লুকিয়ে থাকা রূপকথারা

পল্লবী সেনগুপ্ত

হাত থেকে পড়ে কাপটা ভেঙ্গে গেল ঝনঝন শব্দে আর তার সঙ্গে বিচ্ছিরি একটা হুংকার দিয়ে উঠল পিয়ালি।

— “উফফফ! অসহ্য। যাক যাক, সব ভেঙ্গেচুরে যাক। আমিও মরি আর সব ধ্বংস হোক।”

পিয়ালির চিৎকারে ওঘর থেকে ছুটে এল অভি। এসে দেখল পিয়ালি কাঁচের টুকরোগুলো তুলছে আর কীসব গালিগালাজ করে যাচ্ছে মানদাকে। দৃশ্যটা দেখে রাগে গা জ্বলে গেল অভির। এই মেয়েটার কি কোনো আক্কেল নেই? বলবে না বলবে না করেও বলেই ফেলল, “এখন এগুলো কি না করলেই নয়? সন্ধ্যাবেলা ফিরে এসেও তো করা যায় এসব হাবিজাবি কাজগুলো। ঘড়ির দিকে একবার দেখেছ?”

— “হ্যাঁ সেই। আমার তো খুব আনন্দ হচ্ছে। অফিস তো আর আমায় যেতে হবে না! ঝিগিরি করে অফিস যেতে তো দারুণ মজা লাগে আমার” — খেঁকিয়ে উঠল পিয়ালি। অভির মাথাটা ঝাঁ করে জ্বলে গেল এবার। সবসময় শুধু চিৎকার আর সব কথার শুধু টেরা ব্যাঁকা উত্তর।

— “দামি কাপটা একে তো অসাবধানতায় ভাঙলে, তার উপর আবার খোঁচা দিয়ে কথা বলছ! মানদা যখন কাজে এত ঘন ঘন কামাই করছে, তখন ছাড়িয়ে দাও ওকে। কে মাথার দিব্যি দিয়েছে তোমায় ওকে রাখার জন্য? আর কে বলেছে তোমায় সব ঝিয়ের কাজ সেরে যেতে? আমি তো সাহায্য করতে চাইলাম তোমায়, তখন না করলে কেন?” — এক নিঃশ্বাসে প্রায় কথাগুলো বলে গেল অভি।

— “হ্যাঁ, হ্যাঁ, সব দোষ তো আমার। অমানুষ কোথাকারের! কোনো মানবিকতা আছে তোমার? এক ফোঁটাও ভালোবেসেছ কোনোদিন আমায়? যদি বাসতে তাহলে এভাবে বলতে পারতে না। তুমি খুব ভালোভাবেই জানো, আমার অফিস কেমন! সাড়ে দশটার এক চুল বেশি দেরি হলেই ‘লেট কামিং’ হয়ে মাইনে কাটা যায়। কিন্তু আমি সেসব জেনেও সংসারের কাজগুলো, কামাই করা ঝিয়ের কাজগুলো সব একা হাতে সারছি। আমার দেরি দেখে বস ঝাড়বে এটা জেনেও আমি তোমায় কাজে হাত লাগাতে দিই না, তারপরেও তুমি আমাকে, আমাকে অভিযোগ করছ! এত নিষ্ঠুর তুমি? মাত্র দেড় বছরেই তোমার কাছে আমি এত পুরানো হয়ে গেলাম! নন্দন আর কফি হাউসে বসে বলা প্রেমের কথাগুলো যে সব ভণিতা ছিল সেটার আর কোনো সন্দেহই রইল না বলো!”

