একটা প্রেমের গল্প

পল্লবী সেনগুপ্ত

রোজকার মতোই লাঞ্চের সময় অফিস ক্যান্টিনে ঢুকতেই অর্চিকে দেখতে পেল অরিন। কোণার দিকে একটা টেবিলে মুখটা ব্যাজার করে বসে আছে একা একা।

ওর সামনের চেয়ারটা টেনে ধপ করে বসে পড়ে গলা ঝাড়ল, “কী গুরু মুখটা এমন বাংলার পাঁচের মতো করে রেখেছ কেন শুনি? আর এই লাঞ্চ টাইমে একা একা বসে যে? তোমার হিরোইন কোথায়?”

— “ইয়ার্কি ছাড়। আমার একদম কিচ্ছু ভালো লাগছে না। কী করব কিচ্ছু বুঝতে পারছি না” — তেঁতো গেলার মতো মুখ করে বলল অর্চি।

— “কেন রে? কেসটা কী?” — এবার সিরিয়াস স্বরে বলল অরিন।

— “বাড়ি থেকে বিয়ের জন্য বেজায় চাপ দিচ্ছে রে। তুই তো জানিস আমার বাবা-মা আর বাড়ির লোকেরা শহুরে মানুষ নয়। তাদের ধ্যান ধারণাটাও একটু পুরোনো ধরণের। ঠাকুমার শরীরের অবস্থা খুব খারাপ। তাই তিনি নাত বউয়ের মুখ দেখে যেতে চান। সেই জন্য বাড়ির সকলে আমার বিয়ে নিয়ে একেবারে ক্ষেপে উঠেছে। এই উইক-এন্ডে যখন গ্রামের বাড়ি গেছিলাম, মনে হচ্ছিল সকলে যেন তক্ষুনি আমার বিয়ে দিয়ে দেবে।”

— “তা ভালো তো। বিয়ে করে সংসারী হয়ে যা। এতে এত চাপের কী আছে? বাড়িতে কাজরীর কথা বলেছিস তো নিশ্চয়ই। তোর বাড়ির সকলে যতই প্রাচীনপন্থী হোক না কেন ছেলের ভালোবাসার মানুষকে মেনে নিতে আপত্তি হবে না নিশ্চয়ই।”

— “না রে অরিন ব্যাপারটা তা নয়। কাজরীকে মেনে নিতে আপত্তি কেউ করবে বাড়িতে এমন নয়। কিন্তু কাজরীর কথা আমি এই মুহূর্তে বলব কী করে বল তো? একে তো সম্পর্কের বয়স মাত্র দশ মাস। তার মধ্যে কাজরী কেমন স্বাধীনচেতা মেয়ে সে তো তুই জানিস। আর সবচেয়ে বড় কথা হল ও সামনের মাসে সিডনি চলে যাচ্ছে চোদ্দ মাসের একটা প্রোজেক্ট নিয়ে। তাই কাজরী কোনোভাবেই চায় না সিডনি যাওয়ার আগে এই সব ঝামেলার মধ্যে যুক্ত হতে। ও আমায় খুব কড়া ভাবেই বলে রেখেছে যেন আমাদের বিয়ে নিয়ে এক্ষুনি কোনো শোরগোল আমি না তুলি। আর সিডনি যাবার আগে ও কোনোমতেই আমার মা-বাবাকেও ফেস করতে চাইছে না। কিন্তু এখন যদি আমি বাড়িতে ওর কথা বলি তাহলে সকলে এক্ষুনি ওকে দেখতে চাইবে। হয়তো ও যাবার আগে আশীর্বাদী অনুষ্ঠানও করে রাখতে চাইবে। কিন্তু কাজরী এগুলো এই মুহূর্তে কোনোভাবেই মেনে নেবে না রে” — অদ্ভুত অবসাদ ঝরে পড়ল অর্চির গলা থেকে।

— “ঠিক আছে এত চিন্তা করিস না। ঠিক কিছু একটা ব্যবস্থা হয়ে যাবে” — অরিন আশ্বাস দিতে চেষ্টা করল সহকর্মী তথা বন্ধুকে।

— “নারে ভাই, সমস্যা ক্রমশ জটিল হচ্ছে। বাড়ি থেকে আমার বিয়ে বিশাখার সঙ্গে মোটামুটি পাকা করেই ফেলেছে। বলছে আগামী শ্রাবণেই নাকি… আমার কোনো কথাই কেউ শুনতে চাইছে না। নানারকম ইমোশনাল অত্যাচার চলছে।”

“ওয়েট ওয়েট… এই বিশাখা আবার কে? সিনে কোনো সেকেন্ড হিরোইন নাকি?” — চোখ মটকে এবার চটুল হাসছে অরিন।

