পল্লবী সেনগুপ্ত
মোবাইলটা স্ক্রল করতে করতে আচমকাই ওটা দুম করে ছুঁড়ে খাটের উপর ফেলে দিল রিয়া। আলগোছে টেনে নিল পাশের টেবিলে রাখা ইংরেজি থ্রিলারের পেপারব্যাকটা। দু-মিনিট সেটার পাতা উলটে ওটাকেও ঠেলে দিল একটা কোণায়। মন বসছে না কিছুতেই।
হ্যাঁ, এই মনটাই তো যত নষ্টের মূল। একদম অবাধ্য আর বোকা এই মনটা। নাহলে সব কিছু জেনে বুঝেও কি আর এই মনটা ওই রাজেশের জন্য এত লাগামছাড়া হয়।
— “কিরে, কেমন হল আজ তোর রোমিওর জন্মদিন? তোর সব সারপ্রাইজগুলো দেখে নিশ্চয়ই পুরো ফিদা হয়ে গেছে?” — অফিস থেকে ফিরে ব্যাগটা খাটে ছুঁড়ে দিয়েই চোখ টিপে ভ্রূ নাচিয়ে প্রশ্নটা করল পায়েল।
— “কী আবার হবে? কিছুই হল না। রাজেশ আজ জাস্ট দশ মিনিটের জন্যই এসেছিল অফিসে, তারপর চলে গেল নিজের লোকদের সঙ্গে সময় কাটাবে বলে” — থমথমে মুখে জবাব দিল রিয়া।
পায়েল আর বেশি ঘাটাল না ওকে। ওর মুখে মেঘের ঘনঘটা দেখে পায়েল বুঝেই গেল যে হাওয়া খুব একটা সুবিধার নয়।
— “আমি আজ ডিনার করব না। ভালো নেই শরীর” — কিছুটা অস্থির ভাবেই বলল রিয়া।
— “ওকে” — বলে সোজা বাথরুমে ঢুকে গেল পায়েল।
ঘরের লাইটটা অফ করে দিয়ে অন্ধকারে ডুব দিতে চাইল রিয়া। নিজের মুখটা গুঁজে নিল বালিশে।
রিয়া কলকাতার মেয়ে নয়, দুর্গাপুরের মেয়ে। ওখানেই স্কুল, তারপর ওখানকার কলেজ থেকেই ইঞ্জিনিয়ারিং। কিন্তু ক্যাম্পাসিং থেকে কেন কে জানে কোনো চাকরি জুটল না আর রিয়ার। তাই কলকাতা শহরে এসে নিজের চেষ্টাতেই একটা সফটওয়্যার কোম্পানিতে মোটামুটি ভালো একটা চাকরি জোগাড় করেছিল ও।
কিন্তু রিয়ার ভাগ্যটা বোধহয় সত্যিই খুব খারাপ। তাই চাকরির বছর দেড়েক যেতে না যেতেই কোম্পানির ব্যবসায় কী সব সমস্যা দেখা দিল। বেশ নড়বড়ে হয়ে গেল কোম্পানির অর্থনৈতিক হাল। সেই অবস্থায় ম্যানেজমেন্ট ঠিক করল যে কিছু লোকজনকে ছাঁটাই করা হবে, আর খারাপ কপালের জন্যই বোধ হয় রিয়ার নামটাও ঢুকে গেল সেই ছাঁটাই হওয়া লোকদের দলে।
রিয়ার তখন পাগল পাগল অবস্থা। একে তো ওর ব্যাচমেটরা এমনিতেই সবাই মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানির ট্যাগ লাগিয়ে কলার উঁচু করে ওর সামনে, আর সেখানে রিয়া একটা সাধারণ কোম্পানির চাকুরে, তার ওপরে এই চাকরিটা খুইয়েও যদি ওকে দুর্গাপুরে ফিরে যেতে হয় তাহলে যে আর বেইজ্জতির কোনো সীমা থাকবে না সেটা সেদিন বেশ বুঝেছিল রিয়া।
তাই চাকরি চলে যাবার কথাটা সেদিন কাউকে বলেনি ও। এমনকি বাবা-মাকেও না। পাগলের মতো একটা চাকরি খুঁজছিল ও হন্যে হয়ে। কিন্তু চাকরির বাজার বড্ড খারাপ। ওর মতো কম এক্সপিরিয়েন্সের মেয়েকে কেউই নিতে চায় না। আর নিতে চাইলেও এত বাজে একটা স্যালারি অফার করে যেটা দিয়ে কলকাতার মতো বড় শহরে খাওয়া-দাওয়া থাকা চালিয়ে জীবন কাটানোটা সত্যি খুব দুরূহ হয়ে পড়ে।
প্রায় মাসখানেক এমন খোঁজাখুঁজির পর মোটামুটি একটা ভদ্র মাইনের চাকরি পেয়েছিল রিয়া। তবে কোম্পানিটা খুবই নতুন। একটা স্টার্ট আপ আই টি কোম্পানি। রাজেশ আগরয়াল নামে একজন কমবয়সি ছেলে খুলেছে কোম্পানিটা।