উফফ! অসহ্য লাগার পরিমাণটা আরও বেড়ে গেল অভির। এই ঘ্যানঘ্যানে, বিরক্তিকর আর অবুঝ মেয়েটাকে কী করে অভি কলেজ জীবনে ভালোবেসেছিল কে জানে! অভির বলতে ইচ্ছা করল যে ভালোবাসার মানে আদৌ জানো তুমি? শুধু নিজের টুকু ছাড়া কিছু বোঝো? প্রতিদিন পিয়ালির ড্রাইভারের মতো ওকে অফিস ছেড়ে দিয়ে আবার অন্য রুটে নিজের অফিস পৌঁছতে যে কী ভীষণ হ্যাপা হয় অভির সেটা বোঝার কোনো ক্ষমতা পিয়ালির নেই। আজকাল রোজ অফিস পৌঁছতে দেরি হচ্ছে অভির। বিশাল সাক্সেনা সেদিন বেশ করে শুনিয়ে দিল দু-চার কথা। সেটা জানার পরও কোনো হেলদোল আছে মেয়েটার? যথারীতি নিজের গদাই লস্করি চাল বজায় রেখে চলেছে, আর দেরি করে চলেছে যথারীতি। শুধু নিজের সুবিধা-অসুবিধাকে বড় করে দেখা ছাড়া আর কিছু কি ও জানে আদৌ? কথাগুলো মুখের কাছে চলে এলেও ক্যোঁৎ করে গিলে ফেলল অভি। কী লাভ বলে? যে জেগে ঘুমায় তাকে জাগানো যায় না। আর এসব বললে শুধু শুধু অশান্তি বাড়বে আর এই তাড়াহুড়োর সময় আরও কিছু সময় নষ্ট হবে। তাই কথা না বাড়িয়ে দুম করে দরজা বন্ধ করে অফিসের জামাকাপড় পরতে শুরু করল অভি। শুনল তখনও চিৎকার করছে পিয়ালি, “ছেড়ে দেব, সব ছেড়ে দেব আমি। এই চাকরিটাও আর এই শয়তান ছেলেটাকেও। ডিভোর্স করে দেব আমি আমার বান্ধবী সুজাতার মতো। বেঁচে গেছে সুজাতা। আর আমাকেও বাঁচতে হবে এবার।”

— “সুজাতার বর দেবমাল্যর মতো অত সৌভাগ্য কি হবে আমার? এত সহজে কি সত্যি মুক্তি মিলবে? উফফ! যদি সত্যি মুক্তি মিলত এই মেয়েটার হাত থেকে!” — নিজের মনেই কথাগুলো বলে ফেলল অভি, আর ওর বুক ঠেলে বেরিয়ে এল একটা চাপা দীর্ঘশ্বাস।

— “জানিস, তোকে প্রথম যেদিন দেখেছিলাম সেদিনই কে যেন কানে কানে বলে গেছিল যে তুই শুধুই আমার।”

— “ধ্যাত! খালি বাজে কথা না!” লজ্জা পেয়ে হেসে বলল কফি হাউসে বসে থাকা অষ্টাদশী মেয়েটা।

— “নারে সত্যি। বিশ্বাস কর। তুই আমার সব ভাবনার মধ্যে মিশে থাকিস। তোকে সব সময় কাছে পেতে ইচ্ছে করে। আর যেদিন তোর সাথে দেখা হয় না, সেদিন কেমন অস্থির লাগে আমার। কিছু ভালো লাগে না। তুই কোনোদিন আমায় ছেড়ে যাবি না তো?”

— “কোথায় যাব আমি তোকে ছেড়ে? আমি তোকে ছেড়ে থাকতে পারব নাকি? আমি তোকে ছেড়ে একদম থাকতে পারব না। তুই বল কোনোদিন আমায় কষ্ট দিবি না তো?”

— “না কোনোদিন না। কক্ষনো না, একটুও না...”