— “প্লিজ ভাই, ঠাট্টা নয়। বিশাখা আমাদের গ্রামেরই মেয়ে। গ্রামের স্কুলের হেড স্যারের একমাত্র সন্তান। আমি ওকে ছোটবেলা থেকেই চিনি। এক সময় অল্প কিছুদিন ওকে ইংরেজি পড়িয়েছিলাম। সেসব অনেকদিন আগের কথা। মেয়েটা এমনিতে খুব ভালো। এখন সেও এই কলকাতা শহরেই থাকে। কোন একটা সরকারী স্কুলের টিচার। গ্রামে সকলের চোখের মণি বিশাখা। সকলে একেই আমার বউ বানাবে ঠিক করেছে। মেয়েটার সঙ্গে আমার একটা মিটিংও ফিক্স করে ফেলেছে সবাই মিলে। আজ বিশাখা আমার ফ্ল্যাটে আসবে, ফ্ল্যাট দেখেশুনে নিতে। সবাই তো ধরেই নিয়েছে আমি আর ও-ই সংসার করব দুজনে মিলে আগামী দিনগুলোতে। সকলের ইচ্ছা তাই আমরা একবার নিভৃতে নিজেদের আগামী দিনের বাসায় বসে কিছু কথা সেরে নিই। আমি জাস্ট এটা মেনে নিতে পারছি না অরিন। আমি কোনোমতেই বিশাখাকে বিয়ে করতে পারব না। ইনফ্যাক্ট কাজরী ছাড়া অন্য কাউকে মেনে নেবার কোনো প্রশ্নই উঠছে না। কিন্তু আমি যে কী করি?” — টেবিলে দুমদুম করে কয়েকটা ব্যর্থ ঘুষি মারল অর্চি।

— “হুমম… সমস্যা একটু জটিল ঠিকই কিন্তু তা বলে সমাধান নেই এমন নয়। আমি যা বলছি তাই শোন…” বিজ্ঞের ভঙ্গিতে বলল অরিন।

নদীতে ডুবে যাওয়া মানুষ খড়কুটো পেলে যেমন আশ্বস্ত হয় সেভাবেই খুশিতে নড়ে উঠল অর্চি।

— “বল ভাই বল। প্লিজ আমায় এই সমস্যা থেকে বাঁচা অরিন…” বন্ধুর হাত চেপে ধরেছে সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার অর্চি রায়।

ব্যাগ থেকে ঠিকানাটা বের করে মিলিয়ে নিল বিশাখা। হ্যাঁ, ঠিক জায়গাতেই এসেছে ও। এই তো মালতী অ্যাপার্টমেন্ট। এখানেই তো অর্চিদার ফ্ল্যাট। বুকের মধ্যে কেমন যেন ধুকপুক করে উঠল বিশাখার। পড়ন্ত বিকেলের গোলাপি আলো যেন লালচে আবির ছড়িয়ে দিচ্ছে বিশাখার বুকের ভিতরেও।

অবশেষে কিনা অর্চিদার ঘরনি হওয়াই লেখা ছিল ওর কপালে! দমকা ঝড়ে এলোমেলো হয়ে যাওয়া ডায়েরির পাতার মতো বিশাখার স্মৃতিখাতার পৃষ্ঠাগুলোও অবাধ্য ভাবে ছুটোছুটি করছে কেমন যেন ওর ভেতরে। মনে পড়ে যাচ্ছে কত সব পুরোনো দিন। তখন সবে ক্লাস সেভেন বিশাখা। আর অর্চিদা ইলেভেন। প্রথম মন্দিরা বলেছিল ওকে কথাটা একটা সরস্বতী পুজার দিন, “জানিস অর্চিদা না তোর দিকে আজ দেখছিল লুকিয়ে লুকিয়ে অঞ্জলির সময়।” মন্দিরা ঠিক বলেছিল কিনা সেদিন বিশাখা জানত না। কিন্তু এই কথাটা শোনামাত্রই বুকের ভেতর কেমন যেন জলতরঙ্গ বেজে উঠেছিল ওর। আর তারপর থেকেই বারবার ওর ইচ্ছা করত অর্চিদাকে দেখতে।

না, অর্চি ওকে দেখছে লুকিয়ে বা প্রকাশ্যে এমনটা ওর কখনওই চোখে পড়েনি, কিন্তু আস্তে আস্তে বিশাখা বুঝতে পারছিল ঐ মানুষটাকে একটা দিনও দেখতে না পেলে ওর আর মন ভালো থাকবে না। কি সুন্দর দেখতে অর্চিদা, ঠিক যেন রাজপুত্র।

আর তারপর বিশাখা ইলেভেনে ওঠার পর তিন মাস ওকে ইংরেজিটা দেখিয়ে দিয়েছিল সে। আর সেই তিন মাসে তো ওর মনের সবটুকুই চুরি হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু মনে মনে যতই ভালোবাসুক না কেন বিশাখা কোনোদিনই ভুলেও সেকথা অর্চিদাকে বুঝতে দেয়নি। সত্যি বলতে কি কাউকেই কোনোদিন জানতে দেয়নি ও নিজের মনের গোপন ভালোবাসা। কোনোদিন আশাও করেনি মানুষটাকে নিজের করে পাবার। নিজের একতরফা প্রেম হিসাবেই সবটা ধরে নিয়েছিল ও। কিন্তু পাকেচক্রে সেই লোকটার সঙ্গেই যে দুই বাড়ির বড়রা মিলে এভাবে বিশাখার বিয়ে ঠিক করে ফেলবে সে যে ও ভুলেও ভাবেনি! এখনও তো কেমন যেন সবটা স্বপ্ন স্বপ্ন লাগছে ওর। আজ কিনা সেই অর্চিদার সঙ্গেই কথা বলতে এসেছে ও তার ভাবী স্ত্রী হিসেবে।