ছেলেটা নিজে পড়াশুনায় যথেষ্ট ভালো। যাদবপুর ইউনিভার্সিটি থেকে বি টেক পাস করা। কিন্তু চাকরি-বাকরি করার ধাতই নেই ছেলেটার। বড়লোক ব্যবসাদার বাপের ছেলে। তাই বড় বিজনেসম্যান হবারই স্বপ্ন দেখে সে। আপাতত কোম্পানিটা ছোটো। কিন্তু একদিন এই ছোট জাহাজই পক্ষীরাজ হয়ে উড়বে আকাশে এমনটাই স্বপ্ন রাজেশের। সেই কথাই ইন্টারভিউয়ের সময় রাজেশ বলেছিল রিয়াকে।
কেন কে জানে ইন্টারভিউয়ের সময়তেই রিয়ার খুব ভালো লেগেছিল ছেলেটাকে। অদ্ভুত একটা আত্মবিশ্বাস যেন খেলা করছিল মানুষটার দুই চোখে। জয়েন করার পর থেকে খুবই মন দিয়ে, যত্ন নিয়ে আর অধ্যবসায়ের সঙ্গে কাজ শুরু করেছিল রিয়া। নিজের সবটুকু নিষ্ঠা ঢেলে দিয়ে কাজ করত ও। বাঁধাধরা সময়ের পরোয়া করত না কোনোদিনই। কেন যেন মনে হতো এই ছোট জাহাজটাকে একটা বড় জাহাজ করার চ্যালেঞ্জটা ওকে উতরাতেই হবে।
রিয়ার নিষ্ঠা মুগ্ধ করছিল আস্তে আস্তে রাজেশকেও। তাই আস্তে আস্তে কাজের সম্পর্ক ছেড়ে একটু একটু করে বন্ধুত্বর গোলাপি গন্ধও স্পর্শ করছিল ওদের সম্পর্কটাকে।
— “রিয়া, ব্যস তুমহি হো জিসপে হাম আঁখ বন্ধ করকে ভি ভরসা কর সাকতে হ্যায়। কারণ হামি জানে এই কোম্পানিকে তুমহিও ভালোবাসে” — হিন্দি আর ভাঙা ভাঙা বাংলা মেশানো রাজেশের এই কমপ্লিমেন্টটা শুনে কেন যেন সেদিন খুশি হবার বদলে লজ্জা পেয়েছিল রিয়া।
আর সেদিনই রিয়া নিশিচত হয়ে গেছিল যে রাজেশের প্রতি ওর বেশ ভালোমতোই একটা দুর্বলতা তৈরি হয়েছে। আর এটা বুঝতে পারা মাত্রই বুকের মধ্যে কেমন যেন একটা দুরুদুরু ভাব টের পেয়েছিল রিয়া। এর আগে মাত্র একবারই প্রেম করেছিল ও স্কুলজীবনে, অয়নের সঙ্গে। কিন্তু অয়ন খুব খারাপভাবে ছেড়ে দিয়েছিল ওকে। ছেলেটা ছিল নিপাট চরিত্রহীন। তারপর আর কোনোদিন প্রেমের পথ মাড়ায়নি রিয়া। সত্যি বলতে কি ওর মনে আর কোনো অবাধ্য বসন্ত লাফিয়েও পড়েনি অয়নের পরে।
কিন্তু এই রাজেশ যেন সব হিসাব বদলে দেবার জন্যই এসেছে — এমনটাই সেদিন মনে হয়েছিল রিয়ার। দেখতে দেখতে দু-বছর প্রায় হতে চলল রিয়ার এই কোম্পানিতে। ছোট্ট জাহাজটা বড় হচ্ছে একটু একটু করে। সাত জনের কোম্পানিতে এখন প্রায় চল্লিশ জন লোক। রিয়া এখন এখানে একজন বেশ হোমরাচোমড়া মানুষ।
কিন্তু তাতে মোটেই একদম খুশি নয় রিয়া। আগে যখন কোম্পানি ছোট ছিল তখন রাজেশ বেশিরভাগ সময় অফিসেই থাকত। রিয়ার সঙ্গে কাজকর্ম নিয়ে আলাপ আলোচনা যেন আর ফুরাতই না ওর। কিন্তু যত বড় হচ্ছে কোম্পানি, তত যেন রাজেশ কেমন বদলে যাচ্ছে।
রিয়ার সম্মান প্রতিপত্তি এখন অনেক বাড়লেও রাজেশের সঙ্গে ওর সেই নৈকট্য এখন আর কোথায়? আজকাল সব ব্যাপারেই কেমন যেন ছাড়া ছাড়া থাকে রাজেশ। এর কারণ কি শুধুই কোম্পানির বড় হওয়া আর রাজেশের বেশি ব্যস্ত হওয়া? নাকি অন্য কিছু? রাজেশের জীবনে কি নতুন কেউ এসেছে? নাকি মাঝে একটু বেশি সাহসী হয়ে নিজের ফিলিংস রাজেশকে বোঝাতে চেয়েছিল রিয়া আর তাতেই বিরক্ত হয়ে গেছে ছেলেটা? আচ্ছা রাজেশ তার মানে রিয়াকে আদৌ পছন্দ করে না, তাই না?
কিন্তু রিয়ার চোখ আর মন কি এতটাও ভুল বুঝতে পারে? সবাই তো বলে মেয়েদের চোখ নাকি কখনও ভুল করে না এই সব ব্যাপারে?