মিথ্যে! সব মিথ্যে ছিল। পুরোনো দিনে বলা অভির বলা সব কটা কথাই চরম মিথ্যে ছিল। মিথ্যে না হলে কোনো মানুষ বিয়ের দেড় বছরের মধ্যে এভাবে বদলে যেতে পারে না। সব সময় শুধু ঝগড়া আর অশান্তি। আর গতকাল যেটা হল? এখনও ঘটনাটা বিশ্বাসই করতে পারছে না পিয়ালি। অসভ্য, কুচুটে, অবিবেচক— যা পারল বলে গেল অভি। আর শেষের কথাটা? অভি পারল এটা বলতে? পারল এতটা কষ্ট দিতে পিয়ালিকে?

কম্পিউটার স্ক্রিনের দিকে ফাঁকা একটা দৃষ্টিতে তাকিয়ে বসে ছিল পিয়ালি। প্রায় এক ঘণ্টা হল অফিস চলে এসেছে, কিন্তু কিছুই কাজ করে উঠতে পারেনি এখনও সেভাবে। আজ সোমবার, কাজের চাপও বেশি। তবুও কাজে মন বসাতে পারছে না। ভীষণ কষ্ট হচ্ছে বুকের কাছটায়। একটা কান্না ঠেলে বেরিয়ে আসতে চাইছে ভিতর থেকে।

— “কিরে কী হয়েছে তোর?” — সুদর্শনার প্রশ্নটায় চমক ভেঙ্গে মুখ ফিরিয়ে তাকাল পিয়ালি। সুদর্শনা ওর কলিগ হলেও অনেকটা বন্ধুর মতোই হয়ে গেছে এখন।

— “কিছু না” — অস্ফুটে উত্তর দিল পিয়ালি।

— “তাহলে এমন গোমড়া হয়ে হয়ে আছিস কেন? বরের সঙ্গে আবার ঝগড়া করেছিস নিশ্চয়? কী নিয়ে লাগল আবার?”

— “তেমন কিছু না রে।”

সত্যি ব্যাপারটা তেমনও কি বড় কিছু ছিল? এটার জল যে এত দূর গড়াবে আন্দাজও করতে পারেনি পিয়ালি। অন্য অনেক উইক-এন্ডের মতো এই উইক-এন্ডটাতেও ওরা অভির দেশের বাড়ি মানে যেটা কলকাতা থেকে খানিক দূরে সেখানে গিয়েছিল। দিন কয়েক আগে অভির বাবা-মায়ের বিবাহবার্ষিকী ছিল। তাই এবার যাবার সময় অভির মায়ের জন্য একটা শাড়ি কিনে নিয়ে গেছিল পিয়ালি। ও নিজে খুব একটা শাড়ি পরে না। তাই শাড়ি সম্বন্ধে খুব একটা ভালো ধারণা নেই। তবু যাহোক কিনেছিল নিজের পছন্দমতো। কিন্তু সেই পছন্দটা যে খুব একটা জুতসই হয়নি সেটা ও বুঝে গেছিল শাড়িটা হাতে পাবার পর অভির মায়ের মুখ-চোখ দেখেই। সেদিনই সন্ধ্যার দিকে অভি ওর বাবার সঙ্গে একটু বাজারে যাবার পর নিজের অপছন্দটা মুখ ফুটে বলেই ফেললেন অভির মা।

— “তোর আনা শাড়িটা ভালোই হয়েছে, কিন্তু শাড়িটার কোনো ব্লাউজ পিস নেই।”

— “তাহলে একটা ব্লাউজ কিনে নাও।”

— “নারে কেনা ব্লাউজ পরি না আমি, তৈরি করাই পরি। তাছাড়া শাড়িটা বহরেও একটু ছোট। ঠিক ভালো লাগছে না। মনে হয় খুব একটা ভালো কোয়ালিটির নয়।”