বাড়ির সকলে বলেছিলেন ওর সঙ্গে ফোনেও মাঝে মাঝে কথাটথা শুরু করতে। কিন্তু বিশাখা পারেনি। কি এক ব্রীড়া যেন বারবার রুদ্ধ করেছে ওকে। না, অর্চিদাও কখনও ফোন করেনি। হয়তো সেও একই রকম অস্বস্তির শিকার।

সাতপাঁচ ভাবতে ভাবতে লিফটের চাবি চাপল বিশাখা। যন্ত্রে চেপে পৌঁছে গেল ভাবী বাসস্থানের নির্দিষ্ট তলায়। কিন্তু একি ! দরজায় তো তালা। তার মানে অর্চি কি এখনও ফেরেনি অফিস থেকে? কিন্তু কেন? মাসিমা মানে অর্চিদার মা তো ওকে বলেই রেখেছেন নিশ্চয়ই আজ বিশাখা আসবে।

দেওয়ালে হেলান দিয়ে এবার ব্যাগ থেকে বোতল বের করল বিশাখা। খানিক জল খেল ঢকঢক করে। স্কুল থেকে সিধা চলে এসেছে এখানে। তাই বেশ ক্লান্ত লাগছে এবার। কিন্তু সে কই? একবার কি তাহলে ফোন করে দেখবে বিশাখা?

— “এই তুমি কে গো? তুমিই কি বিশাখা?” — অপরিচিত মহিলা স্বরে ভাবনায় ছেদ পড়ল ওর। উলটোদিকের ফ্ল্যাট থেকে বেরিয়ে এসেছেন এক গোলগাল ফর্সা চেহারার ভদ্রমহিলা।

— “হ্যাঁ আমিই… কিন্তু আপনি?” — একটু সংকুচিত স্বরে বলল বিশাখা।

— “আমি রুপালি। অর্চির রুপালি বউদি। মাসিমা মানে অর্চির মা-ও আমায় খুব ভালোবাসেন। এখানে উনি এলেই তো শুরু হয় আমাদের গল্প। আমি আপাতত তোমার হবু বরের লোকাল গার্জেন বলতে পারো। ছেলের বউ না আসা অবধি মাসিমাই এই দায়িত্ব দিয়েছেন আমায়। আর উনিই আজ সকালে আমায় ফোন করে বলেছেন তুমি আজ এই ফ্ল্যাটে আসবে। অথচ ছেলের কাণ্ড দেখো! এখনও নিশ্চয়ই কাজ নিয়ে অফিসে পড়ে আছে। ঠিক এই ভয়টাই মাসিমা করছিলেন জানো তো। যাইহোক, তুমি এস তো। আমার ফ্ল্যাটে এসে বসো, যতক্ষণ না তোমার হবু কর্তা ফিরছেন” — বিশাখার হাত টেনে ওকে নিজের ফ্ল্যাটে নিয়ে গেল রুপালি।

ভদ্রমহিলা বেশ আন্তরিক। কথা বলতে ভালো লাগছিল বিশাখার। কিন্তু মিনিট দশকের বেশি কথা বলা হল না। ন মিনিট চৌত্রিশ সেকেন্ডের মাথায় ফিরে এল অর্চি।

“যাও যাও প্রাক-বিবাহ প্রেমপর্বের শুরু করে দাও আজ থেকেই…” — বিশাখার পিঠে আলতো চাপড় মারল রুপালি।

অর্চিকে দেখেই বুকের মধ্যে আবার সেই পুরোনো জলতরঙ্গটা বেজে উঠল বিশাখার। গলার কাছে একসঙ্গে একলক্ষ রঙিন প্রজাপতি উড়ে গেল নিজের হবু স্বামীর ফ্ল্যাটে পা দেওয়া মাত্রই।

— “বোসো”, গম্ভীর গলায় বলল বিশাখার অর্চিদা।

দু-মিনিটের মধ্যে রান্নাঘর থেকে সে নিয়ে এল একটা ঠান্ডা জলের গ্লাস। তারপর কেটে কেটে বলল, “বিশাখা, আমার তোমার সঙ্গে খুব গুরুত্বপূর্ণ কিছু কথা আছে। আর সেই কথাগুলো বলার জন্যই আজ তোমার মুখোমুখি হয়েছি আমি।”

নিমেষে সব ভালোলাগা সব উবে গেল বিশাখার। অদ্ভুত একটা ভয় চেপে ধরল ওকে। অর্চিদার গলাটা এমন ঠান্ডা আর নিঃস্পৃহ শোনাচ্ছে কেন? কী বলতে চাইছে ও? খারাপ কিছু কি? তবে কি এই বিয়েতে মত নেই অর্চিদার?

ব্যাগের মধ্যে ফোনটা ভাইব্রেট হচ্ছে বুঝতে পেরেই বিরক্তিতে মুখটা কুঁচকে গেল কাজরীর। ঝট করে মুঠো ফোন বের করে ঝাঁজিয়ে উঠল ও।

— “কী ব্যাপার অর্চি, কেন ফোন করছ আমাকে এখন? গতকাল বিকালেই তো কথা হল তোমার সঙ্গে। তুমি তো জানো আগামীকালকেই বেরিয়ে যাচ্ছি আমি, তাই আজ খুব ব্যস্ত থাকব সেটাই কি স্বাভাবিক নয়?”