গত বছর ঠিক এই দিনই তো ছিল সেটা… এখনও মনে আছে রিয়ার। না, ওদিন রিয়া জানত না যে ওটা রাজেশের জন্মদিন।
সারাদিন কাজের পর রাজেশ সেদিন জোর করে ওকে নিয়ে গেছিল ডিনার করাতে একটা বড় রেস্তোরাঁয়। যদিও রাজেশ একজন কট্টর ভেজিটেরিয়ান আর তাই খাবার টেবিলে সব নিরামিষ পদ দেখে হালকা নাক কুঁচকে গেছিল রিয়ার, তবুও একটা অপার ভালো লাগা ওর নন ভেজ প্রীতিকে নস্যাৎ করে দিয়েছিল সেদিন নিমেষে।
— “এ বাবা! আমি তো জানতামই না আজ তোমার জন্মদিন। আমি তো তোমার জন্য কোনো গিফটই আনিনি” — আক্ষেপ আর আহ্লাদ মেশানো একটু নেকু স্বরেই বলেছিল সেদিন রিয়া।
— “তুমি হামাকে এখনও চাইলে দিতে পারে গিফট” — ঠোঁটের ফাঁকে হালকা হাসি খেলিয়ে বলেছিল সেদিন রাজেশ।
— “ওমা! সে কী করে হয়?”
— “হামার মাম্মি তো বাঙালি আছে। তাই হামি অনেক টেগোরের নভেলের গল্প শুনেছি। আর ইউনিভার্সিটিতে পড়ার সময়ও আমি অনেক ফ্রেন্ডদের কাছে অনেক টেগোরের পোয়েট্রি শুনেছি। সংগসও শুনেছি। অ্যান্ড আই লাইক টেগোরস ক্রিয়েশন ম্যাডলি। কিন্তু কী জানো তো হামাদের ফ্যামিলিতে এসব অত কেউ লাইক করে না। আর এখন কাজের এত প্রেশার যে আমারও আর অত এসব শোনা হয় না। স্টিল আই ট্রাই। টাইম পেলেই আমি শুনার ট্রাই করি। সো, তুমি যদি আজ আমায় একটা টেগোরের গান শুনাও দেন আই উইল বি হ্যাপি মোর দ্যান এনিথিং।”
— “এখন? মানে এখানে?” — রিয়া একটু চমকালেও সেদিন ফেলতে পারেনি ও রাজেশের অনুরোধ। একটু চাপা গলায় হলেও গেয়েই ফেলেছিল গোটা একটা রবীন্দ্রসঙ্গীত।
‘আমারও পরাণ যাহা চায়, তুমি তাই… তুমি তাই-ই গো।’
গানটা যে রিয়া ভালোই গায় সেটা ছেলেবেলা থেকেই বহুজনের মুখেই নানা সময়ে শুনেছে ও। কিন্তু সেদিন রাজেশের চোখে গানের সময় যে মুগ্ধতা ও দেখতে পেয়েছিল তাতে ওর পক্ষে নিজেকে লতা মঙ্গেশকর ভেবে ফেলাও খুব আশ্চর্য ছিল না। রাজেশের চোখের সেই ঝরে পড়া মুগ্ধতা সেদিন পাগল করে দিয়েছিল রিয়াকে। আর ও বুঝতে পেরেছিল যে সেদিন রাজেশ ওর মনের সবটুকু ফাইনালি চুরি করে নিল।
তারপর থেকে এমন একটা মুহূর্ত রিয়া খুঁজে পায়নি যখন ওর মনে রাজেশের আনাগোনা হয়নি।
কিন্তু যত রিয়ার মন রাজেশের জন্য পাগল হয়েছে, রাজেশও যেন একটু একটু করে দূরে হতে থেকেছে।
নিজের মনের বেহাল অবস্থার কথা রিয়া শুধু নিজের লেডিজ হোস্টেলের রুমমেট পায়েলকে বলেছিল। পায়েলই বলেছিল ওকে নিজের মনের ফিলিংস রাজেশকে বোঝানোর জন্য মাঝে মাঝে ওকে হিন্ট দিতে। রাজেশের যে কোনো প্রেমিকা নেই সেটা তো জানতই রিয়া। তাই পায়েলের আইডিয়াটা সেদিন ঠিকঠাকই লেগেছিল ওর।
কিন্তু রাজেশ কেন এমন করছে আজকাল? কেন জেনে বুঝে রিয়াকে এভয়েড করছে ও? তবে কি রিয়াকে ফালতু মেয়ে ভাবছে? ও কি বুঝতে পারছে না ওর এই এড়িয়ে চলাটা কতখানি কষ্ট দিচ্ছে রিয়াকে? আজকাল তো কাজেও মন বসাতে পারছে না ও।
আজকের দিনটায় একটা শেষ চেষ্টা করবে বলে ভেবেছিল রিয়া। রাজেশকে সারপ্রাইজ দেবে বলে আজকের এই জন্মদিনে কত রকম ব্যবস্থা করেছিল ও অফিসে। অফিস সাজানো, বাহারি কেক, নানা রকম কাস্টমাইজ গিফট। কিন্তু কী হল? সারাদিন অফিসে এলই না আজ রাজেশ। সন্ধ্যার পর একবার এল দশ মিনিটের জন্য। সবাইকে হাই হ্যালো করে কোনোমতে কেক কেটে চলে গেল ও। একরাশ ভালোবাসা দিয়ে সাজানো দিনটাকে কোনো পাত্তাই যেন দিল না ও। কচিকলাপাতা শাড়িতে সাজা রিয়ার দিকে ভুল করেও তাকাল না একবার।
চোখ ফেটে জল আসছিল আজ রিয়ার অফিসের মধ্যেই। না, রাজেশ ওকে শুধুই একজন অফিস স্টাফ ভাবে। তাহলে আগে কেন এত রিয়া রিয়া করত সব সময়? কেন এত বাড়তি সময় কাটাত? কেন নিজের চোখের ভাষায় ফুটিয়ে তুলত অন্য আবেদন?