আর তর্ক করেনি পিয়ালি। কিন্তু বিরক্তিতে ভরে গেছিল ওর মনটা। অভির মা এমনিতেই ওকে খুব একটা পছন্দ করেন না কোনোদিনই, সেটা পিয়ালি ভালোই জানে। এর আগেও অনেকবার অনেক খোঁচা মারা কথা বলে পিয়ালিকে ছোট করতে চেষ্টা করেছেন, কিন্তু এবারের ব্যাপারটা খুব বেশি খারাপ লেগেছিল ওর। ভালোবেসে দেওয়া উপহারটাও একটু ভালো মনে নিতে পারল না মানুষটা? এত ছোট মন? উপহারটা অপছন্দ যদি হয়েও থাকে এত খারাপ ভাবে কি কেউ বলে মুখের ওপর? কলকাতায় নিজেদের ফ্ল্যাটে ফিরে এসে সেই খারাপ লাগার কথাটাই পিয়ালি বলতে গেছিল অভিকে। কিন্তু অভি পুরো কথা শেষ হবার আগেই জ্বলন্ত অঙ্গার হয়ে ফেটে পড়ল যেন। চিৎকার করে উঠল বিশ্রী ভাবে, “একদম মিথ্যা কথা বলবে না আমার মায়ের নামে। আমি জানি না নাকি তুমি কেমন? কুচুটে, অসভ্য মেয়ে তুমি। বড়দের সম্মান দিতে জানো না? বড়দের সম্বন্ধে মিথ্যে বলতে লজ্জা করে না তোমার? আমার মা এমন মানুষই নন। নিশ্চয় মা সরল মনেই কিছু বলেছেন আর তুমি সেটার বাঁকা অর্থ করেছ। এটাই তো স্বভাব তোমার।”

আর মেজাজ ঠিক রাখতে পারেনি পিয়ালি। যে দোষ করল তার দোষ না দেখে উলটে পিয়ালিকেই দোষ দিচ্ছে অভি। মিথ্যাবাদী ভাবছে ওকে। কেন বলতে যাবে ও মিথ্যা? বাজখাই চিৎকার করে বলে উঠল — “সেই তো, যেমন মা তার তেমনই তো ছেলে হবে। নীচু মন তোমাদের সবার। পুরো পরিবারটাই ফালতু।”

আর সহ্য করেনি অভি। ঝপ করে উঠে দাঁড়িয়ে কঠিন স্বরে বলে দিল, “তবে তুমিও শুনে রাখো, আমি আর থাকব না তোমার সঙ্গে। তোমার মতো অবুঝ, অবিবেচক মানুষের সঙ্গে থাকা যায় না। আমাকে মুক্তি দাও আর নিজেও তুমি বাঁচো নিজের মতো।”

তারপরে আর কোনো কথা বলেনি অভি। সারারাত কেঁদেছে পিয়ালি। পারল এটা বলতে অভি? নাঃ সত্যি! অভির সঙ্গে বোধহয় আর থাকা যাবে না এটা পিয়ালিও বুঝতে পারছে। যতই কষ্ট হোক এটা সত্যি যে ওদের ভালোবাসা একদম ফুরিয়ে গেছে। এভাবে সবসময় অশান্তি করে একসঙ্গে বাঁচার থেকে আলাদা হয়ে যাওয়াটাই বোধহয় ভালো।

— “এই ফোন বাজছে তোর...” — আবার সুদর্শনার খোঁচায় সম্বিৎ ফিরল পিয়ালির। আরে হ্যাঁ। ফোনটা ভাইব্রেট হচ্ছে।

— “হ্যালো...” ফোন কানে চাপল ও।

— “কিরে মলি ব্যস্ত নাকি?” ওপাশে বাবার গলা।

— “না বলো।”

— “শোন তুই অফিসে ছুটির দরখাস্তটা করে দিস কিন্তু মনে করে। আর তোর বসকে একটু বুঝিয়ে বলিস যাতে মঞ্জুর করে তোর ছুটিটা...”