— “না মানে আসলে তোমার কথা হঠাৎ খুব মনে পড়ল। এত দূরে চলে যাচ্ছ তুমি। তাই…” — অর্চির গলার কষ্টটা পড়তে পারল না কাজরী। আরও রুক্ষ হল ওর স্বর, “মিডল ক্লাস ন্যাকা ছেলেদের মতো কথা বোলো না প্লিজ। দূরে যাচ্ছি তো কী? স্কাইপ কল, ভিডিও চ্যাট সব অপশনই থাকছে নিশ্চয়ই। এখন আমি ফোন রাখছি।”

কট করে কেটে গেল ফোন। আর মোবাইল হাতে ভ্যাবলার মতো বসে রইল অর্চি। মুঠো ফোনটাও ঝপ করে নিভে গেল চার্জ শেষ হয়ে। ফোনটা ছুঁড়ে ফেলে মাথা চেপে শুয়ে পড়ল ও। ছটফট করছে পাগলের মতো। মাথার ভিতরটা যন্ত্রণায় যেন ফেটে যাচ্ছে ওর। বুকের ভেতর অসহ্য একটা ব্যথা। গা আগুনের মতো গরম। একটু আগেই থার্মোমিটার জানান দিয়েছে শরীরের উত্তাপ এখন প্রায় ১০৩ ডিগ্রির কাছাকাছি। হাত-পা জুড়ে অদ্ভুত একটা অবসন্ন ভাব জাগছে ধীরে ধীরে। মনে হচ্ছে শরীরের সব শক্তি যেন হারিয়ে যাচ্ছে ক্রমশ। গলার কাছে অসহ্য ব্যথা। প্রচণ্ড বমিও পাচ্ছে। কিন্তু অর্চির ক্ষমতা নেই এখন উঠে বাথরুম পর্যন্ত যাবার। শোবার ঘরের বিছানায় বসেই হড়হড় করে খানিকটা বমি করে ফেলল ও। আরও খারাপ হচ্ছে শরীর সময়ের সঙ্গে সঙ্গে। তবে কি আজকেই মারা যাবে অর্চি? নিজের গ্রামের বাড়ি থেকে বহুদূরে একলা এই শহরের ফ্ল্যাটেই কি তবে শেষ নিঃশ্বাস পড়বে ওর? কেউ তো জানতেও পারবে না অর্চি কত কষ্ট পেয়ে মারা যাচ্ছে। ওর বাবা-মা ভেলোরে গেছেন ঠাকুমার চিকিৎসার জন্য। তারা তো কেউ জানেনই না তাদের ছেলে কেমন অসুখে পড়েছে। নিজের জন্য ডাক্তার ডাকার ক্ষমতাটুকু পর্যন্ত নেই ওর। ওদিকে রুপালি বউদিরাও কেউ নেই আজ। বোনের বিয়েতে আজ সকালেই বেরিয়ে গেছেন ওরা সবাই মিলে। সকালে বউদি এসেছিলেন অর্চিকে আজকে দুপুরের জন্য কিছু খাবার দিতে। একবার জিজ্ঞাসাও করেছিলেন, “কিরে ভাই তোর চোখ-মুখ এমন লাগছে কেন? শরীর খারাপ নাকি?”

— “না না, ওই একটু জ্বর” — ব্যাপারটাকে ওই লঘু করে দিয়েছিল। তাই বউদিরাও বোঝেননি বোধহয় তখন, আসলে ঠিক কতটা অসুস্থ হয়ে পড়েছে অর্চি।

আস্তে আস্তে চোখের সামনে কেমন যেন অন্ধকার ঘনিয়ে আসছে ওর। ও বুঝতে পারছে মৃত্যু আসন্ন এবার। বড্ড ইচ্ছা করছে শেষ সময়ে একটুকরো স্নেহসিক্ত পরশ পেতে। সেই সামান্য আশাটুকুতেই তো ফোন করেছিল ও কাজরীকে। কিন্তু…

না, একাই ধুকে ধুকে এখন মরতে হবে এখন ওকে। এই শহরে যে ওর আপন কেউ নেই। ও যে বড্ড একা।

ঠক ঠক ঠক… মনে হল যেন একটা শব্দ হচ্ছে ঘরের বাইরে। ক্ষীণ আওয়াজ যেন আচমকা ধাক্কা মারল কানে। দরজায় কেউ যেন ধাক্কা দিল কি? অর্চি ঠিক বুঝতে পারল না। সত্যি কি কেউ দরজা ধাক্কাচ্ছে নাকি মনের ভুল ওর?

— “অর্চিদা… ও অর্চিদা দরজাটা খোলো একবার। কলিং বেল বাজছে না কেন?” — পুরোনো পরিচিত একটা কণ্ঠস্বর আছড়ে পড়ল অর্চির কানে।

বিশাখা না? সত্যি কি বিশাখা এসেছে তবে? কিন্তু কেন আসবে ও এখানে হঠাৎ?