সেগুলো কি সবই রিয়াকে বোকা বানিয়ে ওকে দিয়ে আরও বেশি কাজ করানোর জন্য? নাকি সব ছেলেই এমন হয়, ঠিক অয়নের মতো? নাকি রাজেশ আসলে বড়লোকের একটা এমন ছেলে যে মেয়েদের শুধুই খেলনা বলে ভাবে? না, আর রাজেশকে নিয়ে ভাববে না রিয়া। এই চাকরিও ছেড়ে দেবে ও। অন্য একটা চাকরি খুঁজে নিয়ে চিরকালের মতো ও চলে যাবে রাজেশের দৃষ্টিসীমার বাইরে।
বিছানায় শুয়ে ছটফট করছিল রাজেশ। আজ প্রথমবার শেলির সঙ্গে ডেটে গেছিল ও। ডেট মানে বাড়ি থেকে জোর করে অ্যারেঞ্জ করে দেওয়া ডেট।
শেলি বড় বিজনেসম্যানের মেয়ে, তার ওপরে পাপাজির ভালো বন্ধুর মেয়ে। তাই বাড়ির সকলে একপ্রকার জোর করেই বিয়েটা ফাইনাল করে ফেলেছে রাজেশের সঙ্গে ওর।
প্রথমে সবাই যখন জিজ্ঞাসা করেছিল রাজেশকে ওর এই বিয়েতে মত আছে কিনা তখন কেন যেন ঝট করে ওর মুখের সামনে ভেসে উঠেছিল একটা মুখ। আর সঙ্গে সঙ্গেই মনের ভেতর থেকে কে যেন বলে উঠেছিল, “নেহি রাজেশ, হাঁ মাত কর” — মনের কথা শুনে রাজেশ একটু কিন্তু কিন্তু ভাব দেখিয়েওছিল কিন্তু পাপাজি আর চাচাজি গর্জে উঠেছিল স্বভাবসিদ্ধ চালেই।
— “পাগল হ্যায় তু? পাতা ভি হ্যায় তুঝকো কিতনা আমির হ্যায় উসকা বাপ? এক লতি বেটি হ্যায় উও বাপ কি। সব কুছ তুঝে হি মিলেগা সমঝতা হ্যায় তু?”
ওদের যুক্তির সামনে সেদিন আর দাঁড়াতে পারেনি রাজেশের আবেগ। না, প্রেম ট্রেম কোনোদিনই তেমন হয়নি ওর। আর যে টুকটাক ইনফ্যাচুয়েশন হয়েছিল সেগুলোও বলার মতো কিছু নয়। কিন্তু এই রিয়া মেয়েটা যেন একদম বেহিসেবি করে দিতেই এসেছে রাজেশের হিসেবি মনটাকে।
শুরু থেকেই বড্ড অন্যরকম ছিল মেয়েটা। কাজের প্রতি দারুণ নিষ্ঠা আর ওর সততা বরাবরই ভীষণ আকৃষ্ট করত রাজেশকে। আর তার ওপর অমন গানের গলা! কটা মেয়েরই বা থাকে?
না, হিসেবি মনটা নিয়ম ভেঙে ওই বাঙালি মেয়েটার জন্য একটা আলাদা জায়গা তৈরি করেই দিয়েছিল রাজেশের মনে। আর তাছাড়া মাম্মি বাঙালি ছিল বলেই বোধহয় রাজেশের বরাবরই মনে আলাদা একটা ভালো লাগা ছিল ওই বাঙালিদের প্রতি।
কিন্তু বাঙালিকে বিয়ে করা নিয়ে আসার পরিণাম যে কী হতে পারে সেটা তো রাজেশ নিজে চোখেই দেখেছে। মৃত্যুর আগে পর্যন্তও এ বাড়ির কেউ ভালোভাবে মেনে নেয়নি ওর মাম্মিকে। মাম্মিকে কেউ কিচেনে যেতেও দিত না। তাকে তার বাপের বাড়ির সঙ্গেই যোগাযোগ করতে দেওয়া হতো না। আর মাম্মিও কেন কে জানে মেনে নিত এই বাড়ির সকলের লাল চোখ। হয়তো ছেলের কথা ভেবেই। হয়তো ওরা মাম্মিকে বলেছিল ওদের কথা না শুনলে রাজেশকে ওরা দূরে করে দেবে মাম্মির থেকে।
রাজেশের মনে পড়ে কত রাত ও দেখেছে মাম্মির চোখে জল। ওর মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে চুপচাপ চোখের জল ফেলত মাম্মি সবার থেকে লুকিয়ে। আর রাজেশও বিছানায় পড়ে থাকত তখন কাঠ হয়ে। কোনোদিন জিজ্ঞাসা করত না মাম্মিকে, যে কেন কাঁদছে সে? আসলে রাজেশ তো বুঝত। ও তো অনুভব করত মাম্মির কষ্টটা। আর এই কষ্ট গুমরে গুমরেই তো কেমনভাবে অকালে চলে গেল মানুষটা।