— “হুম...।”

কেটে গেল ফোনের লাইন। উফফ! তিন-চার দিনের ছুটি এই মার্চ মাসে কি আদৌ দিতে রাজি হবে বস? মনে তো হয় না। দু-দিনের ছুটি চেয়েছিল সুদর্শনা ওর বন্ধুর বিয়ের জন্য। তাই পেল না। আর সেখানে আবার তিন-চার দিন! কিন্তু চেষ্টা তো করতেই হবে একবার। উফফ! বুক ঠেলে একদলা বিষণ্ণ বাষ্প বেরিয়ে এল পিয়ালির।

‘বলম পিচকারি যো তুনে মুঝে মারি...’ গাঁক গাঁক করে গান বাজছে অফিসের বাইরের চত্বরটায়। আগামীকাল দোল, তাই উৎসবে মেতেছে সব। আবির আর রং নিয়ে চলছে হৈ-হুল্লোড়। যদিও আকাশ দেখে কে বলবে কাল দোল! ফাগুনের আকাশ শ্রাবণের বৃষ্টি আর মেঘেই ঢাকা হয়ে রয়েছে ঠিক অভির মনের মতোই। আর সবার সঙ্গে তাই খুশিতে মাততে একদম ইচ্ছে করছে না ওর। আনমনে বসে ফেসবুক নিয়ে টুকটাক নাড়াচাড়া করছিল অভি। নিউজফিডে শুধু সবার রঙ মাখা ছবির ভিড়।

অনেক ছবি দেখতে দেখতে হঠাৎ একটা ছবিতে চোখ আটকে গেল। পিয়ালির আর ওর রং মাখা হাসি হাসি মুখের একটা সেলফি। গত বছর দোলে তোলা হয়েছিল এটা। খুব করে পিয়ালিকে রং মাখিয়েছিল ও গতবার। পিয়ালিও প্রতিশোধ নিয়েছিল হাড়ে হাড়ে। তারপর তুলেছিল এই সেলফিটা। বিয়ের পরের প্রথম দোল বলে কথা! সেই ছবিটাই আবার এবছর প্রোফাইল পিকচারে সেট করেছে পিয়ালি। ছবিটা দেখে মাথাটা এত গরম হয়ে গেল যে ঝপ করে ফেসবুকটা বন্ধ করে দিল অভি। এসব ন্যাকামোর কী দরকার ছিল ওই মেয়েটার? ও তো আদৌ ভালোবাসে না অভিকে। তাহলে এসব কেন? যদি একটুও ভালোবাসত তাহলে কি এই উৎসবটার সময় এভাবে অভিকে একা করে দিয়ে চলে যেতে পারত! না পারত না। একটুও কি ওর মনে পড়ছে ওর গত দোলের কথা? নিশ্চয় পড়ছে না। খুব মজাতেই আছে ও। সব কষ্টটা অভি একাই পাচ্ছে। ও একদমই নিশ্চয় মিস করছে না বরকে। নিজের বাবা-মায়ের সঙ্গে বেড়াতে গেছে যখন, তখন আনন্দ যে করবে সেটা তো জানাই কথা। হ্যাঁ, হ্যাঁ, ওটাকে বেড়াতে যাওয়াই বলে। বর্ধমানে বাবার গুরুদেবের বাড়ি যাওয়াটা তো শুধু একটা ছুতো। সব কাজিনরা একসঙ্গে হবে, মজাই তো করবে। আর ফিরবে চার দিন পর। দোল-টোল সব সেরে। অভিকে সেভাবে জোর দিয়ে যেতেও বলল না। হ্যাঁ, পিয়ালির বাবা বলেছিলেন, কিন্তু তাতে কেন যাবে অভি? পিয়ালির কি আরও জোর দিয়ে বলা উচিত ছিল না? অবশ্য পিয়ালি জানত যে এখন ওর পক্ষে কয়েকটা ছুটি ম্যানেজ করাটা প্রায় অসম্ভব। তাই হয়তো বলেনি। কিন্তু নিজে তো চলে গেল দিব্যি। একটুও ভাবল না বরের কথা।