— “অর্চিদা…” — আবার ডাকল বিশাখা। বুকের মধ্যে হাজার কষ্টেও যেন এক পশলা বৃষ্টি হল অর্চির। তাহলে কি এ যাত্রায় বেঁচে যাবে ও? তবে কি সত্যি দরজার বাইরে বিশাখা এসে দাঁড়িয়েছে?

শরীরটাকে কোনোমতে টানতে টানতে দরজা পর্যন্ত নিয়ে গেল ও। দরজা খুলতেই দেখতে পেল দাঁড়িয়েছে এসে সে। বিশাখা।

— “একি অবস্থা তোমার অর্চিদা?” — আঁতকে উঠল বিশাখা।

অর্চি কিছু বলতে চাইল। কিন্তু পারল না। শুধু ঠোঁট দুটো সামান্য নড়ল ওর। ও বুঝতে পারল নিজের চেতনা হারিয়ে লুটিয়ে পড়ছে ও। জ্ঞান হারাবার আগের মুহূর্তে শুধু ও শুনতে পেল বিশাখার আকুল গলা, “ডাক্তারবাবু, প্লিজ দেখুন মানুষটাকে। কী হল ওর। অর্চিদাআআ…”

— “আমার তোমাকে খুব জরুরি কয়েকটা কথা বলার আছে বিশাখা” — অসম্ভব ঠান্ডা গলা অর্চির। ওই নিরুত্তাপ স্বরে বোধ হয় কিছু একটা বুঝতে পারল বিশাখা। অল্প কেঁপে উঠল ও। ভাঙাচোরা গলায় বলল, “তুমি কিছু বলার আগে আমি তোমায় কিছু বলতে চাই অর্চিদা। জানি না কীভাবে বলা উচিত। কিন্তু এটা একদম সত্যি কথা যে আমি তোমায় ভালোবাসি। আজ থেকে নয়। অনেক দিন আগে থেকে। হয়তো ভালোবাসা বিষয়টাকে যেদিন থেকে বুঝতে শিখেছি সেদিন থেকেই। শুধু কোনোদিন কাউকে জানতে দিইনি। নিজের সমস্ত ভালোবাসাটা নিজের বুকের মধ্যেই আড়াল করে রেখেছিলাম অনেকটা লজ্জার স্পর্শ মাখিয়ে। তাই আজ এই বিয়েটা হবার পর আমি তোমায় খুব ভালো রাখব এটা কথা দিতে পারি। নিজের সবটুকু দিয়ে আগলাব তোমায়। আমি কথা দিচ্ছি।”

— “প্লিজ বিশাখা… প্লিজ এসব বোলো না। আমার কথাটা আগে আমায় বলতে দাও তুমি। আমি জানি বিশাখা তুমি খুব ভালো মেয়ে। কিন্তু বিশ্বাস কর আমি নিরুপায়। তোমার ভালোবাসার মর্যাদা দেবার ক্ষমতা আমার নেই। আর বাড়ির সকলে চাইলেও এই বিয়েটা আমি করতে পারব না। কারণ আমি অন্য একজনকে ভালোবাসি। কাজরী। কাজরীর মতো স্মার্ট, সুন্দরী আর আধুনিকা একজন প্রেমিকার স্বপ্নই আমি চিরকাল দেখে এসেছি। কিন্তু আজ আমি এত অসহায় যে আমার এই ভালোবাসার কথা আমি কাউকে জানাতেও পারব না। কারণ কাজরী খুব শিগগির বিদেশ চলে যাচ্ছে চোদ্দ মাসের জন্য। তাই ও চায় না এক্ষুনি এই সম্পর্কটার ব্যাপারে আমি আমার বাড়িতে জানাই” — এক নিঃশ্বাসে নিজের কথাগুলো বলেই অর্চি বুঝতে পারল বিশাখার চোখের কোণে ভিড় করেছে একদলা কালো মেঘ। বৃষ্টি হয়ে ঝরে পড়বে বোধহয় ও মেঘ এক্ষুনি। কিন্তু সবটা বুঝেও নির্লজ্জ হল অর্চি আরও বেশি করে। ঠিক অরিনের কথা মতো।

— “বিশাখা আমি তোমার কাছে সাহায্য চাই। এই বিপদ থেকে তুমিই আমায় বাঁচাতে পারো। আমি এই বিয়ে না করতে চাইলে সবাই নানা ভাবে চাপ দেবে আমায়। বাড়িতে অশান্তি হবে নানা রকম। তাই প্লিজ যা করার তোমাকেই করতে হবে।”

— “কিন্তু কী করব আমি?” — কান্নাভেজা গলাতেই বলল মেয়েটা।

— “তুমি জানাও তুমি এই বিয়ে করতে চাও না। কারণ হিসাবে যা কিছু বলতে পারো। তুমি বলতে পারো আমাকে তোমার পছন্দ নয়। কিংবা বলে দিও তুমি অন্য কাউকে বিয়ে করতে চাও অথবা তুমি বিয়ে করতেই চাও না এখন। যা হোক কিছু বলে দিও।”

ঠিক এইভাবেই প্রথমদিন নিজের বাড়িতে ডেকে বিশাখাকে ব্যবহার করেছিল অর্চি নিজের স্বার্থ সিদ্ধি করতে। বিশাখা মেনেও নিয়েছিল ওর কথা। অর্চির দাবীটুকু শুনে জল ভরা চোখে বেরিয়ে গেছিল ওর ফ্ল্যাট ছেড়ে।

