঠতাম অভ্যাস আর বিরক্তির অন্য নাম। হয়তো তোমার চোখেও আমার জন্য ভেসে উঠত শুধুই কর্তব্যের বোঝা। তার চেয়ে হয়তো এই ভালো যে আমি সারাজীবন জানব পৃথিবীর এমন একজন মানুষ অন্তত আছে যার কাছে আমি বাড়তি নই, অসুন্দর নই। যার কাছে আজও আমি শুধুই অষ্টাদশী প্রেমিকার প্রতিভূ”।

— “কী জানি হয়তো তুই ঠিকই বলছিস। তুই ভালো থাকলে আমিও সত্যি খুব ভালো থাকব রে।”

— “আর তুমি ভালো থাকলে আমিও ভালো থাকব।”

— “চেষ্টা করব ভালো থাকার। বিয়েটাও না হয় সেরেই নেব।”

— “সমুদ্র আজ আমাদের অনেক কিছু ফিরিয়ে দিল সুজয়দা। হয়তো এইজন্যই এই সমুদ্র আমাদের টেনে এনেছিল দুজনকে একইসঙ্গে একই সময়ে নিজের কাছে। চলি সুজয়দা। প্রবীর জেগে গেলেই খুঁজবে আমায়। ফিরতে হবে যে আজ।”

ধীর পায়ে হোটেলের পথে পা বাড়াল অস্মি। বুকের ভেতরটা বড় নির্ভার লাগছে আজ। না পিছন ফিরে ও আর তাকাবে না। সুজয়ও নিশ্চয়ই পা বাড়িয়েছে নিজের গন্তব্যর পথে। একবার মনে হয়েছিল সুজয়ের মোবাইল নম্বরটা নেবার কথা। কিন্তু শেষমেশ আর সেটা চাইল না অস্মি। কী দরকার সব সম্পর্ককে বিজ্ঞানের যন্ত্রে বেঁধে ফেলার! কিছু সম্পর্কের অনুভূতি না হয় স্মৃতিপটেই কয়েদ হয়ে থাক অপরিবর্তিত ধ্রুবতারার নির্মল জ্যোতির মতো।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%