— “কিরে এখানে বসে কী করছিস? বাইরে চল। দোল খেলবি তো? নাকি বউ তিন-চার দিনের জন্য বাইরে বলে তুই বিরহ ব্যথায় কাতর হয়ে গেলি।” একটু খোঁচা মেরেই কথাটা বলে গেল তপন।

— “আসছি একটু পরে।”

— “ওকে। অ্যাজ ইউ উইশ।”

বিরহ! বিরহ কাকে বলে? অভির তো রাগ হচ্ছে প্রচণ্ড। কিন্তু কষ্টও তো হচ্ছে। এই দেড় বছরে পিয়ালিকে ছেড়ে থাকেনি যে কখনও! কিন্তু একতরফা কষ্ট পেয়ে কী লাভ? ওই স্বার্থপর মেয়েটা কি বোঝে আদৌ অভির মন? না ও বোঝে না। অভিও চলে যাবে এবার বাইরে কোথাও চাকরি নিয়ে। তখন বুঝবে মজা পিয়ালি।

উফফ! কেন এত মনে পড়ছে ওর কথা? থাকলে তো শুধু ঝগড়াই হয়। তাহলে আজ ও চলে যাওয়ায় এত কষ্ট হচ্ছে কেন? আচ্ছা, ওর তো হালকা জ্বর ছিল, ওখানে গিয়ে আবার বাড়বে না তো! অবশ্য বাড়লেই বা কী। আছে তো ওর নিজের লোকরা। অভি কেন ভাববে? না, এত কষ্ট যে হচ্ছে সেটা ও ফিরে এলে একদম বুঝতে দেওয়া যাবে না ওকে। ও যেখানে খুশি যাক, যতবার খুশি যাক কিচ্ছু বলবে না অভি। এখনও কি ও কলেজের খোকা আছে নাকি যে সেই পুরোনো দিনের মতো আবার বলবে — “যেদিন তোর সঙ্গে দেখা হয় না সেদিন কেমন অস্থির লাগে আমার। কিছু ভালো লাগে না। তুই কোনোদিন আমায় ছেড়ে যাবি না তো?...”

কিন্তু কেন মনে হচ্ছে যে পিয়ালিকে এক্ষুনি ফোন করে যদি বলা যেত আবার আগের মতো… কেন মন মানছে না? কেন এত অবুঝ হয় মানুষের মন!