তাই রিয়ার প্রতি নিজের ভালোলাগাটা বুঝতে পারার সঙ্গে সঙ্গেই নিজেকে শক্ত করে নিয়েছে রাজেশ। আজকাল রাজেশ জেনে বুঝেই এড়িয়ে চলে ওকে। কিন্তু তাতে কী আর? ও মেয়েও যে রাজেশকে নিজের মন দিয়ে বসে আছে, সেটা তো রাজেশ প্রতি মুহূর্তেই বুঝতে পারে। আর রিয়া নিজে থেকেই তো বোঝাতে চায় সেটা।
কিন্তু না। রিয়ার কোনো জায়গা রাজেশের জীবনে নেই। থাকতেই পারে না। ওই বাঙালি নন ভেজিটেরিয়ান মেয়েকে কেউ মেনে নেবে না এই বাড়িতে। আর রাজেশের বাবা যে ভুল করেছিলেন সে ভুল আর কেউ করতেই দেবে না ওকে। তাছাড়া ও-ই বা কেন করবে এমন কাজ যাতে সবাই ওর বিরুদ্ধে হয়ে যায়? বাড়ির সকলের টাকাতেই তো শুরু করেছিল রাজেশ ব্যবসা। তাই সবার প্রতি ওরও তো দায়বদ্ধতা আছে। তাছাড়া শেলি সত্যি অনেক ভালো অপশন। ওর বাবার টাকা রাজেশের ব্যবসায় যোগ হলে আর পিছন ফিরে তাকাতে হবে না ওকে।
— “বেটা…” হঠাৎ মাথায় একটা আলতো হাতের স্পর্শে চমকে উঠল রাজেশ।
কখন যেন মা এসে চুপি চুপি বসেছে ওর মাথার কাছে।
— “বেটা কেন এমন করছিস রে? যাকে মন দিয়েছিস তাকে দূরে সরিয়ে রেখে অন্য মেয়েকে কেন শাদি করছিস? ওকে কি ভালোবাসতে পারবি? নাকি ওই শেলি তোকে ভালোবাসতে পারবে রিয়ার মতো করে?”
ছেলের মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে কথাগুলো বলছেন মা।
— “মাম্মি তুমহি তো জানো এই ঘরে কেউ মেনে নেবে না রিয়াকে। আর হামিও চাই না ঘরের সবাইকে দুখ দিতে। হামিও চাই হামার বিজনেস অনেক বড় হোক। আর শেলির পাপার টাকা হামার বিজনেসে এলে হামার বিজনেস অনেক উঁচা যাবে।”
— “জিন্দেগী বিজনেস এর থেকেও অনেক বড় হয় রে বেটা। আর প্যায়ার টাকার থেকে অনেক বড় হয়। শেলির বাপের টাকা ওকে শাদি করলে তুই পাবি, কিন্তু প্যায়ার? রিয়া তোকে যে প্যায়ার দিতে পারবে সেটা কি ওই শেলি পারবে? তুই কি পারবি শেলিকে নিজের দিল দিতে? দেখিস বেটা বিজনেস উঁচা করতে গিয়ে যেন জিন্দেগী নিচা না হয়ে যায়। প্যায়ার এর থেকে বেশি দামি কিছু হয় না রে বেটা। কোনো বিজনেস, কোনো টাকা প্যায়ার কিনতে পারে না।”
— “কিন্তু মাম্মি… মাম্মি… শোন মাম্মি…” ধড়মড় করে বিছানায় উঠে বসল রাজেশ। এ কী স্বপ্ন দেখল ও? এসব কী বলছিল মাম্মি? তবে কি মাম্মিও চায় যে রাজেশ রিয়াকেই…
না না না। নিজের মনকে কষে ধমকাল রাজেশ। রিয়াকে নিয়ে আর কোনো ভাবনা নয়। এখন থেকে শেলিকে নিয়েই ভাববে ও। জোর করে হলেও শেলিকেই ভালোবাসার চেষ্টা করতে হবে। করতেই হবে।
ফোন বাজার শব্দটা বাথরুম থেকেই পেয়েছিল রিয়া। এবার বেরিয়ে এসে দেখল দুটো মিসড কল। রাজেশের নম্বর থেকে। জলদি হাতে রিডায়াল করল রাজেশের নম্বরে।
— “হ্যালো রিয়া… তুম আই নেহি আজ… ক্যায়া হুয়া? একটু পরে আসছে তো?” — বেশ চিন্তিত রাজেশের স্বর।