আর ঠিক তারপরের দিনই অর্চির মা ছেলেকে ফোন করে উপুড় করে দিয়েছিল এক গামলা সহানুভূতি।

— “ছিঃ ছিঃ বিশাখা মেয়েটা যে এমন সত্যি বুঝতে পারিনি রে বাবা। কেমন সরল সেজে থাকে, অথচ পেটে পেটে এত শয়তানি। ওর বাবা জানালেন মেয়ে নাকি বলেছে সে বিয়ে করবে না। ওর সঙ্গে ইতিমধ্যে নাকি কোনো সহকর্মীর প্রেম হয়েছে। ছিঃ! ঘেন্না ঘেন্না। এতই যদি নষ্টামির শখ তো এতদিন বলল না কেন? আমাদের সবার, আমার ছেলের মন, অনুভূতি নিয়ে খেলল কেন?”

মা যা নয় তাই সেদিন বলছিল বিশাখার সম্বন্ধে। একটু অপরাধী লাগছিল অর্চির। কিন্তু মুখ বুজেই সবটা তবু শুনে গেছিল ও। না শুনে আর কিই বা উপায়।

মায়ের ফোন রেখেই খুশিতে আত্মহারা হয়ে ও সেদিন ফোন করেছিল কাজরীকে।

“কাজু তুমি নিশ্চিন্তে সিডনি যাও। এদিকটা আমি সব সামলে নিয়েছি” — মন খুলে বলেছিল প্রেমিকাকে। অথচ বিশাখাকে একবারও ফোন করে ধন্যবাদ জানায়নি নিঃস্বার্থভাবে সব দায় নিজের ওপর নেবার জন্য। আসলে অর্চি আর কোনোদিন বিশাখার মুখোমুখি হতেই চায়নি সচেতনভাবে।

কিন্তু মানুষ যা চায় তা যে বাস্তবে হয় না। সেইজন্য সেই বিশাখার হাতেই হয়তো সুস্থ হওয়া লেখা ছিল ওর। যেদিন কাজরী বিদেশ গেল ঠিক তার আগের দিনই মারাত্মক জ্বরে পড়ল অর্চি। একা একা হয়তো মরেই যেত ও। কিন্তু ওকে মরতে দেয়নি বিশাখা। রুপালি বউদির সঙ্গে ফোন নম্বর আদান-প্রদান হয়েছিল সেই প্রথমদিনেই মেয়েটার সেটা জানত না অর্চি। অর্চির চোখমুখ দেখে সেদিন ঠিক ভালো লাগেনি রুপালি বউদির। তাই বিশাখাকে ফোন করে খবরটা দেন উনি। আসলে বউদিকে জানানো হয়নি যে আসলে বিশাখার বিয়েটা ভেঙে গেছে ওর সঙ্গে। সেইজন্যই হয়তো বউদি ফোন করেছিলেন ওকে।

খবর পেয়েই ডাক্তার নিয়ে ছুটে এসেছিল মেয়েটা। তারপর টানা পাঁচ দিন ধরে ক্রমাগত সেবা করে গেছে ও অর্চির, প্রতিদিন ওর ফ্ল্যাটে এসে। যেন ও কত আপনজন ওর।

এখন অর্চি সুস্থ। ডাক্তারের চিকিৎসা আর বিশাখার সেবা সারিয়ে তুলেছে ওকে। তবে ও সুস্থ হবার পর থেকেই আবার হারিয়ে গেছে বিশাখা। এখন আর আসছে না ওর ফ্ল্যাটে। ফোন করে খবরও নিচ্ছে না তেমন। কিন্তু না, অর্চি আর ওকে হারিয়ে যেতে দেবে না। এই অসুখটা যেন এক ধাক্কায় চোখ খুলে দিয়েছে ওর। ও বুঝতে পেরেছে জীবনে ভালো থাকার মানে। ভালোভাবে বেঁচে থাকতে গেলে একজন সুন্দরী আধুনিকা প্রেমিকা নয়, পাশে একজন ভালোবাসতে পারার মতো মানুষ প্রয়োজন। আর ঠিক তেমনই একজন মানুষ বিশাখা। কাজরীর মতো একজন স্বার্থপর মানুষের জন্য বিশাখাকে কিছুতেই হারানোর ভুলটা আর করতে পারবে না অর্চি। সেইজন্যই তো আজ বিশাখাকে এই দামি কফিশপে ডেকে পাঠিয়েছে ও। সেদিন যেমন বিশাখা নিজের মনের কথা বলেছিল ওর সামনে, তেমনই অর্চি বলবে আজ। কিন্তু ও আসবে তো?

পর পর দু কাপ কফি শেষ করে যেই তিন নম্বর কফিটা অর্ডার করতে যাচ্ছিল ও ঠিক তখনই কাঁচের দরজা ঠেলে কফি শপে প্রবেশ করল বিশাখা। মুহূর্তের মাঝেই যেন বুকের ভেতর দামামা বেজে উঠল অর্চির।

চেয়ার টেনে বসল ওর ঠিক মুখোমুখি মেয়েটা। কপালে ওর বিন্দু বিন্দু ঘাম। এক গাল হেসে বলল, “কী, এখন একদম ফিট তো?”