পিয়ালির বিয়ের সময় গুরুদেব আসতে পারেননি কোনো একটা কারণে, আর তারপর থেকে এই দেড় বছরে কোনোভাবেই গুরুদেব আর ওর দেখাও হয়নি নানা অবস্থার প্রেক্ষিতে। এই ব্যপারটা নিয়ে একটা অশান্তির কাঁটা অনেকদিন থেকেই ঘুরপাক খাচ্ছিল বাবার মনে সেটা পিয়ালি বুঝত। যাই হোক এবার একটু শান্তি পেয়েছেন বাবা। দোলপূর্ণিমা উপলক্ষে গুরুদেবের বর্ধমানের আশ্রম বাড়িতে খুব বড় পূজা, যজ্ঞ আর উৎসব হচ্ছে এবার। চলবে কয়েক দিন ধরে। এবার দোলের তিথি মাহাত্ম্য নাকি খুব বড়। তাই সেই পূজাতে গুরুদেব বাবাকে ডেকেছেন, আর বারবার বলেছেন যেন পিয়ালি অবশ্যই যায়। পিয়ালির পরিবারের সকলেই এই গুরদেবের শিষ্য। তাই কাকামণি আর জ্যাঠামণিও যাচ্ছে সবাইকে নিয়ে। দিন চারেক বাদে ফেরা হবে। দোলের ক্যালেন্ডার হোলি ডে আর মাঝে একটা রবিবার থাকায় দু-দিন সি এল নিয়েই ম্যানেজ হয়ে গেল চারদিনের ব্যপারটা। কিন্তু এই মার্চ মাসের সময়ে দুদিন ছুটি পাওয়াটাই খুব কঠিন ছিল পিয়ালির জন্য। তাই ছুটি পাওয়া নিয়ে প্রথমে বেশ চিন্তায় ছিল ও। একে তো বাবা বারবার করে বলেছেন, তার ওপর পিয়ালির নিজের মনেও বেশ খুঁতখুঁত একটা ভাব ছিল। কিন্তু অবশেষে অনেক অনুরোধের পর যখন মিলল ছুটিটা তখনও কেন যেন পুরোপুরি খুশি হতে পারছিল না ও। কোথায় যেন খুট করে কাঁটা বিঁধছিল বুকের মাঝে। কেন এমনটা হচ্ছিল সেটা তখন ভালো বুঝতে না পারলেও এখন বেশ বুঝতে পারছে পিয়ালি। আসলে ছুটি মঞ্জুর হয়ে যাওয়া মানেই তো চারদিনের জন্য বর্ধমান যাওয়াটা নিশ্চিত হয়ে যাওয়া। আর তার মানেই দোলের সময়টায় অভিকে ছেড়ে থাকা। কারণ অভি যে এই সময়টায় ছুটি পাবে না সেটা একদম নিশ্চিত। খুট করে বিঁধে থাকা কাঁটাটা এখন লক্ষ কোটি মৌমাছির হুলের মতো ক্ষত বিক্ষত করছে পিয়ালির ফুসফুস।

হাই রোডের পথ ধরে যেমন হু হু করে ছুটে চলেছে ওদের গাড়িটা, তেমনই হু হু করছে পিয়ালির মনের ভিতরটাও। বার বার মনে হচ্ছে অভির কথা। গত বছরের দোলের কথা। গত দোলে খুব করে রঙ মাখিয়েছিল অভি ওকে। পিয়ালিও ছাড়েনি। একদম ভূত সাজিয়ে দিয়েছিল ছেলেটাকে। ঘোল খাওয়া, সেলফি তোলা সব মিলিয়ে খুব রঙিন ছিল দিনটা। তারপর দিনের শেষে খুব আদর করেছিল অভি ওকে। বড্ড মনে পড়ছে সেই দিনটা। আচ্ছা, অভির কি মনে পড়ছে? নিশ্চয় না। তাহলে এতক্ষণে কি একটাও ফোন করত না ও? ও বোধহয় শান্তিই পেয়েছে। একবারও তো আসতে মানা করল না পিয়ালিকে সেজন্যই। এইবার দোলটা সঙ্গে থাকলেও কি একই রকম রঙিন হতো দিনটা, নাকি ঝগড়া করেই কেটে যেত বাকি দিনগুলোর মতো? অজানা একটা কষ্টে বুকের ভিতরটা ছেয়ে গেছে পিয়ালির। খুব অদ্ভুত অদ্ভুত খেয়াল আসছে মাথায়। আচ্ছা, এই পথ ধরেই তো বর্ধমানের কোনো এক কলেজে ফাংশান করতে যাবার পথে পথ দুর্ঘটনায় প্রাণ হারালেন “বাঁধন ছাড়া” ব্যান্ডের লিড সিঙ্গার ঋদ্ধি। এই তো ক’দিন আগের কথা। এক্ষুনি যদি পিয়ালিদের গাড়িটাও এক্সিডেন্ট করে? কী হবে তাহলে? আর তো কোনোদিন দেখা হবে না অভির সঙ্গে। কোনোদিন আর ঝগড়া করা হবে না, ভালোবাসাও হবে না। অভি তো জানতেই পারবে না পিয়ালির মন খারাপগুলো। নিজের অজান্তেই সানগ্লাসের পিছনে ঢাকা চোখ দুটো জলে ভরে উঠল পিয়ালির।

— “এই দিদি, কী হয়েছে রে তোর? এমন উশখুশ করছিস কেন? শরীর খারাপ লাগছে নাকি?” — পৃথা আলতো একটা টোকা মারল দিদিকে।

— “আমার খুব ভয় করছে রে। আমাদের গাড়িটা যদি এখন এক্সিডেন্ট করে?”