— “নেহি। আজ নেহি আয়ুঙ্গি। তাবিয়ত ঠিক নেহি হ্যায়” — একটু গম্ভীর চালেই জবাব দিল রিয়া।
— “বাট রিয়া আজ হামারা এক বহত বড়া ক্লায়েন্ট আনেওয়ালা হ্যায় এন্ড ইউ নো দ্যাট। ফির ভি তুম ক্যায়সে…”
— “আমি ছুটি মোটেই খুব বেশি নিই না। তাই একদিন প্রয়োজন তো হতেই পারে” — এবার বেশ কঠিন হল রিয়ার স্বর।
ওদিক থেকে ফোন কেটে গেল এবার। আসলে রিয়ার আজ শরীরটা একটু ম্যাজম্যাজ করছিল। তাই অফিস ডুব মেরেছে ও। অবশ্য দু-মাস আগের রিয়া হলেও এই সামান্য কারণে অফিস ডুব মারার কথা ও ভাবতেই পারত না, তাও আবার এমন একটা জরুরি দিনে।
আসলে আজকের রিয়া আর সেই দু-মাস আগের রিয়ার মধ্যে পার্থক্য অনেক। অফিসে সবাই সেটা ভালোই বোঝে। নিশ্চয় রাজেশও বোঝে।
এখন রিয়া যতটা প্রয়োজন ঠিক ততটাই অফিসে থাকে। মাঝে মাঝেই অফিস থেকে আগে বেরিয়ে পড়ে জরুরি কাজের দোহাই দিয়ে। আর এমন দিনগুলোতে সবাই ফিসফাস করে রিয়াকে নিয়ে। ওরা বলাবলি করে যে নিশ্চয় রিয়া প্রেম করতে যাচ্ছে নিখিল রায়ের সঙ্গে।
আসলে নিখিল রায়ের কথাটা রিয়া শোভনাকে বলেছিল নিজে থেকেই একদিন। শোভনা মেয়েটা বেশ ভালো। রিয়ারই বয়সি। তাই ওকে কেন যেন বলে ফেলেছিল রিয়া। আর তারপর থেকেই অনেকেই বোধহয় জেনে গেছে ব্যাপারটা। তাছাড়া নিখিল যা বাড়াবাড়ি করে , তাতে সবাই জানবে নাই বা কেন। রিয়ার সব ছবিতে লাইক। সব ছবিতে সব মাখোমাখো প্রেমের কমেন্ট।
অফিসের অনেকেই রিয়াকে বলে, “প্লিজ একবার দেখাও তোমার উড বি কে” — কিন্তু রিয়া পারছে না। আসলে নিখিলের পারমিশান নেই যে। কেন যে ছেলেটা এভাবে নিজেকে লুকিয়ে রাখতে পছন্দ করে কে জানে! নিজের ফেসবুক প্রোফাইলেও তাই ঝুলিয়ে রেখেছে— স্পাইডার ম্যানের ছবি। কিছুতে সে নিজের ছবি দেবে না।
অতি কষ্টে ওকে বুঝিয়ে রিয়া নিজের ফেসবুকে ওদের দুজনের একটা ছবি আপলোড করেছিল। তাও সেখানে মুখ দেখা যাচ্ছে না নিখিলের। ব্যাক সাইড থেকে ছবিটা তোলা। শুধু দেখা যাচ্ছে নিখিলের নীল ব্লেজার আর কালো জিন্স। পিছন থেকে দুজন দুজনকে জড়িয়ে আছে ফোটোটায়।
আসলে নিখিল রিয়ার পাড়ার ছেলে। দুর্গাপুরেরই। বেশ কিছুদিন ইউ এস এ-তে ছিল ছেলেটা। ইদানিং ফিরেছে। ছোটবেলায় খুব ভালো বন্ধু ছিল ওরা। এখন যখন বাবা-মা চাইছেন তাই রিয়া আর নিখিলের সঙ্গে বিয়েতে আপত্তি করেনি। এখন মুম্বাইতে থাকে নিখিল। মাঝে মাঝে কলকাতায় আসে। তবে খুব কেয়ারিং। সব সময় খেয়াল রাখে রিয়ার। সারাক্ষণ ফোন করে ওর খবর নেয়। অফিসে তো সবাই ফিসফাস করে রিয়ার সারাক্ষণ আজকাল ফোনে গুজুর গুজুর নিয়ে। রাজেশও জানে নিশ্চয়ই। জানুক গে। রিয়া এখন শুধু নিখিলের ব্যাপারটাতেই মন দিতে চায়। হয়তো এই নিখিলই একমাত্র ঠিক করে দিতে পারে রিয়ার জীবনের কেটে যাওয়া তালটা।
কফিশপে বসে অস্থির অস্থির লাগছে রাজেশের। রিয়া আসবে তো? কেন আসছে না তাহলে?