হ্যাঁ অসুখের ঐ সময়টায় বিশাখা ওর সেবা করতে কর‍তে অনেক সহজ হয়ে গেছে অর্চির সামনে আগের থেকে।

— “বিশাখা তোমায় আমার কিছু বলার আছে।”

— “হ্যাঁ বলো” — ভাবলেশহীন গলা বিশাখার।

— “বিশাখা, গত পরশু কাজরীর সঙ্গে আমার ব্রেক আপ হয়ে গেছে। ও ভীষণ স্বার্থপর একজন মানুষ আমি বুঝতে পেরেছি। বিদেশে গিয়ে দুদিনেই ও একদম বদলে গেছে আমূলে। ওর জীবনে আমায় আজ আর প্রয়োজন নেই। আসলে ও বোধহয় আমায় কোনোদিন ভালোইবাসেনি জানো! প্রেমটা আমার একতরফা ছিল। কিন্তু আর কোনো ভুল আমি করতে চাই না। ওর বিরহে কাতর হয়ে আমি হা হুতাশ করতে চাই না। ওর ফেলে যাওয়া জায়গাটা আমি তোমায় দিতে চাই বিশাখা। আমি তোমায় বিয়ে করতে চাই। তোমার সঙ্গে থাকতে চাই। ছোটবেলা থেকে তোমার যে ভালোবাসা আমার জন্য ছিল, তাকে মর্যাদা দিতে চাই” — মনের শব্দগুলোকে সাজিয়ে গুছিয়ে নিয়ে বলল অর্চি।

মাথা নীচু করে মিনিট দুয়েক চুপ করে রইল বিশাখা। তারপর আস্তে আস্তে মুখ তুলে অর্চির চোখে চোখ রাখল। ঠান্ডা গলায় কেটে কেটে বলল, “কিন্তু সেটা কী করে সম্ভব অর্চিদা? তুমি তো জানো আমি আমার এক সহকর্মীর সঙ্গে একটা সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েছি ইদানিং।”

— “উফফ! এসব মিথ্যা আমায় কেন শোনাচ্ছ তুমি? আমার কথা রাখতে সেদিন এই মিথ্যাটা তুমি সবাইকে বলেছিলে আমি জানি, কিন্তু আজ আর এর কোনো প্রয়োজন নেই। তুমি সবাইকে বলে দিও আসলে সেদিন আমার কথাতেই মিথ্যা বলেছিলে তুমি।”

— “না অর্চিদা, মিথ্যা নয়। এই মিথ্যাটাই যে আসলে সত্যি হয়ে যাবে সেটা আমিও ভাবিনি। আমাদের বিয়েটা ভাঙার দু-দিন পরেই আমার কলিগ মিস্টার তরুণ সাহা আমায় বিয়ের প্রস্তাব দেন। তরুণ আমাদের স্কুলেরই ফিজিক্সের টিচার। খুব ভালো মানুষ। আমরা ভালো বন্ধুও। তাই আমি আর ওঁকে ফিরিয়ে দিইনি। আসলে আমিও তো চাই ভালোবাসা পেতে।”

গলা কাঁপছে এবার অর্চির। এসব কী বলছে বিশাখা! দু-দিনের মধ্যে এসব কী হয়ে গেল?

— “এসব তুমি কী বলছ বিশাখা? এটা হতেই পারে না। আর এটাই যদি সত্যি হবে তাহলে কেন আমায় সেবা করে সুস্থ করে তুললে তুমি বলো?” — প্রায় গর্জে উঠল অর্চি।

— “অর্চিদা একসময়ে আমি তোমায় সত্যি ভালোবাসতাম। এখনও তোমায় বন্ধু মনে করি। আর অতীতের কিছু দায় তো বর্তমানের কাছে থেকেই যায়, সেইজন্যই সেদিন পাশে ছিলাম তোমার। আর সত্যি কথা কী জানো, সেদিন যদি তুমি ওভাবে আমায় অপমান আর প্রত্যাখান না করতে, হয়তো আমিও তরুণের ডাকে সাড়া দিতামই না। আটকে থাকতাম তোমার ভালোবাসার মিথ্যা মোহজালেই। তাই তোমার কাছে আমার কৃতজ্ঞতা অশেষ। যাইহোক আমি আজ চলি। তুমি ভালো থেকো। আশা করি, তুমি তোমার মনের মতো জীবনসঙ্গীর দেখা পাবে শিগগির।”

সাইডব্যাগটা কাঁধে ঝুলিয়ে ধীর পায়ে কফিশপ থেকে বেরিয়ে যাচ্ছে শ্যামলা রঙের সাধারণ মেয়েটা। একদৃষ্টে সেদিকে তাকিয়ে রইল অর্চি। চোখটা কেমন যেন ঝাপসা হয়ে আসছে ধীরে ধীরে। একসময় মেয়েটার অবয়ব ছোট হতে হতে হারিয়ে গেল ওর দৃষ্টিসীমার আড়ালে। তবুও স্থবির বসে আছে অর্চি। একটু আগে বিশাখার বলে যাওয়া কথাগুলো যেন কানে বাজছে এখনও। হঠাৎ কেমন যেন বেবাক ফাঁকা লাগছে সব। জীবনে প্রথমবার নিজেকে বড্ড বেশি হেরে যাওয়া লাগছে আজ অর্চির।

ভিড় বাসটায় কোনোরকমে ঠেলাঠেলি করে উঠল বিশাখা রোজকার মতোই। বসার জায়গা পেল না যথারীতি। বাসের রড ধরে ঝুলতে ঝুলতেই মনে আবার বেজে উঠল একটু আগেই অর্চির মুখ থেকে শুনে আসা কথাগুলো।

আজ নিজের ভালোবাসাকে ফিরিয়ে দিল বিশাখা। একটা মিথ্যা প্রেমের গল্প বলে আজ অর্চিদা’র থেকে নিজেকে চিরকালের মতো অনেক দূরে সরিয়ে নিল ও। কারণ সত্যি কথাটা যে ও কাউকে বোঝাতে পারবে না। বিশাখা যে একটা মেয়ে। সব মেয়েই চায় নিজের ভালোবাসার মানুষটার কাছ থেকে ভালোবাসাই পেতে। কিন্তু অর্চি যে বিশাখাকে কোনোদিন ভালোবাসেইনি। আজও বাসে না। ওর চোখে কোনোদিন নিজের জন্য প্রেম এক মুহূর্তের জন্যও খুঁজে পায়নি বিশাখা। এমনকি আজকেও না। অর্চির চোখে আজ ছিল অশেষ একটা কৃতজ্ঞতা। কিন্তু ভালোবাসায় যে কৃতজ্ঞতার কোনো জায়গা নেই। অর্চি আজও বোধহয় কাজরীকেই ভালোবাসে কিংবা কাজরীর মতো কোনো আধুনিকা মেয়ের স্বপ্ন দেখে আজও ও। কিন্তু ওই কাজরীর থেকে আসা হঠাৎ এই প্রত্যাখানটাই মেনে নিতে পারছে না ছেলেটা। সেইজন্যই তার জায়গায় বিশাখাকে জোর করে বসিয়ে নিজের মনের সুপ্ত প্রতিশোধ স্পৃহা করে চরিতার্থ করতে চাইছিল ও, সেটা বেশ বুঝেছে বিশাখা। কিন্তু এটা যে ও সত্যি পারবে না। নিজের ভালোবাসার মানুষের জন্য অনেক কিছুই করতে পারলেও নিজের আত্মসম্মান ও বিক্রি করতে পারবে না। কাজরীর বিকল্প হয়ে মিথ্যা মিথ্যা সংসার খেলায় নিজের জীবন উৎসর্গ করতে পারার মতো মনের জোর একেবারে নেই ওর। কিন্তু এসব কথা কাকে বলবে? কেই বা বুঝবে? নিজের মনের সবটুকু অনুভূতি যে সকলকে বোঝানো যায় না। কিছু ভাবনা, কিছু উপলব্ধি একান্ত নিজেরই হয়। আর সেই উপলব্ধি থেকেই আজ অর্চির থেকে দূরে যাবার সিদ্ধান্ত নিয়েছে ও। ভালোবাসা আর আত্মসম্মানের দ্বন্দ্বে বেছে নিয়েছে আত্মসম্মানকেই।

হঠাৎ ঘ্যাঁচম্যাচ করে ব্রেক কষল বাসটা। স্টপেজ আসতেই বেশ কিছু লোক নেমে গেল, আর বিশাখাও দৌড়ে গিয়ে বসে পড়ল একটা খালি সীটে। ক্লান্ত শরীরটা বড্ড বিশ্রাম চাইছে এবার। বাসের খোলা জানালার ফাঁক দিয়ে চোখ রাখল ও বাইরের পৃথিবীতে। বাইরে বৃষ্টি হচ্ছে ঝিরঝির আর বেশ হাওয়াও দিচ্ছে। কালবৈশাখী বোধহয়। এক মুঠো রঙিন হাওয়া হঠাৎ তারই মধ্যে ঝাপটা মারল ওর চোখে। একটা ছোট দোকান। রঙ বাহারি নানা পিচকারি আর আবিরের সমারোহ সেখানে।

— “ও হ্যাঁ, পরশু তো দোল!” — নিজের মনেই বলে উঠল বিশাখা। না, বসন্তের রঙ সবার জন্য সমান হয় না। কেউ কেউ ভালোবাসার লাল রঙ মেখে রঙিন হয়, আবার কেউ কেউ খুঁজে নেয় অন্য কোনো রঙ। যেমন আজ বিশাখা নিয়েছে। ও খুঁজে নিয়েছে আত্মসম্মানের রঙটা। ব্যাগের ভিতর থেকে ফোন বের করে কানে হেডফোন গুঁজল বিশাখা। চালু করল হালকা করে ওর পছন্দের গান। বাস চলছে ধীর লয়ে আর ওর কানে ছড়িয়ে পড়ছে ওর প্রিয় গানের সুর আর কলিরা। ফসিলস ব্যান্ডের সেই গানটা গেয়ে চলেছেন রূপম ইসলাম,

— “এ হৃদয় দপ্তর পালটাচ্ছে না… অবসর নেওয়া যাচ্ছে না… ফুটেছে হাসনুহানা…”

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%