— “ধুত! তুই না...”

— “নারে, কত এক্সিডেন্ট তো হয় এই পথে...”

— “আরে, আমরা কি এই রাস্তা দিয়ে প্রথমবার বর্ধমান যাচ্ছি নাকি? আগেও তো কতবার গেছি। তুই ভুলভাল ভাবিস না তো” — কানে হেডফোন গুঁজে আবার গান শুনতে ব্যস্ত হয়ে গেল পৃথা।

— “জীবনদা, গাড়ির এসিটা বন্ধ করো তো” — ড্রাইভারকে বলল পিয়ালি। গাড়ির ভিতরের এই কৃত্রিম শৈত্যটা কেমন যেন অসহ্য ঠেকছে। এসি বন্ধ হতেই গাড়ির জানলার কাঁচটা অল্প ফাঁক করল ও। আজ সকাল থেকেই কালো মেঘ আর ঝিমঝিমে বৃষ্টি মুড়ে রেখেছে দিনটাকে। কে বলবে আগামীকাল দোল! কাঁচ খুলতেই একমুঠো ভিজে বাতাস আর অনেকগুলো বৃষ্টির ফোঁটা ভিজিয়ে দিয়ে গেল পিয়ালিকে। এলোমেলো করে দিল ওর কপালের ওপর পড়ে থাকা অবাধ্য চুলগুলো। হঠাৎ ব্যাগ হাতড়ে ব্যস্তভাবে ফোন বের করল পিয়ালি। অভিকে এক্ষুনি ফোন করতে হবে। ওকে এক্ষুনি বলতেই হবে, “তোমাকে ছেড়ে আজও থাকতে পারি না আমি। আমার শুধু আজও তোমাকেই চাই। ঝগড়া করার জন্যও চাই, ভালোবাসার জন্যও চাই”।

মোবাইলটা হাতে নিয়েও ফোনটা করতে পারল না পিয়ালি। ও কি আর কলেজের সেই কিশোরী মেয়ে আছে এখন! এমন ছেলেমানুষির বয়স আর নেই যে। তাছাড়া গাড়িতে বাবা, মা, বোন, ড্রাইভার সবাই রয়েছে এখন। না, হাজার ইচ্ছে করলেও বলা যাবে না এখন ওসব কথা। কিন্তু বলতে যে পিয়ালিকে হবেই। না ফোনে নয়, কলকাতায় পৌঁছে অভিকে একদম শক্ত করে জড়িয়ে ধরে কথাগুলো বলবে ও।

— “দিদি, কি সুন্দর একটা গন্ধ আসছে দ্যাখ!”

হ্যাঁ , ঠিক বলেছে তো পৃথা। কোথা থেকে আসছে গন্ধটা? জানলার বাইরে মুখ বাড়াল পিয়ালি।

— “ঐ তো ওই গাছটা থেকে...”

গাছটা দেখতে পেয়েছে পিয়ালি। ওদের গাড়িটা চলে যাচ্ছে গাছটা ছাড়িয়ে। থোকা থোকা নাম না জানা সুগন্ধি ফুলে ভরে আছে গাছটা, আর বিলিয়ে দিচ্ছে নাম না জানা সুবাস। বৃষ্টি ভেজা সুগন্ধি বাতাসটা সারা শরীরে মেখে নিল পিয়ালি। ফোনে হেডফোন লাগিয়ে গুঁজল কানে। ওর প্রিয় গানটা গাইছে অনুপম রায়, ‘বসন্ত এসে গেছে... বসন্ত এসে গেছে...’

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%