বিগত কয়েক মাস ধরে নিজের সঙ্গে যুদ্ধ করতে করতে আজ ভীষণ ক্লান্ত রাজেশ। নিজের ব্যবসার উন্নতির কথা ভেবে, বৈষয়িক দিক থেকে লাভবান হতে চেয়ে আর বাড়ির সকলের কথায় কি ভীষণ ভুল করে ফেলেছে ও আজ তা হাড়ে হাড়ে বুঝছে রাজেশ।
শেলির সঙ্গে বিয়ের কথা শুরু হবার পর থেকেই নিজের সব আবেগকে শক্ত শেকলে বেঁধে ফেলেছিল রাজেশ। সচেতনভাবেই নিজেকে ভীষণ দূরে করে নিয়েছিল রিয়ার থেকে। চেষ্টা করছিল আস্তে আস্তে শেলির কাছাকাছি পৌঁছবার। কিন্তু সেটা যে হবার নয় সেটাও বুঝতে পারছিল ছেলেটা। শেলির মধ্যে বারবার যেন রিয়াকেই খুঁজতে চেষ্টা করে ও। কিন্তু তা কী করে হয়? রিয়া তো রিয়াই। শেলি কী করে রিয়া হবে? রিয়ার চোখে যে ভালোবাসার ঝিলিক রাজেশ দেখতে পেত নিজের জন্য, তার ছিটেফোঁটাও তো রাজেশ হাজার চেষ্টা করেও দেখতে পায়নি শেলির চোখে। শেলি তো যেন নিয়মমাফিকই করছে বিয়েটা। অন্তরের কোনো টান নেই সেখানে। কিন্তু তবুও নিজের বুকে পাথর চেপে সবটা মেনে নিয়ে, সব কষ্ট সয়েই এগোচ্ছিল রাজেশ।
কিন্তু গত দু-মাসে সবটা এলোমেলো হয়ে গেল। হ্যাঁ, রাজেশও শুনেছে নিখিল রায়ের কথা। রিয়ার জীবনের নতুন মানুষ। রিয়ার প্রেমে পাগল সে, আর কতটা যে সে দিওয়ানা মেয়েটার জন্য সে তো রিয়ার ফেসবুকে ওর ছবিগুলোতে ছেলেটার কমেন্টগুলো দেখলেই বোঝা যায়। আচ্ছা রিয়াও কি ভালোবাসে ওকে? নাকি বাড়ির কথায় করছে এই বিয়ে? রিয়ার চোখে তো রাজেশ নিজের জন্য দেখেছিল ভালোবাসার ছবি, তাহলে সে ছবি এত তাড়াতাড়ি বদলে গিয়ে অন্য কারোর হয়ে গেল কী করে? অবশ্য বদল তো সময়ের ধর্ম। রিয়া তো নিজেই আমূলে বদলে গেছে এই দু-মাসে।
রিয়ার বদল আর ওর জীবনে নিখিল রায়ের আনাগোনা তিলে তিলে দগ্ধে মারছিল রাজেশকে। তবুও কোনোমতে মুখ বুজে ছিল রাজেশ। কিন্তু গতকাল যেটা হল সেটা ওর সব সহ্যের সীমা পার করে দিয়েছে। কাল চাকরিতে রেজিগনেশান দিয়েছে রিয়া।
তার মানে… তার মানে রিয়া চিরতরে দূরে চলে যাবে এবার। আর রাজেশ কোনোদিন দেখতেও পাবে না ওকে। না, এটা তো কল্পনাই করতে পারছে না রাজেশ। এই কঠিন পরিস্থিতিটাই রাজেশকে বোধহয় চূড়ান্ত ডেসপারেট করে তুলেছে। হ্যাঁ, রাজেশ ঠিক করে নিয়েছে এবার। জীবন একটাই। শুধু ব্যবসা আর বাড়ির লোকদের বাধ্য ছেলে হয়ে থাকার জন্য ও নষ্ট করতে পারবে না সেই জীবনটা। এই জীবনে নিজের জীবনসাথী ও তাকেই বানাবে যাকে ও ভালোবাসে, যে ওকে ভালোবাসে।
রিয়াকেই পাশে চাই ওর জীবনে চলার পথে। বাড়ির সবাই মেনে নিলে ভালো, আর না মেনে নিলে রিয়ার হাত ধরে ওই রক্ষণশীল গোঁড়া মানুষগুলোর দুনিয়ে ছেড়ে ভালোবাসার অন্য পৃথিবী বানিয়ে নেবে ওরা দুজনেই।
আজ সকালে শেলিকে ইমেল করেছে রাজেশ। ও স্পষ্ট জানিয়েছে যে শেলিকে বিয়ে করতে পারবে না ও। নিজের ব্যবসার স্বার্থে শেলির বাবার টাকা আজ আর একটুও চাই না রাজেশের। আজ ওর চাই শুধু একমুঠো রঙিন ভালোবাসা যেটা ওর রোজকার জীবনটাকেও স্বপ্নের মতো করে তুলবে।
“আমায় এভাবে কফি শপে কেন ডেকেছ?” — কখন যে রিয়া এসে পড়েছে রাজেশ খেয়ালই করেনি।
কালো জিন্স আর গোলাপি টপে আজ অসাধারণ লাগছে রিয়াকে। রাজেশ চোখ ফেরাতে পারল না কয়েক মুহূর্ত। তারপর ঠিক ভেবে উঠতে পারল না কী বলবে। দু-এক মিনিট চুপ থেকে কেটে কেটে বাংলায় বলল, “যেয়ো না রিয়া, প্লিজ যেয়ো না।”
— “মানে?” — ভ্রূটা কয়েক ইঞ্চি উঠে গেল এবার রিয়ার।
নিজেকে লুকিয়ে রেখে আর ভণিতা করতে পারল না এবার রাজেশ। ওর আবেগের বাষ্প যে ক্রমেই ঠেলা মারছে বুকের ভেতর, জল হয়ে বেরিয়ে আসতে চাইছে দু-চোখ বেয়ে।
— “রিয়া, আই লাভ ইউ। হামি তুমাকে এতদিন বলতে পারিনি ফর সাম রিজনস। কিন্তু হামি তুমাকে খুব ভালোবাসে। হামি জানি নিখিল রায় আছে তুমার জীবনে। কিন্তু তুমি কি পারো না…”
— “নিখিলকে আমি ভালোবাসি না, বাট হি ইজ মাই ফিঁয়াসে। তুমি মনের কথা বলতে অনেক দেরি করে ফেললে রাজেশ।”
— “হামি জানি। কিন্তু… কিন্তু…” গলা বুজে আসছে এবার রাজেশের।
এবার ছেলেটার হাত চেপে ধরল রিয়া। ওরও যে বুক ভাঙছে রাজেশের চোখে জল দেখে।
— “রাজেশ আমি আজই কথা বলব নিখিলের সঙ্গে। আমি চেষ্টা করব তোমার কাছে ফিরে আসার, আমাদের ভালোবাসাকে বাঁচিয়ে রাখার।”
*************
অফিস থেকে ফিরে পায়েল দেখল রিয়া আজ বেশ খোশমেজাজে। গুনগুন করে গান গাইছে।
— “কিরে কী ব্যাপার? এত স্ফূর্তি যে? কী খবর? নিখিল আসছে বুঝি?” — হালকা চালেই বলল পায়েল।
— “নারে। নিখিল আর আসবে না। কারণ ও মারা গেছে। আই মিন আমি ওকে মেরে ফেলেছি।”
ধপ করে ব্যাগটা পড়ে গেল পায়েলের হাত থেকে। কী বলছে মেয়েটা? পাগল হয়ে গেল নাকি?
— “কী বলছিস তুই? মানে?” — গলা কাঁপছে পায়েলের।
— “মানে রাজেশ আমায় আজ প্রপোজ করেছে। তাই আর নিখিলের প্রয়োজন নেই। সেইজন্য ওকে তো মরতেই হত” — চিকলেট চিবাতে চিবাতে বলল রিয়া।
পায়েল তখনও নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারছে না। ওর ভেবলে যাওয়া মুখ দেখে বেদম হেসে উঠল রিয়া। হাসতে হাসতেই বলল, “আরে নিখিল রায়ের কোনো রিয়েল অস্তিত্ব নেই রে, কোনোদিন ছিলও না। আমিই ওর ভারচুয়াল অস্তিত্ব তৈরি করেছিলাম ফেসবুক অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে। আসলে যখন দেখলাম গামবাট রাজেশটাকে কিছুতেই বাগে আনা যাচ্ছে না তখনই আইডিয়াটা এল মাথায়। নিখিল রায়ের নকল ফেসবুক আর আর একটা নকল গল্প বানালাম। বেশ করে গল্পটা খাওয়ালাম অফিসের শোভনাকে, যাতে ও ব্যাপারটা প্রচার করে বাকিদের মাঝে আর রাজেশ বাবুও পায় খবরটা।
আমার ছোটবেলার বন্ধু নিকিতা। মেয়েটা পুরো টম বয় টাইপ। ছেলেদের মত করে ছাঁটা চুল আর তেমনই পোশাক পরিচ্ছদ। মুম্বাইতেই থাকে। মাঝে কলকাতায় এসেছিল। ওর সঙ্গেই কায়দা করে একটা এমন ছবি তুললাম যেটাকে আমার আর নিখিলের ডুয়েট পিক বলে চালানো যায়। ওকে বলেছিলাম সবটা। তাই ও হেল্প করছিল আমায়। মাঝে মাঝে ও ফোন করত অফিসে থাকাকালীন, যাতে সবাই ভাবে নিখিল রায় কল করছে আমাকে।”
এবার একটু থামল রিয়া। তারপর ফের বলল, “এটাই আমার শেষ দান ছিল রে খেলার। তাই এত কিছুর পরেও যখন দেখলাম ও কিছুই বদলাচ্ছে না তখন মনে হল তাহলে বোধহয় সবটাই বোঝার ভুল ছিল আমার। ও কোনোদিনই ভালোবাসেনি আমায়। দু-মাস ধরে এই নকল নিখিল রায়ের খেলা খেলতে খেলতে খুব ক্লান্ত লাগছিল। তাই ভাবলাম যখন ও আমায় ভালোবাসেনা বুঝেই গেছি, তখন আর এ মিথ্যা খেলার কী বা দরকার আছে। তাই কাল সব নাটক শেষ করার জন্যই চাকরির রেজিগনেশান দিয়েছিলাম। কিন্তু তাতেই যে একেবারে এভাবে সব বদলে যাবে সত্যি ভাবিনি।”
— “এবার কী বলবি ওকে নিখিল রায়ের ব্যাপারে।”
— “নিখিল রায়ের নকল ফেসবুক প্রোফাইল ডিলিট করে দিয়েছি। এবার ওকে বলব সে আমায় নিজের ভালোবাসার ডাকে সাড়া দেবার অনুমতি দিয়ে আবার ইউ এস এ-তেই বিদায় নিয়েছে। ওই কুছ কুছ হোতা হ্যায় টাইপ স্টোরি আর কি!” — এবার চোখ মটকে হাসছে রিয়া হিহি।
— “উফফ! তুমি পারোও বটে গুরু…”— রিয়ার মাথায় ছোট্ট একটা গাঁট্টা মেরে ওয়াশরুমে উঠে গেল পায়েল।
— “হ্যাঁ পারি। নিজের ভালোবাসাকে কাছে পাবার জন্য সব করতে পারি। শুধু আমি কেন, পৃথিবী শুদ্ধ সবাই পারে নিজের ভালোবাসার মানুষটার জন্য লড়ে নিতে। একমুঠো ভালোবাসার দাম যে অনেক প্রেমিক মানুষদের কাছে” — নিজের মনেই বলে জোরে জোরে হেসে উঠল রিয়া আর ভালোবাসার সুগন্ধে ভরে উঠল লেডিজ হোস্টেলের ছোট্ট ফালি ঘরটা।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন